খাওয়া দাওয়া শেষে একে একে সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেল। এদিকে গহনের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। নিধি খেয়াল করলো গহন ভাত মাখছে আর একটু একটু করে মুখে দিচ্ছে। নিধির সন্দেহ হলো যে বোধহয় রান্না ভালো হয়নি আজ। কিন্তু রান্না ভালো না হলে তো ওকে কথা শুনতে হতো। তার মাঝে সবার মন মেজাজ এর যে অবস্থা ছিল কথা শুনিয়ে একেবারে ফালাফালা করে ফেলত। নিধি তবুও সন্দেহী গলায় গহন কে বলল,
“রান্না ভালো হয়নি? খাওয়াই যাচ্ছে না? তাই বলে এত বাজে রান্না তো আমি করি না।”
গহনের ধ্যান ভাঙলো। তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“না না। রান্না সুন্দর হয়েছে তো। আসলে আমারই পেটটা একটু ভরা ভরা লাগছে। এদিকে আবার খাবারটাও নষ্ট করতে পারছি না। মা পছন্দ করে না খাবার নষ্ট করা।”
গহন কথাটা বলতেই নিধি টেবিলের বাকি প্লেট গুলোর দিকে তাকালো। শম্পা, সিনথিয়া আর সাবিত তিনজনের প্লেটেই বেশ অনেকখানি করে খাবার অবশিষ্ট রয়ে গেছে। শম্পা তো কিছু খায়ইনি। নিধি গহন কে সেগুলো দেখিয়ে বলল,
“ওগুলো তাহলে কি? ওরাও তো নষ্ট করেছে। আপনি নষ্ট করলে কি সমস্যা? খেতে না পারলে রেখে দিন।”
“না, সমস্যা নেই। আমি খেয়ে নেব।”
“এত মায়ের বাধ্য ছেলে হতে হবে না। অবশ্য আমি কিছু বলবো না আপনার মাকে নিয়ে। আমি বললেই তো দোষ হয়ে যাবে। পরের বাড়ির মেয়ে বলে কথা। যাইহোক, খেতে হবে না। রেখে দিন।”
গহন এবারও আপত্তি জানালো নিধির কথায়। নিধির এবারে মাথায় আ’গু’ন ধরে গেল। গহনের সামনে থেকে প্লেটটা টেনে নিয়ে বলল,
“একটা কথা বললে শোনেন না কেন? উঠুন। হাত ধুঁয়ে ঘরে যান। দেখাতে এসেছে আমায় মায়ের কত বাধ্য ছেলে!”
কথাটা বলে নিধি টেবিলে থাকা সবগুলো এঁটো প্লেট নিয়ে রান্না ঘরে গেল। এখনো রান্না ঘরে গিয়ে বিরবির করে গহন কে কিসব যেন বলে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন পর নিধির মনে পড়লো যে ওর তো আজ রেগে থাকার কথা ছিল না। আজ তো নিধির আনন্দের দিন ছিল।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই রান্নাঘরে টুকটাক আওয়াজ পেল। পিছনে তাকাতেই দেখল গহন দাঁড়িয়ে আছে। নিধি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“আবার এখানে এসেছেন কেন? খাবারগুলো নিতে এসেছেন নাকি? ওই যে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি। ওখান থেকে তুলে খান।”
গহন ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কফি বানাতে এসেছি।”
“আমাকে বলা যেত না?”
