বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪২

🟢

সকালে ঘুম থেকে উঠে গহন নিধিকে নিজের পাশে দেখতে পেল না। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো গহন। এত সুন্দর একটা রাত কাটার পর সকালে উঠে যদি আগে বউয়ের মুখটা না দেখতে পাওয়া যায় তাহলে কি ভালো লাগে! মন মেজাজটা কি বিগড়ে যাওয়া স্বাভাবিক না! অবশ্যই স্বাভাবিক। গহনের তো এখন দিন রাত চব্বিশ ঘন্টাই বউকে সামনে বসিয়ে রেখে শুধু ওকে দেখতে ইচ্ছে করবে। এদিকে ওর বউ তো একটা ঘন্টাও স্বামীকে ঠিকঠাক দিতে চায় না। আসলে ছোট মানুষ তো বুদ্ধিশুদ্ধি কম। ছোট মেয়েকে বিয়ে করার এই এক জ্বালা। বয়সে আরেকটু বড় হলে ঠিক বুঝতে পারতো গহনের মনের ব্যাকুলতা।

বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো গহনের এসব কথা ভেবে। তবে এখন তো আর হা হুতাশ করেও কোন লাভ হবে না। গলা ছেড়ে তো ডাকতেও পারবে না বউয়ের নাম ধরে। কাল রাতে যা করার করেই নিয়েছে। তখন লজ্জা লাগেনি ঠিকই। তবে এখন এত মানুষ ভরতি বাড়িতে বউয়ের নাম ধরে ডাকতে ঠিকই লজ্জা করবে।

তাছাড়া গতকাল রাতে তো একটা ঘোরের মাঝে ছিল। কে জানে এখন নিধির মুখোমুখি হবে কি করে। নিধিরই বা অভিব্যক্তি কেমন হবে। আচ্ছা মেয়েটা কি লজ্জা পাবে? গহন কে দেখে কি মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে সেখান থেকে? নাকি কোথাও গিয়ে লুকিয়ে পড়বে? নাকি গহনের ওকে দেখলে লজ্জা লাগবে? নাকি গহন নিধিকে দেখে পালাবে?

অনেক গণনা শেষে গহন ভাবলো যে নিধিই ওকে দেখে লজ্জা পাবে। বাধ্য লজ্জা পেতে। মেয়েরা তো লজ্জা পাবে এটাই স্বাভাবিক। আর গহন কেন লজ্জা পেতে যাবে। ও তো পুরুষ মানুষ। পুরুষ মানুষ লজ্জা পায় না।

ফ্রেশ হয়ে গহন ঘর থেকে বেরোলো। সারা বাড়ি খুঁজেও নিজের বউকে পেল না। বাধ্য হয়ে রান্না ঘরে গেল। সেখানেও নিধি নেই। উঁকি দিয়ে দেখলো ওর দুই মামি রান্না করছে। গহন একবার ভাবলো ওনাদেরকে জিজ্ঞেস করবে কিনা। আবার ভাবলো কেমন যেন দেখায় না ব্যাপারটা। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই বউকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখন যে গহনের বউকে লাগবেই।

অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর শেষে নিজের সমস্ত অস্বস্তিকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিলকিসকে একবার ডাকলো।

“বড় মামি!”

ডাকটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলকিস দরজার দিকে তাকালেন। গহনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্ত গলায় বললেন,

“হ্যাঁ বাবা বলো। ক্ষুধা লেগেছে মনে হয় তাই না? খাবার হয়ে এসেছে। আর একটু অপেক্ষা করো।”

“না না মামি ক্ষুধা লাগেনি। আসলে আমার একটা জিনিস খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাগ তো নিধি গুছিয়েছিল। আমি তো জানিনা ও কোথায় কি রেখেছে। ওকে খুঁজেও পাচ্ছিনা। কোথায় আছে বলতে পারবেন কি?”

