শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে গ্রামে এসেছে নিধিরা। এই গ্রামাঞ্চলের মাঝে যে এত সুন্দর বাড়ি থাকতে পারে সেটা নিধি সত্যিই কল্পনা করেনি। বেশ পুরনো দিনের বাড়ি। গ্রামের মাঝে সেই পুরনো আমলের ডুপ্লেক্স বাড়ি কম কথা নাকি। যদিও বাড়ির রং চটে গেছে অনেকটাই। কিন্তু তারপরেও আভিজাত্য এখনো আছে। বিশাল জায়গা জুড়ে বাড়ির এলাকা। বাড়ির ভেতরেই ফল ফুলের বাগানো রয়েছে। তারমানে যাদের বাড়িতে এসেছে তারা বেশ ভালোই বড়লোক। তবে কে জানে স্বভাব কেমন!
এই বাড়িতে বর্তমানে গহনের দুই মামা তাদের পরিবারকে নিয়ে থাকেন। গহনকে দেখে ওনারা ভীষণ খুশি হলেন। গহনের বড় মামার চোখে তো খুশিতে জলই চলে এলো এতদিন পর গহনকে দেখে। শুধু যে গহনের মামারা খুশি হয়েছেন তেমনটা না। মামিরাও ভীষণ খুশি হয়েছে। কত আদর করলো গহনকে। শুধু গহন কে না, নিধিকেও আদর করল। প্রথম দেখাতেই কতটা আপন করে নিল নিধিকে। দেখে যেন মনে হচ্ছে কত দিনের আলাপ ওদের নিধির সঙ্গে।
অল্প কিছুক্ষণ এই মানুষগুলোর সাথে কাটিয়ে নিধির খুব ভালো লেগে গেল মানুষগুলোকে। খুব স্বাচ্ছন্দ্যে মিশতে পারছে ওদের সাথে। নিধির খুব আফসোস হলো এটা ভেবে যে এই বাড়িটা কেন ওর আসল শ্বশুরবাড়ি হলো না। এই মানুষগুলোর সাথে থাকলে তো খুব ভালো থাকতো। কত আনন্দে কাটাতে পারতো দিনগুলো। তা না হয়ে পৃথিবীর সব থেকে খারাপ মানুষগুলোর সাথে ওকে থাকতে হচ্ছে।
বাড়ি থেকে তো ওরা নাস্তা করেই বেরিয়েছিল কিন্তু তারপরেও এখানে আসার পর আবারো নাস্তা করতে দিল। গহনের মামাতো ভাই বোন গুলো সবাই ছোট ছোট। নাস্তা খাওয়া শেষে ওরাই গিয়ে ওদের বাগানের কাঁচা আম পেড়ে এনে মেখে দিল নিধিকে। এই খাবারটা নিধির ভীষণ পছন্দ হলো। একেবারে চেটেপুটে খেল।
আম মাখার বাটিটা নিয়ে গহন কে খুঁজতে খুঁজতে একটা ঘরে গিয়ে ওকে পেল। ছেলেটা বিশ্রাম নিচ্ছে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। নিধি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে একবার ডাকলো গহনকে। সঙ্গে সঙ্গে গহন চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,
“কিছু বলবে?”
নিধি আম মাখার বাটিটা গহনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা খান। ঘুম ছেড়ে যাবে।”
“কি আছে?”
“আম মেখে দিয়েছে আপনার ভাই বোনেরা। ওরা খুব ভালো। আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে। আরে ননদ দেবর হবে তো এমন হবে। তা না হয়ে সব কুটনিগুলো পড়েছে আমার কপালে। যাইহোক, উঠুন। এটা খান।”
গহন নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“না। আমি টক খাই না।”
“আরে বউ খাইয়ে দিচ্ছো তো। মিষ্টি লাগবে।”
“সে তো তুমি ফুচকার কথাও এটা বলেই খাইয়েছিলে। ঝাল তো ঠিকই লেগেছিল।”
নিধি মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“আমি ভালোবেসে ঠিকই খাইয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি ভালোবেসে খাননি। সেজন্য ঝাল লেগেছিল। তখন তো ভালোবাসতেন না। কিন্তু এখন তো আমাকে ভালোবাসেন। এটা আপনার ভালোবাসার একটা পরীক্ষা। যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকেন তাহলে আমার হাতের টক আমও মিষ্টি লাগবে।”
“অদ্ভুত তো! এগুলো কোত্থেকে শিখেছো তুমি? তাই বলে টক আম মিষ্টি লাগবে! বললেই হলো?”
