বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ১০

🟢

“একবারও তো জিজ্ঞেস করলে না আমি কেমন আছি?”

ওয়াশরুম থেকে গোসল করে বেরিয়েছে সাবিত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তখন চুল আঁচড়াচ্ছে। ঋতুর বলা কথাটা হয়তো কানে গেল কিংবা হয়তো কানে গেল না। তৎক্ষণাৎ তো কোন জবাব দিল না। ঋতুর আবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করার সাহস হলো না। বেশ অনেকটা সময় পর সাবিত উত্তর দিল।

“এমনটা তো না যে তোমায় রাস্তায় ফেলে রেখে গেছিলাম। ভালো না থাকার কি আছে? আর যদি এখানে ভালো না থাকো তাহলে কোথায় ভালো থাকবে সেই ব্যবস্থা করো।”

“এভাবে কথা বলছ কেন? আমি কি বলেছি আমি এখানে ভালো ছিলাম না। আমি শুধু বলেছি তুমি তো জানতে চাইলে না।”

এবারের প্রশ্নেরও কোন উত্তর দিলো না সাবিত। বিছানায় গিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে ফোনটা নিয়ে বসে ঋতুকে উদ্দেশ্য করে হুকুম করে বলল,

“একটা টি-শার্ট দাও।”

ঋতু বাধ্য মেয়ের মতন একটা টি-শার্ট এনে এগিয়ে দিল। অনেকদিন পর ফোনটা হাতে পেয়েছে সাবিত। এখন তো আর কোনমতেই ছাড়া যাবে না। ঋতু কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় সাবিতের পায়ের কাছে বসে রইলো। বেশ অনেকটা সময় পর ঋতু ফের বলে উঠলো,

“আমাদের সন্তান আসবে পৃথিবীতে সেই নিয়ে কি তোমার কোন উৎসাহ নেই সাবিত? আজ তিন মাস হলো আমি একা। এই সময়টা আমি তোমায় আমার পাশে আশা করেছিলাম। তুমি ছিলে না বলে অভিযোগ করছি না। কিন্তু তাই বলে এতদিন কাছে ছিল না তারপরও আমাদের সন্তানকে নিয়ে তোমার মাঝে বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।”

সাবিত ফোনের উপর থেকে দৃষ্টি তুলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঋতু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার ইচ্ছে ছিল বাচ্চার, আমার না। আর এখানে এত খুশি হওয়ারই বা কি আছে। মনে হচ্ছে আর কারো বাচ্চা হয় না, তোমারই প্রথম হবে। আর সব থেকে বড় কথা বাচ্চা নিয়ে এত আহ্লাদ দেখানোর সময় আমার হাতে নেই। এই বাচ্চা জন্ম দিয়ে তুমি আমাকে সংসারে বাঁধার যে পরিকল্পনাটা করেছো সেটা কোনদিনও হবে না। আমার যা ইচ্ছে হবে, যেমন ভাবে ইচ্ছে হবে তেমনভাবেই চলবো। তোমার পোষালে থাকো, নয়তো নিজের রাস্তা মাপো।”

কথাটা বলে সাবিত ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে গেল। বিছানার উপরে বসে রইল ঋতু। নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো। নিজেই আবার সেটুকু মুছে নিল। কেউ তো নেই ঋতুর জীবনে যে ওর চোখের জল মুছে দেওয়ার দায়িত্ব নেবে। তাই নিজেকে নিজেরই সামলাতে হবে।

_________

সাবিত খেতে বসেছে। ওকে খাবার পরিবেশন করছে সালমা বেগম। ঋতু তো আছেই। ওর বোনেরাও যেটা পাচ্ছে ভাইয়ের প্লেটে তুলে দিচ্ছে। নিধি যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। প্রথমবারেই এই ছেলের প্রতি যে রাগটা উঠেছিল তাতে এখন ওর মুখ দেখারও আর কোন ইচ্ছে নেই।

