গহন ওর মায়ের জন্য ওষুধ আনতে গেছে। এই ফাঁকে নিধি ঘরে গিয়ে জামা কাপড় বদলে হাতমুখ ধুঁয়ে নিল। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই কলিংবেলের আওয়াজ পেল। বুঝলো গহনই এসেছে। চাবি তো নিধির কাছেই রয়ে গেছে। সেই জন্য ছেলেটা এখন কলিংবেল বাজালো। নয়তো জীবনেও বাজাতো না।
নিধি মনে মনে ঠিক করলো আর কাউকে দরজা খুলতে দেবে না। ওই গিয়ে দরজা খুলবে। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কেউ অবশ্য আসেওনি দরজা খোলার জন্য। কারো এত তাড়াহুড়ো নেই। দরজার কাছে এসে নিধি নিজের গতি কমালাে। দরজা খুলে দিতেই গহন ভিতরে এলো। নিধি আবারো দরজা লাগিয়ে দিল। গহন সোজা গেলো সালমা বেগমের ঘরে।
পূর্বের মতো এবারও গহনের পিছন পিছন নিধি গেল। গহন থার্মোমিটারে আগে জ্বর মাপলো। ১০৩ ডিগ্রি জ্বর উঠে গেছে। ওষুধটা খাইয়ে দিতে ধরলে পাশ থেকে শাহানা বলে উঠলেন,
“সারাদিন কিছু খায়নি তো। খালি পেটে ওষুধ খাওয়াবি?”
গহন এবার বিরক্তিকর গলায় সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব কি মা। খাওয়া দাওয়া করো না কেন তুমি? ঠিক সময় খাওয়া দাওয়া করে ওষুধটা খেলে কি জ্বর এত বাড়তো? নিজের শরীরের যত্ন যে তুমি কবে নিতে শিখবে।”
কথাটা বলে গহন পাশে দাঁড়ানো নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নিধি, একটু মায়ের জন্য খাবার এনে দেবে!”
আদেশ না, বরং অনুরোধের স্বরে বলল গহন কথাটা। নিধি চুপচাপ রান্না ঘরে গেল খাবার আনার জন্য। রান্নাঘরে গিয়ে গরম গরম খাবার দেখতেই তো নিধির চোখ কপালে উঠে গেল। কার আবার এত সুবুদ্ধি হলো যে রান্না করে রেখেছে। এ তো নিধিকে অপমান করার মোক্ষম অস্ত্র ছিল।
নিধি প্লেটে করে খাবার নিয়ে গিয়ে গহনের হাতে দিলো। সালমা তখন হেলান দিয়ে বসে আছেন। গহন নিজেই ভাত মেখে খাইয়ে দিল।সালমা বেগম একবারও দ্বিমত পোষণ করলেন না। এতক্ষণে সেখানে ঋতু এলো। সালমা বেগম কে খেতে দেখে একটু হেসে উঠে বলল,
“জানেন ভাইয়া, আজ সারাদিন আমরা সবাই এত চেষ্টা করেও মা কে কিচ্ছু খাওয়াতে পারিনি। আমিও তো খাইয়ে দিতে চেয়েছিলাম মা। আমার হাতে তো খেলেন না। যেই বড় ছেলে এসেছে ওমনি খাচ্ছেন।”
গহন গম্ভীর গলায় সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার যে জ্বর এসেছে আগে জানোওনি কেন আমায়? একবার কল করে জানাতেও তো পারতে।”
সালমা বেগম কোন উত্তর দিলেন না। চুপচাপ মুখে থাকা খাবার চিবোতে লাগলেন। ঋতুর এই নিয়ে কোন কিছুই বলার উদ্দেশ্য বা ইচ্ছে নেই। তবে চুপ থাকতে পারলেন না শাহানা। নিধির দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙচিয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মায়ের শরীরের খবর নেওয়ার সময় ছিল নাকি তোর। দুপুরে গাড়ি পাঠালি বউকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বউ তোর সেজেগুজে রং ঢং করতে করতে বেরিয়ে গেল। সারাদিন ঘুরেফিরে বাড়িতে ফেরার সময় হলো রাতে। তোর কি আর মায়ের খবর নেওয়ার সময় ছিল। আর তোর বউ তো জানতোই যে তোর মা অসুস্থ। বলেনি কেন তোকে? নাকি তুই জেনেও না জানার ভান করছিস?”
