বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ২৬

🟢

রাতে খাবার খাওয়ার জন্য নিধি আর গহনকে ডাইনিং রুমে যেতে দিল না। কাউকে খেতেও ডাকেনি। নিধি চুপচাপ গিয়ে একটা প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে ঘরে এলো। খাবারের প্লেটগুলো বিছানার ওপরে রেখে গিয়ে আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলো। কেননা এই বাড়ির কারোর কোন বিশ্বাস নেই। যে কোন সময় এসে আবার ঝগড়া লেগে যেতে পারে।

গহন ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেড়ােতেই নিধি ওকে খেতে বলল। গহন বিছানার দিকে তাকিয়ে একটা প্লেট দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি খাবে না?”

“দুপুরের খাবার খেয়েছি সন্ধ্যায়। এখনও পেট ভরে আছে আমার। খাওয়ার সময়ও পাইনা। মানুষের কথা শুনতেই দিনরাত চলে যায়। আপনি খেয়ে নিন। আপনার তো আবার কারো কথা শুনে পেট ভরে না। খাবার খেয়ে পেট ভরাতে হবে।”

কোন কথা বাড়াতে চাইলো না গহন। চুপচাপ খেতে বসলো। কয়েকদিন হলো গহন খেয়াল করছে খাবারে তেল মসলা খুব কম ব্যবহার হচ্ছে। ঝালও কম। কিন্তু এই বাড়ির কেউই তো এত কম ঝাল খেতে পছন্দ করে না। মুখেই তুলবে না কেউ এই খাবার। নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে গহন নিধি কে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,

“রান্না কি তুমি করো?”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“গহনের বউ যেহেতু আমি। সেজন্য আমাকেই রান্না করতে হবে। না এই বাড়িতে গহনের কোন মূল্য আছে। না গহনের বউয়ের কোন মূল্য আছে। আমি রান্না না করলে তো এই বাড়ির কেউ আজকাল খেতেই পারে না। জানেন না আপনি?”

নিধি গহন কে কেন এই কথাগুলো নিয়ে খোঁচা দিল গহন ঠিক বুঝলো না। আপাতত এই নিয়ে কোন কথা না বলে ফের জিজ্ঞেস করল,

“কেউ কিছু বলে না খাবারের স্বাদ নিয়ে?”

নিধি এবারে মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,

“শুনুন, তিন বেলা যে রান্না করে খাওয়াচ্ছি এটাই আপনার চৌদ্দ গুষ্টির কপাল ভালো। কেউ কিছু বলতে এলে সোজা বলে দেবে নিজে রান্না করে যেন খেয়ে নেয়। একেকজনের যা ব্যবহার। এদেরকে যে রান্না করে খাওয়াই তাতেই তো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তার উপর আবার স্বাদ নিয়ে নাকি আমাকে কথা শোনাবে! আসুক না কথা শোনাতে। কাঁচা সবজি খেতে হবে তারপর থেকে।”

“আরে, আমি বোঝাতে চাইছি এত কম ঝাল দেওয়া খাবার তো কেউ খায় না। এই খাবার বাড়ির কেউই মুখে তোলার কথা না।”

“ওহহ এই ব্যাপার। আমি তো আপনার জন্য আলাদা করে রান্না করি। আবার ওদের জন্যও বেশি বেশি ঝাল দিয়ে আলাদা করে রান্না করি।”

গহন অতিমাত্রায় বিস্মিত হয়ে বলল,

“তুমি আমার জন্য আবার আলাদা করে রান্না করো! কিন্তু কেন করতে ‌যাও? ওই রান্নাই তো আমি খেয়ে নিতে পারি।”

“আমিতো জানি তা আপনি পারবেন। এত কথা যখন হজম করতে পারেন আর সামান্য মরিচের ঝাল হজম করতে পারবেন না এটা হয় নাকি। কিন্তু আমার ঠিক হজম হয় না ব্যাপারটা।”

গহন থেমে গেল। চুপচাপ এবারে মনোযোগ দিল খাবারে। কিছুক্ষণ পর নিধি বলে উঠলো,

“তাহলে এই ব্যাপারটা থেকে আপনি কি শিক্ষা পেলেন গহন?”

গহন মাথা তুলে নিধির দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতন বলল,

“কি শিক্ষা পেলাম?”

