বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭

🟢

নিধি কে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল গহন। নিধি কে সোফায় বসালো। একটা পানির বোতলের মুখ খুলে নিধির দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু নিধি নিল না পানির বোতলটা। নিজের কান্নাও আর কোন মতে আটকাতে পারলো না নিধি। শব্দ করে কেঁদে উঠলো। গহন আর পানির বোতলটা নেওয়ার জন্য জোর করলো না। পানির বোতলটা পাশে রেখে নিধির পাশে গিয়ে বসলো।

বেশ কিছুটা সময় গহন কাঁদতে দিল নিধি কে। কোন প্রশ্নও করলো না নিধি কে। কান্নার কারণটাও জানতে চাইলো না। কেননা গহন নিজেই হয়তো একটু আন্দাজ করতে পারছে কান্নার কারণ সম্বন্ধে। একটু পর নিধি নিজেই ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলো,

“আমার বিয়েতে ওরা আমার বাবা কে আসতে দিল না। নিশ্চয় বাড়িতে অপমান করে রেখে এসেছে। নিশ্চয়ই বলেছে বাবারা এখানে এলে আমার অসুবিধা হবে। সেজন্য বাবাও আসেনি। আমার ভাইটাকেও আসতে দেয়নি। ওর কত শখ ছিল আমার বিয়ে নিয়ে।”

গহন চুপচাপ শুনে গেলে নিধির কথাগুলো। কোন উত্তর দিল না। নিধি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লো। গহন সোফা থেকে উঠে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কারো একটা নাম্বারে কল করলো।

বারান্দায় হুইল চেয়ারে বসে আছেন আযীয আহমেদ। দৃষ্টি তার বাইরের সুবিশাল আকাশের দিকে। মাথার ভিতরে তার ঘুরছে নানান ভাবনা। কে জানে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে এখন কি হচ্ছে। মেয়েটা কেমন আছে। এতক্ষনে তো সবাই নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে। ওনারা যায়নি সেটা দেখে নিশ্চয়ই নিধি কাঁদছে। আবার এমনও হতে পারে হয়তো এতটাই আনন্দের মাঝে আছে যে খেয়াল করার সময়ই পায়নি।

আযীয আহমেদের এসব ভাবনার মাঝেই ওনার বাটন ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। হাঁটুর উপর থেকে ফোন আর চশমাটা হাতে নিয়ে আগে চশমাটা চোখে দিয়ে দেখলেন কে কল করেছে। আজকাল আযীয আহমেদের আরেকটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, হাত কাঁপে। সেজন্য নাম্বারটা বুঝতেও তাকে বেশ ভালোই কষ্ট করতে হলো। তবে যখন দেখতে পেলেন বুঝলেন অপরিচিত নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলেন।

“হ্যালো। কে বলছেন?”

আযীয আহমেদের কন্ঠ পেতেই অপর পাশ থেকে গহন সালাম দিয়ে বলে উঠলো,

“বাবা, আমি গহন কথা বলছি।”

গহন নামটা শুনতেই আযীয আহমেদ নড়েচড়ে উঠলেন। ওনার জামাই যে কল করেছে সেটা ঠিক বিশ্বাসই হতে চাইলো না। হঠাৎ জামাই কলই বা করলো কেন এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিতও হয়ে পড়লেন। উৎকন্ঠিত গলায় বললেন,

“আরে বাবা, তুমি হঠাৎ। সব ঠিক আছে তো? আমার মেয়ে কোথায়?”

“আপনার মেয়ের জন্যই কলটা করা। আপনারা আসেননি কেন আজ? আপনারা না আসায় আপনাদের মেয়ে তো একদম কান্নাকাটি করে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে।”

আযীয আহমদ ইতস্তত গলায় বললেন,

“আসলে বাবা, শরীরটা ভালো লাগছিল না। সেজন্য যেতে পারিনি। তোমার মাও গেল না সেজন্য। তুমি একটু আমার মেয়েটাকে বুঝিয়ো। ওর একটু রাগ বেশি। আমি কথা বললে হয়তো এখন আরো রাগ বাড়বে।”

“আপনি অসুস্থ সেটা জানিয়েছেন নিধি কে? আর ডাক্তার দেখিয়েছেন? এখন কেমন আছেন?”

