আজ বেশ সকাল সকাল গহন অফিসে চলে গিয়েছিল। নিধি তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে। গহন তাই আর ওকে বিরক্ত করেনি। নিধির ঘুম ভেঙেছিল সকাল আটটা নাগাদ। উঠে আগে সবার জন্য সকালের নাস্তা বানালো। আজকাল নিধির কাজের চাপ একটু কমই থাকে। শুধু তিনবেলা রান্নাবান্নাটাই করতে হয়। বাকি সব কাজ মিতাই করে দিয়ে যায়। রান্নাবান্নায়ও মিতা যতটুকু পারে সাহায্য করে।
সকাল এগারোটা নাগাদ গহন আবার বাড়ি ফিরলো। একটা জরুরী ফাইল বাড়িতে ফেলে রেখে গিয়েছিল। গহন বাড়িতে এসে শুধু ফাইলটা নিয়েই আবার যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। তবে নিধি ওকে যেতে দিতে নারাজ। সকালে তো খেয়ে যায়নি। আর নিধি খুব ভালো করে জানে এই মানুষ কিচ্ছু খাবে না। রান্না তো হয়ে গেছে। সেই জন্য গহন কে জোরাজুরি করলো যেন খেয়ে যায়।
নিধির জোরাজুরির প্রেক্ষিতে গহন তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
“এখন সময় হবে না নিধি। আর তাছাড়া গাড়িতে জারা বসে আছে।”
“সে কি! জারা আপু নিচে কেন? উপরে নিয়ে আসেননি কেন? আক্কেল নেই আপনার।”
“ও আসবে না ওপরে সেইজন্য আনিনি।”
“আরে তো আপু থাকুক না। কত সময় লাগবে আপনার খেতে।”
গহন কোনমতেই শুনলো না নিধির কথা। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। গহন চলে যেতেই নিধি আবারও রান্না ঘরে গেল। ভাবলো এখনই দুপুর আর রাতের রান্নাটাও করে রাখবে। যেন রাতে গহন বাড়ি ফিরলে আর কোন কাজ না থাকে। একটু নিশ্চিন্তে মনে গোমরামুখোটার সাথে বসে দু চারটে গল্প করতে পারে।
রান্নাবান্নার মাঝে সেখানে ঋতু এলো। ঋতুর হাতে একটা বাটি আর তাতে ফল। নিধির পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফল খেতে খেতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া না খেয়েই চলে গেছে?”
“হ্যাঁ। আসলে অফিসে কি যেন মিটিং আছে।”
“তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম জারা আপু নিচে অপেক্ষা করছে জন্য বোধহয় এত তাড়াহুড়ো করে গেল। আমিতো জানালা দিয়ে দেখলাম জারা আপু দাঁড়িয়ে আছে ভাইয়ার গাড়ির সামনে।”
নিধি আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ জানিতো জারা আপু এসেছিল। তবে ওপরে আসতে চায়নি। বোধহয় তোমার স্বামীর জন্য।”
অপমানিত হলো ঋতু। তবে সেটুকু আর নিধি কে বুঝতে দিতে চাইলো না। চোখে মুখে একটু সন্দেহী ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“সে নাহয় বুঝলাম। কিন্তু ভাইয়া কি সত্যি মিটিং এর জন্যই তাড়াহুড়ো করছিল? তুমি নিশ্চিত?”
নিধি ভ্রুঁ কুঁচকে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখানে নিশ্চিত না হওয়ার কি আছে?”
