বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১৩

🟢

দুপুরের রান্না বান্না শেষ করে ঘরে গিয়ে আগে গোসল করলো নিধি। এখন একটু ভালো লাগছে। না হলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে এত কাজ করতে করতে আর বাড়ি পরিষ্কার করতে করতে নিজের চেহারার অবস্থাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। জামা কাপড় সব নোংরা হয়ে গিয়েছিল।

গামছাটা বারান্দার গ্রিলের সাথে মেলে দিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো চুল আঁচড়ানোর জন্য। হঠাৎ করেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়লো সাবিত। দরজার ছিটকিনি বন্ধ ছিল না, তবে চাপানো ছিল। অন্তত কেউ আসলে তার এতোটুকু বোঝা উচিত ছিল যে ঘরের মাঝে থাকা মানুষটা নিশ্চয়ই কোন কারণে দরজাটা এভাবে চাপিয়ে রেখেছে।

নিধি অবশ্য ভাবেওনি বিনা অনুমতিতে এভাবে সাবিত চলে আসবে। সালোয়ার কামিজ পরেছে আজ নিধি। চুল আঁচড়াবে বলে ওড়নাটা খুলে পাশে রেখে দিয়েছিল। হুড়মুড়িয়ে কাউকে ঘরে ঢুকতে দেখে তড়িঘড়ি করে আগে ওড়নাটা গায়ে দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো সাবিত দাঁড়িয়ে আছে। দাঁত কেলিয়ে হাসছে। নিধির সরাসরি ইচ্ছে করলো একটা ঘুষি মেরে সাবিতের দাঁতগুলো সব ভেঙে দিতে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই সাবিত হাসতে হাসতে বলল,

“আরে ভাবি তোমার সাথে তো এখনো আলাপই করা হয়নি। তাই তোমার সাথে গল্প করতে চলে এলাম।”

“কোন ভদ্রতা নেই আপনার? কত দিনের পরিচিত আমরা দুজন। আরে পরিচিত অপরিচিত বাদ দিন। কোন মেয়ের ঘরে ঢুকতে গেলে যে অনুমতি নিতে হয় এতটুকু ভদ্রতা নেই আপনার?”

সাবিত বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“এটা তো আমার ভাইয়েরও ঘর। ভাইয়ার ঘরে ঢোকার জন্য আমার অনুমতির প্রয়োজন হতো না।”

“আশেপাশে কি কোথাও এখন আপনার ভাইকে দেখতে পাচ্ছেন? ভুলে গেছেন কি যে আপনার ভাই বিয়ে করে বউ এনেছে বাড়িতে। তার মানে ঘরটা এখন তার বউ এরও। যাইহোক কাজ করছি আমি। এখন এখান থেকে যান।”

নিধির করা অপমান ওর গায়ে লাগানো। বরং নিধির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“আরে ভাবি সবেমাত্র এলাম। এখনই বের করে দিচ্ছো। দেওর ভাবির সম্পর্কটা কিন্তু দারুণ হয়। হাসি, ঠাট্টা, ভালোবাসা সবকিছুই থাকে। আর সেখানে তো এখনো আমরা পরিচিতই হতে পারিনি। এসো বসো। আগে আলাপ করি।”

নিধি এবারে চিৎকার করে উঠে বলল,

“চলে যেতে বললাম তো আপনাকে। আমি পরিচিত হতে চাই না আপনার সাথে। চলে যান এখান থেকে।”

নিধি কে এভাবে চেঁচিয়ে উঠতে দেখে সাবিত তড়িঘড়ি করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। চেঁচাবেন না ভাবি। চলে যাচ্ছি আমি।”

নিধি হাতের ইশারায় দরজা দেখিয়ে বলল,

“এক্ষুনি যাবেন।”

সাবিত সত্যি সেখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সাবিত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নিধি তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দরজার ছিটকিনি বন্ধ করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।

