বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৩৮

🟢

ঘরে এসে গহন নিধিকে কোথাও দেখতে পেল না। আসার সময় তো বসার ঘর হয়েই এলো। সেখানেও তো ছিল না। রান্নাঘরেরও তো লাইট অফ দেখলো। তাহলে গেল কোথায় মেয়েটা। গহন ডাকতে ধরলো একবার নিধির নাম ধরে। তবে তার আগেই ওর কানে হালকা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। কেউ যেন ফুপিয়ে কাঁদছে। শব্দটা বারান্দার দিক থেকে আসছে।

গহনের কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। কন্ঠটা তো মনে হচ্ছে নিধির। মেয়েটা তাহলে বারান্দায়। কাঁদছে নাকি! কিন্তু কেন কাঁদছে?

আপাতত ভাবনা চিন্তা করে সময় নষ্ট না করে গহন বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। সত্যিই সেখানে নিধিকে পেল। এগিয়ে গিয়ে নিধির কাঁধে হাত রাখল। তবে নিধির মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। চমকালোও না। আবার ওর দিকে ঘুরেও তাকালো না। গহন একবার ডাকলো নিধিকে ওর নাম ধরে।

“নিধি!”

নিধির থেকে কোন সাড়াশব্দ পেল না গহন। না গহনের ডাকে কোন জবাব দিলো, না ঘুরে তাকালো। গহন এবার নিধিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। কি এক অদ্ভুত কান্ড! মেয়েটা কেঁদে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে। একেবারে চোখের জলে নাকের জলে অবস্থা। এখনো ফোঁপাচ্ছে।

গহন বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন? কে আবার কি বলল?”

নিধি কোন উত্তর দিলো না। শুধু কেঁদেই গেল। গহন আবার জিজ্ঞেস করলো,

“কি হলো বলো কি হয়েছে?”

নিধি এবার একটু শব্দ করে কেঁদে উঠলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল গহন। মেয়েটা না কারণ বলছে, না কান্না থামাচ্ছে। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। কারণটা যদি না জানায় গহন কে তাহলে ওকে থামাবে কি করে!

“আরে আবার কাঁদে! কি হয়েছে আগে বলতে তো হবে আমাকে।”

নিধি এবারে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো। তবে কান্নার তোপে কিছু বলেই উঠতে পারল না। কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে বের হলো।

গহনের খুব খারাপ লাগলো মেয়েটাকে দেখে। নিধিকে দেখে যেন মনে হলো ওর এখন একটু আহ্লাদের প্রয়োজন। একটু সান্ত্বনার প্রয়োজন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য একটা হাতের প্রয়োজন। সাহারা দেওয়ার জন্য একটা কাঁধ কিংবা আগলে রাখার জন্য প্রশস্ত বুক প্রয়োজন।

নিধিকে আপাতত আর কোন কিছু না বলে, নিধিকে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গহন শক্ত করে নিধির মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। এতেই যেন নিধির কান্না আরো বাড়লো। গহনের থেকে একটু আহ্লাদ পেতেই ভেতরে জমে থাকা সব দুঃখ কষ্ট একেবারে বেরিয়ে এলো। পাল্টা দুহাতে গহনের পিঠের টি শার্ট খামচে ধরলো। গহন কে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না। নিধি নিজেই হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

“ওরা সব সময় শুধু আমাকে ছেড়ে দিতে কেন বলে আপনাকে? কি করেছি আমি? ওরা যা করে আমিও তো তাই করি। আমি কি কখনো আপনাকে বলেছি ওদেরকে ছেড়ে দিতে? ওদের কেন এত আমার সাথে হিংসেমি?”

এতক্ষণে গহন আসল ব্যাপারটা বুঝলো। তার মানে নিধি বোধহয় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যাপারটা ভালো লাগলো না গহনের। নিধির এই কথাগুলো শোনা উচিত হয়নি। গহন তো সামলাতে চাইছে পরিস্থিতিটা। ওদিকে সালমা বেগম কে বুঝিয়ে রেখে এলো। ওনার এবার একটু উন্নতি হলেও হতে পারে। এখন নিধি আবার এই কথাগুলো শোনাতে ওর মনে সালমা বেগমের জন্য খারাপ ধারণা বেশি করে তৈরি হবে। তাহলে এক দিক সামলাতে গিয়ে তো আর এক দিক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাহলে সম্পর্ক গুলো স্বাভাবিক করবে কি করে গহন!

