গহনের কথা একেবারে সত্যি হলো। বাড়ির পরিবেশ একেবারে ঠান্ডা। গতকাল রাতের ঘটনাটা নিয়ে কেউ নিধি কে একটা কিছু বলল না। কিন্তু কেন বলল না এই কথাটা নিধি ভেবে পাচ্ছে না।
সকাল সকাল উঠে দেখলো শম্পা নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে একেবারে তৈরি। বোধহয় রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল। নিধি খুব খুশি হলো ওর ব্যাগপত্র গোছানো দেখে। অন্তত একটা ঝামেলা অবশেষে ঘাড় থেকে নামবে। তবে বেশিক্ষণ খুশি থাকতে পারলো না নিধি। কিছুক্ষণ পরেই কানে খবর এলো যে শম্পা আর ওর ছেলে দুজনেই নাকি ভীষণ অসুস্থ। গতকাল রাত থেকে হঠাৎ করে তুমুল জ্বর।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিধি। ওর কপালে বোধহয় সুখ লেখাই নেই।
সকালের নাস্তা শেষে গহন ঘরে এসে অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। খেয়াল করছে বেশ অনেকক্ষণ থেকে নিধি ওর পেছনে ঘুরঘুর করছে। গহন যেদিকে যাচ্ছে নিধিও পেছন পেছন সেদিকেই যাচ্ছে। বোধহয় কিছু বলার চেষ্টা করছে তবে বলে উঠতে পারছে না। বেশ কিছুটা সময় নিধির এমন পাগলের মতন আচরণ খেয়াল করার পর অবশেষে গহন থেমে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে? কেউ তো কিছু বলেনি।”
“আমি জানি আপনি বাড়িতে আছেন জন্য কেউ কিছু বলেনি। আপনি চলে গেলে আপনার মা শুরু করে দেবে।”
গহন কিছু বলে উঠতে ধরলো ওর মা কে নিয়ে কথা বলার জন্য। তবে তার আগে নিধি নিজেই ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখুন অযথা কথা শোনাবেন না আমাকে। আপনিও খুব ভালো করে জানেন আপনার মা কেমন। আমি ওনাকে খারাপ বলছি না। কিন্তু আপনি জানেন উনি কেমন। আর আমি জানি উনি কথা শোনাবেন আমাকে। আর আপনার খালারা তো মুখ একেবারে ফুলিয়ে বেলুনের মতন করে রেখেছে। কখন না জানি ফেটে যায়। আপনি এক কাজ করুন আমায় কোথাও একটা নিয়ে চলুন। আপনি অফিস থেকে ফেরার পথে আবার নিয়ে আসবেন।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ ভাবলো কি করা যায়। কিন্তু ভাবনা চিন্তা করেও কোনো সমাধান খুঁজে পেল না।
“ফুপিরা বাড়িতে নেই। জারার দাদু বাড়ি গেছে। নয়তো ওখানে রেখে আসতাম। তুমি তো তোমার বাবার বাড়িও যাবে না। তাহলে আমি কি করবো বলো? কোথাও যে তোমায় রেখে আসবো তেমন কোনো জায়গাই নেই।”
নিধি অসহায় মুখ করে বলল,
“তাহলে হয় আপনি থাকুন নয়তো আপনার খালাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে যান।”
“এভাবে বের করে দেওয়া যায় নাকি! আর আমি গতকালও অফিসে যাইনি। আজ যেতেই হবে। গুরুত্বপূর্ণ তিনটে মিটিং আছে। একটাও ক্যান্সেল করা যাবে না।”
নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তাহলে আর কি। আমি বাড়িতেই থেকে যাই আপনার মা, খালাদের কথা শোনার জন্য।”
____________
“মা আসতে পারি!”
