গহনের হাত ধরে টেনে নিধি ওকে নিয়ে ঘরে এলো। ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল নিধি। নিধির মনে হয়েছিল রাগটা বোধহয় একটু কমেছে। তবে সত্যি বলতে রাগ একটুও কমেনি। বরং আরো বাড়ছে। যতবারই ওদের বলা কথাগুলো মনে পড়ছে ততবারই মনে পড়ে যাচ্ছে গহনের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ওদের অপমান সহ্য করা। আর ততবারই যেন মাথায় আ’গুন ধরে যাচ্ছে।
অস্থির হয়ে ক্রমাগত ঘরের মাঝে পায়চারি করছে নিধি। গহন গিয়ে চুপচাপ বিছানায় বসলো। চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কি ভয়ংকর মাত্রায় চিন্তায় পড়েছে। হয়তো ভাবছে আগামীকাল সকালে নিধি যখন ঘর থেকে বের হবে তখন পরিস্থিতিটা কি হবে। কিংবা গহনের অনুপস্থিতিতে নিধির ওপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যাবে।
গহনের এসব ভাবনার মাঝে নিধির কন্ঠস্বর ভেসে এলো। গহন কে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছে না। নিজেই পায়চারি করছে আর একা একা বকবক করছে।
“ওরা কি মানুষ? আরে ভাই এত কথা কেউ বলতে পারে? এভাবে ঝগড়া কেউ করতে পারে? এমন কেন এরা? লজ্জা শরম কিছু নেই।”
একটু বিরতি নিয়ে নিধি আবারো বলা শুরু করলো,
“আর উনি কেমন মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। একটা কথা বললেন না। কিন্তু কেন বললেন না? ওনার অনেক কথা বলা উচিত ছিল। বিপরীত পাশে যদি বউ দাঁড়িয়ে থাকতো তাহলে নিশ্চয় অনেক কথা শোনাতো। গা'ধা কোথাকার।”
অবশেষে চুপ থাকতে না পেরে গহন এবারে নিধিকে বলে উঠলো,
“যথেষ্ট বলেছো বাইরে। এবার থামো।”
গহনের কন্ঠটা কানে যেতেই নিধির রাগটা যেন আরো দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেল। গহনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“ওদেরকে থামতে বলেছিলেন যে আমাকে থামতে বলছেন। যাদের কে থামানো উচিত ছিল তাদেরকে তো থামালেন না। আমাকে কেন থামাচ্ছেন? এটা আদৌ আপনার নিজের বাড়ি নাকি রাস্তা থেকে তুলে এনেছিল আপনাকে? যখন আপনার খালারা আপনাকে ওভাবে কথা শোনাচ্ছিল তখন আপনার মা কোথায় ছিল? সারাদিন তো মায়ের পায়ের নিচে গিয়ে পড়ে থাকেন। উড়ে গেল আপনার মায়ের ভালোবাসা? একটা পাগলও তো বুঝে যাবে যে এই বাড়িতে আপনার জায়গা কি, সবার মনে আপনার জায়গা কি। আর সেখানে আপনি তো সুস্থ একটা মানুষ। আপনি বোঝেন না?”
