বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ২

🟢

নিজের ঘরে ক্রমাগত পায়চারি করছেন আর ঘড়িতে সময় দেখছেন সালমা বেগম। ঘড়ির কাটা গিয়ে তখন ঠেকেছে সাতটা তিরিশ মিনিটে। এদিকে এখনো নতুন বউয়ের ওঠার কোন নাম নেই। রাগে, চিন্তায় তার মাথা ব্যাথা ধরে গেছে।

তার এই চিন্তা আরো বাড়াতে ঘরে প্রবেশ করলো ওনার মেয়ে শম্পা। শম্পার কোলে ওর তিন মাসের ছেলে শাফি। সালমা বেগম কে এভাবে ঘরের মাঝে পায়চারি করতে দেখে আর ওনার মুখ চোখের অবস্থা দেখেই শম্পা আন্দাজ করতে পারলো যে ওনার মাথায় এখন কি চলছে। শম্পার ইচ্ছে করলো ওর মায়ের রাগের আগুনে আরেকটু ঘি ঢালার।

“নতুন বউকে পেয়ে তোমার বড় ছেলের ঘুম তো ভাঙছেই না মা। না নিজে ঘর থেকে বের হচ্ছে, না বউ কে বের হতে দিচ্ছে। আজ মনে হয় ওরা উঠবে না। আর তুমি আশায় আছো নতুন বউ কে দিয়ে রান্না করাবে!”

কথাটা বলে শম্পা তাচ্ছিল্য হাসলো। সালমা বেগম কোন উত্তর দিলেন না। তিনি এখনো ক্রমাগত পায়চারি করেই যাচ্ছেন।

এদিকে সালমা বেগমের থেকে কোন প্রতিক্রিয়া না পাওয়াটা মোটেই পছন্দ হলো না শম্পার। ভেবেছিল ওর মা বোধ হয় এখনই গহনের ঘরের দরজায় গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করবে। তবে উনি তো নিজের মতন পায়চারি করেই যাচ্ছেন। একটু ভাবনা চিন্তা করে শম্পা ফের বলে উঠলো,

“প্রথম দিনেই নতুন বউকে এতটা ছাড় দিচ্ছো, পরে দেখবে মাথায় উঠে নাচবে। যথেষ্ট ঘুমিয়েছে। এখন গিয়ে ডাকো।”

সালমা বেগম মেয়ের দিকের রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত পিষে বললেন,

“আমি কি করবো না করবো সেটা তোমার থেকে শিখবো না। আমি খুব ভালো করে জানি আমায় কখন কি করতে হবে।”

মেয়েকে কথাটা বলে সালমা বেগম গলা উঁচিয়ে নিজের ছোট ছেলের বউ ঋতু কে ডাকলেন। শাশুড়ির গলার আওয়াজ পেতেই রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে এলো ঋতু। হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় বলল,

“হ্যাঁ মা বলুন।”

অন্তঃসত্ত্বা ছেলের বউ কে এভাবে ছুটে আসতে দেখে সালমা বেগম ধমকের সুরে বললেম,

“ছোটাছুটি করছো কেন তুমি? এখন কি তোমার ছোটাছুটি করার সময়?”

ঋতু মাথাটা নামিয়ে নিয়ে বিনম্র গলায় বলল,

“না মা। আমি ছোটাছুটি করছি না। আপনি ডাকলেন সেজন্য একটু তাড়াহুড়াে করে এসেছি।”

ছেলের বউয়ের কাছ থেকে এই সম্মানটুকু পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন সালমা বেগম। ভীষণ সন্তুষ্ট হলেন ছোট ছেলের বউয়ের প্রতি। তবে এখন আদর ভালোবাসা দেখানোর সময় না। আদেশের সুরে বললেন,

“তোমাকে যে বলেছিলাম রান্নার সবকিছু তৈরি করে রাখতে, করেছো?”

