নিধির গহনের অফিসে আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গহন কে পাশে বসিয়ে দুপুরের খাবারটা ঠিকঠাকভাবে খাওয়ানো। না হলে মানুষটা যে খাটাখাটনি করে খাবারটাও যদি ঠিকঠাক ভাবে না খায় অসুস্থ হয়ে যাবে।
গহনের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে গেলে আরো কিছুক্ষণ দুজনে বসে গল্প করলো। এবারে নিধির যাওয়ার সময় হয়ে গেল। যদিও গহন বলেনি কিছু। নিধি নিজেই বলেছে যে এখন বাড়ি চলে যাওয়া উচিত। নিধি অবশ্য চাইছিল যেন গহন একটু জোড়াজুড়ি করে আরো কিছুক্ষণ ওর সাথে সময় কাটাতে চায়। তবে নিধি তো ভুলেই গিয়েছিল যে ও পড়েছে একটা পাক্কা বেরসিকের পাল্লায়। এই বেরসিকের আশেপাশে যতই ওনার বিয়ে করা বউ থাকুক না কেন। তবুও ওনার মাঝে কোন অনুভূতিই কাজ করবে না। বউকে দেখে শরীরে একটু শিহরনও জাগবে না। কি যে একটা তেঁতো মানুষ বাপরে বাপ।
নিধি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আরো একবার গহন কে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তাহলে এখন আসি।”
গহন চুপচাপ শুধু মাথা নাড়ালো। নিধি যেতে ধরে থেমে গিয়ে আবারো পিছন ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি হ্যাঁ। আপনি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসবেন।”
এবারে কথাটা বলে নিধি গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভাবলো হয়তো আটকাবে ওকে। অন্তত বলবে যেন পাঁচটা মিনিট পরো যাও। কিন্তু গহন এবারও চুপচাপ মাথা নাড়ালো। এবারে হতাশার থেকে বেশি নিধির রাগ হলো। ভুল হয়েছে এই করলার মতন তেঁতো মানুষটার থেকে একটু মিষ্টি ব্যবহার আশা করা।
আর একটা কথাও বলার ইচ্ছে হলো না গহনের সাথে। নিধি দরজার কাছাকাছি যেতেই পিছন থেকে গহন একবার ডেকে উঠলো ওকে।
“নিধি!”
নিধির মেজাজ দারুন খারাপ ছিল। ফলস্বরূপ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“কি হয়েছে?”
গহন হালকা কেঁপে উঠলো। আমতা আমতা করল কিছু একটা বলার জন্য। নিধির গহন কে আমতা আমতা করতে দেখলেই শরীরটা জ্বলে যায়। আরে বাবা কি বলবি সরাসরি বলা যায় না নাকি। নিধি কি খেয়ে ফেলবো ওকে।
“মুখ দিয়ে কথা কেন বের হয় না আপনার? আমি তো মানুষ। আমি কি খেয়ে ফেলব আপনাকে কিছু বললে?”
গহন বুঝলো আর আমতা আমতা করা যাবে না। নিজের মনের সমস্ত অস্বস্তি, সংকোচকে দূরে ঠেলে ফেলে নিধি কে বলল,
“একটু পরে বাড়ি গেলে হয় না?”
গহন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে নিধি চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“কি বললেন আরেকবার বলুন?”
