বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪১

🟢

নিধি খুবই বাধ্য মেয়ে। গহনের শর্ত অনুযায়ী পাঁচ মিনিটই ভিজেছে। পাঁচ মিনিট পরে যখন গহন ভিতরে যেতে বলেছে চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতন ভিতরে চলে এসেছে।

বৃষ্টিতে ভিজে ভেতরে এসে দুজন দুই বাথরুমে গেল জামা কাপড় বদলাতে। গহন জামা কাপড় বদলে হাঁচি ফেলতে ফেলতে ঘরে এলো। দরজার কাছে এসে সামনের দিকে তাকাতেই থমকে গেল।

নিধি পরনের ভেজা শাড়িটা বদলে আবারো একটা শাড়ি পরেছে। হালকা গোলাপি রঙের কটনের শাড়ি। ভেজা চুল বেয়ে এখনো টপটপ করে পানি মেঝেতে পড়ছে। এক পা বিছানায় উঠিয়ে একটু ঝুঁকে গিয়ে নুপুর পরছে। নুপুরটা কখন যে খুলে গিয়েছিল টের পায়নি। ভাগ্যিস মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছিল। নয়তো হারিয়ে ফেলতো।

নিধির চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। গহন খেয়াল করেছে মেয়েটা গোসল করে বেরোলেই এমন চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে যায়। এখন হয়তো বৃষ্টিতে ভেজার কারণে এমন হয়েছে। একটু ঝুকে যাওয়ার কারণে চুলগুলো বারবার চোখের সামনে এসে নুপুর পরায় বেশ বাঁধার সৃষ্টি করছে। আর নিধি বিরক্ত হয়ে বারবার চুল গুলো পিছনে ছুঁড়ে মারছে। চোখ মুখে তার সে কি বিরক্তি ফুটিয়ে তুলছে। যেন এর থেকে বিরক্তিকর কাজ সে আর জীবনে কখনো করেনি।

নিধির বেখেয়ালে শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গেছে। যার ফলে কোমরের খানিকটা অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। গহনের বেহায়া চোখ দুটো নিধির কোমরে গিয়ে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে গহন নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে ধরেছিল গহন। তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে সামলে নিল।

নুপুর পরা শেষে নিধি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে দেখলো গহন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে এভাবে দরজার কাছে সটান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনার আবার কি হলো? মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ঠান্ডায় জমে গেলেন নাকি?”

নিধির কথা শুনে ধ্যান ভাঙলো গহনের। মৃদু কেঁপে উঠে বলল,

“কই কিছু হয়নি তো। জমে যাইনি আমি।”

“তাহলে দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে আসুন।”

গহন সত্যি সত্যি ভিতর এলো। চুপচাপ বিছানার ওপরে বসে পড়লো। নিধির দিকে চোখ তুলে দ্বিতীয়বার আর তাকালো না। নিধি ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে চিরুনি এনে গহনের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,

“তবে চাই বলুন না কেন অনেক দিন পর বৃষ্টিতে ভিজে কিন্তু দারুন লাগলো। তবে আফসোস একটাই। আশেপাশে অনেক মানুষজন ছিল। নয়তো আপনার সাথে কয়েকটা ছবি তুলতাম। কিন্তু কি ভাবতো সবাই বলুন তো! ভাবতো আমি নির্লজ্জ। কারণ আপনাকে তো সবাই খুব ভালো করেই চেনে। আপনি যে কতটা রসকষহীন সেটাও নিশ্চয়ই জানে। দোষ তো আমারই হতো। সেজন্য আর তুললাম না। তবে পরেরবার কখনো সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই তুলবো। আপনার গলা জড়িয়ে ধরে তুলবো।”

শেষের কথাটা বলে নিধি ঠোঁট টিপে হাসলো। গহন চুপচাপ শুধু মাথা নাড়ালো। কোন উত্তর দিল না। ব্যাপারটা নিধির একদম পছন্দ হলো না। ও এতগুলো কথা বলে গেল তার প্রেক্ষিতে অন্তত হ্যাঁ কিংবা না অন্তত বলা উচিত ছিল গহনের। গহনের কাঁধে হালকা করে একটা কিল বসিয়ে বলল,

“কথা বলছেন না কেন?”

