নিধি তখন ডাইনিং টেবিল গোছাচ্ছে। ওর কাজের মাঝেই সেখানে সালমা বেগম এসে গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি যে আজ ভার্সিটি গেলে না। গহন তো এসে এইজন্য আমায় দোষারোপ করবে। দয়া করে ওকে জানিয়ে দিও যে আমি তোমায় আটকাইনি। তুমি স্বেচ্ছায় পরোপকার করতে গিয়ে থেকে গেছো।”
নিধির কাজের হাতটা থেমে গেল। সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
“অত্যন্ত ধূরন্ধর মহিলা আপনি। আমি বলবো গহন কে যে আমি স্বেচ্ছায় থেকে গিয়েছি নাকি থাকতে বাধ্য হয়েছি। সেসবই আমি গহন কে বলব। কি ভেবেছেন রোজ রোজ এভাবে আমাকে আটকাতে পারবেন? এতটাও সহজ ভাববেন না। আমার মাঝে মানবিকতা আছে জন্য আজ থেকে গেছি। কাল যেন থাকতে না হয় সেই ব্যবস্থাও করবো আমি।”
সালমা বেগম নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,
“যা ইচ্ছে করে নাও। আমি একবারও তোমায় থাকতে বলিনি। না তোমায় কাজগুলো করতে বলেছি। আমি ঋতু কে বলেছিলাম এই কাজগুলো করতে। ওর কোন আপত্তি ছিল না। তোমার শরীরে যদি এখন দয়া মায়া বেশি হয়ে থাকে তাহলে তার দায় আমার না।”
“আর আমার মাথা গরম হয়ে গেলে, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলে আপনার সম্মান রক্ষা করার দায়ও থাকবে না। এমন কিছু বলে দেব যে মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। আমি ভদ্রতা বজায় রাখায় যেন দিন দিন আপনার কূটনামি গুলো বেড়ে যাচ্ছে। আমাকে অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না। এত বছর সংগ্রাম করেই বেঁচেছি। কার সাথে কি ব্যবহার করতে হয়, কাকে কিভাবে সোজা রাখতে হয় সেসব কিন্তু আমি জানি। শুধুমাত্র গহন আপনাকে সম্মান করে বলে চুপ থাকার চেষ্টা করি। নয়তো এতদিনে আপনার কি যে অবস্থা করতাম আমি নিজেও জানিনা।”
কথাটা বলে নিধি দাঁত কিড়মিড় করলো। নিধি আরো কিছু বলতে চেয়েছিলো। তবে পারলো না। তার আগেই ওর কানে দরজা খোলার শব্দ এলো। কিন্তু দরজা খুলল কে? কেউ তো এদিক দিয়ে যায়নি। তার মানে বাইরে থেকে কেউ আসছে। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ এলে একমাত্র তো দরজা খোলার ক্ষমতা গহনের কাছেই আছে। তারমানে গহনই এলো কি?
নিধি এসব ভাবতে ভাবতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো সত্যি গহন আসছে ওর দিকে। চোখে মুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্যতা ফুটিয়ে রেখেছে। নিধির কেন যেন মনে হলো গহন রেগে আছে। তাও আবার ওর ওপরেই রেগে আছে। নিধির এসব ভাবনার মাঝে গহন গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমার নাকি শরীর খারাপ? ভার্সিটি যেতে পারোনি সেজন্য। বাড়ির কাজে হাত দিয়েছো কেন তাহলে?”
নিধি কেন যেন একটু ভয় পেল গহন এর কন্ঠ শুনে। নিধি তো মিথ্যে বলেছে গহন কে। এখন গহন যদি সেটা ধরে ফেলে তাহলে নিশ্চয়ই রেগে যাবে।
নিধির থেকে তৎক্ষণাৎ আশানুরূপ জবাব না পেয়ে গহন ফের গম্ভীর গলায় নিজের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলো। নিধি এবারে হালকা একটু তোতলালো। তবে কোন উত্তর দিতে পারল না।
নিধি টেবিল গোছাচ্ছিলো। হাতে একটা কাচের গ্লাস ছিল তখন ওর। গহন সেই গ্লাসটা নিধির হাত থেকে নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। কাচের গ্লাসটা ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেল। বেশ জোরে একটা শব্দ হলো। সেই শব্দ কেঁপে উঠল নিধি। আর্তনাদ করে বলল,
“আপনার আবার কি হলো?”
