বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩৬

🟢

❝কখনো ভালোবাসা সিক্ত তো কখনো অশ্রুতে❞

নিধি আসার সঙ্গে সঙ্গে জুবাইদা ওকে নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন। নিধি কে বিছানায় বসিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তিনি নিধির পাশে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে বললেন,

“নিধি, গহন ওর মায়ের বিষয়ে তোমায় কিছু জানিয়েছে?”

গহনের মায়ের প্রসঙ্গটা উঠতেই নিধির মেজাজটা বিগড়ে গেল। মৃদু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

“হ্যাঁ বলেছে।”

“কি বলেছে?”

“উনি গহনের সাথে যা করেছেন সে সবই বলেছে ফুপি। ভালো কিছু তো বলার মতন নেই ওনার সম্বন্ধে যা গহন আমায় বলতে পারে। খারাপই বলেছে।”

“ও কি ওর মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে চায় না?”

“যোগাযোগ করা কি উচিত? আপনিই বলুন না ওনার মা ওনার সাথে যা করেছিল সেসব কি ঠিক করেছিল? এরপরে কি ওনার সাথে যোগাযোগ করা উচিত হবে? একটা বাচ্চাকে উনি একা ফেলে রেখে গিয়েছিলেন। তাহলে এত বছর পর হঠাৎ করে আবার সেই ছেলের প্রতি এত ভালোবাসা তৈরি হওয়ার কি কারণ?”

জুবাইদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে তো আমাদের সবারই সময় লাগে নিধি। গহনের জন্য বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। ও খুবই আবেগী এই বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমিও ভাবির প্রতি রেগে ছিলাম। আমিও চাইতাম যেন গহন কখনো ওনার সাথে যোগাযোগ না করে। কিন্তু আমি এখন চাই যেন ওদের মা ছেলের মাঝে সম্পর্কটা ঠিক হয়ে যায়। তার অন্যতম কারণ আমার ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী। যদি উনি আমার ছেলেটাকে মন থেকে ভালোবাসতেন তবে আমি এটা চাইতাম না। আমি শুধু চাই গহন যেন মায়ের ভালোবাসা পায়।”

জুবাইদার কথায় যুক্তি আছে। তবে নিধি এটাও মেনে নিতে পারছে না যে গহনের নিজের মায়ের সাথে আবারও সম্পর্কটা ঠিক করে নেওয়া দরকার। কারণ একবার যে ছেড়ে চলে যেতে পারে, সে বারবার ছেড়ে চলে যেতে পারে। আর এবার যদি ফিরে আসার পর আবারও তিনি গহন কে ছেড়ে চলে যান। তাহলে গহনের নিজেকে আবার শক্ত করে গড়ে তুলতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। হয়তো আর কখনো স্বাভাবিক হতেই পারবে না।

“সে আপনি যাই বলুন ফুপি। আমিও চাই না যে উনি ওনার নিজের মায়ের সাথে যোগাযোগ করুক। এটা ঠিক গহনের সৎ মা হয়তো ওনার অযত্ন করে, অবহেলা করে। তবে জানেন উনি যখন গহনের যত্ন করে সেগুলোর মধ্যে ছলনা থাকে না। গহনের ওনার প্রতি প্রচুর কৃতজ্ঞতা। উনি যদি সত্যিই প্রচন্ড খারাপ হয়ে থাকতেন নিশ্চয়ই গহনের এতটা কৃতজ্ঞতা থাকতো না। কিছু তো উনি ভালো নিশ্চয় করেছেন গহনের সাথে।”

জুবাইদা তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,

“গহন বোকা। সেজন্য ওই মহিলার ছলনাগুলো ধরতে পারেনা। উনি প্রচন্ড স্বার্থপর নিধি। তুমি এখনও ওনাকে চিনে উঠতে পারোনি। ওনাকে চেনা সম্ভব না। সারা জীবন লেগে যাবে একটা মানুষের তবুও ওনাকে ঠিকভাবে চিনে উঠতে পারবে না। উনি সেকেন্ডে সেকেন্ডে নিজের রুপ বদলায়। এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ দেখেছি কিন্তু ওনার মতন জটিল মানুষ আমি আর দুটো দেখিনি।”