গহন হালকা তুঁতলিয়ে বলল,

“কি বলবো?”

“কিছু একটা বলুন।”

গহন কিছু বলতে চাইলো তবে ঠিক বলতে পারলো না। তার আগেই হাঁচি ফেলল। টানা পাঁচ-ছটা হাঁচি ফেলল গহন। এই কয়েকটা হাঁচি ফেলেই শরীরটা কেমন যেন দুর্বল দুর্বল লাগছে। আর কথা বলার পরিস্থিতিতেই রইল না। নিধি গহনের চুলে হাত দিয়ে দেখলো এখনো পানি চুপচুপ করছে। মনে হয় মাথাটা মোছেইনি। নিধি খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“মাথা মোছেননি আপনি তাই না? এত বড় একটা ছেলে তাও আক্কেল নেই। আপনার আরো কবে আক্কেল হবে? নতুন করে কি এসব আক্কেল শেখার মতন বয়স আছে আপনার? কিচ্ছু শেখায়নি আপনার মা আপনাকে।”

গহন কিছু বলতে চাইলো তবে এবারেও তার আগেই কয়েকটা হাঁচি ফেলল। নিধি বিরক্ত হয়ে গিয়ে গামছা এনে নিজেই গহনের মাথাটা মুছে দিল। যেমন কাজ করছে তেমনই মুখও চলছে। গহনের মাথা মুছে দিচ্ছে ঠিকই তবে এর মাঝে বকাবকিও চালু রেখেছে।

নিধি খুব কম সময়ই গহনের এতটা কাছাকাছি এসেছে। একটা অদ্ভুত মিষ্টি সুঘ্রান ভেসে আসছে নিধির শরীর থেকে। এই যে মেয়েটা কানের কাছে এভাবে অনবরত বকবক করেই যাচ্ছে সেগুলোও যেন মিষ্টি লাগছে শুনতে গহনের কাছে। কি সুন্দর যত্ন করে নিধি মাথা মুছিয়ে দিচ্ছে। আবার বকাও দিচ্ছে। গহন তো জানে নিধি ওর জন্য চিন্তা করে জন্যই বকাবকি করছে। নিজের প্রতি গহনের অবহেলার জন্য এভাবে বকাবকি করছে। নিধির এই ব্যাপারগুলো যে গহনের ঠিক কতটা ভালো লাগে সেটা গহন বলে বোঝাতে পারবে না।

গহন আলতো করে দুহাতে নিধির কোমর জড়িয়ে ধরে নিধির শরীরের সাথে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। নিজের শরীরের সমস্ত ভার যেন ছেড়ে দিতে চাইছে গহন। ইচ্ছে করছে নিধিকে বলতে যেন ওকে দুহাতে একটু আগলে নেয়।

গহন কে মুখ ফুটে এসব বলতে হলো না। হঠাৎ করে এভাবে গহন মাথাটা এলিয়ে দেওয়ার জন্য নিধির নিজেরই একটু চিন্তা হলো। গামছাটা পাশে রেখে আলতো করে গহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

“উঁহু।”

“তাহলে কি হয়েছে?”

“কিচ্ছু হয়নি।”

“তাহলে এভাবে কোমর জড়িয়ে ধরলেন কেন হঠাৎ করে?”

