(কার্টেসী ব্যতীত কপি করা নিষেধ)
রাতের মাঝে গহনের জ্বরটা অনেকটা কমে গিয়েছিল। সকালে উঠেই আগে তাড়াহুড়ো করে অফিসের জন্য তৈরি হলো। তিন দিন হলো অফিসে যাওয়া হয় না। অনেক কাজ পড়ে আছে।
গহন তখন একটা জরুরী ফাইল খুঁজছে। তবে কোথাও পাচ্ছে না। গহন তো যথেষ্ট গোছালো। ওর কোন জিনিস কখনো হারায় না। গহন খেয়াল করলো আজ ঘরের প্রত্যেকটা জিনিসই এলোমেলো হয়ে রয়েছে। ঘরটা গুছিয়েছে নিধি নিজের মতন করে। সেজন্যই গহন কিছু খুঁজে পাচ্ছে না ।
গহন এবারে গলা উঁচিয়ে নিধির নাম ধরে ডাকলো।
“নিধি, আমার কালো ফাইলটা কই? আমি টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছিলাম, পাচ্ছিনা।”
রান্নাঘর থেকে নিধিও গলা উঁচিয়ে বলল,
“ওই টেবিলের ড্রয়ারেই আছে। ভালোভাবে দেখুন। ডান পাশে নিচের ড্রয়ারে আছে। আপনি বা পাশে রেখেছিলেন।”
নিধির দেওয়া দিক নির্দেশনা অনুযায়ী খুঁজতেই গহন ফাইলটা পেয়ে গেল। আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করতে চাইলো না। ফাইলটা হাতে নিয়ে যেই না দরজার কাছাকাছি গেল অমনি নিধি সামনে দাঁড়ালো। হাতে খাবারের প্লেট আর পানির গ্লাস। গম্ভীর গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
গহন তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বললো,
“অফিসে যাচ্ছি। ক্লায়েন্ট অপেক্ষা করছে।”
“সে যেই অপেক্ষা করুক না কেন, যদি কোন দেশের প্রেসিডেন্টও এসে অপেক্ষা করে তাও না খেয়ে যেতে পারবেন না। দেখি পিছনে চলুন।”
নিধি জোর করে গহন কে নিয়ে এসে বিছানার উপর বসালো। প্লেটটা গহনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“চুপচাপ খেয়ে নিন। একটা ভাতও যদি প্লেটে থেকেছে তাহলে এই মিটিং ফিটিং এর স্বপ্ন ভুলে যান। ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
গহন বুঝলো না খেয়ে উপায় নেই। তাই চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতন খেয়ে নিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে হাত ধুঁয়ে এসে ফাইলটা নিয়ে নিধিকে উদ্দেশ্য করে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে বলল,
“যা বলেছিলে শুনেছি। এবার আসি। সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
নিধি আলতো হেসে চুপচাপ মাথা নাড়তেই গহন যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। দরজার কাছাকাছি গিয়ে পুনরায় নিধির দিকে তাকিয়ে ওকে একবার ডাকলো। ডাকটা কানে যেতেই নিধি প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আবার কি হলো?”
