বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৪৬

🟢

(কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ)

“আসবো নিধি?”

কন্ঠটা কানে যেতেই নিধি দরজার দিকে মাথা তুলে তাকালো। নিধি তখন নিজের ফোনে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। ফেসবুক একাউন্ট খুলছে। দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো ঋতু দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমবারের মতো ঋতু নিধির ঘরে এসেছে। ওরা এক বাড়িতে থাকে ঠিকই তবে ঋতুর সাথে ওই মাঝে মাঝেই দেখা হয়। ওই দু এক দিনে একবার করে। কেননা মেয়েটা ঘর থেকে বের হয় না। কিংবা হয়তো এমন সময় ঘর থেকে বের হয় যখন নিধি ঘরের মাঝে থাকে। একটু চমকালো নিধি ঋতু কে দেখে এই সময়। তবে অনুমতি দিল।

অনুমতি পেয়ে ঋতু ভিতরে এলো। নিধিই আগে জিজ্ঞেস করল,

“কিছু দরকার?”

ঋতু কিছুক্ষণ আমতা আমতা করল। তারপরে অনুরোধের স্বরে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“একটা অনুরোধ করি তোমায় নিধি। রাখবে আমার অনুরোধ? তোমার থেকে আমি কখনো কিছু চাইনি আর না কখনো চাইবো। আমি জানিনা আমি কখনো তোমায় কিছু দিতে পারব কিনা। তবে আজ আমি তোমার থেকে একটা জিনিস চাইবো। দেবে আমায়?”

ঋতুর কন্ঠটা খুবই নরম শোনাল। নিধির একটুও ছলনা মনে হলো না। নিধিও যেন একটু নরম হলো।

“আচ্ছা ঠিক আছে বলো। যদি আমার সাধ্যের মাঝে থাকে আমি দেবো? আমি না পারলে গহন দিয়ে দেবে। কি লাগবে বলো?”

ঋতু বিছানার উপর নিধির পাশে বসে ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আকুতি ভরা কন্ঠে বলল,

“সাবিত যে নেশা করে বাড়ি ফিরেছে এই কথাটা তুমি ভাইয়াকে জানিও না নিধি। আমি অনুরোধ করছি তোমায় ভাইয়াকে জানিও না। ভাইয়া জানলো ওকে আবার রিহ্যাবে পাঠিয়ে দেবে।”

“সেটাই তো উচিত। যদি ওনাকে রিহ্যাব এ না পাঠানো হয় ওনার এই স্বভাবটা ঠিক হবে না। তুমি কি সারা জীবন মাতাল স্বামীকে নিয়ে সংসার করতে চাও? এমন মাতালের সাথে সংসার করা যায়?”

“সেসন আমি বুঝে নেব। আমার যদি কোন অসুবিধা না থাকে তোমার কেন অসুবিধা হবে বলো।”

“আমার অসুবিধা আছে। তার কারণ আমি একটা মাতালের সাথে একই বাড়িতে থাকতে পারবো না। এই সমস্যার সমাধান দরকার। যেহেতু একবার রিহ্যাব থেকে ফিরে এসেও উনি শোধরায়নি তার মানে ওনাকে এবারে আরো ভালো মতো টাইট দিতে হবে। দেখো আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি, তোমার বাচ্চাটার ভালোর জন্য বলছি। গহন কে এই ব্যাপারটা আমাকে জানাতে দাও।”

ঋতু বুঝলো নিধিকে রাজি করানো খুব সহজ হবে না। এমনিতেই উঁচু পেট নিয়ে চলাফেরা করতে আজকাল ভীষণ অসুবিধা হয়। তার মাঝে আরো নানা শারীরিক জটিলতা আছে।তারপরও নিজের সেসব শারীরিক অসুবিধার কথা গুলো ভুলে গিয়ে খুব কষ্টে মেঝের উপর নিধির পায়ের কাছে বসলো। নিধি তাড়াহুড়ো করে উঠে ঋতুর থেকে দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল,

“আরে পায়ের কাছে বসছো কেন? ওঠো।”

