গতকাল সারারাত গহন আবারো ভালোমতো ঘুমোতে পারেনি। সারারাত পেট জ্বালাপোড়া করেছে। একটু বমি বমি ভাবও ছিল। রাতে ঠিকমত খেতেও পারেনি। ছেলেটা অসুস্থ হলেও একটুও কাউকে বুঝতে দিতে চায় না। কোথায় কি অসুবিধা হচ্ছে সেগুলো মুখ ফুটে বলেও না। চুপচাপ শুয়ে থাকে নয়তো বসে থাকে। একটু যে আর্তনাদ করবে সেসব কিছুও করেনা।
নিধি আজ গহনের আগে ঘুম থেকে উঠলো সকালে। ঘুমন্ত গহনের দিয়ে তাকিয়ে ভাবলো বোধহয় অনেক রাত অব্দি জেগেছিল। সেজন্য এখনো ঘুমোচ্ছে। কে জানে কত রাত অব্দি জেগেছিল। নিধি কে তো দেখিয়েছিল তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেছে। বুঝতে দেবে না তো নিধি কে যে কোথায় কি অসুবিধা হচ্ছে।
নিধি চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে রান্না ঘরে গেল। গতকাল রাতেও গহনের জন্য আলাদা করে রান্না করেছিল। তবে রান্না করেছিল মাংস। মাংস তো আর কম ঝাল মসলা দিয়ে খাওয়া যায় না। তবুও বাকিদের তুলনায় একটু কম ঝাল দিয়েই গহনের খাবারটা রান্না করেছিল। কিন্তু তাও সমস্যা হয়েছে। তাই নিধি ঠিক করেছে যে আজকে মরিচ ছাড়াই রান্না করে দেবে। খালি একটু চাল ডাল সিদ্ধ করে দেবে গহন কে।
রান্নাবান্না শেষে নিধি খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখছিল তখন। একে একে সবাই এসে টেবিলে বসলো। আগে সালমা বেগম এলেন। ওনার পিছন পিছন ঋতু, সাবিত আর সিনথিয়াও এলো। সবার শেষে এসে বসলো গহন।
সালমা বেগম আগে সাবিতের প্লেটে খাবারটা বেড়ে দিলেন। তারপরে দিলেন সিনথিয়া কে। নিধি তখন গহনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চুপচাপ শুধু খেয়াল করলো বিষয়গুলো। সিনথিয়ার প্লেটে খাবার তুলে দেওয়ার পর সালমা বেগম ঋতুর প্লেটেও তুলে দিলেন। ঋতুর প্লেটে খাবার তুলে দেওয়া শেষে এবার তিনি নিজের প্লেটের দিকে হাত বাড়ালেন।
নিধির আর অপেক্ষা করার ইচ্ছে হলো না। ভেবেছিল যে সালমা বেগম হয়তো গহনের প্লেটেও খাবার তুলে দেবেন। তবে ওনার আবভাব ঠিক সুবিধার লাগছে না।
নিধি গহনের জন্য যে পাতলা করে খিচুড়ি রান্না করেছিল সেটাই ওর প্লেটে তুলে দিল। সালমা বেগম আড়চোখে একবার তাকালেন গহনের প্লেটের দিকে। গহনের প্লেটে আলাদা খাবার দেখে সরাসরি নিধি কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি কি রোজ তোমাদের দুজনের জন্য আলাদা রান্না করো?”
নিধির ঠিক নেই কখন কোন খাবার খায়। কখনো গহনের জন্য যা রান্না করে সেটা খায়। কখনো আবার বাকিদের জন্য যা রান্না করে সেটাই খায়। তবুও সালমা বেগমের কথায় হ্যাঁ বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,
“হ্যাঁ মা।”
“কিন্তু কেন? আমাদের জন্য যা রান্না হয় সেটা তোমরা খেতে পারো না কেন?”