গহন নিধির দিকে এগিয়ে এসে ওর গালে আলতো করে হাত রেখে নিধির কপালে বেশ গাঢ় করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। শুধু এতোটুকুতেই সীমাবদ্ধ রইল না গহন। নিধির কপালে চুমুটা খাওয়া শেষ করেই যেতে পারলো না বউকে ছেড়ে। এবারে দুই হাতে শক্ত করে নিধিকে জড়িয়ে ধরে নিধির গালে আলতা করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“এত খেয়াল রাখো কেন আমার? এত যত্ন কেন করো আমার? তুমি বোঝোনা তোমার এত যত্নে আমার কষ্ট হয়! তোমার এত আদর, যত্ন, ভালোবাসায় আমার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আমার যে ভয় হয় নিধি। মনে হয় কোন দিন না তোমায় হারিয়ে ফেলি।”
নিধি পাল্টা গহনকে জড়িয়ে ধরে স্মিত হেসে গহনকে আশ্বস্ত করে বলল,
“হারাবেন না। আমিও তো আপনাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না। আমার নিজের বেঁচে থাকার জন্য হলেও যে আপনাকে দরকার গহন। শুনুন, এখন এইসব যত্নে অভ্যাস করে নিন। আপনার কেউ না থাকলেও বউ আছে। আর আপনার বউ আপনার খুব যত্ন করবে, খুব ভালোবাসবে আপনাকে।”
নিধির এই ছোট্ট ছোট্ট কথাগুলো শুনলে যে ঠিক কি শান্তি অনুভব করে গহন সেটা কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। মনে হয় ভেতরটা যেন একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়। মনে হয় অতীতের যত দুঃখ মনের ভেতরে জমা হয়ে আছে নিধির এই ছোট ছোট বাক্যগুলো নিমেষের মাঝে সেই সব কিছু দূর করে দেয়। সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।
গহন আরেকটু শক্ত করে নিধিকে জড়িয়ে ধরলো। ঠিক কতটা সময় এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকলো তার কোন হিসেব নেই। গহন ভুলে গেল নিজের তাড়াহুড়োর কথা, অফিসের মিটিং এর কথা, ক্লায়েন্টদের অপেক্ষা করার কথা। ইচ্ছে করছে নিধিকে এভাবে জড়িয়ে ধরেই থাকতে।
বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হবার পরও যখন নিধি দেখলো যে গহন ওকে ছাড়ছে না তখন নিজেই বলে উঠলো,
“এখন দেরি হচ্ছে না? বউকে চুমু খেতে, জড়িয়ে ধরতে গেলে দেরি হয় না তাই না?”
নিধির কথাটা শুনে গহন হেসে ফেলল। নিধিকে ছেড়ে দিয়ে তৃতীয়বারের মতো নিধির অন্য গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“ইচ্ছে তো করে সারাদিন তোমায় জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে। কিন্তু হয়ে ওঠে না। আচ্ছা এখন আসি। তুমি নিজের খেয়াল রেখো। আর কোন অসুবিধা হলে কিংবা কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমায় কল করো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। সে না হয় করবো। কিন্তু আপনার বোনকে যে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে তখন আপনি থাকবেন না?”
“চেষ্টা করবো। তবে আসতে পারবো কিনা জানিনা। আমি না এলেও তো সমস্যা হবে না। অনেকেই তো আছে বাড়িতে। মা আছে, সাবিত আছে, পিয়ালও হয়তো আসবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনার না আসাই ভালো। এলে আবার কাজ করাবে। আপনি অফিসেই যান।”
গহন আলতো হেসে চলে গেল সেখান থেকে। নিধিও নিজেকে প্রস্তুত করে রান্না ঘরে গেল কাজের উদ্দেশ্যে।
___________
শাড়ি পড়ে কাজ করতে বেশ অসুবিধা হয়। ঝামেলাও বটে। আজ অতিরিক্ত কাজ থাকায় নিধি একটা সালোয়ার কামিজ পড়েছে। শাড়ি পরে মেয়েটাকে তাও দেখতে যা একটু বউ বউ লাগে। সালোয়ার কামিজ পড়ে একেবারে বাচ্চা বাচ্চা লাগে দেখতে।
সিনথিয়া কে দেখে পাত্রপক্ষের লোকজন চলে গেছে। গহন আসেনি। আর না সালমা বেগম আলাদা করে কল করে গহন কে আবার আসতে বলেছেন।
নিধি এখন খুব তাড়াহুড়ল করে হাত চালাচ্ছে। খুব করে চাইছে যেন গহন বাড়ি ফিরে আসার আগেই নিধির সমস্ত কাজ শেষ হয়ে যায়। এর অবশ্য দুটো কারণ।
এক, আজ যে এত কাজ নিধি করেছে সেটা গহন কে জানতে দিতে চায় না। জানলে লোকটা হয়তো আবার কষ্ট পাবে। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো, গহন বাড়ি ফেরার পর পুরোটা সময় নিধি গহনের সাথে কাটাতে চায়। সেজন্যই তো তাড়াহুড়ো করে কাজগুলো শেষ করছে।
গহনের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজলো। নিধিরও ততক্ষণে কাজ বাজ সব শেষ। সবে মাত্র কাজ শেষ করে হাত মুখ ধুঁয়ে এসে একটু বিছানায় বসেছে। অমনি দেখল গহন ঘরে ঢুকছে। গহনকে দেখতেই মুহূর্তের মাঝে নিধির সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। ভুলে গেল সারাটা দিন কতটা বাজে কেটেছে, কতটা কাজের মধ্যে দিয়ে কেটেছে। নিধির মানসিক শান্তির কারণ এসে গেছে।
গহনকে দেখে নিধি খুশিতে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছেই দুই হাতে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“একদম ঠিক সময় এসেছেন আপনি। আমার সব কাজ শেষ। এখন শুধু আমার হাতের সময় আর সময়। আর এই সময়টাতে আপনার সাথে প্রেম করবো।”
গহন মৃদু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। যা ইচ্ছে করো। কিন্তু ভেতরে যেতে দাও। আগে ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড়টা বদলাই। ক্ষুধা লেগেছে, খেতে দেবে না?”