“হ্যাঁ মা। সকালের খাওয়া দাওয়া শেষ হলেই নিধি রান্না শুরু করতে পারবে। সময় লাগবে না বেশি। আপনি চিন্তা করবেন না।”

“ওগুলো সব হয় সরিয়ে রাখো নয়তো ফেলে দাও। ও নিজেই সবকিছুর জোগাড় করবে। তারপরে রান্না বসাবে। আর ও যখন রান্না করবে তখন ওর ত্রিসীমানায় যেন তোমাকে কিংবা মিতা কে না দেখি। মিতা কে বলে দিও ঘরদোর মোছা শেষে যেন চলে যায়। আজকের মতন ওর ছুটি।”

ঋতু মিনমিনে স্বরে বলল,

“কিন্তু মা এতগুলো মানুষের দুপুরের রান্না ও একা করবে কি করে? আর তাছাড়া আদৌ ও রান্নাবান্না পারে কিনা সেটাও তো জানিনা।”

সালমা বেগম এবারে খেঁকিয়ে উঠে বললেন,

“সেসব তোমায় দেখতে বলিনি আমি। ও বুঝে নেবে। মিতা কে টেবিলে নাস্তা সাজাতে বলো।”

মুখ ফুটে আর একটা কথাও বলার সাহস হলো না ঋতুর। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।

________

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে শাড়িটা বদলালো নিধি। একটা লাল রঙের জামদানি শাড়ি পরলো। গলায় একটা সোনার চেইন আর কানে একটা ছোট্ট সোনার দুল পরলো। চুলগুলো ঠিক কি করে বাঁধবে কিংবা কিভাবে বাঁধলে ওকে দেখতে সুন্দর লাগবে ভেবে পাচ্ছে না। একবার খোপা করছে, একবার বিনুনি বাঁধছে তো আরেকবার ছেড়ে দিচ্ছে। তবে কোন কিছুতেই ভালো লাগছে না।

এক পর্যায়ে গিয়ে নিধির মনে হলো শাড়ি পরাটাই হয়ত বোকামি হয়েছে। উচ্চতায় নিধি বেশ অনেকটাই ছোট। অন্তত গহনের তুলনায় অনেক ছোট। নিধির ধারণা শাড়ি পরে ওকে মানায় না। শুধু নিধির একারই ধারণা না, অনেকেই ওকে এই কথাটা বলেছে। আর এই উচ্চতা কম হওয়ার জন্য বিয়েতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের পক্ষ থেকেও বেশ ভালো কথাই শুনতে হয়েছে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে গহন বের হলো। আয়নার সামনে নিধি কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু হয়েছে?”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“ফেসবুকে একটা মিমস দেখেছিলাম, খাটো মেয়েদের নাকি লাল শাড়ি পরলে সিলিন্ডারের মতন লাগে। আমাকেও কি তেমন লাগছে?”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ ফসকে হেসে ফেলল গহন। নিধির কানে গহনের হাসির শব্দটা যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালো। গহনকে হাসতে দেখে রাগী গলায় বলল,

“মজা নিচ্ছেন? আসলে নিজে তালগাছের মতন লম্বা হয়ে গেছেন তো সেজন্য এখন হাসছেন। আমার মতন যদি ছোটখাটো হতেন তাহলে বুঝতেন। অবশ্য ছেলেদের এসব খুঁত ধরা হয় না। আমার কষ্ট আপনার না বোঝাটাই স্বাভাবিক। ছেলেদের তো আর কখনো এই কথাগুলোর সম্মুখীন হতে হয় না যে এত খাটো কেন, গায়ের রং কালো কেন, দেখতে ভালো না, বেশি মোটা নয়তো আবার বেশি চিকন। একটা ছেলে যদি দিনের বেলায় চাকরি করে রাতের বেলায় নেশায় ডুবেও থাকে তাও তার কোন দোষ হয় না।”

গহন নিজের হাসি থামিয়ে নিধির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

“সব সময় কথা এত বাড়াতে নেই। মানুষ বাঁচাল বলে। এখন ঘর থেকে বেরোবে। বাইরে আমার পরিবারের লোকজন আছে। ওদের সাথে মুখে মুখে তর্ক করবে না। কেউ যদি কোন কিছু জিজ্ঞেস করে বা তোমারই যদি কোন কিছু বলার হয় তাহলে যতটা পারো সংক্ষেপে সেটা বলার চেষ্টা করবে। আর যতটা সম্ভব কম কথা বলার চেষ্টা করবে।”

গহন নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতেই নিধি বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,

“প্রথম দিন থেকেই আপনার আমার কথা বলা নিয়ে এত সমস্যা কেন বলুন তো? আপনাকে বিয়ে করেছি জন্য এখন কি কখন কি বলবো সেটাও আপনার অনুমতি নিয়ে বলতে হবে? যৌতুক দিয়েছি আমি, অথচ এমন ব্যবহার করছেন আপনি যেন আপনিই আমায় কিনে নিয়ে এসেছেন। আমি যেন আপনার দাস।”