“বললাম একটু দেরি করে বাড়ি ফিরলে কি সমস্যা হবে? আসলে তোমাকে তো কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে পারলাম না। তাই আজ শহরেই ঘুরতাম। তোমার যদি ব্যস্ততা থাকে তাহলে চলে যেতে পারো। কোন সমস্যা নেই। অন্য কোনদিন ঘুরবো। আমি বললাম জন্যই যে আমার কথা শুনতে হবে তার কোন মানে নেই। তোমার ইচ্ছে হলেই যাবো, না হলে যাবো না।”
নিধি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ গহনের দিকে তাকিয়ে রইলো। দরজার কাছ থেকে গুটি গুটি পায়ে আবারও গহনের দিকে এগিয়ে এসে গহনের কপালে হাত রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“জ্বর তো আসেনি। আপনাকে দেখে তো সুস্থই মনে হচ্ছে। কিন্তু সুস্থ থাকলে তো আপনি এই কথাটা আমায় বলতে পারতেন না।”
ভ্রুঁ কোঁচকালো গহন। নিধির কথার মানেটা ঠিকঠাক বুঝেও উঠতে পারলো না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি বলছো? বুঝলাম না।”
“এই যে আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে চাইলেন। আপনি কি জানেন বউকে নিয়ে ঘুরতে যেতে চাওয়া কত বড় পাপ? আপনার বিন্দুমাত্র কোন ধারণা আছে বউয়ের সাথে সময় কাটাতে চাওয়া কত বড় পাপ। বাপরে বাপ একদিনে এত পাপ করে ফেললেন। ছিঃ ছিঃ গহন।”
গহন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিধির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। সত্যি মেয়েটার কথাগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কথার ধরন দেখে তো মনে হলো গহনকে খোঁচা দিয়ে কথাগুলো বলছে। কিন্তু এখন কেন খোঁচা দিল। গহন তো কিছু করেনি।
গহন কে চুপ করে থাকতে দেখে নিধি এবারে হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“মজা করছিলাম। আরে আমি পড়েছি আপনার মতন একটা আনরোমান্টিক মানুষের পাল্লায়। হঠাৎ করে আপনি ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেন তো তাই আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে মানুষটা আপনি বোধহয় খুব বেশি আনরোমান্টিকও না। বউয়ের সাথে সময় কাটাতে আপনারও ইচ্ছে করে তাই না? কিন্তু লজ্জায় বলতে পারেন না।”
কথাটা বলে নিধি হালকা করে গহনের কাঁধে একটু ধাক্কা দিল। এতক্ষন গহন যতটা না লজ্জা পেয়েছিল এখন তার থেকে অনেক বেশি লজ্জা পেল। ভীষণ অস্বস্তি হলো এই মেয়েটার কথাগুলো শুনে। এখন তো নিজেরই নিজেকে গালি দিতে ইচ্ছে করছে। কেন যে বলতে গেল ঘুরতে যাওয়ার কথা। না বললে তো মেয়েটা এভাবে মজা নিতে পারতো না।
___________
দুজন গন্তব্যহীন মানুষ গাড়ি নিয়ে শুধু ঘুরছে পুরো শহর জুড়ে। কারণ নির্দিষ্ট কোন যাওয়ার জায়গা নেই। কোন পছন্দের জায়গাও নেই। কোথায় যাবে ওরা কিচ্ছু জানে না। কোথায় যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিল সেটাও জানে না। শুধু একে অপরকে বলেছিলো দুজনে একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাবে। কিন্তু কোন গন্তব্য ঠিক ছিল না।
মাঝে মাঝে অবশ্য এমন গন্তব্যহীন ভাবে বের হওয়াটাই ভালো। কোন কিছু নির্দিষ্ট করে বেরোলে তো সেই মাফিকই চলতে হয়। কিন্তু অনির্দিষ্ট বিষয়গুলো হয় অসম্ভব সুন্দর। যা ইচ্ছে তাই করা যায়। যেখানে সেখানে গিয়ে যতক্ষন ইচ্ছে ততক্ষন সময় কাটানো যায়।
ঘড়িতে তখন সময় বিকেল পাঁচটা। এই শহরটা নিধির কাছে নতুনই বলা চলে। নিধির চলাফেরার জায়গার বিস্তৃতি খুব বেশি না। স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার খুব কম জায়গার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই তো বলা যায় নিজের পাড়া অব্দি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলেজ যেত। আবার কলেজ থেকে সোজা বাড়ি আসতো। পাড়াতে কয়েকজনকে পড়াতো। এইতো নিধির যাতায়াতের জায়গা। এর বাইরে খুব বেশি হলে মাঝে মাঝে আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়েছে। খুব বেশি না হয়তো দু এক বছর পর পর গিয়েছে। সারাটা বছর তো বাড়িতেই কেটে যেত।
আজ প্রথম নিধি কে নিয়ে কেউ ঘুরতে বেরিয়েছে। আজ প্রথম কেউ নিধিকে কোন শহর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। গহন নিধি কে সব কিছু দেখাচ্ছে, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সব কিছুর সাথে। অনেকক্ষণ এভাবে গন্তব্যহীন ভাবে ঘোরার পর অবশেষে একটা জায়গায় এসে গাড়িটা থামালো গহন।
নিধি গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এটা কোথায় এলাম?”
