প্রায় দশ থেকে বারো জনের রান্না করতে হচ্ছে নিধি কে। সাহায্যের জন্য কাজের বুয়া মিতাকে পেয়েছে। যদিও মিতাকেও সাহায্যের জন্য পাওয়ার কথা ছিল না নিধির। তবে সকালে নিধির ব্যবহারে সালমা বেগম সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাছাড়া পরে তার ভাবনায় এসেছে এত মানুষের রান্না নিধি একা করবে এটা যদি গহনের কানে যায় তাহলে ওনার সম্পর্কে একটু বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে গহনের মনে, যেটা তিনি কখনোই হতে দেবেন না।
শেষে বাধ্য হয়ে মিতাকে সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন। যদিও মিতাকেও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে পাঠিয়েছেন যে খুব বেশি কাজ করার দরকার নেই। টুকটাক হাতে হাতে একটু এগিয়ে দেবে। কঠিন কাজগুলো যেন নিধিকেই করতে দেয়।
রান্নাবান্না মোটামুটি সব বেশ ভালোই পারে নিধি। তবে সমস্যা একটাই এত মানুষের রান্না কখনো এর আগে করা হয়নি। আর করলেও পাশে বড় কেউ ছিল দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে আজ কেউ নেই। মিতাকে জিজ্ঞেস করলেও ঠিকঠাকভাবে উত্তর দিচ্ছে না। নিধি তো ভাবল বোধহয় মিতা নিজেও রান্না পারেনা। নিধি তো আর বুঝলো না যে মিতাকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে।
দুপুর তিনটে পার হয়ে গেল তাও নিধির রান্না বান্না শেষ হলো না। এর মাঝে যে শম্পা আর সিনথিয়া কতবার এসে তাড়া দিয়ে গেছে তার কোন হিসেব নেই। সালমা বেগমও বেশ কয়েকবার এসেছেন। তবে তিনি তাড়া দেননি। শুধু বলেছেন সবকিছু ঠিকঠাক করে করার জন্য। ঋতুও এসেছিল কয়েকবার। তবে কোন সাহায্য করেনি। মুখ দিয়ে সাহায্য করার কথা উচ্চারণও করেনি। নিধিও আগবাড়িয়ে কাউকে সাহায্যের জন্য বলেনি। যখন ওকে একা করতে দিয়েছে একাই করবে। কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। নিধির আত্মবিশ্বাস আছে নিজের ওপর যে ও করতে পারবে। আর যদি আত্মবিশ্বাস না থাকতো তাহলে প্রথমেই জানিয়ে দিত সেটা।
সাড়ে তিনটে নাগাদ বাড়িতে নতুন কয়েকজন অতিথি এলো। গহনের ফুপি জুবাইদা আর ফুপাতো দুই বোন জান্নাত আর জারা এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে গহন নিয়ে এলো ওনাদের কে।
ওনারা বাড়িতে আসতেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওনাদের আপ্যায়নের জন্য। সালমা বেগমের মুখ থেকে তো হাসিই সরছে না। ঋতু কে বলল রান্না ঘরে গিয়ে একটু ওনাদের জন্য ঠান্ডা শরবত বানিয়ে আনতে। এও বলল যেন নিজে বানিয়ে নিয়ে আসে।
ঋতু রান্নাঘরে গিয়ে নিজের মতন শরবত বানালো। অন্য পাশে নিধি রান্না করছে। দুজনের মাঝে কোনো কথা হলো না। ঋতু কার জন্য কেনই বা শরবত বানাচ্ছে সেটাও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করল না নিধি। আর না ঋতু বলার প্রয়োজন মনে করলো।
এদিকে আসার পর অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে তারপরেও গহনের বউ এখনো না আসায় ওকে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন জুবাইদা। গহনকে তাড়া দিয়ে বললেন,
“গহন, তোর বউ কোথায়? ওকে একবার ডাক। নাকি আবার আমার সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে?”
“না ফুপি। লজ্জা পেয়ে বসে থাকার মতন মেয়ে নিধি না। আসলে ও কোথায় সেটা আমিও জানতে চাইছি। মা, নিধি কোথায়?”
