“মায়ের কাছে আসার সময় হলো তাহলে! যাক তাও এসেছো, আমি এতেই ধন্য হয়ে গেলাম বাবা। তোমার পায়ের ধুলাে যে আমি পাবো সত্যিই ভাবিনি। যাইহোক, বসো। তোমার সেবা কিভাবে করতে পারি বলো?”
সালমা বেগম যে প্রতিটা কথাই গহনকে ঠেস দিয়ে বললেন সেটা গহন বুঝলো। কিন্তু তবুও গহন কথাগুলো তে কষ্ট পেল না। দেরি তো হয়েছে ওর মায়ের ঘরে আসতে। তাই ভাবলো মা হয়তো কষ্ট পেয়েছে। মনের দুঃখ থেকেই কথাগুলো বলেছে।
কষ্ট পাওয়াটাও তো অস্বাভাবিক না। আগে তো গহন বাড়ি ফেরার পরে সবার প্রথমে মায়ের ঘরে আসতো। কিন্তু এখন আর আসা হয় না। সব সময় তো শুধু ইচ্ছে করে নিধির মুখটা দেখতে। সেজন্যই তো বাড়ি ফেরার পর আগে নিধির সাথে কিছুটা সময় কাটায়। আগে মন মেজাজটা ভালো করে নেয়। তারপরে আসে সালমা বেগমের কাছে।
গহন এগিয়ে গিয়ে সালমা বেগমের পাশে দাঁড়ালো। বসার ইচ্ছে আর হলো না।
“মা, নিধি কাল থেকে ভার্সিটিতে যাবে। ওর পড়াশোনার চাপ তো অনেক থাকবে। তাই তোমাকে বলতে এলাম যে বাড়ির ব্যাপার গুলো নিয়ে ওকে বেশি চাপ দিও না।”
“কখনো শুনেছো আমি তোমার বউকে বাড়ির কাজ নিয়ে চাপ দিয়েছি?”
গহন বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তরে বলল,
“না মা, কখনো শুনিনি। তার কারণ নিধি আমার কাছে অভিযোগ করেনি। কিন্তু নিজের চোখে অনেক কিছু দেখেছি।”
থতমত খেলেন সালমা বেগম। বুঝলেন এই নিয়ে কথা বাড়ালে তিনিই বিপদে পড়বেন। সেজন্য প্রসঙ্গটা বদলে একটু গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলেন,
“তারমানে বাড়ির বউ হিসেবে ওর যতটুকু দায়িত্ব ততটুকুও আর পালন করবে না? সারাদিন পড়াশোনার অজুহাতে সমস্ত দায়িত্ব থেকে দূরে পালাবে তাইতো?”
গহন একটু হেসে বলল,
“এখানে পালানোর কি আছে মা? তোমরা সহযোগিতা করবে ওকে। নিজের দায়িত্বে অবহেলা করার মত মেয়ে নিধি না। শুধু ওকে একটু সহযোগিতা করা প্রয়োজন।”
“বেশ ঠিক আছে। যা ভালো বোঝো তাই করো। ওর পড়াশোনায় বিরোধিতা করছি না আমি। করতেই পারে পড়াশোনা। স্বাবলম্বী হওয়া ভালো কথা। কিন্তু ঘর আর বাইরে দুটো যেন সমানভাবে সামলাতে পারে। তাই বলে স্বাবলম্বী হওয়ার চক্করে যেন আমার সংসারটা না এলোমেলো করে ফেলে।”
গহন বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“এমনটা হবে না। নিশ্চিন্তে থাকতে পারো তুমি।”
আর কোন উত্তর দিলেন না সালমা বেগম। গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে রইলেন। একটু বিরতি নিয়ে গহনই আবারো বলে উঠলো,
“তোমার সাথে আরেকটা কথা ছিল আমার মা। সিনথিয়ার ব্যাপারে।”
সিনথিয়ার নামটা শুনতেই সালমা বেগম কপাল কুঁচকে তাকালেন গহনের দিকে। কৌতূহলী গলায় বলল,
“সিনথিয়ার ব্যাপারে কি কথা বলবে?”