ডাইনিং রুমে সবাইকে এত ব্যস্ত দেখে গহন আর কাউকে বিরক্ত করতে চাইলো না। ড্রয়িং রুমে এসে দেখলো নিধি বসে আছে। নিধিকে উদ্দেশ্য করেই বলল,

“নিধি একটা দরকারি কাজ পড়ে গেছে। আমি আসছি।

“খেয়ে যান। রান্না হয়ে গেছে তো।”

“এসে খাবো। এখন যাই দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কথাটা বলে গহন চলে যেতে নিলে নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,

“খেয়ে যেতে কত সময় লাগবে? কতই বা খান আপনি? যান খেয়ে আসুন। আপনার মা খাবার বেড়ে দিচ্ছে ছোট ছেলেকে। আপনি গিয়ে বসলে আপনাকেও দিয়ে দেবে। নাকি আবার আমায় যেতে হবে? ঠিক আছে চলুন আমি যাচ্ছি। কোন ব্যাপার না। এত কিছু করতে পারলে সামান্য আপনাকে ভাত বেড়ে দিতে পারবো না!”

নিধি উঠতে নিলে গহন হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“থাক, কোন প্রয়োজন নেই। তোমায় আর কষ্ট করতে হবে না। যথেষ্ট কষ্ট করেছো। তুমি আমার বউ জন্য আমায় পাশে বসিয়ে খাওয়াবে তেমন কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আর কখনো আমি তেমন আশায় ছিলামও না। আমার অভ্যাস আছে না খেয়ে থাকার।”

কথাটা বলে গহন চলে যেতে ধরলে নিধি ফের বলে উঠলো,

“আরে বাবা আপনাকে রাগানোর জন্যই তো কথাগুলো বললাম। না খেয়ে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন খেয়ে নেবেন। দুপুর তিনটে বাজে। আরো কখন খাবেন, রাতে? আর শুনুন আপনার সাথে একটু আমাকেও খেতে বসাবেন! বিশ্বাস করুন সকাল থেকে প্রচুর কাজ করেছি। খুব খিদে পেয়েছে। আপনার বাড়ির লোকের তো আমার কথা মাথাতেই নেই। আমি যদি এখন গিয়ে খেতে বসেছি সবাই আবার কথা শোনানো শুরু করবে। পেট তখন এমনিতেই ভরে যাবে। শুনুন না, আপনার খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও আমার জন্য খেয়ে যান না!”

গহন নিজেই পাল্টা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো নিধির দিকে। আসলে মেয়েটার উপর রাগ দেখাবে নাকি মায়া করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে মিটিংয়েও দেরি হয়ে যাচ্ছে। তবে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর বাইরে যাওয়ার জন্য পা উঠলো না গহনের। নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এসো।”

গহন চেয়ারে গিয়ে বসে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মা খেতে বসো। সিনথিয়া, শম্পা তোমরাও বসো।”

সালমা বেগম গহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“না বাবা। আমরা এখন খাব না। আগে তোমরা খেয়ে নাও। তারপর আমরা খেতে বসবো।”

গহন পড়লো এবার মহা বিপাকে। আড়চোখে একবার নিধির দিকে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটা অসহায় দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে আছে। গহন ঠিক বুঝে উঠতে পারল না কি করবে, কি করা উচিত। এখন যদি নিধিকে খেতে বসতে বলে তাহলে নিধিকেই কথা শুনতে হবে। গহনের সামনে হয়তো কেউ কিছু বলবে না কিন্তু গহনের আড়ালে ঠিকই বলবে। অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করলো গহন। শেষে নিধি কে বলল,

“আমার খাবার দাও নিধি।”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গহনের প্লেটে খাবার তুলে দিল। গহন কে আর কোন দোষ দিতে ইচ্ছে করলো না। নিধিরও তো খেতে বসতে চাওয়ার কথা মনে হতেই ভয় লাগছে। আর গহনও যে কেন নিধি কে খেতে বসতে বলল না সেটাও নিধি খুব ভালোভাবেই বুঝলো।