নিধি স্বাভাবিক গলায় বলল,
“গহনের সমস্যা হয় মা। তাই ওনার জন্য আলাদা করে রান্না করি আমি।”
“তাই নাকি? গহন, তোমার সমস্যা হয় আমাদের জন্য রান্না করা খাবার খেতে? তা আমাদের জন্য তুমি কি এমন রান্না করো নিধি যা গহন খেলে সমস্যা হয়? আলাদা করে কিছু মেশাও নাকি আমাদের খাবারে?এত বছর যাবত আমি সবার জন্য একই রান্না করে এসেছি। কোনদিনও তো গহনের অসুবিধা হয়নি।”
নিধি খুব সুন্দরভাবে ঠোঁটে মিষ্টি একটু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ওনার কি আর এক অসুবিধা মা! ওনার হাজার একটা অসুবিধা। কিন্তু বোঝার মতন কেউ নেই। উনি এমনিতেই স্বভাবে চুপচাপ মানুষ। আর তাছাড়া কতই বা অভিযোগ করা যায়। সেজন্য বুঝে নিতে হয় ওনার সমস্যাগুলো।”
গহনের শরীরটা তখনও ভীষণ খারাপ। সারারাত না ঘুমোনোর কারণে মাথাটাও প্রচন্ড যন্ত্রণা করছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে শরীরটা। তারমধ্যে এসব কথা ভালো লাগছে না। নিধির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলাতেই বলল,
“নিধি, খেতে বসো।”
নিধি খেতে বসতে চাইলো সত্যি। তবে তার আগেই সালমা বেগম নিধি কে উদ্দেশ্য করে আবারো বলে উঠলেন,
“সংসার আলাদা করার পরিকল্পনা করছো? একই রান্নাঘরে, একই পরিবারের মানুষদের জন্য দু'রকম রান্না হয়। দুদিন পর নিশ্চয়ই বাড়িও আলাদা করতে চাইবে। গহন তোমারও কি এমনই ইচ্ছে? যদি আলাদা হওয়ার ইচ্ছে থেকে থাকে তাহলে আমায় আগে থেকেই জানিয়ে দাও। আমি মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবো।”
গহন কিছু বলে উঠতে ধরলো। তবে নিধি ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে নিজেই সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাদের এমন কোন পরিকল্পনাই নেই মা। আপনার ছেলের ঝাল খাবার খেতে অসুবিধা হয়। মা হিসেবে নিশ্চয়ই এই কথাটা আপনি জানেন? কিন্তু জানা সত্ত্বেও আপনি কোন ব্যবস্থা নেননি। এখন ওনার কিছু হয়ে গেলে আপনার কিছু যায় আসবে কিনা জানিনা। তবে আমার অনেক কিছু যায় আসবে। উনি ছাড়া তো আপনাদের মাঝে টিকতে পারবো না আমি। আমার নিজের জন্য হলেও আমার ওনাকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। তার থেকেও বড় কথা আমি ওনাকে কথা দিয়েছি সারা জীবন ওনার পাশে থাকবো। তাই ওনার খেয়াল তো আমাকেই রাখতে হবে।”
কোন এক অজানা কারণে সালমা বেগমের মুখটা বন্ধ হয়ে গেল। সিনথিয়া মুখ ভেঙচিয়ে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আজকাল তুমি একটু বেশি কথা বলছো না! মায়ের মুখে মুখে এত তর্ক করো কেন? শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে কিরকম আচরণ করতে হয় সেটা শিখে আসোনি?”
নিধি এবারও খুব মিষ্টি করে হেসে বলল,
“এখানে এসে তোমার বড় আপুর থেকে শিখেছি তো। যাইহোক তুমি ছোট মানুষ চুপচাপ খাও। খেতে খেতে বেশি কথা বললে গলায় খাবার আটকে অকালে কিছু একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে।”
গহনের এবার আর সত্যি ভালো লাগছে না এত কথা। চুপচাপ নিধির হাতটা ধরে ওকে থামতে ইশারা করে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা, এখন এইসব আলোচনা থাক। একটু খাই আমি। রাতেও খেতে পারিনি। ক্ষুধা লেগেছে। খেয়েদেয়ে ওষুধ খেতে হবে আমায়।”
অনেকক্ষণ আগেই সালমা বেগম থেমে গেছিলেন। এবার একেবারে নিরব হয়ে গেলেন। গহন খুব বেশি খেতে পারল না। যতটুকু সম্ভব খেয়েদেয়ে উঠে গেল। একে একে সবাই উঠে গেল। থেকে গেল শুধু নিধি আর সালমা বেগম।
