বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩৭

🟢

জুবাইদা বেশ অনেকক্ষণ থেকে উশখুশ করছেন গহনের সাথে ওর মা কে নিয়ে কিছু কথা বলবেন বলে। তবে কেন যেন ঠিক বলে উঠতে পারছেন না। গহনদের যখন চলে যাওয়ার সময় হলো তখন তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। নিচে নেমে নিধি তখন জারা আর জান্নাতের সাথে টুকটাক কথা বলছে। এই ফাঁকে জুবাইদা গহন কে নিয়ে সেখান থেকে একটু সরে এলেন।

“কিছু বলবে ফুপি?”

“তুই জানিস আমি কি বলতে চাইছি।”

গহন সত্যি বুঝতে পারছে এখন জুবাইদা ওকে কি বলতে চাইছে। তাই ব্যাপারটাকে আর জটিল করার ইচ্ছে হলো না।

“বুঝতে পারছি কি বলতে চাইছো। তবে এই ব্যাপারটা নিয়ে কি সত্যি এখনও বলার মতন কিছু বাকি আছে ফুপি?”

জুবাইদা জোর গলায় বললেন,

“অবশ্যই আছে। তুই কবে আমার কথা বুঝবি, বাবা! তুই বুঝিস না আমি তোকে কতটা ভালোবাসি? আমি তোর ভালো চাই গহন। আমি আমার নিজের মেয়েদের থেকেও তোকে বেশি ভালোবাসি। তুই আমার প্রাণ। বিশ্বাস কর বাবা, তোকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যায়। শুধুমাত্র তোর জন্য আমি তোকে এত কষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে পারিনি। শুধুমাত্র তুই আমার কথা শুনিসনি বলে আমি তোকে আমার সাথে রাখতে পারিনি। নয়তো কি তোর ফুপি তোকে এই জা’হা’ন্না’মে’র মাঝে ফেলে রেখে যেত! বিদেশ গেলি পড়াশোনা করতে। আমার কাছে একেবারে থেকে গেলে পারতি না? আমি কি তোর যত্ন করতাম না? তোর মায়ের থেকে তোকে কম ভালোবাসতাম আমি?”

গহন জুবাইদা কে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কে বলেছে তুমি আমাকে আমার মায়ের থেকে কম ভালোবাসতে? আমি তো জানি তুমি আমাকে আমার মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসতে, এখনও বাসো। আমি জানি তুমি আমায় সবথেকে বেশি ভালোবাসো। কিন্তু আমি দায়িত্বের কাছে আটকে গেছি ফুপি। আমি কৃতজ্ঞতার কাছে আটকে গেছি। আমার বাবাকে দেওয়া কথার কাছে আটকে গেছি আমি। আমার বাবা ভরসা করে আমায় যে দায়িত্ব দিয়ে গেছে সেই দায়িত্ব থেকে আমি পিছপা কি করে হই?”

জুবাইদার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। তিনি সেটা মুছে নিয়ে গহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“তোকে আমি তোর দায়িত্ব থেকে পিছপা হতে বলছি না। পালন কর তোর দায়িত্ব। ওদেরকে যত টাকা ইচ্ছে দে। ওদের সাথে ভালো ব্যবহার করবি তো ঠিক আছে সেটাও কর। কিন্তু ওদের সঙ্গে থাকতে হবে কেন?”

গহন একটু ভাবনার জগতে ডুব দিয়ে আনমনে বলে উঠলো,

“তুমি জানো না, মা আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। অসুস্থ হয়ে যায়। তোমার মনে নেই আমাকে এক মাসের জন্য মা নিজে হোস্টেলে পাঠিয়ে আবার আমাকে ছাড়া থাকতে না পেরে নিজেই বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল আমাকে ছাড়া মা। সেই মা কে ছেড়ে আমি কি করে থাকি!”

সালমা বেগমের কথা উঠতেই জুবাইদার মাথাটা গরম হয়ে গেল। নিজেকে গহনের থেকে ছাড়িয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“ওই সব কিছু তোর মায়ের নাটক। এতই যদি তোর প্রতি ভালোবাসা থেকে থাকতো তাহলে তোকে এত কষ্ট দিতে পারতেন উনি? উনি তোকে পছন্দ করে না গহন। উনি তোকে হিংসে করে। আর কবে বুঝবি তুই এসব?”