“এখন ঠিক আছি। আর নিধি কে জানিও না, ও জানলে অযথা চিন্তা করবে। তোমরা আনন্দ করো। আর আমাদের নিয়ে ভেবো না। আমরা ভালো আছি মেয়েকে জানিয়ে দিও।”

গহন বুঝলো আযীয আহমেদ বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি ওদের কথোপকথন শেষ করতে চাইছেন। হয়তো অস্বস্তিতে। এদিকে আযীয আহমেদ যতই চাইছেন জামাইয়ের সাথে তাড়াতাড়ি কথোপকথন শেষ করে দিতে ততই যেন গহন কথা বাড়াচ্ছে। উনি নিধির সাথে কথা বলতে চান না। গহন কে নাহয় মিথ্যে বলে, ভুলভাল বুঝিয়ে নিজের কথা বিশ্বাস করাতে পারবেন। তবে নিধি কে বোঝাতে পারবেন না। মেয়েকে মিথ্যে বলতে গেলেই ধরা পড়ে যাবে।

“বাবা তৈরি হয়ে নিন মাকে নিয়ে। আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন।”

গহন কথাটা বলতেই আযীয আহমেদের ধ্যান ভাঙলো। তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,

“না না বাবা গাড়ি পাঠানোর কোন প্রয়োজন নেই। আমরা অন্য কোন সময় যাব। আজকে আর জোর করো না। আজকে হয়ে উঠবে না যাওয়া।”

“কিন্তু কেন? আপনারা না এলে নিধির মনটা ভালো হবে না। ও তো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।”

“ও তুমি চিন্তা করো না। আমি পরে মেয়ের সাথে কথা বলে ওকে বোঝাবো। কিন্তু আজ আর যাওয়ার জন্য জোর করো না বাবা। কিছু সমস্যা আছে, যে সমস্যার সমাধান হয় না। তুমি আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো। ওকে ভালো রেখো এতোটুকুই আমার চাওয়া। আর তাছাড়া তোমরা তো আজ আসবে। আমাদের আবার যাওয়ার কি প্রয়োজন? এলেই দেখা হয়ে যাবে।”

আযীয আহমেদের কথায় অবশ্য যৌক্তিকতা আছে। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে। একটু পরে তো ওদেরকেই যেতে হবে। আযীয আহমেদের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। জোর করছি না আপনাদের আসার জন্য। তবে আপনি একবার নিধির সাথে কথা বলুন বাবা। ওর ভালো লাগবে।”

জামাইয়ের মুখের উপরে নিষেধ করতে পারলেন না তিনি। গহন নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“কথা বলো তোমার বাবার সাথে।”

নিধি তখনও বসে বসে কাঁদছিল। গহনের কন্ঠটা পেতে মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতন প্রশ্ন করলো,

“হ্যাঁ?”

“বললাম তোমার বাবার সাথে কথা বলো। কলে আছেন উনি।”

গহনের কথাটা বুঝতেই নিধি এক প্রকার ফোনটা কেড়ে নিয়ে কানে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“কেন আসলে না তোমরা বাবা? আর ওদেরকে কেন পাঠিয়েছো? তোমার কি মনে হয় ওদেরকে দেখলে আমার মন খারাপ দূর হবে কিংবা আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়বো? আমার ভালো লাগার কি কোন দামই নেই তোমাদের কাছে? ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিলে, ছেলেকে আমার পছন্দ কি পছন্দ না সেই নিয়ে আমার মতামতটাও জানতে চাইলে না। আজ শুধু চেয়েছিলাম যেন তোমরা আসো। তোমরা এলে কি খুব ক্ষতি হতো? আমার কি একটুও ভালো থাকার অধিকার নেই?”

