আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো সাবিতের। কোন উদ্দেশ্য ছিল না এত সকালে ঘুম থেকে ওঠার। কিন্তু তারপরও ঘুম ভেঙে গেল। গতকাল রাতের একটা কাজ সাবিতের বাকি রয়ে গেছে। সেজন্য হাতমুখ ধুঁয়ে সবার আগে এলো নিধির ঘরে।
নিধি তখন ঘরেই আছে। বিছানা ঠিক করছিলো। সাবিত আগের দিনের মতন আজ আর হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল না। বরং দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঘরে থাকা নিধির থেকে ভেতরে আসার জন্য অনুমতি চাইলো।
“ভাবি, ভিতরে আসতে পারি!”
হুট করে একটা পুরুষালী কণ্ঠস্বর পেয়ে নিধি একটু চমকালো। এই বাড়িতে ছেলেদের মাঝে এক সাবিতই রয়েছে যার সম্পর্কে নিধি ভাবি হয়। তারমানে সাবিত ই ডাকলো। তাও আবার ভিতরে আসার জন্য অনুমতি চাইলো। নিধি কি ঠিক শুনলো নাকি ভুল শুনলো। নাকি সাবিতেরই কোন অসুখ বিসুখ হয়েছে। নাহলে হঠাৎ করে এত ভদ্র হয়ে গেল কি করে।
নিধির এসব ভাবনার মাঝে ফের সাবিতের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“ভাবি, আছো? একটু দরকার ছিল। আসতে পারি কি?”
ধ্যান ভাঙলো নিধির। তড়িঘড়ি করে বলল,
“হ্যাঁ আছি। আসুন।”
অনুমতি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সাবিত ঘরে এলো। এর আগের দিনের মতো আজকে আর মুখে হাসি লিপ্টে নেই। বরং মুখ দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছুর জন্য হয়ত লজ্জিত। আজেবাজে কোন কথা তুলল না সাবিত। নিধির সাথে ভাব জমানোর প্রসঙ্গটাও তুলল না। নিধির থেকে বেশ অনেকটা দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
“আসলে ভাবি আমি বুঝতে পারিনি যে আমার ব্যবহারে তোমার খারাপ লাগবে। তুমি আসার আগে ভাইয়ার ঘরে কখনো অনুমতি নিয়ে আসার প্রয়োজন হয়নি। এই বাড়ির কোন ঘরেই অনুমতি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না আমার। সেজন্য আসলে ভেবেছিলাম এই ঘরে এলেও কিছু হবে না। আসলে আমার মাথাতে আসেনি যে আমি এভাবে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লে তুমি অস্বস্তিতে পড়তে পারো। বাট ট্রাস্ট মি ভাবি, আমার তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলার কিংবা অসম্মান করার কোন উদ্দেশ্যই ছিল না। তুমি ভাইয়ার থেকে শুনে দেখো আমি খুব মিশুক স্বভাবের। প্রথম দেখাতেই তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। তুমি আমার একমাত্র ভাবি। তোমার সাথে একটু বন্ধুত্ব করব না বলো?”
হঠাৎ করে সাবিতের এই রূপ দেখে নিধি তাজ্জব বনে গেছে। তারমানে গহনকে কথাটা বলে কাজ হয়েছে। তার মানে গহন কাল রাতে যখন উঠে বাইরে গিয়েছিল তখন সাবিতের সাথে কথা বলতেই গিয়েছিল। কি এমন বলেছে সাবিত কে যে এক রাতের মধ্যে ছেলেটার এমন আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল। ব্যাপারটা কি ভাবনার নয়! অবশ্যই ভাবনার বিষয়।
দুটো দিন দেখেছে নিধি এই ছেলেটাকে। কই একবারের জন্য তো নিধির এই ছেলেকে সুবিধার বলে মনে হয়নি। তাহলে গহন কি এমন বলল যে একেবারে ইবলিশ থেকে সোজা ফেরেশতা হয়ে গেল?