ঋতু নিধির দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“দেখো নিধি, আমি তোমাকে বলছি না সন্দেহ করতে। কিন্তু বোকামি করতেও বলবো না। যদি ভাইয়ার মিটিংয়ে যাওয়ার থাকে তাহলে জারা আপু কি করছিল ওনার সঙ্গে? তুমি একবার ভেবে দেখো তো যদি ওনার এতটাই ব্যস্ততা থাকে তাহলে জারা আপুকে পেলেন কোথা থেকে? জারা আপু তো রাস্তাঘাট তেমন চেনে না। নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিল।”
ব্যাপারটা নিধির কাছেও একটু খটকা লাগলো। সত্যিই তো এতই যদি ব্যস্ততা থেকে থাকে তাহলে এর মধ্যে আবার জারা কে কোথা থেকে টেনে আনলো। তবে ঋতুকে সেটা বুঝতে দিতে চাইলো না। একটু হেসে কথাটা উড়িয়ে দিতে চাইলো।
“না না। তুমি যেরকম ভাবছো তেমনটা না। যদি ওনার অন্য কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে কি আর বাড়িতে আসতেন? আর আমাকে জানানোরই বাকি প্রয়োজন ছিল? উনি নিজেই জানিয়েছেন যে নিচে জারা আপু অপেক্ষা করছে।”
“যেন তোমার সন্দেহ নাহয় সেজন্য হয়তো বলেছে।”
নিধি এবার একটু চমকে উঠে ঋতুর দিকে তাকালো। ঋতুর চোখেমুখে নিধির জন্য একটু মায়া ফুটে উঠেছে। নিধির হঠাৎ করে বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। বুঝে উঠতে পারল না গহন ওকে যা বুঝিয়েছিল সেটা ঠিক নাকি ঋতু ওকে যা বোঝাতে চাইছে সেটা ঠিক।
সত্যিই তো জারার সব সময় গহনের সাথে থাকা ব্যাপারটা তো ভালো না। দুদিন আগেও তো এসেছিল গহনের সাথে দেখা করতে। যদিও সেদিন জান্নাত ছিল সঙ্গে। তবে জান্নাত মেয়েটা তো বোকাসোকা সেটা নিধি বুঝতে পেরেছে। নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ঋতু ফের বলে উঠলো,
“তোমার মনে আছে নিধি সেদিন যে জারা আপু সাবিত কে কত আজেবাজে কথা শুনিয়ে গেল। মা কত বার করে ভাইয়াকে বলল যেন জারা আপুকে কিছু বলে। ভাইয়া কিন্তু একটা কথাও বলেনি। একবারও কিন্তু আটকাইনি। জানো নিজের পরিবার, পরিবারের লোকজন সম্বন্ধে কথা বলা ভাইয়া একদমই পছন্দ করে না। কিন্তু জারা আপু এতো অপমান করলো সাবিত কে তারপরও ভাইয়া একটা কিছু বলল না। তুমি একবার ভেবে দেখো তো, যদি জারা আপুর জায়গায় তুমি থাকতে তোমাকে আটকাতো না ভাইয়া? ধরে নিলাম যে তোমায় বকাবকি করত না কিন্তু থামতে অবশ্যই বলতো নিধি।”
ঋতুর কথাটা একদমই ভুল না। গহন খারাপ ব্যবহার করে না নিধির সাথে। বকাঝকাও করে না। কিন্তু থামতে তো বলে। জারা যেভাবে অপমান গুলো করে গিয়েছিল সাবিত কে, নিধি যদি সেভাবে বলতো তাহলে হয়তো গহন রেগেও যেতে পারতো। তাহলে জারা কে কিছু বলে না কেন? কিসের এত দুর্বলতা জারার প্রতি?
নিধির শুকনো মুখটার দিকে তাকিয়ে ঋতুর মায়া হলো। আলতো করে নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“দুশ্চিন্তা করো না। আমি যেই কথাগুলো বললাম সন্দেহের বশে বলেছি। ঠিকও হতে পারে ভুলও হতে পারে। যদিও আমার মনে হয় না ভাইয়া এমন। কিন্তু জারা আপুর ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারছিনা আমি। তুমি তো বলেছিলে ভালোবাসাটা শুধু জারা আপুর পক্ষ থেকে ছিল। হতেই তো পারে দুর্বলতা এখনো থেকে গেছে। আর তোমাদের সম্পর্কের মাঝে এই ফাটলটা দেখে হয়তো সুযোগ বুঝে সেখানে ঢুকে যেতে চাইছে। তুমি জানো আমিও জানি ভাইয়া লাখে না, কোটিতে একজন। এমন জীবনসঙ্গী কে হাতছাড়া করতে চাইবে বলতো! আজকালকার যুগে কি ছেলেদের বিশ্বাস করা যায়! সেখানে ভাইয়া খুব ভালো একজন জীবন সঙ্গী। হতে পারে জারা আপু ওনাকে ছাড়তে চাইছে না।”
আরো কয়েক মুহূর্ত ঋতু নিধির কাছে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল সেখান থেকে। নিজের হাতদুটো অবশ হয়ে আসছে। কাজ করার শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না।
আচ্ছা সত্যি কি জারা খারাপ! সত্যিই কি নিধির থেকে সবকিছু কেড়ে নিতে চায়, গহন কে কেড়ে নিতে চায়? কিন্তু ওই মেয়েটাকে দেখে তো এমন মনে হয় না। সব সময় নিধির পাশে দাঁড়ায়, নিধির হয়ে কথা বলে। গহনকে অব্দি ছাড় দেয় না।
আচ্ছা গহন কি কোন ভাবে প্রশ্রয় দেয় জারা কে? কেন গহন জারা কে কিছু বলে না? সব সময় কেন নিধিকেই থামাতে আসে। আর কাউকেই তো থামায় না। শুধু নিধিকেই সব বিষয়ে থামায় কেন?