গহনের এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা দেখে ফাহমিদা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“আরে বাবা এতো অজুহাত দিতে হবে কেন? সরাসরি বললেই তো পারো যে বউকে খুঁজছো। কিছু মনে করব না আমরা। তোমারই তো বউ।”

গহন খুবই অস্বস্তিতে পড়লো। কেননা খেয়াল করলো ফাহমিদার সাথে বিলকিস এমনকি ওদের সাহায্য করার জন্য যে দুজন মেয়েকে রাখা হয়েছে তারাও গহনের দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে হাসছে। গহন তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে বিলকিস ওর নাম ধরে ডেকে উঠে বলল,

“আরে বাবা শুনে যাও। ফাহমিদা, তুই থামতো। ছেলেটাকে লজ্জা দিস না। নিধি বাইরে বাগানে আছে। গাছ থেকে আম পাড়তে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষণ আগে গেছে। এতক্ষণেও যে কেন আসছে না বুঝতে পারছি না। তুমি গিয়ে দেখো।”

গহন চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল। বাড়ির পিছনের দিকটায় আমের বাগান। সেখানে গিয়েও নিধিকে কোথাও পেল না। এবারে গহনের মাথাটাই গরম হয়ে গেল। কোথায় গেল মেয়েটা? কে জানে আবার গ্রাম ভ্রমণে বেরিয়েছে কিনা। এখন এত বড় গ্রামে কোথায় খুঁজবে মেয়েটাকে।

আর গেল না গহন বাইরে। বিরক্ত হয়ে আবার ভিতরে চলে গেল। নিজের ঘরে যেতে ধরে করিডরে কারো সাথে একটা ধাক্কা খেল গহন। গহন তড়িঘড়ি করে অপরাধী গলায় বলে উঠলো,

“সরি।”

চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো নিধির সাথে ধাক্কা খেয়েছে। নিধি কপালে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। গহনের সাথে ধাক্কা খেয়ে গিয়ে পাশে দেয়ালের সাথে মাথায় বারি খেয়েছে। কপালে হাত বোলাতে বলাতে গহনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“এই দানবের মতন শরীরটা নিয়ে একটু দেখেশুনে হাঁটতে পারেন না। জানেনই তো আপনার বউ ছোট। যেখানে সেখানে ধাক্কা খেয়ে যেতেই পারে। একটু তো দেখেশুনে চলা উচিত আপনার। আরো কবে আক্কেল হবে আপনার বলুন তো?”

গহনের কানে বোধহয় নিধির বলা কথাগুলো গেল না। কেননা গহন আপাতত হা করে নিধির দিকে তাকিয়ে আছে। গহন নিধিকে দেখতে ব্যস্ত। নিধির পরনে তখন সবুজ রঙের একটা হ্যান্ড পেইন্ট করা শাড়ি। সবুজের মাঝে বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট ঘাসফুল আঁকা। মেয়েটার চুলগুলো এখনো হালকা ভেজা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে চুলগুলো আঁচড়ায়নি। এলোমেলো হয়ে আছে। লম্বা চুল গুলো অমনি ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। সাজগোজ বলতে কিচ্ছু করেনি। ঠোঁটে ভ্যাসলিন অব্দি লাগায়নি। এই সাধারণ বেশভূষায় নিধিকে ঠিক কতটা অপরূপ সুন্দর লাগলো গহনের কাছে সেটা গহন বলে বোঝাতে পারবে না। নিধির শাড়িতে আঁকা ফুল গুলোর মতনই গহনের কাছে নিধিকেও কোন একটা ফুলই মনে হলো।

এদিকে নিধি অনেকক্ষণ আগে গহনকে কথাটা বলেছিল। কিন্তু এতক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরেও গহনের থেকে কোন উত্তর পেল না। ফলস্বরূপ মাথা তুলে গহনের দিকে তাকালো। দেখলো গহন হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আজ নিধির বুঝতে একটুও দেরি হলো না যে গহন ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গহন যে ওকে দেখে থমকে গেছে বেশ বুঝলো। ব্যাপারটা নিধির কাছে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলো।

হালকা একটু কেশে গহনের ধ্যান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করলো এবং কাজও হলো। ধ্যান ভাঙতেই গহন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আমতা আমতা করে বলল,

“কিছু বলছিলে তুমি?”