নিধি গহন কে ছাড়লো না। শুধু মাথাটা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খেতে তো অবশ্যই দেব। তার আগে বলুন আমার জন্য কি এনেছেন?”
হঠাৎ করে নিধির কথাটা শুনে গহন কেমন যেন ঘাবড়ে গেল। চোখ মুখে হালকা একটু অপরাধবোধ ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তুমি কিছু আনতে বলেছিলে? আমার তো আসলে মনে ছিল না। কি লাগবে বলো আমি এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।”
“আরে ধুর কিছু আনতে বলিনি তো আমি। তাই বলে আপনি কিছু আনবেন না? আরে এটা তো আনতে হয়। বাড়িতে একটা কম বয়সী ছোট বউ আছে। তার কত কিছু খেতে ইচ্ছে করে। চিপস আনবেন, চকলেট আনবেন, কোল্ড ড্রিঙ্কস আনবেন, আইসক্রিম আনবেন। মাঝে মাঝে ফুচকাও আনবেন। আর প্রতিদিন ডিম সিদ্ধ তো অবশ্যই আনবেন।”
নিধির শেষের বাক্যটা শুনে গহন কপাল কুঁচকে বলল,
“ডিম সিদ্ধ বাইরে থেকে আনতে হবে কেন? বাড়িতেই তো ডিম থাকে। তুমি খেতে পারো না?”
“আরে না। বাড়িরটা খেলে হজম হবে না।”
“কি করে হজম না হয়ে থাকে সেটা আমি বুঝে নেব। তোমার যেটা, যতটুকু ইচ্ছে খাবে। কে কি বলে সেটা দেখার জন্য আমি আছি।”
নিধি কন্ঠে অনীহা প্রকাশ করে বলল,
“না। খাবার নিয়ে খোঁটা ঠিক সহ্য হয় না আমার গহন। তার থেকে ভালো আপনি রোজ বাইরে থেকে ডিম সিদ্ধ আনবেন আমার জন্য।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। কাল থেকে না হয় আনবো। আজ তো কিছুই আনিনি। তাহলে গিয়ে নিয়ে আসি এখন। কি খাবে বলো?”