গহন ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“শান্তি পাচ্ছি। স্বস্তি পাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার খুব কাছে আমার নিজের কেউ আছে। যার আমাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তা হয়। যার ভালোবাসাটা অন্যরকম। যার বাইরেটা খিঁটখিঁটে, কঠোরতায় মোড়ানো। অথচ ভেতরটা একদম মোমের মতন। একটু ভালোবাসার আঁচ পেলেই

গলে যায়।”

“তবে তাকে সেই সামান্য ভালোবাসার আঁচটুকুই কেউ দেয় না। ভালোবাসা দিতে সবাই এতটাই কিপ্টেমি করে।”

নিধির কথাটা শুনে গহন মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে ওর দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“আমিও কিপ্টেমি করি?”

“আপনি তো আরও হারকিপ্টে। সবথেকে বড় কিপ্টে আপনি। আপনার মতন কিপ্টে আমি আমার জীবনে দেখিনি। যাইহোক, শুধু বউয়ের থেকে যত্ন নিলেই হবে না। বউয়েরও যত্ন করতে হবে। একটু সাহায্য করুন তো।”

গহন ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,

“কি?”

“শাড়ির কুচিটা ঠিক করে দিন। এলোমেলো হয়ে গেছে। আপনি কি বলুন তো? আপনার তো নিজ থেকে এগুলো খেয়াল করা উচিত। আমাকে সব সময় সবকিছু বলে বলে করাতে হবে কেন? কি সুন্দর নিজ থেকে এগিয়ে এসে একটু ঠিক করে দেবেন। সিনেমা-টিনেমা দেখেন না নাকি?”

“এত কথা বলার কি আছে? বললেই ঠিক করে দিতাম।”

নিধি একটু পিছিয়ে যেতেই গহন নিধির সামনে বসে ওর শাড়ির কুচি ঠিক করে দিল। নিধির খুব ভালো লাগলো এই মুহূর্তটা। একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করলো নিধির মাঝে। আজকাল নিধি অনুভব করতে পারে যে ও সংসার করতে এসেছে। ওর সংসারে সুখ আছে, আনন্দ আছে। যে মানুষটার সাথে সংসার করতে এসেছে সেই মানুষটা ভালো। নিধিকে ভালোবাসতে চায়, নিধির যত্ন করতে চায়। ব্যাস এতোটুকুই তো নিধির প্রয়োজন ছিল। এর থেকে বেশি তো আর কিছু চায়নি।

____________

নিধিদের যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেই ঘরটা বিশাল বড়। সেই ঘরে একটা বিশাল বড় জানালাও আছে। ঝড় বৃষ্টির কারণে কারেন্ট নেই। সেজন্য জানালাটা খোলা রেখেই ঘুমিয়েছে, যেন বাইরে থেকে বাতাস আসে। জানলার ধারে বিছানা না হওয়ায় কোন ধরনের অসুবিধা হচ্ছে না।

খাটটাও বিশাল বড়। দুজন মানুষ অনায়াসে খুব স্বাচ্ছন্দে ঘুমোতে পারবে। তবে গহন খেয়াল করছে নিধি সমানে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। গহন যতই সরে যাচ্ছে নিধি ততই ওর দিকে এগিয়ে আসছে। একপর্যায়ে গিয়ে গহন খেয়াল করলো ওর কাছে আর সরার মতন জায়গা নেই। একটু নড়লে পড়েও যেতে পারে খাট থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখলো নিধি একেবারে ওর পিঠের নিচে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে। একহাতে খামছে ধরে আছে গহনের টি-শার্ট।

গহন এতক্ষণে বুঝতে পারলো মেয়েটা কেন বারবার এগিয়ে আসছিল। বাইরে এখনো বেশ ভালোই ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে বজ্রপাতও হচ্ছে। একটু পর পর যখন জোরে জোরে বাজ পড়ছে তখনই নিধি এক ধাপ এক ধাপ করে ওর দিকে এগিয়ে এসে খামচে ধরছে ওর টি শার্ট।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই আরো একবার বেশ জোরেশোরে একটা বাজ পড়লো। নিধি এবারে ভয়ে মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো। সেই সাথে দুই হাতে শক্ত করে খামচে ধরলো গহনের টি শার্ট।