সালমা বেগমের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। নিধি খাওয়া-দাওয়া শেষে প্লেটগুলো নিয়ে উঠে রান্না ঘরে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“বাপের বাড়ি থেকে বেশ ভালোই প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছো। ভেবেছিলাম বয়স কম, সংসারের এত প্যাঁচ বোধহয় তোমার মাথায় ঢুকবে না। তবে বয়সে ছোট হলেও স্বামীকে কিভাবে নিজের আয়ত্তে রাখতে হয় সেটা জানো। আমার ছেলেকে, আমার গহনকে বেশ ভালোই নিজের আঁচলে বেঁধেছো। তোমার দ্বারা যে এতটা চালাকি সম্ভব সেটা আমি সত্যিই ভাবিনি। খুব সহজভাবে নিয়েছিলাম তোমায়।”
নিধি থেমে গেল। ঘুরে এসে ডাইনিং টেবিলের উপরে হাতে থাকা প্লেটগুলো রেখে সালমা বেগমের দিকে তাকালো। সালমা বেগম ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। বেশ শান্ত দেখাচ্ছে ওনাকে। নিধি একটু হেসে বলল,
“বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা যা ভাবি সবসময় সেটার উল্টো হয় মা। যাকে আমরা যতটা সহজ সরল ভাবি সে ততটা সহজ সরল হয় না। আর আমি প্রশিক্ষণ নিয়ে আসিনি। পরিস্থিতি আমাকে ধীরে ধীরে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। আর আমি এই ব্যাপারটায় সত্যি নিরাশ হলাম যে আপনি আমাকে যতটা ভালো ভেবেছিলেন আমি ততটা ভালো হতে পারিনি। ক্ষমা করবেন মা। ওই যে বললাম সব সময় আমাদের মন মত সবকিছু হয় না। আমরা যা ভাবি তেমনটাও হয় না। এই দেখুন না আমি ভেবেছিলাম আপনি গহনের মা কিন্তু আপনি আসলে ওর মা নন।”
হঠাৎ করে সালমা বেগমের চোখে মুখে এক অদ্ভুত হিংস্রতা ফুটে উঠলো। নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় নিধি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমি গহনের মা। খবরদার দ্বিতীয়বার আর এই কথা তুমি মুখে আনবে না। আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করো না।”
অনেকক্ষণ মিষ্টি করে কথা বলেছে নিধি সালমা বেগমের সাথে। আর মিষ্টি করে কথা বলা সম্ভব না। সব সময় কি তাই বলে এভাবে জোর করে হেসে হেসে কথা বলা যায় নাকি! নিধি নিজেও এবার পাল্টা গম্ভীর গলায় সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি কঠোরতা দেখাতে কিছু বাকি রাখেননি মা। বাকি রইল গহনের মা হওয়ার কথা। গহনের খুব আফসোস জানেন তো যে ওর নিজের মা ওর নিজের হতে পারেনি। কিন্তু ওর সৎ মা ওর নিজের মা হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি ওর একজন মাও ওর নিজের হতে পারেনি। আপনি ওর নিজের মা হলে কি আজকে গহন কে অসুস্থ হতে হয়, খাবার নিয়ে এত কষ্ট পেতে হয়?”
“নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো কিন্তু তুমি এবার। গহনের কানে এই কথাগুলো তুলতে আমায় বাধ্য করো না।”
“আমি খুব ভালো করেই জানি, যে কথাটা আপনি গহনের কানে দেবেন সেটা সরাসরিই দেবেন। তার আগে আমায় হুমকি দেবেন না। কিংবা আমি কোন কিছু বললে আপনি থামবেনও না। আমি নিজের সীমার মাঝেই আছি। বিয়ের পর স্বামীর যতটুকু সেবা করা দরকার সেসবই করছি। আপনিই কি সেসবের মাঝে এসে আজেবাজে কথা বলে নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন না মা? ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। মানে ছেলের দায়িত্ব এখন ছেলের বউয়ের। এখন ছেলে তার বউয়ের আঁচলে থাকবে। আপনি কেন এখনো তাকে নিজের আঁচলে রাখার চেষ্টা করছেন বলুন তো? আমি নিজের জিনিস অন্য কারো আঁচলে রাখতে পছন্দ করি না মা। সে জন্য শক্ত করে বেঁধে রেখেছি।”
সালমা বেগম তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,
“যতই শক্ত করে বাঁধাে না কেন কোন কাজ হবে না। আমার ছেলে আমায় কতটা ভালোবাসে সেই সম্বন্ধে তোমার কোন ধারনা নেই। আমার এক কথায় আমার ছেলে গোটা দুনিয়া ওলটপালট করতে পারে। সব কিছু ছাড়তে পারে। আর তুমি দুদিনের মেয়ে তোমায় ছাড়বে না! আবারো সাবধান করছি আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করো না।”