গহন কথাটা বলতেই নিধি ওর কপালে হাত রেখে দেখলো হালকা জ্বর আছে এখনও। চোখ মুখে মৃদু রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“নিজের শরীরের আরাম বোঝেন না আপনি? এখনই বাইরে থেকে এলেন। আবার এখনই কোন আক্কেলে যেতে চাইছেন? আমি যতই বউ হই না কেন তাই বলে আমি বললেই বাইরে যেতে হবে আবার? সবার আগে নিজেকে প্রাধান্য দেবেন। সামনে বউ থাকুক আর মা থাকুক। কারো জন্যই নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোন মানে হয় না।”
“যে নিজেকে রেখে আগে আমাকে প্রাধান্য দেয়, আমি যদি তাকে আগে প্রাধান্য না দেই তাহলে কেমন হয় না ব্যাপারটা? তখন তো তোমার সাথে অন্যায় করা হয়ে যাবে।”
মুহূর্তের মাঝে নিধির অভিব্যক্তিটা হালকা একটু বদলালো। চোখে মুখে মৃদু লজ্জা ভাব ফুটিয়ে তুলে ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“ওহ্ আচ্ছা। তাহলে আজকাল বউকে দেখে ভয়ও করেন। খুবই ভালো গুণ এটা। যাই হোক, ভিতরে আসুন। আজকের মত ছেড়ে দিলাম। তবে কাল থেকে কিছু না কিছু অবশ্যই আনবেন।”
গহন বাধ্য ছেলের মতন চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে। নিশ্চয়ই আনবো।”
___________
সকালে খাবার টেবিলে বসে একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেল নিধি। নিধির খুশি হওয়া উচিত, অবাক হওয়া উচিত নাকি দুঃখ পাওয়া উচিত, নাকি লজ্জা পাওয়া উচিত ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিংবা হয়তো ভয় পাওয়া উচিত ছিল। কেননা ওর শাশুড়ি আর ননদ তো বেজায় চটেছে নিধির উপরে।
সিনথিয়াকে যারা দেখতে এসেছিল তারা নাকি সিনথিয়াকে রেখে নিধিকে পছন্দ করেছে। ওরা নাকি বলেছে ছেলের বিয়ে দিলে নিধির সাথেই দেবে।
গহন তখন সবে মাত্র একটু পানি মুখে দিয়েছিল। সালমা বেগমের মুখ থেকে কথাটা শুনে ওর কাশি উঠে গেল। নিধি যে একটু গহনের পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে সেই হুশটাও নেই। ও তো নিজেই হা করে তাকিয়ে আছে সালমা বেগমের মুখের দিকে। গহনের তাই নিজেরই নিজেকে সামলাতে হলো।
গহনের কাশি থামতেই শম্পা রাগান্বিত গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি ইচ্ছে করে এমনটা করেছো তাই না? কি দরকার ছিল ওদের সামনে এত ঘোরাঘুরি করার? আর তাছাড়া কাল সালোয়ার কামিজ পরেছিলে কেন? এমনি দিন তো শাড়ি পরে সারা বাড়ি ঢং ঢং করে ঘুরতে থাকো। শাড়ি পরলে তো বাড়ির বউ এর মত লাগতো। তা না করে নিজেকে কচি দেখানোর জন্য সালোয়ার কামিজ পরতে গিয়েছিলে? লজ্জা করল না? বিবাহিত হয়ে আবার বিয়ে করার সাধ জেগেছে?”
শম্পার কথাগুলো শুনে নিধি তাজ্জব বনে গেল। নিধি তো মাত্র দুই থেকে তিনবার গিয়েছিল ওদের সামনে, তাও বাধ্য হয়ে। কেননা ওদের সামনে খাবারগুলো রাখারও কারো সময় ছিল না। নিধিকেই করতে হয়েছে সবটা। নয়তো ওদের সামনে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না।
এদিকে শম্পার কথাগুলো গহনের একদমই পছন্দ হলো না। গম্ভীর গলায় শম্পাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব কি ধরনের শব্দ ব্যবহার করছো তুমি শম্পা? তোমাকে আমি বলেছিলাম না ভদ্রভাবে কথা বলতে। আর এখানে নিধির দোষ কোথায়? ও নিজের কাজ করছিল। দোষ ওই মানুষগুলোর যারা একজনকে দেখতে এসে অন্যজনকে পছন্দ করে গেছে।”
“হ্যাঁ, তুমি তো এখন অন্যজনেরই দোষ দেবে। তোমার বউয়ের তো কোন দোষ থাকতেই পারে না। ও তো সাধু। এই পৃথিবীর সবাই দোষী। শুধু তোমার বউ একাই পবিত্র। ওর পা ধোঁয়া জল খেতে হবে আমাদের।”
“এত বাড়াবাড়ি করতে তো আমি বলিনি। যতটুকু সম্মান নিধির প্রাপ্য ততটুকুই তো দিতে পারো না। অতিরিক্ত আবার কি দেবে!”