________
রাত আটটা নাগাদ গহন বাড়ি ফিরলো। সোজা আগে নিজের মায়ের ঘরে গেল না। শরীরটা আজ বড্ড ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন ভীষণ ব্যস্ততা আর কাজের চাপের মাঝে দিয়ে গেছে। দুপুরে শুধু একটা স্যান্ডউইচ খেয়েছিলো। আর কিছু যায়নি সারাদিন পেটে। তাই ভাবলো ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুঁয়ে খাওয়া দাওয়া করে তারপরে মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে।
ঘরে গিয়ে দেখলো নিধি বিছানার ওপর গালে হাত ঠেকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বসে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নিধির উপর দিয়ে যেন কোন ভয়ঙ্কর ঝড় বয়ে গেছে। একেবারে নিস্তেজ করে দিয়ে গেছে। মনমরা হয়ে বসে আছে মেয়েটা। ব্যাপারটা গহনের ভালো লাগলো না। বাড়িতে তো অশান্তি করার মানুষের অভাব নেই। নিধিকে কথা শোনানোর মানুষেরও অভাব নেই। কে জানে ওর অনুপস্থিতিতে আবার কিছু হলো কিনা!
কোটটা খুলতে খুলতে চিন্তিত ভঙ্গিতে নিধি কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,
“কিছু কি হয়েছে?”
সবেমাত্র নিধি গহনের উপস্থিতি খেয়াল করলো। এতক্ষণ এতটাই গভীর ভাবনায় নিমগ্ন ছিল যে বুঝতেই পারেনি গহন এসেছে। সেই সকাল থেকে ঋতুর বলা কথা গুলোই নিধি কে ভাবাচ্ছে। গহনের কন্ঠটা শুনে চমকে ওর দিকে তাকালো। কিছু একটা বলে উঠতে ধরেও আবার থেমে গেল। নিস্তেজ গলায় ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“না।”
ব্যাপারটা গহনের ঠিক লাগলো না। এক শব্দে কথা শেষ করার মেয়ে তো নিধি না। গহনের এই ছোট্ট একটা প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিশাল একটা উত্তর দেওয়ার কথা ছিল নিধির। তা না করে এত সংক্ষিপ্তভাবে শেষ করে দিল। তারমানে গন্ডগোল তো অবশ্যই আছে।
বিছানায় বসা নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর সামনা সামনি বসে ফের চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“সত্যি করে বলো কি হয়েছে?”
নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি হয়েও থাকে কি করবেন? আমার হয়ে ঝগড়া করবেন?”
“কে কি বলেছে সেটা আগে বলো?”
“ধরুন যদি আপনার মা কিছু বলে থাকে। তাহলে? উনি তো অসুস্থ। আপনি কিছু বললে আবার শ্বাসকষ্ট উঠে যেতে পারে। তাহলে কি আমাকেই ধৈর্য ধরে থাকতে হবে? আপনি কি তারপরও আমাকেই চুপ থাকতে বলবেন? মানে আপনি শুধু সব সময় কি আমাকেই সবকিছু করতে বলবেন? আর কাউকে থামতে বলতে পারেন না আপনি?”
একদমই ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই নিধির। খুবই শান্ত গলায় প্রশ্নগুলো করলো গহন কে।গহনের যেন মাথার উপর দিয়ে গেল নিধির বলা কথাগুলো। একেই তো সারাদিনের অতিরিক্ত খাটাখাটনির কারণে এখন যেন মাথাটা কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। তার ওপরে আবার নিধির এমন অদ্ভুত প্রশ্ন।
“একটু পরিষ্কার করে বলবে আমায় কি হয়েছে?”