“আমার অভ্যাস আছে নিজের কাজ নিজে করার। নিজে কফি বানিয়ে খেতে খেতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে এখন আর কারো বানানো ভালো লাগেনা।”
গহন ভেবেছিল নিধি বোধহয় ওর এই গুন শুনে বাহবা দেবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং নিধি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“ওও। তার মানে এই বাড়িতে কেউ আপনাকে কফিটাও বানিয়ে দেয় না। আরে আসল ফাটা কপাল তো আপনার। আমার কপালে এর থেকে ঢের ভালো ছিল। আমার মা তো আমাকে ডিম ভেজে এনে দিত। যা খেতে চাইতাম তাই বানিয়ে দিত। আর আপনার মা বোনেরা শুধু পারেই ঢং করতে।”
কথাটা বলে নিধি নিজেই নিজের জিভে কামড় বসালো। শেষের বাক্যটা বলা উচিত হলো না। গহনের দিকে তাকাতেই দেখল গহন কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলছে। তবে গহন কে আর নিজের মুখটা খুলতে দিলো না। তার আগে নিজেই বলে উঠলো,
“বুঝতে পেরেছি। শেষের কথাটা পছন্দ হয়নি। ঠিক আছে আর বলবো না। এখন আমার জন্যও এক কাপ কফি বানান। দেখি কেমন কফি বানাতে পারেন। যদি ভালো না হয়েছে আপনাকেই কিন্তু গেলাবো। আর শুনুন, যে সে কফি আমি খাইনা। বেশি করে ঘন দুধ দিয়ে তিন চামচ চিনি দিয়ে বানিয়ে আনবেন।”
“কিন্তু আমি তো ব্ল্যাক কফি খাই, চিনি ছাড়া।”
গহন কথাটা বলতেই নিধি মুখ ভঙ্গিতে তুমুল বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“এটা আবার কেউ খায়! তাইতো বলি আপনার মুখ কেন এত তেঁতো। যাইহোক আপনি খান আপনার কফি। আমার লাগবে না।”
কথাটা বলে নিধি ঘরে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হয়েও থেমে গেল। আবারো কয়েক কদম পিছিয়ে গহন কে ডাকলো। গহন নিধির দিকে তাকাতেই দেখলো নিধি ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গহন আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবে?”
নিধি উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,
“ধন্যবাদ আমায় দেওয়া কথা রাখার জন্য। আমার হয়ে কথা বলার জন্যও ধন্যবাদ। আমি জানি আমাকে হয়ত আপনার খিটখিটে, বদমেজাজি মনে হয়। অস্বাভাবিকও না ব্যাপারটা। তবে একদিন আপনি বুঝবেন কেন আমি এমন করি। আসলে মাথাটা সব সময় বিভিন্ন কারণে গরম হয়ে থাকে। আর সব রাগ গিয়ে পরে আপনার উপর৷ আমার ব্যবহারে কখনো কষ্ট পেয়ে থাকলে সরি।”
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে নিধি চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে গহন বলে উঠলো,
“সমস্যা নেই৷ রাগ দেখাতে পারো। আমার সহ্য করার অভ্যাস আছে। তবে অনুরোধ একটাই সম্পর্কটাকে শুধু রাগ দেখানোর জায়গাই বানিয়ো না।”
নিধি কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ চলে গেল সেখান থেকে।
__________
নিধি জানে গহন এসে এখন আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসবে। সেজন্য অযথা জেগে থাকতে চাইলো না। আর এমনিতেও মানুষটার মুখ দিয়ে তো ভালো কোন কথা বের হয় না। নিধির স্বামী তোর ভালো না যে একটু প্রেম ভালোবাসার কথা বলবে, কিংবা স্বামীর সাথে গল্প করে একটু সুখ অনুভব করবে।
নিজের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিধি। ঘুমোনোর আগে ভাবলো একবার আকিব কে জানিয়ে রাখবে যে কাল ও নিয়াজের সাথে দেখা করতে যাবে৷ কলও করলো আকিব কে তবে নিধির দুর্ভাগ্য। আকিবের থেকে জানতে পারলো নিয়াজ নাকি ওর মামার বাড়ি গেছে তাও আজই। কয়েকদিন পরে আসবে।
ফোনটা রেখে দিয়ে একরাশ দুঃখ নিয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো নিধি। ঘরে তখন নিধি একাই। জানালার পাশে শুতেই হঠাৎ করে মনে হলো যদি এখন জানালা দিয়ে কেউ উঁকি দেয়! যদি তার চোখমুখের আকৃতি বিকৃত হয়! যদি তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরে!