“আমি তোমাকে বলেছিলাম না পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে? তোমার কি মনে হয় সংসারের কাজ না করলে তোমার পেটে খাবার যাবে না? নাকি তোমার স্বামী অসন্তুষ্ট হয়ে তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে?”
নিধি মাথা নামিয়ে নিয়ে মিনমিনে গলায় বলল,
“শ্বশুরবাড়ির লোকজন অসন্তুষ্ট হয়ে ঠিকই বের করে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করবে।”
গহন এবারে হালকে একটু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“এত দিকে নজর রাখতে বলেছি তোমায় আমি? তোমার স্বামী সন্তুষ্ট কিনা সেদিকে খেয়াল রাখো। সারা পৃথিবীর লোকের সন্তুষ্টি অর্জনের ঠ্যাঁকা নিয়ে বসে নেই তুমি। বারবার করে আমি তোমায় বলে গিয়েছিলাম ঠিক সময় মত তৈরি হয়ে থেকো, গাড়ি পাঠাবো নিতে। আর তুমি এখানে বসে থেকে সংসারের কাজ করছো। তোমার স্বামীর তোমাকে সারা জীবন বসিয়ে খাওয়ানোর ক্ষমতা আছে নিধি। তাই এই বাড়িতে টিকে থাকার জন্য সবার সন্তুষ্টি অর্জন জরুরী না।”
গহনের এবারের চেঁচানোতে নিধি কেঁপে উঠলো। তবে এবারে মনে হলো কিছু বলা দরকার। কারণ নিধি বুঝতে পারছে গহন আসলে ওর ওপরে রাগ দেখাচ্ছেনা। রাগটা দেখাচ্ছে বাকিদের উপরে। তাহলে এখন যেহেতু রেগে আছে রাগটা তরতর করে বাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিধিকেই করতে হবে। যাকে বলে আগুনে ঘি ঢালতে হবে নিধিকে।
ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো সালমা বেগম কে ইশারায় দেখিয়ে বলল,
“আপনার মাকে জিজ্ঞেস করুন কেন আমি যেতে পারিনি। উনি ভাবিকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই কাজ করাচ্ছিলেন। কি বলে কাজ করাচ্ছিলেন জানেন? আমাদের দুজনের মাঝে নাকি খুব মিল সেজন্য আমি এতদিন ভাবির কাজ করেছি। আর এখন তাই আমার কাজ ভাবিকে করতে হবে। ওনার দামড়া ছেলেকে উনি কাপড় গুলো ছাদে শুকোতে দিতেও যেতে পাঠাতে পারেন না। আর ভাবিকে এই অবস্থায় উনি পাঠান সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে। আমি তো ওনার মতন অমানবিক না, নির্দয় না, পাষাণও না। আমার একটা মন আছে। যেতে পারিনি এই অবস্থায় ভাবিকে রেখে। আমি চলে গেলে গরুর মতন ওনাকে দিয়ে খাটাতো। এতদিন আপনাকে গাধা পেয়ে খাটিয়েছে। আর এখন আমাকে ফাঁদে ফেলে গরু বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
গহন সালমা বেগমকে আগেই একটা কথাও বলল না। ফের নিধিকে উদ্দেশ্য করেই রাগী গলায় বলল,
“তোমাকে তো আটকায়নি? তোমাকে এত সহৃদয়বান হতেও আমি বলিনি। যাদের ঝামেলা তারা বুঝে নিত। ঋতু তো মায়ের ছেলের বউ। মায়ের নাতি বা নাতনি ওর গর্ভে আছে। মায়ের ছেলের সন্তানকে জন্ম দেবে ঋতু। যতক্ষণ পর্যন্ত ঋতুর ওপর এই বংশের বংশধর জন্মানোর দায়িত্ব আছে কেউ কিচ্ছু হতে দেবে না ওর।”
নিধি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে রইল। গহন সেই একই কথা বলল যেগুলো ঋতু ওকে বলেছিল। তারমানে সবাই এই বাড়ির পরিস্থিতি সম্পর্কে, সবার উদ্দেশ্য, মন-মানসিকতা, কে কতদূর কি করতে পারে সবই জানে। শুধু নিধিই জানেনা।
নিধি কে শাসানো শেষে গহন এবারে সালমা বেগমের দিকে তাকালো। রাগারাগি করলো না। তবে পূর্বের মতন গম্ভীর গলাতে বলল,