নিধি একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“দুটো মিনিট সময় দিন আমায়। বলছি।”
কথাটা বলে নিধি আবারো জানালা দিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকানো। গহন ভীষণ ধৈর্যশীল পুরুষ। ধৈর্যের ব্যাপারে গহনকে বোধহয় কেউ কখনোই হারাতে পারবে না। সেজন্য নিধির বলা কথা অনুযায়ী চুপচাপ অপেক্ষা করলো।
ঠিকঠাক দু মিনিট পরে নিধির কথা বলার ইচ্ছে হলো কিনা সেটা নিধি নিজেও জানে না। তবে বেশ অনেকটা সময় পার হয়েছে মাঝে। গহনের দিকে ঘুরে বসে নির্জীব গলায় জিজ্ঞেস করল,
“জারা আপুর উপরে আপনার দুর্বলতা আছে?”
এতক্ষণে গহন যেন আন্দাজ করতে পারছে নিধির কি হয়েছে সেই ব্যাপারে। আবার ওর মাথায় ভূত ঢুকেছে। মুহূর্তের মাঝে গহনের মেজাজটা বিগড়ে গেল। বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আবার এই আজে বাজে প্রসঙ্গটা তুললে তুমি। আমার মনে হয় সেই দিনই এই প্রসঙ্গটার সমাপ্তি করেছি আমি। আর কিচ্ছু নেই যা আমি তোমায় নতুন করে জানাতে পারি।”
নিধি বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
“জিজ্ঞেস করেছি জারা আপুর প্রতি দুর্বলতা আছে কিনা। থাকলে হ্যাঁ উত্তর দিন, না থাকলে না উত্তর দিন। কথা শেষ।”
গহন অনেক কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“না নেই।”
“তাহলে জারা আপুকে কখনো কিছু বলেন না কেন? যতই রাগ করুক না কেন তাও কিছু বলেন না। আপনার পরিবারকে অপমান করলেও থামতে বলেন না। আপনাকে অবধি ধমকায় তাও আপনি কিছু বলেন না। কিন্তু কেন? ওই জায়গায় তো আমি থাকলে আমাকে ঠিকই চুপ করতে বলতেন। তাহলে জারা আপু কে কেন বলেন না?”
“তুমি কি চাইছো তোমায় আর জারা কে আমি এক জায়গায় বসাই?”
একটু থতমতো খেল নিধি। একটু নড়েচেড়ে উঠে বলল,
“তা কেন দেবেন। আমি তো আপনার বউ।”
“তাহলে বউয়ের সাথে যা করতে পারব বাকি সবার সাথে কি তাই করতে পারব আমি? তোমার উপর আমার যতটুকু অধিকার আছে জারার উপর কি আমার ততটুকু অধিকার আছে? তোমায় আমি অনেক কিছু করতে বলতে পারি, তোমায় আমি আদেশ করতে পারি, অনুরোধও করতে পারি। কিন্তু জারা কে পারলে শুধু অনুরোধই করতে পারি, আদেশ না।”
নিধি একটু একটু বুঝতে পারল গহনের কথার মানেটা। কিন্তু এখনো পুরোপুরি হজম হচ্ছে না ব্যাপারটা। আবারো বলে উঠলো,
“সেটা ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু জারা আপুর সাথে আপনার ব্যবহারটা অন্যরকম লাগে। কেমন কেমন যেন লাগে।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কেমন লাগে?”
নিধি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“কেমন লাগে মানে কেমন কেমন যেন লাগে। মানে মনে হয় জারা আপু আপনার খুব আপন। আপনি খুব দুর্বল ওনার প্রতি। আপনি ওনাকে কষ্ট দিতে চান না এমন মনে হয়। সেজন্য তো উনি আপনাকে ধমকায় ঠিকই কিন্তু আপনি ওনাকে ধমক দেন না।”
গহন পা তুলে বিছানার ওপরে বসে নিধির দিকে একটু এগিয়ে এসে ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“জারা সম্পর্কে আমার ফুফাতো বোন। তার থেকে বেশি কিছু হলে আমার খুব ভালো বন্ধু। আমরা দুজনে সমবয়সী। আমাদের মাঝে সম্পর্কটা অনেক সুন্দর। কিন্তু আমি ওকে কথায় কথায় ধমক দিতে পারি না নিধি। জারা আমাকে ধমক দেয়, ও আমার সাথে রাগারাগি করে সেটা ওর স্বভাব। কিন্তু একজন মেয়ে যার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই তার সাথে রাগারাগি করা, ধমকা ধমকি করা আমার স্বভাব না। আমার কাছে এটা অভদ্রতা মনে হয়।”
নিধি চোখ ছোট ছোট করে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমায় তো ঠিকই ধমক দেন।”
“ভালোও তো বাসি। তাহলে বরং জারাকেও ধমক দেবো সেই সাথে ভালোও বাসবো। এটাই ঠিক হবে। যেকোনো একটা করতে পারবো না। করলে দুটো একসঙ্গেই করবো। বলো করবো?”