নিধি আগেই কিছু বলল না। দুহাত পেছনে বেঁধে গহনের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে গহনের দিকে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। নিধির সেই দৃষ্টি দেখে গহন কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়লো। সবকিছু গুলিয়ে ফেলল। আর অবাক করার বিষয় হলো গহন এখন লজ্জা পাচ্ছে। অস্বস্তিও হচ্ছে। অথচ এই মেয়েটার চোখে কোন লজ্জা, অস্বস্তি কিচ্ছু নেই। পালানোর চেষ্টাও করছে না। গহন ভুল ভেবেছিল। নিধি লজ্জা পাবেনা। লজ্জা পেলে গহনই পাবে। যতই পুরুষ মানুষ হোক না কেন তবুও গহনই লজ্জা পাবে।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই নিধি বলে উঠলো,

“গতকাল রাত থেকে দেখছি আপনার চোখে কেমন যেন ঘোর লেগেই আছে তো লেগেই আছে। এবার ঘোরটা কাটান। দিন হয়ে গেছে তো। রাতে যা করেছেন দিনেও যদি সেগুলো করতে চান তাহলে তো খুবই মুশকিল।”

নিধি কথাগুলো বলার সাথে সাথে গহন বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। মেয়েটা ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটিয়ে রেখেছে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন কেন অদ্ভুত ভাবে হাসছেও।

গহন আন্দাজ করতে পারলো যে ওকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য ইচ্ছে করেই নিধি এমন করছে। নিধির কথাগুলোর প্রেক্ষিতে গহন কিছু না বলে অন্য প্রসঙ্গ তুলল। একটু ব্যস্ত গলায় বলল,

“আমার একটা দরকারি কল করার আছে।

আসছি।”

গহন ওকে পাশ কাটিয়ে যেতে ধরলে নিধি ওর পথ আটকে দাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“দাঁড়ান। আমি কি যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি আপনাকে?”

গহন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না।”

“তাহলে যাচ্ছেন কেন? শুনুন এখন থেকে আমার সাথে বুঝে শুনে কথা বলবেন। আপনি দিনে আমার সাথে যেমন ব্যবহার করবেন, রাতে তেমনি ব্যবহার ফেরত পাবেন। ভালো ব্যবহার না করলে আপনার কপালে দুঃখ আছে।”

নিধি কথাটা বলতেই গহন আগে আশেপাশে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখে নিল কেউ আছে কিনা। যাক আশেপাশে অন্তত কেউ নেই। দৃষ্টি আবারও নিধির উপরে তাক করে বলল,

“আজেবাজে কথা বলছো কেন? চুপ করো। একটু তো লজ্জা পাওয়া উচিত তোমার।”

নিধি মোটেই লজ্জা পাওয়ার মেয়ে না। বরং আরেক কদম গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে গহনের ভেজা চুলের মাঝে আঙ্গুল বুলিয়ে বলল,

“সে তো আপনারও একটু লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল গতকাল রাতে। জানেন, আমি আপনাকে যতটা ভালো ভেবেছিলাম আপনি ততটাও ভালো নন। আপনি ততটাও সাধাসিধে নন, যতটা নিজেকে দেখান। যদি আপনি সত্যি ততটাই সাধাসিধে হতেন তবে কি গতকাল রাতে ওসব করতে পারতেন! আপনি ছেলেটা খুব একটা ভদ্র নন গহন।”

কথাটা বলে নিধি হালকা করে গহনের কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে হেলে দুলে চলে গেল সেখান থেকে। নিধি সেখান থেকে চলে যেতেই গহন নিজের বুকে হাত দিয়ে দেখলো হৃদ স্পন্দনের গতি কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেছে। গহন ইতোমধ্যে ঘামতে শুরু করেছে। কি সাংঘাতিক মেয়ে। না কোন লজ্জা আছে, না কোন অস্বস্তি আছে। বরং গহন কে লজ্জা পাইয়া ছাড়লো। এ তো কোন সাধারণ মেয়ে না। এ পুরোই এট'মবো'ম।

__________

আজ রাতেও বৃষ্টি হচ্ছে। তবে বজ্রপাত হচ্ছে না আজ গতকালের মতন। গহন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের কারণে বৃষ্টির ছাট এসে ওর শরীরে লাগছে। কিন্তু গহনের সেসবে বিন্দুমাত্র কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

নিধি গিয়েছিল ওর মামির কাছে গহনের জন্য ওষুধ আনতে। নিধি আজ সারাদিন একটু ব্যস্ত ছিল। গহনের সাথে দেখাই হয়নি বলতে গেলে। দুজন দুদিকে ছিল। ফলস্বরূপ ছেলেটা যে অসুস্থ সেই খবরটাও তার সারাদিন জানা হয়নি।

