সকালে অফিস যাওয়ার আগে গহন একবার সাবিতের ঘরে এলো। সাবিত সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। ঋতুকে অনেকক্ষণ আগে পাঠিয়েছে কফি আনার জন্য। তবে এখনো আসেনি মেয়েটা। গহন তখন সাবিতের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। এরই মাঝে সাবিত ঋতুর নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ঋতু! এক কাপ কফি বানাতে কত সময় লাগে? ম'রার পর আনবে? আমার লা'শকে খাওয়াবে কফি?”
সাবিতের কথাটা একদমই পছন্দ হলো না গহনের। খুবই দৃষ্টিকটু লাগল স্ত্রীর সাথে এমন ব্যবহার। একটু কেশে সাবিত কে জানানোর চেষ্টা করলো যে ও এসেছে। শব্দটা কানে যেতেই সাবিত ঘাড় কাত করে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো গহন দাঁড়িয়ে আছে। মেজাজটা যথেষ্ট খারাপ ছিল সাবিতের। গহন কে দেখে সেটা আরো বিগড়ে গেল।
যদিও সাবিত সচরাচর গহনকে বুঝতে দিতে চায় না যে ওকে দেখলে সাবিতের মাথাটা ঠিক কতটা গরম হয়। তবে আজ চেয়েও কেন যেন নিজের ওপরে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলো না। চোখ মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“কিছু বলবে?”
গহন ভিতরে এলো। এগিয়ে এসে বিছানায় সাবিতের পাশে বসলো।
“কি হয়েছে? শরীর খুব খারাপ? জ্বর এসেছে নাকি? দেখি।”
গহন হাতটা বাড়িয়ে সাবিতের কপালে রাখতে চাইলো। তবে সাবিতের সেটা একদমই পছন্দ হলো না। একটু পিছিয়ে গিয়ে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আমি এখনো ছোট নেই ভাইয়া যে বাচ্চাদের মতন আদর দেখাতে হবে। কি বলতে এসেছো সেটা বলো।”
নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা গুটিয়ে নিল গহন। ওর ভালোবাসা সাবিতের প্রয়োজন নেই। সেজন্য দেখাতেও চাইলো না আর। যেটা বলতে এসেছে সেটাই বলবে। একটু সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ঋতুকে ডাক্তার দেখাচ্ছো ঠিক মত?”
“দেখাচ্ছে হয়তো। আমি জানিনা।”
গহন কপাল কুঁচকে বলল,
“তুমি জানো না মানে? তোমার জানা উচিত। তুমি জানো না তো কে জানে?”
“ওর মা যায় ওর সাথে। কবে যায়, কখন যায় আমি জানিনা।"
“কিছু হয়েছে ওর সাথে? ঝামেলা করেছো?”
“আরে না রে বাবা কিছু হয়নি।”
গহন বুঝতে পারছে যে সাবিত বিরক্ত হচ্ছে। কিন্তু তাও আবারো জিজ্ঞেস করলো।
“তুমি কি ঋতুর গায়ে হাত তোলো? গতকাল ওর কপালে আমি একটা ক্ষত চিহ্ন দেখেছি। এমনি এমনি তো ক্ষতটা হওয়ার কথা না। মেয়েটা সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকে। স্বামী হিসেবে তোমার কতটুকু দায়িত্ব সেটা তোমার বোঝা উচিত সাবিত। যথেষ্ট বড় হয়েছো তুমি। তোমার নিজের বাচ্চা হবে। তুমি যদি এখনো বাচ্চামো করো তাহলে তো চলবে না তাই না? মেয়েটার দায়িত্ব নিয়েছো, সেই দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে হবে। ঋতুর মুখের দিকে তাকালে যে কেউ বুঝে যাবে যে ও এই বাড়িতে ভালো নেই। তোমার সাথে ভালো নেই। ওকে ভালো রাখার দায়িত্ব তো তোমার।”
