বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৬

🟢

একদম ধবধবে সাদা একটা জর্জেটের শাড়ি পরেছে নিধি। পুরো শাড়িতে স্টোনের ভারী কাজ করা। গয়না হিসেবে পরেছে একটা হীরের নেকলেস। এটাও জুবাইদাই দিয়েছে নিধিকে। সাজগোজ শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরই নিজেকে চিনতে অসুবিধা হলো।

নিধির ধারনা অনুযায়ী ওকে তো শাড়ি পরে সিলিন্ডারের মত লাগার কথা। তবে আজ অন্যরকম লাগছে। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত যেন একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া লেগে আছে।

নিধির সাজগোজ শেষ হতেই সেখানে জুবাইদা এলেন। নিধি কে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে আগে মন ভরে দেখলেন। তারপর প্রশংসার কন্ঠে বললেন,

“মাশাআল্লাহ। এখন তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যে তুমি আমার ছেলের বউ। গহন তো আজ চোখই ফেরাতে পারবেনা তোমার উপর থেকে।”

জুবাইদার কথা শুনে হালকা লজ্জা পেলো নিধি। জুবাইদার সাথে জারা আর জান্নাতও এসেছে। ওরাও প্রশংসা করলো নিধির। একটু পরে সেখানে এলো সিনথিয়া আর শম্পা। নিধির পোশাক-আশাক, গয়না, সাজগোজ দেখে ভীষণ হিংসে হলো। একবার নিজেদের পোশাকের দিকে তাকালো।

এমনটা নয় যে গহনের বিয়ের জন্য ওরা নতুন পোশাক কেনেনি। গহন নিজেই টাকা দিয়েছে। যে যত টাকা চেয়েছে তাকে তত টাকাই দিয়েছে। যে যার নিজের পছন্দমত পোশাক কিনেছে। তবে নিধির পোশাক দেখে যেন চোখ ঝলসে গেল।

দু বোন মিলে চোখে চোখে ইশারাতেই ঠিক করলো যে নিধি কে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবে যে পোশাকটা সুন্দর হলেও ওকে একদমই মানাচ্ছে না।

শুরুটা করলো শম্পা৷ নাকশিটকে নিধির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

“এ মা কি বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে তোমায় নিধি। এত দামি আর সুন্দর একটা শাড়ি যে তুমি পরেছো, সেটা তোমায় দেখে বোঝাই যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কম দামি। তোমার গায়ে একদমই মানায়নি। আর কি মেকাপের ছিরি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে জোর করে গায়ের রং ফর্সা বানানোর চেষ্টা করেছো। ”

হুট করে নিধির হাসি হাসি মুখটা কেমন চুপসে গেল। পিছন ঘুরে তাকিয়ে আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নিল। কই খারাপ তো লাগছে না। বেশ ভালোই তো লাগছে। বাকি রাও তো বলল ভালো লাগছে। তাহলে এই মেয়ে আবার একা এসে কেন বলছে যে ভালো লাগছে না?

নিধি নিজের মনের সন্দেহ দূর করার জন্য জুবাইদা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ফুপি, ভালো লাগছে না আমায়?”

জুবাইদা একবার চোখ গরম করে আগে শম্পার দিকে তাকালেন। শম্পা দেখেও না দেখার ভান করল। খুব একটা পাত্তা দিল না। এমন চোখ রাঙানিতে শম্পা অভ্যস্ত। কবে ওর ফুপি ওর দিকে ভালোভাবে তাকিয়েছে? এটা নতুন না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

জুবাইদা আবারও নিধির দিকে তাকিয়ে গালে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,

“সবার পছন্দ আলাদা মা। তোমার নিজের সাজে তুমি সন্তুষ্ট তো? এতোটুকুই যথেষ্ট।”