নিধি পাল্টা তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“আপনিও আমাকে বাকি বৌমাদের মতন ষড়যন্ত্র করতে বাধ্য করবেন না। আপনার বয়স হয়েছে। অবশ্যই বুদ্ধি আমার থেকে কমে গেছে। আপনার কোন ধারণা নেই গহন আমাকে কতটা ভালোবেসে ফেলছে। আপনার ধারণাই নেই গহন আমার সাথে কতটা জড়িয়ে যাচ্ছে। আমি ওনাকে অবুঝ ভেবেছিলাম। কিন্তু উনিও খুব ভালো করে বোঝেন কে ওনাকে সত্যিকারের ভালোবাসে আর কে ওনাকে স্বার্থের জন্য ভালোবাসে। যদি ওনার ভালোবাসা আমার প্রতি সত্যি হয়ে থাকে তবে দেখবেন একদিন আপনি আপনার পাশে ওনাকে পাবেন না। উনি আমাকে কারোর কথাতেই ছাড়বেন না।”
কথাটা বলে নিধি প্লেটগুলো নিয়ে আবারো রান্না ঘরে চলে গেল। সালমা বেগম দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করলেন। কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নিধির যাওয়ার দিকে। তিনি সত্যি বুঝে উঠতে পারছেন না যে গহন কি তার হাত থেকে এতটাই বেরিয়ে গেল যে নিধি এভাবে গহনের হয়ে ওনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে! গহন কি সত্যি ওনার থেকে বেশি নিধির কাছাকাছি চলে যাচ্ছে! সত্যিই কি গহন আর ওনার কথা শুনবে না!
__________
“মায়ের সাথে কি কথা বলছিলে তুমি?”
বিছানায় শুয়ে আছে গহন। নিধি সবেমাত্র সকালের কাজবাজ সব সেরে ঘরে ঢুকলো। ওকে আসতে দেখে গহন চোখের উপর থেকে হাত নামিয়ে প্রশ্নটা করলো। নিধি কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই বলল,
“ঝগড়া করছিলাম।”
গহন চমকে শোয়া থেকে উঠে বসে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি ঝগড়া করছিলে?”
নিধি এবারও স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হ্যাঁ। তো কি করতাম? ভয় দেখাচ্ছিলেন উনি আমায়। আপনি নাকি ওনার কথায় আমায় ছেড়ে দেবেন। এত সাহস আছে নাকি আপনার! শুনুন যা করবেন ভেবে চিন্তে করবেন। বুড়ো বয়সে কিন্তু আর এত সুন্দর বউ পাবেন না।”
গহন কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“বাজে কথা বন্ধ করো। সত্যি করে বলো কি কথা বলছিলে তোমরা?”
নিধি এবার হাতের কাজটুকু ফেলে এগিয়ে গেল গহনের দিকে। বিছানায় গহনের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন বিশ্বাস হলো না আমার কথাটা? আপনার মা কি এমন কিছু বলতে পারে না বলে আপনার মনে হয়?”
একটু থতমতো খেল গহন। আমতা আমতা করে বলল,
“না মানে কিন্তু এখন তো এইসব কথা হওয়ার কথা না তাই না?”
“এখনই হওয়ার কথা। আজকাল আপনি মাঝে মাঝে ফোঁস করে উঠছেন। বউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বউয়ের হয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করছেন। বোনকে শ্বশুরবাড়িতেও পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এগুলো আপনার মায়ের জন্য কতটা কষ্টকর বুঝতে পারছেন? তার থেকেও ওনার কাছে বেশি কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে উনি আমাকে যতটা ভালো ভেবেছিলেন আমি ততটা ভালো হয়ে উঠতে পারিনি ওনার কাছে। এত কষ্ট উনি আর মনের মাঝে চেপে রাখতে না পেরে সেটা প্রকাশ করেই ফেলেছেন।”
গহনের কেন যেন আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না নিধির সাথে এই নিয়ে। কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ আবারও শুয়ে পড়লো। নিধি উঠে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল। আবারো গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার সত্যি মনে হয় উনি আপনাকে ভালোবাসেন?”