“আর মা, বাড়িতে কি কাজের লোক রাখা হয়নি? এখন একজন আছে দরকার হলে আরো দশ জনকে রাখবে। টাকা যা লাগে আমি দেব। আমার টাকা দিতে সমস্যা নেই, তোমাদের লোক রাখতেই সমস্যা? আমার বউকে দিয়েও কাজ করাতে হবে না, সাবিতের বউকে দিয়েও কাজ করাতে হবে না। তোমাদের কারোরই কাজ করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি কি কখনো তোমাদেরকে বলেছি যে আমার বউকে বসিয়ে রেখে তোমরা কাজ করো? তাহলে কেন সবসময় ওকে দিয়ে খাটানোর মতন পরিস্থিতি তৈরি করো বলতে পারো? গতকাল রাতেই তোমার সাথে আমার এই নিয়ে পরিস্কার ভাবে কথা হয়ে গিয়েছিল।”
সালমা বেগম খ্যাঁক করে উঠে বললেন,
“অযথা আমার দোষ দিচ্ছ কেন? তোমার স্ত্রীকে দিয়ে না হয় কোন কাজ করানোর অধিকার আমি রাখি না। ও আমাকে নিজের শাশুড়ি হিসেবে মানেই না। কিন্তু আমার ছেলের বউকে দিয়ে তো কাজ করানোর অধিকার আমি রাখি। নাকি সেই অধিকারও এখন তোমরা কেড়ে নেবে আমার থেকে? ঋতুর তো কোন অসুবিধা হয় না আমার আদেশ পালন করতে। তোমার স্ত্রীর কেন এত অসুবিধা হয়?”
“তার কারণ ও বোকা। সেজন্য অসুবিধা হয়। যাইহোক, কে বোকা, কে চালাক, কে কোথায় কি ষড়যন্ত্র করছে এসব ব্যাপারে আমি কথা বলতেই চাই না। তোমরা সবাই জানো অশান্তি আমার অপছন্দ। আমি সেটা এড়িয়ে চলতে চাই। কিন্তু ঘুরে ফিরে তোমরা আমাকে সেই পথেই নিয়ে যাও। ঋতুকে দিয়েও যেন এসব কাজ করার কথা না ওঠে। এটাই আমার শেষ কথা মা। আমার কানে যেন আর এই কথাগুলো না আসে। আর নিধি তোমাকে বলছি।”
কথাটা বলে গহন নিধির দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। নিধি হালকা একটু কেঁপে উঠে ঠিকঠাক হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“জ্বী জ্বী বলুন। আমি শুনছি আপনার কথা।”
“কাল থেকে একদিনও যেন ক্লাস মিস না হয়।
কে কাকে দিয়ে কি কাজ করাচ্ছে, কার কি করতে অসুবিধা হবে সেইসব দেখার দায়িত্ব তোমার না। যদি তোমার কোন অসুবিধা হয় সেটা আমায় বলবে। রোজ রোজ কিন্তু আমার পক্ষে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখে বাড়িতে এসে পারিবারিক ঝামেলার সমাধান করা সম্ভব না। আমিও মানুষ।”
নিধি শুধু অসহায় মুখ করে তাকিয়ে রইল গহনের দিকে। গহনের আর কোনো কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। অফিসে একটা গুরিত্বপূর্ণ মিটিং আছে। সেজন্য আবার যেতে হবে অফিসে। দরজার দিকে পা বাড়াতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“তুমি কিন্তু আজ আবারও আমায় অপমান করলে গহন। তোমার স্ত্রীর সামনে আমায় ছোট করলে। তোমার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করা প্রত্যেকটা ছোট বড় বাক্যের পেছনে যে ইঙ্গিতে তুমি আমাকে অপমান করলে তা বুঝতে কিন্তু আমার বাকি নেই। সাবিত কিন্তু কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলেনা। কখনো ওর বউয়ের সামনে আমায় অপমান করে না।”
গহন থেমে গিয়ে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি সাবিত না মা। আবারো বলছি আমি সাবিত না। আর না আমি সাবিত হতে চাই। আমি আমার নিজের ক্ষেত্রে বরাবরই মেরুদণ্ডহীন ভাবে থেকেছি। তার কারণ আমার দায়বদ্ধতা ছিল বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমার স্ত্রীর ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডহীন ভাবে বেঁচে থাকার থেকে আমার কাছে মৃ’ত্যু অনেক বেশি সম্মানজনক। সাবিতের মতন মেরুদণ্ডহীন হতে পারব না। আর সব সময় ত্যাগ শুধু আমার পক্ষ থেকেই কেন করতে হবে বলতে পারো? কোন কিছু এক পাক্ষিক চলতে পারে না। ধৈর্যের সীমা সবারই থাকে। আমারটা হয়তো অতিক্রম করে গেছে।”
“এর আগে তো তোমার ধৈর্যের কোন সীমা ছিল না। কখনো সেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও ছিল না। সব পরিবর্তন কেন স্ত্রী আসার পরই হলো বলতে পারো আমায়?”