জানবেই বা কি করে। গহন তো নিজের অসুস্থতার কথা কাউকে জানায় না। সেজন্যই নিধিরও আজ আর জানা হয়নি। জেনেছে একটু আগে। গহনের হাত ধরে টেনে বিছানা থেকে তুলে জানালার কাছে আনতে চেয়েছিল। তখনই গহনের হাতটা স্বাভাবিকের থেকে বেশ অনেকটাই বেশি গরম মনে হয়েছিল। তারপর কপালে হাত দিতেই দেখে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সারাদিন এমন জ্বর নিয়েই ঘুরেছে ছেলেটা। অথচ না কাউকে কিছু জানিয়েছে, না ওষুধ খেয়েছে।

নিধি ওষুধ আর পানির গ্লাস নিয়ে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ধরুন। ওষুধ খেয়ে আমায় উদ্ধার করুন।”

গহন একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। জানে এখন যদি মেয়েটা কে আর রাগায় তাহলে গহনের কপালে দুঃখ আছে। চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতন ওষুধটা খেয়ে নিল।

নিধি পানির গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে আঙুল উঁচিয়ে গহনকে শাসিয়ে বলল,

“আর কোনোদিন যদি দেখেছি যে অসুস্থতার কথা আমাকে জানাননি সেই দিন আপনাকে বোঝাবো আপনার বউ কি জিনিস। কি সমস্যা আপনার? বলতে কি হয় যে অসুস্থ?”

গহন জানালা দিয়ে বাইরের উত্তাল প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল,

“অভ্যাস নেই। আমি নিজেই নিজের দেখাশোনা করে অভ্যস্ত। নিজের অসুস্থতার জন্য কাউকে ব্যতিব্যস্ত করতে পছন্দ করিনা।”

নিধি খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“সবাই আর বউ এক হলো? শুনুন, বউ হচ্ছে সবার থেকে আলাদা। আর এতদিন আপনার বউ ছিল না বলে নিজেই নিজের দেখাশোনা করে অভ্যস্ত। কিন্তু এখন তো আপনার বউ আছে। আর আপনার বউয়ের ভালোবাসা বাকিদের মতন নাটক না বুঝেছেন?”

নিধি যে শেষোক্ত বাক্যটা সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল সেটা গহনের বুঝতে বাকি রইলো না। তবে কিছু বলল না। আজকাল কোনোকিছুতেই নিধিকে বাঁধা দিতপ ইচ্ছে করেনা।

নিধি গহন কে শাসানো শেষে সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে গহন নিধির পেট পেঁচিয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। নিধির পিঠ হুড়মুড় করে গিয়ে গহনের বুকের সাথে ধাক্কা খেল।

বিজ্ঞাপন

“আরে কি হলো? টানাটানি করছেন কেন?”

গহন আলতো হাতে নিধির চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ওর কাঁধের ওপর নিজের থুঁতনি ঠেঁকিয়ে বলল,

“দেখো, বাইরে কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। আমার আবারও তোমার সাথে ভিজতে ইচ্ছে করছে।”

গহনের কথায় নিধি তুমুল আপত্তি জানিয়ে বলল,

“মোটেই না। শরীরে জ্বর নিয়ে উনি যাচ্ছেন বৃষ্টি তে ভিজতে। শখ কত!”

গহন আলতো হাসলো নিধির কথায়। আপাতত আর কোনো কিছু না বলে নিধির হাতটা ধরে জানানা দিয়ে বাইরে বের করলো। নিধি একবারের জন্যও নিষেধ করলো না। শুধু হাতটুকুই দুজনে বৃষ্টির পানিতে ভেজাতে পারলো। আর গহন এতটুকুতেই খুশি।

“এমন দিনগুলো আজীবন থাকবে তো আমাদের জীবনে গহন?”