নিধি গহনের পাশে গিয়ে বসে বলল,
“একবার খেয়েই তো দেখুন। আমি বলছি মিষ্টি লাগবে। তাও যদি না লাগে আমি ব্যবস্থা করে দেব। কথা দিচ্ছি। আজ যদি আম আপনার মিষ্টি না লেগেছে আমার নাম আমি বদলে ফেলব। টক লাগার সুযোগই দেব না।”
মেয়েটা খুবই জোড়াজুড়ি লাগালো গহনের সাথে। গহন বাধ্য হয়ে উঠে বসলো। বাধ্য হয়ে খেতেও রাজি হতে হলো। নিধি গহনের মুখে একটুখানি আম মাখা দিতেই গহনের শরীরটা একটু ঝাকি দিয়ে উঠলো যেন, এতটাই টক আম। গহনের অভিব্যক্তি দেখে নিধি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল যে একটুও মিষ্টি লাগেনি আমটা। অবশ্য লাগবেই বা কি করে। এটা তো সত্যি সম্ভব না।
তবে আরেকটা উপায় আছে নিধির কাছে। গহন চোখ দুটো বন্ধ করে কোন মতে শুধু এখন মুখে থাকা আমটুকু গেলার চেষ্টা করছে। তবে না গিলতে পারছে না ফেলতে পারছে।
গহন বিরক্তিকর মুখ ভঙ্গিতে বলল,
“একটুও মিষ্টি লাগেনি এই টক আম মাখা। কি যে করো না তুমি। আর জীবনে আমাকে এসব আজেবাজে জিনিস খাওয়াতে আসবে না।”
নিধি কোন উত্তর না দিয়ে আশেপাশে একবার দেখে নিলো কেউ আছে কিনা। দরজাটা যদিও খোলা আছে কিন্তু ঘরে তো কেউ নেই। গহন এখনো চোখদুটো বন্ধ করেই আছে। নিধি তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়িয়ে আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে খুব দুঃসাহসিক একটা কাজ করে বসলো। টপ করে গহনের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“চুমু দিয়ে দিয়েছি। এবারে নিশ্চয়ই মিষ্টি লাগবে। আমি এখন আসি।”
কথাটা বলে নিধি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিধির করা অতর্কিত হামলাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না গহন। ব্যাপারটা গহনের বোধগম্য হতে বেশ অনেকটা সময় লাগলো। যতক্ষণে বোধগম্য হয়ে চোখ খুলল ততক্ষণে নিধি পালিয়েছে সেখান থেকে।
গহনের পুরো শরীরটা যেন জমে গেল। গহন একদিকে যেমন জমে গেছে, অন্যদিকে আবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে। নিধি গহনের যে গালে ঠোঁট ছুঁয়েছিল গহন একবার সেখানে নিজের হাত বোলালো। কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে গহন। অস্থির লাগছে। মুখে থাকা আমটা সত্যি মিষ্টি লাগলো কিনা গহন জানেনা। তবে প্রেশারটা অবশ্যই বেড়েছে। আবার এমনও হতে পারে অতিরিক্ত মিষ্টির কারণে ডায়াবেটিস হয়ে গেল হয়তো।
__________
দুপুরে রান্নাবান্নার আয়োজন করছেন গহনের মামিরা। ওনাদের সাহায্য করার জন্য দুজন মেয়েকেও রাখা হয়েছে। নিধি ওনাদের পাশে বসে থেকে ওনাদের কাজ দেখছে। এখনও এই বাড়িতে মাটির চুলাতে রান্না হয়। বিশাল বড় রান্নাঘর। রান্নাঘরের মেঝে পাকা নয়। তবুও কি সুন্দর পরিষ্কার করে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে।
বর্তমানে রান্না করছে গহনের বড় মামি বিলকিস। বিলকিস খেয়াল করলেন নিধি উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখছে উনি কি রান্না করছেন।
“তুমি রান্নাবান্না পারো মা?”
বিকলিসের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“দুঃখের কথা আর কি বলি মামি। খুব একটা পারতাম না রান্না বান্না। কিন্তু এই বাড়িতে আসার পর বাধ্য হয়ে সব রান্না আমাকেই করতে হয়। আমি রান্না না করলে কেউ কোন খাবার খেতেই পারে না।”
স্বাভাবিকভাবে নিধির কথার ভঙ্গিমার জন্য যে কারোরই হেসে ফেলা উচিত ছিল। তবে হাসতে পারলেন না বিলকিস। উল্টো নিধির দিকে একটু ঝুঁকে এসে ওর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে কন্ঠে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন,
“আহারে! এতোটুকু একটা মেয়েকে দিয়ে এত কাজ করায়!”