ঋতুর বসা অবস্থাতে আর নিধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। যেখানে বসেছিল সেখানে বসা অবস্থাতেই দুই হাত জোড় করে অনুরোধের স্বরে বলল,

“তোমার পায়ে পড়ছি নিধি ভাইয়াকে জানিও না। আর কয়েকদিন পর আমার বাচ্চাটা হবে। ওই সময় আমি আমার স্বামীকে আমার পাশে চাই। ও যেমনই হোক আমি, ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমি চাই আমার বাচ্চাটা হওয়ার পর আগে ওর বাবা ওকে কোলে নিক। আমি চাই হাসপাতালে ওর মুখটা দেখে তারপর ওটিতে যেতে। যেন আমি সেখানে ম'র'লেও শান্তি পাই। এই সময়টা আমার ওকে পাশে চাই নিধি। দয়া করে আমার স্বামীকে কেড়ে নিও না আমার থেকে।”

নিধি কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। খারাপ লাগছে ঋতুর জন্য। মেয়েটা কাঁদছে। খুব অসহায় দেখাচ্ছে ঋতুকে। আসলেই ঋতু প্রচন্ড ভালোবাসে সাবিত কে। কিন্তু শ'য়'তা'নটার না বউয়ের প্রতি কোন টান আছে, না অনাগত সন্তানের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা আছে।

নিধি জীবনে অনেক পুরুষ মানুষ দেখেছে। অনেক ধরনের বাজে পুরুষ মানুষ দেখেছে। তবে সাবিতের মতন কাউকে দেখেনি। এমন অদ্ভুত ছেলে এই জীবনে নিধি কখনো দেখেনি। আর না বোধহয় কখনো দেখবে। অন্তত যেখানে গহনের সাহচার্যে থেকেছে, নিজের ভাইকে সারাদিন দেখছে তারপরও কি করে সাবিত এমন হতে পারে! আসলে রক্তেই দোষ আছে। না বাপের র’ক্ত ভালো, না মায়ের রক্ত ভালো।

এদিকে ঋতু এখনো কেঁদেই যাচ্ছে। নিধির মনে হলো ওকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। মেঝেতে ঋতুর পাশে গিয়ে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“দেখো, আমি বুঝতে পারছি তোমার কষ্টটা। কিন্তু ওনাকে তো ভালো করতে হবে তাই না? এভাবে নেশা করতে থাকলে তো ওনার নিজের জীবনটাও শেষ হয়ে যাবে। আমি তোমার খারাপ চাই না। আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি গহনকে জানাই ব্যাপারটা। উনি ঠিক কোন না কোন সমাধান বের করবেন।”

ঋতু আবারো ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“আমি এখন কোন সমাধান চাইনা নিধি। আমার শরীরটা ভীষণ খারাপ। আমার ভয় হয় কখন না জানি আমার কি হয়ে যায়। আমি শুধু চাই এই সময়টাতে আমার স্বামী আমার পাশে থাকুক। আমি এমনিতেই নিঃস্ব নিধি। আমার জীবনে সুখ বলতে কিছু নেই।আমার জীবনে মানসিক শান্তি বলতে কিছু নেই। অনেকদিন হলো আমি অনুভব করতে পারি না যে আমি বেঁচে আছি। সাবিত হয়তো আমার খেয়াল রাখে না, আমায় ভালোবাসে না ঠিক। তবে তারপরেও রাত হলে যখন ও আমার পাশে এসে ঘুমোয় আমার ভালো লাগে নিধি। আমার মনে হয় যে না, ও আমারইও, আমার কাছেই আছে। আমার পাশেই আছে। ওর শরীরের ঘ্রাণ আমার নাকে এলে আমি আরাম পাই, শান্তি পাই। এতোটুকু কেড়ে নিও না আমার থেকে। অন্তত এখন কেড়ে নিও না। আমার স্বামীকে আমার সাথে থাকতে দাও নিধি।”