দরজার কাছে কেউ দাঁড়ালে ড্রেসিং টেবিলে তার প্রতিবিম্ব বেশ স্পষ্টই দেখা যায়। ভুল ক্রমে সাবিতের চোখটা ড্রেসিং টেবিলের দিকে যেতেই খেয়াল করল ঋতু কফির মগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। মুহূর্তের মাঝে সাবিতের মেজাজটা চটে গেল। ভাবল ঋতুই বোধহয় গহনের কাছে গিয়ে কোন নালিশ করেছে। যেমন রাগ হলো ঋতুর উপরে, তেমনি রাগ হলো গহনের উপরে। গহন কে, যে ওর কাছে সাবিত জবাবদিহি করবে? গহনের সাহসই বা হলো কি করে ওর কাছে জবাবদিহি চাওয়ার? কে বলেছে এত জ্ঞান দেওয়ার জন্য।
সাবিত এর থেকে এতক্ষণেও কোন উত্তর না পেয়ে গহন ওর কাঁধে হাত রেখে কিছু একটা বোঝাতে চাইলো। সাবিত সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাঁধ থেকে গহনের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার বউয়ের সাথে আমি কেমন ব্যবহার করব না করব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে তুমি নাক গলাতে এসেছো কেন? তোমাকে এই অধিকার কে দিয়েছে? আর আমার বউয়ের দিকে এত তাকাতেই হবে কেন তোমার? ওর মুখ দেখলে বুঝতে পারো ওর মন খারাপ, ওর কপালের ক্ষতস্থানে তোমার চোখ পড়ে, এত কিছু তো তোমার দেখার প্রয়োজন নেই। ঘরে তো তোমার নিজের বউ আছে। তুমি নিজের বউয়ের দিকে নজর দাও। অন্যের বউকে দেখার প্রয়োজন তো নেই। তোমার বাড়িতে থাকছি, তোমার টাকায় খাচ্ছি বলে কি এখন আমার বউয়ের উপরে নিজের অধিকার ফলাতে আসবে নাকি?”
লজ্জায় অপমানে গহনের মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো। নিজের উপর যে ঠিক কতটা রাগ হলো সেটা বলে বোঝাতে পারবে না। মনে হলো কেন এসেছিল এখানে? গহন তো জানতো এমন কিছুই হবে। কিন্তু তারপরও কেন নিধির কথা শুনে আসতে গেল? নিধিকে বোঝানো উচিত ছিল গহন কেন ওদের ব্যাপারে কোন কথা বলতে চায় না। জোর করে তো আর কারো থেকে সম্মান আদায় করা যায় না। সেজন্যই তো গহন সবসময় নিজেই নিজের সম্মান বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে। এসব কিছু থেকে দূরে থাকে। কেন আসতে গেল আজ এই ঘরে? কেন সাবিত কে এই কথাগুলো বলতে গেল?
আর একটা শব্দও বের হলো না গহন এর মুখ থেকে সাবিতের জন্য। লজ্জায় অপমানে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
___________
“এই ছেলে প্রতিদিন এক কথা বলতে হয় কেন? খেয়ে যেতে কি সমস্যা আপনার? এর আগের দিনই বলেছিলাম না খেয়ে গেলে ঠ্যাং ভেঙে বাড়িতে বসিয়ে রাখবো। একদিনে কথা কানে যায় না?”
গহন হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলল,
“আজ ক্ষুধা লাগেনি। পরে ক্ষুধা লাগলে অফিসে গিয়ে কিছু খেয়ে নেব।”
“আপনি যে কত খাবেন সেটা আমি খুব ভালোভাবেই জানি। চুপচাপ বসুন। ভাত এনেছি খেয়ে যান।”
গহন নিধির কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না নিধি। খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি এক কাজ করো, টিফিন বক্সে দিয়ে দাও।”
নিধি সন্দেহী গলায় বলল,
“খাবেন তো ঠিকঠাক?”
গহন নিধিকে আশ্বস্ত করে বলল,
“হ্যাঁ খাব।”
নিধি গহনের খাবারগুলো টিফিন বক্সেই দেবে ভেবে প্লেটটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরে আবার থেমে গেল। পিছন ফিরে গহনের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
‘আপনার ভাইয়ের সাথে কথা বলেছিলেন কি? বুঝিয়েছেন ওনাকে?”