সালমা বেগম তখন ঘরে বাকি সবাইকে নিয়ে বসে গল্পগুজব করছেন। গহনকে আসতে দেখে সবার হাসি ঠাট্টা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সবাই একযোগে ভেঙচি কেটে নিজেদের মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। সালমা বেগম তেমন কিছুই করলেন না। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে অনুমতি দিলেন। গহন ভিতরে এসে সালমা বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমার সাথে একটু কথা ছিল মা।”
সালমা বেগম বুঝলেন যে গহন তার সাথে একাকী কথা বলতে চাইছে। ইশারায় বাকি সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। সবাই চুপচাপ চলে গেল। সবাই বেরিয়ে যেতেই গহন গিয়ে ওর মায়ের পাশে বসলো। গহন কিছু বলে ওঠার আগে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার বউয়ের যেন কোন অসুবিধা না হয় সেটাই নিশ্চিত করতে এসেছো?”
গহন একটুও চমকানো না। ও জানে ওর মা ওর চোখের ভাষা পড়ে নিতে পারে। গহনের মনের কথা খুব সহজেই বুঝে যেতে পারে। আলতো হেসে বলল,
“তার মানে তুমিও জানো আমার অনুপস্থিতিতে নিধির অসুবিধা হতে পারে, তাই না মা?
“নতুন বউ হয়ে যদি বড়দের মুখেমুখে এভাবে তর্ক করে অসুবিধা তো হবেই বাবা। শ্বশুর বাড়িতে টিকে থাকা কি এত সহজ? তোমার কি মনে হয় তোমার মায়ের সংসার সহজ ছিল? এই বাড়িতে তোমার বাবা-দাদী সবাই আমার জন্য পরিবেশটা প্রতিদিন কঠিন করে তুলতো। আমাকে কখনো দেখেছো কারো মুখে মুখে এভাবে তর্ক করতে?”
“নিধি তো ওর নিজের জন্য তর্ক করেনি মা। আমার জন্য তর্ক করেছে। ও আমার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আসলে মা সবার তো আমার মতন ধৈর্য হয় না যে, যে কেউ এসে কথা শুনিয়ে গেলে চুপচাপ সহ্য করবে। সবার থেকে এই ব্যাপারটা আশা করাও উচিত না। আমার কথা রাখার জন্য নিধি যথেষ্ট চুপ থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সব সময় তো আমি ওকে চুপ থাকতে বলতেও পারি না মা। জোর করা হয়ে যায়। সব বিষয়ে জোর খাটে না। সে যতই আমি ওর স্বামী হই না কেন।”
সালমা বেগম শুধু হাসলেন। গহনের মনে হলো আলাদা করে সালমা বেগমকে আর কোন কিছু বলার দরকার নেই। উনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী একজন মানুষ। বুঝেই গেছেন গহনের এখানে আসার পেছনের কারণ।
গহন চুপচাপ উঠে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“আজকাল আমার ছেলেকে কেমন যেন অপরিচিত লাগে আমার। আমি আজকাল আমার ছেলেকে বুঝতে পারছি না। আমাদের দুজনের মাঝে যেন দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে বাবা।”
থেমে গেল গহন। আর পা উঠতে চাইলো না সামনে এগোনোর জন্য। কিছুক্ষণ নিজ মনে কিছু একটা ভাবলো। পিছন ঘুরে সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গেল। হাতে থাকা ব্যাগটা বিছানার ওপর রেখে দুই হাতের আঁজলায় সালমা বেগমের মুখটা নিয়ে মায়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“তোমার ছেলে সারা জীবন তোমার থাকবে মা। দূরত্ব তৈরি হওয়ার কি আছে? আমার কাছে সব সম্পর্কের মানে, সব সম্পর্কের সমীকরণ, সব সম্পর্কের জায়গা আলাদা। যে যার জায়গাতে পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে থাকবে। তুমি জানো তোমার ছেলে সম্পর্ক ভাঙতে না, গড়তে ভালোবাসে। এখন আসছি।”