নিধি গহনের প্লেটে খাবার তুলে ওর সামনে রাখলো। হঠাৎ করেই গহনের ফোনটা বেজে উঠলো। একদম ঠিক টাইমে কলটা এসেছে, তাও সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। গহন ফোনটা কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে কি যেন বলল। সেসব শুনে গহন তাড়াহুড়ো করে বলল,

“আমি এক্ষুনি আসছি।”

ফোনটা রেখে গহন উঠে দাঁড়িয়ে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা, অফিসে একটা দরকারি কাজ পড়ে গেছে। আমি আসছি। রাতে ফিরব।”

সালমা বেগম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই গহন এবারে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিধি, আমার খাবারটা তুমি খেয়ে নিও। খাবার নষ্ট করার প্রয়োজন নেই কেমন। এখনই আগে তুমি এটা খেয়ে নাও। নয়তো পরে ভুলে যাবে। আর খাবার গুলো নষ্ট হয়ে যাবে।”

গহন কথাটা বলল ঠিকই তবে নিধি তাও চেয়ারে বসার সাহস পেল না। এদিকে গহন ওকে এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফের তাড়া দিয়ে বলল,

“কি হলো বসো। খেতে বললাম তো। তোমার তো ক্ষুধাও লেগেছে।”

কথাটা বলে গহন একপ্রকার ওর হাত ধরে টেনেই চেয়ারে বসালো। আর কোন কথা হলো না সেখানে। গহন চলে গেল। বাকিরাও ব্যাপারটা কে খুব বেশি গুরুত্ব দিলো না, সালমা বেগম বাদে। তবে উনি গুরুত্ব দিলেও এখন আর কিছু বললেন না।

এদিকে কেউ না বুঝলেও নিধি তো ঠিকই বুঝল গহন এই কাজটা কেন করল। খুব খারাপ লাগল নিধির। ওর জন্য গহন খেতে পারল না। এখন তো নিধির মনে হচ্ছে গহন কে ওর কথাটা বলাই উচিত হয়নি। এতক্ষণ যখন অপেক্ষা করলো আর একটু অপেক্ষা করেই নিতে পারতো। শুধু শুধু মানুষটার খাওয়া হলো না।

নিধি থালায় হাত দিল ঠিকই তবে এক লোকমাও মুখে দিতে পারল না অপরাধবোধে। খিদেটা হঠাৎ করে ম'রে গেল। খাবার প্লেটটা ঢেকে রেখে হাত ধুঁয়ে ঘরে চলে গেল। কেউ সেদিকে খেয়ালও করলো না। কারো হাতে তখন অত সময়ই নেই। সবাই সাবিত কে খাওয়াতে ব্যস্ত।

________

আজ পুরোটা দিন খুব বাজে কাটলো নিধির। এক মিনিটের জন্যও বোধহয় একটু কাজ থেকে ফুরসত পায়নি। কেউ যেন নিধির বিশ্রাম নেওয়া সহ্যই করতে পারছিলো না। যখনই দেখেছে নিধি একটু বসেছে তখনই ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। নিধির তো মনে হচ্ছে ওকে আসতে দেখে সবাই কাজ করাই ভুলে গেছে। যে যা পারছে সেই কাজের জন্য হুকুম করছে। মুখের ওপরে নাও করতে পারছে না।

শাশুড়ি মা আগেই দায়িত্ব দিয়েছে, বলেছেন সবার খেয়াল রাখতে। এদিকে স্বামীও ভালো না। অভিযোগটা করবে কার কাছে নিধি। আবার সংসারও করতেই হবে। তাই চুপচাপ মুখ বুঝে সব সহ্য করে গেল। তার মধ্যে সেই সকালে একটু খেয়েছিল। তারপর থেকে আর পেটে খাবারও পড়েনি। দুপুরে তো আর খাওয়া হলো না। রাতেও ভাবল গহন ফিরলে একসঙ্গে খাবে। কিন্তু সেই মানুষের তো ফেরার নামই নেই।

অবাক করার বিষয় হলো নিধির কাছে গহনের নাম্বারটা পর্যন্ত নেই যে একবার কল করে একটু খোঁজ নেবে। সেই মানুষটাই বা কেমন। উনিতো চাইলেই নিধির নাম্বার জোগাড় করতেই পারতেন। একবার কি নিধির থেকে চেয়ে নেওয়া যেত না! একবার কি নিজ থেকে কল করে নিধির খোঁজ জানতে চাইতে পারতেন না! কিন্তু সেসব তো উনি করবেন না। বউয়ের প্রতি কোন ভালোবাসা আছে নাকি যে খোঁজ নেবে!