নিধি সত্যি বুঝতে পারেনা এই ছেলেটাকে দেখলে ওর এত বেশি অস্বস্তি হয় কেন। সেই সাথে এটাও বুঝে উঠতে পারেনা এই ছেলেটা যতটা স্বাভাবিকভাবে ওর সাথে আলাপ করতে চায় আদৌ কি ওর মনটা ততটা পরিষ্কার। নাকি অন্য কিছু চলে ওর মনে।

___________

রাতে গহন বাড়ি ফিরে আজ আর সেই একই ভুলটা করলো না। খেতে বসার আগে নিধিকে জিজ্ঞেস করলো যে খেয়েছে কিনা। নিধিও এই অপেক্ষাতেই ছিল। গহন জিজ্ঞেস করাতে ভালো লাগলো। না খেয়ে অপেক্ষা করছিল গহনের জন্য।

আজও গহন নিজেই নিজের প্লেটে খাবার বেড়ে নিল। সেই সাথে নিধির প্লেটেও খাবার বেড়ে নিল। খাবার খাওয়ার মাঝে কোন কথা হলো না আর দুজনের মাঝে। নিধি হয়তো দু একটা কথা বলতে চাইলো। তবে গহন এর অতিরিক্ত গম্ভীর্যতার কথা ভেবে কিছু বলে উঠতে পারল না। অন্যদিকে গহন চাইছিল যে নিধি কিছু বলুক। কেননা আগবাড়িয়ে কোন গল্প তুলতে পারে না গহন। এটা গহনের ব্যর্থতা। তবে নিধিও কিছু বলল না। সেজন্য গহনেরও আর নিধির সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেটা পূরণ হলো না।

আজকেও খাওয়া-দাওয়া শেষে গহন নিধির প্লেটটা নিয়ে গিয়ে ধুঁয়ে রাখলো। আজকেও এর আগের দিনের মতন খাবার-দাবার সব ফ্রিজে রেখে টেবিলটা মুছে গুছিয়ে রাখল সবকিছু।

নিধি বুঝে উঠতে পারেনা এই ছেলেটাকে। এই কাজগুলো করার সময় তো নিজের পুরুষত্বটা দেখাতে আসে না। নিধি গহনকে যেমন ভেবেছিল তাতে তো গহনের ধারনা হওয়া উচিত এই সমস্ত কাজ বউরা করবে। তাহলে গহন কেন করে? আবার এইসব কাজ করতে যখন আত্মসম্মানে লাগে না তাহলে বউয়ের কাছে সামান্য ক্ষমা চাইতে এতে দ্বিধা ছিল কেন?

এসব ভাবতে ভাবতে নিধি ঘরে গেল। গহন আজকেও সোফায় গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। নিধি চুপচাপ শুয়ে পড়তে চাইলো, তবে তখনই মনে পড়ে গেল সাবিতের কথা। তবে গহন কে বলার সাহস হচ্ছে না। সেই সাথে এটাও ভাবছে গহন কি আদৌও ওর কথা বিশ্বাস করবে? আর তাছাড়া নিধি তো কেবল সন্দেহের বশে কথাটা বলবে। সন্দেহ তো ভুল হতেও পারে। তার মধ্যে গহন আবার নিজের পরিবারের প্রতি তো অন্ধ। হয়তো সাবিতের কথা বললে উল্টো নিধির প্রতিই রেগে যাবে।

নিধি একবার ভাবলো বলবে না কিছু গহন কে। কিন্তু পর মুহূর্তেই আবার ভাবলো কেন বলবে না। নিশ্চয়ই বলবে। লোকটা না হলে তো একচেটিয়া সব সময় শুধু নিধির দোষই দেখে যাবে। নিধিও বলবে ওর পরিবারের লোকজনের দোষ। আর রেগে গেলে রেগে যাবে। এই লোকের কাজই তো নিধির সাথে রাগারাগি করা। বিশ্বাস না করলে না করবে। নিধির বলা দায়িত্ব ছিল, বলবে।