জুবাইদার কথা শুনে শম্পা মুখ ভেঙচালো। বলার মতন কথা খুঁজলো। ভাবলো আরো নতুন কি বলে নিধি কে খোঁচানো যায়। মস্তিষ্কে জোর দিল কিন্তু কিছু খুঁজে পেল না। শম্পা কে চুপ করে থাকতে দেখে সিনথিয়া ভাবল এবারে সুযোগটা ওকে কাজে লাগাতে হবে। নিজেই আবার নিধি কে বলল,

“গয়না এতো কম পরেছো কেন ভাবি? তোমার বাপের বাড়ি থেকে না হয় কম গয়না দিয়েছে সেসব আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমাদের বাড়ি থেকে তো আর কম গয়না দেয়নি। সেসব অন্তত পরতে পারতে। কি যে ছোটলোকি কাজ করো না! আমাদের মান সম্মান কিছু রাখলে না।”

জুবাইদা যতই চেষ্টা করেন কথা না বাড়ানোর এই দুটো মেয়ে যেন ততই ওনাকে রাগিয়ে দেয়। কথা বাড়াতে বাধ্য করে। এবারে তিনি সিনথিয়ার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,

“ভদ্রভাবে কথা বলো সিনথিয়া। সম্পর্কে আর বয়সে দুদিক থেকেই নিধি তোমার থেকে বড়।”

জুবাইদার কথায় প্রেক্ষিতে জারা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“কাকে কি বলছো মা। ভদ্রতা শব্দটা ওর ডিকশনারির কোথাও খুঁজেই পাবে না। আর তাছাড়া ওর সাজগোজ দেখছো না। দুই বোনই গা ভরতি সোনার গয়না পরে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নিধি না, ওদেরই বৌভাতের অনুষ্ঠান। আরে কেউ তো নিজের বিয়েতেও বোধহয় এত সাজেনা, যতটা এরা ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে সেজেছে।”

জারার করা অপমানে মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল সিনথিয়া আর শম্পা দুজনেরই। তবে শম্পার মুখ বন্ধ হলেও সিনথিয়ার মুখ বন্ধ হলো না। জারার কথা একদমই সহ্য হয় না সিনথিয়ার। ইচ্ছে করে মুখে ঝামা ঘষে দিতে। খেঁকিয়ে উঠে জারা কে বলল,

“তুমি স্টাইলের কি বোঝো হ্যাঁ? জানো আমার এই শাড়ির দাম কত? আমি দশ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি এটা। এত ভারী কাজ করা একটা শাড়ির সাথে গয়না পরবোনা? বলো আমাদের বেশি সুন্দর লাগছে দেখতে জন্য তোমার হিংসে হচ্ছে।”

জারা হো হো করে হেসে উঠে ফের ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“জারার এখনো এত খারাপ দিন আসেনি যে তোমাদের দুজনকে দেখে হিংসে করবে। ঠিকই বলেছো, এত টাকা দিয়ে শাড়ি কিনেছো যদি ভারি ভারি গয়না না পরো তাহলে শাড়ির দামটা মানুষকে বোঝাবে কি করে তাই না? আর নিধি তোমাকেও বলছি। আসলেও তোমার এত কম গয়না পরা উচিত হয়নি। আরো বেশি গয়না পরলে তবে না তোমায় ছাপড়ি লাগবে দেখতে। তখনই তো মানুষজন তোমার বদনাম করবে। আর তখনই তো তোমার দুই ননদ খুশিতে লাফিয়ে উঠবে। যাও গিয়ে যত গয়না আছে সব পরে নাও। তোমাকে যতক্ষণ না ছাপড়ি লাগছে দেখতে ততক্ষণ তোমার ননদেরা খুশি হতে পারবেনা। আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে খুশি করা তোমার দায়িত্ব।”