রাতে সবাই খাওয়া দাওয়া করে নিল, নিধি বাদে। দুবেলাই সাবিত রান্নার যে খুঁতটা ধরলো তা হলো খাবারে নাকি ঠিকঠাক ঝাল হয়নি। নিধি শুধু পারলো না মুখের ওপর বলতে যে পছন্দ না হলে নিজে যেন রান্না করে খায়।

গহন তখনও বাড়ি ফেরেনি। খাওয়া-দাওয়া শেষে যে যার ঘরে চলে গেল ঘুমোনোর জন্য। নিধি থালা-বাসন সব মাজা শেষে রান্না ঘর পরিষ্কার করে টেবিলটা গুছিয়ে রাখল।

নিধি বোধহয় নিজেই ভুলে গেছে যে ওর নতুন বিয়ে হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত যা দেখেছে, শুনে এসেছে তাতে নতুন বউরা নাকি বিয়ের পরপর ঘোরাঘুরি করে। অথচ নতুন বউ হওয়ার অনুভূতিটা কেমন হয় নিধি সেটাই অনুভব করার সময় পেল না।

বিজ্ঞাপন

নিধি জানতো শ্বশুর বাড়ি খুব একটা সুখকর জায়গা না। এখানে অশান্তি হবে, দিনরাত খোঁচা শুনতে হবে, কাজও করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে ভেবেছিল অন্তত নতুন নতুন প্রথম কয়েকটা দিন একটু শান্তিতে থাকতে দেবে। কিন্তু এরা তো সেই প্রথম দিন থেকেই নিধির শান্তি সহ্য করতে পারছে না।

সে যাই হোক। কাজকাম শেষে সবে মাত্র একটু সোফায় এসে বসলো আর অমনি ঘর থেকে সালমা বেগমের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

কি সুন্দর মিষ্টি করে “নিধি মা” বলে ডাকছেন। এই মানুষটাকে নিয়ে নিধি ভীষণ দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে আছে। উনি আসলে ভালো না খারাপ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষটা আসলেই ভালো। নিধিকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। কিন্তু আবার মাঝে মাঝে মনে হয় সবটাই ওনার ভালো মানুষের নাটক। বিশেষ করে গহনের সামনে একদম ভালো মানুষ সেজে বসে থাকে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই আবারও সালমা বেগমের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধি গলা উঁচিয়ে বলল,

“আসছি মা।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিধি উঠে গেল সালমা বেগমের ঘরে। আজকে আর শাড়ি পরেনি। সালোয়ার কামিজ পরেছে। ওড়না দিয়েই মাথায় ঘোমটা দিল। বলা যায় না এটাও আবার সমস্যা হয়ে যেতে পারে।

দরজায় দাঁড়িয়ে নিধি ভেতরে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইল। সালমা বেগম তখন বই পড়ছেন। নিধির কন্ঠ পেয়ে বইটা পাশে রেখে দিয়ে মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,

“অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভিতরে এসো।”

নিধি ভেতরে গেল। সালমা বেগম ওকে নিজের পাশে বসার জন্য বললেন। চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতন বসে পড়ল নিধি। আগবাড়িয়ে নিজে আগেই কোন কথা বলল না। সালমা বেগমই আগে বললেন,

“খেয়েছো?”

“না মা, খাইনি। পরে খাবো।”

“গহনের জন্য অপেক্ষা করছো?”