গহন সিট বেল্ট খুলতে খুলতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“গাড়ি থেকে নামো। অনেকক্ষণ থেকে তো ঘোরাঘুরি করছি। তাই ভাবলাম তোমাকে কিছু খাওয়াই। এখানকার ফুচকার খুব সুনাম। ফুচকা তো নিশ্চয়ই পছন্দ করো তাই না?”
ফুচকার নামটা শুনতেই নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। ফুচকার তেঁতুল জলের কথাটা মনে করতেই জিভে জল চলে এলো। তাড়াহুড়ো করে সিটবেল্টটা খুলতে খুলতে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একদম ঠিক বলেছেন। ফুচকা তো আমার জান, আমার ভালোবাসা।”
“আর আমি?”
নিধির হাতটা থেমে গেল। ঘাড় কাত করে গহনের দিকে তাকাতেই দেখলো গহন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিধি কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে গহন ফের বলল,
“ফুচকা তোমার সব ভালোবাসা নিয়ে নিলে আমার জন্য কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে? তাহলে আমি কে?”
নিধি একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। গহন বেশ জটিল প্রশ্ন করেছে। যদিও প্রশ্নটা খুব বেশি জটিল হওয়ার কথা না। ওদের মাঝে তো একটা সম্পর্ক আছে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক। কিন্তু তাও নিধি খুব তাড়াতাড়ি বলে দিতে পারল না কথাটা।
একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“একটু ভালো, একটু খারাপ, একটু তেঁতো, একটু মিষ্টি। সব মিলিয়ে আপনি হলেন আমার হিটলার স্বামী।”
কথাটা বলে একা একাই হেসে উঠলো নিধি। গহনের রেগে যাওয়া উচিত ছিল হয়তো নিধি এমন পরিচয় দেওয়ায়। কিন্তু গহন রাগ করতে পারলো না মেয়েটার প্রাণোচ্ছল হাসির দিকে তাকিয়ে। কি নির্ভেজাল হাসি! যেন কোন মিষ্টি সুর বাজছে গহনের কানে।
মেয়েটা বাড়ি থেকে একেবারে সাজগোজ ছাড়া বেরিয়েছে। বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি হিসেবে শুধু নতুন একটা শাড়িই পরেছে। এর বেশি তার কিচ্ছু করেনি। চুলটাও আঁচড়েছে কিনা কে জানে। মাঝখানে সিথি করে চুলটা ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। গহন নিশ্চিত এই মেয়েটা চুল আঁচড়ায়নি। শুষ্কতায় ঠোঁটের চামড়া ফেটে গেছে।
তবে এই বিষয়গুলো নিধির সৌন্দর্যকে একচিলতেও কমাতে পারেনি। অন্তত গহনের চোখে তো মোটেই না। সব কিছু ছাপিয়ে গেছে মেয়েটার নির্ভোজাল প্রাণখোলা হাসি।
