বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪৩

🟢

“এত তাড়াতাড়ি সিনথিয়ার বিয়ে দেওয়ার কি প্রয়োজন মা? ও পড়াশোনা করুক। ওর বয়স তো এখনও অনেক কম।”

গহন কথাটা বলতেই পাশ থেকে নিধি বলে উঠলো,

“ওর বয়স কম কি করে হলো? আপনিও তো এই বয়সেরই একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন।”

নিধি কথাটা বলতেই পাশ থেকে সিনথিয়া মুখ ভেঙচিয়ে বলে উঠলো,

“মোটেও না। আমি তোমার বয়সী না। আমি তোমার থেকে এক বছরের ছোট।”

নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“মোটেই তুমি আমার থেকে এক বছরের ছোট না। আমরা সমবয়সী। তুমি ইন্টারে ফেল করেছিলে। সেজন্য এখনো কলেজের গন্ডি পেরোতে পারোনি। আর এমন নাটক করো যেন আমার ছোট। তোমার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে।”

গহন শান্ত দৃষ্টিতে শুধু নিধির দিকে তাকালো। কিছু বলল না। ওর দৃষ্টির দ্বারাই নিধিকে বোঝাতে চাইলো যেন নিধি থেমে যায়। থেমেও গেল নিধি। কিছু বলতেও পারছে না। কি করে গহনকে বোঝাবে যে নিধি চাইছে তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়িতে চলে যাক সিনথিয়া। যা জ্বালানোর শ্বশুর বাড়ির লোককে জ্বালাক। ওকে যেন আর বিরক্ত না করে।

ওরা দুজনে থামতেই গহন আবারও সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এত তাড়াহুড়াের কি আছে মা? আর তাছাড়া হঠাৎ করে এই সম্বন্ধের কথা এলোই বা কোথা থেকে যে কাল সোজা ওরা দেখতে চলে আসছে? আগে খোঁজখবর নিতে দাও আমায়।”

“নিয়েছি তো খোঁজখবর। প্রায় এক মাস যাবত খোঁজ-খবরই নেওয়া হচ্ছে।”

“এক মাস যাবত খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে ছেলের? কে নিচ্ছে?”

“তোমার খালা। অনেকদিন আগে আমাকে ছেলের কথা বলেছিলো। আমার পছন্দ হয়েছিল তাই খোঁজখবর নিতে বলেছিলাম। ছেলের এক বন্ধু শম্পার চাচাতো দেওর। তার থেকেও খোঁজখবর নিয়েছি। যথেষ্ট ভালো ছেলে। ছেলের পরিবারও ভালো।”

গহন বিস্মিত গলায় বলল,

“মানে গত এক মাস ধরে এসব হয়ে যাচ্ছে?

সিনথিয়ার বিয়ের কথা তোমরা গত এক মাস যাবতই জানো?”

“হ্যাঁ। গতকাল ওরা দেখতে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তুমি তো ছিলে না। বাড়িতে তোমার থাকাটা প্রয়োজন ছিল। তাই আগামীকাল আসতে বলেছি। এখন কিভাবে কি করা যায় বলো?”

গহন কোন উত্তর দিলো না। চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইল। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে সালমা বেগম আবারো বলে উঠলেন,

“চুপ করে আছো কেন? বলো কি করা যায়?”

গহন এবারও কোন উত্তর দিল না। পাশ থেকে নিধি বলে উঠলো,

“আরে কি হলো উত্তর দিচ্ছেন না কেন? আর তাছাড়া এই ব্যাপারটা আপনি আগে থেকে জানতেন না এটাতে অবাকই বা হচ্ছেন কেন? এই বাড়ির মানুষদের কাছে আপনার কতটুকু কি মূল্য আছে সেটা কি আপনি জানেন না? এমনটা তো নয় আপনাকে ছাড়া কারো কিছু চলে না। বরং আপনাকে ছাড়াই দিব্যি চলে যায় সবার জীবন। তাই এই কষ্ট পাওয়ার নাটকটা করার দরকার নেই গহন।”

নিধি কথাটা বলতেই সালমা বেগম ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর গলায় বললেন,

“এখন তুমি আমার ছেলেকে বলবে যে ওর এই বাড়িতে কতটুকু কি মূল্য আছে তারপরে ও বিশ্বাস করবে? তোমার কি মনে হয় ও জানেনা ওর এই বাড়িতে গুরুত্ব আছে কি নেই?”