নিধি রাগে কাঁপছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। ভেতরটা তুমুল অস্থির হয়ে আছে। নিধির বারবার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে এই বাড়িতে গহনের নিজের কেউ নেই। অথচ এই ছেলেটা সবাইকে নিজের ভেবে বসে আছে। নিধি তো নিজের বাড়িতেও এতটা করুণ পরিস্থিতিতে ছিল না যতটা গহন এই বাড়িতে থাকে। নিধিকে তো আর কেউ কথা শোনাতে পারতো না অন্তত। আচ্ছা মতো কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিত। অথচ এই ছেলেটা ঠিকভাবে ঝগড়াও করতে পারে না।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই আবারও ওর কানে ভেসে চলে গহনের শান্ত কণ্ঠস্বর।
“রাগ কমাও। শান্ত হও। যাও গিয়ে মাথায় পানি দিয়ে এসো।”
“আমার কিন্তু রাগ বাড়ছে আপনার এই কথাগুলো শুনে। একটুতো বুঝুন যে ওরা আপনাকে অপমান করছিল, তাও অযথা। আমার খারাপ লেগেছে। ওরা কেন আপনাকে অপমান করবে? আমার একদম ভালো লাগেনি এই ব্যাপারটা। কি বাজে বাজে কথা শোনাচ্ছিলো আপনাকে।”
কথাগুলো বলতে বলতে নিধির কন্ঠটা ধরে এলো। কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল মেয়েটা। ওর নিজেরই খারাপ লাগছে গহনের জন্য অথচ এই ছেলেটা কি স্বাভাবিক।
এদিকে নিধির কাঁদো কাঁদো মুখটা দেখে গহন ভ্যাবাচ্যাকা খেল। গহনকে অপমান করেছে তাহলে নিধি কাঁদছে কেন? গহনের কথা চিন্তা করে কেউ কাঁদছে ভাবা যায়! গহনের কথাও তাহলে কেউ চিন্তা করছে আজকাল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই গহন উঠে এগিয়ে গেল নিধির দিকে। গহন কে এগিয়ে আসতে দেখে নিধির মনে হলো ছেলেটা নিশ্চয়ই আবার বলবে শান্ত হতে। বলবে যেন আর কখনো ওদের মুখে মুখে কথা না বলে। সেজন্য নিধি আগেই সাবধান করে দিয়ে বলল,
“একদম কোন জ্ঞান দিতে আসবেন না আমাকে। যদি আপনাকে আবার ওরা কথা শোনায় আমিও আবার ওদেরকে কথা শোনাবো। আর যদি চান আমি চুপ থাকি তাহলে আপনি মুখ খুলবেন। আরো অনেক কিছু বলা উচিত ছিল আমার ওদের কে। এখন আমার আপনার ওপর রাগ ঝাড়তে ইচ্ছে করছে।”
গহন নিধির কাছাকাছি এসে ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
“শান্ত হও। আগে রাগটা কমাও তারপরে আমরা কথা বলবো। আমি শুনবো তোমার কথা। যা যা বলতে চাও সব শুনবো। দরকার হলে সারারাত জেগে শুনবো। কিন্তু আগে রাগটা কমাও। রাগের মাথায় আমরা সবসময় ভুল-ভাল কথাই বলি যার কারণে পরে আফসোস হয়।”
গহনের নির্লিপ্ততা কেন যেন নিধির ভালোই লাগছে না। এত শান্ত কেন হবে মানুষটা। একটু তো রেগে যাওয়া উচিত ছিল। এমনটাও তো নয় যে শুধু নিধির সাথে রাগারাগি করে, আর বাকিদের বেলায় চুপ থাকে। তাহলে নাহয় নিধি নিজেকে এটা বলে সান্ত্বনা দিতে পারত যে বাকি পুরুষদের মতন পারেই শুধু বউয়ের সাথে ঝগড়া করতে। কিন্তু এই মানুষটা তো নিধির সাথেও রাগারাগি করে না। সব সময় শান্ত থাকে। কেন সবসময় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে? মাঝে মাঝে তো উচিত জবাব দিতে হয় তাই না?
অন্যান্য সময় হলে নিধি হয়ত গহনের সাথে রাগারাগি করতো। তবে এখন গহনের জন্য খারাপ লাগছে। নিধি অসহায় গলায় বলল,
“কেন চুপ করে ছিলেন? এর আগেও ওরা আপনাকে এভাবে অনেক কথা শুনিয়েছে নিশ্চয়ই তাই না? আর আপনি চুপচাপ শুনে গেছেন? কেউ কখনো প্রতিবাদ করেনি আপনার হয়ে?”
