বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪

🟢

সন্ধ্যের দিকে সিনথিয়া এলো নিধির ঘরে। নিধি তখন চুপচাপ বিছানায় বসে ফোন চালাচ্ছে। বাড়ির অন্যরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। গহন কোথায় আছে সেই খোঁজ নিধি জানে না, জানতেও চায় না। যেদিকে ইচ্ছে যাক। নিধির আশেপাশে না থাকলেই হয়।

ঘরে আসার জন্য অনুমতি নেওয়ার কোন প্রয়োজন মনে করলো না সিনথিয়া। সোজা ঘরের ভেতর চলে এলো। হঠাৎ করে ওকে আসতে দেখে নিধি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। বিরক্তও হলো অনুমতি না নিয়ে আসার জন্য। তবে মুখে কিছু বলতে পারলো না। যতই হোক এটা তো ওর ননদ। দু এক কথা বললে ওরা আবার হাজার কথা শুনিয়ে ছাড়বে। আর এখন এত কথা শোনার মতন ধৈর্য নেই নিধির।

সিনথিয়া বিছানার উপর নিধির পাশে বসে বলল,

“কি করছো ভাবি?”

ব্যাপারটা নিধির কেমন যেন একটু সন্দেহজনক লাগছে। সিনথিয়ার হাসিটাও অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে। ওকে দেখে কেন যেন নিধির মনে হচ্ছে কোন একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে। তবে আগেভাগে কিছু বলল না।

এদিকে নিধির থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সিনথিয়া ফের জিজ্ঞেস করলো,

“কি করছো ভাবি?”

“এই যে তোমার দিকে তাকিয়ে আছি।”

নিধির এমন উত্তরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সিনথিয়া। হুট করেই নিধি আবার হেসে উঠে বলল,

“মজা করছিলাম। আমি তো ফোন দেখছিলাম। তুমি কিছু বলবে?”

সিনথিয়া নিজেও পাল্টা হেসে বলল,

“হ্যাঁ। আসলে ফুপি তোমায় তখন কি কি উপহার দিল সে সব দেখতে এলাম। আর ভাবলাম তোমায় একটু গুছিয়ে দিয়ে সাহায্যও করবো।”

নিধি খুশিই হলো সিনথিয়ার কথা শুনে। এমনিতেই এসব জিনিসপত্র গোছাতে আলসেমি লাগে নিধির। নিজের স্যুটকেস দেখিয়ে বলল,

“আমি আমার বাড়ি থেকে যা জেনেছি ওই স্যুটকেসগুলোতে আছে। ওগুলো গুছিয়ে দাও। আর ফুপি যেগুলো দিয়েছে ওগুলো পরে খুলবো। ফুপি বলেছে আমি যেন একা একা না খুলি।”

আপাতত এতটুকুতেই খুশি থাকলো সিনথিয়া। স্যুটকেস থেকে সবকিছু বের করে গুছিয়ে দিয়ে আবার চলে গেল।

সন্ধ্যের দিকে জুবাইদা এসে নিধি কে তৈরি হতে বললেন। উনি কোথায় যেন নিয়ে যাবেন। যদিও নিধির ইচ্ছে নেই বাইরে যাওয়ার। তবে যেহেতু জুবাইদা বলে গেছেন এত ভালোবেসে তাই ভাবলো যাওয়া উচিত। জুবাইদা আবার বলেও গেছেন যেন সুন্দর করে সাজগোজ করে। যেন ওকে দেখতে একদম নতুন বউয়ের মতনই লাগে।

নিধি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর ভাবলো, শুধু সাজগোজ করলেই কি আর নতুন বউয়ের মতন লাগে! নতুন বইয়ের মতন দেখতে লাগার জন্য স্বামীর ভালোবাসা দরকার, মনে সুখ শান্তি দরকার, একটা নির্ঝঞ্ঝাট সংসার দরকার। এগুলোর কোনটাই তো নিধির কাছে নেই। তাহলে ওকে নতুন বউয়ের মতন দেখতে লাগবে কি করে?

