বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪৮

🟢

খাওয়া দাওয়া শেষ করে গহন গেল সালমা বেগমের ঘরে। সালমা বেগম তখন ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় গহন এলো সেখানে। আজকাল আর গহন কে দেখে সালম বেগমের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে না। তিনি চাইলেও হাসতে পারেন না। নিজের উপর জুলুম চালিয়েও নিজেকে হাসাতে পারেন না। তবে গহন এখনো সেই নিয়মটা বজায় রেখেছে। সালমা বেগম কে দেখলেই মিষ্টি করে একটু হাসে। মন থেকে হাসে।

“ভালো আছো মা? শরীর ঠিক আছে?”

সালমা বেগম গহনের প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর না দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“মন ম'রে গেলে শরীর নিয়ে আর কারই বা চিন্তা থাকে! জীবনটা অশান্তিতে অশান্তিতেই কেটে গেল। কারো থেকে না পেলাম ভালোবাসা, কারো থেকে না পেলাম সম্মান। এক ভরসা ছিল নিজের ছেলেমেয়েদের থেকে। তারা তো যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত, যে যার বউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমার শরীরের খোঁজ রেখে আর কি কাজ তোমাদের বলো?”

সালমা বেগম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে গহন কে কথাগুলো বললেন। গহন ওনার দুই বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বললেন,

“সংসার, বউ এরা নিজের জায়গায়। মা তার নিজের জায়গায়। সংসার, বউয়ের প্রভাব কখনো মায়ের উপরে পড়বে না। আর মায়ের প্রভাব কখনো সংসার, বউয়ের উপর পড়বে না। আর মায়ের খোঁজ খবর কি আমি রাখি না?”

“আগের মত না রাখো না। সকালে সেই যে বেরিয়ে যাও সারাদিন আর মায়ের কাছে কল করার প্রয়োজন মনে করো না। রাতে বাড়ি ফিরে সব কাজ সেরে তারপর আসো মায়ের সাথে দেখা করতে। আজকাল মায়ের মুখে মুখে তর্ক করো। প্রত্যেকটা কথায় মা কে ভুল প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লাগো। বউয়ের সামনে মা কে ছোট করো। বউয়ের হয়ে কথা বলো। পরিবর্তন তো অনেকটাই হয়েছে বাবা। এখন এই গহন আর শুধু আমার ছেলে নেই। কারো স্বামীও হয়ে গেছে।”

“তাহলে বোঝো মা একটু কি পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক না? এখন তো অন্য কারোর দায়িত্বও আমার উপর। আরেকজনের অধিকার রয়েছে আমার উপর। তার দিকটাও তো আমাকে দেখতে হবে, বুঝতে হবে। আমি তো অন্যায় ভাবে কখনো কাউকে দোষারোপ করি না মা, সেটা তুমিও জানো। নিধির অপরাধ থাকলে যেমন ওকে বলবো, তোমাদের অপরাধ থাকলে তোমাদের বলবো।”

আপাতত সালমা বেগমের গহনের এসব নীতিবাক্য শোনার ইচ্ছে হচ্ছে না। সেজন্য হাত উঠিয়ে গহনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

“বাদ দাও আপাতত এসব কথা। যেদিন বউয়ের দোষ দেখতে শিখবে সেদিন বরং এই নিয়ে আমার সাথে কথা বলতে এসো। কি বলতে এসেছিলে এখন সেটা বলো?”

গহন সাথে করে একটা ছোট্ট শপিং ব্যাগ এনেছিল। সেটা সালমা বেগমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এটা সিনথিয়া কে দিয়ে দিও।”

“কি আছে এতে?”