নিধি কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন ওর হাতটা চেপে ধরে ওকে থামার জন্য ইশারা করলো। তারপরে নিজেই সালমা বেগমের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“আমি তো উপলব্ধি করতে পারলাম না মা যে আমার এই বাড়িতে গুরুত্ব আছে কি নেই কিংবা কতটুকু গুরুত্ব আছে। তুমি আমাকে একটা বার এই বিষয়ে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি ব্যাপারটায় আমি খুবই আশাহত হলাম। আমি কষ্ট পেলাম মা। আমার বোনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। পাত্র পক্ষের লোকজন দেখতে আসবে অথচ আমি ওর বড় ভাই হয়ে কিছু জানি না।”

একটু থতমত খেলেন সালমা বেগম। সেই সাথে কিঞ্চিত ভয়ও পেলেন। গহন আজকাল এত কিছু বুঝতে শিখেছে! এত কথা ধরতে শিখে গেছে! গহন আজকাল কষ্ট পেতে শিখে গেছে! নিজের অধিকার সম্পর্কে জেনে গেছে! ব্যাপারটা তো মোটেই ঠিক না। গহনের তো এত কিছু জানা বা বোঝা উচিত হলো না। তবে আপাতত সালমা বেগমকে পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে। শান্ত গলায় গহন কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“আসলে বাবা তোমার বোনের তো বিয়ের বয়স হয়েছে। ওর জন্য তো সম্বন্ধে আসতেই থাকে। আমি এই সম্বন্ধটাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এমনি বলেছিলাম খোঁজ নিতে। এই এক সপ্তাহ হলো ভালো ভাবে খোঁজ নিয়েছে তোমার খালা। ছেলে, ছেলের পরিবার ভালো। সেজন্য আমি আর দেরি করতে চাইনি। ব্যাপারটা খুব বেশি পুরনো না বাবা। তোমরা ঘুরতে গিয়েছিলে। আমি সেসময় তোমাদের বিরক্ত করতে চাইনি।”

রাগে নিধি শুধু কটমট করছে। ইচ্ছে করছে আবার একটু ঠুস ঠাস করে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে এই মহিলাকে। আবার একটু গহনের সামনে এই মহিলার মুখোশটা টেনে খুলতে ইচ্ছে করছে। কত ভালো উনি, যে নিধিরা ঘুরতে গিয়েছিল জন্য উনি বিরক্ত করতে চাননি। আহারে কতই না ভালোবাসেন উনি নিধি আর গহনকে। আসলে নিধির কপাল অনেক ভালো যে এমন একটা শাশুড়ি পেয়েছে। কিন্তু কথা হলো নিধির এত ভালো কপাল ঠিক পছন্দ না। সেজন্য এত ভালো শাশুড়িও পছন্দ না।

গহন খুব ভালো করেই জানে নিধি শুধু কিছু বলার জন্য উশখুশ করছে। সেজন্যই তো শক্ত করে হাতটা চেপে ধরে বসে আছে।

গহন আপাতত আর এই নিয়ে কোন কথা তুলতে চাইলো না। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজের মাথা থেকে কথাগুলো বের করে দিয়ে সালমা বেগম জিজ্ঞেস করলো,

“এক সপ্তাহের মধ্যে কি এমন খোঁজখবর নিয়ে নিলো খালা, মা? আমরা সারা জীবন দেখেও একটা মানুষ কে চিনতে পারিনা। সেখানে এক সপ্তাগের মধ্যে খোঁজ খবর নিয়ে নিলো? আবার ওদেরকে বাড়িতে চলেও আসতে বললে। আগে আমাদের আরো ভালো করে খোঁজখবর নেওয়া উচিত ছিল। আর তাছাড়া সিনথিয়ার মত আছে?”