নিধি অসহায় দৃষ্টিতে শুধু ঋতুর দিকে তাকিয়ে থাকলো। খুব মায়া হলো ঋতুর জন্য। মনে পড়ে গেল গহনের কথা। গহন তো ভালো রেখেছে নিধিকে। নিধির জীবনের সব ইচ্ছে গুলো পূরণ করছে ধীরে ধীরে। নিধি যা বলে তাই শোনে।

হঠাৎ করে নিধির গহন কে দেখতে ইচ্ছে হলো। গহনকে একবার জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে হলো। ভাবলো গহন বাড়ি ফিরলে সবকিছু বাদ রেখে আগে ওকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসে থাকবে।

__________

নিজের ঘরে এসে ঋতু দেখলো সাবিতের পাশে সালমা বেগম বসে আছে। ঋতুকে ঘরে আসতে দেখে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,

“কি দরকার ছিল ওর হাতে পায়ে ধরার? গহনকে কি করে সামলাতে হয় আমি দেখে নিতাম। তোমাকে আমি বলেছিলাম এই কাজগুলো করতে?”

ঋতু এক হাতে চোখের জল গুলো মুছে নির্জীব গলায় বলল,

“ভাইয়া কি আর এখন আপনার কথা শোনে মা? কি করে সামলাবেন আপনি ওনাকে? ভাইয়াকে যদি এখন কেউ সামলাতে পারে তাহলে সেটা শুধুমাত্র নিধিই পারবে।”

সালমা বেগম গর্জে উঠে বললেন,

“চুপ কর। আমার ছেলে এখনো আমার কথা শোনে। ওকে সামলানোর ক্ষমতা আমার সব থেকে বেশি।”

“এই ক্ষমতাটা যদি সাবিতের উপরে প্রয়োগ করতেন খুব ভালো হতো মা। অন্তত আমার জীবনটা নষ্ট হতো না।”

“তোমার জীবন আমিও নষ্ট করিনি, আমার ছেলেও নষ্ট করেনি। নষ্ট করেছো তুমি নিজে। ও তো বিয়ে করতে চায়নি তোমাকে। তুমি তো হাত কে'টে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলে। জোর করে বিয়ে করেছো আমার ছেলেকে ভুলে গেলে সেসব?”

“বিয়ের প্রতিশ্রুতিতো আপনার ছেলেই দিয়েছিল। সেসব কি আপনি ভুলে গেলেন মা?”

সালমা বেগম অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“মুখে মুখে তর্ক করা কোত্থেকে শিখছো তুমি? আমার সাথে তর্ক করে পেরে উঠবে না। আমার জন্যেই এই বাড়িতে টিকে আছো এখনো তুমি। ভুলেও নিধি হওয়ার চেষ্টা করো না। নিধির সাথে আমি কখন কি করতে পারি, কি কি করেছি, কি কি করছি সেসব নিশ্চয়ই তুমি ভালো করেই জানো। নিধির মতন সহ্য ক্ষমতা কিন্তু তোমার নেই। আর না গহন যেমন নিধির পাশে দাঁড়াচ্ছে তেমন ভাবে সাবিত কে তুমি তোমার পাশে পাবে। তাই তর্ক করা বাদ দাও।”

“ছেলের বউদের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখে কি শান্তি পান মা? দুটো মেয়ে তো আপনারও আছে। আপনার মেয়েদের সাথে যদি তার স্বামীরা এমন ব্যবহার করে সহ্য করতে পারবেন? আপনার একটু ভয় হয় না মা? এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ঠিকই। তার স্বামীও যথেষ্ট ভালো কিন্তু আরেক মেয়েতো এখনো বাকি আছে। তার কপালে যদি আপনার মতন শাশুড়ি, আপনার ছেলের মতন স্বামী জোটে সহ্য করতে পারবেন মা? তখন কাঁদবেন না তো? তখন আফসোস করবেন না তো অন্যের মেয়েদের সাথে এই আচরণ গুলো করার জন্য?”