বিলকিসের কথাটা শুনে পাশ থেকে গহনের ছোট মামি ফাহমিদা বলে উঠলেন,
“তো গহনের বাড়ির লোকদের থেকে তুমি কি আশা করো আপা? তোমার কি মনে হয় ওরা গহনকে বিয়ে করিয়েছে ওর বউকে শান্তিতে থাকতে দেওয়ার জন্য নাকি গহনকে শান্তিতে দেওয়ার জন্য? সংসারে নিশ্চয়ই অশান্তি করার জন্য কাউকে পাচ্ছিলো না। সেজন্য গহনের বিয়ে দিয়েছে। না হলে ওই মহিলা দেবে গহনের বিয়ে! ছেলে হাতছাড়া হয়ে যাবে না ওনার!”
ফাহমিদার কথাটা শুনে নিধি চোখ বড় বড় করে ওনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি করে বুঝলেন মামি? তারমানে উনি আপনাদের সাথেও কিছু করেছেন নাকি?”
“না। আমাদের সঙ্গে কি করবেন? আমরা ওনার বাড়িতে গিয়ে থাকি, না ওনার টাকায় খাই। আমাকে গরম দেখাতে এলে উল্টো আমি গরম দেখিয়ে ছাড়বো না।”
“তাহলে কি করে বুঝলেন?”
এবারে পাশ থেকে বিলকিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিধির প্রশ্নের উত্তরে বললেন,
“মানুষের সুখের কথা লুকিয়ে রাখা গেলেও, দুঃখের কথা লুকিয়ে রাখা যায় না মা। মুখ দেখেই বোঝা যায়। কবরী চলে যাওয়ার পর তো প্রথমদিকে প্রায় ছেলেটা আসতো এখানে। তখন আমার শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন। ছেলেটা মুখ ফুটে কিছু বলত না। বরং সব সময় সালমার প্রশংসাই করত। কিন্তু ওর শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখেই আমরা ঠিকই আন্দাজ করতে পারতাম সব। দু একবার ওর বাবাও নিয়ে এসেছে ওকে সঙ্গে করে। গহন কিছু বলে না। কিন্তু ওর বাবা অনেক কিছুই জানিয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ে করে কত বড় ভুল করেছিলেন সেসব নিজ মুখেই বলেছেন।”
“কবরী কে? গহনের মা?”
“হ্যাঁ। কি যে ভুতে ধরেছিল মেয়েটাকে কে জানে। এত ভালো একটা মেয়ে হুট করে সংসার ছেড়ে চলে গেল। ছেলেটাকে ছেড়ে চলে গেল। সংসার ছেড়ে নাহয় যেত। ছেলেটাকে যদি সঙ্গে নিয়ে যেত তাহলে তো আমরা ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতাম। ও যদি গহনকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত গহনের কি আর এত কষ্ট হয়!”
বিলকিস কথাটা বলতেই পাশ থেকে ফাহমিদা আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন,
“আপা চুপ কর। ভাইজান আসছে। কবরী আপার নাম শুনলে রাগারাগি করবে কিন্তু।”
মোস্তফা সাহেব সেখানে প্রবেশ করতেই পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠল। কবরী এবং গহনের সম্পর্কে সব ধরনের কথাবার্তা একেবারে থেমে গেল। মোস্তফা সাহেব গম্ভীর গলায় তার স্ত্রী বিলকিস কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“গহনের পছন্দের সবকিছু রান্না করছো তো?”
“হ্যাঁ। ওর পছন্দের সবই রান্না করছি।”
মোস্তফা সাহেব এবারের নিধির দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বললেন,
“শুধু যেন আবার গহনের পছন্দের খাবারই রান্না করো না। নিধির পছন্দের খাবারও রান্না করো। আমাদের বাড়ির বড় বউ নিধি। প্রথমবার এলো। ওর আপ্যায়নে যেন কোন ত্রুটি না থাকে।”
বিলকিস চুপচাপ মাথা নাড়াতেই মোস্তফা সাহেব সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিধির কোথাও এত কদর থাকতে পারে সেটা নিধি সত্যিই ভাবতে পারেনি। অন্তত গহনের সাথে সম্পর্কিত আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে যে নিধির এত কদর থাকবে সেটা নিধি আশা করেনি। অবশ্য গহনের যে এখানে এত কদর থাকতে পারে সেটাও তো নিধি ভাবেনি।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই পাশ থেকে ফাহমিদা একটু ফিসফিসিয়ে বললেন,
“তা নিধি, তুমি কবরী আপা কে দেখেছো কখনো?”