“ওর জন্য একটা নতুন ফোন কিনেছি। সেদিন তো ভেঙে দিয়েছিলাম। অনেক প্রয়োজনে তো লাগে ফোন। দিয়ে দিও ওকে।”

সালমা বেগম একটু সন্তুষ্ট হলেন গহনের আচরণে। সেদিন তো অসুস্থ ছিলেন বলে কিছু বলতে পারেননি। তখন এসব দিকে খেয়ালও ছিল না। তখন তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল যে তার ছেলে পর হয়ে যাচ্ছে। তবে পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে সময়ের অভাবে গহনের সাথে কথা বলা হয়নি। আলতো হেসে বললেন,

“তুমি দিয়ে দাও। ও খুশি হবে।”

“না মা তুমি দিও। আমি দিলে হয়তো ওর পছন্দ হবে না। আর এতক্ষণে হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছে। আমি গেলে বিরক্ত হবে।”

“না না ও ঘুমোইনি। ও তো পড়ছে। ও আমাকে বলেছে এবার পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করবে। তুমি যাও, গিয়ে দিয়ে এসো। ও খুশি হবে।”

সালমা বেগমের কথার দ্বিমত পোষণ করলো না আর গহন। ফোনটা নিয়ে গেল সিনথিয়ার ঘরে। ওর পিছন পিছন সালমা বেগমও গেল। সিনথিয়ার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে গহন থেমে গেল। পিছন ফিরে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুমি আগে যাও।”

সালমা বেগম মাথা নাড়িয়ে দরজাটা খুললেন। দরজাটা খুলতেই ভিতরের দৃশ্যটা দুজনের কাছেই দৃশ্যমান হলো। সিনথিয়া আয়েশী ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে ফোন চালাচ্ছে। তবে অবাক করার বিষয় হলো সিনথিয়ার কাছে তো ফোনটা থাকার কথা না। গহন ওর ফোনের যা অবস্থা করেছিল সেই ফোনটা তো আর ঠিক হওয়ার মতন অবস্থাতেই ছিল না। গহন প্রশ্নাত্মক গলায় সালমা বেগম কে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি ফোন কিনে দিয়েছো ওকে?”

“না তো। ও তো আমায় এই বিষয়ে কিছু বলতেই আসেনি। আমারও তেমন খেয়াল ছিল না।”

“তাহলে কোথায় পেল ফোন?”

সালমা বেগম যেন একটু একটু বুঝতে পারলেন। মুহূর্তের মাঝে ওনার মাথায় আ’গুন ধরে গেল। সরাসরি রুমের ভেতরে ঢুকে গিয়ে হিংস্র গলায় সিনথিয়া কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ফোন কোথায় পেলি তুই?”

সালমা বেগমের কন্ঠটা কানে যেতেই সিনথিয়া লাফ দিয়ে উঠে বসলো। সামনে নিজের মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখগুলো মার্বেলের আকার ধারণ করল। ভয়ে কন্ঠ মৃদু কাঁপলো।

“মমমা, তুমি এএখানে?”

সালমা বেগম ফের হিংস্র গলায় বললেন,

“তোকে আমি জিজ্ঞেস করেছি ফোন কোথা থেকে পেলি তুই?”

হাতে থাকে ফোনটা সিনথিয়া তাড়াহুড়ো করে নিজের পেছনে লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,

“এটাতো আমার ফোন না। আমার বান্ধবীর ফোন। আমি একদিনের জন্য ধার নিয়েছি।”

ততক্ষণে ঘরের ভেতরে গহনও এসেছে। সিনথিয়ার কথাটা গহনের একটু বিশ্বাস হলো। আবার একটু অবিশ্বাসও হলো। তবে আসল ব্যাপারটা গহন ধরতে না পারলেও সালমা বেগম তো ঠিকই বুঝলেন। পুনরায় হিংস্র গলায় বললেন,

“বান্ধবীর থেকে ধার নিয়েছিস না কোত্থেকে পেয়েছিস আমি জানিনা। আজ তো তোকে আমি।”

কথাটা বলে সালমা বেগম মেয়ের দিকে তেড়ে গেলেন। সিনথিয়া তাড়াহুড়ো করে অন্য পাশ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে এসে গহনের পেছনে দাঁড়ালো নিজেকে মায়ের থেকে আড়াল করার জন্য। সালমা বেগম সিনথিয়া কে শাসিয়ে বললেন,

“বেরিয়ে আয় বলছি। তোর ফোনের নেশা আজ আমি বের করে ছাড়বো। বেরিয়ে আয় বলছি।”