নিধি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কেন এত জটিল মনে হয় ওনাকে? আমার তো এতটাও জটিল মনে হয় না। ভালো খারাপ মিলিয়েই মানুষ। এই কি খারাপ গুণগুলো ওনার মাঝে বেশি।”

“উনি কতটুকু ভালো সেসব বলতে পারব না। তবে আমার গহনের জন্য যে উনি কোন বিষের থেকে কম না এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আসলে শুধু ওনার দোষ দেওয়া যায় না। আসল দোষ ছিল আমার ভাই আর আমার মায়ের। গহনের প্রতি ওদের অতিরিক্ত অন্ধ স্নেহই গহনের জীবনটা আরও বিষাক্ত করে তুলেছে। ওদের জন্যই গহন যেমন ওর নিজের মা কে হারিয়েছে। ঠিক তেমনি সৎ মায়ের থেকেও ভালোবাসা পায়নি।”

নিধি এবারে বেশ আগ্রহ খুঁজে পেল এই ব্যাপারটায়।নিধি জানতে চায় গহনের অতীতের ব্যাপারে। ওর মা কেন চলে গেল ওকে ছেড়ে সেই ব্যাপারে গহন কে তো জিজ্ঞেস করা যা না। ও নিজেই তখন ছোট ছিল। এই কথাগুলো তুললে মনও খারাপ হয়ে যায়। বাকি রইল একমাত্র জুবাইদা। যার থেকে সবটা জানা যেতে পারে। নিধি জুবাইদার দিকে ঘুরে বসে কৌতূহলী গলায় বলল,

“কেন ফুপি? ওনারা কি করেছিলেন?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জুবাইদা পুরনো স্মৃতির মাঝে ডুব দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ সেগুলো মনে করার পর নিধি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমার ভাইয়ের খুব বাজে একটা স্বভাব ছিল। স্ত্রী কে সম্মান না করা। ওনার মানসিকতা এমন ছিল যে বাড়ির বউ এর কাজ শুধুমাত্র তিন বেলা ওনাকে রান্না করে খাওয়ানো, ঘরদোর পরিষ্কার করা, আর বাচ্চা মানুষ করা। সেই বাচ্চার প্রতিও মায়ের অধিকার থাকবে না। প্রয়োজনে তিনি মা হয়ে তার নিজের সন্তানকে শাসন করতে পারবেন না। মা হয়ে তিনি তার সন্তানের সম্বন্ধে ভালো-মন্দ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। আমার মাও এমনই ছিল। সব সময় ছেলেকে উস্কানি দিত। ছেলের বউ ওদের কাছে মানুষই ছিল না।”

“তাহলে ওনাদের কারণেই গহনের মা চলে গিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। গহনের মা ছিল শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে। রুপে, গুণে অনন্য। বিয়ের আগে কথা হয়েছিল ওনাকে পড়াশোনা করতে দেয়া হবে, চাকরিও করতে দেওয়া হবে। ভাবির স্কলারশিপে বিদেশে মাস্টার্স করতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভাই সেটা করতে দেয়নি। তার কারণ ভাইয়ের মনে হয়েছিল বউ যদি বেশি পড়াশোনা করে তাহলে হয়তো তাকে আর সংসারে দমিয়ে রাখা যাবে না। সে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখবে। ভাবির আর পড়াশোনা করা হয়নি। চাকরির কথা তো বাদই দাও।”

“তারপর?”

“প্রচন্ড আত্মসম্মানী মেয়ে ছিল ভাবি। ছোটখাটো প্রয়োজনে ভাইয়ের কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে খুব সম্মানে বাঁধতো। তারও কারণ প্রত্যেকটা বিষয়ে ভাইকে জবাবদিহি করতে হতো। প্রত্যেকটা পয়সার হিসাব দিতে হতো। এমন না যে ভাইয়া টাকা দিত না। টাকা দিত কিন্তু পাই পাই হিসাব দিতে হতো। এক টাকা এদিক ওদিক হলেই খুব ঝামেলা করতো। তিন বেলা রান্না বান্না নিয়ে ঝামেলা করতো। গহনকে একটু শাসন করলে ঝামেলা করতো।”