নিধি একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“হ্যাঁ একদিন ভিডিও কলে কথা হয়েছে ওনার সাথে।”
নিধির কথাটা শুনে বিলকিস আর ফাহমিদা দুজনেই চমকে উঠলেন। ফাহমিদা অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“কবরীর সাথে তোমার কথা হয়েছে! কিন্তু কিভাবে?”
“গহনের ফুপি কথা বলিয়েছেন। আরো একদিন কথা হয়েছে। সেদিন অবশ্য আমি ওনাকে চিনতে পারিনি।আমি তো তখনও জানতাম না যে উনি গহন এর মা। উনি গহনের ফোনে কল করেছিলেন গহন এর সাথে কথা বলার জন্য।”
ফাহমিদা আর বিলকিস আরেক দফা চমকালেন। রান্নাবান্না সব ফেলে রেখে ফাহমিদা আর বিলকিস নিধির দিকে ঘুরে বসলো। বিলকিস গুরুতর ভঙ্গিতে বললেন,
“কথা হয়েছে কবরীর সাথে গহনের?”
“না হয়নি। উনি তো কথা বলতে রাজি না। আর তাছাড়া ওনার মা কল করেছে খবরটা জানতে পারার সাথে সাথে ওনার সৎ মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কথা বলার সুযোগটাই তো উনি পেলেন না। ইচ্ছেও নেই কথা বলার।”
বিলকিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“স্বাভাবিক। যে কারণে কবরী ছেলেটাকে ফেলে রেখে গিয়েছিল তাতে স্বাভাবিকভাবে কোন সন্তানেরই আর তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা থাকবে না। খুব আফসোসে হয় জানো তো আমার। কেন যে চলে গিয়েছিল কবরী! বুঝতে পারি ওর সংসারের অশান্তি অন্যান্য সংসারের অশান্তির থেকে আলাদা ছিল। ও স্বাধীনচেতা মেয়ে ছিল। তারপরও যথেষ্ট মানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু শেষমেষ কি যে একটা কাজ করে বসলো!”
________
বিকেলের দিকে আবহাওয়া ভীষণ খারাপ হয়ে এলো। পরিষ্কার আকাশটা হঠাৎ করেই কালো মেঘে ঢেকে গেল। প্রকৃতি কেমন যেন উত্তাল হয়ে উঠলো। নিধি একটু গহনের মামাতো ভাই বোনের সঙ্গে গ্রামটা দেখতে বেরিয়েছিল। তবে খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। আবহাওয়া খারাপ দেখে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে এসেছে।
তীব্র বাতাসে পথে ধুলো উড়ছে। সেই ধুলাবালির কিছুটা নিধির চোখেও গিয়েছে। দুচোখ ডলতে ডলতে নিধি ঘরে গেল। গহন ওদের সঙ্গে যায়নি। ছেলেটা সেই যে আসার পর ঘরে উঠেছে। শুধু দুপুরে খাওয়ার সময় একটু বেরিয়েছিলো। না হলে ঘর থেকেই বের হয়নি। শুধু বিশ্রামই করছে, তো বিশ্রামই করছে। বাড়িতে থাকাকালীন ল্যাপটপকে ছাড়তে চায় না। আর এখানে ঘুরতে এসে বিছানা কে ছাড়তে চাইছে না। কবে যে লোকটা নিধিকে এভাবে জাপটে ধরবে কে জানে!
নিধিকে চোখ ডলতে ডলতে ঘরে ঢুকতে দেখে গহন জিজ্ঞেস করলো,
“ধুলো গেছে চোখে?”