কথাটা বলে গহন উঠে দাঁড়ালো। চলে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল। পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে তার ভেতর থেকে কয়েকটা এক হাজার টাকার নোট বের করে মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“খালাদের যাতায়াত ভাড়া দিয়ে দিও। পরে যদি আমি ভুলে যাই তাই আগেই দিয়ে রাখলাম।”
কত টাকা দিলো সেটা গহন হিসেব করার প্রয়োজন মনে করলো না। তবে এতোটুকু জানে যে কম হবে না। বরং হলে বেশিই হবে। নিজের মা কে এত গুনে টাকা দিতে পছন্দ করে না গহন। সালমা বেগম টাকাটা নিলেন। উনি টাকাটা নিতেই গহন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কি এক ভয়ংকর দোটানার মাঝে পড়ে গেছেন। কেন যে তার মাঝে এত অস্থিরতা তৈরি হয় হঠাৎ করে কে জানে।
__________
ঋতু আর নিজ থেকে এগিয়ে এসে নিধির সাথে গহন আর জারা কে নিয়ে কিছু বলেনি। বলার হয়তো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাই নিধি ভাবল যে ঋতুর সাথে গিয়ে একটু গল্প গুজব করবে। এমনিতেই টুকটাক কথাবার্তা বলবে। তারপরে নিশ্চয়ই কথায় কথায় ঋতু আবারও জানতে চাইব ওর আর গহনের সম্পর্কের কথা। তারপরে হয়তো আবারও গহন আর জারা কে নিয়ে কিছু বলতে পারে।
যেই ভাবা সেই কাজ। ঋতুর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ওকে ডাকলো নিধি। তৎক্ষণাৎ উত্তর ভেসে এলো না। কিছুটা সময় বিরতি নিয়ে তারপরে ঋতুর উত্তর ভেসে এলো। ঋতুর কন্ঠ পেয়ে নিধি ঘরে এলো। দেখল ঋতু বিছানায় শুয়ে আছে। ঘরে সাবিত নেই। কে জানে কোথায় গেছে।
নিজে এগিয়ে গেলো ঋতুর দিকে। ওকে আসতে দেখে ঋতু শোয়া থেকে উঠে বসলো। খুব কষ্ট হলো উঠে বসতে। নিধি ওকে সাহায্য করলো। মাথার পিছনে একটা বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল। তারপরে নিজেও ঋতুর পাশে বসে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“শরীর খারাপ নাকি তোমার?”
শরীরটা সত্যি বড্ড খারাপ ঋতুর। গতকাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি। কতবার যে বমি করেছে তার হিসেব নেই। সকাল থেকে তাও যা একটু ভালো আছে। তবে শরীরটা ভীষণ দুর্বল। এর মাঝে তো পেটে আবার হালকা একটু ব্যথা করছিলো। কিন্তু তারপরও ঋতু মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল।
“ওই আর কি। একটু খারাপই শরীরটা। এই সময় যা হয়।”
“তো ডাক্তারের কাছে যাচ্ছো না কেন? ঝুঁকি নেয়া উচিত না। ডাক্তার দেখানো উচিত ছিল তোমার।”
“হ্যাঁ। আসলে ভাবছিলাম ডাক্তারের কাছে যাব। আমার মা কে কল করেছিলাম। মায়ের শরীরটাও আজকে ভালো না। সেজন্য ভাবলাম কাল পরশু চলে যাব।”
ঋতুর কথাটা শুনতেই নিধি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“তোমার মায়ের অপেক্ষা করতে হবে কেন? তোমার হাজবেন্ড কোথায়? ওনাকে তো আমি সারাদিন কোন কাজ-বাজ কিচ্ছু করতে দেখি না। ঘরেই তো বসে থাকেন। তাহলে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে অসুবিধা কি?”
“আসলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ও অতক্ষণ বসে থাকতে পারে না। বিরক্ত হয়ে যায়। আবার আমিও একা একা চলাফেরা করতে পারিনা। আমাকে ধরে ধরে হাঁটাতে হয়। ও আসলে এসব পারে না।”
নিধির কপালে তৈরি হওয়া ভাঁজটা আরো গাঢ় হলো। অসন্তুষ্ট গলায় বলল,
“এ আবার কেমন কথা। পারেনা বললে তো হবে না। পারতে হবে ওনাকে। তুমি ওনার স্ত্রী।ওনার প্রতিবেশী না যে দায়িত্ব পালন করলেও চলবে না করলেও চলবে। কোথায় তোমার স্বামী?”