গহন আলতো হেসে বলল,
“তুমি তো ছিলে না এর আগে। তাহলে কে কথা বলতো আমার হয়ে? আমার খালাদের সঙ্গে ঝগড়া করার সাহস কারো হয় না। তোমার মতন সাহসী তো আর কেউ কখনো ছিল না আমার জীবনে।”
“সত্যি করে বলুন তো ওরা আপনার সাথে এমন কেন করে? ওদের ব্যবহারে সবসময় মনে হয় যেন আপনি পর, আলাদা। আমি আজ একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। দেখুন সালমা, সাবিত, সিনথিয়া, শম্পা। আর আপনি হলেন গহন। নামের মাঝেই তো কত পার্থক্য। এভাবে কেউ নাম রাখে।”
“আমার নাম আমার বাবার সাথে মিলিয়ে রাখা। আমার বাবা রেখেছিলেন আমার নাম। সেজন্য ওদের সাথে মেলে না।”
“আপনি কিছু লুকোচ্ছেন না তো আমার থেকে? আমার আপনাকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার আপনার সঙ্গ না, আপনার আমার সঙ্গ প্রয়োজন। এই বাড়িতে আপনি নির্বাসিত। আমি তো খেয়াল করি সারাদিনই ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকেন। আপনার খাওয়া দাওয়া নিয়ে কারোর চিন্তা নেই। আপনি কখন বাড়ি ফিরলেন, কখন বেরিয়ে গেলেন সেই নিয়েও কারো কোন চিন্তা নেই। কেন এত অবহেলা আপনার প্রতি? আপনার মায়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমি দ্বিধায় ভুগছি। উনি আপনাকে ভালোবাসেন ঠিক আছে। কিন্তু সব সময় ভালোবাসাটা আমার চোখে পড়ে না।”
গহন এবারও আলতো হেসে বলল,
“মা আমাকে ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে আমি জানি। সবসময় নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করা তো জরুরী না, তাই না?”
“দরকারের সময় প্রকাশ করা জরুরী। আপনি এটা অস্বীকার করতে পারবেন না যে আপনার সাথে অন্যায় উনিই বেশি করে। ভালোবাসেন মানলাম। আমি জানি মা বাবা যেমনই হোক তাও তাদেরকে সম্মান করা উচিত। কিন্তু তাই বলে ওনার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন না? কেন ওনার ব্যাপারে আপনি অন্ধ হয়ে থাকেন?”
গহন তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ভাবনার জগতে নিমগ্ন থেকে আনমনে বলে উঠলো,
“অন্ধ হয়ে থাকি না। আমি শুধু চাই আমার জন্য মা আর কোনো কষ্ট না পাক। মাতৃ স্নেহের ঋণ কেউ কখনো শোধ করতে পারে না নিধি। তুমি সবার সব ঋণ শোধ করতে পারলেও মাতৃস্নেহের ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবে না। এটা এমন এক ঋণ যেটা তুমি জীবন দিয়েও শোধ করতে পারবেনা।”
হাল ছেড়ে দিল নিধি। বুঝলো এই ছেলেকে কিছু বোঝানো সম্ভব না। অন্তত ওর মায়ের ব্যাপারে তো একেবারেই অসম্ভব। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“বুঝেছি। চলুন এখন ঘুমোবো। এই আবর্জনাগুলোর কথা বলতে আর ভালো লাগছে না।”
“তুমি ঘুমোও। আমার একটু কাজ আছে।”
গহন কথাটা বলতেই নিধি ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“মাথা কিন্তু এমনিতে যথেষ্ট গরম আছে আমার। ওই ল্যাপটপকে দেখলে আমার মনে হয় ও আমার সতীন। আজ কিন্তু ওর অবস্থা আমি খারাপ করবো যদি আপনি এখন না ঘুমিয়ে ওটাকে নিয়ে বসেছেন তো। আর আমি আপনাকে রাত এগারোটার পর আর যেন কাজে বসতে না দেখি। তাতে যা হওয়ার হবে। ম’রা’র ইচ্ছা হয়েছে ওনার! শখ কত!”