ভয়ে সিনথিয়া থরথর করে কাঁপছে। দুহাতে গহনের বাহু খামচে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“ভাইয়া বাঁচাও।”

গহন কিছু বলে উঠতে ধরলে সালমা বেগম গহনকে শাসিয়ে বললেন,

“তুমি একদম চুপ করে থাকবে গহন। ওকে আজ আমার হাতে থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আর ওর জন্য যে ফোন এনেছো ওটা নিয়ে যাও। ওকে ফোন ছাড়াই বাঁচতে শিখতে হবে। অন্তত বিয়ের আগে পর্যন্ত।”

কথাটা বলে সালমা বেগম এগিয়ে গিয়ে গহনের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সিনথিয়ার একটা হাত খামচে ধরলেন। ভয়ে সিনথিয়া এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো। অন্য হাতে গহনের বাহু খামচে ধরলো। গহনের থেকে সাহায্য চাইলো।

“ভাইয়া বাঁচাও। মা মা'রবে আমায়।”

এত চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে নিধি আর ঋতুও ছুটে এলো। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখে দুজনেই তাজ্জব বনে গেল। গহন অনেক চেষ্টা করে সালমা বেগমের থেকে সিনথিয়ার হাতটা ছাড়িয়ে ওকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল,

“কি হচ্ছে এসব মা? এত বড় মেয়ের গায়ে তুমি এখন হাত তুলবে? আমায় কথা বলতে দাও। তুমি যাও এখান থেকে।”

“আমি এখান থেকে গেলে হবে না গহন। তুমি বুঝতে পারছো না ও আমাকে ছাড়া কাউকে দেখে ভয় করে না। আমাকে সামলাতে দাও।”

গহন এবারে মৃদু রাগী গলায় বলল,

“বললাম তো আমি সব সামলে নেব। আমি কথা বলছি ওর সাথে। তুমি এখন এখান থেকে যাও।”

সালমা বেগম আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন পূর্বের থেকেও বেশি রাগী গলায় বলল,

“বললাম তো আমি তোমায় এখান থেকে চলে যেতে। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাও। আমি কথা বলছি ওর সাথে।”

থেমে গেলেন সালমা বেগম। যাওয়ার আগে এমন হিংস্র দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন যে সিনথিয়া ভয়ে কুকড়ে গেল। উনি ইশারায় হুমকি দিলেন সিনথিয়াকে যে গহন চলে যাওয়ার পর কে ওকে বাঁচায় উনি দেখবেন।

সালমা বেগম এর পিছন পিছন ঋতু আর নিধিও চলে গেল সেখান থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে।

গহন সিনথিয়া কে ধরে বিছানার উপর বসালো। বেড সাইডের উপর থেকে পানির গ্লাস এনে নিজেই পানি খাইয়ে দিল সিনথিয়া কে। গ্লাসটা আবার পূর্বের জায়গায় রেখে এসে নিজেও সিনথিয়ার পাশে বসলো। মেয়েটা ভয়ে এখনো কাঁপছে আর কাঁদছে। গহন সিনথিয়ার চোখের জল মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“এখনো কাঁদছো কেন? মা চলে গেছে তো। আর আসবেনা।”

সিনথিয়া ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“তুমি চলে গেলে আবার আসবে। আমাকে মা'র'বে আমি নিশ্চিত। তুমি যেও না ভাইয়া।”

গহন সিনথিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফের আদুরে গলায় বলল,

“আসবে না। মা'রবেও না। আমি কথা বলবো মায়ের সাথে। কিন্তু তার আগে তুমি আমায় বলো তো এই ফোনটা কার? কোত্থেকে এনেছো?”