নিধি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এত বাজে ছিলেন উনি! না মানে আমি ভাবতাম গহন বোধহয় ভালো না। এখন তো মনে হচ্ছে গহন যথেষ্ট ভালো।”

জুবাইদা একটু হেসে বললেন,

“ঠিক বলেছো। আমার ছেলেটা খুব ভালো। যদিও তোমাদের বিয়ের সময় আমি ওর মাঝে একটু আমার ভাইয়ের গুন দেখতে পেয়েছিলাম। তবে এখন ও ঠিক আছে। ও অবুঝ না। ও শুধু ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চায়। ভাবি খুব ভালোভাবে জানতো গহনকে চাইলেও ভাবি নিজের সাথে রাখতে পারবে না। আবার আমার ভাই যে খুব সহজে ভাবিকে ডিভোর্স দেবে না সেটাও জানতো। সেজন্যে ভাবি সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল কাউকে না জানিয়ে চলে যাওয়ার। জীবনের আটটা বছর উনি সংসারে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিনিময়ে কিচ্ছু পাননি। উনি শুধু একটু নিজের মতন বাঁচতে চেয়েছিলেন।”

“এটাই ওনার চলে যাওয়ার কারণ?”

জুবাইদা একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেলেন। একবার ভাবলেন বলবেন নাকি বলবেন না। পর মূহুর্তে মনে হলো বলা উচিত হবে না। নিধির মনে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে।

উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে শুধু হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালেন নিধি কে।

নিধি অসন্তুষ্ট গলায় বলল,

“আমি মানছি ফুপি যে ওনার সংসারে শান্তি ছিল না। উনি শান্তির খোঁজে সংসার ছেড়ে চলে যেতেই পারতেন। কিন্তু গহনকে নিয়ে যেতে পারতেন সঙ্গে করে। গহন কে ওভাবে একা শপিংমলে ফেলে রেখে যাওয়া কি ওনার উচিত হয়েছিল? যদি কোন বিপদ হয়ে যেত তার দায়ভার কে নিত?”

এবারে কোন উত্তর দিলেন না জুবাইদা। তিনি তো নিজেও জানেন গহনের মা যা করেছিল সেটা ঘোর অন্যায় ছিল। এই পাপের কোন ক্ষমা হয় না। জুবাইদা নিজেও ওনাকে কখনো ক্ষমা করতেন না। কিন্তু সালমা বেগমের আচরণ যে জুবাইদা কে কাজটা করতে বাধ্য করেছে।

গহনের মা এক সময় ভুল করেছিল গহন কে ফেলে রেখে চলে গিয়ে। কিন্তু এখন তিনি নিজের ভুলটা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন। এখন যদি একবার সুযোগ পান ছেলেকে ভালোবাসার তাহলে হয়তো নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসবেন। কিন্তু সালমা বেগম তো কখনো সেভাবে ভালোবাসবে না। উনি তো কখনোই গহনকে ভালোবাসবে না। আর জুবাইদা তো চায় যেন গহন একটু মায়ের ভালোবাসা পায়।

__________

জারাদের বাড়িতে আসার পর থেকে নিধি এক সেকেন্ডের জন্যও শান্তি পায়নি। গহনকে অনেকবার কল করেছে। কিন্তু রিসিভ করেনি গহন ফোনটা। মেসেজও করেছিল গহন কে কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসেনি।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠলো। নিধি তড়িৎ গতিতে উঠে গিয়ে নিজেই দরজা খুলে দিল। দরজা খুলে সামনে গহনের মুখটা দেখতে পেল নিধি। কেন যেন গহন কে দেখে নিধি হাসতে পারল না। খুশি হতে পারল না। কেননা মনের মাঝে একটা ভয় কাজ করছে। তবে গহন নিধির মুখটা দেখতেই খুব সুন্দর করে হাসলো।

মুহূর্তের মাঝে নিধির সব দুশ্চিন্তা হাওয়া হয়ে গেল। সব ভয় একেবারে কর্পূরের মতন উবে গেল। গহন হেসেছে ওকে দেখে। তার মানে নিশ্চয়ই রেগে নেই। আর রেগে থাকলে তো কেউ হাসে না। তাও আবার গহনের মতন মানুষ। তার মানে গহনের মন মেজাজ খুবই ভালো আছে।

“ভিতরে যেতে দেবে না আমায়?”