এবারে গহন বসলো সালমা বেগমের পাশে । সালমা বেগমের এক হাতের উপর নিজের হাত রেখে শান্ত গলায় বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“সিনথিয়া তো এখনো যথেষ্ট ছোট মা। ওর বিয়ে নিয়ে তো এত তাড়াহুড়ো করার কোন প্রয়োজন নেই। ওর স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছে। একবার ও স্বাবলম্বী হয়ে গেলে এমন হাজারটা ভালো ছেলে পাওয়া যাবে। আর তাছাড়া ওর বিয়ে, ওর জীবন, ওর মতামতেরও তো একটা গুরুত্ব আছে। আমরা কিভাবে জোর করে বিয়েটা দিয়ে দেবো বলো।”
“সিনথিয়া তোমায় বলতে বলেছে এসব?”
“হ্যাঁ বলেছে। এই নিয়ে যেন আবার ওকে বকাবকি করতে যেও না। আমি ওর বড় ভাই। ও আমার কাছে আবদার করতেই পারে।”
“অন্যায় আবদার করেছে। তুমি বুঝবে না। আমি জানি তুমি ওর ভালোর জন্য বলছো। কিন্তু আমি ওর ভালো অন্য দিক দিয়ে দেখছি। আমার কথা শোনো, ওর সঙ্গ না দিয়ে কি করে তাড়াতাড়ি বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যে সে ব্যাপারে আমায় সাহায্য করো। আমি ঠিক করেছি আমি এই বিয়েটাই দেব। আমি তোমাকে ছেলের কাজের জায়গা, বাড়ির ঠিকানা সব দিয়ে দেব। তুমি খোঁজ নিয়ে নিও।”
গহন আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে সালমা বেগম ওকে থামিয়ে দিয়ে পাল্টা নিজে গহনের হাতটা ধরে বলল,
“আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো বাবা। সিনথিয়া তো শুধু তোমার বোন না। ও আমার মেয়েও। আমি ওকে জন্ম দিয়েছি। আমি কি ওর খারাপ চাইবো? মায়েরা কি কখনো খারাপ চায়? এই পরিবারে যদি ওর বিয়ে দিতে পারি ওর চৌদ্দগোষ্ঠীর কপাল ভালো হবে। ওনারা যখন তখন বিয়ের জন্য রাজি। আমি শুধুমাত্র এগোতে পারছি না এই মেয়ের বেয়াদবির জন্য।”
“কিন্তু মা ওরা যে সিনথিয়া কে দেখতে এসে অন্যজনকে পছন্দ করে গেল। এই নিয়ে কি ওর মনে একটা খারাপ প্রভাব তৈরি হবে না? যদি বিয়ের পরে ওকে এই নিয়ে আবার খোঁচায়। ও তো ছোট মানুষ, কষ্ট পাবে।”
সালমা বেগম গহন কে আশ্বস্ত করে বললেন,
“তেমন কিছুই হবে না। নিধি কে পছন্দ করার জন্য ওনারাও লজ্জিত। ওনারা পরে নিজেরাই তো বলেছেন যে সিনথিয়াকেও পছন্দ। এই নিয়ে আর কথা বাড়িও না। বিয়েটা হয়ে যেতে দাও। আর শোনো, আমায় টাকা দিও। ওর জন্য গয়না বানিয়ে রাখবো। জামাইকেও তো কিছু না কিছু দিতে হবে। বিয়ের আয়োজন কিভাবে কি করবে তুমি দেখে নিও। ভরসা আছে তোমার ওপর আমার।”
গহনেরও মনে হলো এই নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না। সালমা বেগম নিশ্চয়ই এই বিয়ের মাঝেই কোনো ভালো দেখতে পেয়েছেন সিনথিয়ার জন্য।
___________
আজও সকালে গহন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেছে। নিধি ন’টায় বেরোবে বাড়ি থেকে। গহন যাওয়ার আগে বলে গিয়েছে ওর জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিবে। আর যাওয়ার সময় গহনের অফিসের সামনে থেকে গহনও উঠে যাবে।
নিধি সকালের নাস্তা সেরে রান্নাঘরে সবকিছু গোছগাছ করে রেখে ঘরে এলো তৈরি হওয়ার জন্য। গহন অনেকগুলো নতুন জামা কিনে দিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল যে কোন জামাটা পরে ওকে বেশি মানায়। শেষে হালকা আকাশী রঙের একটা সালোয়ার কামিজ বেছে নিল নিধি। সালোয়ার কামিজ পরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নাকের ফুলটা খুলে রেখেছিল। তারপর আর পরার কথা মনেই নেই। এখন পরে নিল। নিধি ইচ্ছাকৃতভাবে চুড়িও পরলো। যেন ওকে দেখেই বোঝা যায় যে নিধি বিবাহিত। কোন ছেলে যেন সুযোগ নিতে না পারে। আর তারপরও যদি দুঃসাহস দেখায় প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার, নিধি তো আছেই তাকে শায়েস্তা করার জন্য।