সিনথিয়া যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাই করছিল। কিছু বলে উঠতে ধরলো তাড়াহুড়ো করে। তবে সালমা বেগম তার আগেই বলে উঠলেন,

“হ্যাঁ ওর মত আছে। আর মত না থাকলেই বা কি। ভালো সম্বন্ধ যখন পেয়েছি সব ঠিক থাকলে বিয়ে অবশ্যই দিয়ে দেবো।”

গহন বুঝলো ও আর যাই বলুক না কেন কোন কিছুতেই কিছুই বদলাবে না। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা তো নেওয়া হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়ে গহন ওর মা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ঠিক আছে মা। তুমি যা ভালো মনে করো সেটাই করো।”

কথাটা বলে গহন সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে সালমা বেগম ওকে পিছন থেকে আবারো ডেকে উঠলো। গহন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল,

“হ্যাঁ, বলো মা।”

“বলছিলাম যে বাবা, ওনারা তো কালই আসবেন। আজকেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হতো। বাজার-হাট তো কিছুই করা হয়নি।”

“তো যিনি বাজার করে দেন তাকে বলে দিও। যা টাকা লাগে আমি দিয়ে দেব।”

“না বাবা। আসলে আমি চাইছিলাম যে এই বাজারটা তুমি করো। আসলে ওই ছেলে ঠিকঠাক জিনিসপত্র চেনে না। মাঝে মাঝে পঁচা মাছ নিয়ে আসে, শাক-সবজিও তাজা কিনতে পারেনা। আসলে শম্পার বিয়ের সময় সম্বন্ধ দেখা থেকে শুরু করে তুমি সবকিছু যেভাবে সামলেছিলে। আমি চাই সিনথিয়ার বিয়েতেও তুমি সেভাবেই সব সামলাও।”

গহনের শরীরটা তখন খুবই দুর্বল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। বাইরে আবার আজ ভ্যাপসা গরম। শরীরটা সায় দিচ্ছে না বাইরে যেতে। এদিকে আবার সালমা বেগম এভাবে বললেন। না কি করে বলবে? গহনেরও তো একটা দায়িত্ব আছে।

নিধি গহন কে দেখেই যেন বুঝতে পারলো গহন যেকোনো সময় হ্যাঁ বলে দেবে। কিন্তু নিধি তো এটা হতে দিতে পারে না। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে গরমের মাঝে নিধি কোনমতেই গহনকে যেতে দেবে না। এই দূর্বল শরীর নিয়ে বাজারের ভারি ভারি ব্যাগগুলো টানতে দেবে না।

গহন সালমা বেগমকে কিছু বলে ওঠার আগেই নিধি সরাসরি গহনকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনি কোথাও যাবেন না। আপনি অসুস্থ। চুপচাপ ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন।”

নিধি কথাটা বলতেই গহন চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো। একইভাবে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে সালমা বেগমও নিধির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কি বললে তুমি? তুমি আমার কথার উপর দিয়ে কথা বলছো? গহন কে নিষেধ করছো আমার আদেশ মানতে?”

নিধি মনে মনে একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে গম্ভীর গলায় সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সব আদেশ যে সবসময় মানতেই হয় তার কোন মানে নেই মা। আর তাছাড়া এটা আপনার আদেশ না, অন্যায় আবদার। গহন অসুস্থ। গতকাল থেকে ওনার তুমুল জ্বর। আর এই শরীরে উনি এখন ভিড়ের মাঝে যাবেন বাজার করতে? কেন? বাড়িতে আপনার ছোট ছেলে নেই? উনি সারাদিন কি করেন? আমি তো ওনাকে ঘুমোনো ছাড়া আর কোন কিছু করতে দেখি না। ওনাকে পাঠান।”