সালমা বেগম নিধির খোঁজ জানেনই না এমন ভঙ্গিতে বললেন,
“আমি তো জানিনা। হয়ত ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।”
জুবাইদাদের সাথে আনা ব্যাগগুলো তখন ঘরে নিয়ে যাচ্ছিল মিতা। সালমা বেগমের মুখে কথাটা শুনে নিজ উদ্যোগেই গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নতুন ভাবি তো রান্না করে। সেই সকাল থেইকা রান্না করতেছে। ঘাইমা-টাইমা অবস্থা খারাপ হইয়া গেছে গা।”
কথাটা পছন্দ হলো না জুবাইদার। একদিন হলো নতুন বউ হয়ে এসেছে আর আজকেই এতটা খাটাখাটনি করানো একদমই ঠিক হচ্ছে না।
তিনি সালমা বেগম কে কিছু না বলে সরাসরি গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আজকের দিনে কি মেয়েটাকে রান্নাঘরে পাঠানোর খুব প্রয়োজন ছিল গহন?”
“আমি তো নিজেও জানিনা ফুপি ও রান্নাঘরে কি করছে।”
জুবাইদা গম্ভীর গলায় বললেন,
“জানা উচিত ছিল। তোমার স্ত্রী কোথায় কি করছে সেই খবর তুমি রাখবে না? এতটা কেয়ারলেস কিভাবে হতে পারো তুমি? আর তাছাড়া আমি তোমাকে বলেছিলাম নিধিকে নিয়ে এয়ারপোর্ট এসো। ওকে বাড়িতে একা রেখে যাওয়াই তোমার আজ ঠিক হয়নি। আর রেখে গেলেও তোমার মা কে বলে যাওয়া উচিৎ ছিল যেন ওকে দেখে রাখে তাই না?”
গহন অপরাধী গলায় বলল,
“আমি আসলে বুঝতে পারিনি ফুপি। আমি দেখছি।”
গহন নিধি কে খুঁজতে রান্নাঘরে গেল। গিয়ে দেখলো নিধি তখনও রান্না করছে। মিতা একদম ঠিক বলেছিলো, ঘেমে অবস্থা খারাপ। এখনো কপাল বেয়ে টুপটুপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
“নিধি!”
কে ডাকলো সেটা ভাবার সময় নেই নিধির কাছে। তবে এতোটুকু বুঝলো যে হয়তো রান্না হয়েছে কিনা সে জন্যই ডাকছে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আর দশ মিনিট সময় লাগবে। তাহলেই হয়ে যাবে সব। সবাই কে খাবার টেবিলে ডাকুন।”
“রান্নাবান্না রেখে চলো। আর করতে হবে না। একজন তোমায় দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে।”
নিধি এবারেও বুঝলো না যে গহন কথা বলছে। ফের ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
“রান্নাটা শেষ করেই আসছি আমি। আর একটু সময় লাগবে।”
“বললাম তো আর করতে হবে না। বাকিটা অন্য কেউ করে নেবে।”
নিধি এবারে বিরক্ত হলো। আর না দেখে থাকা যাচ্ছে না যে কে এসেছে। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো গহন দাঁড়িয়ে আছে। গহন কে দেখে যে রাগ হলো না তেমনটা না। রাগ তো একটু মনের মাঝে জমে আছেই৷ সেই সকালে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলো। যাওয়ার পর একবার খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলো না যে ওর বউ কেমন আছে, কি করছে। আর এখন এসেছে আলগা দরদ দেখাতে।
নিধি অবশ্য সেসব অভিযোগ করলো না। রেগেমেগেও কথা বলল না গহনের সাথে। বরং খুব মিষ্টি করে হেসে গহনের কথায় আপত্তি জানিয়ে বলল,
“মোটেই না। আমার একটা খুব ভালো গুন আছে জানেন তো আমি কে কেমন সেটা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারি। আর এটাও বুঝে গেছি এ বাড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির মানুষ আছে। এখন আমি রান্নাটা রেখে বাইরে যাব আর যে বাকি কাজটুকু করবে সে সবাইকে বলে বেড়াবে পুরো রান্নাটা সে করেছে। আর তার রান্না আদৌও ভালো কি খারাপ সেটাও আমি জানি না। সুতরাং আমার এই রান্নাটা খারাপ হলে বাকি রান্না গুলোরও বদনাম হয়ে যাবে। আর আজ নতুন এসেই আমি এত বড় একটা বদনাম আমার ঘাড়ে নিতে পারবো না। যদি আপনি আমায় দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারেন যে আমি রান্না ঘর থেকে বেরোনোর পর কেউ এসে আমার রান্নায় হাত লাগাবে না তাহলে আমি আপনার সাথে যেতে পারি। না হলে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।”
গহন বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“আমি তোমায় সংক্ষেপে কথা বলতে বলেছিলাম। এত বাড়তি কথা আমার ভীষণ অপছন্দনীয়। চলো এখন। কেউ হাত দেবে না তোমার রান্নায়।”
নিধি গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে চলুন। যাচ্ছি।”
শাড়ির আঁচলটা কোমরের বাঁধন থেকে খুলে হাতের ওপরে নিল। যেমন ছিল তেমন ভাবেই যেতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরলো। এবারে নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আবার কি হলো?”