এসব ঝগড়া ঝামেলা থেকে সব সময় দূরে থাকে জান্নাত। জারা যেমন কথায় কথায় যৌক্তিক উত্তরগুলো দিয়ে দিতে চায় জান্নাত ঠিক তার বিপরীত। সব সময় চেষ্টা করে যেন কোন ধরনের কোন ঝামেলা তৈরি না হয়। আর যদি ভুলেও ঝামেলা তৈরি হয়ে যায় সেটা কি করে তাড়াতাড়ি সমাধান করা সে আশাতেই থাকে।

বর্তমানে তৈরি হওয়া ঝামেলার একটা খুব ভালো সমাধান এলো জান্নাতের মাথায়। সবার এসব বাক-বিতণ্ডার মাঝে অনেকক্ষণ আগেই দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে গিয়েছিল। খুঁজে খুঁজে গহনকে নিয়ে এলো ঘরে। গহন বাইরে কাজ করছিল। ওকে জোর করে টানতে টানতে নিয়ে এলো ঘরে।

গহনকে ঘরে আসতে দেখেই শম্পা আর সিনথিয়া দুজনে একসাথে চুপ হয়ে গেল। এদিকে জারা তখন ওদেরকে কথা শুনিয়েই যাচ্ছে। ঘরে ঢুকেই জারার এমন রাগী মূর্তিটা ঠিক হজম করতে পারল না গহন। বিচলিত ভঙ্গিতে বলল,

“কি হয়েছে জারা? রাগারাগি করছ কেন ওদের সাথে?”

জারা ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ানো গহনের দিকে তাকালো। গহনকে দেখে বোধহয় জারার রাগ আরো বাড়লো। রাগী কন্ঠে গহনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার মত স্টুপিড কে আমি এই কথাগুলো বলতে চাই না গহন।”

জারার কথাটা শুনে উপস্থিত দুটো মানুষ ফিক করে হেসে ফেলল। আর তারা হলো নিধি আর জান্নাত। গহন আর জারা কে কিছু বলল না। জান্নাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এখানে নিয়ে এলে কেন?”

জান্নাত ইশারায় নিধি কে দেখিয়ে বলল,

“ভাইয়া, বলতো ভাবি কে কেমন লাগছে দেখতে? এখানে দুটো টিম হয়ে গেছে। এক টিম বলছে ভাবিকে ভালো লাগছেনা। আরেক টিম বলছে ভাবিকে মারাত্মক লাগছে। এখন তুমি যেটা বলবে সেটাই হবে। বলো ভাবিকে কেমন লাগছে দেখতে?”

জান্নাতের কথাটা শুনে গহন একবার তাকালো নিধির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে নিধি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। একটু অস্বস্তি হলো। এতগুলো মানুষের মাঝে এভাবে তাকিয়ে থাকলে কি অস্বস্তি হবে না! জান্নাতটাও বোকা। ওরা থাকলে না হয় সমস্যা হতো না। কিন্তু এখানে তো ফুপিও আছে। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না?

তার মধ্যে আবার গহনের ওপরে বিচারের দায়িত্ব দিলো যে ওকে ভালো লাগছে কি খারাপ লাগছ। নিধি তো নিশ্চিত যে গহন নিশ্চয়ই সবার সামনে অপমান করবে। বলবে একদম দেখতে পেত্নীর মতন লাগছে।

তবে নিধির এই সমস্ত ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে গহন বলে উঠলো,

“ভালোই তো লাগছে। ও তো সুন্দরই দেখতে। তাহলে খারাপ লাগতে যাবে কেন? কে বলেছে ওকে খারাপ লাগছে?”