সালমা বেগম গর্জে উঠে বললেন,

“মুখ সামলে কথা বলো মেয়ে? আমার ছেলে বাজারে যাবে না।”

নিধি পাল্টা গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার স্বামীও অসুস্থ শরীর নিয়ে বাজারে যাবে না।”

বিজ্ঞাপন

“আমার কোন ছেলে মেয়ে কি করবে, আমি আমার কোন ছেলে মেয়েকে দিয়ে কি করাবো সেটা তোমার থেকে শুনবো না।”

নিধি এবারে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“ঠিক আছে শুনতে হবে না। আমি তো আপনাকে শুনতে বলিনি। ছোট ছেলে যখন যাবে না তাহলে প্রতিদিন আমাদের বাড়ির বাজার যিনি করে দেন তিনি আজকেও করে দেবেন। কিন্তু গহন যাবে না।”

গহন তাড়াহুড়ো করে এসে নিধিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,

“চুপ করো। আমি ঠিক আছি এখন। এটা আমার দায়িত্ব নিধি। আর আমি ঠিক আছি তো এখন। চিন্তা করো না।”

গহন খুবই শান্ত গলায় নিধিকে বোঝানোর ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল। কিন্তু কেন যেন নিধি বুঝতে পারল না। বোঝার চেষ্টাই করলো না কিংবা বুঝতে চাইলোও না। বরং মাথাটা গরম হয়ে গেল। রাগ হলো গহনের উপর। কেন এই লোকটা নিজের দিক বোঝে না। নিজের সুবিধা অসুবিধার কথা মুখের উপর বলতে পারবে না কেন। গহনের থেকে এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“আপনি চুপ করুন। নিজের হয়ে যখন কথা বলতে পারবেনই না তাহলে আমি যখন কথা বলছি আমাকে ভুলেও বাধা দিতে আসবেন না । আপনি ঠিক আছেন তাই না? থার্মোমিটারে মাপলে এখনও আপনার গায়ে ১০২ ডিগ্রি জ্বর উঠবে। ওরা আপনাকে মানসিক কষ্ট দেয় সেটা নাহয় তাও চুপচাপ মুখ বুঝে মেনে নেই আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে। তাই বলে শারীরিক কষ্টও দেবে আর আমি ছেড়ে দেব। ওনার ছোট ছেলে কেন যেতে পারবে না? সারাদিন করেন কি উনি?”

গহন কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সালমা বেগম বলে উঠলেন,

“সাবিতের বাজার করার অভ্যাস নেই। ও পারে না এসব করতে।”

“পারেনা যখন তাহলে শিখে নিতে বলুন। অভ্যাস যখন নেই তাহলে অভ্যাস করতে বলুন। ওনার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা বলে ওনাকে আপনি বাড়ির কোন কাজে হাত দিতে দেন না। এমন কি ওনার নিজের কাজটুকুও আপনি আমাকে দিয়ে করান। আবার আপনার ছোট ছেলের অংশের কাজটুকুও আমার স্বামীকে দিয়ে করান। কেন আপনার ছোট ছেলেও কি অন্তঃসত্ত্বা? ওনারও কি মাথা ঘোরায়, বমি পায়? হ্যাঁ যদি আপনি এটা বলেন যে আপনার ছোট ছেলে অন্তঃসত্ত্বা তাহলে আমি ওনাকে ছাড় দেবো। তাহলে আমি নিজে গহনকে পাঠিয়ে দেবো।”

সালমা বেগম হিংস্র গলায় বলে উঠলেন,

“ভাষা ঠিক করো তোমার নিধি। বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু তুমি। গহন, তোমার স্ত্রীকে থামতে বলো।”