হালকা একটু লজ্জা পেল নিধি। আমতা আমতা করে বলল,

“না মা মানে, এমনি আর কি। ভাবলাম উনি এলে একা একা খাবেন তাই খাইনি।”

“তুমি অপেক্ষা করে থেকো না। খেয়ে নাও। গহন তো প্রায়ই বাইরে থেকে খেয়ে আসে। আমি কত রাত ওর জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করে থেকেছি। পরে ও এলে বলেছে খেয়ে এসেছে। আমি খেয়েছি কিনা খোঁজও নেয়নি। তোমার সাথেও দেখো একই কাজ করবে।”

“সে যদি ওনার এতোটুকু জ্ঞান না থাকে আমাকে জিজ্ঞেস করার যে খেয়েছি কিনা তাহলে তো আমার আর কিছু বলার নেই। তবুও আমার ইচ্ছে করছে আজ অপেক্ষা করার, করব আমি।”

এই নিয়ে আর কোন কথা তুলতে চাইলেন না সালমা বেগম। নিধিও থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,

“আচ্ছা মা, তোমার আর গহনের মাঝে সব ঠিকঠাক আছে তো?”

সালমা বেগম প্রশ্নটা করতেই নিধির কপালে আপনাআপনি গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। পাল্টা প্রশ্ন করল,

“মানে? কি জিজ্ঞেস করতে চাইছেন?”

“আসলে তোমাদের দুজনকে দেখে আমার মনে হয় যে তোমাদের মাঝে সম্পর্কটা ঠিক নেই। আমি তো আমার ছেলেকে চিনি। ও পেয়েছে একদম ওর বাবার গুণ। তোমার শ্বশুরও সব সময় সবকিছুতে শুধু শাসন করতো। সব সময় জোর খাটাতো। যতটুকু ভালোবাসতো তার থেকে হাজার গুণ বেশি অধিকার ফলানোর চেষ্টা করতো জোর করে। গহনের মাঝেও এই গুণটা আছে আমি বুঝি। আসলে এটা ওদের বংশের দোষ। ওদের বংশে একটা কুখ্যাত নিয়ম বলতে পারো। এরা সব সময় স্ত্রীদেরকে দাবিয়ে রাখতে চায়।”

আজ বুঝলো নিধি গহনের আসল সমস্যা। তাহলে এটা গহনের বংশগত সমস্যা। মানে বংশগত ভাবেই চলে আসছে যে সব সময় স্ত্রীদের ইশারায় নাচাতে হয়। কখনো স্ত্রীদেরকে ভালোবেসে বুকে আগলে রাখতে নেই। বরং পায়ের নিচে রাখতে হয়। যেন বেশি নাড়াচড়া করলে একটা লাথি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যায়।

নিধি কে ভাবনার জগতে নিমগ্ন থাকতে দেখে সালমা বেগম ভাবলেন এবার আসল কথাটা বলে ফেলা যাক। যে কারণে তিনি নিধিকে ডেকেছেন এবার সেই কথাটা সাড়া দরকার।

নিধি তখন ঘোর ভাবনার মাঝে নিমগ্ন। সালমা বেগম নিজের হাত দুটো নিধির হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু অপরাধী গলায় বলল,

“আমি জানি সিনথিয়া যে কাজটা করেছিল সেটা মোটেই ঠিক করেনি। গহন তোমার সাথে যে ব্যবহারটা করেছিল সেটা তো আরো বেশি অনুচিত ছিল। আমি ওদের দুজনের হয়ে ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। তুমি কিছু মনে করো না ওদের ব্যবহারে। আসলে ওরা এমনই। তুমি তো পরের বাড়ির মেয়ে, সেজন্য তোমার কদর নেই। আমি তোমার কষ্টটা বুঝেছি। কেননা এক সময় আমিও একই জিনিস গুলোর মধ্যে দিয়ে গেছি।”

নিধির কথাটা ঠিক ভালো লাগলো না। দৃষ্টি সংকুচিত করে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এতই যখন বুঝেছেন আমার কষ্টটা তাহলে তখন আপনি চুপ ছিলেন কেন মা? আপনি কেন আপনার ছেলে মেয়েকে শাসন করলেন না? এ আপনার কেমন কষ্ট জানতে পারি কি?”

