বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১৮

🟢

বাড়িতে আজ অনেক অতিথি আসবে। সবাই আসবে গহনের বউকে দেখতে। আবার তাদের জন্য রান্নাবান্নাও নতুন বউকেই করতে হবে। সালমা বেগম নিধি কে বলে দিয়েছে দুপুরের মাঝে যেন রান্না শেষ করে গোসল করে একটু সাজগোজ করে। প্রথমবার দেখবেন ওনারা নিধি কে। ওনাদের সামনে একটু পরিপাটি হয়ে না গেলে চলে নাকি! নিধি চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছে।

এত মানুষের কাজ নিধি কে আজ একা করতে হচ্ছে না। মিতা এসেছে ওকে সাহায্যের জন্য। আর অবাক করার বিষয় হলো আজ মিতা নিজ উদ্যোগেই সব কাজ করছে। কঠিন কাজগুলোও নিজেই করছে। এমন কি আজ ঋতুও এগিয়ে এসেছে নিধি কে সাহায্য করার জন্য। কে জানে আজ হঠাৎ করে আবার সবার কি হয়ে গেল। না হলে তো এই কয়দিন ঋতু আর মিতা দুজনের কারোরই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। আজ আবার দুজনে একসঙ্গে এসে হাজির হয়েছে।

নিধি তখন মাংস রান্না করছে। ওকে যাবতীয় সব সাহায্য করা শেষে মিতা গেছে ঘর মুছতে। রান্নাঘরে তখন কেবল ঋতু আর নিধি রয়েছে। নিধি রান্না করছে আর ঋতু পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিধি আগবাড়িয়ে কোন কথা তোলেনি। কেননা জানেনা ঋতুর স্বভাব কেমন। হয়ত ঋতুর নিধির কথা পছন্দ হবে না।

তবে কিছুটা সময় চুপ থাকার পর কথা আগে ঋতুই তুলল।

“জানো তো নিধি তুমি খুব সৌভাগ্যবতী যে ভাইয়ার মতন একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছো। সকালে কি সুন্দর তোমার হয়ে কথা বলল। অন্যদিকে যদি ভাইয়ার জায়গায় আমার স্বামী আর তোমার জায়গায় আমি হতাম তাহলে এই অপরাধের জন্য সবার সামনে আমার গায়ে হাত তুলতো।”

নিধি চমকে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই অবস্থায় গায়ে হাত তুলতো?”

ঋতু মলিন হেসে বলল,

“এটাতো স্বাভাবিক। আমার শরীরের যে অবস্থাই হোক না কেন তাতে ওর কি। ক্ষতি হলে আমার হবে। ওর তো কিছু হবে না।”

“তোমার গায়ে হাত তোলে আর তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো? উল্টো একটা লাগিয়ে দিতে পারো না। আর অকারণে গায়ে হাত তুলবেই বা কোন সাহসে? তুমি তোমার বাড়িতে জানাতে পারো না?”

ঋতু আনমনে কিছু একটা ভেবে বলল,

“ভুল করেছি নিজে। অভিযোগ করার মুখ নেই। তাও জানিয়েছিলাম। মাকে জানিয়েছিলাম, বাবাকে জানিয়েছিলাম। সবাই বলেছে ধৈর্য ধরতে। ছেলেদের মাথা নাকি গরম হলে এরকম একটু হাত তোলে। কিন্তু বউদেরকে সেটা মেনে নিতে হয়। সেজন্য আমিও মানিয়ে নিচ্ছি।”

নিধি এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,

“তুমি আসলেই বোকা। চুপচাপ সবটা মেনে নাও জন্যই তো বারবার মা’রার সাহস পায়।”

ঋতু শুধু একটু হাসলো। সাবিত কে নিয়ে আপাতত আর কোন কথা না তুলল না। ফের গহনকে নিয়ে কথা তুললো।

“তবে যাই বলো না কেন ভাইয়া কিন্তু খুব ভালো। সেদিন রাতে দেখলাম খাওয়া-দাওয়া শেষে তোমার প্লেট ধুঁয়ে রাখলো। তোমার কপাল কিন্তু খুব ভালো।”

নিধি এবারে ভ্রুঁ কুঁচকে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি কি করে জানলে? লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলে?”