গহন নিধিকে কিছু বলার আগেই নিধি আঙুল উঁচিয়ে গহনকে শাসিয়ে বলল,

“আমাকে থামতে বললে কিন্তু আজ খুব খারাপ হয়ে যাবে গহন। আমি আমার উপরে হওয়া অন্যায় চুপচাপ সহ্য করি যেন আপনাকে অশান্তির মাঝে পড়তে না হয়। আপনাকে ভালো রাখতে আমায় যা করতে হবে আমি তাই করবো। আরেকটা কথা স্পষ্ট শুনে রাখুন, যদি আপনি এই অসুস্থ শরীর নিয়ে খাটাখাটনির জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। তাহলে আপনার পেছন পেছন কিন্তু আমিও বের হবো বাড়ি থেকে। ভাববেন না আপনার সাথে খাটতে যাবো। এই সংসার ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে, আপনাকে ছেড়ে এমন জায়গায় চলে যাব আপনি আমাকে কখনো খুঁজে পাবেন না। আর না কখনো সেখান থেকে আমাকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গহনের মুখটা কেন যেন বন্ধ হয়ে গেল।গহন খুব ভালো করে জানে এই মেয়েটা ঠিক কতটা জেদি। যা ইচ্ছে তাই করে ফেলতে পারে। গহন কিছু বলতে পারলো না। শুধু অসহায় মুখ করে তাকিয়ে রইল নিধির দিকে। নিধিকে খুব করে বোঝাতে চাইলো ওর অসহায়ত্ব। নিধিকে বোঝাতে চাইলো যেন অন্তত নিধি গহনকে বুঝে থেমে যায়।

নিধি বুঝলো গহনের অসহায়ত্ব। তবে থামতে পারলো না। এখন থামলে চলবে না। নিধি যা করছে গহনের জন্যই তো করছে।

এদিকে সালমা বেগম এখন নিধিকে রেখে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে গহন এর দিকে। ওনার ছেলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে শুনছে সবটা। কিছুই বলল না। এই মেয়েটা গহনের মা কে যা ইচ্ছে তাই বলছে অথচ গহন কিছু বলল না। চুপ হয়ে গেল শুধুমাত্র মেয়েটাকে হারানোর ভয়ে। তার মানে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই মেয়েটা গহনের জন্য!

সালমা বেগমের এসব ভাবনার মাঝেই নিধি গহনের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর মা আপনাকে বলি, এই নোংরা খেলা গুলো থামান এবার। শুধু মুখে বাবা বাবা বলে ডাকলেই ভালোবাসা হয়ে যায় না মা। আপনার সেই আদরের বাবা অসুস্থ। একবার তার কপালে হাত রাখলেই টের পাবেন সে ঠিক কতটা অসুস্থ। এখানে সারাটা দিন মানুষটা ছোটাছুটি করে ঠিক কতটা ক্লান্ত সেটা আমি ওনার মামা বাড়ি গিয়ে বুঝেছি। মানুষটা বিছানা ছেড়ে ওঠেনি, ওনার শরীর এতটাই ক্লান্ত। শুধু শারীরিক দিক থেকে না, উনি মানসিক দিক থেকেও ভীষণ ক্লান্ত মা। আমাকে দিয়ে সংসারে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে খাটাচ্ছেন। আমি চুপচাপ খেটে যাই শুধুমাত্র এই মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন উনি একটু শান্তিতে থাকতে পারেন। তাই আপনাকে বলছি দয়া করে আমার স্বামীকে আপনার নোংরা খেলার হাত থেকে রেহাই দিন। ওনার জীবনের প্রায় পঁচিশটা বছর আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন। এবার ওনাকে মুক্তি দিন।”

কথাগুলো বলা শেষ হতেই নিধির গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। নিধি চায়নি কাঁদতে। তারপরও কেন যেন কেঁদে ফেলল। গহনের অসহায়ত্বের কথা গুলো ভেবে কেঁদে ফেলল। খুব খারাপ লাগে নিধির গহনের জন্য। নিধি সবসময় চেষ্টা করে গহন কে একটু শান্তিতে রাখার জন্য। কিন্তু এই ছেলেটা নিজের শান্তি নিজেই বোঝেনা। গহন খেয়াল করলো যে নিধির গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিধি তাড়াহুড়ো করে নিজের চোখের জল মুছে গহনের হাত ধরে গম্ভীর গলায় বলল,