নিধি ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“এর থেকে আপনি এই শিক্ষা পেলেন যে এই পৃথিবীতে বউ এর থেকে বেশি আপন আর কেউ হয় না।”

নিধি ভেবেছিল ওর এই কথাটা শুনে বোধহয় গহন হাসবে। কিংবা হয়তো মজা পাবে। সেজন্যই বলেছিল যেন গহন একটু হাসে। গহন হাসলো ঠিকই তবে শব্দ করে না। আলতো একটু হাসলো। শুধু যেন নিধির কথায় সম্মতি জানালো।

গহন তখনও মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছিলো। খেতে খেতেই হঠাৎ করে গহনের হাতটা থেমে গেল। নিধি তখনও ওর সামনে বসে আছে। মাথা তুলে একবার তাকালো নিধির দিকে। ধীর গলায় একবার নিধির নাম ধরে ডাকলো।

ডাকটা কানে যেতে নিধি গহনের দিকে ঘুরে বসে বলল,

“হ্যাঁ বলুন।”

তৎক্ষণাত গহন কিছু বলে উঠতে পারল না। হয়তো এখনো দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে ভুগছে যে নিধি কে এই কথাটা বলা ঠিক হবে নাকি হবে না। বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও গহনের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কিছু কি বলবেন?”

নিধি কথাটা বলার পরও গহন আরও কিছুটা সময় নিয়ে কি যেন ভাবলো। আনমনে একটু হেসে বলল,

“এই বাড়িতে সব খাবারে কেন এত বেশি ঝাল দেওয়া হয় জানো? কেন সবাই ঝাল খাবার খেতে বেশি পছন্দ করে জানো?”

নিধির কাছে প্রশ্নটা খুবই অদ্ভুত মনে হলো। সেই সাথে অযৌক্তিকও। একেকজনের একেক রকম পছন্দ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কারো ঝাল বেশি পছন্দ, কারো ঝাল কম পছন্দ। এতে আবার আলাদা করে কোন কারণ থাকতে পারে নাকি!

“না, আমি জানিনা। আপনি বলুন।”

গহন আবারো কিছুটা সময় নিয়ে আলতো হেসে বলল,

“তার কারণ আমি অতিরিক্ত ঝাল খেতে পারি না। ঝাল খাবার খেলে আমার অসুবিধা হয় তাই।”

ভ্যাবাচ্যাকা খেলো নিধি। এ আবার কেমন কারণ। মানে একজনের পছন্দ না জন্য আরেকজনের পছন্দ। একজনের অসুবিধা হয় জন্য অন্যদের সেটা পছন্দ। আসলেই যে নিধি একটা চিড়িয়াখানায় এসে পড়েছে আরো একবার নিশ্চিত হলো। কারো কোনো স্বভাবেরই ঠিক নেই। এরা মানুষ হতেই পারে না। মানুষের কোন গুণই নেই এদের মাঝে।

“আসলেই আপনারা সবাই অদ্ভুত। একজনের পছন্দ নয় জন্য আরেকজনের সেটা পছন্দ হবে এটাই নিয়ম৷ পুরো গুষ্টিই পাগল।”

“তুমি বোধহয় আমার কথাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলে না তাই না?”

“বোঝার মতন কিছু ছিল কি?”

এবারে গহন একটু শব্দ করে হেসে উঠলো। ওকে হাসতে দেখে নিধি যেন নিশ্চিত হয়ে গেল যে সত্যি বোঝার মতন কিছু ছিল। কিন্তু কি ছিল? এক লাইনের কথায় আর কিই বা বুঝবে?

“কি ছিল বোঝার মতন বলুন না? আমি তো বুঝলাম না। আরেকবার বুঝিয়ে বলুন ঠিক বুঝে যাব আমি।”

গহন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে আবারো খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে বলল,

“কিছু না। এমনি বললাম।”

গহন কথাটা বলতেই নিধির রাগ উঠলো। যদি কিছু নাই থেকে থাকে তাহলে এভাবে বলল কেন। পুরো কথাটা শেষ করলেই তো পারতো। খচ্চর একটা।

_________

সকালে ঘুম ভাঙতেই নিধি পাশে গহন কে দেখতে পেল না। উঠে বসে সামনে তাকাতেই দেখলো গহন পূর্ণ মনোযোগের সাথে সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই নিধির মাথাটা গরম হয়ে গেল। গলা উঁচিয়ে বলল,

“রাতে কি ঘুমিয়েছিলেন নাকি এটা কোলে নিয়েই বসে ছিলেন?”