গহনের প্রশ্নের উত্তরটা জারার দেওয়ার ভীষণ ইচ্ছে হলো। ব্যাঙ্গাত্মক গলায় সামনে শম্পা আর সিনথিয়া কে সম্পর্কে দেখিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“কে আবার বলবে? তোমার ছাপড়ি দুই বোন।”

গহন এবার অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো জারার দিকে। ইশারায় জারা কে থামার জন্য আকুতি জানালো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও জারা থামল। আপাতত এখানে তেমন কোন কথা কাউকে বলার সুযোগ দিতে চাইলো না গহন। কমিউনিটি সেন্টারে যাওয়ার জন্য সবাইকে তাড়া দিল।

_________

কমিউনিটি সেন্টারে এত মানুষের ভিড়ে নিধির দুচোখ শুধু খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর মা-বাবা আর ভাইটাকে। কখন যে ওরা আসবে কে জানে। এতক্ষণে এসেও গেছে হয়তো কিন্তু নিধির সাথে হয়তো দেখা করতে আসার সময় পাচ্ছে না। কাউকে যে একটু ডেকে জিজ্ঞেস করবে নিধি যে ওর বাড়ির লোকজন এসেছে কিনা সেটাও পাচ্ছে না। আশেপাশে জারা কিংবা জান্নাত কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

শম্পা আর সিনথিয়াকে দেখতে পাচ্ছে। ওরা তো একটু পরপর এসে নিধি কে নিজের জায়গা থেকে তুলে দিয়ে নিজেরাই বসে ছবি তুলছে। গহনেরও দেখা পাচ্ছে না। উনি তো এখন অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। বাড়িতে তো মানুষের অভাব পড়েছে যে ওনাকেই যেতে হবে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝে আবারো সিনথিয়া নিজের কিছু বান্ধবীদের নিয়ে সেখানে এলো। প্রথমে নিধির সাথে কিছু ছবি তুলল। তারপরে নিধিকে নিজের জায়গা থেকে তুলে দিয়ে নিজেরা বসলো সেখানে।

নিধির নিজেরই অস্বস্তি হলো। খেয়াল করল কিছু মানুষ ওর দিকে বেশ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। হয়তো ওনারাই সিনথিয়ার আচরণে বিরক্ত। কিংবা নিধির এমন শান্ত স্বভাবে বিরক্ত। কিন্তু নিধির কিছু করার নেই। এখন কিছু বললে আবার একটা ঝামেলা হবে। আর এত মানুষের মাঝে ঝামেলা করার কোনো মানেই হয় না। আর যেখানে সিনথিয়ার নিজের কোন আক্কেল জ্ঞান নেই সেখানে নিধি আর কিই বা বলতে পারে।

দূর থেকে বেশ অনেকক্ষণ যাবত গহন ব্যাপারটা খেয়াল করছিল। গহন কাউকে খুব বেশি উপদেশ দিতে পছন্দ করে না। উপদেশ দিতে চায়ও না। কেননা উপদেশ মানুষজন তেমন একটা গ্রহণ করেনা।

প্রথমদিকে তো গহন নিধিকে নিয়ে চিন্তায় ছিল। ভাবছিল কখন না জানি আবার রেগে যায়। তবে খেয়াল করলো নিধি একটুও রাগেনি। মুখে বিরক্তির ভাবও নেই। সিনথিয়া যা শুরু করেছে এখন গহনের নিজেরই বিরক্ত লাগছে। নিজের বন্ধুদেরকে একটু অপেক্ষা করতে বলে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল। একবার ভাবলো সিনথিয়াকে বলবে যেন বারবার এভাবে নিধিকে নিজের জায়গা থেকে তুলে না দেয়। কিন্তু পর মুহুর্তে মনে হলো ও এখন যদি সিনথিয়া কে গিয়ে এই কথাটা বলে বিরাট বড় একটা ঝামেলা হবে।

ঝামেলাটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য গহন নিধির কাছে গিয়ে নিধির হাত ধরে বলল,

“চলো, আমার বন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়ে দেই।”

আজ আবারও এমন মুহূর্তে গহন কে দেখে ভীষণ ভালো লাগলো নিধির। নিজেকে বড় একা একা লাগছিলো। চারিদিকে এত মানুষ অথচ নিধির পরিচিত কেউ নেই, ওর আপন কেউ নেই। গহন এসে হাতটা ধরায় যেন একটা আলাদা স্বস্তি অনুভব করলো। নিধি অন্য হাত দিয়ে গহনের বাহু আঁকড়ে ধরে বলল,