গহন পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে নিধির কপালের ঘাম মুছে দিতে ধরলো। নিধি চমকে উঠে মাথাটা একটু পিছন দিকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“কি করবেন?”
গহন উত্তর দিল না নিধির প্রশ্নের। চুপচাপ মুখের ঘাম মুছে গেল। নিধি চুল গুলো হাত খোঁপা করে রেখেছে। ভালোই লাগছে দেখতে, তবে সকালের মতন লাগছে না। গহন নিজেই নিধির খোঁপা খুলে দিল। এতে নিধির ঘাড়ে হালকা একটু স্পর্শ লাগলো গহনের হাতের। নতুন এক স্পর্শের সাথে পরিচিত হতেই নিধির গা শিউড়ে উঠলো। ভালো লাগা কাজ করলো নাকি অস্বস্তি হলো নাকি অন্য কোনো অনুভূতি কাজ করলো নিধি বুঝতে পারলো না। তবে যাই হোক না কেন এই অনুভূতিটা অন্যরকম। একেবারে নতুন নিধির কাছে।
গহন নিধির সামনের চুলগুলো হাতের সাহায্যে ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“যার সামনে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি সে সব বিষয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে। আর আমার বিষয়ে তো আরো বেশি। আমি চাইনা প্রথম দিন দেখেই সে তোমার মাঝে কোন খুঁত ধরুক। আমার কাছে তুমি যেমন একটু বিরক্তিকর আর বেশ অনেকটা বোধগম্যের বাইরে বাকিদের কাছে যেন তেমন মনে না হয়। কাউকে তোমায় নিয়ে কিছু বলার সুযোগ তৈরি করে দেবে না কখনো।”
“তাহলে আরেকটু সময় দিন। ঘরে গিয়ে একটা নতুন শাড়ি পড়ে সাজগোজ করে আসি। ঠোঁটে একটু লাল লিপিস্টিক, চোখে আইলাইনার তারপর আমার বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে যতগুলো সোনার গয়না দিয়েছে সব পরে আসি। কারণ যার সামনে নিয়ে যাচ্ছেন সেও তো আপনার পরিবারেরই লোক। সেও নিশ্চয়ই বাকিদের মতনই হবে। সেও নিশ্চয়ই হিসেব করতে বসবে আমি বাপের বাড়ি থেকে কয় কেজি সোনা এনেছি তাই তো?”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা চাইছি। আর কিছু করতে বলবো না, এভাবেই চলো।”
“ভুল তো করেছেনই। আমায় তো বেশ সুন্দর জ্ঞান দিলেন যেন কাউকে কথা বলার সুযোগ না দেই। অথচ আপনি যদি একটু শক্ত হন আমার ব্যাপারে অন্যদের প্রতি তাহলে আর কারো সাহসই হবে না আমায় নিয়ে কথা বলার। অবশ্য কাকে কি বলছি। যার মানসিকতাই এমন যে বউকে হুমকি ধামকি দিয়ে সবসময় পায়ের নিচে রাখতে হবে, মাথায় তোলা যাবেনা তার থেকে আর কিই বা আশা করা যায়।”
কথাটা বলে নিধি গহনের আগে আগে হাঁটা দিল। ওর পিছন পিছন গহনও গেল। আপাতত আর নিধির বলা কথাগুলো নিয়ে ভাবার সময় পেল না।
বসার ঘরে যেতেই গহন নিধি কে পরিচয় করে দিল জুবাইদার সাথে। নিধির মাথায় তখন ঘোমটা নেই। সালমা বেগম তাড়াহুড়ো করে ছেলের বউয়ের দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“এ কি মা! মাথায় কাপড় নেই কেন? নতুন বউ ঘোমটা দিয়ে থাকতে হয় গুরুজনদের সামনে।”
নিধি তাড়াহুড়ো করে শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথায় দিতে ধরলে ওকে বাধা দিলেন জুবাইদা। সোফা থেকে উঠে এগিয়ে গেলেন নিধির দিকে। নিধি সালাম দিল। সালামের জবাব দিয়ে তিনি আগে মন ভরে নিধি কে দেখলেন।
সামনাসামনি দেখবেন বলে এখনও অব্দি ছবি দেখেননি নিধির। এমনকি ওদের বিয়ের ছবিও দেখা হয়নি তার।
এদিকে জুবাইদা কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিধির একটু ভয় হলো, আবার অস্বস্তিও হলো। ভাবল কখন না জানি আবার কি খুঁত টেনে বের করে। গহন তো বলল উনি নাকি খুঁতখুতে। তবে তেমন কিছুই হলো না। হঠাৎ করে জুবাইদা নিধি কে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“তোমায় জড়িয়ে ধরে এতক্ষনে আমি শান্তি পেলাম। আমাকে চিনতে পেরেছো? গহন বলেছে তোমায় আমার কথা?”