“হ্যাঁ। পুরো রাস্তার ধুলো মনে হচ্ছে আমার চোখের মাঝে চলে গেছে।”
“নিষেধ করেছিলাম আমি যেতে। আমার কথা না শুনলে এমনই হবে।”
নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,
“জ্ঞান না দিয়ে একটু সাহায্য করলেও তো পারেন। একটু দেখুন তো চোখটা। মনে হচ্ছে চোখের মাঝে কোন পোকাও গেছে। যেন হাঁটছে আমার চোখের মধ্যে।খুঁজে বের করুন তো।”
কথাটা বলে নিধি গহনের সামনে গিয়ে বসলো। নিধির কথা অনুযায়ী গহন সত্যিই ওর চোখের মাঝে পোকা টোকা কিছু পড়েছে কিনা সেটা খোঁজার চেষ্টা করলো। তবে চোখটা একদম পরিষ্কার দেখাচ্ছে।
“না কিছু তো নেই। পরিষ্কার চোখ।”
নিধি একটা ঝাড়ি মেরে বলল,
“ভালো করে দেখুন তো। আপনি তো বুড়ো হয়ে গেছেন। চোখের পাওয়ার কমে গেছে। একটু সময় নিয়ে ভালো করে খুঁজুন।”
ঝাড়ি খেয়ে গহন আবারও ভালোভাবে নিধির চোখের মাঝে পোকা খোঁজার চেষ্টা করলো। এবারে ফোনে ফ্ল্যাশলাইট অন করে দেখলো। কিচ্ছু নেই। ফের বলে উঠলো,
“বললাম তো কিছু নেই। তুমি চোখ চুলকানো আগে বন্ধ করো। আর হাতে এত ধুলো ময়লা কেন? এই হাতে চোখ চুলকালে তো এমনিতেই অসুবিধা হবে। কোথায় গিয়েছিলে যে এতো ধুলো ময়লা লাগলো?”
নিধি দাঁত বের করে হেসে বলল,
“পড়ে গিয়েছিলাম রাস্তার মাঝে। আসলে সামনে একটা গর্ত ছিল। সেটা টের পাইনি। উজবুকের মতন হাঁটছিলাম তো। আমার হাতটা ধরার মতো কেউ ছিল না। অল্পের জন্য শাড়িটা খুলে যায়নি। ভাবুনতো শাড়ি খুলে গেলে কি হতো? আপনার মান সম্মান কিছু থাকতো না।”
“আমার মান-সম্মানের কথা না ভেবে আগে তোমার মান সম্মানের কথা চিন্তা কর। এত উশৃংখল কেন তুমি? খেয়াল থাকে কোথায় তোমার? একটা কাজ মনোযোগ দিয়ে করতে পারোনা।”
নিধি ফ্যালফ্যাল করে গহনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আগে আমি সব কাজ মনোযোগ দিয়েই করতাম। কিন্তু আজকাল আমার মনোযোগের একটু সমস্যা হয়েছে। মনোযোগ যে সারাদিন কোথায় থাকে আমি নিজেও খুঁজে পাই না।”
গহন যেই না আরো কিছু বলতে যাবে অমনি ঘরে গহনের ভাই বোনেরা প্রবেশ করল। নোশীন ছুটে এসে নিধির হাত টেনে ধরে বলল,
“ভাবি বাইরে চলো। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। আমরা সবাই বৃষ্টিতে ভিজবো।”
নোশীন আর নিধি সমবয়সী। সেজন্য আসার পর থেকে নোশীনের সাথেই সব থেকে বেশি ভাব জমেছে। বাকিরা সবাই নিধির ছোট। নোশীনের মুখ থেকে বৃষ্টিতে ভেজার কথাটা শুনতেই নিধি লাফিয়ে উঠে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“বৃষ্টিতে ভিজবো। অনেক দিনে হলো ভেজা হয় না। চলো চলো, তাড়াতাড়ি চলো। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে না হলে আবার।”
নিধি যেতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরে সাবধানী গলায় বলল,
“ভুলেও তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে না। রাস্তায় উষ্টা খেয়ে পড়েছিলে, এবার বৃষ্টির মাঝে আছাড় খেয়ে পড়ার ইচ্ছে হয়েছে তাই না? আর এই অসময়ে বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর আসবে। কোন প্রয়োজন নেই যাওয়ার। চুপচাপ বসে থাকো৷ নোশীন, তোমরা যাও।”
গহনের কথাটায় নিধি তুমুল আপত্তি জানিয়ে বলল,
“থাকবো না আমি। ওদের সাথে আমিও যাব। ওরা বৃষ্টিতে ভিজলে সমস্যা নেই, আমি ভিজলে কেন সমস্যা হবে? ওদেরকে যেতে বলছেন, তাহলে আমাকে আটকাচ্ছেন কেন?”