আপাতত এসব ভাবনা বাদ দিয়ে নিধি আবারো একটা শাড়ি পরলো। হালকা কাজ করা বেগুনি রং এর হাফ সিল্ক শাড়ি পরলো।বিয়েতে গহনদের পক্ষ থেকে বেশ দামী দামী শাড়ি পেয়েছে। তবে সেগুলো পড়তে ইচ্ছে করলো না। সবাই কি ভাববে যে বাপের বাড়ি থেকে কিছুই আনেনি। সেই জন্য শ্বশুরবাড়ির দেওয়া জিনিসই পরছে। অযথা আবার নিজের বাবা মাকে ছোট করার দরকার নেই।

একটু সাজগোজও করলো নিধি। গয়না হিসেবে ভাবলো শুধু একটা সোনার ঝুমকো পরবে, যেটা নিধির দাদি দিয়েছে। আলমারির ভেতরে খুঁজতে গেল, তবে পেল না। সম্ভাব্য সব জায়গাতেই খুঁজল কিন্তু তাও নিধি খুঁজে পেল না ঝুমকোটা। পরে মনে পড়লো সিনথিয়া তো সব গুছিয়ে রেখেছে। ও হয়তো জানবে।

সিনথিয়ার ঘরে গেল নিধি। ওর ঘরে তখন সালমা বেগম আর শম্পাও উপস্থিত ছিল। কোন একটা বিষয় নিয়ে বেশ হাসাহাসি করছিল ওরা। দেখে মনে হচ্ছে খুব খুশি।

নিধি এত সবে কান না দিয়ে সিনথিয়া কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সিনথিয়া, তুমি যে আমার সবকিছু গুছিয়ে দিলে আমার একটা সোনার ঝুমকো ছিল। ওটা কোথায় রেখেছো?”

সিনথিয়া একটু মনে করার ভঙ্গিতে বলল,

“কোথায় ভাবি? কোন ঝুমকো তো আমি পাইনি।”

“আরে ছিলো তো। তুমি অন্য গয়নাগুলোও তো রেখে দিয়েছো। ওগুলোর সাথে ঝুমকোটা ছিল। ওই ব্যাগেই ছিল।”

সিনথিয়া ফের মনে করার ভঙ্গিতে বলল,

“না, ছিল না। তুমি অন্য কোথাও রেখেছো।”

“আরে নারে বাবা। অন্য কোথাও রাখিনি। আমিতো ওটা পরিইনি। আর আমি খুঁজে দেখেছি সবজায়গায়। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার সবগুলো গয়না ওই ব্যাগের ভেতরেই রাখা ছিল।”

সিনথিয়ার অভিব্যক্তি একটু পাল্টে গেল। হালকা তেজি গলায় বলল,

“বললাম তো আমি জানিনা। ছিল না ওখানে কোনো ঝুমকো। না থাকলে আমি কোথা থেকে এনে দেবো।”

নিধি এবার নিজেও রাগী ভঙ্গিতে বলল,

“আমি বলছি তো ছিল ওখানে। তুমি একটু মনে করার চেষ্টা করে দেখো অন্য কোথাও রেখেছো কিনা। আমি নিশ্চিত তুমিই ওটা কোথাও রেখে ভুলে গেছো। আচ্ছা, তুমি যে আমার থেকে একটা চুড়ি চেয়ে আনলে ভুলে আবার ওটার সাথে চলে আসেনি তো? একটু দেখোতো।”

“কি বললে তুমি? মানে তুমি কি বলতে চাইছো আমি চুরি করেছি তোমার ঝুমকো? তুমি এত বড় একটা অপবাদ আমায় দিতে পারলে ভাবি? তাই বলে আমাকে চোর প্রমাণ করলে তুমি! মা দেখেছো কি বলছে ভাবি?”

কথাটা বলে সিনথিয়া কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আবার শম্পাও কান্নাকাটি জুড়ে বসলো। বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“কাঁদিস না বোন। ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন কি আর এই বাড়িতে আমাদের সম্মান থাকবে নাকি। আজ চোরের অপবাদ দিয়েছে, কাল হয়তো দেখবি বাড়ি থেকেই বের করে দিচ্ছে।”

বিস্ময়ে নিধির চোখ কপালে উঠে গেল। ও বলল কি আর এরা বুঝলো কি। আচ্ছা সত্যি কি ওরা নিধির কথাটা না বুঝেই এমন করছে নাকি বোঝার পরেও ইচ্ছে করে তামাশা করার চেষ্টা করছে।

এদিকে এত চেঁচামেচি আর কান্নাকাটির আওয়াজে বাড়ির লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে গেল। সিনথিয়া কে এভাবে কান্নাকাটি করতে দেখে গহন ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠলো,

“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?”