শাহানা কথাটা বলার সাথে সাথে নিধি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মিথ্যে বলছেন কেন? আপনাকে কে বলল যে আমি জানি উনি অসুস্থ? সকাল থেকে আমাকে একবারও এই ঘরে আসতে দেখেছেন? একবার খাবার দিতে এসেছিলাম। আপনি তো দরজার কাছ থেকেই খাবার থালা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পারলেন না শুধু আমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে। দেখুন খালা, আমি গহন না যে ভুলভাল মিথ্যে অপবাদ দিয়ে দেবেন আর আমি চুপচাপ শুনে যাব। আমি নিধি, বুঝতে পেরেছেন? আমি নিধি।”
শাহানা ফের মুখ ভেঙচিয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে অভিযোগের কন্ঠে বললেন,
“তোর বউয়ের মুখের ধার খুব গহন। খুব মুখ চলে এই মেয়ের।”
নিধি এবার একটু হেসে উঠে বলল,
“একদম আপনার মতন খালা। কখনো আপনাকে না দেখে, আপনার সাথে কোন রকম সম্পর্ক ছাড়াই আমরা একে অপরের গুণ পেয়েছি। আমরা দুজন দুজনকে কত ভালোবাসি ভাবুন তো!”
শাহানা আর বলার মতন কিছু খুঁজে পেলেন না। দু চারবার আবারও মুখ ভেঙচিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। গহন সালমা বেগমকে ভাত খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে আবার শুইয়ে দিয়ে এবারে ঋতু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সাবিত কোথায়?”
“ঘরে আছে ভাইয়া। ডাকবো?”
“মায়ের যে ওষুধ নেই ওকে জানাওনি? ও কি জানে না এই ব্যাপারটা?”
ঋতু আমতা আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া একবার বলেছিলাম। আসলে ও ঘুমোচ্ছিল তো সেজন্য খুব বিরক্ত হয়েছিল।”
"একটু ডেকে নিয়ে এসো তো ওকে। বলো আমি ডাকছি।”
ঋতু চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিধি মনে মনে খুব খুশি হলো। বুঝতে পারলো সাবিত ঝাড়ি খাবে। তাই এখন ঘর থেকে যাওয়া যাবে না। দেখতে হবে তো নাটকটা।
বেশ অনেকটা সময় চুপ ছিলেন শাহানা। তবে গহনের সালমা বেগমের প্রতি এত দরদ তার পছন্দ হচ্ছে না। শাহানা ফের মুখ ভেঙচিয়ে গহন কে বললেন,
“তোর ঢং আজকাল শেষই হচ্ছে না গহন। তুইই তো অসুস্থ বানালি সালমা কে। এখন আবার এমন ভাব করছিস যেন তোর দরদ উথলে পড়ছে।”
গহন শীতল দৃষ্টিতে শাহানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খালা, আপনি আমার থেকে বয়সে বড়। আমি শ্রদ্ধা করতে চাই আপনাকে। সেই সুযোগটা আমাকে তৈরি করে দিন। সব সময় কি ঝামেলা তৈরি করা খুব দরকার? সব সময় অন্যদের পারিবারিক বিষয়ে নাক গলানোটাও ঠিক না তাই না? এতে অতিথিদের সম্মান নষ্ট হয়।”
নিধির এবার খুশিতে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করলো। গহন কে একটু বাহবাও দিতে মন চাইলো। তবে সেটা করতে পারলো না। তার আগেই ঘরে লাফাতে লাফাতে সিনথিয়া এলো। ঘরে কে কে আছে, কার কি অবস্থা সেসব কোন দিকে খেয়াল করার সময় নেই। ওর আসল লক্ষ্য হচ্ছে গহন। সোজা গহনের দিকে এগিয়ে গিয়েই ওর পাশে দাঁড়িয়ে আবদারের কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেবে প্লিজ!"
সবসময় একবার চাওয়াতেই সিনথিয়া নিজের কাঙ্খিত সব বস্তু পেয়ে গেছে। সেটা হোক টাকা কিংবা অন্যকিছু। যত টাকাই হোক, তত টাকাই পেয়েছে। এবারেও নিশ্চিত ছিল যে গহন ওকে পাল্টা জিজ্ঞেসও করবে না যে কি প্রয়োজনে টাকা চাই। বেশিরভাগ সময় এমন হয়েছে যে ও যা চেয়েছে তার থেকে বেশি দিয়েছে গহন। যেন কম না পরে । তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটলো। সিনথিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে গহন পাশে শুয়ে থাকা সালমা বেগমকে দেখিয়ে বলল,
“মা যে অসুস্থ সে কথা তুমি জানো?”
একটু থতমত খেল সিনথিয়া। ও জানে সালমা বেগম অসুস্থ। আবার হয়তো জানে না। শুনেছিল বোধহয় কারো থেকে। তবে ঠিক এসে দেখে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্তু গহন কে তো সন্তুষ্ট রাখতে হবে। সেজন্য মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া জানি তো মা অসুস্থ।”
“কোথায় ছিলে এতোক্ষন? একবার মায়ের পাশে এসে বসেছিলে? একটু জলপট্টি দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলে? মায়ের মাথায় যদি এসে একবার হাত রাখতে, তবুও তো মা একটু আরাম পেত তাই না?”