এদিকে নিধির থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সাবিত ফের বলা শুরু করল,
“দেখো ভাবি, আমি মন থেকে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তুমি প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দিও। তুমি যদি এই কথাগুলো ধরে বসে থাকো তাহলে তো আমাদের সম্পর্কটা সব সময় একটা অস্বস্তির মাঝেই থেকে যাবে। আমি এটা চাই না। পুরনো কথাগুলো তুমি ভুলে যাও। আর আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, এমন ভুল আর কক্ষনো হবে না। আর আমি সত্যিই তোমায় অস্বস্তিতে ফেলার জন্য কাজগুলো করিনি। তুমি তো আমার নিজের মানুষ, আমার ভাবি। সেজন্য আসলে আমি একটু বেশি এক্সাইটেড হয়ে কাজগুলো করে ফেলেছিলাম। তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না। আর ভাইয়া কে একটু বুঝিয়ে বলো যেন ভাইয়া আমায় ভুল না বোঝে।”
সাবিতের কথাগুলো শুনে নিধির মনে হলো ওর কথার মাঝে এক ফোঁটাও মিথ্যে নেই, কোন ছলনাও নেই। যেন মন থেকে ক্ষমা চাইছে। যেখানে ছেলেটার চোখে মুখে একটা তীব্র অপরাধবোধ ফুটে উঠেছে সেখানে কি আর মিথ্যে বলতে পারে!
কি সুন্দর মাথা নিচু করে অপরাধী ভঙ্গিতে বারবার নিধির কাছে ক্ষমা চাইছে। একবার চোখ তুলে তাকালোও না। সম্পূর্ণ ভদ্রতা বজায় রেখেছে। নিধির একবার মনে হলো তাহলে কি ওই সাবিত কে ভুল বুঝেছিল? আসলেই কি অতিরিক্ত মিশুকে স্বভাবের জন্য আর নতুন ভাবির সাথে পরিচিত হওয়ার অধিক আগ্রহের ফলে এমন আচরণ করে ফেলেছিল?
হতেই পারে। বাড়িতেও তো নিধির ঘরে মাঝে মাঝেই ওর চাচাতো ভাইরা অনুমতি না নিয়েই প্রবেশ করতো। তার মানে তো এটা নিধি কখনো বলতে পারে না যে ওদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল। কিংবা চারিত্রিক কোন দোষ ছিল।
নিধির এসব ভাবনার মাঝে আরো অনেকবার সাবিতের ওর কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়ে গেছে। সবশেষে অনেক গণনা করার পর নিধির মনে হলো যে ওর ধারণাই হয়তো ভুল ছিল। হয়তো একটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু যেহেতু এখন ছেলেটা এত ভালোভাবে ক্ষমা চাইছে তাহলে ওকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।
নিধি যদি এখন ক্ষমা না করে তাহলে গহন কেও ছোট করা হয়ে যাবে। যেহেতু গহন গিয়ে সাবিতের সাথে কথা বলে ওকে নিজের ভুলটা বুঝিয়েছে। আবার গহনের কথাতেই সাবিত ক্ষমা চাইছে। তাহলে নিধির অবশ্যই ক্ষমা করা উচিত।
ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ইটস ওকে ভাইয়া। আমিও বোধহয় আপনার সাথে একটু বেশি খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। আমিও ভুল ভেবেছিলাম আপনার সম্বন্ধে। আই এম রিয়েলি সরি ভাইয়া।”
প্রত্যুত্তরে সাবিতও পাল্টা হেসে বলল,
“ইটস ওকে ভাবি। দেবর ভাবির সম্পর্কে ছোটখাটো ভুলগুলো সরি না বললেও ক্ষমা করে দিতে হয়। আর তুমি আমায় ক্ষমা করেছো তো?”