নিধি চমকে উঠে বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো গহনের দিকে। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“কি বললেন ভালোবাসেন আমায়? সত্যি! আরেকবার বলুন? আপনি ভালোবাসেন আমায়? কিন্তু কবে ভালোবাসলেন, কিভাবে ভালোবাসলেন, কি কারণে ভালোবাসলেন, কতটুকুই বা ভালোবাসেন? আরে ভালোবাসেন আগে কেন বলেননি? ধুর! আগে এই কথাটা বললে কি সারাদিন আমায় এত চিন্তা করতে হতো। এখন আরেকবার বলুন তো। সত্যি ভালোবাসেন? আমাকেই ভালোবাসেন তো? মানে মন থেকে কথাটা বলেছেন নাকি আমার সন্দেহ দূর করার জন্য বলেছেন?”
গহন চোখে মুখে কিঞ্চিৎ বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলে নিধিকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“চুপ চুপ, একদম চুপ। এত প্রশ্ন কেউ করে। কোন সুস্থ মানুষ এত প্রশ্ন করতে পারে একসঙ্গে?”
নিধি আপাতত গহনের এসব কোন কথাই গায়ে মাখল না। গহনের দিকে একটু ঝুঁকে এসে আবদারের কন্ঠে বলল,
“গহন, আবার বলুন না ভালোবাসেন আমায়? সত্যি আপনি ভালোবাসেন? আপনি ভালোবাসতে জানেন? বউকে কি করে ভালোবাসতে হয় আপনি সত্যিই জানেন? আমার তো ভাবতেই অবাক লাগছে আমার স্বামী এতটা ভালো হয়ে গেছে যে আমায় ভালোবাসতে শুরু করেছে!”
নিধি একা একাই কথাগুলো বলল আর লজ্জা পেল। ওকে লজ্জা পেতে দেখে গহন অস্বস্তির মাঝে পড়ে গেছে। কেন যে কথাটা বলতে গিয়েছিলো কে জানে। মেয়েটা যে এই কথাটা নিয়ে কতক্ষণ ওকে খোঁচাবে আর লজ্জায় ফেলবে কে জানে। কার কার সামনে এই কথাটা তুলবে তার হিসাব নেই। গহন তাড়াহুড়ো করে উঠে যেতে ধরলো। তবে নিধি ওকে সেই সুযোগ দিলো না। হাত ধরে টেনে আবার বসালো।
“শুনুন না, আরেকবার বলুন না সত্যি আমায় ভালোবাসেন?”
গহন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করলো কিছুক্ষণ। প্রথমবার হঠাৎ করে কথাটা বলে ফেলেছিলো। তখন কথাটা খুব সহজ মনে হয়েছিল গহন এর কাছে। এমনটা না যে গহন নিধির মন ভোলানোর জন্য কথাটা বলেছিল। মন থেকেই কথাটা বেরিয়েছিল। কিন্তু এবার যেন খুব কঠিন মনে হলো। সেজন্যই তো আমতা আমতা করলো। এদিকে বরাবরের মতন গহন কে আমতা আমতা করতে দেখে নিধির রাগ উঠলো। এক ঝটকায় গহনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“বুঝেছি সবই মিথ্যে। ভালো-টালো কিচ্ছু বাসেন না। তাইতো বলি এই বয়সে এসে আবার ভালোবাসবেন কি করে। ভালোবাসার বয়সই তো আপনার শেষ।”
না আর চুপ করে থাকা যাবে না। গহনের মনে হলো কিছু একটা বলার দরকার। নয়তো নিধি কে যতোটুকু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলো আবার হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। একটু পর হয়তো আবার জারা কে নিয়ে কথা শুরু করবে। নিধি তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। গহন হালকা একটু কেশে নিধির মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। তবে মেয়েটা মূর্তির মতন বসে আছে। নড়াচড়াও করছে না।
গহন ডাকলো দু একবার নিধির নাম ধরে। তবে মেয়েটা ঘুরেও তাকালো না গহনের দিকে।
“তোমার আর জারার জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা নিধি। আমি তোমার সঙ্গে যা যা করতে পারি, তোমার সঙ্গে যে ব্যবহারটা করতে পারি জারার সাথে সেগুলো করতে পারিনা। সব থেকে বড় কথা আমি মানুষকে উপদেশ দিতে পছন্দ করি না। আমি কখনো কাউকে আটকাই না নিধি। যার যা ইচ্ছে বলে যায়। চুপচাপ শুনে যাওয়াটাই আমার কাছে ভালো লাগে। অন্তত কোন অশান্তি হয় না। তবে আমি তোমাকে কেন আটকাই জানো?”