সিনথিয়া আমতা আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ আসলে আমি ঘরে ছিলাম। আর মা তো তেমন অসুস্থ ছিল না। জ্বরই তো এসেছে। কি আর হবে। জ্বরে তো কেউ মা'রা যায় না। আমি তাই নিশ্চিন্ত ছিলাম।”
সিনথিয়া কথাটা বলতেই গহন ধমকের সুরে বলে উঠলো,
“শাট আপ। মা'রা যায় না মানেটা কি। মা'রা যাওয়ার প্রসঙ্গ আসলো কোথা থেকে। আর একজন মানুষ শুধু মা'রা গেলেই তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয়? অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয় না? তুমি ঘরে বসে থেকে মোবাইল চালানোর সময় পেয়েছো অথচ একটা বার এসে মায়ের খোঁজ নিয়ে যাওয়ার সময় পাওনি?”
যতই হোক সিনথিয়া তো শম্পারই বোন। দুই বোনের মাঝে গুনগুলো প্রায় একই। ওরা গহনের দু একটা কথাই সহ্য করতে পারে। এর বেশি আর না। তবে শম্পার থেকে সিনথিয়া একটু বেশি বুদ্ধিমান। মুখে মুখে তর্ক করার বোকামিটা করবে না। কেননা এই ব্যাপারটা সালমা বেগমও পছন্দ করেন না যে গহনের মুখে মুখে তর্ক করবে। সেজন্যই সিনথিয়া এক কান দিয়ে গহনের কথা শুনলো আর অন্য কান দিয়ে গহনের কথা বের করে দিল।
এর মাঝে ওর ফোনে মেসেজের একটা টুং শব্দ পেল। স্ক্রিনে তাকাতেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। এই মেসেজটার রিপ্লাই দিতেই হবে। নাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
গহন অনেক কিছু বলল সিনথিয়াকে। অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো। ভালো করে বলল, শাসনও করল। কিন্তু সিনথিয়া কিচ্ছু শোনেনি। ও মেসেজ টাইপ করেই যাচ্ছে। নিধি ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে খেয়াল করলো। এক পর্যায়ে গিয়ে আর চুপ থাকতে পারলো না। গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখতেই গহন ঘাড় কাত করে নিধির দিকে তাকালো। নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কথা বলতে যথেষ্ট শক্তি ক্ষয় হয়। দেখুন অযথা আপনার শক্তি নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। যাকে উদ্দেশ্য করে এত জ্ঞানের বার্তা ছুঁড়ছেন সে এগুলোর একটাও ধরতে পারছে না। ওর পুরো নজর ফোনে। হয় আপনি নিজের কথা থামান নয়তো ওর থেকে ফোন নিন। এখন দেখুন আপনি যা ভালো বোঝেন।”
গহন সত্যি খেয়াল করলো সিনথিয়ার পুরো মনোযোগ ফোনের উপরে নিবদ্ধ। গহনের এদের অবাধ্যতা দেখে ভীষণ রাগ হয়। বিশেষ করে এই বাড়ির মানুষদের ব্যাপারে এদের এত গা ছাড়া ভাব গহনের একেবারেই পছন্দ না।
উঠে সিনথিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে এক টানে ফোনটা কেড়ে নিয়ে মেঝের উপর ছুঁড়ে ফেলল।
বিস্ময়ে সিনথিয়ার মুখ হা হয়ে গেল। মেঝের উপরে দুই খন্ড হয়ে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে কষ্টে দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে চাইলো। এটা কি হয়ে গেল সিনথিয়ার ফোনের সাথে?
মুহূর্তের মাঝে মাথায় আগুন ধরে গেল। অগ্নিদৃষ্টি তে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ছুঁড়ে ফেললে কেন আমার ফোনটা? কোন সাহসে আমার ফোন ছুঁড়ে ফেললে তুমি?”
গহন কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“এইবার আগে পরীক্ষায় পাস করবে তারপরে ফোন পাবে। তার আগে তোমার হাতে যেন আমি ফোন না দেখি। খুব বেশি প্রয়োজন হলে একটা বাটন ফোন পাবে। এর থেকে বেশি কিছু আশা রেখো না। ঘরে যাও।”
“দেখো ভাইয়া তুমি কিন্তু…...।”
সিনথিয়াকে নিজের কথার সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে গহন বলে উঠলো,
“ঘরে যেতে বলেছি আমি।”
একদমই রাগারাগি করেনি গহন। খুবই শান্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলেছে। তবে ওর শান্ত কণ্ঠের মাঝেই যেন একটা চাপা আদেশ ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিনথিয়া কিছু বলতে পারল না। একে তো বাড়িতে শম্পা নেই। ওর মাও অসুস্থ। বাকি রইল সাবিত। ও জীবনে সিনথিয়ার হয়ে কোন কথা বলবে না। তাই এখন একা গহনের সাথে পেরে উঠবে না ভেবে তিরিং বিরিং করতে করতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“মা তুমি বিশ্রাম নাও। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
__________
সোফায় ভাবুক ভঙ্গিতে নিধি বসে আছে। গহন ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিধি কে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ভাবছো এত?”