অপর পাশ থেকে আযীয আহমেদ মেয়েকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“এত রাগ করে না মা। আর জামাই আছে সামনে। কি আজেবাজে কথা বলছিস।”

নিধি রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“তাে আমি কি করবো? যে থাকে থাকুক। আমি তো সত্যি বলছি, মিথ্যে তো বলছি না। সব সময় সবকিছু বোঝার, সব পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলার দায়ভার শুধু আমারই তাই না? কিন্তু আমাকে কেউ বুঝবে না? ওনার আমাকে যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই বলছে, ওনার পরিবারের লোকজনের আমাকে যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই বলছে কই ওনাকে তো কেউ আটকায় না? তুমি একবার ওনাকে বলতে পারবে বুঝেশুনে কথা বলার জন্য? সব দায় শুধু আমারই তাই না? আমি মেয়ে বলে নাকি আমি অসহায় বলে, গরিব বাড়ির মেয়ে বলে, আমার বাবা মায়ের কোন ক্ষমতা নেই বলে? দরকার নেই তোমাদের আসার। কারোরই আসতে হবে না। আজ যখন আসোনি আর কোনদিন আসবেও না এই বাড়িতে। আর না আমি তোমাদের বাড়িতে কখনো যাব। যদি নিধি ম'রেও যায় ওর জানাযায় শরীক হওয়ারও দরকার নেই। ওকে দাফন করার জন্য, ওর কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার জন্যও তোমাদের আসতে হবে না।”

কথাটা বলে নিধি কান থেকে ফোনটা নামিয়ে মেঝের উপরে ছুঁড়ে মারলো। ভেঙে গেল ফোনটা। গহন একবার তাকালো নিজের ফোনের দিকে। তবে একটুও উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেল না। তড়িঘড়ি করে গিয়ে মেঝের উপর থেকে ফোনটা তুললও না। নিধির উপরে রাগারাগিও করল না। মেয়েটা হাউমাউ করে কাঁদছে এখন ওর উপর রাগারাগি করার কোন মানেই হয় না।

গহন চুপচাপ নিধির পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওকে কাঁদতে দিল। এদিকে গহন সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় নিধির কাঁদতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। কিছুটা সময় অসুবিধা নিয়েই কাঁদার পর মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে ফের চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“এর আগে কখনো কাউকে কাঁদতে দেখেননি যে এভাবে তাকিয়ে আছেন? নাকি নিজে কখনো কাঁদেননি? অবশ্য আপনি কাঁদবেনই বা কেন? পড়াশোনা শিখেছেন, নিজের ব্যবসা আছে, নিজে উপার্জন করেন, আপনার পরিবারের লোকজন আপনার কথা শোনে, আপনার ইচ্ছের মূল্য আছে, কেউ কখনো আপনাকে কথা শোনাতে আসেনা। আপনি কাঁদবেনই বা কেন? কান্না তো শুধু লেখা থাকে আমার মতন মেয়েদের কপালে।”

নিধি কথাগুলো বলে আবারও কিছুক্ষণ চিৎকার করে কান্নাকাটি শেষে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালো। গহন চমকে দু কদম পিছিয়ে গেল। হঠাৎ করেই নিধির কান্না থেমে গেল। নিধি দুহাতে খুব ভালোমতো চোখের জল মুছে নিয়ে গহনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চলুন। বাইরে গিয়ে আবার ভালো বউ হওয়ার নাটক করি।”

গহন বুঝে উঠতে পারে না এই মেয়ের সমস্যাটা ঠিক কি। একটু আগেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করছিলো। আবার এখন একেবারে চুপ হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি কি কান্না থামানো যায়? কই গহন তো পারত না।

এদিকে গহনের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে নিধি ফের বলল,

“চলুন।”

“ওয়াশরুমে গিয়ে মুখটা ধুঁয়ে নাও। সাজগোজের অবস্থা খারাপ। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া যাবে না।”

নিধি প্রতি উত্তরে কিছু বলল না। ওয়াশরুমে গিয়ে মুখটা ধুঁয়ে বের হলো। গহন এবারে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলে নিধি এবার ওকে আটকে বলল,

“একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে আপনাকে।”

গহন দুহাত পকেটে গুজে দাঁড়িয়ে বলল,

“বলো।”

“নিয়ম অনুযায়ী আজকে আমাদের আমার বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে আমরা যাব না। জীবনটা তো আমাদের কখনোই নিয়মমাফিক চলে না। তাই এই নিয়মটা পালন করতেই হবে তেমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তারপরও যদি আপনার নিয়ম পালন করার খুব বেশি ইচ্ছে থাকে আপনি যেতে পারেন। আমি যাব না।”

“আর কারণ হিসেবে কি বলবো? কেন যাব না আমরা?”

