জারাদের বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে এবাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাগ্যিস গহন নিজের সঙ্গে চাবি নিয়ে গিয়েছিল। নয়তো আজ রাতে ঘরে ঢুকতে পারতো কিনা সন্দেহ।
পুরোটা রাস্তা নিধি কে খুব শান্ত দেখিয়েছে। একটা কথাও বলেনি। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে তবে তাও আজ নিধি একবারের জন্যও গহনের সাথে ঝগড়া করার চেষ্টা করেনি। গহন একটু অবাক হয়েছে নিধির এমন ব্যবহারে।
বাড়ি ফিরে নিধি আগে নিজের জামা কাপড় বদলালো। তারপরে নিধি ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই গহন ওয়াশরুমে গেল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গহন নিধি কে ঘরে খুঁজে পেল না। বেলকনিতে উঁকি দিতেই দেখল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। দেখে মনে হচ্ছে মনটা খারাপ।
গহন একবার ভাবলো সেখানে যাবে না। নিধি তো আর গহন কে ডাকেনি। হয়তো একা সময় কাটাতে চাইছে। একটু পরে আবার মনে হলো একবার গিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করা দরকার সমস্যাটা কি। হয়েছেটা কি। এত মনমরা হয়ে আছে কেন? ঠিকই তো ছিল বাড়িতে। হঠাৎ করে আবার কি হয়ে গেল।
গহন গিয়ে নিধির পাশে দাঁড়ালো। হালকা একটু কেশে নিধির মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। গহনের উপস্থিতি বুঝতে পেরে নিধি সেখান থেকে একটু সরে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। গহন ভ্রুঁ কোঁচকালো। মেয়েটার হলোটা কি? দেখে তো মনে হচ্ছে গহনের ওপরে রেগে আছে বোধহয় কোন কারণে। কিন্তু রেগে থাকলেও কোন কারণে রেগে আছে। গহনের জানামতো আজ সকাল থেকে তো গহন কিছু করেনি৷ তাহলে হলোটা কি?
নিজেই নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিছু হয়েছে কি?”
নিধি কোন উত্তর দিল না। গহন ফের জিজ্ঞেস করলো,
“আমি কি কিছু করেছি? কোন কারণে আমার উপর রেগে আছো?”
নিধি এবারও কোন উত্তর দিল না। গহন বুঝে উঠতে পারলো না যে নিধি যদি কারণ না বলে তাহলে ও সমাধান দেবে কি করে। খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে মেয়েটা কথা বলবে না ওর সাথে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গহন যখন চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো ঠিক তখনই ওর কানে ভেসে এলো নিধির কণ্ঠস্বর।
“আপনি কখনো আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেন না কেন? আমাদের মাঝে স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নেই কেন?”
থমকালো গহন। কিঞ্চিত চমকালোও। সেই সাথে একটু অস্বস্তিও হলো নিধির এমন প্রশ্নে। গহনের থেকে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর না পেয়ে নিধি এবারে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফের একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল। গহন কপাল কুঁচকে বলল,
“তুমি চাও?”
“কি চাই?”
“যে কথাটা আমায় বললে। তুমি চাও আমাদের মাঝে আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর মতন স্বাভাবিক সম্পর্ক হোক? তুমি চাও যেন আমি তোমাকে ছুঁই?”
নিধি একটু আমতা আমতা করে বলল,
“আমি চাইলেই কি আর না চাইলে কি। এটাতো নিয়ম। এটা তো করেই সবাই। আপনি এত ভালো হলেন কি করে? আপনি এত ভালো হবেনই বা কেন? আমার ভালো লাগে না এই ব্যাপারটা।”
“ভেবেচিন্তে কথাটা বলছো তো? আমি আবার এই নিয়ম পালন করতে গেলে তোমার অসুবিধা হবে না তো।”
নিধি এবার একটু ঘাবড়ালো। ভাবলো সত্যি সত্যি আবার গহন এই নিয়ম পালন করবে না তো। ওর কথাটা কি সিরিয়াসলি নিয়ে নিলো? আমতা আমতা করে উত্তর দিল,
“না মানে আমি জিজ্ঞেস করছিলাম আপনাকে আপনি কেন এত ভালো? মানে এত ভদ্র সেজে থাকেন কেন? বউকে দেখে আপনার কোন অনুভূতি কাজ করে না? আপনার কি কোন সমস্যা আছে?”