নিধির কন্ঠে সংশয় প্রকাশ পেল। নিজের ভাগ্যকেই ঠিক বিশ্বাস হয় না নিধির। এত সুখ নিধির কপালে স্থায়ী হবে সেটা ভাবতেই অবাক লাগে।

তবে গহনের মনে কোনো সন্দেহ নেই। আলতো করে নিধির গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“থাকবে। এই বৃষ্টি, বর্ষা এগুলো আসবে যাবে। সময়ের পরিবর্তন হবে ঠিকই। তবে আমাদের ভালোবাসা এমনই থেকে যাবে।”

নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে ফের সংশয় নিয়ে বলল,

“সময় আর ঋতুর মতন আপনিও বদলে যাবেন না তো? এই বর্ষা আর বৃষ্টি তো হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। আবারো কত দিন অপেক্ষা করে থাকতে হয় ওদের ফিরে আসার জন্য। আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমাকেও আবার এমন অপেক্ষায় থাকতে হবে না তো গহন? হঠাৎ করে আপনার ভালোবাসাও হারিয়ে যাবে না তো?”

গহন এবারে নিধি কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। দুহাতের আঁজলায় নিধির মুখটা নিয়ে নিধির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“এমন কখনোই হবে না। আমাদের ভালোবাসায় বারো মাসই বর্ষা থাকবে। সেই বর্ষা কখনো বা আমাদের অশ্রুতে ভিজিয়ে দেবে, কখনো বা আমাদের ভালোবাসায় সিক্ত করবে। বর্ষাতো শুধু প্রেমের প্রতীক না, বর্ষা বিরহের প্রতি। তুমি শুধু প্রেম গ্রহণ করবে তা কি করে হয়। বিরহও তো গ্রহণ করতে হবে।”

নিধি স্মিত হাসলো গহনের কথায়। আর কোনো সংশয় রইলো না মনের মাঝে। বৃষ্টির বেগ বাড়লো। গহন হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিতে হাতটা ভিজিয়ে নিল। সেই ভেজা হাতে ছুঁয়ে দিল নিধির গাল। নিধি হালকা একটু শিউরে উঠলো। যেই মানুষটা নিধিকে বিরক্ত করছে তাকেই আবার দুহাতে আঁকড়ে ধরলো। মোট কথা ভালোবাসুক বা বিরক্ত করুক তাও নিধির এই মানুষটাকেই চাই।

ধীরে ধীরে গহনের গহনের ছোঁয়ায় নিধি মিইয়ে যেতে লাগলো। লজ্জাবতী লতার মতন কুঁকড়ে গেল গহনের স্পর্শে। পরিবেশ, পরিস্থিতি সবকিছু ভুলে আজ আবারো গহন ডুব দিলো নিধির মাঝে। নিধির গলার ভাঁজে মুখ ডোবাতেই নিধি খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে খামচে ধরলো গহনের টি-শার্ট।

আবারো প্রকৃতি কেমন উত্তাল হয়ে উঠলো। আবারো ওদের ভালোবাসার সাক্ষ্যি হয়ে রইলো বৃষ্টি, গালপালা আর আবছা চাঁদ। মেঘের আড়াল থেকে একটু আগেই চাঁদ সামান্য উঁকি দিয়েছিল। তবে ওদের মিলনে লজ্জা পেয়ে সে নিজেও আবার মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। ওরা বরং নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে একে অপরকে ভালোবাসুক। একে অপরকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেক। কেউ বিরক্ত না করুক ওদের।

__________

গহনদের উদ্দেশ্য ছিল আরো দুদিন থাকার। তবে দু দিনের বেশি থাকতে পারলো না। সকাল হতে না হতেই সালমা বেগমের কল চলে এলো। জরুরি ভিত্তিতে গহন কে ডেকে পাঠিয়েছেন তিনি। কি কারণ সেসব বলেননি। শুধু বলেছেন যেন আজ দুপুরের আগে চলে আসে। গহন বেশ অনেকবার কারণ জিজ্ঞেস করেছে তবে সালমা বেগম কিচ্ছু জানাননি। গহন কয়েকবার বলেও ছিল যে আজ ওরা যেতে পারবেনা, কাল যাবে। তবে সালমা বেগম সে কথা শোনেনি। ছেলের উপরে তো তার অনেক অধিকার। সেই অধিকারই খাটিয়েছেন তিনি। হুকুম করেছেন যেন দুপুরের আগে তাড়াতাড়ি চলে আসে গহন নিধিকে নিয়ে।

