বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৫১

🟢

সকালে ঘুম থেকে উঠে আজকেও নিধি গহনকে নিজের পাশে পেল না। ঘড়িতে সময় দেখল সবে মাত্র সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। কিন্তু কথা হলো এত তাড়াতাড়ি কোথায় গেলে মানুষটা। আজ তো ছুটির দিন। অফিস যাওয়ার তো কথা না।

নিধির মাথা কাজ করছে না এটা ভেবে যে মানুষটা সকাল-সকাল গেল কোথায়। ভাবলো কল করবে। নিধি ফোনটা হাতে নিয়ে গহনকে কল করার জন্য উদ্যতও হলো। তার আগেই চোখে পড়লো গহনের একটা মেসেজ।

❝একটা দরকারি কাজ ছিল। তাই অফিসে আসতে হয়েছে। তুমি ঘুমােচ্ছিলে তাই বিরক্ত করিনি। চিন্তা করার দরকার নেই আমি খেয়ে নেব। আজ সারাদিন একটু ব্যস্ত থাকবো। কল করার হয়তো সময় পাবো না। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে মেসেজ দিয়ে রেখো।❞

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিধি মেসেজটা পড়ে। নিধি খুব ভালো করেই জানে মানুষটা যতই বলুক না কেন তবুও কিছু খাবে না। ক্ষুধা লাগলেও খাবে না। ক্ষুধা তে ম'রে গেলেও খাবেনা। তবে কিছু করার নেই। আজ সারাদিন তো ব্যস্ত থাকবে নাকি গহন। অফিসে গেলেও হয়তো নাগাল পাবে না। তাই ভাবলো রান্না করে দুপুরে পাঠিয়ে দেবে খাবার।

নিধি ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের দিকে যেতে ধরলে হঠাৎই চোখে পড়ল সালমা বেগমের ঘর থেকে ঋতু বেরোচ্ছে। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে চলে গেল ঋতু্। বোধহয় কাঁদছিল। ব্যাপারটা মোটেই সুবিধার লাগলো না নিধির। সালমা বেগম তো মানুষটা একেবারেই ভালো না। তার ওপর ঋতুকে যেভাবে শাসায়। কে জানে আজ আবার কি বলল।

এত চিন্তা আর কৌতূহল নিয়ে থাকতে পারলো না নিধি। ভাবলো একবার ঋতুর ঘরে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে।

দরজাটা খোলাই আছে। দরজার কাছে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর থেকে ঋতুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো নিধির কানে। উঁকি দিতেই দেখলো সাবিত নেই। যেহেতু বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় নেই তার মানে বাড়িতেও নেই। নিধি আর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে এলো। ঋতু তখন বিছানায় বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। নিধি তাড়াহুড়ো করে এসে ওর পাশে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন? আরে কেঁদো না। এই সময় তোমার এত কান্নাকাটি করা ঠিক না।”

ঋতু একবার চোখ তুলে তাকালো নিধির দিকে। কান্নার বেগ আরো বাড়লো। নিধি ভ্যাবাচ্যাকা খেল। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঋতুর চোখের জল মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“কি হয়েছে ভাবি আমায় বলো। মা কিছু বলেছে? গায়ে হাত তুলেছে নাকি আবার? তুমি না বলো আমি তোমার ছোট বোনের মতন। তাহলে বলো আমায় কি হয়েছে। তুমি একবার শুধু বলো যে ওই মহিলা তোমার গায়ে হাত তুলেছে। তারপর ওনার ব্যবস্থা আমি করছি। সোজা তোমায় নিয়ে থানায় যাব।”

নিধির থেকে একটু ভরসা আর আহ্লাদ পেতেই ঋতুর কান্নার বেগ কয়েকগুণ বাড়লো। ডুকরে কেঁদে উঠে দুই হাতে নিধিকে জড়িয়ে ধরলো। নিধিও পাল্টা ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ আগে কাঁদতে দিল ঋতুকে।

প্রাণ ভরে কাঁদলো ঋতু নিধিকে জড়িয়ে ধরে। হাউমাউ করে কাঁদলো। ওর কাঁদার ভঙ্গিটা দেখেই যে কেউ বুঝতে পারবে মেয়েটা ঠিক কতটা অসহায়।