সিনথিয়া চটজলদি কোন উত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,

“আমার একটা বান্ধবীর থেকে নিয়ে এসেছি। আসলে কলেজের একটা অনুষ্ঠানে আমি নাচে নাম দিয়েছি। ইউটিউবে ভিডিও দেখে রিহার্সাল করবো জন্য ওর ফোনটা নিয়ে এসেছি। সত্যি বলছি ভাইয়া এটা আমার বান্ধবীর ফোন।”

সিনথিয়া এত সুন্দর ভাবে মিথ্যেটা বলল যে গহন না বিশ্বাস করে থাকতে পারলো না। ও নিজের সঙ্গে যে ফোনটা এনেছিল সেটা সিনথিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“বান্ধবীর ফোন ওকে কাল দিয়ে এসো। এই নাও তোমার জন্য একটা নতুন ফোন কিনেছি। কালই এনেছিলাম কিন্তু দেওয়ার কথা মনে ছিল না।”

সিনথিয়া নতুন ফোনটার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“আমার জন্য নতুন ফোন এনেছো তুমি!”

“সেদিন রাগের মাথায় ভেঙে ফেলেছিলাম। তো পরে মনে হলো তুমি তো বড় হয়েছো। প্রয়োজন হতেই পারে।”

নতুন ফোনের দিকে তাকিয়ে খুশিতে সিনথিয়ার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো। মুহূর্তের মাঝে সব মন খারাপ দূর হয়ে গেল। খুশিতে লাফিয়ে উঠে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“থ্যাংকস ভাইয়া। তুমি অনেক ভালো। আমি ছোট ভাইয়াকে বলেছিলাম আমায় একটা ফোন কিনে দিতে। কিন্তু ও তো আমার কথা কানেই তুললো না। আপু কেও বলেছিলাম। মাকে তো ভয়ে বলতেই পারিনি। কেউ দেয়নি শুধু তুমি দিলে, তাও না বলতেই। অনেক অনেক অনেক গুলো থ্যাংকস। তুমি সব থেকে ভালো ভাইয়া।”

সিনথিয়ার প্রতি জমে থাকা এতদিনের সমস্ত অভিযোগ, অভিমান নিমিষের মাঝে উধাও হয়ে গেল ওর মুখের হাসিটা দেখে। এই যে সিনথিয়া গহন কে বলল যে ও সব থেকে ভালো ভাইয়া এতোটুকুই গহনের পুরো দিনটা যেন ভালো করে দিল। গহন জানেনা সিনথিয়া এই কথাটা মন থেকে বলেছে কিনা। তবে বলেছে যে এতোটুকুই যথেষ্ট। এতটুকু বলার মতনও তো কেউ নেই।

বিজ্ঞাপন

আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে সালমা বেগম যে মা'রবে না সিনথিয়া কে এই নিশ্চয়তা দিয়ে গহন উঠে দাঁড়ালো বেরিয়ে আসার জন্য। দরজার কাছাকাছি আসতেই সিনথিয়া একবার ডেকে উঠল ভাইয়া বলে। গহন দাঁড়ালো। পিছন ফিরে তাকিয়ে ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,

“আর কিছু লাগবে?”

সিনথিয়া পিলপিল পায়ে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কিঞ্চিত অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“আরেকটা কথা বলার ছিল তোমায় ভাইয়া।”

গহনা অভয় দিয়ে বলল,

“হ্যাঁ বলো। কিছু হয়েছে?”

সিনথিয়া শুষ্ক ঠোঁটটা জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বলল,

“আমি এই বিয়েটা করব না ভাইয়া। তুমি একটু মা কে বোঝাও না। মা উঠে পড়ে লেগেছে বিয়েটা দেওয়ার জন্য। আমি এত করে বলছি আমি বিয়ে করবো না, শুনছেই না আমার কথা।”

“কিন্তু কেন করবে না? শুনলাম ছেলে ভালো, ছেলের পরিবার ভালো। সবকিছু ঠিক থাকলে করে নাও বিয়েটা।”

সিনথিয়া তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না ভাইয়া। এখন আমি কোনমতেই বিয়ে করব না। আমি আগে পড়াশোনা শেষ করতে চাই। তারপরে চাকরি করবো। এত তাড়াতাড়ি কেন আমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো? আমি আরো কিছুদিন তোমাদের সাথে থাকতে চাই। প্লিজ ভাইয়া মাকে বোঝাও না। তুমি ছাড়া কেউ বোঝাতে পারবে না মাকে। তোমার একমাত্র ছোট বোন আমি। আমার জন্য তোমাকে এতোটুকু করতেই হবে। কথা দাও আমায় তুমি করবে?”