সোফায় বসা গহন কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

“শুনুন! দরকারি কথা আছে আমার আপনার সাথে।”

নিধির কথা বলার ধরনটা গহনের কাছে সত্যি গুরুতর মনে হলো। ল্যাপটপের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিধির দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,

“হ্যাঁ বল।”

“আপনার ভাইকে বলে দেবেন যেন আমার ঘরে এলে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে। সেই সাথে ওনাকে এটাও বলে দেবেন আপনার অনুপস্থিতিতে যেন এই ঘরে না আসে। আমার ওনার সাথে পরিচিত হওয়ার কিংবা খোশগল্পে মেতে থাকার কোন ইচ্ছে নেই। অস্বস্তি হয় আমার ওনাকে দেখে।”

হঠাৎ করে সাবিতের প্রসঙ্গ যে উঠবে সেটা গহন ভাবেনি। তার ওপর আবার এমন সব কথাবার্তা। হঠাৎ নিধির এমন কথা বার্তার মানেটা ঠিক বুঝে আসলো না গহনের। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“হঠাৎ এসব বলছো কেন? কিছু হয়েছে?”

“আপনার ভাইয়ের সামান্য ভদ্রতা নেই যে ঘরে কোন মেয়ে থাকলে অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। আজ দুপুরে আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলাম। দরজার সিটকিনি লাগাইনি, তবে চাপানো ছিল। আমার গায়ে তখন আমার ওড়নাটাও ছিল না। আর এর মাঝে আপনার ব্যাক্কল ভাই অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে না করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। আপনি আমার স্বামী। যেমনই হন না কেন তবুও আপনি আমারই স্বামী। যেখানে আপনার সামনে ওড়না ছাড়া আমি দাঁড়াতে পারব না সেখানে আপনার ভাইয়ের সামনে আমার কতটা অস্বস্তি হয়েছিল ভাবতে পারছেন? ওর আবভাবও আমার ভালো লাগে না। ওকে বলে দেবেন সভ্যতা শিখতে। নয়তো যে কোনদিন আমার হাতে জুতোর বারি খাবে।”

গহন নিজেই সাবিতের এমন আচরণের কথা শুনে লজ্জা পেল। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে থাকলো। নিধি বেশ অবাক হলো গহনের এমন আচরণে। ভেবেছিলো যেকোন সময় খ্যাঁক করে উঠবে। কিংবা এমনও হতে পারে নিধি কে মা'রা'র জন্য তেড়ে আসবে। এটা তো নাকি আবার গহনের বংশের দোষ। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর গহন লজ্জিত ভঙ্গিতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওর আচরণের জন্য আমি লজ্জিত। ও আর এমন করবে না।”

“আপনি গ্যারান্টি দিচ্ছেন কিভাবে? আমার তো মনে হয় ও সেই প্রাণী যার লেজ কখনো সোজা হওয়ার না। মানে আমি ভেবেছিলাম আপনিই বোধহয় সব থেকে খারাপ। কিন্তু এখন দেখছি আপনার থেকেও খারাপ আরো বহু মানুষ আছে। এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই আশ্চর্যজনক।”

নিধি যে খুব ভদ্রভাবে গহন কে অপমান করলো সেটা গহনের বুঝতে বাকি রইলো না। তবে কিছু বলল না। তর্ক করার ইচ্ছে হলো না। মাথায় এখনো ঘুরছে সাবিতের ব্যাপারটা। গহনের নিজেরই তো কেমন অস্বস্তি হচ্ছে সাবিতের আচরণের কথাটা ভেবে। গহন তো অত্যাধিক প্রয়োজনেও ঋতুর সাথে কথা বলে না। সম্পর্কের মাঝে সম্মান বজায় রাখার জন্য নিজের সীমার মাঝে থাকা ভীষণ দরকার। আর সাবিত সেটা নষ্ট করেছে। নিধির মনেও ওর সম্পর্কে খারাপ ধারণা জন্মানোটা অস্বাভাবিক না।