বিজ্ঞাপন

“বলে দেবেন নিধির যাওয়ার ইচ্ছে নেই। এতোটুকু বললেই আমার বাড়ির লোকজন এমনি বুঝে যাবে কেন নিধির যাওয়ার ইচ্ছে নেই। আর আপনার বাড়ির লোককে আপনি কি বলবেন সেটা আপনার ব্যাপার। তাদের সামনে নিজের বউয়ের দোষ তুলে ধরবেন নাকি সেটাকে আড়াল করার চেষ্টা করবেন সেটা আপনার ব্যক্তিত্ব আপনাকে বলে দেবে।”

কথাটা বলে নিধি গহনকে রেখেই হনহন করে হেঁটে দরজা খুলে চলে গেল। গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আজকাল প্রায় গহনের মনে হয় বেছে বেছে পৃথিবীতে এত মেয়ে থাকতে একটা এটম বো’মে’র সাথে বিয়ে হয়েছে গহনের। যে যেকোনো সময় ফেটে যায়।

__________

স্টেজের উপর চুপচাপ মূর্তির মতন বসে আছে নিধি। এখনো মানুষজন আসছে। ওর হাতে উপহার দিচ্ছে। নিধি সেগুলো চুপচাপ নিয়ে পাশে রেখে দিচ্ছে। উপহার নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না নিধি কে। সবটাই জারা আর জান্নাত দেখছে। মাঝে অবশ্য সিনথিয়া আর শম্পা দুই একটা উপহার নিয়ে গেছে। তবে সেসব নিয়ে নিধির কোন মাথা ব্যথা নেই। জীবনের ঠিক নেই উপহার দিয়ে কি করবে!

হঠাৎ করে নিধির কানে একটা পুরুষলী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধি মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো ওর সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের সবগুলো দাঁত বের করে হাসছে। যেন মনে হচ্ছে তার প্রধান লক্ষণ নিধিকে নিজের দাঁতগুলো দেখানো।

নিধি হা করে আবিদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সম্পূর্ণ অচেনা ছেলেটা নিধির জন্য। কেন এভাবে ও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, ওকে দেখে হাসছেই বা কেন কিছুই মাথায় ঢুকলো না নিধির। ওর পরিচয় জিজ্ঞেস করতেও আলসেমি লাগলো।

নিধি কে নিজের দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবিদ নিজ উদ্যোগে নিজের পরিচয়টা দিয়ে বলল,

“ভাবি, আমি আবিদ। আপনার দেওর মানে গহনের বন্ধু আমি। ওর বেস্ট ফ্রেন্ড।”

নিধি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“গহন কে?”

ভ্যাবাচ্যাকা খেলো আবিদ। ভাবলো আবার ভুল বাড়িতে চলে এসেছে নাকি। না হলে বউ জামাই এর নাম জানবেনা এটা আবার হয়! জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“ভাবি গহন আপনার জামাই। যার সাথে বিয়ে হয়েছে আপনার। আরে ওই যে লম্বা করে, ফর্সা ছেলেটা। মনে নেই?”

নিধি একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“ওহ্ হ্যাঁ মনে পড়েছে। ওই দানবটা। আসলে ভুলে গেছিলাম। আপনি ওনার বন্ধু?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে ওনার কাছে যান। আমার কাছে এসেছেন কেন? কি দরকার? ওনাকে খুঁজে পাচ্ছেন না?”