“হ্যাঁ ভালোবাসে।”
“নিশ্চিত আপনি এই বিষয়ে?”
গহন জোর গলায় বলল,
“হ্যাঁ নিশ্চিত।”
নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,
“ধ্যাত। আপনার সাথে কথা বলাই বৃথা। পাগল কোথাকার। শরীরের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে তাও বলে ভালোবাসে।”
নিধি আরো বিড়বিড় করে কি সব যেন বলতেই থাকলো। গহনের কানে সেই কথাগুলোর কিছুই গেল না। বারংবার নিজেই নিজেকে বোঝালো ওর মা ওকে ভালোবাসে। সত্যি ভালোবাসে।
হয়তো পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসতে পারেনি। তবে ভালোবাসে। নয়তো কি আর গহনকে ছাড়া ওনার থাকতে কষ্ট হতো! গহন দূরে চলে যাওয়ায় উনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন! গহনকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য কি উনি ব্যস্ত হয়ে পড়তেন!
আরো কত কারণ আছে এমন যার দ্বারা গহন বুঝেছে যে উনি গহন কে ভালোবাসে। হ্যাঁ হয়তো নিজের ছেলে মেয়ের মতন ভালোবাসতে পারেননি। তবে ভালো তো বেসেছেন।
__________
সময়টা তখন দুপুর বারোটা। গহন আজ অফিসে যায়নি। অফিসে যাইনি বললে ভুল হবে। সকালে নাস্তা শেষে একটু বিশ্রাম নিয়ে যেতে ধরেছিল অফিসে। তবে নিধির চোখ রাঙানিতে আর বকবকানিতে যেতে পারেনি। মেয়েটা তো ফোন আর ল্যাপটপও লুকিয়ে রেখেছিল।
নিধি তখন রান্নাঘরে দুপুরের রান্নায় ভীষণ ব্যস্ত। আর গহন ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। সালমা বেগম এলো ওর ঘরে। উনি জানেন নিধি রান্না ঘরে আছে। সেজন্য ঘরে ঢোকার জন্য অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। নিধি থাকলেও যে অনুমতি নিতেন তেমনটা না। তবে তখন নিধিকে দেখানো যেত যে ওনার ছেলের ঘরে প্রবেশের জন্য ওনার অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
গহন তখনও সালমা বেগমের উপস্থিতি অনুভব করতে পারেনি। সালমা বেগম ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বিছানায় শুয়ে থাকা গহনের দিকে। সকালে শুনলেন ছেলেটা নাকি অসুস্থ। খাবারও মুখে তুলতে পারল না। আবার নাকি মাথা ব্যথাও করছে। ছেলেটা কি আগের থেকে একটু শুকিয়ে গেছে না? তাই তো মনে হচ্ছে। আজকাল কি তবে খাওয়া দাওয়া একেবারেই ঠিকঠাক করে করছে না? কিন্তু বউ তো নাকি আলাদা করে রান্না করে দেয়, সেবা যত্নও করছে। মায়ের সেবারও তো প্রয়োজন হয় না। তাহলে শরীরের অবনতি হলো কেন? তাহলে কি কাজের চাপ বেশি যাচ্ছে জন্য এত ক্লান্ত দেখাচ্ছে? হতে পারে।
সালমা বেগম চুপচাপ গিয়ে গহনের মাথার কাছে বসলেন। গহন তখনও খেয়াল করেনি। বোধহয় হালকা একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলো। সালমা বেগম গহনের মাথায় হাত রাখলেন। কয়েক সেকেন্ড মত হাত বুলিয়ে দিতেই গহন টের পেল। চোখ মেলে পাশে সালমা বেগম কে বসে থাকতে দেখে গহনের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। ছেলেকে হাসতে দেখে সালমা বেগম নিজেও আলতো একটু হেসে বললেন,
“শরীর এখন ঠিক আছে বাবা?”
“আমি ঠিক আছি মা। তুমি ঠিক আছো? শ্বাসকষ্ট হয়েছিল আর?”
“না ঠিক আছি আমি।”
“কিছু বলতে কি তুমি?”