“ঘরে চলুন। এখন বিশ্রাম নেবেন। আমি রান্না করে আনছি। খেয়ে দেয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমোবেন। সুস্থ হয়ে নিন তারপরে যত দায়িত্ব পালনের ইচ্ছে করবেন।”

কথাটা বলে নিধি গহনের হাত ধরে টেনে ওকে ঘরের দিকে নিয়ে গেল।

সালমা বেগম ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার গাল বেয়েও কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। সালমা বেগম কাঁদছেন। কিন্তু কেন কাঁদছেন সিনথিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এগিয়ে এসে সালমা বেগমের কাঁধে হাত রেখে প্রশ্নাত্মল গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কাঁদছো কেন মা?”

সালমা বেগম হাতের উল্টো পিঠে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে কন্ঠে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বললেন,

“পর কখনো আপন হয় না।”

নিধি গহন কে ঘরে রেখে বেরিয়ে এসেছিল রান্না ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেই সময় সালমা বেগমের কথাটা ওর কানে গেল। নিধি এই কথাটার উত্তর না দিয়ে কোনমতেই চলে যেতে পারলো না। সালমা বেগম ঘরে যাওয়ার জন্য পিছন ঘুরতেই নিধিকে দেখে একটু চমকালেন। মুহূর্তের মাঝে ওনার চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠলো।

“যথেষ্ট তো কথা শুনিয়ে গেলে। আরো কিছু বাকি রয়ে গিয়েছিল নাকি?”

নিধি আলতো একটু হেসে বলল,

“না মা। আর তো কিছু বাকি ছিল না। তবে আপনার শেষের কথাটা কানে গেল। ওই যে আপনি বললেন না পর কখনো আপন হয় না। একদম ঠিক বলেছেন। ঠিক তেমনি সৎ মাও কখনো নিজের মা হয় না।”

সালমা বেগম গর্জে উঠে বললেন,

“নিজের সীমা ছাড়িও না নিধি।”

নিধি এবারও আলতো হেসে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“আপনি নিজের সীমা যতটা ছাড়াবেন আমি তার থেকে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাবো মা। আরেকটা বিষয় বলে রাখি মা, আপনার এই নোংরা খেলা থেকে যদি আমি আমার স্বামীকে বের না করেছি। তাহলে আমি গহন কিফায়াতের বউ না।”

_____________

নিধি রান্না ঘরে তখন গহনের জন্য রান্না করছে। রান্না শেষ। এখন খাবারগুলো প্লেটে বেড়ে গহনের জন্য নিয়ে যাবে। এরই মাঝে সেখানে ঋতু এলো। নিধি খেয়াল করেনি তখনও ঋতুকে। ঋতু এসে যখন নিধির পাশে দাঁড়ালো তখন খেয়াল করলো নিধি। শুধু একবার আড় চোখে তাকালো ঋতুর দিকে। তবে আগবাড়িয়ে কোন কথা বলল না। মন মেজাজের এখন বারোটা বেজে আছে। সেজন্য নিজের মুখটা আপাতত বন্ধ রাখাই শ্রেয় মনে করলো।

তবে নিধি চুপ থাকলেও ঋতু চুপ থাকতে পারলো না। ও তো এসেছেই কথা বলতে নিধির সাথে।

“খুব আনন্দ করলে এই দুদিন তাই না নিধি?”

নিধি বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“কেন সহ্য হচ্ছে না তোমার?”