আবিদের সমস্ত উৎসাহ যেন নিমিষের মাঝে হাওয়া হয়ে গেল। মনে হলো ওর সামনে কোন মানুষ না, ভিনগ্রহের কোন অদ্ভুত প্রাণী বসে আছে। আবিদ বুঝতে পারলো না নিধি জন্মগতভাবেই এমন অদ্ভুত নাকি আজ অনুষ্ঠানে আর বিয়ের চাপে এমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। অবশ্য গহনের বাড়ির যা পরিবেশ যে কোন সাধারন মানুষকে নিমেষের মাঝে অদ্ভুত বানিয়ে ফেলতে পারে। তাই আবিদ আর কিছু মনে করল না। নিধির পাশে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“গহনকে দিয়ে তো আমার আজ কোন কাজ নেই ভাবি। আমি তো আপনার সাথে আলাপ করতে এসেছি। আসলে আপনাদের বিয়েতে আসতে পারিনি, দেশে ছিলাম না। ঠিক সময় ফেরার টিকিটও পাইনি। আজকে দেশে ফিরে সোজা বাড়িতেও যাইনি, এখানে চলে এসেছি।”

নিধি জোর পূর্বক হেসে বলল,

“আচ্ছা। ভালো করেছেন এসে। খেয়ে যাবেন কিন্তু।”

আবিদ যেন স্পষ্ট বুঝতে পারলো নিধির ওর সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে নেই। আবিদও আর আগ বাড়িয়ে কিছু বলার মতন খুঁজে পেল না। অগত্যা স্টেজ থেকে নেমে যেতে ধরলে হুট করে ধাক্কা খেল কারোর সাথে। দুজনেই ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো।

আবিদ বিরক্ত হয়ে তাকালো দেখার জন্য যে কে নিজের চোখ কপালে তুলে হাঁটছিল। তবে সামনে তাকিয়ে যে জারা কে দেখতে পাবে সেটা আশা করেনি। মুহূর্তের মাঝে নিজের সমস্ত বিরক্তিভাব এক ভুলে গেল। ঠোঁটে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি। তবে জারা মোটেও খুশি হলো না আবিদকে দেখে। বিরক্তিকর গলায় বলল,

“দেখে হাঁটতে পারেন না। নাকি মেয়ে দেখলেই ধাক্কা দিতে ইচ্ছে করে। এই জন্য আমার এই দেশটা ভালো লাগেনা। মেয়ে দেখলেই ছেলেরা হামলে পরে, যেন কোনদিন দেখেনি।”

কথাটা বলে জারা চলে যেতে ধরলে আবিদ তাড়াহুড়ো করে ওর সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,

“আরে জারা, আমাকে চিনলেন না?”

জারা একবার আবিদকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালোভাবে দেখে নিয়ে বলল,

“কোন বিখ্যাত মানুষ বলে তো আপনাকে মনে হচ্ছে না।”

“আরে আমি আবিদ। গহনের বেস্ট ফ্রেন্ড। ভুলে গেলেন আমাকে? মনে নেই দেশে থাকতে আমি কত বিরক্ত করতাম আপনাকে। কতবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে। আর আপনি বারবার রিজেক্ট করেছেন। একবার তো চড়ও খেয়েছিলাম। আপনার মনে না থাকলেও আমার বেশ মনে আছে।”

কথাটা বলে আবিদ নির্লজ্জের মতন দাঁত কেলিয়ে হাসলো। সত্যি বলতে জারা যে চেনেনি এমনটা না। চিনেছিল, তবে ইচ্ছে করে এমন ভাব দেখালো যে চিনতে পারেনি। কেননা আবিদ কে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার কোন দরকার নেই।

তবে এখন আবিদ নিজের পরিচয় দেওয়ার পর এমন ভঙ্গিতে কথা বলল যে মনে পড়েছে।

“ও আপনি! তাইতো বলি এমন ছ্যাঁচড়ামো স্বভাব আর কারই বা হবে। তা এত বছরেও আপনার স্বভাব বদলালো না। এখনো ধাক্কাধাক্কি করার অভ্যাস রয়েই গেছে।”

“ছিল না তো এতদিন এই অভ্যাস। তবে আজ অজান্তেই আবার তৈরি হয়ে গেল। শুধু আপনাকে ধাক্কা দেই, আর কাউকে দেই না।”