গহন আলতো হেসে জুবাইদার কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“না ফুপি। মা আমায় হিংসে করে না। বরং মা আমাকে নিজের দুর্ভাগ্যের কারণ হিসেবে দায়ী করে। তুমি ভাবো তো আমার উপরে কি কম বড় একটা বোঝা যে আমি একজন মানুষের দুর্ভাগ্যের কারণ! আমি তার সারাটা জীবন নষ্টের কারণ! একজন মেয়ে শুধুমাত্র আমার জন্য তার স্বামী, শ্বশুর বাড়ি কোথাও একটু ভালোবাসা পায়নি, একটুও সম্মান পায়নি। তার কি আমার উপরে রাগ থাকাটা স্বাভাবিক নয়? এতকিছুর পরও তিনি তো আমায় ভালোবেসেছেন। মাঝে মাঝে যে দুর্ব্যবহার উনি আমার সাথে করেছেন সেগুলো কি অযৌক্তিক ছিল? তুমি মন থেকে উত্তরটা দাও, ওনার আচরণ গুলো কি স্বাভাবিক ছিল না?”

জুবাইদা চোখের জল মুছে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন,

“আমি বলছি না ওনার সাথে যা হয়েছে সেগুলো ঠিক হয়েছে। আমি নিজেও আমার মা ভাইয়ের বিরুদ্ধে ছিলাম। কিন্তু উনি তোর সাথে যেগুলো করেছেন সেগুলো কি ঠিক ছিল?”

গহন জুবাইদার মুখটা আবারও নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“উনি অনেক কম দুর্ব্যবহার করেছেন আমার সাথে। শুধুমাত্র আমার জন্য তার গায়ে হাত তোলা হতো, আমার ঠিকঠাক যত্ন না করার জন্য তাকে খাবার খেতে দেওয়া হতো না, অকারণে প্রতিটা বিষয়ে আমাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাকে অসম্মানিত করা হতো। তার কি করে আমার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হতে পারে ফুপি? সেই হিসেবে উনি অনেক কম দূর্ব্যবহার করেন আমার সাথে। তোমরা কবে বুঝবে এই কথাটা? এই একই কারণগুলোর জন্য তো আমার নিজের মাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। অথচ আজ তুমি আমার সেই নিজের মায়ের সাথে আমাকে সবকিছু স্বাভাবিক করে নিতে বলছো। আর সব দোষ ওনার শুধুমাত্র উনি আমার সৎ মা বলে? ওনার কি আমাকে শাসন করার কোন অধিকার নেই?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জুবাইদা। বুঝলেন গহন কে হাজার বুঝিয়েও কোন লাভ হবে না। অবশ্য গহনের সবগুলো কথাই যে অযৌক্তিক তেমনটাও না। কিছু কিছু কথা গহনের ঠিক। তাই আপাতত তিনি আলোচনার সমাপ্তি এখানেই করতে চাইলেন।

জুবাইদা সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে গহন আবারো ওনাকে ডেকে উঠলো। তিনি থেমে যেতে বাধ্য হলেন।

“আমার মা কিন্তু শুধুমাত্র শ্বশুরবাড়িতে অশান্তির জন্য চলে যায়নি ফুপি। তার পেছনে আসল কি কারণ ছিল সেটা তুমিও খুব ভালো করে জানো। আর আমি একটা কথায় খুব বিশ্বাসী জানো তো। যে একবার ছেড়ে যেতে পারে সে আর কখনো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতেই পারে না।”

এবারও কোন উত্তর দিতে পারলেন না জুবাইদা। হঠাৎ করেই ওনার মনে হলো, উনি কি গহনের সাথে অন্যায় করছেন? গহনের ভালো ভাবতে গিয়ে কি ভুল করছেন?

_________

জারাদের বাড়িতে তো দারুন সময় কাটিয়েছে নিধি। গহন কে নিয়ে যদিও একটু চিন্তায় ছিল। তবে সেই চিন্তাটুকুও কেটে গেছিলো। তবে বাড়ি এসে টুপ করে মনটা খারাপ হয়ে গেল। শম্পা যায়নি। জানতে পারলো হঠাৎ করেই নাকি পিয়াল কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য শহরের বাইরে যেতে হয়েছে। দু তিন দিন পর আসবে। সেই কয়দিন নাকি শম্পা এখানেই থাকবে।

নিধির ডুকরে কান্না পেল। এমনটা না যে নিধি শম্পা কে দেখে ভয় পাচ্ছে। তবে এত কি ঝগড়া করা যায়! এসেছে তো সংসার করতে। কিন্তু এখানে তো ঝগড়া ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকা যায় না। নিধি জানে ওর মুখ খুব ভালো মতোই চলে। কিন্তু তাই বলে সারাক্ষণ কি এভাবে ঝগড়া করার ইচ্ছা হয়! যেই মানুষগুলোর সাথে সারা জীবন কাটাতে হবে সব সময় কি তাদেরকে খোঁচাতে ইচ্ছা হয়! ভালো লাগে কি এসব!