কয়েক মুহূর্তের জন্য গহন থমকালো। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“ওদের মাঝে তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
নিধি কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আরে বাবা আমি যাইনি তাে। আপনাকে পাঠিয়েছি সেজন্য।”
“তোমার কিংবা আমার কারোরই ওদের মাঝে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু ওদের মাঝে কেন কারোর মাঝেই আমাদের যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
“ধুর বাবা। আপনি বলুন তো কথা বলেছেন ওনার সাথে? কি বলল?”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“সাবিত এটা পছন্দ করেনি যে আমি ওদের মাঝে কথা বলেছি। এই কথাটা আমি তোমাকে আগেও বলেছিলাম যে কেউ পছন্দ করবে না। কিন্তু তুমি শুনলে না আমার কথা। এবার মিলল তো।”
“উনি বলল আর আপনি চুপচাপ চলে এলেন? ঠাস করে কানের নিচে একটা লাগিয়ে দিতে পারলেন না? অপদার্থ কোথাকার। কাম নেই, কাজ নেই শুধু গিলবে, ঘুমোবে আর বাড়িতে বসে থেকে বউকে পে'টা'বে। আরে ওকে আমার সামনে এনে দিন তো। দুটো চ'ড় আর চারটে লা'থি খেলে ঠিক হয়ে যাবে। বউ পে'টা'নোর স্বভাব আমি পাঁচ মিনিটে ঘুচিয়ে দেব।”
সাবিত গহন কে কি কি বলে অপমান করেছে সেগুলো গহন নিধিকে জানাতে চায় না। কেননা বুঝতে পারছে এমনিতেই মেয়েটার সাবিতের ওপর যে রাগ। তার ওপর যদি শোনে গহনকে এভাবে অপমান করেছে বাড়িতে একটা কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে। আজ সকালেই যথেষ্ট অপমানিত হয়েছে গহন এই নিয়ে। আপাতত কেন, আর কখনোই এই নিয়ে কোন কথা উঠুক গহন চায় না। তারওপর আবার যদি নিধি শোনে ওর কথা রাখতে গিয়ে গহন অপমানিত হয়েছে তাহলে কষ্ট পাবে। নিজেকে দোষারোপ করবে, যা গহন চায় না।
সেজন্য নিধিকে বলল না সেই কথাগুলো। কিন্তু মেয়েটাকে থামাতে হবে। যা অপমানিত হওয়ার গহন হয়ে নিয়েছে। নিধি অপমানিত হোক সেটা গহন চায় না। মৃদু গম্ভীর গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি নিষেধ করেছি তোমায় নিধি এই নিয়ে কথা বলতে। তুমি এটা আমার আদেশ ভাবো কিংবা অনুরোধ যা ইচ্ছে তাই ভাবো। কিন্তু আমার এই কথাটা তোমায় শুনতে হবে। ওদের মাঝে তুমি কথা বলবেনা।”
নিধি এবার একটু শান্ত হলো। কাচুমাচু করে গহন কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“ভাবিকে দেখে খারাপ লাগে গহন। উনি খুব অসহায় গহন। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় তো একটু যত্ন প্রয়োজন, ভালোবাসা প্রয়োজন। আর ওনার স্বামী ওনার গায়ে হাত তোলে। আপনি একটু বোঝান না আপনার ভাইকে! না হলে আপনার মা কে দিয়ে বলুন। নাহলে আমি গিয়ে বলি? আমি বোঝাই?”