নিধি মাথায় নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। সাবিত নিধির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সাবিত ঘর থেকে চলে যেতেই নিধি বিছানার ওপর বসলো। পা দোলাতে দোলাতে ভাবল গহন মানুষটাকে বোধহয় যতটা খারাপ ভেবেছিল ততটা খারাপ না। যতটা নিষ্কর্মা ভেবেছিল ততটা নিষ্কর্মাও না। এই লোকটাকে অভিযোগ করলে বোধহয় কাজ হতে পারে। আজ সকাল থেকেই কি সুন্দর নিধির হয়ে কথা বলছে। আবার গতকাল রাতে ভাইকে গিয়ে বেশ ভালোই টাইট দিয়ে এসেছে সেজন্য তো এখন এসে এত সুন্দর ভাবে ক্ষমা চাইলো।
হঠাৎ করে নিধির মনে গহনের জন্য ইতিবাচক ধারণা তৈরি হলো। যে ধারণা গহনের প্রতি একটু একটু সম্মানও তৈরি করলো।
নিধির এসব ভাবনার মাঝে ওয়াশরুম থেকে গহন বেরিয়ে এলো। তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কার সাথে কথা বলছিলে? কে এসেছিল ঘরে?”
নিধি পা দোলাতে দোলাতে হাসি হাসি মুখ করে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার ভাই এসেছিল।”
“সাবিত। কেন?”
“বেশ ভালোই কাজ হয়েছে আপনাকে দিয়ে। ক্ষমা চেয়ে গেল। ছেলেটার ব্যবহার দেখে মনে হলো অতটাও খারাপ না। সেজন্য আমিও অতিরিক্ত খারাপ ব্যহারের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। ঠিক আছে না?”
মনে মনে নিধি আর নিজের ভাই দুজনের প্রতিই ভীষণ খুশি হলো গহন। তবে কারো প্রতিই তৈরি হওয়া সন্তুষ্টি ভাবটা প্রকাশ করা হলো না। নিধির কথার প্রেক্ষিতে শুধু আলতো একটু হাসলো।
গহন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে নিধি চেঁচিয়ে উঠে ওকে থামতে বলল। থেমে গেল গহন। গহন পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো নিধি দৌড়ে এলো ওর দিকে। চমকে গহন একটু পিছিয়ে গেল।
“দৌড়াচ্ছো কেন?”
পিছিয়ে যাওয়া গহনের দিকে নিধি দুকদম এগিয়ে গিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল,
“সকালবেলা উঠে আপনার জন্য কষ্ট করে আলাদা করে তেল মশলা কম দিয়ে খিচুড়ি রান্না করাটা আমার সার্থক। আমার কি মনে হচ্ছে জানেন?”
গহন বেশ উৎসাহী গলায় বলল,
“কি?”
নিধি গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“আমার স্বামী মনে হয় ভালো হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।”
কথাটা বলে নিধি ঠোঁট টিপে হেসে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। লাফাতে লাফাতেই বেরিয়ে গেল। ভীষণ খুশি আজ নিধি। এই বাড়িতে আসার পর থেকে আজ প্রথমবারের জন্য নিধির মনে হলো ওর ও গুরুত্ব আছে এই বাড়িতে। ওর পছন্দ অপছন্দের খেয়ালও রাখা হয়। আর সেই খেয়ালটা যে গহন রেখেছে এই ব্যাপারটাই নিধির খুব ভালো লেগেছে।
গহন কিছুক্ষণ হা করে নিধির যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার আচরন কেমন অদ্ভুত না! কেমন লাফাতে লাফাতে চলে গেল। গহন আজ আরো নিশ্চিত হলো যে ও আসলেও অনেক ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।
_________
সকালের নাস্তার জন্য ডাইনিং টেবিলে গিয়ে গহন শম্পা বাদে বাকি সবাইকে সেখানে উপস্থিত দেখলো। পিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“শম্পা কোথায়?”
সত্যি কথাটা পিয়াল গহনকে বলতে পারলো না। তাই একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,
“ও শাফিকে খাওয়াচ্ছে। আমাকে বলল পরে খেয়ে নেবে।”
গহন জানে পিয়াল মিথ্যে বলল। তবে আর কোনো কথা বাড়ালো না এই নিয়ে। চুপচাপ খেতে বসে গেল।
নিধি একে একে সব খাবারগুলো এনে টেবিলে গুছিয়ে রাখলো। আলাদা একটা প্লেটে খিচুড়ি বেড়ে এনে টেবিলে রাখতেই সিনথিয়া প্লেটের দিকে উঁকি দিয়ে বলল,
“আরে বাহ্ ভাবি। নিজের জন্য আবার আলাদা করে রান্না করেছো। সংসার আলাদা করার ধান্দায় আছো নাকি আবার?”