আরো বিরবির করে কি সব বলতে বলতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো নিধি। গহনের আর সত্যি সাহস হলো না ল্যাপটপ নিয়ে বসার। কেননা বউকে দেখে একটু একটু ভয় হচ্ছে।
আজ মেয়েটা আবার জানালার ধারে শুয়েছে। একটুও নিয়ম নেই মেয়েটার জীবনে। যখন যেটা মন চায় তখন সেটাই করে। গহনেরও আর আজকাল এই নিয়ে কোন কথা তুলতে ইচ্ছে করে না। বাঁধা দিতেও ইচ্ছে করে না। মনে হয় যেভাবে মেয়েটা ভালো থাকে সেভাবেই থাক। লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে গিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লো।
জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো একেবারে নিধির মুখের উপরে পড়ছে। মেয়েটা সত্যি অনেক তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেছে। ঝগড়া করে ক্লান্ত হয়ে গেছে বোধহয়। কি মিষ্টি, নিষ্পাপ লাগছে মেয়েটাকে দেখতে। গহন ঠিক কতটা সময় ঘুমন্ত নিধির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তার হিসাব নেই। আজ আর ঘুমোতেই ইচ্ছে করছে না গহনের। মনে হচ্ছে এভাবেই মেয়েটাকে দেখে যেতে।
গহনের কাছে এখনও ব্যাপারটা আশ্চর্যের লাগছে যে নিধি আজ ওর হয়ে কথা বলেছে। গহনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ঠিক কতদিন পর যে গহন নিজের সামনে এমন একটা শক্ত ঢাল পেল তার হিসেব নেই। একটা শক্তপোক্ত খুঁটির অভাবেই তো গহন এমন শান্ত হয়ে গেছে। অভিযোগ করতে ভুলে গেছে। অভিমান করতে ভুলে গেছে। এত বছর পর আজ এই পুঁচকে মেয়েটা গহনের সেই শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়ালো। অদ্ভুত না!
__________
ঘুমের মধ্যে গহন হঠাৎ করে অনুভব করলো কেউ যেন ওকে ঝাকাচ্ছে। তাও আস্তে ধীরে না, তুমুল ভাবে। মুহূর্তের মাঝে গহনের চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল। চোখ মেলে উঠে বসতেই দেখলো পাশে নিধি বসে আছে। যেন কোন বিষয় নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছে। গহনেরও দুশ্চিন্তা হলো নিধির এই অবস্থা দেখে। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
“সকাল আটটা বাজে।”
“তো?”
“আমি একা ঘর থেকে বের হবো না। আপনিও চলুন।”
“কিন্তু কেন?”
“কাল রাতের কথা মনে পড়ে গেল। কত কিছু বলে দিয়েছি। আমি বলছি না ভুল করেছি। ঠিকই করেছি। বরং কম কথা শুনিয়েছি। কিন্তু এখন বাইরে গেলে সবাই একসঙ্গে ধরবে আমায়। আর আপনিও তো আমার তেমন ভালো স্বামী নন যে আমার হয়ে ঝগড়া করবেন। আমি একা এতজন কে কি করে সামলাবো।”
গহন বিস্মিত দৃষ্টিতে বেশ অনেকটা সময় হা করে তাকিয়ে থাকলো নিধির মুখের দিকে। হঠাৎ করে ঘুম থেকে জাগা পেয়েছে। তার মাঝে নিধির এমন উদ্ভট কথাবার্তা, মাথাটাই যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। সেই সাথে গহন আজ আরো একবার নিশ্চিত হলো এই ব্যাপারে যে মেয়েটার মাথায় অবশ্যই সমস্যা আছে।
বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন গহনের থেকে কোন সাড়াশব্দ পেল না তখন নিধি আবারো বলল,
“কিছু তো বলুন। আমার সঙ্গে বাইরে চলুন। একা একা যেতে পারবো না আমি। রাতে তো শুধু আপনার খালারা ছিল। এখন আপনার মাও থাকবে। আর ওনার যা বুদ্ধি আমিও ওনার সাথে পেরে উঠব না। আবার আমি কিছু বললেও দোষ হয়ে যাবে। আমি জানি আপনাকে দেখলে উনি শান্ত থাকবেন। আপনি চলুন। আমি একা যেতে পারবো না।”
গহন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“পা'গ'ল তুমি! এই একটা সামান্য বিষয়ের জন্য এভাবে কেউ ডাকে? আমি ভেবেছিলাম কি না কি হয়েছে।”
আর কোন কথা হলো না আপাতত ওদের মাঝে। ওয়াশরুম থেকে গহন ফ্রেশ এর বাইরে বেরিয়ে দেখলো ঘরের মাঝে পায়চারি করছে নিধি। চোখ মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে। গহন তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এত অস্থির হওয়ার কি আছে? এখন কোন কথা উঠবে না। পরেও যেন না ওঠে সেই ব্যবস্থা আমি করে রেখে যাবো।”
নিধি মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আরে ধুর। আমি কি আমার কথা ভাবছি নাকি। আমি তো আপনার কথা ভাবছি।”
“আমার কথা কেন ভাবছো? কিই বা ভাবছো?”
নিধি পায়চারি থামিয়ে তাড়াহুড়ো পায়ে গহনের দিকে এগিয়ে এসে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“আপনার বাড়ির লোকেরা আমাকে না ধরলেও আপনাকে আবার অবশ্যই ধরবে। আর আমি আপনার যে অবস্থা দেখলাম গতকাল। আপনার খালাদেরকেই তো কিছু বলতে পারলেন না। আপনার মা ধরলে তো আপনি শেষ। চুপ করে থাকলে হবে না কিন্তু। আচ্ছা ঝগড়া কি করে করতে হয় আপনি জানেন না?”
নিধির শেষের প্রশ্নটা শুনে গহনের একটু হাসি পেল। তবে ঠোঁট টিপে নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক করতো জানালল। ঝগড়া কি করে করতে হয় গহন সে সব জানে না। নিধি বিরক্তিকর গলায় বলে,
“কিচ্ছু জানেন না আপনি। আচ্ছা শুনুন, এখন তো আপনাকে আর শেখানো সম্ভব নয় এই অল্প সময়ের মাঝে। আমি অন্য কোন সময় আপনাকে শিখিয়ে দেব। তবে এখন বাইরে যাওয়ার পর যদি আপনাকে কেউ কোন কথা শোনাতে আসে পাল্টা তাকে কথা শুনিয়ে দেবেন। আমি বললে তো দোষ হয়ে যাবে সেজন্য আমি বলবো না। তাই বলে নিজেকে একা ভাবার দরকার নেই। আমি পেছনে থাকবো। যদি আপনি আটকে যান তাহলে আমি পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে আবার আপনাকে সচল করে দেবো। আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যদি আমি দেখছি আপনি পারছেন না তখন আমি কথা বলবো। ঠিক আছে?”
“প্রয়োজন নেই তোমার কথা বলার। যদি আমাকে কিছু বলে আমি সেসব শুনে নেব। তুমি যেন আবার গতকাল রাতের মতন কিছু বলতে যেও না, ঠিক আছে?”