গহনের এসব ভাবনার মাঝে নিধি আবারো বলে উঠলো,

“আপনার মায়ের তো নিজেরও মেয়ে আছে। আপনার বোনের তো নিজেরও সংসার আছে। সেখানে ওরা মেয়ে হয় কিভাবে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙার কথা বলতে পারে? যদি ওদের আমাকে এতটাই অপছন্দ ছিল তাহলে আপনার সাথে বিয়ে দিয়েছিল কেন? যদি আপনার মায়ের আপনাকে সারা জীবন একাই রাখার উদ্দেশ্য ছিল তাহলে আমাকে পছন্দ করেছিল কেন বলুন? ওনারা আমাকে অসহায় দেখেছেন তাই না? সেই জন্য সুযোগ নিচ্ছেন।”

গহন একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিধির মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,

“আমি আছি তো তোমার জন্য। আমি কখনো ছাড়বো না তোমায়।”

নিধি এবারে গহনের বুক থেকে মাথা তুলে গহনের দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল,

“কিন্তু আমার যে ভয় হচ্ছে। আপনিও তো একজন মানুষ। আমি জানি আপনি অশান্তি পছন্দ করেন না। আপনার মা, বোন আপনার কাছে কতটা প্রিয় সেটাও আমি খুব ভালোভাবে জানি। ওনারা যদি প্রতিনিয়ত আপনার সামনে একটা কথাই জপতে থাকে হয়তো কোন এক সময় গিয়ে আপনার মনও ঘুরে গেল। হয়তো আপনার কোন এক সময় গিয়ে মনে হলো আমিই ভুল, আমিই খারাপ, আমিই আপনাদের সাথে থাকার যোগ্য না। তখন তো ঠিকই ছেড়ে দেবেন।”

গহন দু হাতের আজলায় নিধির মুখটা নিয়ে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

“এমনটা কখনোই হবে না। আর তোমায় ছাড়ার কথা এরপর আর কখনো উঠবেও না।”

নিধি এবারে গহনের হাত দুটো খামচে ধরে অসহায় গলায় বলল,

“বিশ্বাস করুন গহন আমি খুব অসহায়। আমি কোন পরিস্থিতিতে এই বিয়েটা করেছি সেটা আমি কখনোই আপনাকে বোঝাতে পারবো না। আপনার অসহায়ত্ব এক রকম, আমার অসহায়ত্ব অন্যরকম। আপনি তো সবকিছু থাকতে অসহায়। আপনি নিজের ইচ্ছেতে অসহায়ত্ব বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমাকে সবাই মিলে জোর করে অসহায় বানিয়ে ছেড়েছে। বিশ্বাস করুন এখন আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। যদি আপনি আমাকে ছেড়ে দেন আমার নিজের মা-ই আমাকে বাড়িতে তুলবে না। আর যদি জানে যে উচিত কথা বলার জন্য আপনি আমায় ছেড়ে দিয়েছেন তাহলে তো হয়েই গেল। বিশ্বাস করুন গহন আমার আপন কেউ নেই।”

কথাটা বলে নিধি অসহায়ের মতন কাঁদলো। গহন আগেই নিধিকে আর কোনো ভরসা দিল না। মেয়েটাকে আগে একটু কাঁদার সময় দিল। কেউ কাঁদলে তাকে বাধা দিতে নেই। কাঁদতে দিতে হয়। কাঁদার মাঝেও অসীম শান্তি আছে। আর সেটা গহন খুব ভালো করেই জানে।

বেশ কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর নিধি ফের গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানেন গহন, আমি আমার নিজের বাড়িতে কতটা অসহায়ের মতন থেকেছি। ওই বাড়িতে কিন্তু আমার বাবারও অংশ আছে। কিন্তু তারপরও এমন ভাবে আমাদের থাকতে হয়েছে যেন আমরা আশ্রিতা। তার কারণ আমার বাবা কোন উপার্জন করত না। প্রত্যেকটা বিষয়ের জন্য অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সকালে স্কুল কলেজে যাওয়ার সময় খেয়ে যেতে পারতাম না। টিফিনের টাকা থাকত না আমার কাছে। ছেঁড়া স্কুল ড্রেস সেলাই করে বছরের পর বছর পরেছি। সারা বছর তো দূর ঈদের মাঝেও নতুন কাপড় পরার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আমার চাচাতো বোনেদের পুরনো জামা পরতে হত। তার কারণ আমার বাবা উপার্জন করে না। এইসবের জন্যই তো আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল আপনার টাকা পয়সা দেখে। জানেন বৌভাতের অনুষ্ঠানে আমার চাচি আমার কানে কানে বলে গিয়েছিল যেন আমি আর ওই বাড়িতে পা না দেই। আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না গহন। আমার যাওয়ার কোন জায়গা থাকবে না তাহলে। আমি আপনার থেকে অনেক বেশি অসহায়। শুধু আমার হাসির আড়ালে সব লুকিয়ে রাখি। আমার বাবা এখনো বেঁচে আছে ঠিকই তবে বট গাছের মতন ছায়া দেওয়ার মতন অবস্থায় নেই। আমি রোদের তাপে পুড়ে গেলেও আমার বাবা কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেলেও আমার বাবা কিচ্ছু করতে পারবে না।