এক লাফে নিধি জানালার ধার থেকে সরে এসে আবার গহন যে পাশে ঘুমোয় সেই পাশে শুয়ে পড়লো। তাও একেবারে কাঁথা মুড়ি দিয়ে। যেন বোঝাই যাচ্ছে না ওখানে কোন মানুষ শুয়ে আছে।
বেশ অনেকটা সময় পর গহন ঘরে এসে নিধিকে খুঁজলো। বেশ অনেকটা সময় পর বুঝতে পারল যে বিছানার ওপর এভাবে গুটিসুটি হয়ে নিধিই শুয়ে আছে, কোন বালিশ রাখা নেই।
গহন নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে একবার নাম ধরে ডাকলো। গহনের কন্ঠটা পেতেই নিধি চটপট কাঁথার ভেতর থেকে বেরিয়ে উঠে বসলো। গহন দেখল মেয়েটা একেবারে ঘেমে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। এবারে বিরক্ত হলো গহন। মেয়েটার কি স্বাভাবিক কোনো বোধ বুদ্ধি নেই! যদি গরমই লাগছিল তাহলে কাঁথার ভেতরে ঢোকার কোন মানে হয়! ঘরে তো ফ্যান আছে, এসিও আছে। সেগুলো কি চালানো যেত না।
“মাথায় কি তোমার আসলেও বুদ্ধি নেই? এই গরমের মধ্যে কাঁথার ভেতরে ঢুকেছিলে কেন? ঘরে ফ্যান আছে, এসি আছে জানো না?”
নিধি আগে ভূতের ভয়ের কথাটাই বলতে চেয়েছিল গহন কে। তবে এসির নামটা শুনতেই ওর ভাবনা অন্যদিকে ঘুরে গেল। আশেপাশে তাকিয়ে সে খোঁজার চেষ্টা করলো। নিধি খেয়ালই তো করেনি যে এ ঘরে এসিও আছে। বিস্মিত নয়নে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসিও আছে আপনাদের ঘরে! এত বড়লোক আপনারা! অথচ কাজ করার জন্য বাড়িতে একটা লোক রাখতে পারেন না!”
“আছে তো কাজ করার জন্য লোক। মা নিজে আমাদের সবার জন্য রান্না করতে পছন্দ করে। সেজন্য রান্নার লোক রাখা হয়নি। বাকি কাজের জন্য মিতা আছে।”
“এ্যাহ। আপনার মা আপনাদের জন্য রান্না করতে পছন্দ করে? বললেই হলো এক কথা! ফাজলামো জিনিসটা আপনার সাথে যায় না। তাই অযথা ফাজলামো করতে আসবেন না।”
নিধি আশা করেছিল ওর এই কথার প্রেক্ষিতে গহন নিশ্চিতভাবে ওর সাথে ঝগড়া লাগবে। কেননা নিধি বারবার গহনের শ্রদ্ধেয় মা কে নিয়ে কথা বলছে। আর গহন তো মায়ের অনুগত সন্তান। রেগে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। তবে গহন রাগারাগি না করে মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার মাকে নিয়ে কথা থাক। সব সময় অন্যদের নিয়ে কেন কথা বলো? মাঝে মাঝে তো শুধুমাত্র আমাদের নিয়েও কথা হতে পারে তাই না? কখনো কি ভাবার চেষ্টা করেছো এই ঘরে আমরা দুটো মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের একা লাগে? কেন আমরা কেউ কারো সাথে বলার মতন কথা খুঁজে পাই না?”