নিধি কথাটা বলতেই বারান্দা থেকে সাবিত বেরিয়ে এলো। এতক্ষণ ঘরেই ছিল। ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল। নিধির কন্ঠ শুনেই মূলত ঘরে এলো। নিধিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সাবিতের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। নিধির দিকে এগিয়ে এসে বিছানায় একেবারে ওর পাশেই বসে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“আরে ভাবি তুমি এসেছো। কি সৌভাগ্য আমার যে আমার ঘরে তোমার পা পড়েছে।”
সাবিত কে নিজের এতটা কাছাকাছি বসতে দেখে নিধির একটু অস্বস্তি হলো। বসা অবস্থাতেই ঋতুর দিকে এগিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,
“ও মা তাই নাকি? আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে আমি এত মূল্যবান কোন মানুষ যার পা আপনার ঘরে পড়ায় আপনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবেন। যদি আগে জানতাম তাহলে আরো আগেই চলে আসতাম ভাইয়া।”
“তাহলে তো বলতে হচ্ছে আমারই ভুল হয়েছে। আগেভাগে তোমাকে কথাটা বলে দেওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, এখন বলো কেমন আছো? দিনকাল ভালো কাটছে তো?”
“আমার কথাটা না হয় এখন থাক ভাইয়া। আগে আপনার স্ত্রীর দিকে তাকান। ওনার দিনকাল মোটেও ভালো কাটছে না। উনি ভীষণ অসুস্থ। ওনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া ভীষণ প্রয়োজন।”
সাবিত বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“তো যাক না। আমিতো নিষেধ করিনি ওকে। ঋতু, প্রয়োজন হলে ডাক্তারের কাছে যাও। তুমি কি ভাবিকে বলেছো নাকি আবার যে আমি তোমাকে যেতে নিষেধ করেছি? কেন আমাকে ভাবির কাছে খারাপ বানাচ্ছো বলোতো?”
সাবিতের কথাটা শুনে ঋতু তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলে উঠলো,
“না, আমি এমন কিছু বলিনি নিধি কে। বিশ্বাস করো আমি তোমার সম্বন্ধে খারাপ কিচ্ছু বলিনি নিধি কে।”
সাবিত হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল,
“তাই? তাহলে ভাবি এভাবে বলছে কেন আমাকে?”
নিধির কেন যেন ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগলো। নিধি তো একটা সাধারণ কথা বলেছে। আর হঠাৎ করে বললেই বা কেন যে নিধির কাছে ঋতু ওকে খারাপ বানাচ্ছে? আবার ঋতুই বা একটা সাধারণ প্রশ্নে এমন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল কেন? মুখ দেখেই মনে হচ্ছে ভয় পেয়ে গেছে। আমতা আমতা করছে। উত্তর দিতে পারছে না। ঋতুকে এভাবে ভয় জড়োসড়ো হয়ে যেতে দেখে নিধি নিজেই বলে উঠলো,
“ভয় পাচ্ছো কেন ভাবি? আর ভাইয়া, সত্যিই ভাবি আমার কাছে আপনার নামে কোন নিন্দা করেনি। আমি তো একটা সাধারণ কথা বলেছি যে ভাবিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। আর সেই দায়িত্ব নিশ্চয়ই আপনার যেহেতু উনি আপনার স্ত্রী। ওনার গর্ভে আপনার সন্তান আছে তাই না?”