ঋতু কথাগুলো বলার সাথে সাথে সালমা বেগম খেঁকিয়ে উঠে ওকে চ'ড় মা'রা'র জন্য উদ্দ্যত হলেন। হাতটা তুললেনও। ঋতু ভয়ে খিঁচে দুচোখ বন্ধ করলো। তবে কি ভেবে যেন সালমা বেগম চ'ড়টা মা'র'লেন না।

ঋতু ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে সালমা বেগমের দিকে তাকাল। দেখল রাগে তিনি হিশহিশ করছেন। উনি নিজের হাতটা নামিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে ঋতুকে শাসিয়ে বললেন,

“তোমাকে কেন এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম জানো? তার কারণ আমি জানতাম তুমি নিজের মুখ বন্ধ রাখবে। সংসার টেকানোর জন্য তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। আমার ছেলে যেমনই হোক না কেন তুমি ওর সাথে ঠিক সংসার করবে। আজ চ'ড়টা তোমার গালে পড়লো না তার কারণ এত বছর যাবত তুমি আমার কথা মেনেছো। তবে একটা কথা স্পষ্ট শুনে রাখো, নিধি হওয়ার চেষ্টা করো না। তাহলে তোমার অবস্থা কিন্তু নিধির থেকেও জঘন্য হবে। তার কারণ তোমার পাশে দাঁড়ানোর মতন কেউ নেই। তুমি নিজেও নিজেকে বাঁচাতে পারবে না।”

___________

টুকটাক খাবার তো আগেই কিনে পাঠিয়ে দিয়েছিলো নিধির সাথে। সেজন্য গহন বাড়ি ফেরার সময় রাতে শুধু ডিম সিদ্ধ নিয়ে এলো। গহনের তো আর কলিং বেল বাজানোর প্রয়োজন পড়ে না। সেইজন্য নিধি বুঝলোও না যে গহন এসেছে। গহন দরজার কাছে আসতেই হালকা একটু ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পেলো। সঙ্গে সঙ্গে কপাল কোঁচকালো। সেই সাথে দুশ্চিন্তাও বাড়লো। আবার একটু ভয়ও হলো। ভাবল নিশ্চয়ই নিধির সাথে আবার কিছু হয়েছে। হয়তো কেউ কিছু বলেছে।

তাড়াহুড়ো করে ঘরের ভিতরে গেল। গিয়ে দেখলো নিধি জানালার পাশে দুই হাঁটু মুড়ে বসে আছে। কান্নার তোপে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। গহনের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। গহন হাতে থাকা অফিস ব্যাগটা অমনি রেখে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় নিধির পাশে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন? এতোটুকু সময়ের মাঝে আবার কে কি বলেছে?”

গহনের কন্ঠটা শুনতেই নিধি চমকে উঠে হাঁটু থেকে মুখ তুলে ওর দিকে তাকালো। মেয়েটা চোখ দুটো ফুলিয়ে ফেলেছে। চোখ মুখ একেবারে লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে।

নিধিকে এভাবে কাঁদতে দেখে গহনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। অস্থির হয়ে উঠলো। মুহুর্তের মাঝে গহনের পুরো পৃথিবীটা যেন নড়েচড়ে গেল নিধির চোখে জল দেখে। আলতো হাতে নিধির চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“কাঁদছো কেন? কে কি বলেছে?”

নিধি আগে কোন উত্তর দিতে পারলো না। ঠোঁট উল্টিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে দু হাতে গহনের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলো। গহন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল নিধির এমন কান্নায়। মেয়েটা কিছু বলছেও না। গহন আপাতত আর জানার জন্য জোর জুলুমও করলো না। বরং পাল্টা শুধু নিধিকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বেশ অনেকটা সময় পর নিধির কান্নার বেগ হালকা একটু কমলো। গহনকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসে ফোঁকাতে ফোঁপাতে বলল,

“আপনি যদি একটু বদলে যান আমাদের সম্পর্কটা আর টিকবে না গহন। আপনি যদি একটু ছাড় দেন, আমাকে এই বাড়িতে টিকতে দেবে না কেউ৷ শুধুমাত্র আপনি ঠিক আছেন বলে, আপনি আমায় ভালোবাসেন বলে আমি এতটা ভালো আছি৷ শুধুমাত্র আপনার জন্য আমার মুখে এখনো হাসি আছে। নয়তো আমার সারাটা জীবন কাঁদতে কাঁদতেই কেটে যেত। এই বিশটা বছর যাবত কেঁদেছি। বাকি জীবনটাও কাঁদতেই হতো।”

গহন আবারও সযত্নে নিধির চোখের জল মুছে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,

“কে কি বলেছে আমায় বলো?”