বাড়ি ফিরে সবেমাত্র ফ্রেশ হয়ে গহন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। সিনথিয়া এসে খবর দিল যে সালমা বেগম নাকি ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। খবরটা দিয়েই সিনথিয়া সেখান থেকে চলে গেল। গহন হাতের তোয়ালেটা চেয়ারের সাথে ঝুলিয়ে রেখে যেতে ধরলো। অমনি নিধি এক প্রকার দৌড়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“দাঁড়ান। আমার দুটো কথা শুনে যান।”

“এসে কথা বলি?”

“না না। ততক্ষণে দেরি হয়ে যাবে।”

“আচ্ছা বেশ বলো। একটু তাড়াতাড়ি বল।”

নিধি কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে মনে মনে আগে কথাগুলো ঠিকঠাক ভাবে সাজালো। কেননা নিধি জানে কথা বড় করা যাবে না। তাহলে গহন বিরক্ত হয়ে যাবে। ছোট করে গুছিয়ে কথাগুলো বলতে হবে। কথাগুলো গোছানো শেষে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“জারা আপুর সঙ্গে যাওয়ার আগে আমি তৈরি হয়ে এসে আপনার মাকে যাওয়ার কথাটা জানাতেই যেতে ধরেছিলাম। কিন্তু তার আগেই উনি সেখানে চলে আসেন। তারপরে আমি আর ওনাকে জানাতে পারিনি। উনি এই কথাটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছেন। উনি ভেবেছেন আমি হয়তো ওনার থেকে অনুমতি না নিয়েই চলে যেতাম। এখন এই বিষয়টাকে আমার বেয়াদবি ভেবে উনি আপনার মাথা গরম করতেই পারেন। আপনি গরম হবেন কিনা সেটা আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছি না।”

“আমি কি তোমার থেকে এত কিছু জানতে চেয়েছি?”

“আপনি হয়তো জানতে চাননি। কিন্তু আমার মনে হলো আপনাকে জানানো প্রয়োজন। যতই হোক আপনি আবার মায়ের অন্ধ ভক্ত ছেলে। কখন আপনার ব্রেইন কোন দিক দিয়ে ঘুরে যাবে আমি তো বুঝে উঠতে পারব না। আর আপনার মায়ের আর কোনো গুণ থাকুক বা না থাকুক বশ করার গুণ খুব ভালো আছে। খারাপ ভাববেন না আমায়। যেটা সত্যি সেটাই বললাম। এখন আসতে পারেন।”

গহন চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে ধরলে নিধি আবারো ওর পথ রোধ করে বলল,

“আরেকটা কথা, আপনার আদরের বোন এসেছে। আমি জানি আপনার মায়ের মাথাটা আরো বেশি ঘুরিয়ে তুলেছে। যদি আপনাকে কোন কথা শোনায় তার ঠিকঠাক উত্তর দেবেন। আর যদি আপনার মনে হয় আপনি একা পেরে উঠবেন না আমাকে ডাকবেন। আমি দেখে নেব। আমি যাওয়ার পর কে কি বলে আপনাকে সেটা আমি দেখে নেব। আর ওদেরকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনার বউ যথেষ্ট ভালো ঝগড়া জানে।”

নিধির কথাগুলো শুনে গহন একটু হেসে নিধির গালে আলতো করে নিজের হাত রেখে বলল,

বিজ্ঞাপন

“এত ঝগড়া জানতে হবে না তোমাকে। তুমি অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে। মিষ্টি ব্যবহার করতে শেখো। এত কঠোরতা তোমার সাথে মানানসই না। তুমি বরং শুধু ভালোবাসতে শেখো সবাই কে।”

“সবাইকে ভালোবাসতে পারবো না। এত ভালোবাসা নেই আমার মাঝে। যদি সবাইকে ভালোবাসা দেই তাহলে আমার মধ্যে থাকা ভালোবাসা শেষ হয়ে যাবে। শেষে আপনি একটা বড় গোল্লা পাবেন। এখন যান। নয়তো আপনি দেরিতে যাওয়ার শোকে আপনার মায়ের আবার শ্বাসকষ্ট উঠে যেতে পারে। হয়তো ভাববে আমি আটকে রেখেছি।”