একটু থতমত খেয়ে গেলেন সালমা বেগম। মেয়েটাকে যতটা প্যাঁচালো ভেবেছিলেন এ তার থেকেও অনেক বেশি প্যাঁচালো। সহজে বিশ্বাস করবে না সালমা বেগমের কথা। তবে ঘাবড়ালে চলবে না। হার মেনে নিলেও চলবে না। খুব জলদি মনে মনে কারণটা ঠিক করে নিধি কে বললেন,

“আসলে তখন সবার সামনে যদি আমি কিছু বলতাম তাহলে ঝামেলা আরো বাড়তো। গহনও হয়তো আমার উপরে রাগ করত তোমার সামনে সিনথিয়াকে ছোট করার জন্য। তবে পরে আমি ঘরে গিয়ে সিনথিয়াকে যথেষ্ট বকাবকি করেছি।”

নিধি আবারও কপাল কুঁচকে সন্দেহী গলায় বলল,

“আপনি আমার কাছে আপনার ছেলের নামে বদনাম করছেন কেন? মানে আমি আসলে আপনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। সন্তান যেমনই হোক, মায়ের কাছে তো আদরেরই হয়। অন্তত ছেলের বউ এর কাছে ছেলের নামে বদনাম করতে এর আগে কখনো আমি কোন শাশুড়িকে দেখিনি।”

সালমা বেগম নিজের চোখে মুখে ফুটিয়ে তুললেন অসহায়ত্ব। এর কারণ হলো নিধির বিশ্বাস অর্জন করা। উনি বুঝতে পারছেন নিধি যেমন ওনাকে পুরোপুরি এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না আবার সেই সাথে এটাও বুঝলেন যে ওনাকে একেবারে খারাপও ভাবছেন না। কিছুটা সময় নিরব থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপরে মলিন হেসে নিধি লে বললেন,

“তুমিও তো কারো মেয়ে। আমি আমার ছেলের বদনাম করছি না তোমার কাছে। আমি আমার শিক্ষার প্রতি অসন্তুষ্টতা প্রকাশ করছি। আমি আমার ছেলেকে ঠিকঠাক শিক্ষা দিতে পারিনি। মেয়েদের কি করে সম্মান দিতে হয় সেটা আমি ওকে শেখাতে পারিনি। আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত। আমি জানি আমার ছেলে আমাকে ভালোবাসো, ভীষণ ভালোবাসে। তবে তারপরেও তোমার সাথে ও যে আচরণ গুলো করছে সেগুলো যে ঠিক না এটা আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমার ছেলের প্রতি তুমি কোন ক্ষোভ রেখো না মা। তুমি পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও। কেননা দোষ ছিল ওর মায়ের শিক্ষা তে।”

কথাটা বলে সালমা বেগম কেঁদে উঠলেন। নিজে ভ্যাবাচ্যাকা খেল। তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,

“আরে মা কাঁদছেন কেন? থামুন। আপনার ছেলে যদি এসে আবার দেখে আপনি কাঁদছেন আমাকেই দোষ দেবে। উনি তো পারেনই শুধু আমাকে দোষ দিতে। আসলে আপনাকে আমি যেমন ভেবেছিলাম আপনি তেমন না। আপনার ছেলে মেয়ে যে কি করে এমন হলো আমি সত্যি বুঝে উঠতে পারছিনা। আপনার মেয়েরা কেমন তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তবে ছেলেটাকে একটু ভালো বানালেই পারতেন।”

সালমা বেগম শাড়ির আঁচলে চোখের জলটুকু মুছে নিয়ে বললেন,

“কোন মা-ই তো চায় না সন্তান কে খারাপ শিক্ষা দিতে। আমিও চাইনি। কিন্তু ওর বাবার জন্য এমন হয়েছে। ওর বাবার তো গায়ে হাত তোলারও স্বভাব ছিল। তোমার গায়ে কি গহন হাত তুলেছে?”