জারার আর কথা বলার ইচ্ছে হলো না আবিদের সাথে। চলে গেল সেখান থেকে। আবিদ ডাকলো পিছন থেকে তবে সাড়া দিল না। আবিদও তো আর অন্য কোথাও যেতে পারলো না। জারার থেকে এমন অবহেলা, অপমান পেয়েও ওর পিছন পিছন ঘোরা আবিদের পুরনো স্বভাব। যে স্বভাবটা এখনো বদলায়নি।

তবে আর জারার সাথে আপাতত কোন কথা বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই সেখানে গহন চলে এলো। সেই সাথে নিধির পুরো পরিবার। ওদেরকে আসতে দেখেই নিধির মনের ভেতরে নিভে যাওয়া আগ্নেয়গিরির আবার উদগীরণ ঘটল। শুধু সেটা প্রকাশ করতে পারল না।

নিধির ছোট কাকি স্বপ্না এগিয়ে এসে নিধি কে বলল,

“নিধি, যাওয়ার সময় তো হয়ে এলো। চল যাই।”

নিধি কিছু বলে ওঠার আগেই গহন বলে উঠলো,

“আমরা যাচ্ছি না আপনাদের সঙ্গে।”

গহন কথাটা বলতেই নিধির বড় চাচা মুজাহিদ আহমেদ গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কিন্তু কেন বাবা? এটা তো নিয়ম। যেতেই হয়।”

“আসলে আমার অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে গেছে। সেজন্য আমি যেতে পারব না। তাই নিধিকেও পাঠাতে চাইছি না। নিধি, আশা করছি তোমারও কোন আপত্তি নেই?”

নিধি অবাক হলো গহনের এমন কথায়। সেই সাথে একটু খুশিও হলো। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে শুধু সায় জানালাে।

জুবাইদা ভাবলেন নিধি বোধহয় বাধ্য হয়ে গহনের কথায় সম্মতি জানালো। উনি গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“অফিসের কাজ পরেও করা যাবে গহন। আজ যাও। নিধিও নিশ্চয়ই আশা করে বসে ছিল।”

গহন মুখে জুবাইদা কে কিছু বলল না

শুধু ইশারায় থামতে বলল। জুবাইদা বুঝলেন। গহনের ইশারা তাই থেমে গেলেন।

নিধির বাড়ির লোকজনও আর খুব বেশি একটা জোর করলো না। দু-একবার শুধু দায়িত্ববোধ থেকে বলল। হয়তো সেটা বাধ্য হয়ে। নয়তো দেখতে খারাপ লাগে সেজন্য।

যাওয়ার আগে নিধির বড় কাকি আনিসা নিধির প্রতি একটু ভালোবাসা দেখিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল।সবাই ভাবলো বোধহয় নিধি কে উনি ভীষণ ভালোবাসেন। তবে কেবল নিধিই বুঝলো যে উনি কেন নিধি কে জড়িয়ে ধরেছে। এত মানুষের সামনে তো আর জোরে জোরে কোন কিছু বলতে পারছেন না। তাই নিধি কে জড়িয়ে ধরে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পার করেছি। দুদিন পর পর যেন আবার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়ে যাস না জামাইকে নিয়ে। আর নিজের মুখ বন্ধ রাখবি। ভাবিস না এই বাড়িতে তোর জায়গা না হলে আবার গিয়ে আমাদের ঘাড়ে চাপবি। আর আমার ছেলের মাথা মোটেই নষ্ট করার চেষ্টা করবি না। যদি জানতে পেরেছি ওর সাথে এখনো যোগাযোগ রেখেছিস তাহলে তোর সংসারে অশান্তি কি করে তৈরি করতে হয় সেটা আমার খুব ভালোভাবেই জানা আছে। আর আজ না যেতে চাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়ে খুব ভালো করেছিস।”

কথাগুলো বলে ছেড়ে দিলেন তিনি নিধি কে। এখনো ওনার মুখে লেপ্টে আছে খুব সুন্দর একটা হাসি। নিধি শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওনার দিকে। কিছু বলতে পারল না। শুধু ভাবলো মানুষ ঠিক কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প