বেশ অনেকটা সময় ধরে কাঁদার পর অবশেষে ঋতুর কান্নার বেগ একটু কমলো। ঋতুর কান্না কমতেই নিধি নিজের থেকে ওকে ছাড়িয়ে দুহাতে আবার সযত্নে ঋতুর চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,

“কি হয়েছে আমায় বলো? কে কি বলেছে?আমি কথা দিচ্ছি সাহায্য করবো তোমায়।”

ঋতু নিধির হাত দুটো খামচে ধরে অনুনয়ের স্বরে বলল,

“আমার সংসারটা বাঁচিয়ে দেবে নিধি! আমি তোমার পায়ে ধরছি আমার সংসারটা শুধু বাঁচিয়ে দাও। আমি জানিনা তুমি কেন এই সংসারে এত কিছু সহ্য করে পড়ে আছো। আমি জানিনা তোমার কতটা অসহায়ত্ব। তবে আমি খুবই অসহায়। আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমি বাঁচি বা ম’রি আমাকে এই সংসারটাই করতে হবে নিধি। দোহাই লাগে বাঁচিয়ে দাও আমার সংসারটা।”

“কিন্তু হয়েছেটা কি তোমার সংসারের সেটা তো বলতে হবে।”

ঋতু আরেক দফা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“সাবিত অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে নিধি। ওদের সম্পর্কটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমি অনেক দিন থেকেই সন্দেহ করছিলাম। কিন্তু গতকাল রাতে নিশ্চিত হয়েছি। ও এখন ওই মেয়েটার জন্য আমায় তালাক দিয়ে দেবে নিধি। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আমি থাকতে পারবো না ওকে ছাড়া। আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চাটার কি হবে? কিছু একটা করো নিধি।”

নিধি বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“উনি পরকীয়ায় জড়িয়েছেন! সত্যি বলছো? তুমি নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ নিধি আমি নিশ্চিত। আমি মেসেজ দেখেছি। দুজনের একসাথে ছবিও দেখেছি। জানো, এই কথাটা বলেছি বলে ও এই অবস্থাতেও কাল রাতে আমার গায়ে হাত তুলেছে। দেখবে? এই দেখো।”

কথাটা বলে ঋতু নিজের গা থেকে ওড়নাটা সরিয়ে জামাটা একটু তুলে বুকের কাছের ক্ষতস্থানটা দেখালো৷ দেখে মনে হচ্ছে যেন সাবিত নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে জায়গাটা খামচে ধরেছিল। নখের দাগ বসে গেছে। ঘা এখনো শুকােয়নি।

শুধু এতোটুকুই না নিজের কব্জির কাছটাও দেখালো ঋতু। সাবিত এত শক্ত করে ওর কব্জিটা চেপে ধরেছিল যে সেখানেও জখম হয়ে আছে।

নিধি আঁৎকে উঠলো ঋতুর ক্ষত গুলো দেখে। সাবিত আদৌও মানুষ নাকি জা'নো'য়া'র সেটাই বুঝতে পারছে না। নিজের অন্তঃসত্তা স্ত্রীর ওপর কেউ এভাবে শারীরিক নির্যাতন করে! শুধু তো শারীরিক নির্যাতন না, মানসিক নির্যাতনও করছে।

“ওই জা’নো’য়া’র এত মা’রে তোমায়!”

ঋতু অসহায় গলায় বলল,

“আমার পুরো শরীর জুড়ে শুধু ক্ষতরই দাগ নিধি। মাঝে কিছুদিন কমেছিল ওর অত্যাচার। কিন্তু আবারো বাড়ছে। আমি যে প্রেগন্যান্ট ওর এই বিষয়টাও খেয়াল থাকে না। আর পারছিনা নিধি এসব সহ্য করতে। গলায় দড়ি দিয়ে যে ম’রবো তারও কোন উপায় নেই। আমার বাচ্চাটার তো কোন দোষ নেই। আমার জন্য ও কেন ম’র’বে। আমার গলায় যে কাঁটাটা বিধেছে না পারছি গিলতে না পারছি ওগলাতে। এমন জীবন যেন কেউ না পায়।”

কথাটা বলে ঋতু আবারও কেঁদে উঠলো। নিধি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“আচ্ছা চিন্তা করো না আমি দেখছি। কিন্তু তুমি ওনার মায়ের সাথে কথা বলোনি?”