আমি খুব অসহায় গহন।”

গহন দ্বিতীয়বারের মতন নিধির মাথাটা শক্ত করে ওর বুকের সাথে চেপে ধরল। হাউমাউ করে কাঁদলো মেয়েটা। একটু বেশি ভয় পেয়ে গেছে। গহন বুঝে উঠতে পারছে না কি বলে নিধিকে ভরসা দিলে বুঝবে যে গহন ওকে কখনো ছাড়বে না। গহন তো নিজেই মেয়েটার উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আরো কিছুটা সময় নিধিকে কাঁদতে দিয়ে নিধির চুলের ভাঁজে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

“আযীয আহমেদের মেয়ে অসহায় হতে পারে। কিন্তু গহন কিফায়াতের স্ত্রী অসহায় হতে পারে না। কারোর মেয়ে থাকা অবস্থায় হয়তো তুমি অসহায়ের মতন দিন কাটিয়েছো, হয়তো তোমায় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়েছে। তবে আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমার স্ত্রী থাকা অবস্থায় তোমাকে কখনো কারো উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। তোমার সুখ দুঃখ কোন সময় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে না নিধি। তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব, তোমাকে যত্নে রাখার দায়িত্ব আমার।”

“আপনার বাড়ির লোকজন খুব খারাপ। ওরা আপনার মাথা ঘুরিয়ে দেবে।”

“তুমি আছো না। ওরা আমার মাথায় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে গিয়ে ঝগড়া করবে। আমার সাথে ঝগড়া করে আমাকে সোজা করতে পারবে না?”

নিধি আতঙ্কিত গলায় বলল,

“তার মানে আপনি বদলে যাবেন?”

“আরে বোকা! আমি তোমাকে বোঝাতে চাইলাম যে ওরা যদি এমন কিছু চেষ্টা করে তুমি উল্টোটা চেষ্টা করবে। আর চিন্তা করো না এমনিতেও আজকের পর থেকে আর এই নিয়ে কথা উঠবে না। আর একটা কথা সব সময় মনে রাখবে, আমি যখন একবার তোমার দায়িত্ব নিয়েছি তখন কখনো পিছপা হবো না। যতদিন আমি আছি ততদিন তোমায় কোন কিছু নিয়ে ভাবতেই হবে না। আর আমার অবর্তমানেও যেন তোমায় কোন কিছু নিয়ে ভাবতে না হয় সেই ব্যবস্থা করে রেখেই যাবো। মোট কথা তোমার যেন কখনো নিজেকে অসহায় মনে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করবো নিধি। তুমি শুধু ভরসা রেখো আমার উপরে তাহলেই হবে।”

___________

সকালে ঘুম ভাঙতেই নিধি পাশে গহনকে খুঁজে পেল না। বেশিরভাগ দিনেই অবশ্য এমনই হয়। নিধি ভাবলো বোধহয় অফিস চলে গেছে। আর নিধির আজও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। মাথার কাছে হাতড়ে ছোট বাটন ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো সবেমাত্র সকাল আটটা বাজে। নিধির কাছে এটা সবে মাত্রই। নিধির মতে যদি দশটায় বেলা উঠতো তাহলে খুব ভালো হতো।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু নিধির কথা অনুযায়ী তো দশটায় বেলা ওঠে না। সেজন্য ওকে আটটায় উঠে পড়তে হলো।