যেহেতু সকালেই আজ একটা বিরাট বড় ঝামেলা হয়ে গেছে সেজন্য নিধি চাইলো না আর কোন ঝামেলা করতে। সেজন্য স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আমার জন্য না, এটা তোমার ভাইয়ের জন্য। গতকাল রাতে তরকারিতে অতিরিক্ত ঝাল খেয়ে ওনার অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য কম ঝাল দিয়ে আলাদা করে ওনার জন্য রান্না করেছি।”
আর কোন উত্তর দিলো না সিনথিয়া। সালমা বেগম নিধি কে উদ্দেশ্য করে প্রশংসার সুরে বললেন,
“আমার ছেলের বউদের থেকে তো আমি এমনই আশা করি যে তারা আমার ছেলেদের খেয়াল রাখবে। খুব ভালো করেছো মা। তোমাদের বিয়ের আগে তো আমার ছেলের যাবতীয় বিষয়গুলো আমাকেই খেয়াল রাখতে হতো। বিয়ের পরেও অবশ্য আমার ছেলেকে আমাকেই সকালের নাস্তা বানিয়ে খাওয়াতে হয়েছে এই কয়দিন। আজ প্রথম গহন নিজের বউয়ের হাতে তৈরি নাস্তা খাবে।”
নিধি যত ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায় ততই নতুন করে ঝামেলা তৈরি হয়ে যায়। ভেবেছিল নিজের মুখটা বন্ধ রাখবে। তবে কোনমতেই পারল না। তাই বলে এইভাবে কোন রকমের কোন সংকোচ ছাড়া ডাহা মিথ্যে কথা বলে দেবে আর নিধি চুপচাপ সেটা শুনে যাবে এটা অসম্ভব। সত্যিটা জানা সত্ত্বেও নিধির পক্ষে চুপ থাকা অসম্ভব।
সালমা বেগমের ব্যাপারে এতোটুকু তো নিধি বুঝে গেছে উনি নিজেকে যতটা ভালো দেখানোর চেষ্টা করেন ততটাও ভালো না। একদম হাসতে হাসতে নিধি কে বাঁশ দেওয়ার ধান্দায় থাকে। তাই নিধিও এত বড় একটা সুযোগ কি করে হাতছাড়া করতে পারে!
সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আসলে মা রাতে ঘুম না হওয়ার কারণে আমার সকালে উঠতে একটু দেরি হয়েছে এই কদিন। এই ক’দিন আপনিই সকালে নাস্তা বানিয়েছেন? আজও কি সকালের নাস্তা আপনি রান্না করেছেন মা?”