“না না। তেমন পর্যায়ে এখন পর্যন্ত আমাদের ঝামেলা যায়নি। তবে হ্যাঁ এটা ঠিক ওনার কথা তাও সহ্য করে নেব আমি। তবে ভুলেও যদি উনি কোনদিন আমার গায়ে হাত তুলছেন সেদিনই হবে আমার এই বাড়িতে, ওনার সংসারে শেষ দিন। এটা সহ্য করতে পারবো না আমি।”

বাড়িতে প্রবেশ করার জন্য গহনকে কলিংবেল বাজিয়ে অপেক্ষা করে থাকতে হয় না, যে কে কখন এসে দরজা খুলে দেবে তারপর গহন ভিতরে আসবে। গহনের কাছে চাবি আছে। সেই চাবি দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। আসলে নিজের জন্য কাউকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে না গহনের, অস্বস্তি হয়।

প্রতিদিন রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে গহনের সর্বপ্রথম কাজ হলো নিজের মায়ের ঘরে যাওয়া। যদি সালমা বেগম ঘুমিয়ে যায় তাহলে কথা হয় না। তবে উনি না ঘুমোলে মায়ের সাথে গিয়ে টুকটাক কথাবার্তা বলে, মায়ের শরীর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়ে তারপর নিজের ঘরে আসে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।

ঘরে গিয়ে দেখল নিধি বসে আছে। ওনাদের মাঝে কি কথা হয়েছে সেসব কানে যায়নি গহনের। তবে দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে গল্প করছে। পরিবেশটা খুব ভালো লাগলো গহনের। অন্তত এতোটুকু ভেবে নিশ্চিত হলো যে নিধির সারাটা দিন এই বাড়িতে খুব একটা খারাপ কাটেনি। ওর বোনেরা বিরক্ত করলেও অন্তত ওর মা ভালো ব্যবহার করেছে।

“মা!”

নিধির সংসার ছেড়ে যাওয়ার কথার প্রেক্ষিতে সবেমাত্র সালমা বেগম কিছু একটা বলে উঠতে ধরেছিলেন। হয়তো সায় জানাতেন নিধির কথায়। তবে গহনের কন্ঠটা কানে যেতেই মৃদু কেঁপে উঠলেন। গহনকে দেখা মাত্রই আবার স্বাভাবিক হয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললেন।

গহন ভিতরে আসতে আসতে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওষুধ খেয়েছো মা?”

“হ্যাঁ বাবা খেয়েছি। তোমার সারাদিন কেমন কাটলো? কাজ কেমন চলছে?”

“ভালোই চলছে। আচ্ছা অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি এখন ঘুমিয়ে পড়ো। নিধি চলো।”

নিধি উঠে দাঁড়ালো। গহনের এতো ভালো ব্যবহার ঠিক হজম হলো না। সালমা বেগমের দিকে তাকাতেই উনি ইশারায় নিধিকে বোঝালেন যে ওনাদের মাঝে যা আলোচনা হয়েছে সেগুলো যেন গহন কে না বলে।

নিধি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গহনের কাজ দেখলো। বিছানার চাদর টানটান করে দিয়ে বালিশ ঠিক করে দিয়ে সালমা বেগমকে শুয়ে পড়তে বলল। উনি শুয়ে পড়লে গহন ওনার গায়ে কাঁথা টেনে দিলেন। তারপর আবার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বেড সাইটের উপর গ্লাসে পানিও ঢেলে রাখল, যেন মায়ের কোনরকম কোন অসুবিধা না হয়। তারপরে ঘরের লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে নিধি কে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

সালমা বেগম দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ করে মনের মাঝে একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি হলো। উনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন কি করছেন এসব? গহন তো ওনার ছেলে। তবে ছেলের সাথে কেন এমন করছেন? পরক্ষণেই আবার ভাবলেন উনি তো ভুল কিছু করছেন না। যা করছেন ঠিকই করছেন। এই মেয়ে ওনার ছেলের জন্য ঠিক না। নিধি কে ওনার ছেলের জীবন থেকে দূর করতেই হবে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প