গহন নিজেই বলে উঠলো,
“না ফুপি। এখনো তোমার কথা জানানো হয়নি ওকে। আসলে আমি চেয়েছিলাম তুমি এলে সামনাসামনি পরিচয় করিয়ে দেবো।”
জুবাইদা এবারে নিধিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে ওর গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,
“মাশাআল্লাহ। আমার গহনের পাশে বেশ মানাবে তোমায়। ভারী মিষ্টি দেখতে তুমি। আমি গহনের ফুপি, মানে তোমারও ফুপি।”
নিধি শুধুমাত্র হাসলো। জান্নাত আর জারাও নিজ উদ্যোগেই এগিয়ে এসে নিধির সাথে পরিচিত হলো। এই তিনজন মানুষকেই বেশ পছন্দ হলো নিধির। মনে হলো বাকিদের থেকে আলাদা। আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে নিধি কে নিয়ে তিনি গহনের ঘরে গেলেন। ওদের পিছন পিছন সালমা বেগম, শম্পা আর সিনথিয়াও গেল।
নিধি ঘরে গিয়ে দেখল ওদের ঘরে দুটো নতুন স্যুটকেস রাখা। জুবাইদা সেগুলো নিধি কে দেখিয়ে বললেন,
“এই দুই স্যুটকেসে তোমার জন্য কিছু উপহার আছে মা। আসলে তোমার পছন্দ কেমন, তুমি কেমন রং পছন্দ করো সেসব তো আমি জানি না। তাই আমি নিজের পছন্দ মতই কিনেছি। এরপরের বার তোমার কেমন পছন্দ, কি রং পছন্দ আমায় জানিয়ে দিও। আমি সেগুলোই কিনব। না হলে তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে কিনব। এবার নাহয় ফুপির পছন্দেই পরো এসব কেমন!”
নিধি এবারও আলতো হেসে শুধু মাথা নাড়লো। এদিকে সালমা বেগম আর তার দুই মেয়ের চোখ কপালে উঠে গেছে। দুটো স্যুটকেস ভরতি উপহার দিল। এর মাঝে নিশ্চয় গয়নাগাটিও আছে। আর যেহেতু গহনের ফুপি গহনের বউয়ের জন্য এনেছে কম দামী কিছু তো কোনদিনও দেবে না। হয়তো হীরের গয়নাও আছে। কিংবা তার থেকেও যদি দামি কোন বস্তু থাকে হয়তো সেসবই আছে। নিশ্চয়ই টাকা-পয়সাও দিয়ে রেখেছে। হয়তো বাড়ি গাড়ির কাগজপত্রও আছে। এসব ভেবেই ওনাদের তিনজনের মাথা ঘুরে উঠলো।
এত কিছু দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না সিনথিয়া। জুবাইদার দিকে এগিয়ে গিয়ে নাকে কান্নার সুরে বলল,
“ফুপি, কখনো তো তুমি আমাদেরকে এত উপহার দাও না। সব যদি বড় ভাবিকেও দাও তাহলে আমাদেরকে আর কি দেবে!”