নিধি মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“আমাকে করার আগে আপনি নিজেকে কখনো এই প্রশ্নটা করেছেন? আপনি নিজেকে কখনো জিজ্ঞেস করেছেন কেন আমার মতন একটা মেয়ে যে কথা বলতে ভালোবাসে সেও আপনার সাথে বলার মতন কোন কথা খুঁজে পায় না? আপনি নিজে কখনো ভেবে দেখেছেন কেন আমাদের দুজনের মাঝে আমাদের দুজনকে নিয়ে কথা হয় না? তার কারণটা আমি বলি। কারণ আমাদের দুজনের মাঝে কিচ্ছু নেই। আমাদের দুজনের মাঝে সব সময় কেউ না কেউ থাকেই। আমরা দুজন ছিলামই না কখনো।”
দমে গেল গহন। একটু হলেও যেন বুঝতে পারল যে নিধির বলা কথাগুলো ভুল না। সত্যি ওদের দুজনের মাঝে হয়তো এখনো কোনো সম্পর্ক তৈরিই হয়নি। তবে গহনের মনে হলো আজ একটু ওদের দুজনের মাঝে নিজেদেরকে নিয়ে কথা হওয়ার দরকার। হাতে থাকা কফির মগটা নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নাও।”
নিধি কফির মগটার দিকে তাকিয়ে কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,
“এসব চিনি ছাড়া কফি আমি খাইনা। আপনি খান।”
“যেমন বলেছিলে তোমার জন্য তেমন ভাবেই বানিয়েছি। আমার জন্য আলাদা করে চিনি ছাড়া বানিয়েছি।”
গহন কথাটা বলতেই নিধি এক প্রকার লাফিয়ে পড়লো কফির উপরে। মেয়েটার মনোযোগ এখন শুধুমাত্র সেই কফিতেই। পাশে যে গহন দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিধি বলে উঠলো,
“কাল যাওয়া হবে না আমাদের। আমার ভাই বাড়ি নেই। ও এলে তারপর দেখা করতে যাব।”
গহন ছোট্ট করে উত্তরে শুধু “ঠিক আছে” বলল।
নিধিও আর কথা তুলল না। গহন বিরক্ত হলো নিধির প্রতি। গহন যে আগ বাড়িয়ে এত কথা বলতে পারেনা এই মেয়েটা কি সেসব বোঝে না।
গহন আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো চুপচাপ। বুঝলো এই মেয়েটা বলবে না কিছু। নিজেই বলে উঠলো,
“চলো বারান্দায় যাই।”
নিধি ভাবনা চিন্তা করার সময় নিল না। বারান্দায় যাওয়ার ইচ্ছে হলো না। জানালার পাশে গহন কে ইশারায় দেখিয়ে বলল,
“বারান্দায় যাব না। ওখানে ভূত চলে আসতে পারে। এখানে বসুন। এখানে ভূত এলেও আগে আপনাকে ধরবে। ততক্ষণে আমি পালিয়ে যাব।”
কথাটা বলে নিধি একা একাই হাসলো। গহন কিছু মনে করল না। বরং নিধির হাসি দেখে ওর নিজেরও একটু হাসার ইচ্ছে হলো। তবে নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর খোলসের বাইরে বেরিয়ে এসে হাসতেও পারল না। চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতন বিছানায় এসে বসলো।
যথেষ্ট কথা আগ বাড়িয়ে বলেছে গহন। আর কিছু বলা সম্ভব না। মুখ দিয়ে আর কথা বেরই হবে না। এমনিতেই বারান্দায় যাওয়ার কথাটা বলার কারণেই এখন অস্বস্তি হচ্ছে। কিছুটা সময় চুপ থাকার পর নিধি বলে উঠলো,
“আপনাকে একটা কথা বলি? কিন্তু কথা দিতে হবে পরে এই নিয়ে খোঁটা দেবেন না।”
গহন কফি তে একটা চুমুক দিয়ে বলল,
“এসব অভ্যাস সচরাচর মেয়েদের থাকে। ছেলেদের না।”
“আরে সেটা তো আমিও জানি। কিন্তু আপনি তো আবার অন্য ধরনের ছেলে। মানে আপনি ছেলেই, কিন্তু একটু আলাদা। যাইহোক, খোঁটা দেবেন না তো?”
গহন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো৷ গহনের থেকে সাড়া পেতেই নিধি একটু উদাস ভঙ্গিতেই বলল,
“আমি চা খাই না। কফি আমার খুব ভালো লাগে। আমার এক চাচাতো বোন রাত জেগে পড়াশোনা করে। আমার চাচি ওর জন্য কফি এনে রাখে। জানেন, আমাকে খেতে দিত না। আমিও ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। রাত জেগে পড়তাম। কিন্তু আমাকে এমনিই পড়তে হতো। ভুলক্রমেও যদি কখনো কফি বানিয়ে খেতাম অনেক কথা শুনতে হতো। আপনার বাড়িতে আবার এমন কোন সম্ভাবনা নেই তো?”