সিনথিয়া গহনের দিকে এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“ভাইয়া দেখো, আমি বলছি আমি ভাবির সোনার দুল কোথায় জানিনা। কিন্তু ভাবি আমার উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছে। বলছে আমি নাকি নিয়ে এসেছি। আমি তো ভাবিকে সাহায্য করার জন্য ভাবির জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখো এখন ভাবি আমাকে দোষারোপ করছে।”

গহন বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকালো নিধির দিকে। নিধিও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে গহনের দিকে। পরিস্থিতিটা যেন এখনো ঠিকঠাক নিজের আয়ত্তে আনতে পারেনি নিধি। এদিকে নিধির চুপ থাকার সুযোগ কাজে লাগালো শম্পা। নিজেও কান্নার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

“ঋতু এতদিন হলো আমাদের বাড়িতে আছে। কখনো আমাদের সাথে একটু উঁচু গলায় কথা অব্দি বলেনি। আর তুমি আসতে না আসতেই সোজা চুরির বদনাম দিয়ে দিলে! তুমি বলে দিলেই পারতে নিধি যে আসলে তুমি তোমার বাড়ি থেকে গয়না কম এনেছো। গয়না কম হলে কি আমরা কিছু বলতাম। আমরা তো জানি তোমার বাবা মার অবস্থা সম্বন্ধে। আর এসব কিছু জেনেই তো আমরা তোমাকে এনেছি। আমরা তো জানি তারা কতটুকু কি করতে পারবেন। তোমার বাবা-মা গয়না দেয়নি সেই কথা লুকোনোর জন্য তাই বলে আমার বোনের নামে চুরির অপবাদ দেবে! এটা ঠিক করলে না তুমি।”

গহন আসলে কি করবে, কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। গহন অপেক্ষায় আছে নিধির কিছু বলার। এদিকে নিধি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই মেয়ে তো চুপ থাকার কথা না। তার মানে কি সত্যি অপরাধটা নিধিই করেছে? সেজন্যই কি চুপচাপ আছে?

“নিধি কি বলেছো তুমি সিনথিয়াকে?”

নিধি শুধু হা করে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কেন যেন কিছু বলতে পারলো না। অন্যান্য সময় যে মেয়েটার মুখ দিয়ে খই ফোটে প্রয়োজনের সময় সেই মেয়েটা একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। গহন খুব করে চাইলো নিধি কিছু বলুক।তবে নিধি কিছুই বলল না। নিধি কে চুপ করে থাকতে দেখে গহন এবারে কিঞ্চিত রাগী গলায় বলে উঠল,

“কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো আমি। কি চুরি হয়েছে তোমার? আর বাড়ি থেকে চুরি হওয়ার প্রশ্নই বা আসছে কি করে? আর যদি কিছু চুরি হয়েও থাকে সেটা তুমি সবার আগে আমায় বলবে তো। সরাসরি এসে সিনথিয়া কে চোরের অপবাদ দিচ্ছো কেন? আমার বোন সম্বন্ধে কি জানো তুমি? কতটুকু চেনো তুমি ওকে? ও তো কখনো জিজ্ঞেস না করে ওর ভাইয়ের কোন কিছুতেও হাত দেয় না। সেখানে সরাসরি তোমার একটা সোনার কানের দুল চুরি করবে! মাথা ঠিক আছে তোমার? তুমি হয়তো নিজেই ঠিক রাখতে পারোনি বা হয়ত হারিয়ে ফেলেছ। নিজের দোষ অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা করো না।”

খুব কঠোরভাবে গহন কথাগুলো বলল। শুনে মনে হলো সিনথিয়াই ওর নিজের, নিধি কেউ না। নিধির যেন এই বাড়িতে কোন মূল্যই নেই। আশেপাশে তাকিয়ে একটা মানুষকেও নিধির নিজের বলে মনে হলো না। সবাই কেমন ক্ষোভের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কোন দোষ না করেও যেন নিধি আজ অপরাধী। সবথেকে বেশি অপরাধী তো নিধি নিজের কাছে হলো, যে এমন প্রয়োজনের মুহূর্তে একটা কথাও বলতে পারল না। এমনকি নিজের ভুলটা বুঝতে পারা সত্ত্বেও এখনো কিছু বলতে পারছেনা। আসলে কি বলবে, কি বলা উচিত সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। চুপচাপ নিজের মাথা নামিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।

নিধি কে নীরব থাকতে দেখে গহন ভাবলো সত্যি বোধহয় অপরাধটা নিধিরই। না হলে তো এই মেয়ে চুপ থাকতো না। অন্তত কান্না তো মোটেও করত না। তার মানে সত্যিই অপরাধটা নিধিরই। আর এখন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে শাস্তির ভয়ে হয়তো কাঁদছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গহনের নিধি কে অপরাধী মনে হলেও জুবাইদার তা মনে হলো না। জুবাইদা নিধির কান্নার পেছনে অন্য কোন কারণ খুঁজে পেলেন। এগিয়ে এসে এক হাতে নিধি কে আকড়ে ধরে গহন কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,

“যথেষ্ট হয়েছে গহন। নিধি কি এখনো কিছু বলেছে যে তুমি সমানে ওকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছো?”