যৌতুকের কথাটা শুনতেই গহন কপাল কুঁচকে বলল,

“যৌতুক! কিসের যৌতুক দিয়েছো তুমি? আমি তো কোন যৌতুক চাইনি।”

নিধি তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“চাননি ঠিকই, কিন্তু সম্মানের ভয়ে, মেয়ের কষ্ট হবে ভেবে আমার বাবা-মা আমাকে যথেষ্ট গয়না দিয়েছে। এই বাড়িতে আসার পর আপনার আত্মীয় স্বজনরা আমাকে ঘিরে গোল করে বসে আমি কি কি গয়না এনেছি সেসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। আমাকে কথা শুনতে হয়েছে যে আমি কেন আরো বেশি গয়না আনলাম না। কেন আমার ঘর সাজানোর জন্য ফ্রিজ, এসি, খাট, আলমারি এসব আনিনি। কেন আমার বাবা-মা তাদের একমাত্র জামাইকে একটা বাইক গিফট করল না। এসবই শুনতে হয়েছে আমায়। অথচ আপনি এই বলে দোষ কাটাতে চাইছেন যে আপনি যৌতুক চাননি।”

গহন বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে নিধির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। এসব আলোচনা কখন হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। গহন তো নিজের পরিবারের লোকজনকে বলে দিয়েছিল যেন এই বিষয়ে কেউ নিধি কে কোন প্রশ্ন না করে। তারপরও এই কাজগুলো করলো কে ভেবে পেলো না গহন।

এদিকে নিধির সাজগোজ করার আর বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে মনের মাঝে রইল না। চুপচাপ মাথায় ঘোমটা টেনে ঘর থেকে বেরোতে ধরলে গহন ওর নাম ধরে ডেকে উঠলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিধি থামলো। পিছন ঘুরে তাকিয়ে কন্ঠে একরাশ অনিহা প্রকাশ করে বলল,

“বলুন।”

কথাটা বলতে যদিও গহনের একটু অস্বস্তি হচ্ছে কিন্তু তারপরও মনে হলো নিধি কে বলা উচিত। তা না হলে বাইরে বেরোনোর পর নিধিকেই আরও বেশি অস্বস্তিতে পড়তে হবে। নিধির দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“বাইরে যেতেই কেউ যদি জিজ্ঞেস করে যে গোসল করেছো কিনা কিংবা চুল কেন শুকনো। তাহলে বলে দেবে গোসল করেছিলে। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে তারপরে বেরিয়েছো কেমন?”

“কিন্তু কেন? মানে আমি গোসল করব কিনা, আমার চুল ভেজা বা শুকনো কেন সেটার কৈফিয়তও এখন আমাকে আমার শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে দিয়ে বেড়াতে হবে?”

গহন জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

“যা বোঝো না সেই নিয়ে অযথা তর্ক করো না। আগেও বলেছি তর্ক করা আমার পছন্দ না। যেটা বললাম চুপচাপ সেটা মেনে চলবে।আর যথেষ্ট বড় হয়েছো তুমি। আমি কেন এই কথাটা বললাম সেটার মানে তোমার বোঝা উচিত ছিল।”

যেহেতু গহন বলল বোঝা উচিত ছিল তার মানে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা নিধির আয়ত্তের মাঝে আছে। নিধি নিজের মস্তিষ্কে একটু জোর প্রয়োগ করলো এটা বোঝার জন্য যে কেন গহন ওকে এই কথাটা বলল। অবাক করার বিষয় হলো একটু ভাবতে না ভাবতেই নিধি বুঝে গেল গহনের কথার মানে। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাও পেল। অস্বস্তিও হলো একটু বলা যায়। তবে সেসব গহন কে বুঝতে দিতে চাইলো না। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে ধরলে গহন ফের বলে উঠলো,

“আরেকটা কথা।”

নিধি থামতেই গহন বলল,

“মানুষের আসল সৌন্দর্য তার ব্যবহারে। আমি কাউকে তার চেহারার সৌন্দর্য দেখে বিচার করি না। তোমার ব্যবহার যত সুন্দর তুমি মানুষ হিসেবে ততটাই ভালো এটা আমি মনে করি।”

গগন কথাটা বলার পর নিধি কয়েক সেকেন্ডের মতন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো। হয়তো অনুধাবন করার চেষ্টা করলো গহনের কথার আসল অর্থটা। অনুধাবন করা শেষে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

