বাসর রাতে নিজের নব বিবাহিতা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সাবধানী বার্তা ছুঁড়লো গহন,
“কখনো যেন না শুনি আমার মায়ের মুখে মুখে তর্ক করেছো তুমি। এই প্রশ্নও যেন কখনো তোমার মাথায় না আসে যে বিয়ের পরেও কেন আমার বোন বেশিরভাগ সময় আমাদের বাড়িতে থাকে। তুমি যতটা সন্তুষ্ট আমার বাড়ির লোককে করতে পারবে ঠিক ততটাই সন্তুষ্ট আমিও হবো।”
ঘোমটার আড়াল থেকে মাথা তুলে নিধি একবার তাকালো নিজের স্বামীর দিকে। বেশ অদ্ভুত লাগলো নিধির ব্যাপারটা।
সবে মাত্র আজ বিয়ে হয়েছে। ফুলশয্যার রাতে এসে ঘরে ঢুকেই এভাবে সাবধান করার কি খুব দরকার ছিল! নিধির তো মনে হলো গহন যেন ওকে হুমকি দিলো। বোঝাতে চাইলো যে গহনের সাথে সংসার করতে চাইলে ওর মা বোনের সাথে ভালো ব্যবহার করতেই হবে। সে ওরা যাই করুক না কেন।
নিধির উত্তরের আশায় অপেক্ষারত ছিল গহন। তবে বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন নিধির থেকে কোন উত্তর পেল না তখন নিজেই আবার বলে উঠলো,
“তোমার সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানার অপেক্ষায় আছি আমি।”
ধ্যান ভাঙলো নিধির। ঘোমটার আড়াল থেকে মুখটা বের করে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন এই কথাগুলো তোলার কি খুব দরকার ছিল? দুজন তো এখনো দুজনকে ঠিকঠাক ভাবে জানতেই পারলাম না, তার আগেই এভাবে আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?”
গহন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“হুমকি কোথায় দিলাম আমি?”
নিধি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“আপনার কথার মাঝে কোথাও হুমকি শব্দটার অস্তিত্ব না থাকলেও আপনার কথা বলার ভঙ্গির মাঝে ছিল। আপনি হয়তো সরাসরি আমাকে বলতে পারলেন না ঠিকই, তবে বোঝাতে চাইলেন যে আপনার সাথে সংসার করতে চাইলে আপনার পরিবারকে সন্তুষ্ট রাখাটা ভীষণ জরুরী। তা এই একই কথাটা আপনার পরিবারকে বলেছেন তো?”
একটু নড়েচেড়ে উঠলো গহন। গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলো,
“একপাক্ষিক বিবেচনা করে কোনো কথা বলিনা আমি। আমার বাড়ির লোককে যা বলার বলেছি, তোমাকেও যা বলার বললাম। তবে আমার প্রত্যাশাটা তোমার থেকে বেশি থাকবে। তুমি আমার স্ত্রী, তোমার প্রতি আমার জোর সব থেকে বেশি।”
“আপনার অধিকার খাটানোটা আমার ভীষণ পছন্দ হতো যদি আপনি প্রথমে ঘরে এসে এই কথাগুলো না তুলে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন যে এই নতুন পরিবেশে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। অধিকার খাটানো তারই সাজে যে পরোয়া করতে জানে।”
গহন যেন একটু হলেও নিজের ভুলটা উপলব্ধি করতে পারলো। সত্যি বোধহয় ঘরে এসে প্রথমেই এই কথাটা বলা উচিত হয়নি। নিধি তো আজ প্রথম এই বাড়িতে এসেছে। এই বাড়ির পরিবেশটাও যে খুব একটা স্বাভাবিক না সেটা গহন নিজেও খুব ভালো করেই জানে। গহনের উপস্থিতিতে হয়তো কেউ কিছু বলবে না, তবে গহনের অনুপস্থিতিতে তো অনেক কিছুই হয়ে যেতে পারে। সেখানে নিধির মন মেজাজ এর অবস্থা না জেনে আগেই এসে ওর মন মেজাজটা আরো খারাপ করে দিলো এই কথাগুলো বলে।
তবে কেন যেন নিজের ভুলটা স্বীকারও করতে পারলো না গহন। হয়তো নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর সামনে মাথা নত করার কথাটা ভাবতেই নিজের ভেতরে থাকে পুরুষ সত্ত্বাটা জেগে উঠলো। ভাবলো আপাতত আর এই নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো।