গহন গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে নিষেধ করেছে আমি। চুপচাপ বসো। নোশীন, তোমরা যাও। বৃষ্টি কিন্তু থেমে যাবে। তাড়াতাড়ি যাও।”
নোশীনরা বুঝলো গহন কে রাজি করানো সম্ভব না। অযথা নিধির জন্য ওদেরও ভেজা হবে না। তাই সবাই দৌড়ে চলে গেল বাইরে। গহন এখনও নিধির হাত ধরে আছে। নিধি খুব করে চেষ্টা করলো গহনের থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য। বলা যায় একপ্রকার লাফাচ্ছে। তবুও গহন ওর হাত ছাড়লো না। গহনের শক্তির সাথে পেরে ওঠা সম্ভব না। যখন নিধি বুঝলো এভাবে গায়ের জোরে পেরে উঠবে না তখন অসহায় মুখ করে গহনকে বলল,
“যেতে দিন না! কি হবে একটু বৃষ্টিতে ভিজলে? আচ্ছা ঠিক আছে আপনাকে নিয়েই ভিজবো। একা একা ভিজবো না।”
গহন পূর্বের মতই গম্ভীর গলায় বলল,
“নিষেধ করেছি আমি। তোমাকে এক কথা কতবার বলতে হয়? এত অবাধ্য কেন তুমি?”
নিধি এবারে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
“আমার বাড়িতে থাকতে বাবা ভিজতে দিত না। ভেবেছিলাম বিয়ের পর জামাইয়ের সাথে ভিজবো। কত আশা নিয়ে ছিলাম আমি বলুন তো। আরে বিয়ের পর জামাইয়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজবো বলেই তো এতদিন বেঁচে আছি আমি। চলুন না। বৃষ্টি শেষ হয়ে গেল তো। জীবন তো একটাই। উপভোগ করা উচিত। বাড়ি ফিরে গেলে তাে আবার নির্যাতন শুরু হয়ে যাবে। গহন, চলুন না!”
গহন তবুও ছাড়লো না নিধির হাত। যদিও এখন অনেকটা নরম হয়েছে মেয়েটার এভাবে আকুতি মিনতি করা দেখে। কিন্তু ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। বাজ পড়ছে। এর মাঝে তো ভিজতে দেওয়াটা ঠিক হবে না। তারপর যদি আবার অসুস্থ হয়ে যায়!
গহনের থেকে আশানুরূপ কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে নিধি বারবার আশাহত হচ্ছে। তবে হাল ছাড়লো না নিধি। এবারে গহনের পাশে গিয়ে একেবারে গহনের গা ঘেসে বসলো। গহন হঠাৎ করে নিধির এভাবে গা ঘেসে বসার কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। গহনকে আরেকটু অবাক করে দিয়ে নিধি ওর কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“চলুন না গহন। আপনি আমায় না বুঝলে আর কে বুঝবে? আমার শখগুলো যদি আপনিও না পূরণ করেন তাহলে আর কে পূরণ করবে? কাকে গিয়ে বলবো আমি আমার ইচ্ছেগুলোর কথা? আপনিও যদি আমাকে হাসাতে না পারেন তাহলে এই জীবন রেখে আর কি লাভ? আমি বলেছিলাম না আপনাকে ভালোবাসি শুধু মুখে বললেই হয় না, কাজে প্রমাণ করতে হয়। যদি আপনি আমার ভালো লাগা, খুশি, শখ এইসব বিষয়ই না বোঝেন তাহলে আর কি ভালোবাসলেন!”
গহন খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে মেয়েটা ওকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে। তবে সব কিছু বোঝা সত্বেও গহন কেমন যেন নরম হয়ে গেল। এত মিষ্টি করে আবদার করলে কতক্ষণই বা আর নিষেধ করা যায়। নিধির হাতটা ধরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে চলো। তবে বজ্রপাত হচ্ছে। বেশিক্ষণ না। পাঁচ মিনিট ভিজবো। তারপরে চলে আসবো তোমায় নিয়ে। তখন যেন আর কোনো বাড়াবাড়ি না দেখি।”
নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল,
“এক সেকেন্ডও বেশি থাকবো না কথা দিচ্ছি। এখন তাড়াতাড়ি চলুন।”
কথাটা বলে নিধি আগে দৌড় দিতে ধরে আবার থেমে গেল। পিছন ফিরে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বজ্রপাত হচ্ছে তো। আপনার ভেজার কি দরকার? আমি একা একাই ভিজি। যদি আপনার কিছু হয়ে যায় আপনার মা আমাকে ছাড়বে না।”
গহন শক্ত করে নিধির হাতটা ধরে আলতো হেসে বলল,
“কিছু হলে না হয় দুজনেরই হোক। একজনকে ছাড়া আরেকজন বেঁচে থেকেই বা কি করব!”