ঋতু একটু হেসে উঠে বলল,

“লুকিয়ে দেখব কেন। আমি রান্না ঘরে এসেছিলাম পানি নেওয়ার জন্য। তোমাদের দুজনকে চোখে পড়ে গেল। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তোমাদের দুজনকে। খুব ভালো লাগছিল তোমাদেরকে দেখতে। মনে হলো অনেকদিন পর একটা স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক দেখলাম। নয়ত আমার নিজের সংসারের ঝামেলা দেখতে দেখতে তো ভুলেই গিয়েছিলাম স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক আসলে কেমন হওয়া উচিত।”

ঋতুর কথাটা শুনে নিধি হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“দূরে দাঁড়িয়ে ছিলে তো সেজন্য আমাদের মাঝে কি কথাবার্তা হয়েছে সেসব টের পাওনি। সেসব শুনলে তুমি নিজেই বলতে আমাদের থেকে তোমাদের সম্পর্ক ঢের ভালো আছে। আমাদের মাঝে কোন স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নেই। পুরোটাই অস্বাভাবিক।”

ঋতু যেন আগ্রহ খুঁজে পেল নিধির কথার মাঝে। ইচ্ছে করলো ওদের সম্পর্ক সম্বন্ধে আরও কিছু শুনতে। কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মানে কি বলতে চাইছো? তোমাদের সম্পর্ক ঠিক নেই? কি সমস্যা?”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“সমস্যা যে আসলে কি সেটা তো আমি নিজেও জানিনা। না আমার দিক থেকে আমি ওনার জন্য কোন টান অনুভব করি। না ওনার দিক থেকে আমার প্রতি কোন টান বুঝতে পারি। সম্পর্কটা একেবারেই নিরামিষ। আমরা এক ঘরে থাকছি, এক বিছানায় ঘুমোচ্ছি, পাশাপাশি বসে খাচ্ছি, গল্পগুজবও করছি। সব ঠিক আছে। কিন্তু সম্পর্কটা না ঠিক এগোচ্ছে না। একই জায়গায় আটকে আছে।”

ঋতু এবার আরেকটু এগিয়ে এলো নিধির দিলে। বেশ গুরুতর ভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ভাইয়া এখনো তোমার কাছে আসেনি? মানে তোমাদের দুজনের মাঝে সম্পর্কটা ওই পর্যায়ে যায়নি?”

নিধি লজ্জা পেয়ে গেল ঋতুর প্রশ্নে। এমন প্রশ্ন আবার কেউ কাউকে করে নাকি। এগুলো শোনার মতন কোন কথা। আরে বাবা স্বামী স্ত্রীর মধ্যেকার এটা সব থেকে গোপনীয় ব্যাপার। সেটাও কেউ প্রশ্ন করে শুনতে চায়!

এদিকে নিধি কে চুপ করে থাকতে দেখে ঋতু ফের বলে উঠলো,

“কি হলো বলো? কাছে আসেনি ভাইয়া তোমার?”

“এসব কথা বাদ দাও ভাবি। অন্য কথা বলো।”

ঋতু এবারে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

“যেটা জিজ্ঞেস করলাম সেটার উত্তর দাও। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। যদি সম্পর্কটা তোমাদের এগিয়ে না থাকে, যদি ভাইয়ার দিক থেকে কোন চেষ্টা না থাকে তাহলে হয়তো আমি এর কারণটা বলতে পারি যে কেন তোমাদের সম্পর্কটা একই জায়গায় আটকে আছে।”

নিধি কপাল কুঁচকে তাকালো ঋতুর দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি কারণ?”

“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তুমি।”

নিধি বুঝলো এই মেয়ে নাছোড়বান্দা। না শুনে ছাড়বেই না। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“না। আমার অস্বস্তির কথা ভেবেই উনি আসেননি আমার কাছে। কাজটা ভালোই করেছেন।”

ঋতু আফসোসের সুরে বলল,

“তুমি মেয়েটা আসলেও বোকা। বয়স তো যথেষ্ট হয়েছে। এতোটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন একটা পুরুষ মানুষ তার বউয়ের থেকে দূরে থাকতে পারে?”

“কেন?”

আশপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিলো ঋতু। কেননা কেউ যদি এই কথাটা শুনে ফেলে তাহলে সমস্যা হতে পারে। তারপরে আরেকটু নিধির কাছাকাছি গিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,

“তোমায় একটা কথা বলছি নিধি। তুমি কাউকে বলো না যেন। নয়তো আমার সমস্যা হয়ে যাবে।”

নিধি ঋতুকে আশ্বস্ত করে বলল,

“চিন্তা করো না ভাবি। কাউকে বলবো না।”

“জারা আপুকে তো চেনো?”