শম্পা মুখ ভেঙ্গিয়ে বলল,
“সম্মান অর্জন করে নিতে হয় ভাইয়া। ওই মেয়ে…...।”
শম্পাকে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে গহন বেশ শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“আগেও বলেছিলাম তোমায় ওর নাম নিধি। হয় নিধি বলে ডাকবে, নয়ত ভাবি বলে ডাকবে। এই মেয়ে, ওই মেয়ে, সেই মেয়ে এই সব সম্মোধন আমি পছন্দ করি না।”
কেন যেন শম্পা দমে গেল। গহনের শান্ত কণ্ঠস্বরটা শুনেই ভয় পেল। তবে শম্পা ভয় পেলেও সালমা বেগমের তো ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। উনি অবশ্য এই নিয়ে ছেলেকে কিছু বলবেন না। উনি সরাসরি গম্ভীর গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করেই বললেন,
“কি দরকার ছিল তোমার গতকাল ওদের সামনে অতবার করে যাওয়ার? আর তাছাড়া তোমার নাকফুল কোথায়? হাতে চুড়িও নেই। মানে ওদের সামনে গিয়ে তুমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেটা কি? তোমার আসল উদ্দেশ্যটা কি ছিল একটু বলবে আমায়?”
অনেকক্ষণ থেকে নিধি চুপচাপ সব সহ্য করে যাচ্ছে। কিন্তু এবারে আর চুপ থাকা যাবে না। সবাই মিলে তো উঠে পড়ে লেগেছে গহনের কাছে নিধিকে অপরাধী বানাবে বলে। কিন্তু নিধি তো সেটা হতে দেবে না।
“নাকফুল টা আজ সকালে মুখ মোছার সময় নাক থেকে খুলে গেছে আমার মা। গতকাল পরেই ছিলাম। আর চুড়ি আমি পরিনা। কাজ করতে অসুবিধা হয়। আর আমি কেন কাল ওদের সামনে গিয়েছিলাম সেটা কিন্তু আপনারা সবাই খুব ভালো করেই জানেন। নাস্তা পরিবেশন করছিলাম। আর তাছাড়া এতই যখন সমস্যা আমায় নিয়ে তাহলে ওনারা বারবার যখন জিজ্ঞেস করেছিল আমি কে। তখন পরিচয় দেননি কেন যে আমি এই বাড়ির বড় বউ? আপনার ছোট ছেলের বউকে তো নিজে ঘর থেকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন যদি আমার পরিচয়টাও দিয়ে দিতেন তাহলে তো আর এই সমস্যাটা হতো না।”
একটু থতমত খেয়ে গেলেন সালমা বেগম। খেয়াল করলেন গহন কপাল কুঁচকে ওনার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে পরিস্থিতিটা হাতের বাইরে চলে যেতে দেওয়া যাবে না। তিনি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললেন,
“কখন? ওরা তোমার পরিচয় জানতে চায়নি। তোমার দিকে ওনারা এতটা নজরই দেননি।”
নিধি ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“সেজন্যই বুঝি আপনার মেয়ের জায়গায় আমাকে পছন্দ করে গেছে? ওনারা কমপক্ষে তিনবার জিজ্ঞেস করেছেন আমি কে। আপনারা একবারও পরিচয় দেননি। আমি সত্যি আশায় ছিলাম যে হয়তো আপনি আমার পরিচয় দেবেন। কিন্তু আপনি দিলেন না। আমি কিন্তু আড়াল থেকে সব দেখেছি মা। আর এখন আপনারা মা, মেয়ে কি সুন্দর পুরো দোষটা আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। শুনুন মা, একবার বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের রূপ দেখেই আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি পাগল না যে আবার বিয়ে করে অন্য বাড়ির মানুষদের রূপ দেখতে যাব।”
সালমা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না। আপাতত এই ব্যাপারটার সমাপ্তি এখানেই ঘটলো।
___________
নিধি গুনগুন করে গান গাইছে আর আর চুল আঁচরাচ্ছে। দুপুরে রান্না বান্না শেষ করে গোসল করে এসে সবেমাত্র একটু নিজেকে দেওয়ার মত সময় পেল। গহন বলেছিলো দুপুরে খেতে আসবে। গহন আসার আগে একটু নিজেকে পরিপাটি করে রাখতে হবে। গহনের জন্যই তো আজ আবার একটা শাড়ি পরলো। এখন গহন কখন আসবে, এসে নিধিকে দেখে ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে। তারপরে একটু দু চারটে প্রশংসার শব্দ বের করবে মুখ দিয়ে সেই অপেক্ষায় আছে নিধি। তবে কখন যে মানুষটা আসবে কে জানে!