“হ্যাঁ চলুন। এখানে থাকবো না। এখানকার মানুষজন কেমন যেন। আপনার থেকেও খারাপ।”

নিধি গহনের প্রশংসা করলো নাকি খোঁচা দিল ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না গহন। সেই সাথে রেগে যাওয়া উচিত নাকি খুশি হওয়া উচিত সেটাও বুঝতে পারল না। দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান আপাতত এখানেই করতে হলো।

হাত ধরে নিধি কে নিয়ে স্টেজ থেকে নামলো। নিজের বন্ধুদের সাথে নিয়ে গিয়ে আলাপ করিয়ে দিলো। সবাই বেশ আন্তরিক ব্যবহার করলো নিধির সাথে। নিধির মনে হলো গহনের পরিবারের লোকজনের থেকে ওর বন্ধুরা ঢের ভালো আছে।

এদিকে অনুষ্ঠান তখন প্রায় শেষের দিকে। মানুষজন খাওয়া-দাওয়াও শুরু করেছে। এতক্ষণেও নিধির বাড়ির লোকজনের কোন খবর নেই। গহন কল করেছিলে তবে ওদেরকে কলে পায়নি। আরো প্রায় দশ থেকে বিশ মিনিট পর অবশেষে নিধির বাড়ির লোকজনের পা পড়লো কমিউনিটি সেন্টারে।

নিধির দুই চাচা, চাচি, চাচাতো ভাই বোন সবাই এসেছে। তবে নিধি নিজের মা, বাবা আর ভাইকে দেখতে পেল না। অস্থির হয়ে উঠলো নিজের মা-বাবাকে দেখতে না পেয়ে। নিজের চাচা চাচির সাথে কথা বলার ইচ্ছেও হলো না। চাচাতো ভাই বোনদেরকেও তেমন একটা সহ্য হয় না। ভিড়ের মাঝে থেকে আকিবের হাতটা টেনে ধরে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“এগুলোকে কেন সাথে নিয়ে এসেছো? আর আমার বাবা মা কোথায়? আমার ভাই কোথায়?”

আকিবের পাশে ওর মা দাঁড়িয়ে আছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে ওদের দুজনকে। হয়তো চেষ্টা করছে যে নিধি ওর কানে কানে কি বলছে সেগুলো শোনার। আকিব সাবধানতার সাথে নিজেও ফিসফিস করে নিধিকে বলল,

“বড়লোক বাড়ি দেখেছে যে। ওরা না এসে থাকে নাকি! আর তুমি তো জানো বড় আব্বু আসবে না। বড় আব্বু কে একলা রেখে বড় আম্মুও এলো না। সেজন্য নিয়াজকেও আনতে পারলাম না। ওর খেয়াল কে রাখবে।”

নিধি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“তাই বলে আনলে না! তুমি তো ছিলে খেয়াল রাখার জন্য। আর খেয়াল রাখার কি আছে। গাড়িতে এসেছো, গাড়িতে যাবে। কেন আনলেনা আমার ভাইটাকে?”

আকিব অসহায় গলায় বলল,

“আমি কি করতাম বলো। আমার কথা কেউ শোনে নাকি। আমার কথা শুনলে তো তোমার বিয়েটাই হতো না।”

রাগে দুঃখে নিধির কান্না চলে এলো। গাল বেশে দু'ফোটা জল গড়িয়েও পড়লো। আকিব ব্যস্ত গলায় বলল,

“আর কেঁদো না। সাজগোজ নষ্ট হয়ে যাবে। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।”