নিধি তখনও একা একা বকবক করতেই আছে। সেদিকে গহনের খেয়াল নেই। একটু পর ল্যাপটপটা বন্ধ করে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিধি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে গহনের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আরে কিছু বলছিলাম তো আমি। যদি নাই শোনার ছিল তাহলে আগেই বলে দিতেন। কষ্ট করে বলতাম না। খাটাস কোথাকার।”

কথাটা বলে মুখ ভেংচিয়ে শুয়ে পড়লো নিধি। কখন ঘুমিয়ে গেল নিজেও জানে না।

ঘড়িতে সময় তখন বোধ হয় রাত দেড়টা কি দুটো। নিধি গভীর ঘুমে তলিয়ে। গহন তখনো ল্যাপটপে কাজ করেই যাচ্ছে। না দুচোখে কোন ঘুম আছে, না শরীর কোনো ক্লান্তি আছে। মানুষটা যেন রোবট। বিশ্রামের কোন প্রয়োজন নেই তার।

গভীর রাত হওয়ায় চারিদিকে কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। না গাড়ির শব্দ, না মানুষের কোলাহলের শব্দ। এমন নিঃশব্দতার মাঝে হঠাৎ করেই নিধি চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে বসলো। গহন নিজেও চমকে উঠলো। অল্পের জন্য হাঁটুর উপর থেকে ল্যাপটপটা মেঝেতে পড়ে গেল না। আতঙ্কিত গলায় নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“কি হয়েছে?”

নিধি কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো গহনের দিকে। কোন উত্তর দিলে না। হঠাৎ করেই কেঁদে উঠলো। হঠাৎ করে নিধিকে এভাবে কাঁদতে দেখে ভরকালো গহন। তড়িঘড়ি করে নিধির পাশে গিয়ে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হলো? কাঁদছো কেন? এখন নিশ্চয়ই বলবে না যে তোমার ঘুমের মাঝে গিয়ে আমি কিছু করে এসেছি যার জন্য কাঁদছো।”

নিধি ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“আমার ভাই। আমার ভাইকে দেখতে যাব।এখনি যাবো। চলুন।”

“অদ্ভুত তো! এখন কি করে যাব? কয়টা বাজে সে খেয়াল আছে তোমার?”

নিধি অনুরোধের স্বরে বলল,

“নিয়ে চলুন না আমায়। খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি ওকে নিয়ে। ওকে না দেখলে আমি শান্তি পাব না। আমাদের বিয়ের দিন ও অসুস্থ ছিল। তারপরে খোঁজও নিতে পারিনি। প্লিজ নিয়ে চলুন না। ওকে একবার দেখলে তবেই আমি শান্তি পাবো। একবার দেখা করতে নিয়ে চলুন আর একমাসেও কিছু বলবো না। নাহলে সামনে থেকে সরুন, আমি যাচ্ছি।”

গহন একটু সহানুভূতি দেখাতে চাইলো নিধি কে। যেহেতু খারাপ স্বপ্ন দেখেছে ছোট ভাইকে নিয়ে এমন অস্থির হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান বুদ্ধি হারিয়ে ফেললে তো চলবে না। এত রাতে যাওয়া সম্ভব নাকি?

গহন কে চুপ করে থাকতে দেখে নিধি সত্যিই ভাবলো একাই যাবে। বিছানা থেকে নামতে ধরলে গহন মৃদু ধমক দিয়ে বলল,

“চুপচাপ বসো। এত রাতে যাওয়া যাবে না। ”

নিধি অসহায় কন্ঠে বলল,

“তাহলে কি করব? কল করি?”