“হ্যাঁ। কি আর করবো বলো তোমরা তো এখনো মা হওনি। সেজন্য বুঝবে না সন্তানরা খালি পেটে বাইরে বেরিয়ে গেলে মায়েদের কতটা চিন্তা হয়। আমার ছেলে মেয়েরা তো সকাল সকাল বাইরে বেরিয়ে যায়। সেজন্য আমাকেই উঠে রান্না করতে হয়।”
“কিন্তু আজ সকালে আমি যে মিতাকে রান্নাঘর থেকে বের হতে দেখলাম মা। মিতা তো আমাকে বলল ওই নাকি এই ক’দিন রান্না করেছে। আজও বলল ওই রান্না করেছে। দেখেছেন মা কত বড় সাহস ওর। কষ্ট করেন আপনি অথচ নিজে নাম কেনার চেষ্টা করে। এর জন্য কিন্তু ওকে শাস্তি দিতেই হবে মা। না হলে আরো মিথ্যে বলা শুরু করবে। আর দেখেছেন মা আপনি তো বলেছিলেন ও ছুটি নিয়েছে। কিন্তু যেন পুরো মাসের মাইনেটা ঠিকঠাকভাবে পেয়ে যায় শুধু সেজন্য সকালে টুকটাক কাজ করে দিয়ে আর সারাদিনে খোঁজ থাকে না। যেন মাইনে নেওয়ার সময় বলতে পারে যে ও রোজ এসেছে। এই মাসে টাকা দেওয়ার সময় কিন্তু আপনি এ ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন। নয়তো ওর লোভ বেড়ে যাবে।”
সিনথিয়া তখন মনের সুখে খাবার খাচ্ছিলো। হঠাৎ করে কাশি উঠে গেল গলায় খাবার আটকে। গহন তাড়াহুড়ো করে গ্লাসে পানি ঢেলে সিনথিয়ার দিকে সেটা এগিয়ে দিল। পরিবেশটা হঠাৎ করে কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠলো। তবে নিধি এখনো মুখে হাসি বজায় রেখে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে।
সালমা বেগমের মুখে কোন রাগ নেই, কোন অস্বস্তি নেই। তিনি যেন অবাকও হননি। খুব স্বাভাবিক দৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে আছে।
ওনার এত শীতল দৃষ্টির মানে নিধি বুঝতে পারল না। ওর দিকে তো সবাই বেশিরভাগ সময় কটমট করেই তাকায়। তাই এভাবে নিধির দিকে তাকিয়ে সালমা বেগম ওকে কি বোঝাতে চাইছেন সেটা নিধি বুঝে উঠতে পারলো না। সিনথিয়ার কাশি থেমে গেল। গহন সম্পূর্ণ প্রসঙ্গটা বদলানোর জন্য নিধি কে একটু তাড়া দিয়ে বলল,
“নিধি, আমায় খাবার দাও। তুমিও খেয়ে নাও। আর খাবার টেবিলে এত কথা বলতে নেই। দেখলে তো সিনথিয়া বিষম খেল।”
নিধি বাধ্য মেয়ের মতন চুপচাপ গহনের প্লেটে খাবার তুলে দিল। খাওয়ার মাঝে গহন আড়চোখে কয়েকবার তাকালো সালমা বেগমের দিকে। দেখল উনি শুধু হাত দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করছে। খাবার তুলে আর মুখে দেওয়া হচ্ছে না। গহন নিজের খাওয়া থামিয়ে সালমা বেগমে কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা, খাচ্ছো না কেন? এভাবে শুধু খাবার নাড়াচাড়া করলেই হবে? ওষুধ খেতে হবে তো।”
সালমা বেগম জোরপূর্বক মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললেন,
“হ্যাঁ খাচ্ছি। আসলে রান্নায় আজ একটু বেশি ঝাল দিয়ে দিয়েছি। আমিও তো এত ঝাল খেতে পারি না।”
গহনকে খিচুড়ি দিয়ে খিচুড়ি বেচে গিয়েছিল। নিধি বাটিটা সালমা বেগমের থেকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“মা আমার রান্না খেয়ে দেখুন। ভালো হয়েছে।”
সালমা বেগম বাটিটা আবার নিধির দিকে ফেরত দিয়ে বললেন,
“না মা লাগবে না। ঝাল বেশি হলেও আমি এই খাবার খেতেই পছন্দ করি।”
নিধিও আর কথা বাড়ালো না। খাওয়া-দাওয়া শেষে যে যার ঘরে চলে গেল। গহন আগেই চলে গিয়েছিল ঘরে। একটু পর নিধিও এলো। গহন তখন বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো। নিধিকে আসতে দেখে ওকে একবার ডাকলো। নিধি সোফায় আয়েশী ভঙ্গিতে বসে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বলুন।”
গহন শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে নিধির দেখে এগিয়ে গেল। নিধিকে উদ্দেশ্য করে শান্ত গলায় বলল,
“একটা অনুরোধ করছি তোমায়। মা কে সবার সামনে এভাবে অপমান করোনা।”
“অপমান করিনি তো। অপমানের কি দেখলেন আপনি?”