নিধি তৈরি হয় ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে এর মধ্যেই বাইরে থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো ওর কানে। নিধি তাড়াহুড়ো করে বাইরে গিয়ে দেখলো মেঝের উপর ভেজা কাপড় পড়ে আছে। পাশে বালতিও পড়ে আছে। ঋতু বসে কাপড় গুলাে আবার বালতিতে তুলছে। মেয়েটার যে বসে থেকে কাজটা করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারল নিধি। সেজন্য তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে নিজেই কাপড়গুলো বালতিতে তুলে দিতে দিতে ঋতুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরে ভাবি তুমি কেন এই ভারী বালতি নিয়েছো? আর এগুলো নিয়ে যাচ্ছিলে কোথায়?”
ঋতু হাঁপানো গলায় বলল,
“ছাদে শুকোতে দিতে যাচ্ছিলাম।”
নিধি চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কিইই! মাথা ঠিক আছে তোমার? এই সময়, এই অবস্থায় তুমি এই ভারি বালতি নিয়ে ছাদে যাবে কাপড় শুকোতে দিতে? কেন ওই কুম্ভকর্ণের ঘুম হয়নি? একজন ওনার কাপড় ধুঁয়ে দেবে, একজন ওনার কাপড় শুকোতে দেবে, আরেকজন ভাঁজ করে রাখবে আর উনি শুধু পরবেন। যাও গিয়ে ওনাকে বলো শুকোতে দিয়ে আসতে।”
ঋতু আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কি বলছো এসব? চুপ করো। আমি যাচ্ছি তো।”
নিধি রাগান্বিত গলায় বলল,
“তোমার সবসময় চুপ করো চুপ করো কিন্তু আর ভালো লাগেনা। তুমি এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ওনার কানের মধ্যে গিয়ে কথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে আসছি।”
কথাটা বলে নিধি সত্যিই ঋতুর ঘরের দিকে যেতে ধরলে কোত্থেকে যেন সালমা বেগম সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিধি চমকে উঠে থামলো। নিধি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
“তুমি কাজ করবে না ঠিক আছে। তোমার সংসারের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু ঋতু কে উস্কানি দিচ্ছো কোন সাহসে? তুমি পড়তে যাবে না কি করতে যাবে সেটা তোমার ব্যাপার। এখন তুমি বাড়িতে না থাকলে কাউকে না কাউকে তো কাজ করতেই হবে তাই না? ছেলেদের তো বিয়ে দিয়ে বউ এনেছি আমি কাজ করবো বলেই।”
নিধি থামল। যাওয়ার আগে যদিও মন মেজাজটা খারাপ করতে চাইছিল না। কোন উদ্দেশ্য ছিল না কারো সাথে কোন তর্ক বিতর্কে জড়ানোর। তবে মনে হলো না জড়িয়ে কোন উপায় নেই। পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যদি আমাদের দুজনকে দিয়ে শুধু কাজই করানোর উদ্দেশ্যই ছিল, তাহলে ছেলেদের সাথে বিয়ে দিয়ে তো আমাদের বাড়ির বউ বানিয়ে আনার দরকার ছিল না মা। টাকা দিলে তো আমাদের থেকে ভালো, সভ্য কাজের লোক পেয়ে যেতেন।”
সালমা বেগম ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলেন,
“কাজের লোকের পরিবারের যা অবস্থা, কাজের লোকেদের যা অবস্থা তোমাদের দুজনের অবস্থাও তো তাই। কোন পার্থক্য তো আমি দেখিনি। সেজন্যই তেমন পরিবার থেকে তোমাদের দুজন কে বেছে এনেছি আমি।”
নিধি মোটেই অপমানিত বোধ করলো না। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে পাল্টা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আপনাকেও বোধহয় এমন পরিবার থেকে বাড়ির কাজ করার জন্যই নিয়ে আসা হয়েছিল তাই না মা?”