নিধি সন্দেহী গলাতে প্রশ্নটা করলো। গহন এবারে মৃদু রাগী গলায় বলল,
“শাট আপ। ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া যে তুমি কি বলছো? পাগল হয়ে গেছো?”
“হয়েছে হয়েছে। আর এতো ইংলিশ বলতে হবে না। আপনার মতন বিদেশ থেকে পড়াশোনা না শিখলেও দেশে তো পড়াশোনা করেছি আমি। যথেষ্ট ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। আমি বুঝি এসব ইংরেজির মানে। যাই হোক আমার আসল প্রশ্ন হচ্ছে আপনি আমার কাছে আসতে চান না কেন?”
নিধি কথাটা বলতেই গহন ওর দিকে একটু এগিয়ে গেল। গহনকে এগিয়ে যেতে দেখে নিধি দু কদম পিছিয়ে গেল। তবে গহন থামলো না। নিধির দিকে এগিয়ে যেতেই লাগলো আর নিধি সমানে পেছাতেই লাগলো। একপর্যায়ে গিয়ে নিধি তোতলানো কন্ঠে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরে আমি তো এমনি জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রশ্নটা। কিছু করতে তো বলিনি।”
“কিছু করতে বলোনি তুমি। কিন্তু জিজ্ঞেস করেছো আমি কেন কিছু করি না। সেজন্য আজ করতে চাইছি। তোমার প্রশ্নের উত্তরটা প্র্যাক্টিকালি দেবো ভাবছি।”
নিধি চোখ বড় বড় করে তাকালো গহনের দিকে। পেছাতে পেছাতে বেলকনির একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে ঠেকলো। আর পেছানোর জায়গা নেই নিধির কাছে। গহনও ততক্ষণে একেবারে কাছে চলে এসেছে নিধির। নিধি এখন না পারছে কিছু বলতে, না পারছে পালাতে। এজন্যই বলে ভেবে চিন্তে কথা বলতে হয়। হুটহাট ফুটফাট একটা কথা বলে দিলেই হলো! খুব শখ ছিল না জানতে চাওয়ার যে কেন গহন ওর কাছে আসেনা? এবারে কাছেই এসে দেখাবে।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই গহন একটু ওর দিকে ঝুঁকে গেল। গহন কে নিজের দিকে ঝুঁকতে দেখে নিধি খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে ফেলল। তবে নিজের শরীরে গহনের স্পর্শ অনুভব করতে পারলা না। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল গহন বেশ শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিধি চোখ খুলতেই গহন বেশ শান্ত গলায় বলল,
“যার প্রতি এখনো তোমার কোনো ভালোবাসা নেই তার স্পর্শ তোমার কাছে বিষাক্ত লাগবে। আর আমার ভালোবাসাময় স্পর্শের বিপরীতে তোমার বিষাক্ত অনুভূতি আমার কাছে লজ্জাজনক হয়ে উঠবে। শারীরিক সম্পর্কের দ্বারাই যদি শুধুমাত্র স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতো তাহলে এই পৃথিবীর সব স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কই স্বাভাবিক হতো, সুন্দর হতো। তুমি যেমন বললে এটা শুধুমাত্র একটা নিয়ম। তবে আমি এই নিয়মের একটু ব্যাতিক্রমী হতে চাই। যেদিন আমি তোমায় ভালোবেসে স্পর্শ করতে পারবো আর তুমি আমার সেই ভালোবাসাময় স্পর্শ অনুভব করতে পারবে সেদিন তোমার কাছে তুমি আমায় পাবে।”
কথাটা বলে গহন নিধির থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ফের জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছি। এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমার মাথায় এই কথাগুলো ঢোকালো কে? কি কারণে তুমি আমায় এই প্রশ্ন করলে? এই ক'দিনেই যথেষ্ট ভালো করে চিনেছি তোমায়। তুমি এই প্রশ্নগুলো অযথা করবে না। তোমার মাথায় এই প্রশ্নগুলো আসারই কথা না। আমার আড়ালে তোমার কানে এই নোংরা কথাগুলো কে ঢালছে?”