গহনের এবার মাথাটা সত্যি গরম হয়ে গেল। মেয়েটা যে কেন বোঝেনা যে অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে নেই কে জানে। কথা বলতে গেলে এখন অপমানিত হবে। শুধু সাবিত অপমান করবে না। গহন খুব ভালো করেই জানে ঋতুও কথা শোনাবে। আর ওর মা বোনেরা তো রয়েছেই। রাগী গলায় মৃদু চেঁচিয়ে উঠে নিধি কে বলল,
“এক কথা কতবার বোঝাতে হয় তোমাকে? আমার একটা কথাও শুনতে পারো না? বারবার নিষেধ করে চলেছি ওদের মাঝে কথা বলো না, ওদের মাঝে কথা বলো না। তারপরও বোঝো না কেন? শুধু তো আজ একদিন বলিনি। এর আগেও বলেছি যে কারো মাঝে কথা বলতে যাবে না। তারপরও কথা বোঝোনা কেন? সব সময় সব বিষয়ে নাক গলাতে নেই। সব সময় সব বিষয়ে বাড়াবাড়িও করতে নেই। আর নিজের এই প্রতিবাদী সত্তাটাকে মাঝে মাঝে একটু দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করো। আর এত জনদরদী হতে হবে না। নিজেরটা নিজে বোঝার চেষ্টা করো।”
গহন নিধিকে না আর কোন কিছু বলার সুযোগ দিল, না কোন কিছু শোনার অপেক্ষায় রইলো। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। খাবারটাও নিয়ে গেল না। নিধি থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো নিজের জায়গায়। হা করে তাকিয়ে রইল গহনের যাওয়ার দিকে।
হঠাৎ করে কি হয়ে গেল গহনের যে এভাবে ঝাড়ি দিয়ে চলে গেল? নিধি রাগ করেনি, কষ্টও পায়নি। তবে অবাক হয়েছে। সামান্য একটা কথা নিয়ে তো এতটা রেগে যাওয়ার কথা ছিল না গহনের। সাবিত কি তাহলে কথা শুনিয়েছে গহন কে?
___________
নিধি গহনের ব্যবহারের কথা গুলো ভাবছে আর কাজ করছে। কাজে মন নেই। যদিও মনটা খারাপ করতে চায়নি কিন্তু তবুও খারাপ হয়ে গেছে গহনের এমন ব্যবহারে। এখন অব্দি কখনো গহন নিধির সাথে এতটা খারাপ ভাবে কথা বলেনি। এতটা জোরে কথা বলেনি। কে জানে আজ কি হয়ে গেল। কিংবা হয়তো বদলে যাচ্ছে গহন।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখলো গহনের নাম্বার থেকে কল এসেছে। মুহূর্তের মাঝে নিধির ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে আবার বিষন্নও দেখাল। এখন তো হাসলে চলবে না। গহনের সঙ্গে একটু ভাব নিয়ে কথা বলতে হবে। গহন কে বোঝাতে হবে যে নিধি রেগে আছে। গহন যে ব্যবহারটা করেছে নিধির সাথে সেটা ঠিক করেনি।
নিধি ফোনটা রিসিভ করে গম্ভীর গলায় বলল,
“শুনছি।”
নিধির কণ্ঠস্বরটা শুনতেই গহন আবহাওয়া সম্পর্কে বেশ ভালোই আন্দাজ পেয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন যে তখন ওভাবে বলতে গিয়েছিল কে জানে। নিধির ভালোর জন্যই বলেছিল। কিন্তু গহনের আরেকটু বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। নিধিকে তো সম্পূর্ণ সত্যিটাও বলেনি। হয়তো বললে নিধি বুঝতে পারতো। আবার বলবেই বা কি করে। সত্যিটা বললেও তো মেয়েটা আবার ঝামেলা করবে।
“আমার তোমার সাথে ওভাবে রেগে কথা বলা উচিত হয়নি। দুঃখিত আমার ব্যবহারের জন্য। আর কখনো হবে না।”
একটা সুযোগ পেলো নিধি গহন কে খোঁচানোর। না খোঁচালে চলে নাকি!
“আরে না না দুঃখিত হতে যাবেন কেন? বলতেই পারেন রেগে কথা। বউয়ের সাথে কথা বলাই যায় এভাবে। আমি কিছু মনে করিনি। যতই হোক আপনিও তো পুরুষ মানুষ! বাকিদের মতন যদি বউ এর ওপরে গরমই না দেখালেন তাহলে কিসের পুরুষ মানুষ হলেন! একটু তো পুরুষ মানুষের নাম রাখতে হবে তাই না?”