গহন তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করার পর নিধিকে আশ্বস্ত করে বলল,
“নেই।”
“তাহলে ঠিক আছে। আপনি বরং রোজ আমায় কফি বানিয়ে খাওয়াবেন। আমি যদি সারাদিন রান্না করে খাওয়াতে পারি আপনি একটু কফি বানিয়ে খাওয়াতে পারবেন না? পারতেই হবে।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমি কি বলেছি পারবোনা। এত অতিরিক্ত কথা বলতে নেই। চুপ থাকো।”
নিধি মুখ ভেংচিয়ে চুপ করে গেল। মনে মনে নিজেই প্রতিজ্ঞা করলো যে আর কথা বলবে না। এভাবে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। দুজনের কফিও শেষ হয়ে গেল। কফিটা শেষ হতেই গহনই আবার নিধি কে বলল,
“কিছু বলো।”
নিধি বোধহয় এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে খ্যাঁক করে উঠে বলল,
“নিজেই তো চুপ করতে বললেন। আমার কথা তো সহ্য হয় না আপনার। বাকিরা সারাদিন কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবে তাতে কিছু হবে না। যত সমস্যা নিধি কথা বললে।”
কথাগুলো বলে নিধি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকলো। আবারো কিছুটা সময় নিরবতা চলল। তারপর হঠাৎই নিধির কানে গহনের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। বেশ জটিল একটা প্রশ্ন করলো গহন।
“তুমি কি স্বেচ্ছায় আমায় বিয়ে করোনি? বিয়ের আগে কি আমার সম্বন্ধে কিছুই জানতে না? জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তোমায়? আর যদি তাই হয়ে থাকে কেন ইচ্ছে ছিল না? আমাকে কি পছন্দ ছিল না তোমার?”
নিধি তাকালো গহনের দিকে। ডুব দিলো পুরনো ভাবনায়। মনে পড়ে গেল কত কান্নাকাটি করেছিলো, কত জেদ করেছিলো এই বিয়েটা করবে না বলে। বাড়ির লোকের পায়ে অবধি ধরেছিলো যেন ওকে আর একটু সময় দেয়। পড়াশোনাটা যেন শেষ করতে দেয়। ততদিন অব্দি সময় না দিলেও যেন অন্তত ভার্সিটির পরীক্ষাগুলো দিতে দেয়। কিন্তু কেউ একটা কথাও শোনেনি নিধির।
সেই অভিমানেই তো আর কার সাথে বিয়ে দিচ্ছে, সে ছেলেটা কেমন, কোন বাড়িতে বিয়ে দিচ্ছে কিচ্ছু জানার প্রয়োজন মনে করেনি। গহনের ছবিটা অব্দি দেখেছিল না। যেদিন গহন নিধির সাথে কথা বলতে চেয়েছিল সেই দিনই প্রথমবারের মতন নিধি গহন কে দেখেছিল।
সেদিন যখন গহন জানতে চেয়েছিল নিধির থেকে যে বিয়েতে ওর মত আছে কিনা তখন নিধির খুব করে ইচ্ছে হয়েছিল বলার জন্য যে ওর মত নেই। কিন্তু তখনই মনে পড়ে গিয়েছিল ওর মায়ের বলা কথাগুলো। নিধির মা নিধিকে বলেছিল ওনারা নাকি আর নিধির খরচ চালাতে পারছিলেন না। নিধি এখন বোঝার মতন হয়ে গেছে ওনাদের জন্য। সেজন্য নিজেদের দায়িত্ব পালন করে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে চান। সেই কথাগুলো মনে পড়ে গিয়েছিল নিধির। তাই আর গহন কে বলেনি যে ওর অমতে এই বিয়েটা দিচ্ছে। বলেছিল নিধির মত আছে।
পুরনো সেই কথাগুলো ভাবতেই নিজের দুচোখ ছল ছল করে উঠলো। কোন এক অজানা আতঙ্কে গহনের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। মনে হলো নিধি এখন বলবে যে ওর গহন কে পছন্দ ছিল না। হয়তো বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল তবে গহন কে না। হয়ত নিধির জীবনে অন্য কেউ ছিল। যাকে নিধি প্রচন্ড ভালোবাসতো। সেই জন্যই হয়তো এখনো গহনকে ভালোবাসতে পারেনি।
মৃদু কাঁপা কাঁপা গলায় গহন ফের জিজ্ঞেস করল,
“আমায় পছন্দ ছিল না তাই না?”