গহন হাসতে হাসতেই সালমা বেগমের ঘরে চলে গেল। নিধি একবার ভাবলো লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের কথা শুনবে কিনা। নিধির একটু হলেও এখন গহনের উপর বিশ্বাস আছে যে সালমা বেগম কিংবা ওর বোনেরা কেউ নিধির কথা গহনের কাছে বলে শান্তি পাবে না। গহন ওদেরকে সে সুযোগ দেবেও না। আর বলে ফেললেও হয়তো গহন উল্টো কথা শুনিয়ে দেবে।

কিন্তু ওরা যদি গহন কে কথা শোনায় তাহলে তো গহন কিছু বলতে পারবে না। ছেলেটা নিজের হয়ে কথা বলতেই পারে না।

অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে নিধি সিদ্ধান্ত নিল গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনবে ওদের কথা।। আর যদি গহন কে কথা শোনায় তাহলে তখন নিধি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়বে।

__________

“তোমরা ভাই বোন সবাই এত বড় হয়েছো। তারপরেও এখন অব্দি তোমরা কেউ কোথাও যাওয়ার আগে আমার থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করো। কিন্তু তোমার স্ত্রীর তো সেই ভদ্রতাও নেই গহন। ওর এতটুকু বোধ নেই যে কোথাও যাওয়ার আগে শাশুড়িকে জানিয়ে যেতে হয়।”

গহন বেশ শান্ত দৃষ্টিতে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“নিধি তোমাকে জানাতেই আসছিল মা। কিন্তু তার আগেই তুমি সেখানে চলে এসেছিলে।”

সালমা বেগম তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,

“তাই নাকি? আমি যখন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম তখন তোমার বউ সাজগোজ করে তৈরি হয়ে এসেছে বেরোনোর জন্য জারার সাথে। তাহলে আরো কখন বলতো? ওই বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পরে?”

“নিধি তখন তৈরি হয়েছিল যাওয়ার জন্য মা। কিন্তু যায়নি। সামান্য একটা বিষয়কে কেন এত বড় করে দেখছো? আর তাছাড়া জারা কে আমি পাঠিয়েছিলাম নিধিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা তোমার ছেলে মেয়ে জন্য আমাদের তোমার কাছে দায়বদ্ধতা আছে। নিধি আমার স্ত্রী। ওর দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র আমার কাছে।”

সালমা বেগম বিস্ফোরিত নয়নে গহনের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,

“তোমার স্ত্রীর দায়বদ্ধতা শুধু তোমার কাছে? ওর শাশুড়ির কাছে কোন দায়বদ্ধতা নেই? ও আমার বাড়িতে সংসার করতে এসেছে, অথচ আমাকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করবেনা? তুমি বলতে চাইছো ও আমার থেকে কোন বিষয়ে অনুমতি নেবে না? ওই মেয়ে না হয় ভুলে গেছে তুমিও কি ভুলে যাচ্ছো যে আমি ওর শাশুড়ি?”

গহন এবারও শান্ত গলায় বলল,

“নিধি ওর নিজের বাড়িতে সংসার করতে এসেছে মা। শুধুমাত্র তুমি ওর শাশুড়ি জন্য ও তোমার কাছে সবসময় দায়বদ্ধ থাকবে এটা হয় না। তাহলে আমারও তো আমার শাশুড়ির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকার কথা। তাহলে কি আমারও উচিত প্রতিটা বিষয়ে আমার শাশুড়ির থেকে অনুমতি নেওয়া? ছোট ছোট বিষয়গুলো এত ধরো না মা। নিধি অনেক বড় বড় বিষয় ছেড়ে দেয়। তুমিই তো বলো সংসারে সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হয়, সবাইকে ত্যাগ করেই থাকতে হয়। আর কি বলবো মা বলো। তুমি বিচক্ষণ মানুষ। আমার থেকে জ্ঞান বুদ্ধি তোমার অনেক বেশি। সংসার সম্পর্কে তোমার জ্ঞান বুদ্ধি অনেক বেশি। বাকিটা তুমিই বোঝো।”