নিধি ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
“ভাবছি আপনার মায়ের জ্বর আসার কারণ কি আপনি আর আপনার ব্যবহার?”
প্রশ্নটা করে উত্তরটা জানার জন্য নিধি অধীর আগ্রহে গহনের দিকে তাকিয়ে রইলো। গহন সোফায় নিধির পাশে এসে বসে বলল,
“হুম ঠিক ধরেছো।”
“তা আপনি যে এখনও আপনার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন না? না মানে আমি জানি ভুল কিছু করেননি। কিন্তু তারপরও আপনি তো আবার ওনার বাধ্য, অনুগত সন্তান। আমার মনে হয় আপনি ক্ষমা চাইবেন।”
গহন বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। ভুল কিছু বলিনি আমি।”
নিধি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যিই ক্ষমা চাইবেন না?”
“উঁহু।”
নিধি উচ্ছ্বসিত গলায় গহনের পিঠ চাপড়ে বলল,
“ভেরি গুড। এমনি থাকতে হবে। আই এম সো প্রাউড অফ ইউ গহন।”
কথাটা বলে নিধি আরো কিছুক্ষণ হাসলো। হঠাৎ করে নিধির ভাবনায় আরেকটা নতুন বিষয় এলো। আবারও সোজা হয়ে বসে গহনের দিকে তাকিয়ে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
“আপনার মা আপনাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে তাই না? নয়তো সামান্য একটা ব্যবহারে জ্বর উঠে গেলে। তাও আবার ১০৩ ডিগ্রি ভাবা যায়!”
গহন আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ। ভালো তো বাসেই।”
“হ্যাঁ বাসে ঠিকই। তবে সব সময় সেটা ওনাকে দেখে বোঝা যায় না। আপনিই বলুন আপনার মা কে দেখে সবসময় বোঝা যায় যে উনি আপনাকে ভালোবাসেন?”
গহন আনমনে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে নিধির দিকে ঘুরে বসে বলল,
“আমরা মানুষরা খুবই স্বার্থপর নিধি। আমরা ততক্ষণই অন্যদেরকে ভালোবাসি যতক্ষণ না তারা আমাদের স্বার্থে আঘাত করছে। আচ্ছা তুমি একটা কথা বলোতো, আমি যদি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করি, তোমার গায়ে হাত তুলি তবে কি তুমি আমায় ভালোবাসবে, আমার খেয়াল রাখবে?”
নিধি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“কক্ষনো না। আমি আগেই আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি আমি এত ভালো না। সংসার করবো বলে এসেছি সেটা ঠিক আছে। তাই বলে আমার ধৈর্যের একটা সীমা আছে। আপনি আজ গায়ে হাত তুলবেন তো দুই সেকেন্ডের মধ্যে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব। মনে রাখবেন কথাটা।”
“একদম ঠিক বলেছো। আমি তোমাকে এটাই বোঝাতে চাইছিলাম। তুমি ততদিন অবধি আমায় ভালোবাসবে, আমার যত্ন করবে যতদিন না আমি তোমার স্বার্থে আঘাত করছি, আমার দ্বারা তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে। আমিও ঠিক তোমায় ততদিনই ভালোবাসবো, যতদিন না তুমি আমার স্বার্থে আঘাত করছো। আমরা সবাই এমনই নিধি। আমরা প্রত্যেকেই স্বার্থপর।”
“আচ্ছা আমি মানলাম আমরা সবাই স্বার্থপর। কিন্তু মায়েরা কি স্বার্থপর হয়? মায়েরা স্বার্থপর হয় না। তাহলে আপনি আপনার মাকে কেন স্বার্থপর বানাচ্ছেন?”
গহন ফের আলতো হেসে বলল,
“মা হওয়ার আগে উনি মানুষ। আমরা নিজেকে সবথেকে বেশি ভালোবাসি, আর এটা অন্যায়ও না নিধি। বরং আমি বলবো এটাই ঠিক। কেউ যতদিন না অব্দি তোমার ক্ষতি করছে, তোমার জীবন নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ততদিনই তাকে ভালোবাসো। কিন্তু যদি তার জন্য কখনো তোমার নিজের জীবনের সুখ হারিয়ে ফেলতে হয় তবে তাকে আর ভালোবাসা উচিত না।