জারার নামটা শুনতেই নিধির মুখে আপনা আপনি হাসি ফুটে উঠলো।

“হ্যাঁ চিনি তো। ফুপির মেয়ে। খুব ভালো। অনেকদিন হলো কথা হয়না আপুর সাথে। আজ গহন এলে বলবো আপুকে যেন আসতে বলে।”

ঋতু এবারে মৃদু রাগী গলায় বলল,

“নিজের সংসার টা শেষ করার ইচ্ছে হয়েছে? পাগল মেয়ে! যাকে বাড়িতে ডাকতে চাইছো তার জন্যই তো তোমার আর ভাইয়ার সম্পর্কের মাঝে এত সমস্যা। তোমাকে জানায়নি কেউ, আমি জানাচ্ছি। ভাইয়ার জারা আপুর সাথে সম্পর্ক ছিল। ওরা দুজন দুজনকে ভীষণ ভালোবাসতো। কিন্তু ভাইয়া তো মায়ের বাধ্য। মা কষ্ট পাবেন এমন কোন কাজ ভাইয়া করবে না। মায়ের আবার জারা আপু কে পছন্দ না। সেজন্য বিয়ে করেনি জারা আপু কে। তোমায় বিয়ে করেছে বাধ্য হয়ে। কিন্তু এখনো মনটা নিশ্চয়ই জারা আপুর কাছেই রয়ে গেছে। এখনো দুজনের মাঝে সম্পর্কটা খুব ভালো। জারা আপু ভাইয়াকে যাই বলুক না কেন কোন উত্তর দেয় না। কখনো রাগারাগিও করে না। ভালোবাসা এখনো রয়েই গেছে নিধি।”

নিধির রান্নার হাতটা আপনা আপনি থেমে গেল। মুখটা কেমন যেন চুপসে গেল হঠাৎ করে। কি বলল ঋতু এসব। জারা আর গহনের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক! তার মানে সত্যি কি গহন এখনো জারা কে ভালোবাসে, নিধিকে ভালোবাসে না? তারমানে ওরা দুজনে মিলে নিধিকে ঠকাচ্ছিলো। আর এই জন্যই সেই বিয়ের প্রথম দিন থেকে গহন নিধির ওপরে বিরক্ত। আর এই কারণে আজও ওদের মাঝে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়নি।

“কি বলছো এসব ভাবি? হ্যাঁ ওদের মাঝে এখনো ভালো সম্পর্ক আছে। কিন্তু খারাপ কিছু তো আমি দেখিনি। না জারা আপুকে দেখে আমার অমন মনে হয়েছে না গহন কে দেখে আমার অমন মনে হয়েছে।”

“আমার বলা দায়িত্ব ছিল আমি তোমায় বলেছি। এখন বিশ্বাস করবে কি করবে না সেটা তোমার ব্যাপার নিধি। তুমি যদি এখন চোখ থাকতেও অন্ধ সেজে থাকো তাহলে আমার কিছু করার নেই। তুমি আমার ছোট বোনের মতো সেজন্য সাবধান করে দিলাম। দেখো যেন সংসারটা হাত ছাড়া না হয়ে যায়। এমনিতেও তুমি জারা আপুর থেকে সব দিক দিয়ে পিছিয়ে আছো।”

কথাটা বলে ঋতু সেখান থেকে চলে গেল। নিধি থ মেরে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। চুলোর উপরে থাকা মাংস থেকে হালকা একটু পোড়া গন্ধ আসছে। তবে সেদিকে নিধির কোন খেয়াল নেই। কি বলে গেল এসব ঋতু ওকে? সত্যি কি তবে সংসারটা হাতছাড়া হয়ে যাবে?

__________

রান্নাবান্না শেষ করে গোসল করে একটা নতুন শাড়ি পরলো নিধি। এখন হালকা একটু সাজগোজ করতে হবে। যদিও এসবের বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে নেই। কিন্তু তারপরও বাধ্য হয়েই করতেই হবে। শাশুড়ি আদেশ দিয়েছে। ওনার কথা না শুনলে চলবে নাকি! এমনিতেই বাড়িতে নিজের অবস্থানটা ভীষণ নড়বড়ে। আজকে আবার ঋতুর থেকে যা শুনলো তাতে তো মনে হচ্ছে যে কোনদিন সংসার আর স্বামী দুটোই হাতছাড়া হয়ে যাবে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিধি তখন চুল আচড়াচ্ছে আর ঋতুর বলা কথা ভাবছে। এর মাঝে গহন এলো। গহন যে ঘরে এসেছে নিধি খেয়ালই করেনি। এদিকে কয়েক মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরও নিধির মুখ থেকে কোন কথা না বের হওয়ায় গহন নিধির দিকে তাকালো। দেখল মেয়েটাকে কেমন যেন মনমরা দেখাচ্ছে। গহন হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে?”