ততক্ষণে নিধির গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে। দুহাতে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে মলিন হেসে বলল,
“ব্যাপারটা তেমন না। আসলে আমার বিয়ে করারই ইচ্ছে ছিল না। আমার ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা শেষে চাকরি বাকরি করে আমার মা-বাবাকে নিয়ে আলাদা থাকার। আমার ইচ্ছে ছিল আমার বাবার ভালো চিকিৎসা করানোর। জানেন, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পর ডাক্তার বলেছিল যে ঠিকঠাক চিকিৎসা হলে আমার বাবা আবারো হাঁটতে পারবে। কিন্তু টাকা ছিল না। সেজন্য আমার বাবাকে এখন হুইল চেয়ারে বসে থাকতে হয়। আমার ভাইটা সরকারি স্কুলে পড়ে। আমার ইচ্ছে ছিল ওকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবো। খুব ভালো কিছু বানাবো ওকে। সেজন্য আমার নিজের টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কেউ আমাকে পড়াশোনাই করতে দিল না। বিয়ে দিয়ে দিল।”
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো গহন। যাক এতোটুকু তো অন্তত নিশ্চিত হলো যে ওকে নিয়ে নিধির কোন সমস্যা ছিল না। অন্য কাউকে ভালোও বাসতো না।
“তোমার মতামত উপেক্ষা করে বিয়ে দিয়ে দিল কেন? শুনল না কেন তোমার কথা? তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো৷ তোমার মতামতের দাম আছে।”
নিধি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“মেয়েদের মতামতের দাম কোন কালেই ছিল না। বাবা, ভাই, স্বামী, সন্তান কারো কাছেই মেয়েদের মতামতের মূল্য থাকে না। আপনিই বলুন আপনার কাছে কি আমার মতামতের মূল্য আছে? অবশ্যই নেই। থাকলে সেদিন সিনথিয়ার ব্যাপারে আগেই রায় দিয়ে দিতেন না। নিজে নিজে কত কথা বলে গেলেন। সেদিন আপনি আমার মতামত শোনার প্রয়োজন মনে করেছিলেন?”
“আমি অপেক্ষায় ছিলাম তুমি কিছু বলবে জন্য। তুমি চুপচাপ শুধু কাঁদছিলে জন্য আমার রাগ উঠেছিল। অন্যান্য সময় তো যথেষ্ট কথা বলো তুমি। তাহলে তখন চুপ ছিলে কেন?”
“আপনার বোঝা উচিত ছিল যে হঠাৎ করে সে পরিবেশটায় আমার মাথা ঘুরে উঠেছিল জন্য কিছু বলতে পারছিলাম না। যাকগে সেসব কথা। এখন আপনি বলুন তো আপনি রাজি ছিলেন এই বিয়েতে? আপনি কি বিয়েটাও করেছেন মায়ের কথাতে?”
গহন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“মিথ্যে বলবো না। আমার মায়ের তোমাকে পছন্দ জন্যই বিয়ে করেছিলাম।”
“তাহলে যদি আবার হঠাৎ কখনো আমি আপনার মায়ের অপছন্দের তালিকায় চলে যাই তাহলে কি আমাকে ফেরত দিয়ে আসবেন?”