“এত রাতে কল করো না। নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে সবাই। তুমি কল করলে চিন্তা করবে। এখন চুপচাপ ঘুমোও। কাল দেখা করতে নিয়ে যাব।”

নিধি কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ভাবল যে গহনের কথায় রাজি হবে কিনা। পরে ভাবলো রাজি না হয়ে তো উপায় নেই। এখন তো সত্যিই যাওয়া যাবে না। তার থেকে যদি গহনের কথা শোনে তবে আগামীকাল নিয়ে যাবে। নিধি সম্মতি জানাতেই গহন উঠে আবার নিজের কাজের জায়গায় যেতে ধরলে নিধি ওকে ডেকে উঠে বলল,

“আমার বাড়ি যাব না। এগারোটায় আমার ভাইয়ের স্কুলে টিফিন পিরিয়ড। ওর স্কুলে যাব ওর সাথে দেখা করতে।”

গহন “আচ্ছা” বলে আবারও সোফায় গিয়ে বসলো। নিধিও চুপচাপ আবার শুয়ে পড়ল। তবে দুচোখে ঘুমের দেখা নেই। সমানে এপাশ ওপাশ ফিরতে লাগল। তবে তাও ঘুম আর এলো না। একবার এমন অসময়ে ঘুম ভেঙে গেলে কি সহজে ঘুম আসে নাকি!

হঠাৎ করে নিধির চোখ গেল দেয়াল ঘড়ির দিকে। দেখলো আড়াইটে বাজে। মাথাটা বালিশ থেকে একটু তুলে দেখলো গহন এখনো সোফায় বসে ল্যাপটপ চালাচ্ছে। নিধির মাথাটা গরম হয়ে গেল। রাগী গলায় বলে উঠলো,

“মাথার তারকাটা আপনার? নাকি ঘড়ি দেখতে জানেন না? আড়াইটা বাজে। ঘুমোবেন আর কখন?”

গহন বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আর একটু কাজ বাকি আছে। কিছুক্ষণ পরেই ঘুমোবো।”

নিধি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“কি দরকার। এমনিতেই তো সকাল ছয়টার মাঝে উঠে যান। তিন চার ঘন্টা ঘুমোনোর থেকে বরং আপনি কাজই করুন। অনেক এগিয়ে যাবে। এই কয়েক ঘন্টা কাজ করার ফলে আপনার ব্যবসার এতটাই উন্নতি হয়ে যাবে যে আপনি পৃথিবীর সব থেকে ধনী ব্যক্তি হয়ে যাবেন তাই না? করুন করুন কাজ করুন।”

গহন ছোট্ট করে “আচ্ছা” বলল শুধু। নিধি চুপচাপ কাঁথা মুড়ি শুয়ে পড়লো। ভাবলো যা ইচ্ছে করুক। এদিকে অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও গহন এখনো শুতে এলো না। আর সহ্য করতে পারলো না নিধি। ওর নিজেরই বিরক্ত লাগছে। ঘুমোবে না কেন? ঘুমোতে হবে? এত রাত জেগে কাজ করারই বা কি আছে।

মুখের ওপর থেকে কাঁথা সরিয়ে এবারে গহন কে হুমকি দিয়ে বলল,

“হয় আপনি বিছানায় আসবেন, নয়ত আমি উঠে গিয়ে এখন আপনার ল্যাপটপের বারোটা বাজাবো। আমার সহ্য হচ্ছে না। আমার কথা শুনবেন না কেন? আমার আলোতে ঘুমোতে সমস্যা হয়। এক্ষুনি ঘুমোতে আসুন।”

গহনের কাজ তখন শেষ হয়ে গেছে। নিধির সাথে তাই আর কোন তর্কাতর্কি করতে হলো না। চুপচাপ ল্যাপটপটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বিছানার দিকে আসতে আসতে বলল,

“শেষ আমার কাজ।”

গহন চুপচাপে এসে শুয়ে পড়লো। নিধির চোখে এখনও কোন ঘুম নেই। এদিকে যেহেতু নিধির ঘুম ধরছে না তাই গহন ঘুমিয়ে যাবে এটাও হতে দিতে মন চাইলো না। নিজ থেকে কথা তুললো।

“আচ্ছা, কালকে কখন নিয়ে যাবেন আমায়?”

“দশটায় তৈরি হয়ে থেকো।”

“কিসে যাব আমরা?”