ঋতু তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“উনি মা না নিধি। মায়েরা কখনো এমন হতেই পারে না। উনি হলেন শয়তানের বংশধর। শয়তানের আরেক রূপের নাম সালমা। আমি তোমায় একটা সত্যি কথা বলি, উনি শুধু পারেনই একটা কাজ করতে। সেটা হলো কিভাবে ভাইয়ার জীবনে অশান্তি তৈরি করা যায়, কিভাবে ভাইয়ার জীবনটা ধ্বংস করা যায়। এই ব্যতীত উনি আর কিছুই পারেন না। উনি ওনার ছেলে মেয়েদের শুধু একটা জিনিসই শিখিয়েছেন যে গহন তোদের সৎ ভাই। ওকে সম্মান দেওয়ার দরকার নেই। ওকে ভালোবাসারও দরকার নেই। শুধু যা পাবি ওর থেকে ছিনিয়ে নিবি। আর বাকি রইল বাড়ির বউ। মানুষ কুকুর বিড়ালকে যে সম্মানটা দেয় উনি বাড়ির বউদের কে সেই সম্মানটাও দেয় না। নিজে যা অনুভব করেছেন, নিজে যেভাবে দিন কাটিয়েছেন সেভাবে আমাদের কেও রাখতে চায়। পৃথিবীতে অনেক মানুষ দেখেছি তবে ওনার মতন দেখিনি। ওনার মতন পশু আমি দুটো দেখিনি। বিশ্বাস করো মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ওনাকে মে’রে নিজেও ম’রি। কিন্তু আমি তো তোমার মতন এত সাহসী না। তাই করতেও পারিনা। তুমি আমার একটা ইচ্ছে একটু পূরণ করে দেবে নিধি?”

নিধি মৃদু কম্পিত গলায় বলল,

“কি ইচ্ছে?”

ঋতু আবারো নিধির দুহাত খামচে ধরে বলল,

“সাবিতের মা কে মে’রে ফেলো। আমি জানি নিধি তুমি পারবে। তুমি খুব সাহসী। তোমার পাশে ভাইয়াও আছে। ভাইয়া সবটা সামলে নেবে দেখো। তুমি শুধু ওনাকে মে’রে ফেলো। তোমার জীবনটাও শান্তিতে ভরে উঠবে, আমার জীবনটাও। উনি সব নষ্টের মূল। সাবিত কে নিয়ে আমি দুদিন আগে একটু ওনার মুখে মুখে তর্ক করেছিলাম জন্য উনি আর এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বললেন না। বরং আমার সামনে ওনার ছেলেকে উস্কানি দিয়েছেন। উনি স্পষ্ট ওনার ছেলেকে বলে দিয়েছেন যে ওনার ছেলের যা পছন্দ, যাকে পছন্দ তাকে নিয়ে যেন থাকে। ওনার পূর্ণ সমর্থন আছে এতে।”

ঋতু কথাটা বলার সাথে সাথে নিধি নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কি যা তা বলছো? পাগল হয়ে গেছো নাকি? মানছি উনি সুবিধার না তাই বলে খু’ন করবো কেন? আমি খু’নি না। আর তাছাড়া যে যেমনই হোক তা বলে তাকে খু’ন করবে এটা কোন সমাধান না। তুমি শান্ত হও। আমি গহনের সাথে কথা বলবো।”