“তুমি নিজেই জানো তুমি কি করেছো। তুমি কাজটা ভুল করেছো কি ঠিক করেছো আমি সেই প্রসঙ্গে যাব না। আমি শুধু তোমায় বলছি আমার মা কে সবার সামনে এভাবে ছোট করো না। আমি চাইনা আমার মা তার সন্তানদের সামনে অসম্মানিত হোক।”
নিধি এবারে মৃদু গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“তাহলে নিশ্চয়ই এমন কোন কাজও করা উচিত না যাতে তাকে সন্তানদের সামনে ছোট হতে হয়। দেখুন আমার ওনার সাথে কোন শত্রুতা নেই। তবে উনি যে কাজটা করেছেন সেটাও কিন্তু ঠিক না এটা আপনাকে মানতে হবে। আপনি বলুন আমি কি এই বাড়ির কাজের লোক? এমনটাও তো না যে আমি আসার আগে এই বাড়িতে কোন কাজের লোক ছিল না। হঠাৎ করে এভাবে সেই কাজের লোকের উধাও হয়ে যাওয়াটা একটু অদ্ভুত না? মিতা এমন সময় এসে বাড়ির কাজ করে আবার চলে যায় যেন আমি বা আমরা কিচ্ছু টের না পাই। আমাকে বলা হলো যে সেই মেয়ে নাকি ছুটিতে আছে। তাই আমাকে সব কাজ করতে হবে। কাজ করতে অসুবিধা নেই আমার। কিন্তু আমাকে কেন মিথ্যেবলা হলো তার উত্তর দিন।”
“তুমি যদি সরাসরি এসে আমার থেকে উত্তরটা চাইতে দিয়ে দিতাম। কিন্তু তুমি সেটা করো নি। আর এখন উত্তর নিয়েই বা কি করবে। তোমার যা করার তা তো করেই দিয়েছো। যাইহোক, কথা বাড়াতে চাই না। তোমাকে শুধু আমি বললাম আমার মা কে ছোট করো না। এতোটুকুই।”
কথাটা বলে গহন চলে যেতে নিলে পিছন থেকে নিধি বলে উঠলো,
“আর আপনার মায়ের দোষ আপনি দেখলেন না? আমার সাথে যে অন্যায় হয়েছে তারও কোন বিচার করবেন না?”
থামলো গহন। ঘাড় ঘুরিয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার আড়ালে আমি এমন অনেক কিছুই করি যেগুলো তুমি দেখতে পাও না। তাই আমি কি দেখতে পাই কি দেখতে পাইনি সেই হিসাব করতে যেও না। আর একটা কথা, এরপর থেকে যদি তোমার সাথে হওয়া কোন অন্যায়ের বিচার তুমি চাও তবে দয়া করে সেই কথাটা সরাসরি এসে আগে আমায় বলো। আমায় আগে বিচার করার সুযোগ দিও। আগেই পরিস্থিতিটাকে জটিল বানিও না।”
গহন চলে যেতে ধরলে নিধি ফের বলে উঠলো,
“কিন্তু আপনার মা আমার সাথে এমনটা কেন করলেন সেসব জানার প্রয়োজন মনে করছেন না আপনি?”
“যা জানি আবার নতুন করে সেটা জানতে চাওয়ার প্রয়োজন দেখছি না। এই বাড়িতে কে কখন কোন কারণে কি করতে পারে সেসব আমি জানি নিধি। আর সেজন্যই তোমায় কিছু করতে নিষেধ করি আমি। আমি সত্যিই জানি না তুমি কবে বুঝবে আমায়।”
কথাটা বলে গহন চলে গেল। নিধি এবার একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে গেল। বুঝে উঠতে পারছে না গহনই ভুল নাকি ও গহন কে বুঝতে পারছে না।
_______
নিজের ঘরে ফোনে তখন নিজের বোনদের সাথে কথা বলছেন সালমা বেগম। খোঁজ খবর নিচ্ছেন যে ওনারা কখন আসবেন। অপর পাশ থেকে তারা জানালো যে ওনারা আজ দুপুরের মাঝে এসে পড়বে।
তাদের সাথে হয়তো আরো কথা বাড়াতেন তিনি। তবে গহন আসায় ফোনটা রেখে দিয়ে নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ গহনের উপর নিবদ্ধ করে বলল,
“কিছু বলবে বাবা?”