নিধি কথাটা বলার সাথে সাথে সালমা বেগম অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,
“মুখ সামলে কথা বলো নিধি। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না।”
নিধিও পাল্টা হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
“আপনিও আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। আপনার মাঝে কি সামান্য মনুষ্যত্ববোধ নেই? ওনার পেটে তো আপনার ছেলেরই সন্তান রয়েছে। বাইরে থেকে তো নিয়ে আসেনি। কোন আক্কেলে এই ভারি বালতি নিয়ে ওনাকে আপনি ছাদে পাঠাচ্ছেন? আর আপনার দামড়া ছেলে শুয়ে শুয়ে ঘুমোবে?”
“আমার ছেলে কি করবে না করবে সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। আর তাছাড়া তুমি তো ভার্সিটিতে যাচ্ছিলে। যাও না। তোমাকে তো আমি নিষেধ করিনি। এখন তোমার অবর্তমানে তোমার ভাগের কাজগুলো তো ঋতুকেই করতে হবে। নাহলে তো আমার সংসার চলবে না মা।”
কথাটা বলে সালমা বেগম ঋতুকে উদ্দেশ্য করে আদেশের সুরে বললেন,
“তুমি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? দুজনের মধ্যে তো বেশ ভালোই মিল। একজন আরেকজনের কাছে গিয়ে অসহায়ত্বের গল্প শোনাও, কাঁদো, ভরসা দাও। একজনের অংশের কাজও আরেকজন করে দাও। যাও, কাপড়গুলল শুকোতে দিয়ে এসো। তারপরে সবার জন্য দুপুরে রান্না করবে। এতদিন তোমার অংশের কাজ নিধি করেছে। এখন নিধির অংশের কাজ তুমি করবে।”
নিধি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সালমা বেগমের দিকে। এই মানুষটা এমন কেন? আদৌও কি ইনি মানুষ? মানুষ হলে তো ঋতুকে এভাবে বলতে পারতেন না। নিধি ঘৃণা ভরা কন্ঠে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার কি লজ্জাই নেই? আপনিও তো মা। আপনারও তো মেয়ে আছে। আপনার মেয়েকে যদি তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এভাবে খাটায় আপনি সহ্য করতে পারবেন? আমার সাথে এই কাজগুলো করার দুঃসাহস দেখাতে পারেন না বলে সব অত্যাচার ওনার উপর করবেন? আপনার বিবেক কাজ করে না কেন? এতটাও তো বয়স হয়নি আপনার যে বোধবুদ্ধি লোপ পাবে।”
সালমা বেগম ফের চোখ গরম করে নিধির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার বিবেক কাজ করে কি করেনা তার কৈফিয়ত তোমায় দেবো না আমি। আর তোমার এই নিয়ে এত কথা বলার কোন অধিকারই নেই। আমি গহনের স্ত্রীকে কোন আদেশ করিনি। আমি আদেশ করেছি আমার ছেলের বউকে। ওকে দিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করাতে পারি। ওর কোন আপত্তি নেই। তুমি বেশি কথা না বলে নিজের কাজে যাও। আর যদি ঋতু কে কাজ করতে দেখলে এতই কষ্ট হয় তাহলে নিজের অংশের কাজ শেষ করে তারপরে যাও।”