জুবাইদা আলতো হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“গহন হলো আমার ছেলে। আর নিধি আমার ছেলের বউ। আর তোমরা হলে আমার ভাইয়ের মেয়ে। পার্থক্য তো আছেই মা। আমার ছেলে, ছেলের বউ আমার যতটা আপন তোমরা কি আর আমার ততটা আপন হতে পারবে? ঠিক তেমনি আমার ছেলে, ছেলের বউয়ের প্রতি আমার যতটা স্নেহ থাকবে তোমাদের প্রতি তো ততটা থাকবে না।”
এই প্রথম এই বাড়ির কোন মানুষকে সত্যি নিধির ভীষণ পছন্দ হলো। কি সুন্দর সবার সামনে বাকিদের থেকে বেশি নিধি কে প্রাধান্য দিল। খুব আফসোস হলো নিধির এটা ভেবে যে যদি ওর বরটাও এমন হতো তাহলে বেশ ভালোই হতো। দুজনে মিলে সারাদিন সবার মুখে মুখে উচিত জবাব দিত।
_________
খেতে বসে জুবাইদা নিধি কে নিয়েই বসলেন। শুধু নিধি কে না, বাকিদের কেও খেতে বসতে বললেন। তবে সালমা বেগম বসলেন না। আলতো হেসে বললেন,
“নিধি নাহয় বাড়ির নতুন বউ। আমি তো বাড়ির পুরনো বউ। আমাকে তো দায়িত্ব পালন করতে হবে। তোমরা বসো আমি খাবার পরিবেশন করছি।”
কেউই কোন আপত্তি জানালো না। সালমা বেগমকে ওনার কাজ করতে দিল। সালমা বেগম আশা করেছিলেন যে গহন হয়তো ওনাকে বসতে জোর করবে। তবে গহন কি ভেবে যেন তেমন কিছুই বলল না। হয়তো ব্যাপারটাকে সালমা বেগম যতটা গুরুত্ব দিলেন গহন ততটা গুরুত্বই দিল না।
এদিকে খাবার-দাবার নিয়ে বেশ চিন্তায় আছে নিধি। কে জানে রান্না কেমন হয়েছে। এতগুলো মানুষ খেতে বসেছে, যদি না খাওয়া যায় তাহলে তো একটা বদনাম হয়ে যাবে। আরে দানবটা নিশ্চয়ই ঘরে নিয়ে গিয়ে আবারো দশটা কথা শোনাবে নিধিকে। বিয়ের এত জ্বালা নিধি সেসব আগে জানতো না। জানলে বাড়ি থেকে পালিয়েই যেত, তবুও বিয়ে করত না।
নিধি আগেই খাবার মুখে তুলতে পারল না। বাকি সবার প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় রইল। সবার প্রথমে প্রতিক্রিয়া দেখালো শম্পা। একে একে অনেকগুলো পদ খাওয়ার পরে নাক শিটকে বলল ,
“মাংসটা সিদ্ধ কম হয়েছে নিধি। লবনের স্বাদও পেলাম না। আর এতো ঝাল দেয় নাকি কেউ! এদিকে আবার মাছের তরকারিতে মনে হচ্ছে শুধু লবনই দিয়েছো। পোলাও ও ঝরঝরে হয়নি। পানি বেশি হয়ে গিয়েছে। মাছটাও বেশিক্ষণ ভেজেছো মনেহয়। শক্ত হয়ে গেছে।”
নিধির মুখটা শুকিয়ে গেল। নিজের খাওয়ার ইচ্ছাটাও সেই সাথে ম’রে গেল। জুবাইদা একবার তাকালেন নিধির শুকনো মুখটার দিকে। খারাপ লাগলো তার নিধির জন্য। তিনি ইশারায় মেয়েদের কে বললেন প্রশংসা করতে। তবে বাকিরা প্রশংসা করার আগেই গহন জুবাইদা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ফুপি, মনে আছে তোমার, লন্ডনে পড়াশোনা করার সময় তোমার হাতে রান্না খেয়ে আমি একদম অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। দেশে ফিরে আর কারোর হাতের রান্নাই ভালো লাগতো না। আজকে কিন্তু খাবার গুলো খাওয়ার পর মনে হচ্ছে তুমি রেঁধেছো।”
জুবাইদা আলতো হাসলেন। গহনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বাহবাও দিলেন। এবারে একে একে তিনি, তার দুই মেয়ে, শম্পার স্বামী সবাই প্রশংসা করলো নিধির রান্নার। তবে সবাই প্রশংসা করলে কি হবে, শম্পা আর সিনথিয়া মিলে যত রকম ভাবে বদনাম বের করা যায় সব চেষ্টা করলো।
সবশেষে নিধি হিসাব করে দেখলো মাত্র দুজনের রান্না অপছন্দ হয়েছে। বাকি সবার পছন্দ হয়েছে। তাহলে ওই দুজনকে গণনার বাইরে রাখাই যায়।
তবে নিধি একটু আশা করেছিল গহন হয়তো একটু ভালো ভাবে প্রশংসা করবে। কি সব ছাতার মাথা প্রশংসা করলো, আবার নিধির রান্নার সাথে ওর ফুপির রান্নার তুলনা করলো। কে জানে কি বোঝাতে চাইলো। নিধি তো বুঝলো না।