নিধি চুল আঁচড়ে পিছন ঘুরতেই চমকে উঠলো। দেখলো স্বয়ং গহন দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। ব্যাপারটা ঠিক নিধির বিশ্বাস হলো না। এত তাড়াতাড়ি তো গহনের আসার কথা ছিল না। আর কখনই বা এলো যে নিধি টের পেল না?
এদিকে নিধির নিজের দিকে এভাবে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার মানেটা গহন ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগে নিধিই বলে উঠলো,
“আপনি কি সত্যি এসেছেন নাকি আমি ভুলভাল দেখছি? আপনি কখন এলেন যে আমি টের পেলাম না? এত তাড়াতাড়ি বা এলেনই কেন?”
নিধির এতগুলোর প্রশ্নের মাঝে গহন শুধু শেষের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করে আলতো হেসে বলল,
“তোমার টানে।”
নিধি চমকে উঠে বলল,
“আরে বাহ্। আজকাল আপনি সত্যি সামনে থাকলেও মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। আবার কল্পনাতে এলেও মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। কি কঠিন প্রেমে পড়েছি আমি বুঝতে পারছেন? জেগে থাকি বা ঘুমিয়ে থাকি সবসময় আপনাকেই দেখছি। আপনি থাকুন বা না থাকুন তাও আপনার উপস্থিতিই আমি অনুভব করছি। মানে একেবারে ভয়ানক প্রেমে পড়েছি আমি। পিছলেও পড়িনি, আছার খেয়েও পড়িনি। একেবারে অন্যরকম ভাবে পড়েছি। এমন ভাবে পড়েছি যেমন ভাবে আর কেউ কখনো পড়েনি।”
নিধির কথাগুলো শুনে গহন এবারে শব্দ করে হেসে উঠল। গহনের হাসির শব্দ হতেই নিধির টনক নড়লো। গহনের বাহুতে হালকা করে একটা চিমটি কাটতেই গহন মৃদু আর্তনাদ করে উঠে বলল,
“কি করছো?”
নিধি চোখ বড় বড় করে গহনের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বল,
“তার মানে আপনি সত্যি এসেছেন!”
“মিথ্যে মিথ্যে আবার আসা যায় নাকি?”
“যায় তো। আপনি তো প্রায়ই আসেন। আমি তো সবসময় আপনার সাথেই কথা বলি। আপনি অফিসে থাকলেও আমি আপনাকে বাড়িতেই দেখি। ওই যে বললাম না কঠিন প্রেমে পড়েছি।”
গহন কন্ঠে কিঞ্চিত বিস্ময় ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি এখনো বাচ্চাই আছো তাই না? তুমি যে বড় হয়েছো, তোমার যে বয়স হয়েছে, তোমার যে বিয়ে হয়ে গেছে সেসব তোমাকে দেখলে বোঝাই যায় না। প্রতিটা মুহূর্তে তুমি আমায় অনুভব করাও যে তুমি খুবই ছোট।”
নিধি মুখ ভেংচিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“তা আমি তো ছোটই। আমাকে দেখে কি আপনার নিজের মতন বুড়ো মনে হয়। মাত্র বিশ বছর আমার।”
“তো একটু বড় হও। বাচ্চাকে নিয়ে কি আর সংসার করা যায়!”