একটু নড়েচেড়ে উঠলো নিধি। সত্যি কথাটা স্বীকার করা যাবে না। চটপট একটা মিথ্যে সাজানোর চেষ্টা করে বলল।
“কেউ বলেনি। আমি নিজেই যথেষ্ট বুদ্ধিমতী।”
“আজ আমায় বলছো না তো ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রেখো, এই বাড়িতে আমি ছাড়া তোমার কেউ নেই। তোমার স্বামী ভালো হোক কিংবা খারাপ হোক তবুও শুধুমাত্র তোমার স্বামীই আছে। কথাটা মাথায় রেখো।”
গহন আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো সেখানে। ভাবলো এবারে হয়ত নিধি কিছু বললেও বলতে পারে। নিধিরও হঠাৎ করে মনের মাঝে সন্দেহ তৈরি হলো ঋতু কে নিয়ে। গহন কে সত্যিটা বলে দেওয়া উচিত কিনা বুঝতে পারছে না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন নিধি কিছু বলল না তখন গহন হতাশ হলো। যেই চলে যেতে ধরলো অমনি নিধি তড়িঘড়ি করে বলল,
“জারা আপু কে আপনি ভালোবাসতেন এই কথাটা আমায় বলেননি কেন?”
গহন চমকে উঠে নিধির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কাকে ভালোবাসতাম?”
নিধি হালকা তুঁতলে বলল,
“জারা আপুকে। আমি জানি। সব জানি।”
“কার কাছ থেকে জেনেছো?”
“সে সব জেনে আপনি কি করবেন। কথাটা তো সত্যি। এখনো আপনার মনে জারা আপুর জন্য ভালোবাসা রয়েই গেছে সেজন্যই তো আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক না তাই না?”
“শাট আপ। আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক না আমাদের জন্য। এর মাঝে জারা কে টানছো কেন আর আমি জারা আমি কোন দিন ভালোবাসতাম? কে বলেছে এই কথাগুলো তোমায়? জারা বলেছে না আমি বলেছি?”
“না, আপনারা কেন বলতে যাবেন। চোর কি চুরি করে স্বীকার করে নাকি?”
কথাটা বলে নিধি মুখ ভেঙচালো। গহন যথাসম্ভব নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বলল,
“ভালোবাসা আর চুরি দুটো বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। আর সম্পর্কের কথা বলছো আমার আর জারা মাঝে। অথচ আমরা দুজনের কেউই তোমায় এই কথাটা বলিনি আর তুমি তৃতীয় পক্ষের থেকে শুনে বিশ্বাস করে নিলে। ওয়াও! কত বুদ্ধি তোমার।”
নিধির বুঝতে বাকি রইল না যে গহন ওকে অপমান করলো। মৃদু রাগী গলায় বলল,
“জানি তো আমার বুদ্ধি নেই। বুদ্ধি থাকলে তো নিজেই ধরে ফেলতাম। আর আমি বোকা জন্যই আপনারা আমাকে বোকা বানাতেও পেরেছেন।”
“চুপ করো নিধি। আমি তোমাকে ক্লিয়ারলি বলছি আমার আর জারার মাঝে এমন কোন সম্পর্ক ছিল না। বুঝতে পেরেছো? আমরা দুজনে খুব ভালো বন্ধু। জারা আমার সবথেকে ভালো বন্ধু। ও আমাকে খুব ভালো বোঝে এগুলো সব ঠিক। কিন্তু আমি জারা কে ভালোবাসতাম এই কথাটা সম্পূর্ণ ভুল।”
“তাহলে জারা আপু ভালোবাসতো?”