নিধিকে বাড়িতে গহন কখনো এভাবে হাসতে দেখেনা। কখনো এতটা খুশিও দেখেনা। সব সময় যেন একটা চাপের মাঝে থাকে, বিরক্তির মাঝে থাকে। বোধহয় দোষটা গহনের বাড়ির পরিবেশের আর সেই পরিবেশে থাকা মানুষগুলোর। সেজন্য এমন একটা প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েও চুপ হয়ে যায়।
গাড়ি থেকে নেমে ফুচকার দোকানের দিকে যেতে ধরে হঠাৎই নিধির চোখ গেল পাশের অন্য একটা দোকানে। এটাকে ঠিক দোকান বলা যায় না। ছোট পরিসরের জায়গায় একজন মানুষ ডিম সিদ্ধ বিক্রি করছেন। বরাবরই ডিম নিধির ভীষণ প্রিয়। যেকোনো রকম ভাবেই ডিম নিধির প্রিয়। নিধি অনায়াসে একসাথে তিন-চারটে ডিম খেয়ে নিতে পারবে। তবে এই বাড়িতে আসার পর থেকে নিধির প্রিয় ডিমটাই আর খাওয়া হয়ে ওঠে না।
একদিনও এ পর্যন্ত বাড়িতে ডিম রান্না করা হয়নি। ফ্রিজে ডিম থাকে। তবে নিধি খাওয়ার সাহস পায় না। একদিন দুধের জন্য যা কান্ড ঘটলো। তাতে আবার ডিম খেলে না জানি কোন কুরুক্ষেত্র লেগে যায়।
নিধিকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে গহন তাড়া দিয়ে বলল,
“কি হলো চলো।”
“ফুচকা খাবো না। চলুন ডিম সিদ্ধ খাই।”
নিধির ইশারা করা দিকে গহন তাকিয়ে বলল,
“ডিম সিদ্ধ খাবে! এটা তো বাড়িতেও খাওয়া যায়।”
“আরে না না। বাড়ির ডিম সিদ্ধ আর এই ডিম সিদ্ধর মাঝে পার্থক্য আছে। বাড়িতে তো ডিম খাওয়াই যায় না। যাই হোক চলুম ডিম সিদ্ধ খাব।”
নিধি ডিম সিদ্ধ খাওয়ার জন্যই জেদ করলো। গহনের আর কি। যা খেতে চাইবে তাই তো খাওয়াবো। সেজন্য চুপচাপ ফুচকার দোকান রেখে ডিম সিদ্ধর দিকে এগিয়ে গেল।
একে একে নিধি তিনটে ডিম সিদ্ধ খেল ভাবা যায়! গহনকেও অনেকবার জোর করলো খাওয়ার জন্য। তবে গহন খেলো না। নিধি একাই তিনটে ডিম সিদ্ধ খেয়ে নিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে টাকাটা দিয়ে চলে আসার সময় গহন নিধি কে বলল,
“ডিম তোমার এত প্রিয়!”
“খুব ভালোবাসি আমি ডিম খেতে। আমার মনে হয় আমাকে যদি কেউ তিন বেলা ডিম দিয়ে খেতে দেয় আমি অনায়াসে খেয়ে নিতে পারব।”
গহন ছোট্ট করে বলল,
“ওহ্।”
গহন ভেবেছিল নিধি হয়ত আর কিছু খাবে না। কেননা তিনটে ডিম সিদ্ধ খাওয়ার পর কারো পেটে জায়গা স্বাভাবিকভাবে থাকার কথা না হয়ত। তবে গহন সত্যি বুঝতে পারেনি যে নিধির পেটে এখনো খানিকটা জায়গা আছে ফুচকা খাওয়ার জন্য। গহন গাড়ির দিকে চলে যেতে ধরলে নিধি ওর হাত টেনে ধরে বলল,
“আরে কোথায় যাচ্ছেন?”