“কেউ কিছু বলেনি। তবে আমি এতটা ছোট না যে কিছু বুঝবোনা। আমি সব বুঝি। আমি অসহায় জন্যে, আমার পেছনে কোন শক্ত ভিত নেই জন্য আমাকে এই বাড়িতে এনেছিল। ভেবেছিল আমার মুখটা বোধহয় বন্ধই থাকবে সারা জীবন। কেউ ভাবেনি যে আপনি এভাবে আমার পাশে দাঁড়াবেন। ভেবেছিল আপনি বোধহয় সারা জীবন ওদের হাতের পুতুল হয়ে থেকে যাবেন। ওরা কতটা খারাপ! শুধুমাত্র আমার অসহায়ত্ব দেখে আমাকে এই বাড়িতে এনেছিল।”

“কার কথা বলছো? মায়ের কথা বলছো?”

“জানিনা কার কথা বলছি। কিন্তু আপনি খুব ভালো। আপনি অতিরিক্ত ভালো। এতটা ভালো কেউ হয় না। শুনুন গহন, আপনি কক্ষনো কাউকে সুযোগ দেবেন না আমাদের দুজনের মাঝে কথা বলার। যদি আমি কখনো কোন ভুল করি আমাকে যা ইচ্ছে বলবেন কিন্তু কারো সামনে বলবেন না। কাউকে বুঝতেই দেবেন না যে আমাদের দুজনের মাঝে কোন ঝামেলা চলছে। নয়ত সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অনেকে অনেক কিছু করে ফেলবে।”

“আচ্ছা দেবো না। কিন্তু কে কি করলো, কে কি বলল, কাঁদছো কেন এসব তো আমায় জানতে হবে।”

নিধি কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল গহনের দিকে। তারপরে হঠাৎ করে আবারো কেঁদে উঠে দ্বিতীয় দফা গহনের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

“আপনি খুব ভালো গহন। কিন্তু ওরা আপনাকে ভালো থাকতে দেবে না। ওরা আমাদেরকে ভালো থাকতে দেবে না। অনেক বদ নজর পড়বে আমাদের সম্পর্কে। একই বাড়িতে দুজন মানুষ এতটা ভিন্ন কি করে হতে পারে। কেউ তার স্ত্রীর চোখের জলের কারণ, তো কেউ তার স্ত্রীর মুখের হাসির কারণ। আমার ভাবতেই অবাক লাগে যে আপনি এতটা ভালো। আপনি ভাবতে পারছেন আপনি ভালো না হলে আমার জীবনটার কি হত? আমি না এখানে থাকতে পারতাম, না আমার বাপের বাড়িতে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল, না নিজে কিছু করার মতন অবস্থায় আছি আমি। আপনি এতটা ভালো না হলে আমি কোথাও টিকতে পারতাম না গহন। আমি আপনাকে কি করে বোঝাই বলুন তো আমি আপনার প্রতি ঠিক কতটা কৃতজ্ঞ। আমি আপনাকে কিছু বোঝাতে পারছি না। আমার শুধু কান্না আসছে। আমার শুধু বারবার মনে হচ্ছে আপনি খুব ভালো। আমি আমার জীবনটা ভেবেছিলাম কেমন, আর আপনি সেটাকে বানিয়ে দিলেন কেমন।”

সালমা বেগমের তখন ঋতুকে বলা কথাগুলো নিধি শুনে ফেলেছিল। সালমা বেগম যে ঋতু কে চ'ড় মা'রা'র জন্য হাত উঠিয়েছিলেন সেটাও নিধি দেখেছিল। সেই সাথে আজ আরেক দফা খুব ভালোভাবে চিনতে পেরেছিল সালমা বেগমকে। উনি কেমন প্রকৃতির মানুষ সেটাও বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছিল। সেই সাথে নিধি এও বুঝেছিল যে ঋতু আর ওর মাঝে পার্থক্যটা কোথায়।