গহন নিধির আসল সমস্যাটাই বুঝে উঠতে পারছে না। কেন নিধির মনে এতটা রাগ? কথায় কথায় কেন এতটা তর্ক করছে? এটা কি শুধুই এজন্য যে তর্ক করাই নিধির স্বভাব? নাকি এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে? অন্য কারো রাগ কি গহনের উপরে দেখাচ্ছে? আসল উত্তর কোনটা? এই উত্তরটা জানতেই হবে গহন কে। নয়তো ওদের সংসার কখনো স্বাভাবিক হবে না।

___________

বিজ্ঞাপন

ঘর থেকে বেরিয়ে ডান দিক দিয়ে হেঁটে একটু সামনে গেলেই পরে বসার ঘর। বসার ঘরের পাশেই ডাইনিং রুম। সেদিক থেকে মানুষজনের কোলাহলের আওয়াজ পেয়ে নিধি সেদিকে গেল। গিয়ে দেখল ডাইনিং টেবিলে মানুষজন ভরা।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থমকে গেল নিধি। চেনে সবাইকেই, তবে কারো সাথেই খুব একটা সখ্যতা গড়ে ওঠেনি এখনো। আর না গড়ে তোলার সময় পেয়েছে। সখ্যতা তৈরি করার ইচ্ছেও হয়নি নিধির। এখন গিয়ে কি করবে, কার সাথে কথা বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

একটু পরে সেখানে গহনও এলো। নিধিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

এমনিতে গহন ভীষণ অপছন্দের একজন মানুষ নিধির কাছে। দেখলেই গা পিত্তি জ্বলে যায়। গতকাল রাতের পর থেকে তো আরো বেশি অপছন্দ হয়ে গেছে। সব সময় নিধির উপর এমন অধিকার খাটানো, কথায় কথায় হুকুম করার ব্যাপারটাই বেশি অপছন্দ হচ্ছে নিধির।

তবে এমন পরিস্থিতিতে গহন কে দেখে খুব শান্তি পেল নিধি। মনে হল উত্তপ্ত মরুভূমিতে দিক দিশাহারা পথিক এক বিন্দু পানির দেখা পেয়েছে। সে কি শান্তি! সে কি স্বস্তি!

গহন কে দেখে নিধির মুখে হাসি ফুটে উঠলো। গহন নিজেও কিঞ্চিত অবাক হয়েছে। গহন তো ভাবতেই পারেনি নিধি হাসতেও জানে। নিধি দুহাতে গহনের বাহুটা খাঁমচে ধরে বলল,

“আপনি এসেছেন খুব ভালো করেছেন। আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। এত মানুষকে দেখে ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছে, আমার মাথা ঘুরছে।”

“কিন্তু কেন? তুমি তো যৌথ পরিবারে বড় হয়েছো। তাও মানুষজনে এত এলার্জি!”

নিধি অসহায় মুখ করে বলল,

“ওরা সবাই তো আমার নিজের ছিল। ছোটবেলা থেকেই ওই পরিবেশে বড় হয়েছি। কিন্তু এখানে সবাই তা আপনার আত্মীয়। কার সাথে আমার কি সম্পর্ক সেটাও তো ভুলে গেছি। সবার মুখ চিনি ঠিকই, তবে তাও অস্বস্তি হবে না বলুন?”

“তোমার আবার অস্বস্তি হয় নাকি? আমি তো ভেবেছি এতক্ষণে নিশ্চয় এখানে এসে ঝগড়াঝাটি শুরু করে দিয়েছো।”

এই মুহূর্তে গহনের ঠেস দেয়া কথাটা নিধির একেবারে অপছন্দ হলো। যেই না নিধি একটু নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করেছে অমনি যেন আরো সুযোগ পেয়ে গেছে এই লোকটা অপমান করার। ঠিক এই কারণেই নিধি কাউকে নিজের দূর্বলতা দেখাতে চায় না। সব সময় নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে। এই মানুষটাকে যে কেন নিজের দূর্বলতা দেখালো কে জানে।

তৎক্ষণাত গহনের বাহু ছেড়ে দিল নিধি। ঘোমটাটা ঠিকঠাক করে নিয়ে কঠিন গলায় বলল,

“অযথা ঝগড়াঝাটি করার মেয়ে নিধি না। আসলে আপনি আমায় চেনেন না সেইজন্য এই কথাটা বললেন। আমার অতীত সম্পর্কে যদি আপনি জানতেন, আমার অবস্থান দেখতেন তাহলে নির্দ্বিধায় আপনি বলতে পারতেন এই জীবনে নিধির চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল মেয়ে আপনি আর একটাও দেখেননি।”

ওদের কথাবার্তার আওয়াজ গিয়ে পৌঁছালো শম্পার কানে। দেখলো দুজনে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলছে। শম্পা দুজনকে উদ্দেশ্য করে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“আটটা পর্যন্ত একসঙ্গে থেকেও ফিসফিসিয়ে গল্প করা ফুরালো না তোমাদের! গল্প যখন করারই ছিল ঘরে বসেইই তাহলে করতে। এখানে আসার আর কি দরকার ছিল!”