“তো আপনার বউ যে বাচ্চা সেটা শুধু দিনেই কেন মনে হয়? রাতে মনে থাকে না যে আপনার বউ বাচ্চা? এই বাচ্চাটাকে একটু ছাড় দেওয়ার দরকার? বাচ্চাদের সাথে কেমন আচরণ করা যায় সেটা আপনার রাতে মনে হওয়া উচিত ।”
থতমত হয়ে গেল গহন। লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার ইচ্ছে হলো। আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলো না। পিল পিল করে হেঁটে চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেল। কেননা গহন লুকোনোর মতন আপাতত আর কোন জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না।
গহন ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিতেই নিধি হো হো করে হেসে উঠলো। গহন কে এভাবে লজ্জায় ফেলতে কি যে আনন্দ পায় নিধি সেটা বলে বোঝানোর মতন না।
____________
দুপুরে গহনের সাথে একটু বাইরে বেরিয়ে ছিলো নিধি। দুদিন পর থেকেই ইউনিভার্সিটি শুরু হবে। তার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিল। নিধির তো এসব দিকে কোনো খেয়ালই ছিল না। গহন নিজেই নিয়ে গিয়েছিল মনে করে। জামা কাপড় কিনে দিয়েছে, ব্যাগ কিনে দিয়েছে, পড়াশোনার জন্য যাবতীয় যা যা প্রয়োজন সবই কিনে দিয়েছে। সেই সাথে আজকে নিধিকে একটা নতুন ফোনও কিনে দিয়েছে। নিধিকে নিয়ে তারপর একটা সুপারশপে গিয়েছিল। অনেক সকালে ক্লাস থাকবে নিধির। হয়তো অত সকালে খেয়ে যেতে পারবে না কিংবা রান্না করার মতন সময় থাকবে না। তাই টুকটাক কিছু শুকনো খাবার, ড্রাই ফ্রুটস কিনে দিয়েছে। নিধি আবার আবদার করে গহনের থেকে কফিও কিনে নিয়েছে।
নিধির প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনাকাটা শেষে গহন নিধিকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আবার নিজে অফিস চলে গেছে। নিধি আপাতত নিজের ঘরে বসে সেসবই দেখছিলো। মূল আকর্ষণ তো নতুন ফোন। ফোনটা অন করে আগে নিজেই নিজের কয়েকটা সেলফি তুলল। কি সুন্দর ছবি আসছে।
নিজের পরিবারের সাথে আগে কোথাও ঘুরতে গেলে দেখতো ওর ভাই বোন সবাই যে যার ফোনে ছবি তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু নিধির কাছে কোন ফোন ছিল না। আকিবের ফোনটা অবশ্য নিধি ব্যবহার করতে পারত। তবে যদি সেটা আকিবের মায়ের চোখে পড়তো তাহলে হয়ে যেত। ওদের ফোনে এত ভালো ছবি উঠতোও না যতটা নিধির নতুন ফোনে উঠছে। নিধি মনে মনে ঠিক করলো গহন বাড়িতে আসার সাথে সাথে গহনের সাথে বেশ কিছু সেলফি তুলবে।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে ওর কানে একটা শব্দ ভেসে এলো। মনে হলো কিছু যেন ভাঙ্গলো কিংবা কেউ হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল। নিধি লাফ দিয়ে বসা থেকে উঠে ঘর থেকে বেরোলো দেখার জন্য যে কার কি হলো।
বসার ঘরে যেতেই দেখল মেঝের উপর সাবিত হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ। দেখে তো মনে হচ্ছে ঘুমোচ্ছে। নিধির মাথাটা কাজ করা বন্ধ করে দিল। যদি ঘুমোনোর ইচ্ছেই থাকে তাহলে এভাবে মেঝেতে ঘুমোনোর কি আছে। নিজের ঘরে গেলেই পারতো।
সাবিত সেখানে একা নেই। ওর পাশে সালমা বেগমও বসে আছে। উনি ছেলেকে তোলার চেষ্টা করছেন। নিধি এবারে ভাবলো সাবিত বোধহয় অসুস্থ। হয়তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
সেদিকে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা, কি হয়েছে ওনার? অসুস্থ?”