সালমা বেগমের যেন আবারও নিঃশ্বাস নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। সত্যি ওনার শরীরটা খারাপ লাগছে। গহনের এত পরিবর্তন তিনি মেনে নিতে পারছেন না। যে ছেলে আজ অব্দি কখনো ওনার মুখের উপর একটা কথা বলেনি, ওনার চোখে চোখ রেখে কখনো কিছু বলেনি সে কিনা আজ স্ত্রীর হয়ে হাজার একটা কথা শোনাচ্ছে! সালমা বেগমকে ত্যাগের কথা শেখাচ্ছে! নিজের পুরো জীবনটাই তো ত্যাগ করে দিয়েছেন। শখ, আহ্লাদ, স্বপ্ন সবকিছু ত্যাগ করেছেন। আরো কি ত্যাগ করবেন? আর কি কিছু আদৌ বাকি আছে ত্যাগ করার মতন? আছে, সে এক শুধু তার জীবন।

তবে তিনি দুর্বল হলেন না। তিনি ভেবেছিলেন আড়ালে থেকে হয়তো তিনি সবটা সামলাতে পারবেন। তবে তিনি কিছুই সামলাতে পারছেন না। কেননা গহন তার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর আড়ালে থেকে কোন কিছু করা সম্ভব না। যা করার সামনে থেকেই করতে হবে। গম্ভীর গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“এত নীতি বাক্য আমাকে শোনাতে এসো না বাবা। আর তুমি তো নিজেই বললে সংসারের বিষয়ে আমার জ্ঞান বেশি। তাহলে আমার কথাটা একটু মানার চেষ্টা করো। বাড়িতে তো আরো একটা বউ আছে। কই তার তো তোমার বউয়ের মতন এত মুখ চলে না। সে তো কথায় কথায় শাশুড়ি, ননদ, দেবরকে অপমান করে না।”

গহনের এবার ব্যাপারটা ভীষণ বিরক্ত লাগছে। গহন অধৈর্যশীল না। আসলেও গহন ভীষণ ধৈর্যশীল। তবে অযৌক্তিক কথাগুলো বারবার শুনতে ভালো লাগে না।

একটু গম্ভীর গলায় বলল,

“এসব আলোচনা আমার এখন ভালো লাগছে না মা। এসব আলোচনা এখন থাক। তোমার যদি অন্য কিছু বলার থাকে তাহলে সেসব বল।”

“এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যে তোমার বউ বড়দের শ্রদ্ধা করতে জানে না, ছোটদের স্নেহ করতে জানেনা। তোমার বউয়ের মতন বেয়াদব মেয়ে আমি আর দুটো দেখিনি। তোমার বউ আমাকে হুমকি দেয়, আমাকে ভয় দেখায় যে আমার ছেলে নাকি আমার থেকে বেশি ওর কথা শুনবে। তুমি ভাবতে পারছো ওই মেয়ে ঠিক কতটা বেয়াদব যে বাড়িতে শম্পা আর পিয়াল এসেছে জেনেও ও চলে যায়। ওর কি দায়িত্ব না অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা? আমার মেয়ে জামাই বাড়িতে এলে তাদের খাতির যত্ন করার দায়িত্ব কি তোমার বউয়ের না?”

গহন এবারেও অনেক কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত গলাতেই উত্তর দিল।

“তাহলে এখন তুমি কি চাইছো? আমায় কি করতে বলছো স্পষ্ট করে বলো। তুমি জানো এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা আমার পছন্দ না। এক বাক্যে তোমার এই সমস্যার সমাধান বল।”

একটা ঢোক গিললেন সালমা বেগম। প্রথমে একটু আমতা আমতা করলেন। কিন্তু তারপরে ভাবলেন এভাবে আমতা আমতা করা ঠিক হবে না। যা বলার সোজাসুজি বলতে হবে। বিছানায় টান হয়ে বসে গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,

“তুমি কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার। যদি আমার থেকে পরামর্শ চাও তাহলে বলবো ওকে এতটা প্রশ্রয় দিও না। আমি ওই মেয়েকে দেখে যতটুকু চিনেছি তাতে আমার মনে হয় না ও সংসার করার মতন মেয়ে। তোমাদের মাঝে সম্পর্কটাও তো ভালো না। আমি তোমাকে এর আগেও বলেছিলাম আবারো বলছি। যদি কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার থাকে তাহলে তাড়াতাড়ি নিয়ে নাও। দেরি করো না বাবা। যে মেয়ের কাছে তোমার মায়ের, তোমার ভাই বোনের, তোমার পুরো পরিবারের সম্মান নেই, গুরুত্ব নেই। তার গুরুত্বও নিশ্চয়ই তোমার কাছে নেই?”