নিধি একটু আগ্রহ খুঁজে পেল গহনের কথায়। তবে ওর দিকে তাকালো না। কন্ঠটা একটু নরমও করলো না। গম্ভীর গলাতেই বলল,
“কেন?”
গহন এবার নিধির একটা হাত টেনে ধরে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আলতো হেসে বলল,
“তার কারণ তুমি আমার যতটা আপন, তুমি আমায় যতটা ভালো বোঝো, ততটা তো আর কেউ বোঝে না। তোমার জায়গা তো সবার থেকে আলাদা নিধি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বাড়ি ফেরার পর তুমি আমার এক মুঠো স্বস্তি। চারিদিকের এত বিষন্নতার মাঝে তুমি আমার এক চিলতে হাসির কারণ। আমার মরুভূমির মতন শুষ্ক, উত্তপ্ত জীবনে তুমি এক পশলা বৃষ্টি হয় নেমেছো। যে আমার মন প্রাণ আমার জীবনটাকে সতেজ করে তুলেছে। নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। তুমি আমায় হাসতে শেখাচ্ছো নিধি। তুমি আমায় বাঁচতে শেখাচ্ছো। জীবনের প্রতি থেকে মায়া উঠে গিয়েছিল আমার। তবে আজকাল তোমায় দেখে বাঁচতে ইচ্ছে করে। মনে হয় তোমার সঙ্গে একটু সময় কাটানোর জন্য হলেও আমায় বাঁচতে হবে। এই জায়গাগুলোতো জারা পায়নি। তাহলে কি করে জারার সাথে সেই একই ব্যবহার গুলো করবো যেগুলো তোমার সাথে করি বলোতো?”
এতগুলো কথা শোনার পর নিধি আর কোন মতেই রেগে থাকতে পারলো না গহনের উপরে। এর আগের দিনের মতো আজকে আবারো ঋতুর উপরে রাগ হলো। শুধু শুধু মাথাটা গরম করে দিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটা বলে যে নিধির ভালো চায়। অথচ সংসারে অশান্তি এই মেয়েটার জন্যই হয়।
অবশ্য ঋতু কে দোষ দেওয়াও ঠিক না। ঋতু এই কথাগুলো বলে নিধির মাথাটা গরম করে দিয়েছিল জন্যই তো গহনের মুখ দিয়ে এতগুলো কথা বেরোলো। কি সুন্দর মিষ্টি মিষ্টি কাব্যিক কথা শোনালো গহন। ভাবা যায় যে এই মানুষটার মুখ দিয়ে এত মিষ্টি কথা বের হতে পারে। হুট করে নিধির কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে। সেই সাথে গহন কে একটু লজ্জায় ফেলতে ইচ্ছে করলো। আলতো করে গহনের কাঁধে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল,
“যাহ! এভাবে কেউ বলে! আমি তো লজ্জায় লুকোনোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না।”
গহন মোটেই লজ্জা পেল না নিধির কথাগুলো শুনে। বরং আলতো হেসে বলল,
“একান্তই যদি কোন জায়গা খুঁজে না পাও তাহলে আমি তো আছি। আমায় জড়িয়ে ধরে আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে যেতে পারো।
কথা দিচ্ছি, এতটা যত্নে সবকিছুর থেকে আড়াল করে রাখবো যে কোনো আঘাত, কষ্ট, বেদনা তোমায় ছুঁতে পারবে না।”