গহন তাড়াহুড়ো করে নিধির দিকে ঘুরে শুয়ে বলল,

“আরে ভয় পাচ্ছ কেন? কিচ্ছু হবে না। আমি তো আছিই।”

নিধি তো ভাবেইনি যে গহন জেগে আছে। এমন ভয়াবহ একটা মুহূর্তে গহনের কন্ঠটা শুনে নিধি যে কি শান্তি পেল সেটা বলে বোঝাতে পারবে না। দুজনের মাঝে যতটা দূরত্ব ছিল সেটাও আর রাখল না নিধি। যতটা সম্ভব গহনের দিকে এগিয়ে এসে গহনের টি-শার্ট খামচে ধরে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে বলল,

‘আপনি জেগে আছেন সেটা আগে বলবেন তো। তাহলে তো ভয় কম পেতাম।”

“আমি তো এখন বুঝলাম যে তুমি ভয় পাচ্ছো। আমি তো জানতাম না যে তুমি ভয় পাও।”

“অদ্ভুত তো! না জানার কি আছে? এটা তো খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আসলেই আপনার কোন আক্কেল নেই।”

পাল্টা আর কিছু বলল না গহন। চুপচাপ শুয়ে রইলো। একটু পর নিধিই আবার বলে উঠলো,

“জেগে আছেন?”

গহন ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ।”

“ঠান্ডা লাগছে। একটু কাঁথাটা গায়ে দিয়ে দিন তো।”

“তোমার ওপাশেই তো আছে।”

“তো আপনি হাত বাড়িয়ে নিন। এত বিশাল একটা হাত আপনার। ঠিক পেয়ে যাবেন। চেষ্টা করুন।”

“আরে তুমি নাও। কি সমস্যা?”

নিধি গহনের কথায় তুমুল আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না। আমার নড়াচড়া করতে ভয় লাগছে। আমি একটু নড়লেই জোরে জোরে বাজ পড়ছে। বিশ্বাস করুন আমি নড়তেই পারব না। দেখুন কি ভয়ানক ভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর জানালা দিয়ে আলো আসছে ঘরে। আমি তাকাতেই পারবোনা। যা করার আপনিই করুন। আর পারলে জানালাটাও বন্ধ করে দিয়ে আসুন।”

গহনেরও মনে হলো জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আসাই ভালো হবে। তাহলে আলোও আসবে না আর ঘরে, শব্দ হয়তো একটু কম হবে। তাহলে নিধিও আর তেমন ভয় পাবেনা।

গহন উঠতে ধরলে নিধি দুহাতে ওকে টেনে ধরে আবার শুইয়ে দিয়ে বলল,

“উঠছেন কেন আবার?”

“তুমিই তো বললে জানালা বন্ধ করে দিয়ে আসতে। সেজন্যই উঠছি। এখন ছাড়ো আমায়। তুমি তো পাগল হয়েছোই, আমাকেও কি পাগল বানাবে।”

নিধি চুপচাপ ছেড়ে দিলো গহন কে। গহন জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বাইরের ফুরফুরে হাওয়া ওর গায়ে লাগলো। ভেজা মাটির গন্ধ নাকে আসতেই একটা লম্বা শ্বাস টানলো গহন। আর অমনি যেন ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলো গহন।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো এখন আর জোরে জোরে বাজ পড়ছে না। শুধু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। বৃষ্টির বেগও অনেকটা কমে এসেছে। তবে বাতাস এখনো বইছে। গহনের খুব ভালো লাগলো জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। অন্ধকারের মাঝে বুঝতে পারছে বাইরের গাছপালা গুলো কি ভয়ঙ্কর ভাবে নড়াচাড়া করছে। তারা উল্লাসে মেতেছে। কি নিদারুন আনন্দ তাদের মনে আজ।