“তার কারণ আমার স্ত্রী আমাকে আমার ভালো-মন্দ বুঝতে শিখিয়েছে। ওই যে বললাম নিজের ক্ষেত্রে আমার মেরুদন্ড ছিল না। কিন্তু ও আমাকে মেরুদন্ড সোজা করে বাঁচতে শিখিয়েছে। সব সময় চুপ না থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের হয়ে কথা বলতে শিখিয়েছে। এই কথাটা তুমি একদমই ঠিক বলেছো মা। আমার স্ত্রী আসার পরে আমার জীবনের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আমার আচরণে পরিবর্তন ঘটেছে। আমার এখন মনে হয় এই পরিবর্তনটা অনেক আগে হওয়া উচিত ছিল। নিধির আমার জীবনে আরো আগে আসা উচিত ছিল।”
কথাটা বলে গহন চলে গেল। নিধির সাথেও আর কোন কথা বলল না। নিধিও আর পিছন থেকে ডাকলো না। কেননা জানে এখন গহনের মন মেজাজ সত্যিই খারাপ। নিধির উপরে রেগে নেই। আর রেগে থাকলেই বা কি। নিধির গহনের রাগ ভাঙাতে দুই মিনিট সময়ও লাগবে না। দু গালে দুটো চুমু খেয়ে দেবে অমনি গহন আইসক্রিমের মতন গলে যাবে। ছেলে মানুষের রাগ ভাঙানো খুব কঠিন কাজ নাকি! একেবারেই সহজ। পানির মতন সহজ।
_______
প্রথম দিন ভার্সিটিতে এসে ক্লাস করে দারুন লাগলো নিধির। আজকে ভার্সিটি আসার আগে কোন রকমের কোন অশান্তি হয়নি। সালমা বেগম কে খুঁজেই পায়নি নিধি। একবার ভেবেছিল জ্বালানোর জন্য হলেও আসার সময় বলে আসবে। তবে সালমা বেগম দরজাই খোলেনি। সকালের নাস্তাটা অব্দি করেনি।
নিধি বাইরে থেকে কত ডাকলো। অনুরোধও করেছিলো সালমা বেগমকে যেন ভার্সিটি যাওয়ার আগে অন্তত একবার ওনার মুখটা দেখতে দেন। না হলে নাকি নিধির দিনটাই ভালো কাটবে না। শান্তি পাবে না। তবে তারপরও সালমা বেগম দরজা খোলেননি। একটু গলা উঁচিয়ে কথাও বলেননি নিধির সাথে। শেষে নিধি অগত্যা বাধ্য হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে।
তবে দিনটা মোটেই খারাপ যায়নি নিধির। বেশ ভালো কেটেছে। তবে একটু অস্বস্তিও হয়েছে। বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হয়েছে নিধির ক্লাসে। তবে ওদের সাথে যে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে মিশতে পারবে না সেটা নিধি খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে। নিধিতো একটু সেকেলে। আর বাকিরা সবাই আধুনিক যুগের ঢং জানা মেয়ে। একেক জনের পোশাক দেখেই তো নিধির চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। আর নিধিতো গিয়েছিলো সালোয়ার কামিজ করে একেবারে বাড়ির বউ সেজে।
ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে নিধি দেখল গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে গহন দাড়িয়ে আছে। দূর থেকে গহনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠল। খেয়াল করলো একে একে সবাই যে যার গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছে। নিধিকেও পায়ে হেঁটে যেতে হবে না। ওর জন্যও গাড়ি এসেছে। আর শুধু তো গাড়ি আসেনি। নিধির ভালো জামাইও এসেছে। বাকিদের তো ড্রাইভাররা এসে নিয়ে যাচ্ছে।