গহন এগিয়ে গেল মায়ের দিকে। সালমা বেগমের পাশে বসে ওনার এক হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। সালমা বেগম আন্দাজ করতে পারছেন তার ছেলে বোধহয় এমন কিছু বলবেন যেটা তার পছন্দ হবে না। তবে আগবাড়িয়ে কিছু বললেন না।
বেশ কিছুটা সময় পর গহন সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে,
“আমি তোমায় খুব বিশ্বাস করি মা। খুব ভরসা করি তোমায়। আমার চোখে তোমার সম্মান, মর্যাদা, তোমার জন্য ভালোবাসা সবার থেকে বেশি। তুমি বিশ্বাস করো তো মা যে আমি তোমায় খুব বেশি ভালোবাসি?”
একবারের জন্যও ভাবতে হলে না সালমা বেগম কে এই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার জন্য। আলতো হেসে তিনি মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বাবা। কোন সন্দেহ নেই আমার এই বিষয়ে। তুমিও তো জানো যে তোমার মা তোমায় ভালোবাসে।”
“জানি। আমি চাই না মা তুমি কাউকে তোমার সম্বন্ধে কোন কথা বলার সুযোগ দাও। আমি চাই না কেউ তোমায় অপমান করার কোন সুযোগ পাক। আমার মা তো পৃথিবীর সব থেকে ভালো মা। আমি চাই আমার মা যেমন আমার কাছে শ্রেষ্ঠ বাকিদের কাছেও যেন শ্রেষ্ঠই হয়।”
“আর যদি কেউ তোমার মাকে অপমান করে তাহলে?”
গহন সালমা বেগমের হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে ওনাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“তখন আমি থাকবো। তুমি যদি কাউকে সুযোগ না দাও তারপরও যদি তোমাকে অপমান করার চেষ্টা করে। তবে তখন তার প্রতিবাদ করার জন্য তোমার ছেলে থাকবে মা। কিন্তু আমি চাইনা তুমি কাউকে কোন সুযোগ দাও। আমি চাইনা তুমি এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি করো যে আমি তোমার অপমানের কোনো জবাবও না দিতে পারি।”
সালমা বেগম বুঝতে পারলেন ছেলে ওনাকে ঠিক কি বোঝাতে চাইলো। গহন ওনাকে অপমান করতে চায় না, ছোট করতে চায় না সেই জন্য পূর্ণ শ্রদ্ধার সাথে বোঝাল শুধু ওনাকে। ছেলের কথা অনুধাবন করতে পেরে গহন কে উনি আশ্বস্ত করে বললেন,
“ভরসা রাখো তোমার মায়ের উপর। আমি কাউকে সুযোগ দেবো না আমাকে ছোট করার।”
গহন সন্তুষ্ট হলো সালমা বেগমের কথায়। ওনার হাতের উল্টো পিঠে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“আমার মায়ের উপর আমার বিশ্বাস আছে।”
প্রত্যুত্তরে সালমা বেগম নিজেও পাল্টা হেসে শুধু গহন কে আশ্বস্ত করলেন। তিনি গহন কে বোঝাতে চাইলেন যে উনি গহনের বিশ্বাস রাখবেন।
গহন কে বোঝালেন ঠিকই তবে মনে মনে নিজেই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে গেলেন যে আদৌও কি তিনি গহনের বিশ্বাসটা রাখতে পারবেন? হয়তো পারবেন না। আবার যদি কোন ভাবে ধরা পড়ে যান তখন গহনের চোখে চোখ রেখে কি করে কথা বলবেন? তখনো কি গহনের চোখে ওনার প্রতি ভরসা, সম্মান, শ্রদ্ধা থাকবে?