“আমি তো সুযোগ দিয়েছিলাম ওকে ফুপি। ও কিছু বলতে পারলো না কেন?”

“তার মানে বুঝে নাও মেয়েটা কে তোমরা ঠিক কতটা অস্বস্তির মাঝে ফেলেছো যে লজ্জায় মাথা তুলে তাকিয়ে ঠিক-ভুল জানাতে পারছেনা তোমাদের। সিনথিয়া আর নিধি দুজনেই তোমার আপন। অথচ তুমি একজনকে আগলে আছো। আর অন্য জনকে অপরাধী বানানোর চেষ্টায় নেমেছো। তাহলে মেয়েটা তোমাকে বলবে কি করে।”

গহন আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে জুবাইদা হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“থাক। আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। নিধি, ঘরে চলো মা।”

জুবাইদার আগেই নিধি দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। জুবাইদা যাওয়ার আগে আবারো গহন কে উদ্দেশ্য করে রাগী গলায় বললেন,

“নিজের পরিবারকে ভালোবাসা ঠিক আছে, তবে অন্ধ হয়ো না। আর যদি সব সময় এক পাক্ষিক শুনেই বিচার করার হয় তাহলে বিয়ে করাটা তোমার উচিত হয়নি। কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের সাথে থেকে থেকে আমার মনে হচ্ছে তোমার বিবেচনা বোধও হারিয়ে গেছে।”

________

ঘরে এসেই নিধি আগে নিজের দাদির নাম্বারে কল করলো। ফোনটা রিং হয়ে গেলে কিন্তু তিনি কলটা রিসিভ করলেন না। বাধ্য হয়ে এবার নিধি নিজের মায়ের নাম্বারে কল করল। কয়েকবার রিং হতেই নীলা ফোনটা রিসিভ করলেন।

মেয়েকে কল করতে দেখেই তার মনের মাঝে অদ্ভুত ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে বিয়ের পরের দিন তো মেয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকবে। ওনাকে হয়তো কল করার সময়টুকু পাবে না। তাহলে এই ভর সন্ধ্যেবেলা যে কল করলো কোন কি সমস্যা হলো?

ফোনটা ধরে আগেই তিনি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“সব ঠিক আছে তো মা? কোন সমস্যা হয়নি তো ওদিকে?”

নিধি তখনও কাঁদছিল। ইচ্ছে করলো সব বলে দিতে। একটু অভিযোগ করতে ইচ্ছে করলো। তবে করতে পারল না। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে আগে নিজের কান্না থামালো। নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিল, স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। তারপরে আবারও ফোনটা কানে ধরে স্বাভাবিক গলায় নীলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“না মা, কিছু হয়নি। আসলে আমি বলছিলাম দাদি যে আমাকে সোনার ঝুমকোটা দিয়েছিল ওটা কি আমার ব্যাগে দিয়েছিলে তুমি? নাকি বাড়িতেই আছে?”

“দিয়েছি তো তোকে। আমি নিজে গুছিয়ে দিয়েছি সব তোর ব্যাগে। কেন? পাচ্ছিস না?”

“না, আমি আসলে খুঁজিইনি এখনো। জেনে নিলাম তোমার থেকে যে কোথায় আছে। ভাবছিলাম ওটা পরবো তাই।”

নীলা আরো কিছু বলতে চাইলেন তবে তার আগেই নিধি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনটা কেটে দিল। মেয়ে বলল ঠিকই যে কিছু হয়নি কিন্তু তারপরও কেন যেন নীলার মনটা অস্থির হয়ে উঠলো। আসলে মায়ের মন তো। মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা হতেই থাকে। তার উপরে আবার মেয়ে এখন শ্বশুর বাড়িতে গেছে। বিয়েটাও তো মেয়ের ইচ্ছামতো হয়নি। কে জানে মেয়েটা ভালো আছে কিনা!