নিধির ধ্যান ভাঙলো। আয়নার ভিতরে তাকিয়ে দেখলো পিছনে গহন দাঁড়িয়ে আছে। নিধি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু বলল না। গহন বুঝলো না নিধির দীর্ঘশ্বাসের কারণ। ফের ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে কি?”

নিধি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো। তবে গহনের বিশ্বাস হলো না কথাটা। আবারো জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে? কিছু গন্ডগোল করেছো? তাড়াতাড়ি বলো আমায়?”

বিজ্ঞাপন

নিধি এবারে আয়নার ভেতরেই চোখ তুলে গহনের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকার পর ধীর গলায় বলে উঠলো,

“আমায় ছেড়ে দেবেন আপনি?”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল গহন। হঠাৎ করে নিধির এই প্রশ্নের কোন মানে বুঝে উঠতে পারল না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে নিধি ফের বলে উঠলো,

“আমাকে একটুও ভালো লাগে না আপনার? কিন্তু কেন ভালো লাগে না? আমি তো দেখতে খুব একটা খারাপ না। ব্যবহার আমার একটু খারাপ তাই বলে তো খুব বেশি খারাপও না। আপনার জন্যই তো আমার রাগ ওঠে। তাহলে পড়াশোনা জানিনা জন্য পছন্দ না? একেবারে মূর্খ তো আমি না। তাহলে সমস্যা কি?”

“কি আজেবাজে কথা বলছো এসব। এই পাগলামি গুলো মাথায় কে ঢোকালো?”

নিধি পিছনে ঘুরে গহনের দিকে একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

“আমি বলেছিলাম না আপনাকে কখনো আমাকে আমার বাপের বাড়ি যেতে বলবেন না? আমি বলেছিলাম তো আপনাকে আমাদের মাঝে যত বড় ঝামেলাই হয়ে যাক তাও কখনো আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন না। আপনি তো কথাও দিয়েছিলেন।”

“তো আমি কি তোমায় যেতে বলেছি তোমার বাপের বাড়ি? কি পাগলের মতন প্রলাপ বকছো। মাথা ঠিক আছে? কেউ আজেবাজে কিছু বলেছে তোমায় তাই না?”

নিধি শুধু কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল গহনের দিকে। বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“কেউ কিছু বলেনি। আমিই পাগল। আমারই যোগ্যতা কম। কত মানুষ কত দিক থেকে আমার চেয়ে এগিয়ে আছে। আমার আর কি। যাই গিয়ে সংসারের কাজ করি। যে কয়দিন আছি সে কয়দিন এই বাড়ির মানুষজনকে খুশি রাখার চেষ্টা করি। আমার তো আর স্বামী ভালো না যে সারা জীবন আমাকে এই বাড়িতে রেখে দেবে।”

কথাটা বলে নিধি আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গহন ওর যাওয়ার পথে হা করে তাকিয়ে রইল। কি বলে গেল এসব মেয়েটা। গহন কেন রাখবেনা ওকে সারা জীবন এই বাড়িতে? ভীষণ বিরক্ত হলো গহন। মেয়েটাকে যে মাঝে মাঝে কিসের ভূতে ধরে বুঝে উঠতে পারেনা। পুরোই পাগল।

________

গাড়ি থেকে নেমে গহনদের বাড়ির দিকে যেতে ধরে হঠাৎ করেই কারো সাথে ধাক্কা খেলো জারা। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে কার সাথে ধাক্কা খেল সেটা দেখার জন্য যখন মাথা তুলে তাকালো দেখল আবিদ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে ছেলেটারও তুমুল বিস্ময় ভাব ফুটে উঠেছে। আবিদের মুখটা দেখতেই জারার বিরক্তি আরো বাড়লো। রাগান্বিত গলায় বলল,

“আপনার এই ধাক্কা দেওয়ার স্বভাব কোনদিনও যাবে না তাই না? তাও বেছে বেছে আমাকেই ধাক্কা দিতে হবে?”