উঠে বসে সামনের দিকে দৃষ্টি যেতেই দেখলো গহন সোফায় বসে আছে। সব সময় যা করে এখনও তাই করছে, ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই নিধির মন মেজাজটা বিগড়ে গেল। গহন কে এই ল্যাপটপ নিয়ে বসতে দেখে নিধির যে শরীরটা কতটা জ্বলে নিধি সেটা বলে বোঝাতে পারবে না। বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,

“এই ল্যাপটপের মায়া আপনি কবে ছাড়বেন বলুন তো? এর থেকে যদি সংসারে আপনি বিয়ে করে আরেকটা বউ আনতেন তাও মনে হয় আমার এত রাগ হত না যতটা এই ল্যাপটপকে নিয়ে আপনাকে বসে থাকতে দেখলে হয়।”

গহন একবার মাথা তুলে তাকালো নিধির দিকে। ওর কথাগুলো শুনে একটু হেসে আবার ল্যাপটপের ওপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল,

“তাহলে আনবো নাকি তোমার একটা বন্ধু।”

নিধি বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“ছিঃ। সতীন আবার কখনো বন্ধু হয় নাকি। আর এমনিতেই ধরুন আমি অনুমতি দিয়ে দিলাম। তাও আপনি বিয়ে করতে পারবেন না। এক বউকেই সামলাতে পারেন না দুই বউকে কি করে সামলাবেন? আপনি একটা বিয়ে করেছেন তাই আপনার মায়ের শ্বাসকষ্ট উঠে যাচ্ছে। ভাবুন তো দুটো বিয়ে করলে কি অবস্থা হবে! সারাক্ষণ অক্সিজেন দিয়েই রাখতে হবে।”

গহন একটু হেসে বলল,

“আচ্ছা এসব কথা এখন বাদ দাও। নাস্তা করে তৈরি হয়ে নিও। সঙ্গে কিছু জামা কাপড়ে নিও।”

“কেন? কোথায় যাব?”

“আমার মামা বাড়ি।”

গহন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে নিধি ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কক্ষনো না। আমাকে কি ভূতে ধরেছে যে আমি আপনার মামার বাড়ি যাবো? আপনার মামি এখানে এসে নিজের যে রূপ দেখিয়ে গেছেন যে কি বলবো। আপনার মামি অন্য ঘর থেকে এলে কি হবে? আপনার মা, খালাদের থেকে কোন অংশে কম না। কি পরিকল্পনা আপনার বলুন তো? ওখানে নিয়ে কি আমাকে গুম করে ফেলবেন নাকি? শুনুন, বেঁচে থাকতে আমি কখনো আপনার মামার বাড়িতে পা দেবো না।”

গহন একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“আগে আমার পুরো কথাটা শুনে নিতে। যে মামি এসেছিল তার বাড়ি যাব না। অন্য মামার বাড়ি যাবো।”

“কোন মামার বাড়িই আমি যাব না। সে আপনার যেই মামার বাড়িতেই যাই না কেন সে তো আপনার মায়েরই ভাই হবে। আর আপনার মায়ের পুরো গুষ্টির আসল উদ্দেশ্য আমাকে জ্বা'লি'য়ে মা'রা। বলা যায় না, যে রাগ জমে আছে ওদের আমার উপর। যদি খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়! যদি আমি ম’রে যাই! যদি কালো জাদু করে আমার উপরে! এতো ঝুঁকি আমি নিতে পারবো না। সবেমাত্র আপনি ভালো হচ্ছেন। এত তাড়াতাড়ি ম’রবো নাকি! ভেবেছেন আমি ম’রে আপনাকে আরেকটা বিয়ে করার পথ খুলে দিয়ে যাব? অত সহজ না। আমি ম’রলেও ভূত হয়ে এসে আপনার ঘাড়ে চাপবো। আর যদি নতুন বউ ঘরে এনেছেন ওর ঘাড় মটকাবো।”

“থামবে তুমি। কথাটা আমায় শেষ করতে দাও।”

একটু ধমকে উঠলো গহন। ওর এক ধমকেই নিধি চুপ করে গেল। গাল ফুলিয়ে বলল,

“সব ধমকাধমকি শুধু বউয়ের বেলায় বের হয়। মা বোনের বেলায় মুখ দিয়ে দুটো ঠিক ঠাক কথাও বের হয় না।”

গহন কিঞ্চিত গম্ভীর গলায় বলল,

“আজেবাজে কথা বাদ দাও। মায়ের ভাইয়ের বাড়ি যাচ্ছি না। যিনি কল করে নিজেকে আমার মা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন ওনার ভাইয়ের বাড়িতে যাব।”