“কেন গাড়িতে।”
“আচ্ছা মানুষ তো আপনি। ডিম সিদ্ধ খেলাম জন্য আর ফুচকা খাওয়াবেন না? এত কিপটে আপনি। এক প্লেট ফুচকার দাম আর কতই হবে বলুন তো। বউকে ঘুরতে নিয়ে এসে এভাবে কিপটামো করবেন? ছিঃ। এত বড়লোক হয়ে কি লাভ যদি বউকে এক প্লেট ফুচকাই না খাওয়াতে পারেন।”
“ও মা। আমি কখন বললাম খাওয়াবো না। আমি তো খাওয়াতে চেয়েছিলাম। তুমি তো ডিম খেতে চলে গেলে।”
“আরে বাবা সে তো আগে ডিম সিদ্ধ খেয়েছি। কিন্তু আমি কি বলেছি যে ফুচকা আর খাবোই না? চলুন ফুচকা খাব।”
নিধি এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেল গহন কে। গহন স্বেচ্ছায়ই যেত। কিন্তু ধীরস্থিরতা নিধির পছন্দ না। ও নিজে চটপটে, ওর সঙ্গে যে বা যারা থাকবে তাদেরকেও ওর মতন চটপটে হতে হবে।
গহন শুধু নিধির জন্য এক প্লেট ফুচকা অর্ডার করলো। ফুচকা চলে আসার পর নিধি নিজে আগে মন ভরে দু-তিনটে খেয়ে নিল। তারপরে মনে পড়লো ওর পাশে তো গহনও দাঁড়িয়ে আছে। একটা ফুচকার মাঝে টক ঢেলে সেটা গহনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নিন, মুখ খুলুন।”
গহন মাথাটা একটু পিছিয়ে নিয়ে বলল,
“না না আমি খাব না। তুমি খাও।”
নিধি মৃদু রাগী গলায় বলল,
"কি সমস্যা খেলে?”
“আসলে আমি স্ট্রিট ফুড খাই না। ব্যাপারটা আমার ঠিক ভালো লাগে না। আর এসব তো একেবারেই খাই না। তুমি তো জানো আমার সমস্যা হয়। আর এই ফুচকা প্রচন্ড ঝাল।”
“আপনার মা এত বছর ধরে ঝাল তরকারি খাওয়াচ্ছে আপনাকে। তখন কোনদিন আপনার মাকে বলেছিলেন যে আপনার সমস্যা হয়? আর বউ আজ সামান্য একটা ফুচকা খাওয়াতে চাইছে এতে আপনার কি হয়ে যাবে? কিচ্ছু হবে না। বউ ভালোবেসে খাইয়ে দিচ্ছে। ঝাল জিনিসও মিষ্টি লাগবে।”
কথাটা বলে নিধি জোর করে গহনের মুখে একটা ফুচকা দিয়ে দিল। গহনের সত্যি এ ধরনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস নেই। কেন যেন ভালো লাগে না। তবে আজ ফুচকাটা ভালোই লাগলো খেতে। কে জানে এই দোকানের ফুচকাটাই হয়তো বেশি ভালো। কিংবা নিধির বলা কথা অনুযায়ী বউয়ের ভালোবাসা আছে জন্য।
কিন্তু প্রচণ্ড ঝাল লাগলো গহনের ফুচকাটা খেয়ে। তাড়াহুড়ো করে পানির বোতলের মুখ খুলে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে নিল। নিধি মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“লাগবেই তো ঝাল। আমি ভালোবেসে খাইয়ে দিলেই হবে নাকি। ভালোবেসে তো জিনিসটা খেতেও হবে। না হলে মিষ্টি লাগবে কি করে! খাটাশ কোথাকার।”
___________
গহন আর নিধির বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বাজলো। নিধির তখন একটু একটু ভয় করছে। কেননা আজকাল তো এই বাড়িতে নিধি ব্যতীত কেউ রান্নাবান্না কিচ্ছু করেনা। কোন কাজেও কেউ হাত দেয় না। নিধি তো রাতের রান্না করে রেখে যায়নি। এতক্ষণ যে বাইরে থাকবে সেটাও জানতো না। কে জানে রাতের রান্না আদৌও কেউ করেছে কিনা। নাকি এখন আবার এত রাতে ফিরে নিধিকেই সব রান্না করতে হবে। কিংবা এমনও হতে পারে অন্য কেউ হয়তো রান্না করেছে ঠিকই। তবে সম্পূর্ণ গরমটা এখন নিধির ওপরে ছাড়বে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিধি কলিং বেল বাজাতে ধরলে গহন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই। আমার কাছে চাবি আছে।”