সিনথিয়ার প্রচন্ড জোড়াজুড়ি করলো। গহন পড়লো মহা বিপদে। ভেবেছিল এই বিয়েটা নিয়ে আর কোন কথাই বলবে না। এদিকে সিনথিয়া আবার এভাবে জোড়াজুড়ি করছে। শেষে সিনথিয়ার জোড়াজুড়ির কাছে হার মানতেই হলো গহনকে। ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি কথা বলব মায়ের সাথে।”

সিনথিয়া আরেক দফা খুশিতে লাফিয়ে উঠে দুহাতে গহন কে জড়িয়ে ধরে বলল,

“তুমি সত্যিই খুব ভালো। থ্যাংক ইউ সো মাচ ভাইয়া।”

গহন হাসলো। খুশিও হলো সেই সাথে। আবার একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেললো। আসলে কারো থেকে কিছু পাওয়ার আশা করতে গেলে তাকে বিনিময়ে কিছু দিতেই হয়। খালি হাতে কিছুই পাওয়া যায় না।

__________

“কি কান পড়া দিলো আপনার বোন?”

নিধির কথাটা শুনে গহন একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“কান পড়া কি?”

“যা দিয়েছে আপনার বোন সেটাই।”

“আমাকে কিছু দেয়নি। আমি বরং ওকে ফোন দিয়ে এলাম।”

নিধি এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আরে শিক্ষিত ইংরেজের বাচ্চা, আঞ্চলিক ভাষা জানেন না? কানপড়া মানে বোঝাতে চাইছি কি কুমন্ত্রণা দিয়েছে আপনাকে? এখন কুমন্ত্রণার ইংরেজি আমি জানিনা।”

গহন দ্বিতীয় দফা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“না, কোন কুমন্ত্রণা দেয়নি। আর তাছাড়া তোমার স্বামী তো এখন ভালো হয়ে গেছে। কেউ কুমন্ত্রণা দিলেও লাভ হবে না।”

নিধি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,

“পুরুষ মানুষের কোন বিশ্বাস নেই। এরা সবদিক সামলাতে গিয়ে সব সময় সবকিছু ঘেঁটেই ফেলে। অবশ্য আপনাদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। বউ আর মায়ের চক্করে সব সময় তো আপনাদের মত নির্দোষ মালগুলোই ফেঁসে যায়।”

গহন বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“মাল কি? এসব কোন ধরনের ভাষা? তুমি একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এসব বাজে শব্দ কেন ব্যবহার করো?”

নিধি বেশ গাছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“মাল মানে মাল। মাল মানে আপনারা পুরুষজাতি। সে যাই হোক আপনাকে এখন এই মাল বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। এত বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারবো না। ঘুম পেয়েছে। আমি ঘুমোলাম। আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন। শুধু ল্যাপটপ নিয়ে বসবেন না।”

কথাটা বলে নিধি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লো। নিধির সত্যি প্রচন্ড ঘুম পেয়েছে। চোখটা বন্ধ করার পর এক সেকেন্ডও যেন সময় লাগবে না ঘুমিয়ে যেতে। হঠাৎ করেই ঘাড়ে কারো তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করলো। সেই সাথে খেয়াল করল কেউ যেন নিধির কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের দিকে টানছে। নিধির এতটাই বেশি ঘুম পেয়েছে যে চোখটা খুলে যে জিজ্ঞেস করবে গহনকে, যে সমস্যা কি। সেটাও করতে পারছে না।

এদিকে গহন নিধিকে নিজের দিকে টানছে তো টানছেই। আর জায়গা নেই কাছে যাওয়ার তবুও টানছে। নিধি অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“এত যে টানছেন, কাছে যাওয়ার মতন আর জায়গা কোথায়? বুক চিরে কি এখন ভিতরে ঢুকে যাব?”