নিধি চমকে উঠে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মানে আপনার নিজের মায়ের বাড়িতে যাবেন? মানে ওনার বাড়ির লোকজনের সাথে আপনার যোগাযোগ আছে? আচ্ছা ব্যাপারটা কেমন হলো না। আপনার মা কে আপনার পছন্দ না অথচ তার ভাইকে মামা বানিয়ে বসে আছেন। সেখানে আবার ঘুরতেও যেতে চাইছেন।”

“আমার নানির বাড়ির কারোরই ওনার সাথে যোগাযোগ নেই। আমায় রেখে চলে যাওয়ার কারণে মামারা কেউই ওনার সাথে যোগাযোগ রাখেননি।”

নিধি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“সত্যিই! ওনারে এত ভালো! আপনাকে এত ভালোবাসে!”

গহন একটু হেসে বলল,

“হ্যাঁ। আমার মামা আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। নানি যখন বেঁচে ছিল তখন প্রায়ই যাওয়া আসা হতো। কিন্তু নানি মা’রা যাওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি। চার থেকে পাঁচ বছর হচ্ছে মামা বাড়ি যাই না। আমাদের বিয়েতেও মামারা আসেনি। কল করে আমাকে বলেছিল যেন তোমায় নিয়ে যাই। আজ একটু কাজের চাপ কম। তাই ভাবলাম ঘুরে আসি। এক দুদিন থাকবো ওখানে।”

নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল,

“দারুন তো। আমি যাব। শুনুন নাস্তা করার দরকার নেই। ওরা যা পারে বানিয়ে খেয়ে নেবে। আমরা বাইরে খাওয়া দাওয়া করব। বাড়িতে আর থাকারই দরকার নেই। চলুন এক্ষুনি বেরিয়ে যাই।”

“এভাবেই? প্রথমবার যাচ্ছি একটু ভালোভাবে চলো। তুমি তো নতুন বউ। একটু শাড়ি পরো, সাজগোজ করো, চুলগুলো ছেড়ে দাও, একটা টিপ পরো, চোখে কাজল দাও।”

গহনের কথাগুলো শুনে নিধি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“সরাসরি বললেই তো পারেন আপনি আমাকে একটু সাজগোজ করে দেখতে চাইছেন। আরে আমি তো আপনারই বউ। লজ্জা কিসের। আমাকেই তো দেখবেন।”

মেয়েটা বলছে লজ্জা পাওয়ার কি আছে অথচ নিজেই লজ্জা দিচ্ছে। গহন একটু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“তৈরি হয়ে নাও। বেশি সময় নেই। যেতে অনেক সময় লাগবে।”

নিধি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে গহনের পাশে পাশে বসলো। একেবারে গহনের গা ঘেষে বসলো। নিধিকে এভাবে নিজের গা ঘেষে বসতে দেখে গহন একটু সরে বসলো। তবে কোন লাভ হলো না। নিধি আবারও গিয়ে সেই গা ঘেষেই বসলো। গহন এবারে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিছু বলবে?”

নিধি গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“আপনার তো বয়স অনেক হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে উল্টো করে ঝাড়া না দেওয়া অব্দি মনে হয় ভালোবাসা বেরোবে না। কিন্তু এখন তো দেখছি কথায় কথায় আপনার মুখ দিয়ে শুধু ভালোবাসাই বের হয়। যাইহোক, আমি শাড়ি পরবো। চুলও ছেড়ে রাখবো, টিপও পরবো, চোখে কাজলও লাগাবো। কিন্তু আপনাকে আমার মন মত প্রশংসা করতে হবে। যদি প্রশংসা করতে একটুও কিপটেমি করেছেন তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার সাজগোজ সবকিছু নষ্ট করে ফেলব। আর জীবনেও কখনো না শাড়ি পরবো, না সাজবো। মাথায় থাকে যেন কথাটা।”

গহন কে হুমকি দিয়ে নিধি উঠে চলে গেল। গহন কিঞ্চিত ভয় পেল। গহনের নিজের উপর নিজেরই আত্মবিশ্বাস নেই। নিধির মন মত প্রশংসা করতে পারবে কিনা কে জানে। প্রশংসা কিভাবে করতে হয় গহন কি আদৌও জানে! কখনো তো কারো প্রশংসা করেনি। কে জানে কি বলতে কি বলে ফেলবে আর মেয়েটা আবার রেগে যাবে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প