গহন আবারো অপরাধী গলায় বলল,
“দুঃখিত। বললাম তো ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন হবে না কথা দিচ্ছি।”
“আমি আপনাকে বলছি না একেবারে শান্ত হয়ে যেতে। মাঝে মাঝে একটু রাগা ভালো। শরীর স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। কিন্তু সেটা শুধু বউয়ের ওপরে রাগ দেখালেই চলবে না। মাঝে মাঝে একটু মা বোনকেও রাগ দেখাতে শিখুন। একটু রাগ যদি ওদেরকে দেখাতেন তাহলে আজ নিজেই ভালো থাকতে পারতেন। যাই হোক, কার রাগ তখন আমার উপরে ঝাড়লেন?”
“কারোই না।”
নিধি এবারে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“মিথ্যে বলার জন্য কল করেছেন? দেখুন হয় সত্যিটা বলবেন নয়তো কিছুই বলবেন না। কিন্তু মিথ্যে শুনতে পারবো না। আমার তো এটা সন্দেহ হচ্ছে যে আপনার ভাই বোধহয় উল্টোপাল্টা কিছু বলেছে আপনাকে তাই না?”
গহন তাড়াহুড়ো করে বলল,
“না। ও কিছু বলেনি।”
নিধির সন্দেহটা তীব্র হলো। ভাবলো গহন কে এবার একটু ভয় দেখাবে। নাহলে ছেলেটা সত্যি বলবে না।
“ঠিক আছে। আপনি যখন কিছু বলবেন না তাহলে আমি বরং আপনার ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি যে উনি কি কথা শুনিয়েছেন আপনাকে। তারপরে ওনার একদিন আর আমার যে কদিন লাগে।”
নিধি এমনি ভয় দেখালো গহন কে। তবে কাজ হলো। অপর পাশ থেকে গহন ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,
“আরে দাঁড়াও যেও না। আমি বলছি।”
নিধি ঠোঁট টিপে হেসে গম্ভীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে বলুন।”
গহন পড়ল মহাবিপাকে। যে কথাগুলো এই মেয়েটার থেকে লুকোতে চায় সেগুলোই মেয়েটা শোনার জন্য তাড়া দেয়। কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল,
“ঠিক আছে বলবো তোমায়। তবে তার আগে আমায় একটা কথা দিতে হবে।”
“কি কথা?”
“এই নিয়ে তুমি কাউকে কিছু বলবে না, কোন ঝামেলা করবে না। কথা দাও আমায় এই কথাটা শুধুমাত্র আমাদের দুজনের মাঝেই থাকবে?"
নিধি বিরক্তিতে নাক মুখ কোঁচকালো। এখন কথা না দিলেও হবে না, আবার কথা দেওয়াটাও ঠিক হবে না। সত্যি বোধহয় গহনকে কেউ না কেউ কথা শুনিয়েছে। এখন পাল্টা তো নিধিকেও তাকে গিয়ে কথা শোনাতে হবে। কিন্তু কিছু করার নেই। আপাতত গহন কে কথা দিল।
“আমি কিন্তু বিশ্বাস করলাম তোমায় নিধি। আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রেখো। আমি জানি তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙবল না।”
নিধি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“ঠিক আছে বলবো না। এবার বলুন।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“সাবিতের পছন্দ হয়নি আমি ওদের ব্যাপারে কথা বলা। ও ব্যাপারটাকে অন্যভাবে নিয়েছে। উল্টোপাল্টা কথা বলেছে। কিন্তু কি বলেছে সেটা তোমার শোনার প্রয়োজন নেই।”
“প্রয়োজন নেই মানে? অবশ্যই আছে। কি বলেছে বলুন তো?”