সবার মনোযোগ গিয়ে পড়লো দরজার কাছে দাঁড়ানো নিধি আর গহনের দিকে। এতগুলো দৃষ্টি একসাথে ওদের উপরে পড়তে এমনিতেই একটু নিধির অস্বস্তি বাড়লো। মাথায় দেওয়া ঘোমটাটা আরেকটু টেনে নিয়ে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো। গহন বোধহয় হালকা একটু আন্দাজ করল নিধির অস্বস্তি হচ্ছে। তাই পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য শম্পাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমাদের নতুন ভাবির অস্বস্তি হচ্ছে। ও বোধহয় একটু চাপা স্বভাবের। তোমরা আগবাড়িয়ে একটু ওর সাথে কথা বলো।”

নিধি বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো গহনের দিকে। এটা কি সত্যি শুনলো! নিধি তো ভেবেছিল গহন ওর বাড়ির লোককেও বলবে যে নিধি ঝগড়ুটে। তবে এ তো কোনো দুর্নামই করলাে না।

গহনের কথা শুনে ওর ছোট বোন সিনথিয়া এগিয়ে এসে নিধি কে নিজের সাথে নিয়ে গেল। গহনের জন্য একটা চেয়ার ফাঁকাই ছিল। সেখানে গিয়ে গহন বসে পড়লো। সালমা বেগম ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিধি মা, গহনের প্লেটে নাস্তা তুলে দাও।”

নিধি জোরপূর্বক হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে গহনের দিকে এগিয়ে গেল। গহনের প্লেটে নাস্তা তুলে দিতে বিড়বিড় করে বলল,

“অসভ্যলোক কোথাকার! বউয়েরও যে খিদে লাগতে পারে সেদিকে কোন খেয়াল নেই। কোন ভদ্রতাই শেখায়নি এই লোককে।”

নিধি বুঝতেও পারলো না যে গহনের কানে ওর বলা কথাগুলো গেল। তবে ভাগ্য ভালো যে আর কারো কানে যায়নি। নয়তো বিয়ের পরের দিনই স্বামীকে এভাবে অপমান করা এবং পারিবারিক শিক্ষার উপর প্রশ্ন তোলার জন্য একটা বিচার সভা বসে যেত। তখন বাড়িতে নিধির বৌভাতের অনুষ্ঠানের আয়োজনের বদলে ওকে আবার বাপের বাড়ি ফেরত পাঠানোর আয়োজন চলতো।

গহন খাওয়া শুরু করার আগে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা, তুমিও বসে যাও।”

একে একে নিজের বোনদেরকেও বলল

তারপরে দৃষ্টিটা নিধির দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“নিধি, তুমিও বসো।”

নিধি কে খেতে বসতে বলার কথাটা পছন্দ হলো না গহনের মা কিংবা ওর বোনেদের। শম্পা আর সিনথিয়া দুজনেই একযোগে সালমা বেগমের দিকে তাকালো। সালমা বেগম ইশারায় ওদের দুজনকে চুপ করে থাকতে বললেন। মেয়েদেরকে থামানো শেষে এবারে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“বাড়ির বউদের আগেই খেতে বসতে নেই বাবা। তোমরা আগে খেয়ে ওঠো, তারপর নিধি খাবে।”

গহন মুখের মাঝে থাকা অবশিষ্ট খাবারটুকু গিলে নিয়ে বলল,

“এখানে তো বাইরের মানুষ নেই। এত নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে না। পরিবারের সবাইই আছে। নিধি, বসে যাও।”

ব্যস সবাই চুপ। আর একটা কথাও সালমা বেগম বললেন না। না মেয়েদেরকে বলতে দিলেন। বরং সালমা বেগম নিধি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“নিধি মা, তুমি বসে পড়ো।”