আসল পার্থক্যই দুজনের স্বামী। ঋতুর স্বামী ঠিক নেই জন্য ঋতুর আজ এই অবস্থা। আর নিধির স্বামী ঠিক আছে জন্য নিধির এই অবস্থা। ঋতুর অবস্থা দেখে খারাপ লেগেছিল ভীষণ। সেই সাথে কষ্টও যেমন হয়েছিল, আবার ভয়ও হচ্ছিলো। ভাবছিলো এমন পরিস্থিতিতে কখনো নিধি কে না আবার পড়তে হয়।

এসব ভাবতে ভাবতেই নিধির কান্নার বেগটা অনেকটা কমে এলো। নিধির কান্না কমেছে সেটা বুঝতে পেরে গহন ওকে নিজের থেকে ছাড়ালো।

গহন নিধির চোখের জল মুছে দিয়ে চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“এত সহজ নাকি আমাদের মাঝখানে চলে আসা! যদি কেউ জোর করে আসতে চায় তুমি শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধরবে। আর কেউ আসতে পারবে না আমাদের মাঝখানে। তারপরও যদি চলে আসে আমি আছি না। তোমার ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেবো না। আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেবো না। যদি আমরা দুজনে ঠিক থাকি তাহলে কেউ চেষ্টা করেও কিছু করতে পারবে না। আর তোমার এত ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আমি আছি তো।”

নিধি শুধু উপর নিচ মাথা নাড়লো। আরো বেশ কিছুক্ষণ গহন নিধিকে অনেক কিছু বোঝালো। তারপর ফ্রেশ হওয়ার জন্য উঠে যেতে ধরলে নিধি ওর হাত টেনে ধরে আবারো বসালো।

“একটা কথা বলার ছিল।”

“হ্যাঁ বলো।”

নিধি মনে মনে ঠিক করলো কিভাবে কি বলা যায়। কথাগুলো ঠিকঠাক ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে তারপরে গহনকে বলল,

“আমি বলেছিলাম না আপনার ভাই তার বউয়ের গায়ে হাত তোলে। আজকে আমি দেখেছি ভাবির কপালে একটা জখমের চিহ্ন। আমার মনে হয় আপনার ভাই মে'রে'ছে। ওনার সাথে একবার কথা বলা প্রয়োজন আপনার। আর আপনার ভাইয়ের সাথে না বললে আপনার মায়ের সাথে গিয়ে কথা বলুন।”

“খুব কি প্রয়োজন? আমি তো তোমায় বলেছিলাম এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা না বলতে।”

“তাই বলে এক বাড়িতে থেকে কি করে চুপ থাকবো? আপনার ভাইয়ের তো শুধু একটা বদ অভ্যাস না। আপনার ভাইয়ের বউ প্রেগন্যান্ট। অথচ আপনার ভাইয়ের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। যখন ইচ্ছে বাইরে যাচ্ছে, যখন ইচ্ছে বাড়ি ফিরছে। বউয়ের কোন খেয়াল রাখেনা। সারাদিন শুধু নাক ডেকে ঘুমোয়। এটা কারো জীবন হতে পারে! না কোন চাকরি বাকরি করে, না কোন কাজে আসে। পুরো অপদার্থ। শুধু শুধু বাড়িতে রেখে কি হবে। তাও যদি বউয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করতো আমি ক্ষমা করে দিতাম। কিন্তু এ তো পুরাই লস প্রজেক্ট।”

গহন কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“তুমি বাদ দাও এসব ভাবনা চিন্তা। সবাই নিজেদের নিয়ে ভাবে নিধি। তুমিও আমাদেরকে নিয়ে ভাবো। কেউ যেমন আমাদের নিয়ে ভাবেনা, তোমারও তেমনই কাউকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই।”

নিধি কপাল কুঁচকে বলল,

“শুধু কি আমি একাই ভাবি? আপনি ভাবেন না? পুরো চৌদ্দগুষ্টির ভাবনা মাথার মাঝে নিয়ে আমাকে বলছেন নিজেদের নিয়ে শুধু ভাবতে? বউ তো আমি আপনারই।”