“বললাম তো শোনার প্রয়োজন নেই। যা বলার ছিল বলেছি। এই প্রসঙ্গে আর কোন কথা উঠবে না।”
নিধি গহনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,
“কথা তো উঠবেই। ওর সাহস হলো কি করে আপনাকে অপমান করার, আপনাকে কথা শোনানোর? আমি তো এটা ভাবছি যে কতটা না বাজে কথা শুনিয়েছে আপনাকে যে আপনি আমার উপরে রাগ দেখালেন। ওকে তো আজ আমি ছাড়বই না। ওর জন্য আমার ভালো স্বামী আবার খারাপ হয়ে যেতে ধরেছিলো। ও আজ শেষ।”
ফোনের অপর পাশ থেকে গহন অনুরোধের স্বরে বলল,
“প্লিজ নিধি। তুমি কাউকে কিছু বলবে না। আমায় কথা দিয়েছিলে তুমি। আমি ভরসা করেছি তোমায়। তুমিও যদি এখন আমার ভরসা না রাখতে পারো তাহলে সত্যি আমার আর কিছু বলার নেই। তাহলে আজকের পর থেকে আমিও তোমার থেকে আর কোন কিছু আশা রাখবো না। যা ইচ্ছে করো। তবে আমি আজ বুঝলাম আমার কথার মূল্য তোমার কাছেও নেই।”
কথাটা বলে গহন ফোনটা কেটে দিলো। গহন ইচ্ছে করেই এই কাজটা করলো। কেননা জানে কেবলমাত্র এই একটা কাজ করলেই নিধিকে এখন থামিয়ে রাখা যাবে।
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে নিধি বিছানার উপর সেটা ছুঁড়ে মারলো। হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করলো কিছুক্ষণ। এখন যদি সামনে গহনকে পেত নির্ঘাত দুহাতে চুল খামচে ধরতো। গহনকে যে ক’টা কি'ল ঘু'সি খেতে হতো নিধির হাতে তার কোন হিসাব নেই। হয়তো কামড়েও দিতো।
নিধির আজ নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হলো। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিচ্ছু করতে পারছে না। চুপচাপ মুখ বুঝে সবকিছু সহ্য করে নিতে হবে। কথাগুলো ভাবতেই এবার কান্না পেল। আবারও কিছুক্ষণ হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করলো। সামনে গহনকে না পেয়ে নিজেই নিজের মাথার চুল খামচে ধরে বসে রইল। সেই সাথে মনে মনে ঠিক করলো আজ না হয় চুপ করে গেল। কিন্তু এর পরের বার যদি এমন কোন সুযোগ পায়, ছাড়বে না সাবিত কে। ওর গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়বে।
____________
গহনের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজলো। সারাদিন আর নিধির সাথে কথা হয়নি। ঘরে ঢুকতেই দেখলো নিধি বিছানা গোছাচ্ছে। সকালে রাগের মাথায় পুরো ঘর এলোমেলো করে ফেলেছিল। বিছানার চাদর বালিশ সব তুলে ছুঁড়ে ফেলেছিল মেঝেতে। সারাদিন আর সেগুলো ঠিক করা হয়নি। এখন গহন আসবে জন্য পুরো ঘরটা আবার গোছাচ্ছে।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে গহন হালকা একটু কাশলো নিধির মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। কাজ হলো। নিধি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গিয়ে আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দিল। এমন ভাব করলো যে কোন প্রয়োজন নেই গহন কে দেখার।
গহন বুঝলাে আবহাওয়া এখনো গরমই আছে। ঠান্ডা করতে হবে।
“আইসক্রিম এনেছি সবার জন্য। সবাইকে দিয়ে তুমি খাও। তোমার জন্য দুটো এনেছি।”
নিধি গম্ভীর গলায় বলল,
“লাগবেনা। বাকিদেরকে দিয়ে দিন। ওরা গিলুক।”
“ওদের গেলার জন্যও তো এনেছি। ওহ, তোমার জন্য ডিম সিদ্ধও আছে। গরম আছে খেয়ে নাও।”
নিধি এবারও গম্ভীর গলায় বলল,
“প্রয়োজন নেই। ওটাও ওদেরকে দিয়ে আসুন। ওরাই গিলুক। পারলে পুরো ডিমটা একবারে গিলতে বলবেন ওদের। যেন গলায় আটকে থেকে কিছুক্ষণের জন্য কথা বন্ধ থাকে সবার।”