গহন চাবি দিয়ে দরজা খুলতে ধরলে নিধি ওর হাত ধরে বলল,
“কলিংবেল বাজালে কি সমস্যা? ওরা কেউ বাইরে থেকে বাড়ি এলে আমি কি দরজা খুলে দেই না? তাহলে আমি এলে ওরা কেন দরজা খুলে দেবে না? কি এমন করছে? খুব বেশি রাতও তো হয়ে যায়নি যে ঘুমিয়ে পড়বে।”
“কি দরকার ওদের বিরক্ত করা।”
“দরকার আছে। এগুলো বিরক্ত করার মতন কোন কাজ না গহন। করতেই হয়। ধরুন যদি আমরা আজ চাবি না নিয়ে যেতাম সঙ্গে করে তাহলে কি ওদেরকে দরজাটা খুলতে হতো না? এখন ওদেরকে দরজাটা খুলতে হবে। খুলবো না চাবি দিয়ে। সারাদিন শুধু বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়া সবগুলোর। একটু উঠে আসুক। নয়তো কোমরে ব্যথা হয়ে যাবে।”
নিধি কোনমতেই চাবি দিয়ে গহনকে দরজাটা খুলতে দিলোই না। গহন খোলার চেষ্টাও করলো না। বরং নিধি কে একটু প্রশ্রয় দিলো যেন।
নিধি একবার কলিং বেল বাজিয়েই ক্ষান্ত থাকলো না। বাজাতেই থাকলো। বিরক্ত হয়ে হলেও কেউ না কেউ উঠে এসে দরজাটা খুলে দেয় যেন। কেননা নিধি জানে একবার কলিং বেল বাজিয়ে যদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে ঘরের ভিতরে থাকা মানুষগুলো ভুলেই যাবে দরজা খুলে দেওয়ার কথা। তাই ওরা যেন ভুলতে না পারে সেজন্য এই উপায়।
নিধির এই উপায়টা কাজে লাগলো। ঋতু এসে তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দিল। এভাবে কলিংবেল বাজাতে দেখে ভয় পেয়েছিল। ভেবেছিল কে না কে এসেছে।
তবে দরজা খুলে সামনে গহন আর নিধি কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু ভরকালো। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“এভাবে কেউ কলিংবেল বাজায়! আর ভাইয়া আপনি তো সঙ্গে করে চাবি নিয়ে যান।”
গহন কিছু বলে ওঠার আগেই নিধি হেসে হেসে বলল,
“আজ ভুলে গিয়েছিল ভাবি। সেজন্য কলিং বেল বাজালাম। নয়তো আপনাকে দিয়ে কষ্ট করানোর কোন ইচ্ছে ছিল না আমাদের।”
জোরপূর্বক হাসলো ঋতু। কিন্তু কিছু যেন একটা আন্দাজ করতে পারলো। যাই হোক এই নিয়ে আর আপাতত কোন কথা তুলল না। দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াতেই নিধি আর গহন ভিতরে এলো। ওরা দুজনে নিজেদের ঘরে চলে যেতে ধরলে ঋতুর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়লো। গহন কে ডেকে উঠল। গহন ঘাড় ঘুরিয়ে ঋতুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবে?”
ঋতু একটু চিন্তিত ভঙ্গিতেই বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া। আসলে মায়ের খুব জ্বর এসেছে। বাড়িতে ওষুধও নেই। একটু যদি ওষুধটা নিয়ে আসতেন।”
“মায়ের জ্বর এসেছে? কখন?”
“গতকাল রাত থেকেই জ্বর।”
“সারাদিন ওষুধ খাওয়াওনি?”