নিধি একটা বারও নিষেধ করলো না। সঙ্গে সঙ্গে গহনের পাশের চেয়ার বসে পড়লো। খাবার খেয়েছিলো গতকাল সকালে, তাও জোর করে ওর মা মুখে তুলে দিয়েছিল। রাগ করে দুপুরেও খায়নি, রাতেও খায়নি। খিদেয় পেটের মাঝে দুনিয়ার সব ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি শুরু করছে।

খাবার টেবিলে বেশ অনেক কিছুর আয়োজন করা হয়েছে, তবে নিধি নিজের পছন্দমত কিছুই খুঁজে পেল না। আসলে দোষটা খাবারের না, দোষটা নিধির। পৃথিবীতে হাজার পদের খাবার থাকতে নিধি তো খায়ই দুই এক রকমের খাবার। তবুও এটা তো আর নিজের বাড়ি না। তাই মুখ ফুটে কোন কিছু আবদারও করতে পারলো না। যা আছে তাই একটু খেয়ে নিল, তবে পেট ভরল না।

খাওয়া-দাওয়া শেষে গহন নিজের ঘরে চলে গেল। নিধিও পিছন পিছন যেতে ধরলে সালমা বেগম ওকে ডাকলো। নিধি থামলো। সালমা বেগম বেশ আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,

“নতুন বউদের এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠতে নেই মা। তুমি তো এই বাড়ির বড় বউ। সবকিছু তো তোমাকেই সামলাতে হবে। গহন সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে যায়, তোমার ছোট ননদ কলেজে যায়, আমার সকালে ওষুধ থাকে। ঠিকঠাক সময় রান্নাবান্না না হলে তো সমস্যা। শম্পা, ঋতু এরা দুজনেই তো অসুস্থ। ওরা তো কেউ রান্না করতে পারবেনা। তোমাকেই সবটা সামলাতে হবে। আজ তো প্রথম দিন এই বাড়িতে তোমার। কাল বৌভাতের অনুষ্ঠান। পরশু থেকে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রান্না বান্না শুরু করে দেবে কেমন?”

নিধি বাধ্য মেয়ের মতন মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ঠিক আছে মা। আমি এবার থেকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করব। এখন ঘরে যাই!”

সালমা বেগম ফের আদূরে ভঙ্গিতে বললেন,

“ঠিক আছে। এখন ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার এসো। দুপুরের রান্নাটা কিন্তু তোমাকেই করতে হবে।”

নিধি চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে ঘরে এলো। ঘরে এসেই আগে মাথা থেকে শাড়ির আঁচলটা নামালো। এতক্ষণে একটু প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল। এখন তো মনে হচ্ছে নতুন বউ হিসেবে সবথেকে কঠিন কাজটাই হলো ঘোমটা সামলানো।

নিধি বসে বসে একটু বিশ্রাম নেওয়ার মাঝে দেখল গহন শার্ট প্যান্ট পরে একেবারে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেছে। নিধির একটু ইচ্ছে করলো জিজ্ঞেস করতে যে কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু একটা জড়তা নিধি কে আর সেই প্রশ্নটা করতে দিলােনা। তৈরি হওয়া শেষে যাওয়ার আগে আগে গহন নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি খেতে পছন্দ করো তুমি?”

গহনের প্রশ্নটা ঠিকঠাক কানে যায়নি নিধির। নিজেই পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“কি বললেন?”

“বললাম কি খেতে পছন্দ করো তুমি? নাস্তায় তো কিছুই খেলে না। না খেলে ঝগড়া করার শক্তি পাবে কোথা থেকে।”

নিধি চেতে উঠে বলল,

“লাগবে না খাবার। খিদে সহ্য করার অভ্যাস আছে আমার।”

গহন কি ভেবে যেন আর কোন কথা বাড়ালো না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। নিধি ড্যাবড্যাব করে ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।

কি অদ্ভুত মানুষ! নিধি নাহয় রাগ করে একবার বলল কিচ্ছু লাগবে না, তাই বলে মানুষ কি দ্বিতীয়বার আর জিজ্ঞেস করে না? কয়েকদিনের পরিচয়, লজ্জা বলতেও তো একটা জিনিস থাকে। এমনও তো হতে পারে যে নিধি হয়তো লজ্জাতেই বলতে পারেনি। সেটাও কি ওই মানুষটার বোঝার ক্ষমতা নেই? শুধু উচ্চতা আর বয়সই বেড়েছে। কিন্তু মাথার মধ্যে বুদ্ধি নামক বস্তুটা নেই।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প