নিধি দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকলো গহনের দিকে। ফর্সা মানুষটা নিজেকে একেবারে কালো পোশাক আশাকে ঢেকে এনেছে। কালো স্যুট বুট পরে একেবারে ফরমাল লুকে এসেছে। চোখে আবার কালো সানগ্লাসও ঝুলিয়ে রেখেছে। এতক্ষন গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দুহাত পকেটে গুজে রেখেছিল। চোখে মুখে প্রচন্ড বিরক্তিভাব ফুটে উঠেছে। কপালে ঘাম চিকচিক করছে। কয়েক সেকেন্ড পরপরই আবার সমানে ঘড়িতে সময় দেখছে। নিধি বুঝেই উঠতে পারছে না এত ঘনঘন ঘড়িতে সময় দেখার কি আছে।
তবে সে যাই হোক না কেন, দারুন লাগছে দেখতে লোকটাকে। মোটেই বাংলা সিনেমার হিরোর মত লাগছে না। হিন্দি সিনেমার হিরোর মতনও লাগছে না। নিধির কাছে তো গহনকে একেবারে হলিউডের কোন ড্যাশিং হিরোর মতন লাগছে। ভোলা ভালা লোকটাকে দেখলে বোঝাই যায় না যে এত স্টাইল মারতে পারে। নিধি তো খুবই সহজ সরল ভেবেছিল। কিন্তু এই লোকটা তো দারুণ ভাবভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে ওনার উদ্দেশ্যেই ভার্সিটির কয়েকটা তরুণ মেয়েকে পটানো।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই হুট করে নিধির ভালো মেজাজটা বিগড়ে গেল। কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। ভাবলো এই নিয়ে গহন কে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই হবে। কেন এভাবে এত ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে? যাওয়ার সময় তো নিশ্চয়ই মেয়েগুলো একবার করে দেখে গেছে। কে জানে কি কি ভেবেছে মনে মনে নিধি স্বামীকে নিয়ে।
কত আজেবাজে চিন্তাই না এসেছে! নিধির মনেই তো কত আজেবাজে চিন্তা আসছে গহন কে দেখে।
চোখ মুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে গহনের দিকে গেল। অনেকটা কাছাকাছি যেতেই গহন ওকে দেখতে পেল। পকেট থেকে এক হাত বের করে সানগ্লাসটা খুলে হাত বাড়িয়ে আবার নিধিকে ইশারাও দিল যে গহন টের পেয়েছে ওকে।
নিধি কাছাকাছি আসতেই গহন যেই না জিজ্ঞেস করতে যাবে যে, আজকের দিনটা কেমন কাটলো। তার আগে নিধি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এত ভাব মারছেন কেন? বউ কে নিতে এসেছেন, না লাইন মারতে এসেছেন? আমাকে দেখে তো বোঝা যাচ্ছে আমি বিবাহিত। কিন্তু আপনাকে দেখে তো বোঝা যাচ্ছে না।”
গহন কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“ভাব মারলাম কোথায়? আমি তো রোজ এভাবেই বের হই অফিসের জন্য।”
“কিন্তু এভাবে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে, সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চয় ভাব মারেন না। শুনুন, পিছনে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে ঘুরবেন যে আপনি বিবাহিত। আপনার বউ খুবই ভয়ানক। আপনার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালেও তার চোখ উপড়ে ফেলবে। আপনি আমার স্বামী, আমার সম্পদ, আমার মাল। বেশি তেরিবেরি করলে না ঘুষি মেরে পেট একদম ফাটিয়ে দেব।”
গহন এবারে মোটেও অপ্রস্তুত হলো না। বরং শব্দ করে হেসে উঠলো নিধির আজেবাজে কথা শুনে। গহনের হাসি থামতেই চাইল না। তবে গহন কে এভাবে হাসতে দেখে নিধি সবটা গুলিয়ে ফেলল। খুব করে চেষ্টা করলো অন্য দিকে তাকানোর। কেননা এখন কথাগুলো গুলিয়ে ফেললে চলবে না। নিধিকে গম্ভীর থাকতে হবে। রাগ দেখাতে হবে গহনের উপর। তবে পারলো না।