নিধির রুষ্ট কণ্ঠের প্রেক্ষিতে গহন আলতো হেসে বলল,

“পারলে তাই করতাম। কিন্তু সেটা তো পারব না। তাই কাছে টানছি। কি করবো বলো তোমাকে যতই কাছে টেনে নেই না কেন তাও মন ভরে না। মনে হয় আরেকটু কাছে টেনে নেই।”

অন্যান্য সময় হলে নিধি হয়ত একটু লজ্জা পেতো। মনের মাঝে হয়তো প্রজাপতি উড়তো। এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। তবে এখন তেমন কিছুই হলো না। বরং নিধি গহনের দিকে ঘুরে শুয়ে দুই হাতে গহনের গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে বলল,

“এখন পাল্টা আমায় জড়িয়ে ধরুন। তাহলেই মনে হবে বুকের মধ্যে ঢুকে গেছি। আর এখন এসব টানাটানি বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। যা করতে চাইছেন সেটা আজ হবে না। না প্রত্যেকদিন রাতে আপনার অত্যাচার সহ্য করতে পারবো, না সকাল সকাল উঠে ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে পারব। চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতন ঘুমিয়ে পড়ুন।”

গহন দুই হাতে নিধিকে পাল্টা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিধির গালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বলল,

“আমি তো অত্যাচার করি না। আমিতো শুধু একটু ভালোবাসি। আর ঠান্ডা পানিতে অসুবিধা হলে গরম পানি দিয়েও গোসল করা যায়।”

নিধি গহনের গলা ছেড়ে দিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“তার মানে সত্যি সত্যি আপনার উদ্দেশ্য খারাপ? আজ এসব কোনমতেই হবে না। আমি ভীষণ ক্লান্ত। আপনার কি লজ্জা করে না প্রত্যেকদিন রাতে ছোট্ট একটা মেয়ের ওপর অত্যাচার করতে চলে আসেন? ছিঃ গহন। ধিক্কার জানাই আপনাকে।”

গহন তৃতীয় বারের মতন শব্দ করে হেসে উঠলো। এবারে হাসির শব্দটা আগের দুইবারের তুলনায় আরেকটু বেশি হলো। নিধির মাথাটা শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,

“তুমি শুধু আমার কাছে থেকে গেলেই হবে। আর কিচ্ছু চাই না। তোমার থেকে একটু ভালোবাসা পেলেই আমার চলবে নিধি। বেশি কিছু আমি আশা করি না। এই অল্পটুকুও কারো থেকে আশা করতাম না। শুধু তোমার থেকে করি। তুমি ঘুমোও। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”

নিধি আর পাল্টা একটা কথাও বলল না। নিজেও দু হাতে শক্ত করে গহনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো। খুবই তাড়াতাড়ি ঘুম চলে এলো নিধির চোখে। শান্তি আর স্বস্তির ঘুম। এর আগে নিধির কক্ষনো এত ভালো ঘুম হয়নি। কেননা এই পৃথিবীর সব থেকে প্রিয়, সব থেকে নিরাপদ জায়গায় নিধি ঘুমোচ্ছে।

________

আজ গোটা দিনটা নিধির বেশ নিরামিষ ভাবে কাটলো। সারাদিনে করার মতো তেমন কিছুই ছিল না। কারো সাথে আজ কোন ঝগড়া ঝামেলাও হয়নি। যে যার মতন থেকেছে। গহনও আজকাল কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। বউকে দেয়ার মতন তার কাছে সময়ই নেই। নিধিও বোঝে যে গহনের কাজের চাপ বেশি। সেজন্য আর আগে আগে কল করে বিরক্ত করে না গহনকে।

নিধির নিস্তেজ হয়ে থাকা শরীর আর মন দুটোই ফুরফুরে হয়ে ওঠে রাতে গহন ফেরার পর। নিধির সেই মনটা আরও বেশি ফুরফুরে হয়ে গেল যখন গহন মনে করিয়ে দিল যে আগামী কাল থেকে ওর ভার্সিটি শুরু হবে।

পড়াশোনা বিষয়টা যে নিধির কতটা ভালো লাগে সেটা কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। তবে মধ্যে পড়াশোনা না করার জেদ উঠে গিয়েছিল৷ তবে সেই জেদটা এখন কেটে গেছে।

গহন তখন সবে মাত্র জামা কাপড় বদলে এসে বিছানায় বসেছে। ওমনি নিধি ধপ করে এসে গহনের সামনে বসে পরলো।

“আচ্ছা আপনি আমাকে ভার্সিটিতে রাখতে যাবেন?”