“বেছে বেছে আপনিই কেন বারবার আমার সাথে ধাক্কা খাওয়ার জন্য চলে আসেন বলুন তো? আর কোন মেয়ের সাথে তো আমার ধাক্কা লাগে না। মানে বুঝতে পারছেন কোন একটা কানেকশন আমাদের মাঝে আছে।”

জারা বিরক্ততে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“কোন কানেকশন নেই আমাদের মাঝে। আপনার সাথে থাকবে আমার কানেকশন? ইম্পসিবল। সামনে থেকে সরুন তো। যখনই এই বাড়িতে আসি আপনার ছাগলের মতন মুখটা আমাকে দেখতেই হবে। অন্য কোন সময় আসতে পারেন না? আমি যখন আসবো তখনই আসতে হবে।”

আবিদ দাঁত বের করে হেসে বলল,

“আপনার টানেই তো বারবার ছুটে আসি। আমি তো আসতে চাই না, আপনি আমাকে টেনে নিয়ে আসেন আপনার কাছে। আর দেখুন এত জোরে টেনে আনেন যে সরাসরি ধাক্কা খেয়ে যাই। যাই হোক ভালো আছেন? দিনকাল ভালো কাটছে?”

জারা কোন উত্তর দিল না। আবিদের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই। ওকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল। আবিদ ওর পিছন পিছন জারার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে গেল।

দোতলায় উঠতেই দেখল গহনদের ফ্ল্যাটের দরজাটা খোলাই। দরজার সামনে অনেকগুলো স্যান্ডেল। সরাসরি ভিতরে চলে যাওয়ার ইচ্ছে হলো না জারার। কেননা ভিতরে কে না কে আছে কে জানে। বাইরে থেকে উঁকি দিতেই দেখলো বসার ঘর মানুষজন ভরতি। একপাশে দেখলো আবার নিধিও চুপচাপ বসে আছে।

জারার বুঝতে বাকি রইলো না যে এতগুলো মানুষ এসেছে নতুন বউ দেখতে। জারা ভাবলো এখন আর ভেতরে যাবে না।

জারার এসব ভাবনার মাঝেই নিচ থেকে আবিদ ওর নাম ধরে চেঁচিয়ে এলো। এত জোরে চেঁচাতে চেঁচাতে এলো যে ঘরের ভিতরে থাকা মানুষজন দরজার দিকে তাকালো। সবাইকে একযোগে নিজের দিকে তাকাতে দেখে জারার অস্বস্তি হলো। জোর করে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল।

জারা কে দেখতে পেয়ে সালমা বেগম দরজার দিকে এগিয়ে এসে উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,

“আরে জারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন মা? ভিতরে এসো।”

জারা সালাম দিল সালমা বেগমকে। ভিতরেও গেল। অনেকগুলো অদ্ভুত দৃষ্টি একসঙ্গে জারার উপরে পড়লো। যেন কোন মানুষ দেখছে না অদ্ভুত কোন প্রাণীকে দেখছে। জারার ভীষণ অস্বস্তি হলো। সেখানে আর থাকলো না। সরাসরি গহনের ঘরের দিকেই গেল।

গহন তখন নিজের ঘরেই আছে। এত মানুষজন গহনের নিজেরও পছন্দ না। তার মধ্যে আবার সবাই মেয়ে মানুষ।

“গহন আসবো!”

পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর পেতেই গহন দরজার দিকে তাকালো। জারা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“এসো।”

অনুমতি পেতেই জারা ভিতরে এলো। গহন বরাবরের মতন ল্যাপটপে কাজ করছিল। জারাকে আসতে দেখে ল্যাপটপটা পাশে রেখে দিল।

“কখন এসেছো? আর কেউ আসেনি?”

জারা সোফায় গহনের পাশে বসে বলল,

“না। আমি একাই এসেছি।”

“কোন দরকার ছিল কি?”

“হ্যাঁ। বেশ কয়েকদিন হলো তো দেশে এসেছি। কিন্তু কোথাও ঘোরাই হয়নি। কয়েকদিন পরে তো আবার চলে যাব। এদিকে নিধির সাথেও অনেকদিন হলো দেখা হয় না। তাই ভাবলাম তোমাদের সবাইকে নিয়ে আজ ঘুরতে যাব। আমি তো তেমন একটা জায়গা চিনি না।”

জারা আর এগোতে পারল না। তার আগেই ঘরে আবিদ প্রবেশ করলো। বিছানায় বসে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল,

“এসে গেছি আমি। কি গল্প করছেন আপনারা দুজন জারা? আমাকেও বলুন।”

জারা বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গহন প্লিজ এই ছাপড়িটা কে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলো। ওকে অকারণে এত হাসতে দেখলে আমার গা জ্বলে যায়। তুমি জানো ও আমাকে প্রচন্ড বিরক্ত করে। তোমার বাড়িতে এলে তো বিরক্ত করেই, আমাকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও বিরক্ত করে। ইভটিজিং করে ও। আমি কিন্তু যে কোনদিন ওর নামে মামলা করে দেবো বলে দিলাম তোমায়।”

গহন গুরুতর ভঙ্গিতে আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“বিরক্ত করিস তুই জারা কে?”