নিধির সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো আকিবের উপর। সেই সাথে যখন ওর চাচা চাচিকে গহনের পরিবারের লোকদের সাথে হাসতে হাসতে কথা বলতে দেখলো আরো বেশি রাগ উঠে গেল। রাগান্বিত গলায় আকিব কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভেবেছিলাম তুমি অন্তত আমার কষ্ট বুঝবে। আমার ভাইটা কে অন্তত আনা উচিত ছিল। যে করেই হোক আমার বাবা মাকে রাজি করাতে তুমি। কিন্তু তুমিও বাকিদের মতো ওদের রেখে এলে। তোমার সাথেও আর কোন যোগাযোগ রাখব না আজ থেকে।”

কথাটা বলে নিধি সেখান থেকে আবার স্টেজে চলে গেল। চুপচাপ বসে রইল। বুক ফেটে শুধু কান্না আসছে। যখনই চোখের সামনে দেখছে ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে ওর বাবা মার থেকে ওর চাচা চাচির বেশি ভালো সম্পর্ক, ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজনেরা ওর চাচা চাচিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে শরীরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটে উঠছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

দূর থেকে নিধির চাচি খেয়াল করলো নিধি কে। ব্যাপারটা ওনার মোটেই পছন্দ হলো না। একেই তো আসার পর একবারও নিধি ওনাদের সাথে আগবাড়িয়ে কথা বলেনি। তারওপর আবার এখন কাঁদছে। লোকে তো ভাববে যে ওনারা এসেছেন এতে খুশি হয়নি নিধি।

আত্মীয়-স্বজনকে রেখে একাই স্টেজে নিধির দিকে এগিয়ে গেলেন আনিসা। সবাইকে তো আর বোঝানো যাবে না যে উনি নিধির উপরে রেগে আছেন। সে জন্য মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখেই দাঁত পিষে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“সবার কাছে প্রমাণ করতে চাইছিস যে আমাদেরকে তুই কতটা ঘৃণা করিস? কাঁদছিস কেন? কে ম'রে'ছে তোর? বাপ মা তো বেঁচেই আছে, শুধু আসেনি আজকে। কার এত ঠ্যাকা পড়েছে যে তোর ল্যাংড়া বাপকে নিয়ে আসবে।”

“নিধি!”

গহনের কন্ঠটা কানে যেতেই কেঁপে উঠলেন আনিসা। নিধিও হালকা একটু নড়েচেড়ে উঠলো। চেষ্টা করলো চোখের জল আটকানোর তবে আটকাতে পারলো না।

নিধি জানে না কেন তবে গহনকে দেখে যেন চোখের জলগুলো আরো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আনিসাকে পাত্তা দিল না গহন খুব একটা। ওনাকে পাশ কাটিয়ে নিধির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“ঠিক আছো তুমি? কিছু হয়েছে?”

নিধি ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে শুধু দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো কিছু হয়নি। নিধি মুখে যতই বলুক কিছু হয়নি কিন্তু ওর কান্নাই তো গহনের কাছে সবটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। আনিসার বলা কথাগুলো তো গহনের কানেও গেছে। গহন আরেকবার নিধি কে জিজ্ঞেস করল,

“কোন সমস্যা হলে আমায় বলতে পারো। এই ড্রেসে অসুবিধা হচ্ছে? মানুষজনের মাঝে অসুবিধা হচ্ছে?”

নিধি আবারও দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো। গহনের পিছনে দাঁড়ানো আনিসা গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওর কিছু হয়নি বাবা। ও তো আমাদেরকে ছাড়া কখনো থাকেনি। তাই আমাদেরকে দেখে একটু আবেগী হয়ে গিয়েছে। তুমি চিন্তা করো না। আমি দেখছি ওকে। তুমি যাও।”

গহন ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে পিছনে দাঁড়ানো আনিসাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি কথা বলছি তো ওর সাথে।”

কিঞ্চিত অপমানিত বোধ করলেন আনিসা। আপাতত আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলেন না। গহনও নিধি কে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলো না। চুপচাপ নিধির হাত ধরে সেখান থেকে নিয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প