ওনার এসব ভাবনার মাঝেই গহন ফের বলে উঠলো,
“নিধি এ বাড়ির বউ মা। আমাদের সবার খেয়াল রাখা ওর দায়িত্ব। আর আমি জানি ও সেটা হাসিমুখে পালন করবে। কিন্তু সমস্যা হলো ওর বয়স কম মা। এত দায়িত্ব হঠাৎ করে নিতে পারবে না। ওর একার পক্ষে এত কাজ করা সম্ভবও না। মিতাকে আসতে বলো আজ থেকে। দরকার পড়লে ওর বেতন বাড়িয়ে দিও। যদি মিতা কাজ করতে না চায় তাহলে অন্য কাউকে ঠিক করো। কিন্তু আমি চাইনা নিধি একা এত কাজ করুক। ঠিক আছে মা?”
এবারে আর স্বেচ্ছায় হাসতে পারলেন না সালমা বেগম। বরং ঠোঁটে জোরপূর্ব হাসি ফুটিয়ে তুলতে হলো তাকে। এই হাসিটা ফুটিয়ে না তোলা ছাড়া তার কাছে কোন উপায় নেই। সেজন্য বাধ্য হয়ে হেসে বললেন,
“ঠিক আছে। তুমি চিন্তা করো না আমি মিতাকে আজ থেকে আসতে বলব। তবে একটা কথা। নিধি কি তোমায় এই নিয়ে কোন অভিযোগ করেছে যে আমরা ওকে বেশি খাটাচ্ছি? দেখো বাবা, আমরাও তো সংসার করেছি। এর থেকেও বেশি মানুষ ছিল আমাদের সংসারে। আমাদের কেউ কাজ করতে…...”
সালমা বেগম নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। তার আগেই গহন আবারো ওনাকে উদ্দেশ্য করে শান্ত গলায় বলল,
“আমি চাইনা মা যে নিধি এত কাজ করুক। এটা আমার ইচ্ছে। নিধি আমার কাছে কোন বিষয়েই অভিযোগ করে না। আমার অনুপস্থিতিতে এই বাড়িতে কে ওর সাথে কি ব্যবহার করে সে ব্যাপারে ও আমাকে কখনো নালিশ করে না। ও খুব ভালো।”
ছেলের এই কথাটা সালম বেগমের মোটেই পছন্দ হলো না। গহন কি ওনাকে বোঝাতে চাইলেন যে গহন বুঝতে পারে ওর অনুপস্থিতিতে নিধির সাথে এই বাড়িতে সবাই কেমন ব্যবহার করে? ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার কি মনে হয় নালিশ করার মতন কোন কাজ আমরা করি ওর সাথে?”
গহন আলতো হেসে বলল,
“আমার উপস্থিতিতেই আজ শম্পা যে আচরণটা করলো তাতে তো আমি একটু চিন্তায় আছি মা। তবে আমার বিশ্বাস আমার মা থাকতে আমার স্ত্রীর সাথে কেউ খারাপ আচরণ করতে পারবে না। আমিতো জানি আমার মা চায় না যেন আমি কষ্ট পাই। আর এটাতো স্বাভাবিক আমার স্ত্রীর সাথে কেউ খারাপ আচরণ করলে আমার খারাপ লাগবে। তাই আমি জানি আমার মা এই ব্যাপারটার দিকে নিশ্চয় খেয়াল রাখবে। এখন আসছি মা, দেরি হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করো না খালারা আসার আগে চলে আসব।”
গহন নিজেও আর কিছু বলল না। সালমা বেগমও আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। গহন চলে গেল ঘর থেকে।
আজ সকাল থেকে গহনের একের পর এক আচরণে শুধু অবাকই হয়ে চলেছেন সালমা বেগম। ছেলেটা যেন তার বদলে যাচ্ছে। কিন্তু বদলে গেলে হয়তো ওনার প্রতি মনোভাব, ভালোবাসা গুলোও বদলাতো। সেগুলো তো বদলায়নি। এখনো তো সেই আগের মতই আছে। তবে কি পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে হচ্ছে যার কারণে সালমা বেগম ধরতে পারছেন না?