আবিদ নিষ্পাপ মুখ ভঙ্গি করে বলল,

“বিশ্বাস কর ভাই কিছু করি না আমি। আরে উনি এত সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্ট করেন যে আমি প্রশংসা না করে থাকতে পারিনা। ভাই বিশ্বাস কর গতকাল একটা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে ছবি পোস্ট করেছে। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না কোনটা আসল ফুল। সেটাই কমেন্ট করেছিলাম। উনি ওখানে এসেও আমাকে ছাপড়ি বলে গালি দিয়েছেন।”

গহন এবারে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে গেল যে ব্যাপারটা নিয়ে আসলে কি বলবে। আবিদের সাথে কথা বাড়ানোর ইচ্ছে গহনের নেই। কেননা জানে এই ছেলের সাথে পেরে উঠবে না। সেজন্য আপাতত আবিদ কে পাত্তা না দিয়ে জারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওকে ইগনোর করো। তুমি কি বলছিলে সেটা বলো।”

গহনের কথাটা মেনে আবিদ কে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আসলে ভাবছিলাম আজ বিকেলে আমরা সবাই ঘুরতে যাব। কি বলো যাবে?”

গহন কোন উত্তর দেওয়ার আগেই আবিদ লাফ দিয়ে উঠে বলল,

“অবশ্যই যাবো। আরে জারা চিন্তা করছেন কেন। গহন আপনাকে না নিয়ে গেলেও আমি আপনাকে নিয়ে যাব। কোথায় যাবেন বলুন? দেশের ভিতরে, দেশের বাইরে যেখানে যেতে চাইবেন সেখানেই নিয়ে যাব। আপনি শুধু বলুন একবার কোথায় যাবেন?”

“চুপ করবেন আপনি। আমি গহনের সাথে কথা বলছি তো।”

জারা আবারও নিজের কথা শুরু করার আগে নিধি এলো। অনেকক্ষণ আগেই এসেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। ভিতরে আসার জন্য আবার অনুমতিও চাইলো।

নিধির কন্ঠটা পেতেই জারা দরজার দিকে তাকালো। নিধিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই এগিয়ে গিয়ে নিধি কে ভেতরে নিয়ে এলো। নিধি কে গহনের পাশে বসিয়ে নিজে নিধির পাশে বসলো। বাকিদেরকে রেখে এবারে জারা নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আসলে নিধি আমি ভাবছিলাম আজ বিকেলে সবাই ঘুরতে যাব। যাবে তো তুমি?”

“নিয়ে গেলে যাব। আমায় মনে হয় যেতে দেবে না আপু। অনেক মানুষজন এসেছে। এখনও ওদের সেবা যত্ন করা হয়নি।”

“বাদ দাও তো ওদের কথা। যার আত্মীয় সে বুঝে নেবে। আর তুমি নতুন বউ। তুমি কিসের যত্ন করবে। পুরনো বউ আছে তো। ওরা করে নেবে। আজ বিকেলে আমরা সবাই ঘুরতে যাব এটাই ফাইনাল। গহন রাজি তো তুমি?”

গহন একটু চিন্তাভাবনা করে বলল,

“আজকের দিনটা বাদ দাও জারা। আজকে খালারা এসেছে। চলে যাবেন হয়তো। কাল যাই আমরা।”

গহনের কথাটা শুনে নিধি বলে উঠলো,

“ওনারা সবাই অনেক বড় বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছেন নিজেদের সঙ্গে করে। বোধহয় কয়েক বছর থাকবেন।”

নিধির মুখ থেকে কথাটা শুনে জারা আর আবিদ হেসে ফেলল। হাসতে পারলো না গহন। কেননা হাসা তো গহনের স্বভাবেই নেই।

সবশেষে অনেকের আপত্তি আর অনেকের সম্মতির পর সিদ্ধান্ত হলো আজ বিকেলে ওরা ঘুরতে যাবে। যাই হয়ে যাক না কেন আজ ওরা ঘুরতে যাবেই।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প