নিধি তখন গভীর ভাবনায় মগ্ন ছিল। গহনের প্রশ্নটা শুনে ধ্যান ভাঙলো। তাড়াহুড়ো করে দরজার সামনে থেকে সরে দাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আসতে দেব না কেন? আসুন। আপনারই তো বাড়ি।”

গহন ভিতরে এলো। নিধি আগেই গহনের সাথে একটু আলাদা করে কথা বলার সুযোগ পেল না। কিছু জিজ্ঞাসা করারও সুযোগ পেল না। ঘরের ভেতর ঢুকেই গহন আগে জারার বাবা আফজাল হোসেনের সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তারপর বাকি সবার সাথেও কথা বলল। প্রায় আধা ঘন্টা মতন সবার সাথে কথাবার্তা শেষে অবশেষে নিধি গহনের সাথে একটু একা কথা বলার সুযোগ পেল।

গহন একটা রুমে গেল একটু বিশ্রাম নিতে। ওর পিছন পিছন নিধিও গেল। ঘরে এসে গহন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে সবে মাত্র। অমনি দেখলো নিধি এসেছে। মেয়েটা উসখুস করছে কিছু বলার জন্য। গহন জানে নিধি কি জিজ্ঞেস করতে এসেছে। একটু মাথাটা উঠিয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“দরজা বন্ধ করো।”

নিধি দরজার দিকে একবার তাকিয়ে গহনের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অবুঝের মতোন বলল,

“দরজা কেন বন্ধ করব?”

“দুজনে একসঙ্গে ঘরে আছি তাই।”

“ও মা! দুজনে একসঙ্গে ঘরে থাকলে দরজা বন্ধ করতে হয় এটা কোথাকার নিয়ম?”

গহন কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“এটাকে স্বামী-স্ত্রীর প্রাইভেসি বলে। যাতে অন্য কেউ এসে বিরক্ত না করতে পারে সেই জন্যই এই ব্যবস্থা। কমন সেন্স নেই তোমার?”

বিজ্ঞাপন

নিধি মুখ ভেঙচিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে করতে গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“না নেই। থাকবে কি করে? এই প্রথম বিয়ে করেছি। আগে তো আমি আর বিয়ে করিনি যে বুঝবো দরজা বন্ধ করলে স্বামী স্ত্রীর প্রাইভেসি হয়ে যায়।”

দরজাটা বন্ধ করে নিধি বিছানায় শুয়ে থাকা গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু আমতা আমতা করে বলল,

“আপনার মায়ের সাথে কথা হয়েছে?”

গহন উত্তরে বলল,

“হ্যাঁ হয়েছে। শুনলাম শম্পা নাকি এসেছে।”

“হ্যাঁ এসেছে তো। আমি যে শান্তিতে ছিলাম কয়েকটা দিন। আমার শান্তি তো সহ্য হবে না ওনাদের। যাইহোক, কিছু বলেনি আপনার মা?”

“বলার মতন কিছু করেছো নাকি?”

নিধি কপাল কুঁচকে বলল,

“মানে কি বলতে চাইছেন? আমি সবসময় অভিযোগ করার মতন কাজ করি?”

“আমি কখন সেটা বললাম। তুমি জিজ্ঞেস করলে কিছু বলেছে কিনা। তাই আমি তোমাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম বলার মতন তুমি কিছু করেছো কিনা।”

নিধি একটু রাগী স্বরে বলল,

“করেছি তো। অনেক কিছু করেছি। আপনার মায়ের অনুমতি ছাড়া নিঃশ্বাস নিচ্ছি এটা কি কম বড় অপরাধ! এতদিন পর আপনার বোন বাড়িতে ফিরলো। সেই আনন্দে আমি লাফালাফি না করে এই বাড়িতে চলে এলাম এটা কি কম বড় অপরাধ!”