নিধির কন্ঠটা কানে যেতেই গহন ল্যাপটপের ওপর থেকে চোখ তুলে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“একটু আগেই এটা নিয়ে বসেছি। সারারাত ঘুমিয়েই ছিলাম।”

“যাক তাও আপনার সুবুদ্ধি হয়েছে। নাহলে মাঝে মাঝে তো আমার সন্দেহ হয় যে আদৌও আপনি ল্যাপটপে কাজ করেন নাকি অন্যকিছু করেন।”

গহন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“অন্যকিছু করি মানে? কি করি আমি?”

নিধি বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল,

“সে তো আপনিই ভালো জানেন যে আপনি কি করেন।”

কথাটা বলে নিধি ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কি যে আবোলতাবোল বলে মেয়েটা কে জানে।

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো চুল আঁচড়ানোর জন্য। তবে পারলো না সেটা করতে। তার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো।

বিছানার ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠস্বরের সালাম ভেসে এলো। সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কে বলছেন?”

ফোনের অপর পাশে থাকা ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন,

“আমি নিয়াজের ক্লাস টিচার কথা বলছি। আপনি নিয়াজের গার্ডিয়ান কথা বলছেন তো?”

“হ্যাঁ ম্যাম আমি ওর বোন কথা বলছি। আপনি হঠাৎ কিছু হয়েছে কি? আমার ভাই ঠিক আছে তো?”

চিন্তিত গলায় নিধি প্রশ্নটা করলো। হাসফাস করছে উত্তরটা শোনার জন্য। ভদ্রমহিলা বললেন,

“আসলে এই প্রশ্নটা আমি আপনাকে করতে চাইছিলাম। গত এক সপ্তাহ ধরে নিয়াজ স্কুলে আসছেনা। আমি ওর বাবার নাম্বারে কল করেছি কিন্তু উনি ফোনটা রিসিভ করেননি। কোন যোগাযোগই করতে পারছি না নিয়াজ কিংবা ওর গার্ডিয়ানের সাথে। আপনার নাম্বারটা আমি ওর এক ফ্রেন্ডের থেকে পেয়েছি।”

নিধির কপালে চিন্তার সুক্ষ্ম রেখা তৈরি হলো। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“আসলে ম্যাম আমি তো আমার শ্বশুড়বাড়ি তে থাকি। ওর সাথে যোগাযোগ হয়নি। ও যে স্কুলে যাচ্ছে না আমি তো জানিইনা কিছু।”

“ওহ্ আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি তাহলে ওর সাথে যোগাযোগ করে আমায় একবার ওর খবরটা জানাবেন। আরেকটা কথা, নেক্সট উইক থেকে তো নিয়াজের এক্সাম শুরু হবে। ওর গত চার মাসের বেতন এখনো দেওয়া হয়নি। স্কুল থেকে নোটিশ দিয়েছে বেতন ক্লিয়ার না থাকলে এক্সাম দিতে দেওয়া হবে না। এটাও আপনাকে জানানোর ছিল।”

নিধির মুখটা শুকিয়ে গেল। ভুলেই গিয়েছিল ওর ভাইয়ের স্কুলের বেতন দেওয়ার কথা। ওর বিয়ের খরচের জন্য তো এদিকের কথা নিশ্চয় বাবা-মা ভুলেই গেছে। বেতনের অর্ধেকটাও তো নিধি দিত টিউশন পড়িয়ে। এখন তো সেটাও বন্ধ। তার মানে নিশ্চয়ই টাকাটা যোগাড় হয়নি।

নিধির থেকে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর না পেয়ে ভদ্রমহিলা ফের বলে উঠলেন,

“হ্যালো! শুনতে পেয়েছেন আমার কথা?”

নিধির ধ্যান ভাঙ্গলো। আমতা আমতা করে বলল,

“শুনতে পেয়েছি।”

“যত দ্রুত সম্ভব ওর বেতনটা দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। নাহলে এক্সাম দিতে দেওয়া হবে না। আর মনে রাখবেন নেক্সট উইক থেকে ওদের এক্সাম শুরু। দু-তিন দিনের মধ্যে দিয়ে দিলে ভালো হয়।”

“আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম আমি ব্যবস্থা করছি।”

কথাটা বলে নিধি ফোনটা কেটে দিল। নিধির শুকনো চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে গহন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

বিজ্ঞাপন

“কি হয়েছে? কে কল করেছিল?”