নিধি নিজের বেহায়া চোখ দুটো টেনে হিঁচড়েও অন্যদিকে সরাতে পারল না। সেগুলো আবার গহনের দিকেই তাকালো। কি সুন্দর করে হাসে মানুষটা! হাসলে যে কাউকে এত সুন্দর লাগে নিধি সত্যিই জানতো না। ভাগ্যিস গহন হাসলো। নয়তো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট একটা দৃশ্য নিধি উপভোগই করতে পারত না।
গহনের সে মাতাল করা হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘোরের মাঝে চলে গেল নিধি। নিজেকে হারিয়ে ফেলল যেন। হ্যাংলার মতন হা করে গহনের সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে বলে উঠলো,
“এভাবে হাসতে নেই গহন। আপনার বউয়ের বুকে ব্যথা হয়।”
গহনের হাসিটা এবারে সত্যিই থেমে গেল। নিধির দিকে তাকাতেই যেন বুঝে গেল যে নিধি হুঁশে নেই। গহন খেয়াল করলো নিধি ঘেমে গেছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে সযত্নে নিধির মুখের ঘাম মুছে দিতে দিতে বলল,
“আর তুমি যে রোজ আমার বুকে ব্যথা তুলে ছাড়ো। তার বিচার কে করবে?”
নিধি এবারও আনমনে বলে উঠলো,
“আপনি ভালোবেসে যে শাস্তি দেবেন আমি মাথা পেতে নেব।”
গহন আরেক দফা হেসে উঠল। আলতো করে নিধির গাল টেনে দিয়ে বলল,
“শুধু দেখতেই ছোট মানুষ মনে হয়। নয়তো এসব প্রেম ভালোবাসায় আমার ওস্তাদ তুমি। যাই হোক এখন চলো। রোদের মাঝে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। ক্ষুধা লেগেছে?”
নিধির ঘোর এখনও কাটেনি। এখনো গহনের দিকে সেই একই রকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধু উপর নিচ চুপচাপ মাথা নাড়লো।
গহন পাল্টা জিজ্ঞেস করলো,
"ডিম সিদ্ধ খাবে না ফুচকা খাবে? নাকি দুটোই খাবে?"
নিধি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
"এগুলোর একটাও খাব না। আপনাকে চুমু খাব।"
গহন কপাল কুঁচকে বলল,
"হঠাৎ চুমু খাওয়ার ইচ্ছে হলো কেন?"
"এসব ভয়ংকর ইচ্ছে হঠাৎ করেই মনের মাঝে জাগে। আর এসব ভয়ংকর ব্যাপার স্যাপার হঠাৎ করেই ঘটিয়ে ফেলতে হয়।"
গহনের বেশ ভালো লাগলো নিধির এই ইচ্ছেটা। প্রশ্রয় দিতে ইচ্ছে করলো। ফলস্বরূপ নিধির দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
"বেশ তো। তাহলে দেরি কিসের? আজ না হয় জনসম্মুখে ভালোবাসার আদান প্রদান হয়ে যাক।"
এবারে ধ্যান ভাঙল নিধির। এতক্ষণ কি উল্টোপাল্টা কথা বলেছে সেটা উপলব্ধি হতেই ছিটকে গহনের থেকে এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে তোঁতলানো গলায় বলল,
“কককি আজেবাজে কথা বলছেন? ঘরের ঘটনা বাইরে ঘটাতে যাব কেন? বাড়ি চলুন। স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে আপনার। যেখানে সেখানে যা তা করতে চান। অসভ্য লোক কোথাকার। মায়ের মতনই একেবারে নির্লজ্জ। চলুন।”
গহন কে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিধি আগে আগে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে বসলো। গহন কিছুক্ষণ একা একা হাসলো। তারপর একা একাই বিড়বিড় করে বলল,
“পুরোই পা’গল একটা মেয়ে।”