আলমারি থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বিছানার উপর বসা নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ব্যাগ থেকে জামা কাপড় বের করো। আমি ফ্রেশ হয়ে এলে তুমি ফ্রেশ হয়ে নিও। সারারাত এই ভারি পোশাক পরে ঘুমোনোর কোন প্রয়োজন নেই।”
কথাটা বলে গহন ওয়াশরুমে চলে গেল। ও দরজাটা লাগাতেই নিধি বিছানার উপর থেকে একটা বালিশ নিয়ে ওর দিকে ছুঁড়ে মারল। ইচ্ছে ছিল এই বালিশটা একদম গহনের মুখে মারার, তবে সেটা করলে পরিস্থিতিটা বিগড়ে যেত। সেজন্য পারল না।
বিছানার উপরে পড়ে থাকা ফুলের পাপড়ি গুলো তুলে মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো । বিছানার চাদর, বালিশ সবকিছু এলোমেলো করে ফেলল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে গা থেকে গয়না গুলো খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে বলল,
“জুতো মেরে গরু দান করতে এসেছে। দেখাতে এসেছে আমার প্রতি দরদ উতলে পড়ছে।”
_________
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিছানার এমন বেহাল অবস্থা দেখে চমকে উঠল গহন। মনে হলো কোন চোর বোধহয় চুরি করতে এসেছিলো আর ঘরের এই অবস্থা করে রেখে আলে গেছে। তার থেকেও বড় কথা নিধি কে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। দরজাও তো বন্ধ ঘরের, তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়।
গহন গিয়ে বারান্দায় উঁকি দিল। বারান্দা থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। গহন শব্দ করতে চাইলো না। ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। দেখল নিধি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে কারো সাথে কথা বলছে আর কাঁদছে। গহন চেষ্টা করলো নিধি কি বলছে সেটা শোনার ।
“এটা আমি কোথায় এসে পড়লাম আকিব? এবাড়ির মানুষজন কেমন যেন। যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে সে নিজেই তো কেমন অদ্ভুত। আমি কোনদিনও ওনাকে ভালোবাসতে পারব না। আমাকে হয়তো সারাজীবন বাধ্য হয়েই এই সংসারটা করতে হবে। কিন্তু তাও আমি এই সংসারই করব। আমি বলছি তোমায় কক্ষনো আমি এই সংসার থেকে বের হব না।”
“আকিব” এই নামটা চেনে গহন। নিধির চাচাতো ভাই। বিয়েতে দেখেছে। সব সময় নিধির আশেপাশেই ঘুরেছে। নিধিও যখন অন্য সবার সাথে কথা বলতে একরাশ অনিহা প্রকাশ করছিলো তখনই আকিব এলে নিজ উদ্যোগে কথা বলেছে ওর সাথে। বেশ ভালোই মিল দুজনের মাঝে। এখন আবার নিজের দুঃখের কথাও বলছে। বলছে সংসার করবে অথচ সংসারে কি ঝামেলা হয়েছে সেসব কথা বাইরের মানুষ কে বলছে। মেয়েটা সংসারের নিয়মই জানেনা।
অপর পাশ থেকে আকিব কি বলল সেটা তো শুনতে পেল না গহন, তবে কিছুক্ষণ বাদে নিধি ফের বলে উঠলো,
“মেয়েদের ভালোলাগা, ভালোবাসা, ইচ্ছে, স্বপ্ন কোন কিছুর মূল্য নেই আকিব। তোমার কাছে হয়তো আমার ইচ্ছের মূল্য ছিল। কারণ তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু সব পুরুষ তো তোমার মতন হয় না। সবার কাছে মেয়েদের ইচ্ছের গুরুত্ব থাকেনা।”
চমকে উঠলো এবারে গহন। ভালোবাসে ওই ছেলেটা নিধি কে! নিধিও কি তাহলে ওই ছেলেটাকে ভালোবাসে! নিশ্চয়ই বাসে। সেজন্যই তো দুঃখের কথাগুলো কল করে এই ছেলেকেই বলছে। তবে কি এটাই কারণ সারা বিয়ে জুড়ে নিধির মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও না থাকার!