“ভাইয়ের স্কুল থেকে কল করেছিল। সামনের সপ্তাহ থেকে পরীক্ষা। অথচ চার মাসের বেতন বাকি আছে। ও নাকি স্কুলেও যাচ্ছে না। কে জানে কি হলো।”

নিধি আবারো ফোনটা হাতে নিল। নিজের মায়ের কাছে কল করবে। এদিকে ফোনটা কাজ করছে না। বহু পুরনো ফোন। কতবার যে নষ্ট হয়ে গেছে তার ঠিক নেই। নষ্ট ফোনটাই নিধি পেয়েছিল যেন কোনোমতে শুধু কোথাও গেলে সেই সংবাদটা জানাতে পারে।

একেই তাড়াহুড়ো তার মাঝে আবার ফোনের এই অবস্থা। নিধি ফোনটা উল্টো করে ধরে পিছন পাশে হাতের সাহায্যে জোরে জোরে কয়েকটা চড় লাগালো।

গহন হতভম্ব দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে বলল,

“এমন করছ কেন? নষ্ট হয়ে যাবে তো।”

“ধুর কিছু হবে না। দিনে দু'চারটে চড় থাপ্পড় না খেলে ওর জ্ঞান ফেরে না।”

“তোমার এই ফোনটি নষ্ট?”

“অর্ধেক জীবিত অর্ধেক মৃ'ত। আর কি বলবো বলুন?”

এদিকে অনেকক্ষণ চড় থাপ্পর দেওয়ার পরেও নিধির ফোনটা আজ কোন মতেই আর নিজের প্রাণ ফিরে পেল না। শেষে রেগে গিয়ে বিছানার উপর ছুঁড়েই মারল। যেই না গালাগালি করতে যাবে অমনি গহন ওকে থামিয়ে দিয়ে ইশারায় বিছানার ওপর থাকা নিজের ফোনটা দেখিয়ে বলল,

“আর গালাগালি করতে হবে না। যা করার আমার ফোন দিয়ে করো।”

নিধি বেশ খুশি হলো গহনের কথা শুনে।

পাসওয়ার্ডটা শুনে ফোনের লকটা খুলতেই নিধি দেখলো ওয়ালপেপার ওদের দুজনের একটা ছবি রাখা। বিয়ের ছবি। কে কখন কোন দিক থেকে তুলেছে নিধি জানে না। গহনের মুখ ভঙ্গি বেশ স্বাভাবিক। তবে নিধির অভিব্যক্তি থমথমে। যেন কোন ঝড় বয়ে গেছে ওর উপর দিয়ে।

তবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে গহনের ফোনের ওয়ালপেপারে ওদের দুজনের বিয়ের ছবি। মানে মানুষটা আসলে রোম্যান্টিক কিন্তু বোঝাতে চায় না।

নিধি ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সামলে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরে বাহ! বউকে এত ভালোবাসেন যে ওয়ালপেপারে রেখে দিয়েছেন! আচ্ছা অফিসে যাওয়ার পর যখন আমার কথা মনে পড়ে তখন আপনি আমাদের এই ছবিটা দেখেন তাই না?”

গহন অস্বস্তির মাঝে পড়লো। সেই সাথে লজ্জাও পেল। কোনো উত্তরই দিলো না।

নিধি আরো কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। টুকটাক কিসব যেন ভাবনা চিন্তা করা শেষে নিজের মায়ের নাম্বারে কল লাগালো।

নীলার মোবাইলে জামাইয়ের নাম্বারটা সেভ করাই ছিল। হঠাৎ জামাইয়ের নাম্বার থেকে কল আসতে দেখে তিনি ঘাবড়ালেন। হৃদস্পন্দনের গতি তার বেড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করে যেই না কিছু একটা বলতে যাবেন অমনি ভেসে এলো নিধির কণ্ঠস্বর। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“কেমন আছিস মা? ভালো আছিস তো?”