ঋতু মানলো না নিধির কথা। পুনরায় বলল,

“তুমি বুঝতে পারছ না কেন, উনি বেঁচে থাকলে আমরা কেউ শান্তিতে থাকতে পারবো না। উনি তো শুধু আমাদের জীবন নষ্ট করছেন না। উনি ভালো করতে গিয়ে ওনার নিজের মেয়েদের জীবনও নষ্ট করে দিচ্ছেন। উনি যদি শম্পাকে একটু শাসন করতো শম্পা নিজের শ্বশুর বাড়িতে ভালো করে সংসার করতে পারতো। আমি জানিনা সিনথিয়া কোথায় কি করে বেড়ায়। তবে ওর সংসারও সুখের হবে না ওই মহিলার জন্য। আমি তোমায় বলছি উনি না থাকলে অনেক গুলো মানুষের জীবন ঠিক হয়ে যাবে। আমরা অনেকগুলো মানুষ ভালোভাবে বাঁচতে পারব। মে’রে ফেলো ওনাকে। তুমি অনেক সাহসী। তুমি পারবে। আমি বলছি তুমি পারবে।”

নিধি এবারে বেশ জোরেশোরে ঋতুকে একটা ধমক দিয়ে বলল,

“চুপ করো। মানছি কষ্ট পেয়েছো তুমি। তাই বলে যা নয় তাই বলবে? পাগল তুমি নাকি আমাকে পাগল পেয়েছ? বলছি তো আমি সাহায্য করার চেষ্টা করব। কিন্তু এসব খু’নাে’খু’নি করতে পারবো না। ভুলেও আর এই কথা কোনদিন মুখ দিয়ে বের করবে না। তোমার শাশুড়ি যদি এই কথাগুলো শোনে না, ওনাকে মা’রার আগে তোমাকে খু’ন করে রেখে যাবেন। আর তাছাড়া তোমার স্বামী তো প্রেম করার সুযোগ পাবেই। আরো আমাকে জানাতে দিও না গহনকে কিছু। রিহ্যাবে থাকলে কি করে প্রেম করতেন আমিও দেখতাম। তুমি স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকো। আর তোমার স্বামী অন্য জনের সাথে প্রেম করে বেড়াক। আসলে তোমার সাথে এটাই হওয়া উচিত।”

রাগে নিধির মাথায় এখন আ’গুন জ্বলছে। ঋতুকে ঝাড়িগুলো দিয়ে উঠে চলে যেতে ধরলে ঋতু ওর হাত টেনে ধরে অসহায় গলায় বলল,

“কত যুদ্ধ করে ওকে বিয়ে করেছি সে শুধু আমিই জানি। কতটা ভালোবেসেছি ওকে সেটা শুধু আমিই জানি। একবার কাউকে ভালোবেসে দেখো, তারপর বুঝবে তাকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক কতটা কঠিন। ও ভালো না, ও আমাকে ভালোবাসে না কিন্তু আমি তো ভালোবেসেছি। ও নাহয় আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি তো পারছি না ছাড়তে। একটু তো সাহায্য করো। তুমিও ছেড়ে চলে যাবে!”

নিধি ধপ করে আবারও বসে পড়লো। লম্বা একটা শ্বাস টেনে ঋতুকে আশ্বস্ত করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি গহনের সাথে কথা বলবো।”

“একটু তাড়াতাড়ি বল হ্যাঁ? আমি জানি ভাইয়া সব ঠিক করতে পারবে। ভাইয়া মা কে গিয়ে বললে মা সাবিতকে বোঝাবে। ভাইয়াই পারবে শুধুমাত্র মা কে বোঝাতে। আমার সংসারটা তুমি শুধু বাঁচিয়ে দাও। চির কৃতজ্ঞ থাকবো তোমার কাছে। একটা অসহায় মেয়ের ঘর বাঁচিয়ে দাও নিধি।”

____________

সারাদিন নিধির একবারও গহনের সাথে কথা হয়নি। ছেলেটা বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বাজলো। গহন তখন হাত মুখ ধুঁতে গেছে। নিধি খাবার গরম করছে। এর মাঝে পা টিপে টিপে রান্না ঘরে ঋতু এলো। নিধির কাঁধে হাত রাখতেই নিধি চমকে উঠলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ঋতু কে দেখতেই স্বাভাবিক হলো। ঋতু ফিসফিস করে বলল,

“ভাইয়ার সাথে কথা বলেছো?”