এদিকে এতক্ষণেও গহন ফেরত না আসায় নিধি খুবই বিরক্ত হলো। মাথা তুলে জানালার দিকে তাকাতেই দেখলো মানুষটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

“ওখানে ওভাবে মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোলেও তো পারেন। দেখছেন আপনার বউটা ভয় পাচ্ছে। তাও কোন আক্কেল নেই আপনার।”

নিধির কন্ঠটা কানে যেতেই গহনের ধ্যান ভাঙলো। গহন তো ভুলেই গিয়েছিল নিধির কথা। গহন ভুলে গিয়েছিল জানালার সামনে এসে কি কারণে দাঁড়িয়েছে সেই কথা। তবে এই মুহূর্তে জানলাটা বন্ধ করতে ইচ্ছে করলো না। নিধিকেও একবার জানালার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বাইরের আবহাওয়াটা দেখানোর ইচ্ছে হলো।

বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকা নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“একটু আমার সাথে এসো তো।”

নিধি মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,

“কোথায়? বললাম না আমার নড়াচড়া করার শক্তি নেই।”

“আমি থাকবো তো তোমার সাথে। আমি থাকতে ভয় কিসের! আমি কিচ্ছু হতে দেব না তোমার। ভালোবেসে আগলে রাখবো। তুমি শুধু ভরসা করে আমার হাতটা ধরো।”

কথাটা বলে গহন নিধির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। হঠাৎ করে নিধির কি হলো কে জানে। মনের মাঝে থাকা সব ভয় নিমিষের মাঝে উবে গেল। নিধির খুব বিশ্বাস তৈরি হয়েছে গহনের প্রতি যে গহন ওকে ভালোবেসে আগলে রাখবে। কিছু হতে দেবে না নিধির। আর নিধির ভরসা আছে জন্যই তো উঠে বসে ভরসা করে গহনের হাতটা ধরল। গহন আলতো হাসলো শুধু। নিধির হাতটা পাল্টা শক্ত করে ধরে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে গহন নিধির ভরসা রাখবে।

গহন নিধিকে নিয়ে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড় করালো। আর গহন দাঁড়ালো নিধির পেছনে। নিধি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা বাজ পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে নিধি পিছন ঘুরে দুহাতে গহন কে জড়িয়ে ধরে ভয়ার্ত গলায় বলল,

“অযথা এখানে নিয়ে এলেন। এত জোরে জোরে বাজ পড়লে আপনিও বাঁচাতে পারবেন না। এখান থেকে চলুন। নয়ত দুজনেই ম'রে পড়ে থাকবো।”

গহন নিধিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“কিচ্ছু হবে না। সামনে তাকাও।”

কথাটা বলে গহন জোর করে নিধিকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। এবারে আর কোন ধরনের বজ্রপাত হলো না। বাইরে থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস গহন নিধিকে অনুভব করতে বলল। ভেজা মাটির গন্ধ নিধিকে অনুভব করতে বলল গহন। দূর থেকে ভেসে আসা কোন এক অজানা বুনো ফুলের গন্ধ গহন নিধিকে অনুভব করতে বলল। নিধি সেই সমস্ত কিছু অনুভব করতে পারলো। আর যখনই সেগুলো অনুভব করতে পারলো নিমেষের মাঝে আবারো ভয় উধাও হয়ে গেল।

“ভেজা মাটির গন্ধ এত সুন্দর হয় আগে তো জানতাম না।”

গহন এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে নিধিকে জড়িয়ে ধরল। নিধির পরনের শাড়িটা এতক্ষণ শুয়ে থাকার কারণে একটু এলোমেলো হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ গহনের হাতটা গিয়ে পড়লো সরাসরি নিধির উন্মুক্ত পেটে। নিধি শিউরে উঠলো। তবে গহনের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। না ছেলেটা নিজেকে আটকালো, না কোনো অস্বস্তির মাঝে পড়লো, আর না লজ্জা পেয়ে চলে গেল। বরং নিধির কেন যেন মনে হলো গহন জেনেশুনেই এই কাজটা করেছে। গহন শুধু এতোটুকুতেই সীমাবদ্ধ রইলো না। এরপর নিধির কাঁধের উপর আবার নিজের থুতনিও রাখলো।