“আমার গাড়ি আছে।”

নিধি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“আপনার নিজের গাড়ি আছে?”

“হুম।”

“কি রংয়ের গাড়ি আপনার? আপনি গাড়ি চালাতে পারেন? আচ্ছা আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তো? আমাদের বাড়ির রাস্তাটা কিন্তু খুবই ভয়ঙ্কর। বড় বড় ট্রাক, বাস চলাচল করে। আবার কিছু হয়ে যাবে না তো? আচ্ছা ধরুন মাঝ রাস্তায় টায়ার পাংচার হয়ে গেল, আপনি সারাতে পারেন? আচ্ছা শুনুন, মাঝ রাস্তায় যেন আবার গাড়ির তেল না শেষ হয়ে যায়। সেই ব্যবস্থা করে রাখবেন কিন্তু। আর আমার ভাইয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। আমার আপনার মাঝে যে ঝগড়া চলে সেটা ওকে আমি বুঝতে দেবেন না। ওর সামনে ভালো ব্যবহার করবেন যেন আমি আপনার বউ। আসলেই আমি আপনার বউ। কিন্তু মানে এমন ব্যবহার করবেন যে আপনি আমায় ভালোবাসেন।”

নিধি এতগুলো কথা বলে গেল কিন্তু গহনের থেকে কোন উত্তর পেল না। নিধি জানে ও আজেবাজে কথা বলেছে। কিন্তু সেটা তো গহন যেন ঘুমিয়ে না পড়ে সেজন্য বলেছে। একটু জবাব দিলে কি হতো।

হঠাৎ করেই আবার নিধির একটা কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা গহন কি ওকে ভালোবাসে? ভালোবাসার তো কথা না। যদি ভালো না বাসে তাহলে দেখাবে কি করে যে ও নিধি কে ভালোবাসে? নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে নিধি প্রশ্নটা করেই ফেলল,

“আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন? মানে যদি ভালো না বাসেন আমাকে তাহলে আমার ভাইয়ের সামনে দেখাবেন কি করে যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন? মানে আপনি জানেন কি করে ভালোবাসা দেখাতে হয়?আচ্ছা আপনি কি জানেন কি করে বউয়ের সাথে ভালোবেসে কথা বলতে হয়?”

এবারও কোন উত্তর এলো না গহনের দিক থেকে। নিধি ডাকলো কয়েকবার এই ওই বলে। তবে গহনের থেকে কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না। ঘুমিয়ে পড়েছে লোকটা। ভীষণ রাগ হলো নিধির। কাজ করার সময় ঘুম ধরে না। যেই না একটু নিধি গল্প করতে নেমেছে ওমনি ওনার ঘুম পেয়ে গেছে। আস্ত একটা খাটাস।

মুখ ভেংচিয়ে অন্য দিকে ঘুরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। নিধি অন্য দিকে ফিরেছে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গহন চোখ মেলে তাকালো।

সত্যি বলতে প্রথমে তো কোনো উত্তর দেয়নি নিধির অতিরিক্ত প্রশ্নের কারণে। আর পরে উত্তর দিলে না কারণ গহন এর কাছে কোন উত্তর নেই। সত্যিই তো নিধির প্রতি ভালোবাসা নেই। এত তাড়াতাড়ি ভালোবাসাও হয়তো সম্ভব না। কিন্তু সেই কথাটা সরাসরি নিধির মুখের উপরে বলতে একটু অস্বস্তি হতো। সেই জন্য ঘুমোনোর ভান করেছিল।

কেননা গহনের কাছে মনে হয় ভালোবাসি কথাটা বলা যতটা সহজ তার থেকে ভালোবাসি না এই কথাটা বলা অনেক বেশি কঠিন। আর গহন এত কঠিন রাস্তা বেছে নিতে চায় না। তাই যেদিন সহজ কাজটা করতে পারবে সে দিনই না হয় নিধির প্রশ্নের উত্তর দেবে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প