নিধির দিন তো খুব আনন্দে কাটছিল। আনন্দের মাঝে গহন গিয়ে এমন একটা বিচ্ছিরি সংবাদ দিল। নিধির তখন ইচ্ছে করছিল সোজা বাড়িতে গিয়ে সালমা বেগমের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। তবে কিছু তো করার নেই। গহন বলে দিয়েছে যে আসছে। তার মানে যেতেই হবে। ব্যাগ থেকে অনেক কিছু বের করেছিল। ঘরে এসে সেগুলো গোছাচ্ছে আর বিড়বিড় করে সালমা বেগমকে বোধহয় গালি দিচ্ছে। গহন শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গুরুজনদের গালি দিতে নেই।”

“গুরুজনদেরও তাহলে এমন ভাবে থাকা উচিত যেন গালি খেতে না হয়। আপনার শ্রদ্ধেয় মা এমন কাজ করেন কেন যাতে আমার থেকে গালি খেতে হয় ওনাকে? কি ভেবেছে আমি বুঝিনা ওনার ষড়যন্ত্র। উনি ভাবছেন একদিনে বোধহয় আমি ওনার ছেলেকে দূরে এনে ঝাড়ফুঁক করে একেবারে পাগল বানিয়ে ছাড়বো। আপনিও খুব ভালো করেই জানেন হঠাৎ করে কেন ওনার এত জরুরি তলব। কোন কারণ নেই। শুধু আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না জন্য এমন করেছেন। আচ্ছা আপনার মায়ের এসব কেমন বাজে স্বভাব বলুনতো যে ছেলের বউয়ের সাথে সময় কাটানো দেখতে পারে না? এগুলো কোন ভদ্র বাড়ির মানুষের লক্ষণ হতে পারে?”

“এখন এসব কথা রেখে তৈরি হও। যেতে অনেকটা সময় লাগবে।”

গহনের প্রত্যেকটা বিষয়ে এত নির্লিপ্ততা নিধির যেন একেবারে অসহ্যকর লাগে। সালমা বেগমকে তো আর রাগ দেখাতে পারবে না। সেজন্য ভাবলো সম্পূর্ণ রাগটা গহনের ওপরে ঝাড়বে। তাও এখানেই ছাড়বে।

হাতের জামা কাপড়গুলো ব্যাগে তোলা রেখে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে এক হাতে গহনের মাথার চুল খামচে ধরলো। গহন ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“আহ! কি করছো?’

“আপনার সাথে এটাই করা উচিত। আসলে আপনার মায়ের সাথে তো কিছু করতে পারবো না। তাই আপনাকেই সব কিছু সহ্য করতে হবে।”

“লাগছে নিধি চুল ছাড়ো।”

নিধি আরেকটু শক্ত করে চুল ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“বউ চুল ধরলে ব্যথা লাগে তাইনা? মা চুল ধরলে তো লাগতো না। মা যদি এসে বলে শরীর থেকে মাথাটা কেটে ফেলতে তাও তো হাসিমুখে কেটে ফেলবেন। তখন তো ব্যথা লাগবে না।”

“আমি অসুস্থ ভুলে গেলে?”

গহন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে নিধি ওর চুল ছেড়ে দিল। নিধি তো ভুলেই গিয়েছিল যে গহন অসুস্থ। গতকাল থেকে তো জ্বর। বৃষ্টিতে ভেজার কারণেই জ্বরটা এসেছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই কারোরই। এখনো লোকটার ভীষণ জ্বর। গহনের চুল ছেড়ে দিয়ে নিজে অপরাধী গলায় বলল,

“আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। ক্ষমা করবেন হ্যাঁ। আমার সত্যি মনে ছিল না যে আপনি অসুস্থ। মনে থাকলে এভাবে ধরতাম না আপনার চুল।”

গহন নিজের মাথায় নিজেই হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

“ঠিক আছে।”

নিধি হেঁটে আবারও বিছানায় ব্যাগোর কাছে এলো। জামা কাপড়গুলো ব্যাগে তুলতে তুলতে বিড়বিড় করে এবারে যে কাকে গালি দিচ্ছে গহন জানে না। তবে গহনের কোন কিছু বলার সাহস হলো না। বলা যায় না, এবারে হয়তো মেয়েটা এসে গলাই টিপে ধরবে।