নিজের মা-বাবার প্রতি তো অভিমানের পাহাড় জমে আছে নিধির মনের মাঝে। এত সহজে সেই অভিমান কমবে না। আদৌ কোনদিন কমবে কিনা সেটাও জানে না নিধি। তবে আজকাল নিজের মা-বাবার মুখ থেকে যদি এই প্রশ্নটা শোনে যে কেমন আছে তাহলে কেন যেন হাসি পায়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তো ওদের জানার কথা যে জোর করে বিয়েটা দেওয়ার পর নিধি কেমন থাকতে পারে। তার থেকেও বড় কথা ওরা তো এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই নিধির বিয়েটা দিয়েছিল যে ও এই বাড়িতে ভালো থাকবে। তাহলে আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে আলাদা করে।

“আমি এই বাড়িতে ভালো থাকবো জেনেই তো বিয়ে দিয়েছিলে। তাহলে আবার আলাদা করে জিজ্ঞেস করার কি আছে মা?”

“এভাবে কথা বলছিস কেন মা? হ্যাঁ আমরা ভরসা করে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তুই আদৌ ওই পরিবেশটার সাথে মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারছিস কিনা, মানুষগুলো ভালো কিনা….....।”

নীলাকে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই নিধি বলে উঠলো,

“এখন এসব কথা ভেবে আর কি হবে মা? যদি আমি বলি ভালো নেই, এই পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারছি না তবে কি তুমি আমায় কোন সমাধান দিতে পারবে? সেইতো বাদবাকি আরো পাঁচজন মায়ের মতন সেই একই জ্ঞানের কথা শোনাবে আমায়, যে মানিয়ে নিয়ে সংসার করতে হয়। এতগুলো দিনেও একবারও মেয়ের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করোনি। আজ আমি কল দিলাম জন্য তোমার মনে হয়েছে যে আমি কেমন আছি সেটা জানা দরকার। যাইহোক, নিয়াজ স্কুলে যায় না কেন? সামনের সপ্তাহ থেকে ওর পরীক্ষা জানো?”

“হ্যাঁ জানি। এমনিই স্কুলে যায় না।”

“সত্যিই এমনি স্কুলে যায় না?”

নীলা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললেন,

“হ্যাঁ সত্যি।”

“চার মাসের বেতন বাকি আছে ওর। বেতন না দিলে পরীক্ষা দিতে দেবে না। কোন ব্যবস্থা করেছো?”

নীলা এবারেও জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললেন,

“তুই চিন্তা করিস না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোর এখন বিয়ে হয়ে গেছে। তুই নিজের সংসার নিয়ে ভাব। আমাদেরটা আমরা দেখে নেব।”

“আমি জানি মা আমাকে তোমরা পর বানিয়ে দিয়েছো। কিন্তু কথায় কথায় এটা আমায় মনে করিয়ে দিতে হবে না। ওর ক্লাস টিচার আমায় কল করেছিলো। যাইহোক শোনো, এর আগের মাসে রিয়াকে অর্ধেক মাস পড়িয়েছিলাম। তার বেতন দেয়নি। ওর মায়ের থেকে গিয়ে তিনশো টাকা চেয়ে নাও। আমার পেন্সিল ব্যাগের ভেতরে দেখো খুচরো কিছু টাকা আছে। দুইশোর মতন হয়ে যাবে। আর আমি দেখছি কি করা যায়। আকিবের থেকেও একটু চেয়ো। ও দিয়ে দেবে।”

“আচ্ছা সে আমরা ব্যবস্থা করে নেব। তোকে এত চিন্তা করতে হবে না। জামাই কেমন আছে সেটা বল?”

“তোমার জামাই যেহেতু আমার মতন বউ পেয়েছে তাহলে ভালোই থাকবে। এইতো দিব্যি বসে আছে আমার সামনে। সুস্থ আছে, ভালো আছে। এখন রাখছি পরে কথা হবে।”

কলটা কেটে দিয়ে নিধি ফোনটা বিছানার ওপর রেখে গহন কে বলল,

“এতক্ষণ কথা বললাম তাও কলটা কেটে গেল না। অনেক টাকা রিচার্জ করেন আপনি?”