সালমা বেগম মাথা নাড়িয়ে বললে,
“হ্যাঁ। একটা কথা বলার ছিল তোমায়। কিন্তু তুমি তো এখন অসুস্থ। তাই ভাবছি বলবো কিনা।”
গহন সালমা বেগম কে আশ্বস্ত করে বলল,
“এতটাও অসুস্থ না আমি। বল কি বলবে। কোন কিছুর প্রয়োজন তোমার? টাকা লাগলে ড্রেসিং টেবিলের উপর আমার মানিব্যাগ আছে। যা লাগবে নিয়ে যাও।”
“না না বাবা তেমন কোন প্রয়োজন নেই। আসলে আমি জানতে চাইছিলাম উনি কি তোমার সাথে আর যোগাযোগ করেছিলেন?”
গহন বুঝলো সালমা বেগম কার কথা বলছেন। ওনার দুশ্চিন্তার কারণটাও গহন ভালোভাবেই বুঝতে পারলো। শক্ত করে ওনার হাতটা ধরে বলল,
“করেনি। যোগাযোগ করলেই কি না করলেই কি। তুমি এত চিন্তা করছো কেন? আমি তো তোমার কাছেই আছি।”
সালমা বেগম গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
“উনি তোমার জন্মদাত্রী। আমি তোমায় বলছি না ওনার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে কিংবা যোগাযোগ একেবারে বন্ধ করে দিতে। আমি শুধু ভয় পাই নাড়ির টানে।”
“আমার ওনার সাথে যোগাযোগ করার কোন ইচ্ছে নেই।”
“উনি যোগাযোগ করলো কি করে তোমার সাথে?”
“হয়তো ফুপির থেকে নাম্বার জোগাড় করেছে।”
সালমা বেগমের চোখে মুখে বেশ ভালোই রাগ ফুটে উঠলো। গম্ভীর গলায় বললেন,
“ওর সাথে যোগাযোগ রাখারই বা তোমার কি প্রয়োজন?”
“প্রয়োজন আছে মা। ফুপি কে আমি আমার আরেক মা ভাবি। সবার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করা যায় না। জীবনে কিছু মানুষ এমন থাকে যাদের ছাড়া জীবনটা কল্পনাই করা যায় না। যেমন তোমায় ছাড়া, ফুপিকে ছাড়া, নিধি কে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনা করতে পারি না। তোমার পছন্দে নিধি কে বিয়ে করেছিলাম ঠিকই। তখন ওর প্রতি আমার কোন অনুভূতিও কাজ করতো না। কিন্তু এখন আমি আর ওকে ছাড়তে পারবো না। সে আমাকে যেই ওকে ছাড়তে বলুক না কেন, যে কারণই দেখাক না কেন। ওকে ছাড়া আমি আমার জীবন ভাবতেও পারিনা।”
সালমা বেগমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তার মানে কি গহন ওনার আর নিধির মাঝে হওয়া কথাগুলো শুনে নিয়েছিল? নাকি নিধি বলেছিল? নিশ্চয়ই ওনার নিধি কে বলা কথার প্রেক্ষিতেই গহন এভাবে ওনাকে ঠেস দিয়ে কথাটা বলল।
বাহ! ছেলের তবে এতটা অধঃপতন হয়েছে যে আজকাল মাকে ঠেস দিয়ে কথাও শোনায়। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার তুমি কাকে তোমার জীবনে রাখবে আর কাকে ছেড়ে দেবে। তবে দিনশেষে রক্তের সম্পর্ক গুলো জিতে যায় । মায়া মমতা দিয়ে তৈরি হওয়া সম্পর্ক গুলো হেরে যায়। আর আমার ভয় এখানেই।”
কথাটা বলে বেরিয়ে গেলেন সালমা বেগম ঘর থেকে। নিধি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিকঠাক সময় লুকোতেও পেরেছিল। সালমা বেগম ওকে খেয়াল করেনি।
নিধি শুধু সালমা বেগম কে দেখছে আর অবাক হচ্ছে। এই মহিলা কখন নাটক করে কখন সত্যি আবেগী হয়ে পড়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। মাঝে মাঝে তো দেখে মনে হয় নাটক করছে না। আবার যদি গহনের প্রতি অনুভূতিগুলো সত্যি হয়ে থাকে তাহলে এত অবহেলা করে কেন। এই মহিলার আসলে সমস্যা কি সেটাই নিধি বুঝে উঠতে পারে না। ঝাড়ফুঁক দরকার এনার। হয় জ্বীনের আছড় আছে নয়ত এই মহিলা নিজেই জ্বীন।