কোন কিছু বলেই কোন কাজ হচ্ছে না। নিধি প্রচন্ড রেগে আছে। উপায় না পেয়ে গলার টাইটা খুলে গহন গিয়ে আগে দরজাটা বন্ধ করলো। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেতেই নিধি একটু সাবধান হয়ে গেল। নিধি হালকা একটু আন্দাজ করতে পারছে গহন এখন কি করবে। সে জন্য নিজেও প্রস্তুতি নিয়ে রাখলো ও কি করবে সেটা ভেবে।
নিধির ধারণা মোটেই ভুল হলো না। গহন পিছন থেকে এসে দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে নিধি বেশ জোরেশোরে গহনের পেটে কনুই দিয়ে আঘাত করলো। সঙ্গে সঙ্গে গহন ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে ছেড়ে দিল নিধিকে।
“আরে মা'রলে কেন? লাগলো তো আমার।”
গহন পেট ধরে বিছানার উপর বসে পড়লো। চোখমুখ ব্যথায় এখনো কুঁচকে রেখেছে। নিধি রাগী গলায় বলল,
“আপনার সাথে এটাই করা উচিত। আপনার পরিবারের লোকজন যখন নিজেদের কথার দ্বারা আপনাকে আঘাত করতে করতে একদম মাটিতে লুটিয়ে ফেলে তখন কষ্ট হয় না? তখন মনে হয় না মুখ ফুটে একটু ওদেরকে বলি আমার লাগছে এবারে ছেড়ে দাও? বউ মা'রলে এত লাগে কেন? আপনার রোজ মা'র খাওয়া উচিত বউয়ের হাতে।”
গহন ব্যথায় নাক মুখ কুঁচকেই নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সত্যি খুব লেগেছে নিধি। এমনি পেটটা ব্যথা করছিল। আরো লাগলো। খুব কষ্ট পাচ্ছি।”
হঠাৎ করে নিধির অভিব্যক্তিটা কেমন যেন বদলে গেল। মনে হলো গহনের পেটে আঘাত করা ঠিক হয়নি। পিঠ, বাহু এসব জায়গা তো ছিলই। পেটে কেন আঘাত করতে গেল, তাও যে জায়গাটা সমস্যা হয়।
তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে বিছানায় গহনের পাশে বসে অপরাধী গলায় বলল,
“ক্ষমা করবেন। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। রাগের মাথায় ছিলাম। যেখানে পেয়েছি মে'রে দিয়েছে। খুব বেশি ব্যথা পেয়েছেন?”
“খুব বেশি না তবে পেয়েছি।”
নিধি চোখে মুখে অপরাধী ভাব ফুটিয়ে তুলে গহনের পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আহারে! আর করবো না কখনো এমন। আচ্ছা আমি হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। কমলো কি?”
“না তো।”
নিধি জোর গলায় বলল,
“আরে অবশ্যই কমেছে। বউ ভালোবেসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কমবে না কেন? কমতে বাধ্য।”
“আরে কমেনিতো। না কমলে কি করে বলবো যে কমেছে?”
ভালোবেসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে তাহলে কেন ব্যথাটা কমবে না? ব্যথার উচিত ছিল কমে যাওয়া। মনে মনে এমনই ভাবলো নিধি।
পরমূহুর্তেই অন্য একটা ভাবনা এলো নিধির মাথায়। ভাবলো এই কাজটা করলে নিশ্চয়ই ব্যথা কমে যাবে। আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে গহনের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে গহনের গালে একটা চুমু দিলো। গহন থতমত খেয়ে গেল। শুধু এক গালে চুমু দিয়ে ক্ষান্ত থাকলো নিধি। অন্য গালেও চুমু দিয়ে বলল,
“এবারে তো কমবেই। আরে বউ এত ভালোবাসলে তোর যে কারো ক্যান্সারও সেরে যাবে। আর আপনার সামান্য পেট ব্যথা সারবে না!”
গহন এবার না হেসে থাকতে পারল না। হালকা একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“হুম তা ঠিক বলেছো। কমে গেছে। তোমার ভালোবাসা আজকাল আমার সব রোগ সারিয়ে দিচ্ছে। দিনদিন তুমি আমার রোগ সারানোর ওষুধ হয়ে যাচ্ছো। এখন তোমার থেকে এই ছোট ছোট রোগের ওষুধ পেতে হলেও মাঝেমধ্যে অসুস্থ হতে হবে আমায়।”