গহন একটু হেসে উঠে বলল,

“আরেকটা অপরাধ আছে। বাড়িতে আমার বোন আর বোনের জামাই এসেছে। তাদেরকে তুমি বাসি খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছো এটাও কি কম বড় অপরাধ নাকি। বাড়িতে গেলে তো তোমার খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এই মেয়ে, তুমি না সংসার করতে এসেছিলে? এখন তো দেখছি সংসারে অশান্তি ছাড়া কিছুই করতে পারে না। তোমাকে দিয়ে সংসার হবে না বোধহয়। যাইহোক, বাড়ি গিয়ে আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিও। শম্পাও তো মনে হয় চলে গেছে এতক্ষণে। কল করে ওর কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিও। সেই সাথে বলো যেন আবার তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসে কেমন?”

গহন কথাগুলো বলে একা একাই হাসলো। নিধি খুব ভালোভাবে বুঝলো গহন মজা নিচ্ছে। বেশ জোরে গহনের পেটে একটা কিল বসালো। হাসি থেমে গেল গহনের। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“ইশশ! মা'র'ছো কেন? পেটে এমনিতেই আমার অনেক সমস্যা।”

“মা-বোনকে তো এভাবে খোঁচাতে পারেন না। বউকে তো ঠিকই খোঁচান।”

“বউ আমার যতটা আপন বাকিরা তো ততটা আপন না।”

নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“তাই নাকি? বউ বেশি আপন অথচ মায়ের বেলায় অন্ধ হয়ে যান। আর বউয়ের দোষ ত্রুটি গুলো অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করেন। পুরুষ মানুষের কাছে বউ শুধু আপন হয় রাতে। এছাড়া ওরা বউ কে চেনে না।”

কথাটা বলে নিধি মুখ ঝামটি মেরে উঠে যেতে ধরলে গহন ওর হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল। নিধি হুমড়ি খেয়ে গহনের বুকের উপর এসে পড়লো।

থতমত খেলো নিধি। দেখলো গহনের খুবই কাছাকাছি চলে এসেছে। গহনের ঠোঁটের খুবই কাছাকাছি নিধির ঠোঁট। গহনের চোখের কাছাকাছি নিধির চোখ। গহনের তপ্ত নিশ্বাস নিধি অনুভব করতে পারছে। নিধির তপ্ত নিঃশ্বাস গহনের মুখের উপর আছড়ে পড়ছে। গহনের হাত দুটো নিধির কোমরে রাখা। আর নিজের হাত গহনের দুই কাঁধে। ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে গেল না! একটু বেশিই কাছাকাছি চলে এলো না হঠাৎ করে দুজনে!

নিধি গহনের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য একটু মোচড়ামুচড়ি করে উঠে বলল,

“আপনার আবার কি হলো? এখনো রাত হয়নি তো।”

গহন একবার দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল,

“রাত দশটা বাজে। এখনো সময় হয়নি?”

“ছিঃ। আমি না হয় এমনি কথাগুলো বলেছিলাম। তাই বলে আপনি সত্যিই অমন হয়ে গেলেন?”

“সেটা তো তুমিই বলতে পারবে আমি কেমন। আমার তোমাকে কখন প্রয়োজন পড়েছে সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো নিধি। শুধু কি রাতে আমার তোমায় প্রয়োজন হয়েছে? এখন অব্দি কি আমাদের মাঝে তেমন কিছু হয়েছে? আমার সব সময় তোমাকে প্রয়োজন।”

নিধি একটু তাড়াহুড়ো গলায় বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে বুঝেছি। সব বুঝেছি। এবার আমাকে ছাড়ুন। কেউ যদি এসে এই অবস্থায় দেখে আমাদের কি হবে বলুন তো। মান সম্মান থাকবে? আমি আর কাউকে মুখ দেখাতে পারবো? লজ্জায় কি আমি ম'রে যাবো না?”

গহন নিধিকে আশ্বস্ত করে বলল,

“কেউ আসবে না। এই বাড়িতে সবার ম্যানার্স আছে। দরজা বন্ধ দেখে নক না করে সোজা চলে আসবে এতটা অভদ্র কেউ না।”

নিধি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“তা অবশ্য ঠিকই বলছেন। সবাই তো আর আপনার ভাই বোনের মতন হয় না। ইস কি অভদ্র আপনার ভাই-বোন গুলো। বিশ্বাস করুন আমি ওদেরকে সহ্য করতে পারি না। আমার খুব বিরক্ত লাগে। একটু যে মন খুলে এই কথাগুলো বলব তেমন কাউকেও পাই না। আর কাকেই বা বলবো। আমার তো স্বামীও ভালো না যে তার সাথে একটু মন খুলে দুটো দুঃখের কথা বলবো। কি কপাল আমার!”