হঠাৎ করে কি ভেবে যেন নিধির মাথায় প্রশ্নটা চলে এলো। কেননা এই কয়েকদিনেই শাশুড়ির যত রূপ দেখছে তাতে কখন যে উনি আবার কি রূপ ধারণ করবে তা বোঝা মুশকিল।
নিধি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গহনের দিকে। বোঝার চেষ্টা করছে অস্বস্তি হচ্ছে কিনা। কিংবা গহন মিথ্যে বলার চেষ্টা করবে কিনা।
গহন খুব বেশিক্ষণ সময় নিলো না উত্তরটা দেওয়ার জন্য। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“যার ইচ্ছেতেই আসো না কেন যাবে তোমার ইচ্ছেতে। যদি তুমি কখনো যেতে চাও তাহলেই যেতে দেব। আমি সম্পর্ক ভাঙ্গার থেকে গড়তে বেশি ভালোবাসি। আমি কখনো তোমায় যেতে বলবো না।”
“যেতে চাইলেই যেতে দিতে হবে কেন? জোর করে ধরে রাখতে পারবেন না? অবশ্য ধরে রাখবেনই বা কেন? ভালো তো আর বাসেন না যে আটকে রাখবেন? নিধি কে ছাড়া কি আর আপনার জীবন থেমে থাকবে নাকি! ভালোই চলবে। কাউকে ছাড়াই তো কারো জীবন কখনো থেমে থাকেনি। আপনি তো পুরুষ মানুষ, তার উপরে বড়লোক, সুন্দর। দুদিন পর আপনার মা আবার আপনার জন্য কাউকে পছন্দ করবে। আর আপনি নাচতে নাচতে গিয়ে তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবেন। ঠিকই করবেন। নিধিকে আটকে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। বরং পারলে লাথি দিয়ে বের করে দেবেন।”
নিধির বলা কথাগুলো গহন কে ভীষণ ভাবালো। সত্যি তো ওকে যেতে দেবে কেন গহন। নিধি তো গহনের স্ত্রী। ওর অধিকার আছে নিধি কে আটকে রাখার। তাহলে কেন বলতে পারল না যে নিধি যেতে চাইলেও যেতে দেবে না? কারো ক্ষমতা নেই নিধি কে গহনের থেকে আলাদা করার?
গহনের চোখ মুখ দেখে নিধি বোধ হয় বুঝতে পারলে যে গহন ওর কথাগুলোই ভাবছে। হাসলো নিধি। কার থেকে কি আশা করেছিল। যে সম্পর্কে কোন ভালোবাসা নেই, কোন বিশ্বাস নেই, একে অপরের প্রতি কোন সম্মান নেই, যে সম্পর্কে এখনো সামান্য বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারেনি সে সম্পর্কে অধিকারবোধ কি করে থাকবে!
নিধি বিছানায় শুতে শুতে গহন কে বলল,
“ঘুমিয়ে যান। এত ভাবতে হবে না। আর আমি জানি আমি হয়তো বিরক্ত করি আপনাকে। তবুও বলবো কষ্ট করে সহ্য করে নিন। কি আর করবেন বলুন বেছে বেছে গরিব ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেছেন। অসহায় তো হবেই। যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই, উপায়ও নেই। সেজন্য এখানেই পড়ে থাকতে হবে।”
কথাটা বলে নিধি শুয়ে পড়লো। গহন একবার হাত বাড়িয়ে নিধি কে ডাকতে নিল। তবে নিধির কাধটা ছুঁতে যাওয়ার আগেই থেমে গেল আবার। হাতটা গুটিয়ে নিল।
যা বলতে চাইলো গহন সেটা বলতে পারল না। নিজের সবটুকু অনুভূতি যে প্রকাশ করতে পারে না গহন। এই ব্যাপারে গহন অপারগ। নিজের অনুভূতির প্রকাশ্য বর্ণনা দিতে পারে না। বোঝাতেও পারে না কাউকে নিজের ভালোবাসা। কাউকে বোঝাতে পারে না গহন যে ওর জীবনে কার কি স্থান।
থেমে গেল গহন। ভাবলো যদি কখনো নিধি কে বোঝাতে পারবে বলে মনে হয় সেদিনই নাহয় নিধি কে আবারও ডাকবে। তার আগে আর অযথা ডেকে বিব্রত করবে না।