ভীষণ রাগ হলো গহনের নিজের প্রতি। যদি নিধির জীবনে অন্য কেউ থেকেই থাকতো তাহলে বিয়ের আগে যখন গহন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলো বিয়েতে রাজি কিনা তখন কেন কোন উত্তর দেয়নি। কেন বলেছিলো যে ও বিয়েটা করতে চায়। যদি গহন কে ভালো নাই বাসতে পারবে তাহলে কেন অযথা ওর জীবনে এলো?
গহনের আর সেখানে দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ঘরে চলে এলো। একটু পর নিধি নিজেও ঘরে এলো। গহনকে দেখতেই নিজের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা সুতি শাড়ি বের করে ওয়াশরুমের দিকে যেতে ধরলে পিছন থেকে গহন বলে উঠলো,
“এত রাতে কার সাথে কথা বলছিলে?”
গহন আশা করেছিল যে নিধি মিথ্যে বলবে। হয়তো কোন মেয়ে বন্ধুর অজুহাত দেবে কিংবা মা-বাবা বা ভাইয়ের অজুহাত দেবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। নিধি নির্বিধায় উত্তরে বলল,
“আকিবের সাথে কথা বলছিলাম। আমার চাচাতো ভাই।”
“শুধুই কি চাচাতো ভাই নাকি অন্য কিছু?”
গহনের কথার মানেটা ঠিক ধরতে পারলো না নিধি। কপাল কুঁচকে বলল,
“অন্য কিছু মানে? কি বোঝাতে চাইছেন?”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তখন ভেজা চুল আঁচড়াচ্ছিলো গহন। চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপরে রেখে নিধির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“ঘর থেকে তোমার কথাগুলো শোনা যাচ্ছিল। ওই ছেলেটা তোমায় ভালোবাসে সেই কথাটা আমি শুনলাম। সেজন্য বললাম সম্পর্কটা কি শুধুই চাচাতো ভাই বোনের নাকি এর থেকেও বেশি?”
নিধি দু চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। মনে মনে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে আবারো চোখ খুলল। কন্ঠে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বলল,
“ওহ্ তার মানে আপনার মাঝে সন্দেহ সত্তাটাও প্রবল। শুধু ভালোবাসা শব্দটা শুনেই বুঝে গেছেন যে আমার আকিবের সাথে অন্য সম্পর্ক আছে। তা এতই যখন বোঝেন তাহলে এই স্বাভাবিক কথাটা বোঝার ক্ষমতা আপনার মাঝে নেই যে ভাই বোনের মাঝে ভালোবাসা থাকতেই পারে। আপনি আপনার বোনকে ভালোবাসেন না নাকি সেটাও অন্য রকমের সম্পর্ক?”