গহব চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,

“তোমায় যে আমি দেনমোহরের টাকা দিয়েছিলাম। কি করেছো সেই টাকা? ”

নিধি চোখ মুখের আকৃতি বিকৃত করে বিস্মিত গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেনমোহরের টাকা! কোথায় দিলেন, কবে দিলেন, কাকে দিলেন? আমি তো কিছু জানি না।”

গহন ইশারায় আলমারি দেখিয়ে বলল,

“আলমারির ভিতরেই তো রাখা আছে। মনে নেই বিয়ের পরেরদিন দিয়েছিলাম।”

নিধি চমকে উঠে বলল,

“কিইই? আলমারিতে টাকা আছে? আপনি আমাকে দিয়েছিলেন? কই আমার তো মনে নেই। ধুর! ভুলভাল বকছেন। আমাকে কোন টাকা দেননি আপনি। হ্যাঁ আমার মনে পড়ছে দেনমোহর দেওয়ার কথা ছিল আমায়। কিন্তু আপনি দিয়েছিলেন কি? সত্যি দিয়েছিলেন?”

“ভুলে গেছো তুমি। ওটা তো তোমারই টাকা। যা ইচ্ছে করতে পারো। সেজন্যই মনে করিয়ে দিলাম। আমারও মনে হয়েছিল তুমি বোধহয় ভুলে গেছো।”

নিধি খুব মনে করার চেষ্টা করলো যে গহন কখন ওকে টাকা দিয়েছিল। কিন্তু মনে পড়লো না। গহন টাকাটা দিয়েছিল সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু কত টাকা আছে ওখানে সেটা বড় কথা। নিশ্চয়ই ভালোই টাকা আছে। নিয়াজের স্কুলের বেতন দিয়ে দেওয়া যাবে অনায়াসে।

নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠলো বিছানা থেকে। আলমারির দিকে যেতে যেতে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কত টাকা দিয়েছেন?”

“সাত লাখ।”

সবেমাত্র আলমারির কাছে পৌঁছে আলমারিটা খুলতে ধরেছিল নিধি। অমনি ভেসে এলো কানে সাত লাখ শব্দটা। মুহূর্তের মাঝে জমে গেল নিধি। হাত-পা যেন অবশ হয়ে এলো। মাথাটা ভনভন করে ঘুরে উঠল। হয়তো সাত হাজার কিংবা সত্তর হাজার আছে। কিন্তু সাত লাখ হতে পারে না।

অনেক কষ্টে নিধি নিজের শরীরটাকে সচল করে ঘাড় ঘুরিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“মজা করছেন তাই না? সাত লাখ টাকা কি করে থাকবে। এত টাকা কেউ দেয় নাকি!”

গহন বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“এর থেকেও বেশি দেয়। মজা করবো কেন? তুমি জানো না তোমার দেনমোহর কত?”

বাদবাকি প্রশ্ন আপাতত পাশে থাক। নিধি এবারে ছুটে গহনের কাছে এসে ওর পাশে বসে গুরুতরে ভঙ্গিতে বলল,

“দেখুন মজা করবেন না। সত্যি করে বলুন কত টাকা দিয়েছেন? সাত হাজার তাই না? খুব বেশি হলে সত্তর হাজার হতে পারে। সাত লাখ কিন্তু অনেক বেশি টাকা। কখনো একসঙ্গে দেখেছেন এত টাকা? মানলাম দেনমোহর দিয়েছেন তাই বলে সাত লাখ টাকা কেন দিতে যাবেন?”

গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“সাত লাখই দিয়েছি। গুনে নিতে পারো।”

নিধি একহাত মাথায় ঠেকিয়ে বলল,

“আরে পাগল আপনি! এতগুলো নগদ টাকা আলমারির ভিতরে পড়ে আছে। কোন মানে হয় এসবের। যদি বাড়িতে চোর ডাকাত চলে আসতো। আরে আমি তো আলমারিটা ঠিক করে লকও করি না। চাবি এখানে সেখানে পড়ে থাকে। বাড়িতে কত মানুষজন আসে। চুরি হয়ে গেলে আমি তো জানতেও পারতাম না।”

কথাটা বলে নিধি ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে আলমারির চাবিটা নিয়ে গিয়ে আগে আলমারিটা লক করলো। দেখলোও না ভিতরে টাকাটা আদৌ আছে কিনা। গহন যখন বলেছে নিশ্চয়ই আছে। নিধির এমন কর্মকাণ্ড দেখে গহন শুধু হাসলো। মেয়েটা আসলেই পাগল। আলমারিটা লক করতে করতে নিধি গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানেন তো এখন বুঝলাম কেন আমার চাচারা আপনার সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। তবে একটা বিষয় বুঝলাম না। টাকাটা তো আমি পেলাম। তাহলে ওদের কি লাভ? ওরা কেন পাগল হয়ে গিয়েছিল আপনার সাথে আমার বিয়েটা দেওয়ার জন্য? ওদেরকেও দেনমোহর দিয়েছেন নাকি?”