বিছানায় তো অনেকক্ষণ যাবৎ নিধি অনেকটা কাছাকাছি ছিল গহনের। গহনকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল। কিন্তু তখনও নিধির এমন অনুভুত হয়নি যেমনটা এখন হচ্ছে। এখন গহন খুবই কাছে নিধির। পার্থক্যটা এখানেই যে তখন নিধি জড়িয়ে ধরেছিল গহনকে। তবে এখন গহন ধরে আছে। গহন নিজের হাতটা মোটেই স্থির রাখেনি। নড়াচড়া করছে। নিধির শরীরে যেমন অদ্ভুত শিহরণ তৈরি হচ্ছে ঠিক তেমনি যেন সুরসুরিও অনুভব করছে। তবে গহনকে কিছু বলতেও পারছে না। কেননা কোন কিছু বলার মতন পরিস্থিতিতেই এখন নিধি নেই। হৃদস্পন্দনের গতি এতটাই বেড়ে গেছে যেন মনে হচ্ছে হৃদযন্ত্রটা লাফাতে লাফাতে এখন বেরিয়ে আসবে।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে গহনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“বাইরে প্রকৃতি আজ যতটা উত্তাল হয়ে উঠেছে ঠিক ততটাই উত্তাল হয়ে উঠেছে আমার হৃদয়ও নিধি। আজ মন আর মানতে চাইছে না। বারবার হতে চাওয়া ভুলগুলোর থেকে আজ আর নিজেকে সাবধান করতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে আমার অজান্তে আজ কোন একটা ভুল হয়ে যাক। অসাবধানতাবশতই না হয় আজ দুজনে আরেক ধাপ কাছাকাছি চলে আসি। এই ঝড়ের কোন পূর্বাভাস আমার হৃদয় আগে পায়নি। কোন আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে হৃদয়ে এই ঝড়টা উঠলো। এখন এই ঝড়টাকে থামাই কি করে বলতো? তুমি কি আমায় একটু সাহায্য করতে পারবে!”

নিধি তো ঠিকই বুঝলো যে গহন ওকে কি বোঝাতে চাইছে। তবে ও যে বুঝতে পেরেছে সেটা আপাতত গহনকে বুঝতে দিতে চাইলো না। নিধি খুব করে চেষ্টা করলো স্বাভাবিকভাবে গহনের সাথে কথা বলার জন্য। তবে পারলো না। কন্ঠ কাঁপল। মৃদু কম্পিত গলায় বলল,

“আমি কি করে সাহায্য করবো?”

গহন এবারে নিধিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। ফলস্বরূপ নিধির হাত দুটো গিয়ে পড়লো গহনের কাঁধে। আর গহনের হাতের অবস্থান বর্তমানে নিধির উন্মুক্ত কোমরে। বেহায়া ছেলেটার হাত এখনও নিজের মর্জিমত নিধির সমস্ত শরীরে কোনোরকম কোনো দ্বিধা ছাড়া বিচড়ণ চালাচ্ছে।

নিধি গহনের চোখের দিকে তাকাতেই দেখলো বেশ অদ্ভুত দৃষ্টিতে গহন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। গহনের দুচোখে অদ্ভুত কিছু একটা রয়েছে। কোন কামনা রয়েছে গহনের চোখ দুটোতে। নিধির থেকে যেন কোন কিছু চাইছে। খুব আকাঙ্ক্ষিত বস্তু যেন সেটা গহনের জন্য। যেন আকুতি জানাচ্ছে নিধিকে, যেন নিধি একটু সায় জানায় গহনের আবদারে।