“আমার তো যাওয়ার ইচ্ছে আছে। তোমার অসুবিধা হলে যাব না।”

নিধি তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,

“আরে না না। অসুবিধা কেন হবে?”

গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভঙ্গিতে বলল,

“বলা যায় না হতেই পারে অসুবিধা। তুমি তো আমায় বুড়ো বলো। এখন এত বয়স্ক স্বামীকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে অসুবিধা হতেই পারে।”

গহন কথাটা বলতেই নিধি ওর পেটে হালকা করে একটা ঘুসি মেরে বলল,

“আরে ধুর। কোন অসুবিধা হবে না আমার। আপনার মতন স্বামী কজনই বা পায় বলুন। আমি তাও পেয়েছি। আর পরিচয় করিয়ে দেবো না! আচ্ছা আমরা কি আপনার গাড়িতে যাব?”

“হ্যাঁ। গাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়ার অভ্যাস নেই আমার।”

নিধি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তাহলে তো আরো ভালো হবে। এতদিন হেঁটে হেটে স্কুল-কলেজে গেছি। এবার থেকে আপনার বড় গাড়িতে করে যাব। ব্যাপারটাই আলাদা। ইস আমার কি যে খুশি লাগছে বোঝাতে পারবো না আপনাকে। পড়াশোনা করতে আমার খুব ভালো লাগে। খুব মানে খুবই ভালো লাগে। আপনার পরে আমি পড়াশোনা কে ভালোবাসি।”

“যাক, তাও আমি তালিকায় প্রথমে আছি এটা শুনে ভালো লাগলো। এটা শুনেও ভালো লাগলো যে তুমি ভালোবাসো আমায়।”

গহনের মুখে শেষোক্ত বাক্যটা শুনতেই নিধির মুখে হালকা একটু লজ্জার আভা ফুটে উঠলো। তবে একা একা লজ্জা পেলে চলবে নাকি! গহনকেও তো লজ্জা দিতে হবে। নিধি দুহাতে গহনের গাল টেনে ধরে বলল,

“এত মিষ্টি একটা মানুষকে ভালো না বেসে থাকা যায় নাকি! আপনাকে দেখলেই তো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। ইস! কত ভালো আপনি। আপনার নাকটা কি সুন্দর, চোখ দুটো কি সুন্দর মায়াবী, ঠোঁট দুটো কি মিষ্টি, গাল দুটো একেবারে রসে ভেজা মিষ্টির মতন টসটস করছে। আপনাকে দেখলেই মনে হয় খেয়ে ফেলি।”

নিধি তো নিশ্চিত ছিল যে গহন লজ্জায় একেবারে নেতিয়ে যাবে। হয়তো উঠে এখান থেকে পালাবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। অবিশ্বাস্যভাবে গহনের অভিব্যক্তি বেশ স্বাভাবিক। নিধির দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল,

“তো খেয়ে ফেলো। নাক আছে, কপাল আছে, গাল আছে। এগুলো পছন্দ না হলে ঠোঁটও আছে। আমি কি নিষেধ করেছি নাকি! এসব তোমারই তো।”

গহন কথাটা বলার সাথে সাথে নিধি তড়িৎ গতিতে ওর গাল দুটো ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গিয়ে তোতলানো গলায় বলল,

“ছিঃ। আপনি কেমন যেন। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। আমি থাকবোই না আপনার সাথে। আপনার সাথে থাকলে আমিও নোংরা হয়ে যাব। আমি খাবার গরম করতে যাই। আপনি থাকুন।”

কথাটা বলে নিধি তড়িঘড়ি করে উঠে চলে গেল। গহন ডাকলো পিছন থেকে তবে সাড়া শব্দ পেল না। গহন আজ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারলো এই মেয়ের দৌড় কতটুকু। এই মেয়েকে লজ্জায় ফেলা কোন ব্যাপারই না।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প