গহন রাগী দৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বলল,
“আমি নিষেধ করেছি তোমায় মুখে মুখে তর্ক করতে। আমার অপছন্দ।”
নিধি এবার একটু তেঁতে উঠে বলল,
“তাহলে এমন মেয়েকে কেন বিয়ে করেছেন যে কথা বলতে জানে? বোবা মেয়ে কে বিয়ে করলেই হতো।”
কথাটা বলে নিধি সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। গহনের মনে হলো নিধি যেন ঠাস করে ওর গালে একটা চ'ড় বসালো, এতটাই অপমানিত বোধ করল।
গহন ঠিক করলো এই অসভ্য মেয়েটার সাথে কথাই বলবে না। এর সাথে কথা বলা মানে নিজের সম্মান নষ্ট করা। নিজে গিয়ে বিছানার চাদরটা ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়ল।
বেশ লম্বা একটা সময় নিয়ে নিধি গোসল করলো। ইচ্ছে করেই দেরি করলো। ভাবলো ও দেরি করে বেরোবে আর এর মাঝে যেন গহন ঘুমিয়ে পড়ে।
গোসল শেষে ওয়াশরুমের দরজা খুলে উঁকি দিতেই দেখলো গহন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। নিধির বুদ্ধি তাহলে কাজে লেগেছে।
নিধি খুব সাবধানতার সাথে পা টিপে টিপে বারান্দায় গেল। গামছাটা গ্রিলের সাথে মেলে দিয়ে পা টিপে টিপে আবার ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। ভাবলো চুলটা আঁচড়ে তারপর ঘুমোবে।
চুল আঁচড়ানো শেষে লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে যেই না বিছানার দিকে এগোতে নিল অমনি শাড়ির সাথে পা পেঁচিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল। সেই সাথে হালকা চেঁচিয়েও উঠলো। হঠাৎ করে চেঁচানোর শব্দে গহন হুড়মুরিয়ে উঠে বসলো। ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। অন্ধকারে কোথায় কি হলো সেটা বুঝতেও পারলো না। তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে লাইটটা জ্বালাতেই দেখলো মেঝের উপর পড়ে আছে নিধি। ব্যথায় খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে রেখেছে।
চোখ মেলে তাকিয়ে সামনে গহনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই আগে চোখ মুখের অবস্থা ঠিক করলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইলে আবারো তাল হারিয়ে পড়ে যেতে ধরলে গহন গিয়ে ধরলো। পায়ে আবারো ব্যথা পেল নিধি। মৃদু আর্তনাদ করে উঠতেই গহন ধমকের সুরে বলল,
“একটু কম লাফালাফি করলে কি হয় না!”
নিধি একটু দমে গেল। মিনমিনে স্বরে বলল,
“লাফালাফি করছিলাম না। শাড়ির সাথে পা পেঁচিয়ে গিয়ে পড়ে গিয়েছি।”
“শাড়ি সামলাতে যখন পারো না পরতে কে বলেছে তোমায়?”
কোন উত্তর দিলে না নিধি। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে গহনের আরো বেশি রাগ হলো। আবারো ধমক দিয়ে বলল,
“উত্তর দিচ্ছো না কেন?”
নিধি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“উত্তর দিলে যদি আবার তর্ক করা হয়ে যায়।”
গহন অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“বিয়ের প্রথম দিনে কোন মেয়ে এত কথা বলতে পারে? আমি তো জানতাম অস্বস্তিতে মেয়েদের মুখ দিয়ে নাকি কথাই বের হয় না। তোমায় যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি।”
নিধি আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“একদম চুপ। বিছানায় চলো।”
পা বোধহয় মচকে গেছে নিধির। একা একা হাঁটতে পারল না। তাই গহনই ধরে ধরে বিছানা অব্দি নিয়ে গেল। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে লাইটটা বন্ধ করে নিজে অন্য পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
নিধির একটু অস্বস্তি হচ্ছে। হুট করে একজন পুরুষ মানুষের পাশে এভাবে ঘুমোনো যায় নাকি! অথচ এই লোকটা কি সহজে ঘুমিয়ে গেল। তবে লোকটার একটা স্বভাব ভালো আছে। জোর জবরদস্তি করে স্বামীর অধিকার ফলাতে আসেনি।