নিধি কেন যেন গহনের সেই দুচোখের দিকে তাকিয়ে বাকহারা হয়ে গেল৷ কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে ফেলছে নিধি। নিধির কেন যেন মন হচ্ছে আজ ও গহনের কাছে হেরে যাবে। গহনের এই অদ্ভুত দৃষ্টির কাছে হেরে যাবে। গহনের স্পর্শের কাছে হেরে যাবে। হেরে যাবে গহনের আবদারের কাছে। নিধি হেরে যাবে আজ নিজের অনুভূতির কাছে। মনে হচ্ছে যে কোন সময় সায় জানিয়ে ফেলবে গহনের আবদারে। ধরা দিয়ে দেবে গহনের কাছে।

নিধি এসব ভাবনার মাঝেই খেয়াল করলো গহন একটু ঝুঁকে আসছে ওর দিকে। গহন ঝুঁকে নিধির কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আমার অশান্ত হৃদয়টাকে শান্ত করতে শুধু তুমিই পারবে। তুমি ছাড়া তো আর কেউ পারবে না নিধি আমার হৃদয়টাকে শান্ত করতে।”

কথাটা বলে গহন সোজা হয়ে দাঁড়ালো। নিধির ঠোঁটটা কেন যেন তির তির করে কাঁপছে। ওর হাত দুটোও কাঁপছে। কিন্তু তবুও খুব কষ্টে বলল,

“সত্যি কি আমি পারবো? আমার কি আপনাকে এত কিছু দেওয়ার ক্ষমতা আছে?”

গহন নিধি কে আরেকটু নিজের কাছে টেনে নিল। এমনিতেই দুজনে যথেষ্ট কাছাকাছি ছিল। তবে এবারে দূরত্বটা একেবারেই রইলো না। দুজনে অত্যাধিক কাছাকাছি চলে এসেছে। এতটাই কাছাকাছি চলে এসেছে যেখান থেকে আজ আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। নিধি হয়তো নিজেই পারবে না আজ এতটা কাছাকাছি এসেও ফিরে যেতে। আর না গহন ওকে যেতে দেবে।

“তুমি আমাকে সব দিয়েছো নিধি। তুমি আমাকে শান্তি দিয়েছো, স্বস্তি দিয়েছো, বাঁচার কারণ দিয়েছো, তুমি আমাকে ভালোবাসা দিয়েছো, আমায় যত্ন দিয়েছো, আমায় আগলে রেখেছো। আজ আরেকটু কাছে টেনে নেবে আমায়! ঠিক ততটা কাছে টেনে নাও যতটা কাছে গেলে আমরা আর কক্ষনো দূরে যেতে পারবো না। যতটা কাছে যাওয়ার পর আর কখনো আমাদের মনে হবে না যে আমরা দূরে রয়েছি। যতটা কাছে গেলে সব সময় আমরা দুজন অনুভব করতে পারবো যে আমরা একে অপরের কাছেই আছি। আজ আমি তোমার ততটা কাছাকাছি যেতে চাই নিধি যতটা কাছাকাছি গেলে তোমার উষ্ণ স্পর্শে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবো। আজ আমি তোমার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই। আজ আমি একটু বেহায়া হতে চাই। আজ আমি খুব কাছ থেকে তোমার ভালোবাসা চাই। আমি চাই আজ তুমি নিজে একটু আমায় আগলে নাও। ঠিক তোমার বুকের মধ্যে খানে। যেখান থেকে কেউ কখনো আমাকে সরিয়ে ফেলতে পারবে না। যেখানে আমি সারা জীবন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো। নেবে আমায় এতটা কাছে টেনে?”