অপ্রত্যাশিতভাবে নিধির এমন কথা শুনে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো ঋতু। নিধি হঠাৎ করে কেন ওর সাথে এভাবে কথা বলল ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“আরে মন মেজাজ খারাপ নাকি? মায়ের উপরে তৈরি হওয়া রাগ এখনো কমেনি? আচ্ছা ঠিক আছে আমি কিছু মনে করব না। আমি তো তোমাকে আমার ছোট বোনের মতন ভাবি। বড় বোনের উপর রাগ দেখাতেই পারো।”

নিধি তখন প্লেটে ভাত বাড়ছিল। ঋতুর কথাটা শুনে কাজের হাতটা থেমে গেল। প্লেটটা শব্দ করে তাকের ওপরে রেখে ঋতুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাত বুকে গুঁজে বলল,

“তোমার আসলে সমস্যাটা কি আমায় বলবে?”

“সমস্যা। কিসের সমস্যার কথা বলছো?”

“তোমার যেই সমস্যাটা সেই সমস্যার কথা বলছি। আমি আমার শাশুড়ি, ননদের ব্যাপারগুলো ধরতে পারলেও তোমার ব্যাপার গুলো ঠিক ধরতে পারছিনা। তোমাকে না আমি খারাপ বলতে পারি, না ভালো বলতে পারি। তবে কেন যেন মনে হয় তুমি আমার সুখ ঠিক সহ্য করতে পারো না। প্রায় আমি খেয়াল করেছি বাড়িতে যখন আমি গহনের সাথে থাকি তুমি উঁকি দিয়ে দিয়ে আমাদের দেখো। প্রথমদিকে আমি ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলাম। কিন্তু দিন দিন এই বাড়ির সবার রূপ যখন পরিবর্তন হতেই আছে তখন তোমাকেও আমার সন্দেহ হচ্ছে। নিজে অসুখী জন্য আমার সংসারের সুখ সহ্য করতে পারোনা এটাই কি সত্যি?”

ঋতু এবারে কিঞ্চিত রাগী গলায় বলে উঠলো,

“কি যা তা বলছো? বাকিদের সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলো না নিধি। আমাকে পছন্দ নাই হতে পারে। কিন্তু তাই বলে এভাবে অপবাদ দিতে পারো না।”

“এমন কাজ করো কেন যাতে আমি অপবাদ দিতে হয়? দুদিন চেষ্টা করেছো আমার আর গহনের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করার জন্য, আমার আর জারা আপুর সম্পর্কটা নষ্ট করার জন্য। আমিও বোকার মতন বিশ্বাস করেছিলাম তোমার কথা। কিন্তু তুমি যা যা বলেছিলে সবই ভুল। এখন এত ভুল তথ্য তোমায় কে দিল?”

“আমি যা শুনেছি তোমায় তাই বলেছি। আমি তোমার সংসারে অশান্তি তৈরি করার জন্য কথাগুলো বলিনি। আমি শুধু তোমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলাম নিধি। এটা ঠিক আমার সংসারে শান্তি নেই। আমি সেজন্য চাই না তোমার সংসারে অশান্তি হোক। আমি চাই তুমি ভালোভাবে সংসার করো।”

নিধি এবার নিজের চোখ মুখ থেকে গাম্ভীর্য ভাবটা সরিয়ে একটু হেসে বলল,

“অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায় আমার এত ভালো ভাবার জন্য। তবে কি বলোতো আমার স্বামী এখন ভালো হয়ে গেছে। উনি একাই আমার ভালো ভাবার জন্য যথেষ্ট। আর কাউকে আমার ভালো ভাবতে হবে না। আমরা দুজনে দুজনের জন্য আছি। তোমায় আর আমার এত ভালো ভাবতে হবে না। আমার মনে এত সন্দেহও ঢুকিয়ে দিতে হবে না ভাবি। তুমি বরং নিজে ভালো থাকো, নিজে শান্তিতে থাকো, নিজের সংসার মন দিয়ে করো তাহলেই হবে।”

ঋতু খুবই অপমানিত হলো নিধির এমন আচরণে। নিধি আর একটা কথাও বাড়ালো না ঋতুর সাথে। চুপচাপ গহনের জন্য প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে ঘরে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প