এবারের সাবিত কে কোন উত্তর দিতে হলো না। সাবিত কিছু বলে ওঠার আগেই ঋতু বলে উঠলো,
“তোমাকে এত কিছু ভাবতে হবেনা নিধি। আমি বুঝে নেব। যখন আমার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হবে আমি চলে যাব। কার সাথে যাবো, কার সাথে যাবো না, আমায় নিয়ে যাওয়া কার দায়িত্ব সেই নিয়ে তোমায় এত কথা বলতে হবে না।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেল নিধি। এতক্ষণ তো ভালোই ছিল। হঠাৎ করে আবার এই মেয়ের কি হয়ে গেল। নিধি কিছু বলে উঠতে ধরলে ঋতু বেশ কঠিন গলায় বলল,
“আপাতত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার থেকে আমার বিশ্রাম নেওয়াটা বেশি দরকার। যদি একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগটা আমায় দিতে খুব ভালো হতো নিধি।”
অপমানিত হলো নিধি। যাকে বলে একেবারে এগিয়ে এসে অপমানিত হওয়া। এখানে আর এক মুহূর্ত বসার রুচি হলো না নিধির। হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল সেখান থেকে।
ঋতু খেয়াল করলো সাবিত কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে নিধির যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। সাবিতের সেই দৃষ্টির আসল মানে ঋতুর বুঝতে একটুও ভুল হলো না। ঋতুরই তো স্বামী। এতদিনের সংসার, তার আগে কয়েক বছরের প্রেম। সাবিত কে চিনবে না এটা তো অসম্ভব।
“ভুলে যেওনা সম্পর্কে উনি তোমার বড় ভাবি।”
ঋতু সাবিত কে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল। সাবিতের ধ্যান ভাঙ্গলো। ঋতুর দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে বলল,
“তাই নাকি? তুমি না বললে তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আসলে তুমি ভাবিকে এমন ভাবে নাম ধরে ডাকছিলে তো সেজন্য আমি হঠাৎ করে সম্পর্কটাই ভুলে গিয়েছিলাম। আরেকটু হলে আমিও নিধি বলেই ডাকতাম।”
“নিধি বয়সে আমার থেকে ছোট সেজন্য আমি ওকে নাম ধরে ডাকি।”
“সে তো ভাবি আমার থেকেও বয়সে অনেক ছোট। ভাবি এই বাড়িতে আমাদের সবার থেকে বয়সে ছোট। সেই সাথে সব থেকে বেশি সুন্দর আর আকর্ষণীয়ও তাই না?”
কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠল সাবিত। ওর কথা বলার ভঙ্গিতেই কেমন যেন একটা নোংরামির ছোঁয়া পেলো ঋতু। খুব বিরক্ত হলো। মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,
“আর কত নোংরামি করবে? দয়া করে এবার নোংরামিটা ছাড়ো। বয়স তো তোমার কম হলো না। এবার একটু নিজেকে শোধরাও। আমাদের সন্তান আসতে চলেছে সাবিত। অন্তত ওর কথা ভেবে হলেও নিজেকে শোধরাও।”
ঋতুর কথাটা শুনে সাবিত শব্দ করে হাসা থামলো। তবে এখনো হাসছে। বসা অবস্থাতে ঋতুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে এক হাতে শক্ত করে ঋতুর চোয়াল চেপে ধরলো। ঋতু ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো। আকুতির স্বরে বলল,
“ছাড়ো সাবিত। লাগছে আমার। ব্যথা পাচ্ছি তো।”
সাবিতের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখন ঠিক কতটা রেগে আছে ঋতুর ওপরে। হাসতে হাসতেই ঋতুতে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যে সন্তানকে আমি চাইই না তার জন্য নিজেকে শোধরাবো কেন বেবি? আসলে কি বলোতো, না আমি এই সন্তান কে চাই। আর না এখন আমি তোমাকে চাই। বিয়েই তো তোমাকে আমি করতে চাইনি। তারপরও তুমি জোর করলে, তখন সুন্দর ছিলে দেখতে সেজন্য ভাবলাম যে লস তো হবে না। অন্তত বাড়িতে পার্মানেন্ট কেউ থাকবে। কিন্তু এখন না তোমার মাঝে সেই সৌন্দর্যটা নেই যেটা আমায় আকৃষ্ট করতো তোমার প্রতি। তুমি একবার নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছো। কেমন যেন হয়ে গেছো তুমি দেখতে। ওজন বেড়ে গেছে, গায়ের রংটা কালো হয়ে গেছে। সারাদিন অসুখ-বিসুখ লেগেই আছে। তোমায় দেখলে এখন আর সেই ফিলটা আসেনা।”
এখনো সাবিত ঋতুর চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ঋতুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। তবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সাবিত শক্ত করে চোয়াল চেপে ধরে রাখার জন্য সেই ব্যথায় চোখ দিয়ে জল পড়লো। নাকি সাবিতের কথাগুলো বুকে গিয়ে আঘাত করার জন্য চোখ থেকে জল পড়লো।
একটু পর সাবিত ছেড়ে দিল ঋতু কে। উঠে চলে গেল আবারো বারান্দায়। আর ঋতু বরাবর যা করে আসছে তাই করলো। নিঃশব্দে শুধু কাঁদলো।