গহন হালকা একটু হেসে উঠে বলল,

“তো শুধু স্বামীর এই একটা গুণ পেলেই হবে। আমার মতন শান্ত হতে শেখো। কথা কম বলতে শেখো। আমার রাগ কত কম সেটা তো দেখছো। তুমিও নিজে রাগ কমাও, ধৈর্যশীল হও আরো।”

নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“আমি যদি আরেকটু কম রাগ দেখাই তাহলে ওরা আপনাকে দিয়ে কাজ করাতে করাতেই মে'রে ফেলবে। আপনার বউ শক্ত জন্য এখনো টিকে আছেন। মনে রাখবেন, যেদিন আপনার বউয়ের রাগ কমে যাবে, সেদিন আপনি শেষ।”

___________

নিধি তখন খাবার গরম করছে ওদের দুজনের জন্য। এই ফাঁকে গহন সাবিতের ঘরে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সাবিতের নাম ধরে ডাকলো কয়েকবার। তবে ভিতর থেকে সাড়া পাওয়া গেল না। একটু পর হন্তদন্ত পায়ে ভিতর থেকে ঋতু এসে বলল,

“ভাইয়া ডাকছিলেন?”

গহনের সর্বপ্রথম চোখ গেল ঋতুর কপালের ক্ষতস্থানটায়। কালচে হয়ে গেছে। কে জানে আঘাতটা কি করে পেল।

“সাবিত কোথায়? ঘরে আছে?”

ঋতু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“আসলে ভাইয়া ওর শরীরটা খারাপ লাগছিল। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। ডাকতে নিষেধ করেছে।”

“ও আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে সকালে কথা হবে।”

ঋতু মাথা নাড়তেই গহন সেখান থেকে চলে যেতে নিয়ে আবার থেমে গেল। গহনকে থেমে যেতে দেখে ঋতুও থামল। পিছন ফিরে ঋতুর দিকে তাকিয়ে গহন একটু সংকোচ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“সব ঠিক আছে তো ঋতু? যদি কোন সমস্যা হয়ে থাকে আমায় জানাতে পারো। আমার কাছে শম্পা, সিনথিয়া যেমন তুমিও তেমন। কোন সমস্যা হলে আমি সেটা সমাধান করার চেষ্টা করব।”

একটু ভয় পেল ঋতু। চোখে মুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ফুটে উঠলো। তাহলে কি নিধি বলে দিয়েছে গহন কে সব? অবশ্য বলে দিলে তো গহন এভাবে ইঙ্গিতে কথা বলতো না। ঋতু তাড়াহুড়ো করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,

“সব তো ঠিকই আছে ভাইয়া। কোন সমস্যা হয়নি। হলে আমি আপনাকে জানাবো।”

“কপালে কি করে আঘাত পেলে?”

ঋতু তাড়াহুড়ো করে একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,

“আসলে ভাইয়া উষ্টা খেয়ে দেয়ালের সাথে আঘাত লেগেছিল। তেমন কিছু না ঠিক আছি এখন আমি। আপনি যান খেয়ে নিন। নিধি খাবার গরম করছে বোধহয়।”

খুব তাড়াহুড়ো করলো ঋতু। গহন সেখান থেকে চলে না যেতেই তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করলো। দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে থাকা সাবিতের দিকে একবার তাকালো। তারপরে কপালের ক্ষতস্থানে আলতো করে হাত বোলালো।

ঋতু মোটেও উষ্টা খেয়ে আঘাত পায়নি। আঘাতের জন্য দায়ী সাবিত। ধাক্কা দিয়েছিলো। আর ঋতু গিয়ে দেয়ালের সাথে বারি খেয়েছিল। তবে এই কথাটা ঋতু গহন কে বলতে পারল না। কারণ ঋতু জানেনা গহন জানলে ওর এই সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে। তবে এতোটুকু তো নিশ্চিত সমস্যা আরো বাড়তো। সাবিত আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতো।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প