____________

গ্যারেজে গহন গাড়িটা পার্ক করছে। এই ফাঁকে নিধি উপরে উপরে চলে এলো। দরজার কলিং বেল বাজাতেই ভিতর থেকে সালমা বেগমে এসে দরজা খুলে দিল। নিধির মাথায় আগে থেকেই আ'গু'ন জ্ব'ল'ছিল। ওনাকে দেখে সেই আ'গু'নটা আরো দাউদাউ করে জ্ব'লে উঠলো। তবে ওনাকে সেটা বুঝতে দিলে চলবে না।

নিধি ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে সালাম দিলো সালমা বেগম কে। সালমা বেগম গম্ভীর গলায় সালামের উত্তরটা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, তবে পারলেন না। তার আগেই নিধি সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে দু হাতে ওনার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

“আপনার কথা খুব মনে পড়ছিলো মা। বিশ্বাস করুন আপনাকে ছাড়া একটুও ভালো ছিলাম না। আপনি খুব ভালো করেছেন জরুরী কাজের নাটকটা করে আমাদের ডেকে। না হলে তো গহন আমাকে এ বাড়িতে আনতেই চাইছিল না। বারবার শুধু বলছিলো এখানে এলেই নাকি আমার মন আবার খারাপ হয়ে যাবে। আপনি নাটকটা করে খুব ভালো করেছেন। না হলে না জানি আরো কতদিন আপনাকে না দেখে কাটাতে হতো। রাতে তো আমার ঘুমই হতো না মা আপনাকে না দেখে। আমি খাওয়া-দাওয়াও করতে পারতাম না।”

সালমা বেগম যে রেগে নেই তেমনটা না। উনিও ভীষণ রেগে আছেন। নিধির ওনার প্রতি যতটা রাগ জমে আছে ওনার নিধির প্রতি তার থেকেও হাজার গুণ বেশি রাগ জমে আছে। তবে সেসব তিনি আর মুখে প্রকাশ করলেন না। নিধি যেমন নিজের রাগগুলো আড়াল করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলেছে। ঠিক তেমনি তিনিও তাই করলেন। পাল্টা দুহাতে নিধিকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

“আমারও তোমার কথা খুব মনে পড়েছে। কি করবো বলো তোমাদের ছাড়া থাকতে পারছিলাম না। সেজন্য ডেকে পাঠালাম। তবে হ্যাঁ, জরুরি তলবের কোন নাটক করিনি। আসলেই একটা জরুরী ব্যাপার ঘটেছে।”

নিধি এবারে সালমা বেগমকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“তাই নাকি? কি জরুরী ব্যাপার মা? খালারা আবার চলে এসেছেন নাকি আমাকে জ্বা'লা'তে?”

“না। তোমার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। আমার ছেলে কোথায়?”

নিধি একবার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ওহ্ আমার স্বামীকে খুঁজছেন। উনি আছে,

গাড়ি পার্ক করছে। চিন্তা করবেন না চলে আসবে। আমি তাহলে ভিতরে যাই মা। একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। আর হ্যাঁ এই সুযোগে যেন আবার গহনের কানে আমার নামে নিন্দে করতে যাবেন না। ও কিন্তু খুব রেগে যায় আজকাল আমার নামে কেউ খারাপ কিছু বললে। আর আমি চাইনা রেগে গিয়ে আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করুক।”

কথাটা বলে নিধি ঘরে চলে গেল। সালমা বেগম শুধু হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নিধির যাওয়ার দিকে। মুখে আর কিছু বললেন না। তিনি সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে গহন ব্যাগ পত্র নিয়ে ওপরে এলো। সালমা বেগম কে দেখতেই বরাবরের মতনই ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে সালাম দিল। গহনের সেই হাসির মাঝে কোন কৃত্রিমতা নেই। একেবারে মন থেকে হেসেছে।

সালমা বেগম সালামের উত্তর দিতেই গহন জিজ্ঞেস করলো,

“কিসের জন্য এত জরুরী তলব করে পাঠালে মা? কি হয়েছে?”

সালমা বেগম আলতো হেসে বললেন,

“অনেকদূর জার্নি করে এসেছো। আগে যাও ফ্রেশ হও। তারপরে বলবো।”

গহন আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ ফ্রেশ হতে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প