“না। ওষুধ তো ছিল না বাড়িতে। মা কে সারাদিন কিছু খাওয়াতেও পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কিচ্ছু খায়নি।”
“কি যে করো না তোমরা। সারাদিন ওষুধ ছিল না আর এখন আমায় বলছো। আগে জানানো উচিত ছিল।”
কথাটা বলে গহন সালমা বেগমের ঘরের দিকে গেল। গহনের পেছনে পেছনে নিধিও গেল। মানুষটা যাই করে থাকুক না কেন, এখন তো অসুস্থ। তাও আবার নিধির শ্বাশুড়ি। তার উপর আবার গহনের প্রিয় মানুষ। না গেলে হয় না। ব্যাপারটা দেখতে খারাপ লাগে। দেখতে খারাপ না লাগলে নিধি হয়তো যেতনা। কেননা সামান্য তো জ্বরই এসেছে। তেমন কোন ব্যাপার না। আর তার থেকেও বড় কথা এখন গেলে গহন থাকবে সেখানে। ইচ্ছে থাকলেও নিধি কে সালমা বেগম বা অন্যরা ত্যাড়াব্যাকা কথা শোনাতে পারবে না।
আর শোনালেও গহন বুঝতে পারবে যে ওর মা আসলে কেমন। নিধি কে সারাদিন কত কথা শোনায়। সালমা বেগমের ঘরের দিকে যেতে যেতে নিধি মনে মনে দোয়া করলো যেন সালমা বেগম ওকে ভালো মতো গহনের সামনে কথা শোনায়।
সালমা বেগমের ঘরে তখন ওনার দুই বোনই শুধুমাত্র উপস্থিত। আর বাকি যারা এসেছিল তারা সবাই চলে গেছে। ওনারা দুজনেই থেকে গেছেন। অনেকদিন পরে এসেছেন তো সেজন্য বোনকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।
সালমা বেগম তখন কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। কাঁপছেন তিনি। গহন বিছানার ওপর সালমা বেগমের মাথার কাছে বসে ওনার কপালে হাত রাখলেন। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। গহনের ঠান্ডা হাতটা নিজের কপালে অনুভব করতেই আরেকটু কেঁপে উঠলেন সালমা বেগম। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালেন তিনি। চোখ দুটো খুলে রাখতে তার যেন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। লাল টকটকে হয়ে উঠেছে চোখ দুটো। গহনকে বসে থাকতে দেখে আজ আর তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো না। বরং ভেতরে জমে থাকা অভিমানগুলো কান্না হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। তবে তিনি সেটাও করতে করলেন না। তিনি কাঁদবেন না গহনের সামনে। কোনমতেই না।
সালমা বেগমকে চোখ খুলে তাকাতে দেখে গহন ওনার দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“মা ঠিক আছো? শরীর বেশি খারাপ লাগছে? চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।”
সালমা বেগম অস্পষ্ট গলায় বললেন,
“ঠিক আছি। এখন ডাক্তারের কাছে যেতে পারবো না। উঠলেই মাথা ঘুরছে।”
“আমি আছি তো। আমি তোমায় ধরে ধরে নিয়ে যাবো। চলো যাই।”
“না বাবা প্রয়োজন নেই। তুমি যাও। ঘরে গিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে নাও। সবে মাত্র বাইরে থেকে এলে। খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নাও।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। যাব না ডাক্তারের কাছে। বাড়িতে নাকি ওষুধ নেই। আমি গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসি। তুমি শুয়ে থাকো।”
কথাটা বলে গহন উঠে চলে গেল ঘর থেকে। নিধি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। সালমা বেগমের সাথে কথা বলার সুযোগও পেল না। বিছানার অন্য প্রান্তে বসা সালমা বেগমের দুই বোনের দিকে তাকাতেই দেখলো ওনারা অগ্নিদৃষ্টি তে নিধির দিকে তাকিয়ে আছে। নিধির আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। গহনের পিছন পিছন আবার চুপচাপ চলে গেল। এখন গহনের সাথে থাকাই নিরাপদ।