“না। সবেমাত্র এসেছেন। একটু সময় দাও।রাতে ঠিক বলবো। চিন্তা করো না।”

ঋতু অনুরোধের স্বরে বলল,

“আজ রাতের মাঝেই বলো। তুমি আর ভাইয়াই আমার শেষ ভরসা। তুমিই আমার শেষ ভরসা। বলো কিন্তু।”

“চিন্তা করো না। বলবো আমি।”

বিজ্ঞাপন

___________

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে এসে নিধি তখন ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিছানা একদম টানটান করে বালিশ গুলো ঠিক করে নিচ্ছে। নিধির কাজের মাঝেই গহন এসে পিছন থেকে দুহাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো। নিধির সুরসুরি লাগলো। ফলস্বরুপ একটু কেঁপে উঠে মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আরে বউ হয়েছি জন্য যেখানে সেখানে ধরবেন নাকি? সুরসুরি লাগে তো।”

দিন দিন গহনের স্বভাবের বিস্তর পরিবর্তন ঘটছে। শান্তশিষ্ট, গোমরা, ভদ্র ছেলেটা কেমন যেন ধীরে ধীরে অসভ্য হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে লজ্জা শরম কেটে যাচ্ছে। নিধির কথাটা শুনেও একটুও সাবধান হলো না। ওকে ছাড়লোও না। বরং কোমরে ইচ্ছাকৃতভাবে সুরসুরি দিয়ে বলল,

“তোমার যদি বউ থাকতো তাহলে তুমিও বুঝতে বউকে সুরসুরি দিতে কতটা ভালো লাগে।”

নিধি গহনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একহাত গহনের কাঁধের উপর রেখে বলল,

“বউ নেই তো কি হয়েছে? আমার স্বামী আছে না। দাঁড়ান আপনাকে সুড়সুড়ি দিয়ে দেখবো কত ভালো লাগে।”

নিধি গহনের কোমর, গলা, পেট, বুক সব জায়গায় সুরসুরি দেওয়ার চেষ্টা করলো। তবে মানুষটা একেবারে সটান দাঁড়িয়ে আছে। এক বিন্দুও নড়লো না। একটু হাসলোও না। মানুষটার সুরসুরি নেই নাকি? একি অদ্ভুত মানুষ! একপর্যায়ে গিয়ে নিধি নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল,

“আপনি মানুষ না দানব? সুরসুরি নেই কেন?”

গহন নিধির অন্য হাতটাও নিজের কাঁধের উপরে রেখে বলল,

“তুমি জানোই না কি করে সুরসুরি দিতে হয়। দাঁড়াও আমি শেখাচ্ছি।”

কথাটা বলে গহন নিধির দিকে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ঝুঁকে গেল। নিধি একটু থতমত খেল। মৃদু কম্পিত গলায় বলল,

“সুরসুরি শেখাবেন তো ঝুঁকছেন কেন?”

কোন উত্তর দিল না গহন। নিধির দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে একেবারে যখন ওর কাছাকাছি চলে গেল তখন নিধির গালে গহনের গালের ঘষা লাগলো। গহন ইচ্ছাকৃত ভাবে ওর গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি দিয়ে নিধির গালে সুরসরি দেওয়ার চেষ্টায় মেতেছে। নিধি একটু হেসে উঠে বলল,

“সত্যি সুরসুরি লাগছে। কিন্তু আর দরকার নেই। এবারে ছাড়ুন। একটা কথা আছে আপনার সাথে।”

গহন ততক্ষণে নিধির মুখ থেকে আর কোন কিছু শোনার মতন অবস্থাতেই নেই। কোন এক অদ্ভুত নেশায় ডুবে গেছে। আজকাল নিধিকে দেখলেই গহন কোন এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে চলে যায়। দিন দুনিয়া ভুলে বসে। কোন কিছুর দিকে খেয়াল থাকে না। শুধু ইচ্ছে করে নিধিকে কাছে পাওয়ার।

নিধিও বেশ ভালোই বুঝলো যে গহন আর কোন কিছু শোনার মতন অবস্থাতে নেই। এও বুঝলো এখন আর গহনকে সামলাতে পারবে না, থামাতেও পারবেনা। ফলস্বরূপ আজ আবারো গহনের মাতাল করা অনুভূতির কাছে হার মেনে নিল।