নিধি মুখের উপরে গহনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কক্ষনো না। আপনি আমার ভালো স্বামী নাই হতে পারেন কিন্তু আমি ভালো বউ। ওরা আপনাকে অযথা কথা শুনিয়ে যাবে আর আমি চুপ করে থাকবো নাকি? এবার কিছু বলতে আসুক তারপরে ওদেরকে নিধি নিজের আসল রূপ দেখাবো। আসলে আপনি কিছু বলেন না জন্য ওদের সাহস বেড়ে গেছে। তার থেকেও বড় কথা আমি ছিলাম না তো সেজন্য কথা শোনাতে পেরেছে এতদিন। এবার সাহস থেকে থাকলে আসুক আপনাকে কথা শোনাতে।”
নিধির বোধহয় আরো কিছু বলার ইচ্ছে ছিল। গহন কে আরো বিভিন্নভাবে সাহস যোগাতো। হয়তো টুকটাক কিছু ঝগড়াও শিখিয়ে দিত। তবে সেসব সুযোগ আর নিধি পেল না। তার আগেই নিধি কে চমকে দিয়ে হঠাৎ করে গহন ওকে জড়িয়ে ধরলো।
মুহূর্তের মাঝে জমে গেল নিধি। নিধির ছোটখাটো শরীরটা গহনের প্রশস্ত বুকের মাঝে চাপা পড়ে গেছে যেন। গহনের থুতনি গিয়ে ঠেকেছে নিধির কাঁধের উপরে। গহন সেভাবে জড়িয়ে ধরেই নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার কথা ভাবতে শিখছো তুমি নিধি! আমায় নিয়ে চিন্তা হচ্ছে তোমার আজকাল! জানো এই ব্যাপারটি সাধারণ হলেও আমি খুব অবাক হচ্ছি। আমার হয়ে কথা বলবে এমন মানুষ আমি অনেকদিন পর পেলাম নিধি।”
নিধি মৃদু তোতলানো গলায় বলল,
“কেন? আপনার মা তো ছিল।”
গহন এখন আর নিজের মায়ের প্রসঙ্গটা তুলতে চাইলো না। সম্পূর্ণ সে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“কিচ্ছু বলতে হবে না তোমায়। আমি তোমায় সব সময় সবকিছু থেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করছি। তুমি আড়ালেই থাকো। যখনই তুমি সামনে আসতে চেয়েছো তখনই কষ্ট পেয়েছো। তুমি ভাবছো তোমার এই দু চার লাইনের বাক্যে হয়তো আর কেউ তোমার ধারের কাছেও ঘেষবে না। কিন্তু তুমি জানো না তোমার এই বাক্যগুলো কিছু মানুষের মনে তোমার জন্য কতটা ঘৃণা তৈরি করছে। তুমি আমার আড়ালেই থাকো নিধি। সামনে আসার প্রয়োজন নেই।”
কথাটা বলে গহন ছেড়ে দিলো নিধি কে। গহনের দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে নিধি জিজ্ঞেস করল,
“আপনি সব বোঝেন তাই না? কে কখন কি করতে পারে আপনি তো বলেছিলেন সবকিছু জানেন। তাহলে কদিন যে আপনার মা মিতা কে নিয়ে মিথ্যে কথা বলে আমাকে এত কাজ করালো তখন কিছু বললেন না কেন?”
গহন নিধির দু হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে বলল,
“বিশ্বাস করো আমি এটা জানতাম না যে মিতা কে আসতে বারণ করা হয়েছে। কিংবা ও সকালে এসে চলে যেত। তুমি আমাকে বলেছিলে ছুটিতে আছে। আমি সেটাই বিশ্বাস করেছিলাম। আমি বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। কেননা এমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে এটা বোঝাতে চেয়েছিলাম যে এই কাজটা তোমার সাথে কেন করা হলো সেটা আমি জানি।”
নিধি কৌতুহলী গলায় বলল,
“কেন?”
গহন আলতো হেসে নিধির মাথায় হাত রেখে বলল,
“সে সব তোমায় জানতে হবে না। তোমার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে তো। এই যথেষ্ট। বাইরে চলো।”
কথাটা বলে গহন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। নিধি এই মানুষটার উপরে বিরক্ত হবে নাকি ভালোবাসবে বুঝে উঠতে পারছে না। কখনো মনে হয় মানুষটা ভালো। কখনো আবার মনে হয় খারাপ। সংসারের এই জটিল সমীকরণ আর মেলাতে পারছে না নিধি।