একটু পরে নিধিও শুয়ে পড়লো। নিধি কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। ফলস্বরূপ ভেজা চুলগুলো একেবারে আছড়ে গিয়ে পড়ল গহনের মুখের উপর। নিধি তা খেয়ালই করল না।
এদিকে ভেজা চুলগুলো গহনের মুখের উপরে পড়তেই আরেক দফা লাফ উঠে বসলো গহন। নিধি সেসব কিছুই খেয়াল করল না ।
গহন একবার বালিশের উপরে পড়ে থাকা নিধির চুল গুলোর দিকে তাকালো। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছু বলতে পারল না। চুপচাপ চুলগুলো বালিশের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়লো। মনে মনে ভাবতে লাগলো এই মেয়ের সাথে সারাটা জীবন সংসার করবে কি করে। এক রাতেই তো গহনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
__________
গহনের ঘরে বিছানার পাশেই এক বিরাট বড় জানালা। জানালার পাশে শুয়েছে নিধি। সকাল হতে না হতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতরে সূর্যের আলো ঢুকলো। নিধির অভ্যাস একেবারে অন্ধকারের মাঝে ঘুমোনোর। আলোতে ঘুম হয় না। তবুও আজ এই আলোর মাঝেই বেশ অনেকক্ষণ ঘুমোলো। একটুও টের পেল না আলোর উপস্থিতি।
সকাল সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙলো নিধির। চোখ খুলতেই দেখল দুটো বড় বড় চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ মেলে এই দৃশ্যটা খুব ভয়ংকর লাগল নিধির কাছে। এটা কে শুয়ে আছে ওর পাশে? আবার ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কত বড় একটা মানুষ। আদৌ এ মানুষ না কোনো দানব!
নিধি লাফ উঠে বসলো। বিছানাটা একেবারে জানালার ধারে হওয়ায় নিচে আর নামার সুযোগ পেল না। বিছানার ওপরেই দাঁড়িয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠে বলল,
“কে আপনি? আমার বিছানায় কি করছেন?”
গহনের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল। খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছে ওকে। এখনো শুয়ে আছে। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু নিধির বোকামি দেখছে।
এদিকে গহনকে প্রশ্নটা করার পর হঠাৎ করে নিধির খেয়াল হলো এই ঘরে সবকিছুই নতুন। ওর ঘরে তো এই জানালাটা ছিল না। ঘরটাও তো এত বড়ই ছিল না। এতটাই ছোট ছিল যে ঘরে একটু হাঁটার মতন জায়গা ছিল না। তাহলে এটা কার ঘর? এই লোকটাই বা কে?
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে নিধির গতকালের ওর বিয়ের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আরে নিধি তো ভুলেই গিয়েছিল যে ওর বিয়ে হয়েছে গতকাল এই দানবটার সাথে।
ধপ করে আবার বিছানার ওপরে বসে পড়লো নিধি। গহন এবারে উঠে বসে বলল,
“স্মৃতিশক্তি ফেরত এসেছে তাহলে। আসলে মনের মাঝে অন্য কেউ থাকলে স্বামীকে ভুলে যাবে এটাই স্বাভাবিক।”
গহনের এই কথার মানেটা বুঝতে নিধির কিছুটা সময় লাগলো। যখন বুঝতে পারল কথার মানেটা তখন একটু বিরক্ত হলো। এদিকে গহন কথাটা বলে ততক্ষণে নেমে যেতে ধরেছে। নিধি ওর হাত টেনে ধরে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আমার চরিত্রের উপরে কখনো প্রশ্ন তুলবেন না। টুকটাক ঝগড়া ঝামেলা এসব ঠিক আছে। কিন্তু কখনো আমার চরিত্রের প্রসঙ্গ তুলে আমার সাথে ঝগড়া করতে চাইবেন না। অন্য সব অপবাদ আমি মেনে নিলেও এই ব্যাপারটা আমি মানবো না। জীবনে যেই মেয়ে কখনো কোন ছেলে বন্ধু অব্দি বানায়নি আপনি সরাসরি তার চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলতে পারেন না। আশা করছি বুঝতে পেরেছেন।”
কথাটা বলে নিধি আগে আগে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। গহন বিছানায় কিছুক্ষণ বসে থাকলো। নিজেই একবার নিজেকে প্রশ্ন করল যে কোনটা ঠিক। যেটা গহন ভাবছে সেটা নাকি যেটা নিধি বলে গেল সেটা?