এবারে আর কোনমতেই নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না গহন। শব্দ করে একটু হেসে উঠলো। ওর হাসির শব্দটা পেতেই নিধি ওর দিকে চমকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি হাসলেন? আপনি এবার হাসতেও পারেন! হায় আল্লাহ এই এক জীবনে আমায় আর কত কিছু দেখতে হবে!”

নিধির কথাতেও জন্য গহনের হাসি থামল না। বরং আরেকটু বাড়লো। তবে খুব তাড়াতাড়ি গহন নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

“তোমার চাচি এসেছিল আমার মায়ের কাছে বলতে যেন দেনমোহরের টাকাটা বিয়ের আগেই পরিশোধ করে ওনাদের হাতে দেই। কিন্তু আমি দেইনি।”

গহন কথাটা বলতেই নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠে ওকে বাহবা দিয়ে বলল,

“দারুন একটা কাজ করেছেন। আরে ওদেরকে দিলে একটা টাকাও পেতাম না। সব খেয়ে নিত। সবগুলো বাটপার। আচ্ছা এখন আমার আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দিন। এত টাকা যখন দেনমোর হিসেবে দিলেন তাহলে আমার মতন একটা সাধারন মেয়েকে বিয়ে করলেন কেন? অনেক ভালো বউ পেতেন। বড়লোক বাড়ির মেয়েকে বউ হিসেবে পেতেন। আমি সত্যি বুঝতে পারছি না আমার পিছনে এত টাকা কেন ইনভেস্ট করলেন? পুরাই লস।”

এবারে গহনের মুখ থেকে হাসিটা সত্যি সত্যি উড়ে গেল।

“তুমি কি কোন ব্যবসা যে আমি লাভ-লোকসানের আশায় ইনভেস্ট করব? এমন ভাবে বলছো যেন আমি তোমাকে কিনে এনেছি টাকা দিয়ে। এই টাকাটা তোমার হক।”

নিধি মলিন হেসে বলল,

“দেনমোহরের টাকা মেয়েদের হক ঠিকই। তবে দুই বাড়ির মাঝে এই দেনমোহরের টাকা নিয়ে এমন ভাবে দরকষাকষি হয় যে মনে হয় ওই টাকার বিনিময়ে বাপের বাড়ির লোকজন মেয়েটাকে বিক্রি করে দিল। আর টাকার বিনিময়ে ছেলের বাড়ির লোকজন মেয়েটাকে কিনে নিল। আপনার কি মনে হয় আমার বাড়ির লোকজন এমনি এমনি আপনার সাথে আমার বিয়েটা দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল? অবশ্যই আপনি বড় লোক জন্য। কি খোঁজ নিয়েছে আপনার ব্যাপারে বলুন তো আমায়? আপনার কাজের জায়গায় একবার গিয়ে খোঁজ নিয়েছে? আপনার আশেপাশের প্রতিবেশীদের থেকে খোঁজ নিয়েছে? একবার আপনাকে জিজ্ঞেস করেছে যে আপনার কোন বাজে অভ্যাস আছে কিনা? কিচ্ছু জিজ্ঞেস করেনি। আপনার সবকিছু আপনার টাকার নিচে চাপা পড়ে গেছে।”

থেমে গেল গহন নিধির কথাগুলো শুনে। নিধি ভুল বলেনি। সত্যি ওর বাড়ির লোকজন গহনের সম্বন্ধে কোন খোঁজ খবরই নেয়নি। বিয়ের আগে শুধু নিধির বাবা একবার আলাদা করে গহনের সাথে কথা বলেছিল। শুধু অনুরোধ করেছিলেন যেন ওনার মেয়েকে পড়তে দেয়। সেটাও দাবি ছিল না। বিয়ে দেওয়ার জন্য কোন শর্তও ছিল না। ছিল শুধু অনুরোধ। এর বেশি আর কিচ্ছু না। যদি গহন নাও করে দিত তবুও উনি কিছুই বলতেন না। বিয়েটাও ভাঙতো না। সত্যি টাকার কাছে সবকিছুই চাপা পড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প