____________

“এই ছেলে দাঁড়ান। নিজের কাজ শেষ আর ঘুমিয়ে যাচ্ছেন তাই না? আমার কথা কে শুনবে? আমার কথা শুনে তার পরে ঘুমোবেন।”

গহনের দুচোখে ততক্ষণে রাজ্যের ঘুম নেমেছে। নিধির কথায় একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“এখন ঘুমোই। যা কথা শোনার সকালে শুনবো।”

নিধি তীব্র বিরোধিতা করে বলল,

“মোটেই না। এখনই শুনতে হবে। আমি যা বলব সেটা শুনলে এমনিতেই ঘুম উড়ে যাবে আপনার চোখ থেকে। এদিকে ঘুরুন।”

গহন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়েছিল। নিধি জোর করে ওকে চিৎ করে শুইয়ে তারপরে গহনের উন্মুক্ত বুকে নিজের মাথাটা রেখে এক হাতে গহনকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“মনোযোগ দিয়ে শুনবেন আমার কথাটা।”

গহন ঘুম জড়ানো গলায় ছোট্ট করে বলল,

“হুম।”

“আপনার ভাই পরকীয়া করছে সেই খবর রাখেন?”

সত্যি সত্যি মুহূর্তের মাঝে গহনের দুচোখ থেকে ঘুম পালালো। চোখ মেলে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কে পরকীয়া করে?”

“আপনার আদরের ভাই আর আপনার মায়ের বিগড়ে যাওয়া ছোট ছেলে।”

“সাবিত?”

“আরো দু-চারটে ছেলে আছে নাকি আপনার মায়ের? আপনার মায়ের একটাই ছেলে, সাবিত। আর আপনার পরিচয় হলো আপনি শুধুমাত্র নিধির স্বামী। এছাড়া আর কিচ্ছু না।”

ব্যাপারটা গহনের ঠিক হজম হলো না। ফলস্বরূপ পুনরায় প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সাবিত পরকীয়া করে কে বলেছে তোমায়?”

“ওনার বউ।”

“ঋতু কিভাবে জানলো?”

“ফোনে মেসেজ দেখেছে। আপনার ভাইয়ের সাথে তার প্রেমিকার ছবি দেখেছে। এবং এই কথাটা উনি ওনার স্বামীকে জানিয়েছিলেন জন্য আপনার কুলাঙ্গার ভাই আচ্ছা মতো পি’টি’য়ে’ছেও।”

গহনের সত্যি হজম হলো না নিধির বলা কথাগুলো। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“ঘুমের ঘোরে আছো নাকি? কি আজেবাজে কথা বলছো? সাবিত এর ব্যবহার হয়তো খারাপ কিন্তু তাই বলে গায়ে হাত তোলে না। আর তার থেকেও বড় কথা ওরা ভালোবেসে বিয়ে করেছে দুজনে।”

“ভালোবেসে বিয়ে করলেই সারাজীবন ভালোবাসা থাকে নাকি? শুনুন, অন্ধ বিশ্বাস করা ছাড়ুন। আপনার ভাইয়ের চোখ দেখলেই তো বোঝা যায় চরিত্রহীন। জারা আপু কি আর এমনি এমনি ওনাকে অত গালি দেয়। ভাবি আপনার মা কে গিয়েও এই কথাটা বলেছেন। কিন্তু উনি ওনার ছেলেকে শাসন না করে আর উস্কেছেন। আপনাকে কিছু একটা করতে হবে। ভাবি খুব কাঁদছিল। বারবার আমাকে অনুরোধ করছিল যেন আমি আপনাকে বলি। মেয়েটা অসহায়। যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আমার থেকেও নাকি বেশি অসহায়। আপনার মা কে গিয়ে বোঝান।”

গহন কোন উত্তর দিলো না। ভাবনার জগতে ডুবে গেল। খুব কঠিন কঠিন কিছু বাক্য শোনালো নিধি ওকে। যা বিশ্বাস করতে একটু কষ্টই হচ্ছে। ব্যাপারটা বোধগম্য হতেও কষ্ট হচ্ছে। এদিকে গহনের থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে নিধি মুখ তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি হলো? বোঝাবেন তো আপনার মা কে? আর পারলে ঠাস ঠাস করে ওই ছেলেটার গালে দু'চারটে চড় লাগিয়ে দেবেন।”

গহন গম্ভীর গলায় বলল,

“আমরা এই ব্যাপারে কিছুই বলবো না।”

চমকে উঠলো নিধি। গহনকে ছেড়ে দিয়ে ওর বুক থেকে মাথাটা তুলে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“কি বললেন? কিছু বলবো না আমরা? সত্যিই?”