এদিকে মায়ের সাথে কথা বলার পর নিধি আরো নিশ্চিত হয়ে গেল যে কানের দুলটা তাহলে ওই ব্যাগেই ছিল আর নিধি এখন এই ব্যাপারেও নিশ্চিত যে কানের দুলটা সিনথিয়াই নিয়েছে। আর যদি সত্যি ও এমন কিছু না করে থাকে তাহলে তখন অযথা কান্নাকাটির নাটকটা করত না।

কিন্তু কাকে বোঝাবে নিধি এই কথাটা? যেই মানুষটাকে নিধি আপন ভাবতো সেইতো বুঝলো না ওকে। আর কাকে বিশ্বাস করাবে! কিভাবেই বা বিশ্বাস করাবে! সবাই নিশ্চয়ই ভাবছে নিধিই খারাপ। নিধিই অযথা অপবাদ দিচ্ছে। অথচ কেউ এটা জানতেও পারলো না যে নিধি একবারের জন্যও চুরি শব্দটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেনি।

এসব ভাবতে ভাবতে নিধি আবারো কেঁদে উঠলো। ওর কান্নার মাঝে ঘরে জুবাইদা প্রবেশ করলেন। বিছানায় এসে নিধির পাশে বসে আদুরে ভঙ্গিতে বললেন,

“কাঁদে না মা। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। গহনের সাথে কথা বলে সবটা ঠিক করে নাও।”

নিধি ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“কি কথা বলব? দেখলেন না ফুপি আমার থেকে কোন কিছু না শুনেই উনি কেমন আমাকে অপরাধী বানিয়ে দিল? আপনিও নিশ্চয়ই সিনথিয়ার কথাই বিশ্বাস করেছেন তাই না? সিনথিয়া তো আপনার আপন, আমিতো পর।”

জুবাইদা এবার দুহাতে আগলে নিলেন নিধিকে। একটু স্নেহ পেতেই নিধির কান্নার বেগ আরো বাড়লো। এখন জুবাইদা কে নিধির খুব কাছের মনে হলো। ওনাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আমি একবারের জন্যও চুরি শব্দটা মুখ দিয়ে বের করিনি। সন্ধ্যায় সিনথিয়া এসে আমার জামা কাপড় সহ সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছে। আমার কানের দুলটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না জন্য শুধু ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কোথাও রেখেছে কিনা। তারপর ওকে আমি চুড়ি দিয়েছি। বলেছিলাম যে ভুলে ওই চুড়ির সাথে আবার কানের দুল চলে এসেছে কিনা দেখতে। তারপরেই ও কেমন চেঁচামেচি শুরু করে দিল। আর আপনার আদরের গহন আমাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে বোনকে আগলে নিল। আর আমাকে বানালো অপরাধী।”

জুবাইদার আর বুঝতে বাকি রইলো না আসল ঘটনাটা কি। এইসব ঘটনা নিধির জন্য নতুন, জুবাইদার জন্য মোটেও নতুন না। উনি বুঝতে পারছেন আসলে ঘটনাটা কি ঘটেছে। তবে নিধি কে তো এখন সেই সবটা বলতে পারলেন না। আগেই নিধির মনে ওদের প্রতি ক্ষোভ জন্মাতে পারে এমন কোন কথা বলা যাবে না। মেয়েটাকে তো এই বাড়িতে, এই মানুষগুলোর সাথেই সংসার করতে হবে।

তিনি নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফের আদূরে ভঙ্গিতে বললেন,

“আমি বুঝতে পেরেছি। আসলে আমার মনে হয় একটা ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছে। তুমি চিন্তা করো না। আমি গহন কে বুঝিয়ে বলব।”

নিধি জুবাইদা কে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“আমি জানি ফুপি আমার মা-বাবার সামর্থ্য হয়তো খুব সামান্য। কিন্তু তারা আমাকে যা দিয়েছে সেটা তাদের সামর্থের বাইরে গিয়ে দিয়েছে। আমি কোন পরিস্থিতিতে বড় হয়েছি, কোন পরিস্থিতিতে আমি বিয়েটা করতে রাজি হয়েছি এসব আপনারা জানেন না। আপনারা বড়লোক, আপনারা বুঝবেন না আমার কষ্ট। তাই বলে এই অপবাদটা দেবেন না ফুপি যে আমি আমার বাপের বাড়ি থেকে কোন কিছু আনতে পারিনি সে কথাটা লুকোনোর জন্য চুরির অপবাদ দেবো। এটা আমার শিক্ষা না। আমার বাবা-মা আমাকে যে সামান্য জিনিস দিয়েছে আমি সেটাই গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে বলতে পারি। আমার এটা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে লাখ লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে দেওয়ার সামর্থ্য আমার বাবা মায়ের নেই।”

জুবাইদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একদিন হলো মেয়েটার বাড়িতে এসেছে। তার মাঝেই ঝড় বয়ে যাচ্ছে মেয়েটার উপর দিয়ে। তবে তিনি হতাশ হচ্ছেন বারবার গহনের উপর। গহনের থেকে তিনি এমন অবিবেচক আচরণ আশা করেননি।

দরজায় দাঁড়িয়ে গহন শুনলো নিধি আর জুবাইদার কথোপকথন। তবে গহনের উপস্থিতি নিধি আর জুবাইদা টের পায়নি। নিধি কথা বলার পুরোটা সময় গহন খুব ভালোভাবে ওকে পর্যবেক্ষণ করলো। নিধির চোখ দুটো মিথ্যে বলছে না। নিধির কান্নাটাও মিথ্যে না। মিথ্যে বললে তো অন্তত গলাটা কাঁপতো। অন্তত জুবাইদার চোখে চোখ রেখে মিথ্যে বলতে পারত না নিশ্চয়ই।

তবে এই মেয়ে যদি সত্যি বলে থাকে তাহলে তখন কথা বলল না কেন? প্রয়োজনের সময় কথা না বলে অন্য সময় যদি কথা বলে তাহলে তো কাজ হবে না তাই না?

গহন চলে যেতে ধরলো। দেখল ওর পিছনে জারা দাঁড়িয়ে আছে। গহন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“তুমি!”

গহন হাসলেও জারার মুখে হাসির ছিঁটে ফোটাও দেখা যাচ্ছে না। বরং দেখে বোঝা যাচ্ছে রেগে আছে। আর রাগটা যে গহনের ওপরেই সেটাও গহনের বুঝতে বাকি রইল না।

“তুমি তো তোমার পরিবারকে খুব ভালোভাবে চেনো গহন তাই না? কে কি করতে পারে সেসব তোমার খুব ভালোভাবেই জানা।”

গহন আবারও একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ চিনি তো। কি বলতে চাইছো?”

“সবকিছু জেনেও না জানার ভান করার অভ্যাসটা ভীষণ অসহ্যকর। তুমি কি জানো তোমার পরিবারের থেকে তুমি বেশি অন্যায় করছো নিধির সাথে? যদি সত্যি কথা শোনার সৎ সাহস না থাকে তাহলে সেটা মুখের ওপর জানিয়ে দাও। নিধি কে বলো যে তুমি সব সত্যি জানো কিন্তু মানতে নারাজ। এভাবে চুপচাপ আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মনের মাঝে সন্দেহ তৈরি করার তো কোনো মানে হয় না।”

“আমার প্রশ্নের নিধি কোন উত্তর দেয়নি। আমি কি করতাম ওখানে? যদি কোন সমস্যা হয়ে থাকে ওর আগে ব্যাপারটা আমাকে জানানো কি উচিত ছিল না? সরাসরি যদি এভাবে কাউকে গিয়ে চোর অপবাদ দেয় তার তো সম্মানে লাগবেই। এটাই তো স্বাভাবিক।”

জারা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আত্মসম্মান তাও সিনথিয়ার! শব্দ দুটো একসঙ্গে মানায় না। আর চোর কে চোরই বলতে হয়।”

গহন কিছু বলে উঠতে ধরলে জারা হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“প্লিজ গহন! সব সময় নিজের পরিবারের হয়ে ওকালতি করতে এসো না। মানায় না তোমায়। তোমার ব্যক্তিত্বটা এমন হয়ে গেল কি করে বলোতো? তোমাকে আজ সেই গহন লাগছে না যাকে আমি চিনতাম। তোমাকে দেখে আজ মিসেস সালমার ছেলে বলে মনে হচ্ছে আমার।”

গহন আলতো হেসে বলল,

“আমি তো ওনারই ছেলে।”

“আসলেই তুমি ওনার ছেলে হয়ে গেছো। একেবারে আস্ত একটা ইডিয়েট।”

কথাটা বলে জারা ঘরে ঢুকে গেল। গহনেরও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছে হলো না। সে নিজেও চলে গেল সেখান থেকে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প