গহনের কণ্ঠে যে সীমাহীন ব্যাকুলতা প্রকাশ পেল সেটা নিধি খুব ভালোভাবেই টের পেলো। নিধি বুঝলাে গহনের এই আকুলতা শুধু নিধি কে একটু কাছে থেকে পাওয়ার জন্য না। বরং গহনের আকুলতা কেউ যেন গহনকে একটু নিজের কাছে টেনে নেয় সেজন্য। ছেলেটা কক্ষনো কাউকে কাছ থেকে পায়নি। কারো ভালোবাসা পায়নি, কারো স্নেহ পায়নি, কারো যত্ন পায়নি। কেউ আগলে নেওয়ার মতন ছিলো না গহনকে। সেজন্যই তো নিধির থেকে একটু ভালোবাসা পেতেই ছেলেটা চাইছে নিধি যেন ওকে আগলে নেয়।

এমন আবদারের পর নিধি তো ফিরিয়ে দিতে পারবে না গহন কে। নিধি তো নিজেই সবসময় গহনকে আগলে রাখতে চায়। সেখানে যখন গহন আজ নিজ থেকে আবদার করছে সেখানে কি নিধি ওকে ফেরত পাঠাতে পারে! কখনোই না।

গহনের এই মস্ত বড় আবদারের প্রেক্ষিতে নিধি শুধু আলতো হাসলো। গহন বুঝলাে নিধি ওকে আগলে নেবে। গহন বুঝলো ও যা চাইছে নিধিও তাই চাইছে। নিধিও চাইছে আজ গহনের ভালোবাসাময় স্পর্শের মাঝে হারিয়ে যেতে।

গহন আর কিঞ্চিত সময়ও ব্যয় করতে চাইলো না। হৃদয়ে যে তুমুল ঝড় বইছে! তুমুল অস্থিরতা চলছে হৃদয়ের মাঝে। এতটা কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও গহনকে অনেকটা সময় ধৈর্য নিয়ে নিধির অনুমতির অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু এবারে যখন অনুমতি পেয়ে গেছে তখন তো আর দেরি করা যায় না।

মুহূর্তের মাঝে গহন খুব যত্ন আর ভালোবাসার সাথে নিধির ঠোঁট জোড়া দখল করে নিলো। পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সমস্ত শান্তি যেন গহন সেখানেই খুঁজে পেল। নিধি একটুও বাধা দিলো না গহনকে। নিধি নিজেও নিজেকে হারিয়ে ফেলল। এতক্ষণ শরীরে যে অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল এখন যেন তা আরো কয়েকগুন বেড়ে গেল। পরম আবেশে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে গহনের ভালোবাসাময় স্পর্শ অনুভব করলো নিধি।

বাইরে কমে আসা ঝড়টা হঠাৎ করে কেমন যেন বেড়ে গেল। আবারো শুরু হলো তুমুল বেগে বৃষ্টি আর বাতাস। গাছপালাগুলো আবারো কোন এক অজানা খুশিতে মেতে উঠেছে। এবারে তাদের খুশির পরিমাণটা এর আগেরবারের থেকেও দ্বিগুণ। কি উচ্ছ্বাস তাদের মনের মাঝে!

তুমুল বাতাসে জানালাটা আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেল। এখন পুরো ঘর জুড়ে কোন আলো নেই। সমস্ত ঘর অন্ধকারে ছেয়ে গেল। এই অন্ধকারের মাঝে দুটো মানব মানবী নিজেদের সুখের ব্যবস্থা ঠিক করে নিয়েছে। তারা একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেছে। এখন চারিদিকে কোথায় কি ঘটছে কোন কিছুতে তাদের খেয়াল নেই। তারা শুধু এতটুকুই জানে আজ তারা একে অপরকে নিজেদের কাছে টেনে নেবে। দুজন দুজনকে নিজেদের ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখবে।

বাইরে ঝড় ক্রমাগত ভাবে বাড়ছে। কে জানে তাদের মনে এত কিসের আনন্দ! আচ্ছা দুজন মানব-মানবীর ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ায় কি তারা আজ এতটা খুশি?

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প