গহন অবাক না হয়ে পারল না। এত কিছু বলল অথচ গহন একটা টু শব্দ অব্দি করলো না। তারপরও এই মেয়েটা বলে ওর নাকি স্বামী ভালো না। স্বামী ভালো হলে মন খুলে দুঃখের কথা বলতো। আরো কত ভালো হতে বলছে এই মেয়েটা গহন কে?

গহন সেই প্রশ্নটাই করতে চাইলো নিধি কে। তবে নিধি ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে একটু গুরুতর ভঙ্গীতে বলল,

“দাঁড়ান দাঁড়ান। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়েছে আমার।”

গহন নিজেও গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

“কি হয়েছে?”

“আচ্ছা আপনি আপনার ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের মাঝের সম্পর্ক সম্বন্ধে কিছু জানেন? আপনার ভাই কি ব্যবহার করে তার বউয়ের সাথে সেসব জানেন? উনি হাত তোলে ওনার বউয়ের গায়ে। তাও যেখানে ওনার স্ত্রীর শরীরের এই অবস্থা। আপনার কি মনে হয়না এই নিয়ে কিছু করা উচিত। অন্তত আপনার ভাই দু'চারটে থাপ্পড় ডিজার্ভ করেই।”

গহনের অভিব্যক্তিটা কিঞ্চিত বদলালো। নিধিকে জড়িয়ে ধরে থাকা হাত দুটো শিথিল হলো। একটু ছাড়া পেতেই নিধি তড়িৎ গতিতে উঠে শাড়িটা ঠিকঠাক করে নিয়ে বসলো। গহনও উঠে বসলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর গম্ভীর গলায় গহন নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওদের সম্পর্ক ওদের কে বুঝে নিতে দাও। এর মাঝে আমাদের কথা বলে ঠিক হবে না।”

নিধি রুষ্ঠ গলায় বলল,

“তাই বলে এভাবে চুপ থাকবেন? আপনি তো ওনার বড় ভাই। ওনাকে শাষন করার পূর্ণ অধিকার আছে আপনার।”

“অধিকার থাকলেই যে সব সময় খাটানো যায় তেমনটা না। আর তার থেকেও বড় কথা আমি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই না নিধি। আর আমি চাইনা তুমিও এই নিয়ে কোন কথা বলো। আমাকে বলেছো, বলেছো। কিন্তু ওদেরকে এই বিষয়ে কিছু বলবে না।”

নিধি অসহায় গলায় বলল,

“তাই বলে কিছুই বলবো না?”

গহন একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিধিকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“আমাদের সম্পর্কের মাঝে যদি তৃতীয় কেউ প্রবেশ করে তোমার সেটা ভালো লাগবে? আমাদের মাঝে কোন ঝামেলা তৈরি হলে সেটা যদি অন্য কেউ এসে সমাধান করে দিতে চায় তোমার কি ভালো লাগবে? নিশ্চয়ই লাগবে না। সে ক্ষেত্রে সম্পর্কে দূরত্ব আরো বেশি তৈরি হয়। ওদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে তৈরি হওয়া সমস্যা ওদেরকেই মেটাতে দাও। ধরো তুমি আজ একজনের পক্ষ হয়ে অন্যজনকে দুটো কথা শোনালে। দুদিন পর দেখবে তারা দুজন ঠিকই মিলে গেছে। আর তুমি তখন দুজনের কাছেই অপ্রিয় হয়ে দাঁড়াবে। কি দরকার অন্যের মনে নিজের জন্য ঘৃণা তৈরি করার!”

নিধি একটু একটু বুঝলো গহনের কথা। “ঠিক আছে” বলে মেনেও নিল গহনের কথাটা। গহন যখন বলেছে এই নিয়ে কিছু না বলতে, তাহলে নিধি বলবে না।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প