গহন বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“না। কিচ্ছু বলবো না আমরা। যার ব্যাপার তাকে বুঝে নিতে দাও।”

নিধি রুষ্ঠ গলায় বলল,

“অদ্ভুত মানুষ তো আপনি! এই না ভাই বোনের চিন্তায় ঘুম হয় না। ওদের জন্য পারলে নিজের জীবনটা পর্যন্ত উৎসর্গ করে দেন। আজ যেই ব্যাপারটা এসেছে অন্যের মেয়ের অমনি ওদের চিন্তা ওদেরকে করতে দেব। যদি আজ আপনার ভাই পরকীয়া না করে ভাবি পরকীয়া করতো তাহলেও কি এই কথাটাই বলতেন? নাকি শুধু নিজের বাড়ির ছেলের কদর আছে, অন্যের বাড়ির মেয়ের কদর নেই?”

“তুমি বুঝবে না এই বিষয়গুলো। আমি যা বলছি সেটা শোনো। ওরা যা ইচ্ছে করুক। আমাদের এর সাথে কোন লেনাদেনা নেই। দুদিন আগে কিন্তু এই নিয়ে আমাদের মাঝে কথা হয়েছে নিধি। আমি তোমাকে তখনো বলেছি যে এই ব্যাপারে কথা বলায় সাবিত যথেষ্ট কথা শুনিয়েছে আমাকে। আমি শান্তিতে থাকতে চাই। আমি নিজের সম্মান বজায় রেখে চলতে চাই।”

“আরে আমি থাকবো তাে আপনার সাথে। ওরা কথা শোনালে আমিও কথা শোনাবো। কিন্তু তাই বলে এভাবে চুপচাপ বসে থাকব? ভাবি আমার কাছে সাহায্য চেয়েছে গহন। একটু তো বুঝুন। আমার হাতে পায়ে ধরছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছিলো।”

গহন নিধির হাতটা টেনে ধরে ওকে আবার নিজের বুকের উপর শুইয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“শোনো, আমার পরিবারের লোকদেরকে আমি বেশি ভালো চিনি। তুমি বুঝবে না এসব। যে ঋতু আজ তোমায় অভিযোগ করেছে যদি সাবিত তার সাথে একটু ভালো ব্যবহার করে ও সব ভুলে যাবে। তখন তুমি যদি সাবিতকে নিয়ে কিছু বলতে যাও ও নিজেই এর বিরোধিতা করবে। এমন মানুষদের আশেপাশে থাকতে নেই নিধি যারা নিজেদের কথায় অটল থাকতে পারে না। আমার কথা শোনো, আমি তোমার ভালো চাই। আমি তোমাকে সব ধরনের অশান্তি থেকে দূরে রাখতে চাই। আমি যা বলছি সেটা মেনে চলো। এই ব্যাপারটা থেকে দূরে থাকো।”

নিধি আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন অন্য হাতে ওর মুখটা চেপে ধরে বলল,

“চুপচাপ ঘুমোও। এই নিয়ে আর কোন কথা হবে না। আমাকে বলেছো, বলেছো। আবার সবার সামনে যেন এই কথাগুলো তুলতে যেও না। এখন আমার ভালো বউয়ের মতন চুপচাপ ঘুমিয়ে যাও।”

কথাটা বলে গহন ঘুমিয়ে গেল। তবে নিধি ঘুমােতে পারল না। ব্যাপারটা কোনমতেই হজম হচ্ছে না। ঋতু তখন অসহায়ের মতন কাঁদলো ওকে জড়িয়ে ধরে, কতবার করে সাহায্য চাইলো। আর নিধি স্বার্থপরের মতন চুপ করে থাকবে সবটা জেনেও?

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প