এবারে গহন একটু বিপাকে পড়লো। এই কথাগুলো গহন নিধি কে জানাতেই চায়নি। তাহলে হয়তো জারা আর নিধির সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখন আর না বলেও উপায় নেই। কেননা গহন এখন চুপ থাকলে নিধি আরো বেশি ভুল বুঝবে ।
“ছিল জারার দিক থেকে অনুভূতি। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ একপাক্ষিক। জারা কখনো জোর করে আমার থেকে ভালোবাসা আদায় করার চেষ্টাও করেনি। ও এমন মেয়ে না। ওর যথেষ্ট সেল্ফ রেসপেক্ট আছে।”
নিধির কেন যেন ঠিক হজম হলো না গহনের বলা কথাগুলো। ঋতুর থেকে যেগুলো শুনেছিল তার থেকে তো গহনের কথাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদিকে আবার ঋতুর থেকে গহনের কথায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। আবার ঠিক বিশ্বাস করে উঠতেও পারছে না। ওই যে মনের মাঝে একটা সন্দেহ তৈরি হয়ে গেছে। নিধি একহাতে মাথা চুলকে বলল,
“আমি তো অন্য কিছু শুনেছিলাম। আপনার মায়ের নাকি জারা আপুকে পছন্দ না জন্য আপনি বিয়ে করেননি জারা আপুকে। গহন, মিলছে না তো। এই আপনি সত্যি জারা আপুকে ভালোবাসতেন না তো? আমাকে মিথ্যে বলছেন না তো? আমাদের সংসারের উপর কোন প্রভাব পড়বে না তো? আমাকে তো বলল আমার সংসার টিকিয়ে রাখা নাকি মুশকিল হতে পারে।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল নিধির দিকে। দুহাতের আজলায় নিধির ছোট্ট মুখটা নিয়ে ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“যদি আমি জারা কে ভালোবাসতাম তাহলে ওকেই বিয়ে করতাম। মা কে বোঝানো কোন ব্যাপার ছিল না আমার জন্য। কিন্তু আমি জারা কে বিয়ে করিনি তার কারণ ওর প্রতি আমার তেমন কোন অনুভূতি ছিল না। বোঝার চেষ্টা করো নিধি।”
নিধি শুধু হা করে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বলা কথাগুলো শুনলো। একটু বিরতি নিয়ে গহন ফের বলে উঠলো,
“সংসারের পেঁচালো বিষয়গুলো তোমায় বুঝতে হবে নিধি। কাকে কি বললে, কার কোন কথায় সায় জানালে, কাকে কি বলার সুযোগ দিলে তোমার সংসারে অশান্তি তৈরি হতে পারে এই কথাগুলো তোমায় বুঝতে হবে। কে আসলেই তোমার ভালো চায়, আর কে তোমার ভালো সহ্য করতে পারে না তাদের চিনতে হবে। এত অবুঝ হলে হবে না নিধি।”
খুব তাড়াতাড়ি গহনের কথাগুলোর অর্থ নিধি ধরে ফেলল। খুব ভালো করে বুঝতে পারল ঋতু ওকে গাধা বানিয়েছে। মানে যা ইচ্ছে তাই বলে গেছে আর নিধি চুপচাপ বিশ্বাস করে নিয়েছে। এই বাড়িতে এই একটা মানুষকেই ভালো ভেবেছিল নিধি। কিন্তু এ তো আরও বড় বজ্জাত। একেবারে নিধির সংসারে হামলা করেছে। নিধি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো যে আর একবার শুধু ঋতু গহন আর জারা কে নিয়ে কিছু বলুক। তারপরে যদি ঋতুকে সোজা না করেছে তবে নিধি নিজের নাম বদলে ফেলবে।