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নিধি। কেউ টের পায়নি ওকে। সালমা বেগমের কথার ইঙ্গিত স্পষ্ট বুঝতে পারলো। নিধির হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। গহন কেন এখনো কোনো উত্তর দিচ্ছে না? কেন চুপ করে আছে? গহন কে কেন এত ভাবতে হচ্ছে? ও কি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারতো না যে ও নিধিকে ছাড়বে না, নিধির গুরুত্ব আছে গহনের কাছে? মায়ের কথা শুনে ছেড়ে দেবে না তো নিধি কে!

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে গহনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নিধি নিজেকে স্বাভাবিক করে গহনের কথা গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করল।

গহন তখন দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে এসে বিছানায় ওনার পাশে বসে বলল,

“চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো কবুল বলার সময়ই নিয়ে নিয়েছিলাম মা। একবার যখন ওকে নিজের জীবনে গ্রহণ করছি, তখন আর ছাড়বো না। কার কাছে কার গুরুত্ব আছে সেসব আমি জানিনা, জানতেও চাইছি না। আপাতত আমি শুধু এতোটুকু জানি আমার কাছে নিধির গুরুত্ব আছে, আর নিধির কাছে আমার গুরুত্ব আছে। বাকি রইল নিধির তোমাদের অপছন্দের কথা। তোমরাও যে ওকে খুব একটা পছন্দ করো তেমন কিছু তো আমি দেখতে পাচ্ছি না মা। যদি তোমরা ওকে ভালোবাসা দিতে, তারপরেও ও তোমাদের অপছন্দ করতো তখন আমি ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তখন আমি আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে ভাবার কথা ভাবতাম। তোমরা এতগুলো মানুষ একজনের সাথে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারছো না। আর ও একজন হয়ে এতগুলো মানুষের সাথে কি করে মানিয়ে নিয়ে চলবে?”

“তারমানে তুমি বলতে চাইছো সব দোষ আমাদের? তুমি আমার কথা শুনবে না তাই তো? তোমার কাছে তোমার মায়ের কথার কোন গুরুত্ব নেই?”

গহন আলতো হেসে বলল,

“দোষ ত্রুটির কথা না হয় এখন থাক। আর তোমার কথার গুরুত্ব আমার কাছে আছে কি নেই সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। কিন্তু মা, অযৌক্তিক কথার গুরুত্ব কি করে দেই আমি বলোতো? যদি তাও বিষয়টার সাথে শুধুমাত্র আমি জড়িয়ে থাকতাম আমি তোমার কথাটা মেনে নিতাম। আমি আমার নিজের উপর হওয়া সকল অন্যায়, অবিচার, দুর্ব্যবহার সবকিছু মেনে নেই। কিন্তু নিধি কেন মানবে বলতে পারো? ওর কোন দায়বদ্ধতা নেই মানার। ও মানতে চাইলেও আমি ওকে মানতে দিতে পারি না। তাহলে আমাদের সম্পর্ক কে অপমান করা হয়।”

সালমা বেগম অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আর তোমার মায়ের কোন গুরুত্ব নেই? আমাদের মা ছেলের সম্পর্ক কে যে অপমান করছো তুমি তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা?”

গহন সালমা বেগমের দিকে ঘুরে বসে ওনার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,

“আমি কোন সম্পর্ককেই অপমান করিনি মা। যদি আমাদের মা ছেলের সম্পর্কের অপমান করতাম তাহলে এই যে তুমি আমাকে নিধির ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বললে এর প্রেক্ষিতে আমি তোমাকে অনেক কিছুই বলতে পারতাম। আমি তোমার সাথে অনেক দূর্ব্যবহার করতে পারতাম, উঁচু গলায় কথা বলতে পারতাম। কিন্তু আমি সেসব করিনি। তার কারণ আমি তোমায় সম্মান করতে চাই। এখন শুধু আমিই তোমার দিকটা বুঝলে হবে না মা। তোমাকেও আমার দিকটা বুঝতে হবে।”

কথাটা বলে গহন উঠে যেতে ধরেও আবার থেমে গেল। ফের সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত বলায় বলল,

“আজকে নিধির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে প্রসঙ্গটা তুমি তুলেছিল আর যেন কখনো এটা তুলো না। এই ব্যাপারে আমি কারো থেকে কোন কিছু শোনা তো দূর, কল্পনাও করতে চাই না। আমার দুঃস্বপ্নেও এই ব্যাপার গুলো আসুক সেটা আমি চাইনা। নিধি আমার জীবনে আছে, থাকবে। এটাই চিরন্তন সত্য।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প