সালমা বেগম খ্যাঁক করে উঠে বললেন,
“আমার ছেলের যা হয় হোক। তোমায় আমি দেখতে বলেছি? তুমি নিজের কাজে মনোযোগ দাও। এই বাড়ির কেউ অসুস্থ হলেই কি, ম'রে গেলেই কি? তোমার কি তাতে যায় আসে? তুমি তো তোমার স্বামীর সাথে কেনাকাটায় ব্যস্ত। মনে রং লেগেছে না তোমার। যাও গিয়ে নিজের কাজ করো।”
থতমত খেয়ে গেল নিধি। ও বুঝলোই না যে কি এমন জিজ্ঞেস করে ফেলেছে যার জন্য সালমা বেগম ওকে এতগুলো কথা শুনিয়ে দিল। নিধি পুনরায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখলো হাতে পানির গ্লাস নিয়ে ঋতু ছুটে আসছে।
তাড়াহুড়ো করে এসে সাবিতের পাশে বসলো। মেয়েটার চোখে মুখে জল। কাঁদছে বোধহয়। ফোঁপাচ্ছে। সাবিতের চোখে মুখে কয়েক ফোঁটা জল ছিটিয়ে দিল। বিরক্তিতে নাক মুখ কোঁচকালো সাবিত। নিধি এতক্ষণে বুঝলো এই ছেলে আসলে জ্ঞান হারায়নি। অযথা পড়ে আছে।
সাবিত চোখ মেলে তাকাতেই নিধি দেখলো ওর চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। সালমা বেগম আর ঋতু দুজনে মিলে চেষ্টা করে ওকে উঠে বসালো। এখন দাঁড় করোনার চেষ্টা করছেন। তবে ঠিক পেরে উঠছেন না। ওদের প্রচেষ্টার মাঝে ঋতু ক্রন্দনরত গলায় সাবিত কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি তো ভালো হয়ে গিয়েছিলে। আবার কেন এসব খেলে?”
সাবিত কে কথাটা বলা শেষে ঋতু সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি বলেছিলাম আপনাকে মা ও পুরোপুরি বদলায়নি। ও এখনো নেশা করে। মিললো তো আমার কথা।”
পাশে যে নিধি দাঁড়িয়ে আছে সে ব্যাপারে ঋতুর খেয়াল না থাকলেও সালমা বেগমের ঠিকই খেয়াল আছে। তিনি এক ধমকে ঋতুকে থামিয়ে দিলেন। ইশারায় নিধি কে দেখালেন। নিধিও বুঝালো ব্যাপারটা। দুজনে মিলে অনেক কষ্ট করে সাবিতকে দাঁড় করালেন। যাওয়ার আগে সালমা বেগম নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“এ ব্যাপার গুলো গহনের কান অব্দি যেন না যায়।”
নিধি বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“কেন? আপনার ছেলের কুকীর্তির কথা জানা প্রয়োজন গহনের। এটাকে ঠেঙিয়ে সোজা করা দরকার। আস্ত একটা অপদার্থ বানিয়েছেন।”
সালমা বেগমের রাগ হলো ঠিকই তবে তাও তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফের বললেন,
“তুমি নাকি চাও তোমার স্বামীর মানসিক শান্তি বজায় থাকুক। ও যদি শোনে ওর ভাইয়ের এই স্বভাবটা আবার ফিরে এসেছে তাহলে কিন্তু অশান্তিতে পড়বে। যদি সত্যিই চাও যে তোমার স্বামীর যেন মানসিক শান্তি বজায় থাকে তাহলে এই কথাটা ওর কানে দিও না। এটা আমার অনুরোধ বলতে পারো। তোমার শাশুড়ি অনুরোধ করছে গহনের কানে এই কথাটা দিও না।”
নিধি কিছু বলল না। সাবিত কে নিয়ে ওনারা চলে যেতেই নিধি বিরবির করে বলল,
“বলবো না মানে অবশ্যই বলবো। আমার স্বামীর কষ্টে আয় করা টাকা দিয়ে উনি যে একটা অপদার্থকে পালছেন সেটা তো ওনাকে জানাতে হবে। আমার স্বামীর টাকা এভাবে অপাত্রে দান করতে দেব না আমি।”