কথাটা বলে সালমা বেগম চলে গেলেন সেখান থেকে। তিনি সেখান থেকে চলে যেতেই নিধি ঋতুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে বালতিটা কেড়ে নিয়ে বলল,
“কোথাও যাবে না তুমি। চুপচাপ গিয়ে ঘরে বসে থাকো। আর শোনো, মুখটা একটু খোলার চেষ্টা করো। এমনিতেও উনি তোমাকে বাড়ি থেকে বের করবেন না। কারণ হলো উনি খুব ভালো করে জানেন যে ওনার ছেলের সাথে তুমি ব্যতীত আর কেউ সংসার করতে পারবে না।”
ঋতু মলিন হেসে বলল,
“তুমি যে আমার জন্য এতটা ভেবেছো এটাই যথেষ্ট। কাজ না করলে হয়তো উনি আমায় সংসার থেকে বের করবেন না ঠিকই। তবে আরো অনেক কিছু করবেন। সাবিত তো আছেই। আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি ঠিক কাজগুলো করে নেব। আমার অভ্যাস আছে। তুমি আসার আগে তাে আমিই করতাম।”
নিধির মাথাটা এবারে গরম হয়ে গেল। ঋতুর ওপর যেমন রাগ হচ্ছে তেমনি মায়াও হচ্ছে। শেষে বাধ্য হয়ে ঋতু কে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“ঠিক আছে। আমি এটা করে দিয়ে যাচ্ছি। তোমায় ছাদে উঠতে হবে না। আর কোন কাজ করার দরকার নেই।”
নিধি বালতিটা নিয়ে যেতে ধরলে ঋতুর ওর হাত টেনে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার কথা শোনো, তাড়াতাড়ি চলে যাও। উনি এটাই চাইছেন যেন তুমি থেকে যাও। আমি যে করেই হোক কোনভাবে করে নেব কাজগুলো। চিন্তা করো না। বাচ্চাটা না হওয়া অব্দি আমাকে ম'রতে দেবেন না উনি। বংশধর দরকার ওনার। আমার শরীরে প্রানটা থাকলেই হলো। আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি যাও। পড়াশোনা শিখে স্বাবলম্বী হও। আমার মতন বোকামি করো না। পুরুষ মানুষ যেকোনো দিন বদলে যেতে পারে। আজ তোমাকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে সেই সুযোগটা কাজে লাগাও।”
ঋতু নিজের কথাটা শেষ করতে না করতেই আবারো হুড়মুড়িয়ে সেখানে সালমা বেগম এলেন। উনি বুঝতে পারলেন যে এতক্ষণ ঋতু আর নিধির মাঝে কোন গোপন কথা হচ্ছিল। তবে সেই প্রসঙ্গ তিনি তুললেন না। নিধিকে গুরুত্বও দিলেন না। বরং সরাসরি ঋতুকে উদ্দেশ্য করে আদেশের সুরে বললেন,
“সারাদিন যদি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকো তাহলে তো কাজ একটাও হবে না মা। তোমাকে তো এভাবে মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ছেলের বউ করে আনিনি। একবার মেঝের অবস্থা দেখো। হাঁটা যাচ্ছেনা। পা ময়লা হয়ে যাচ্ছে। মুছতে হবে তো।”
ঋতু কিছু বলে ওঠার আগে নিধি আবারও কথা বলে উঠলো। তবে এবারে রাগারাগি করলো না। শান্ত গলায় বলল,
“কি চাইছেন এত চাপ নিতে নিতে ওনার বাচ্চাটা যেন এখানেই হয়ে যায়? মানে হাসপাতালের খরচ বাচানোর ইচ্ছে! আপনাদের তো আবার মায়া দয়া নেই শরীরে। বাচ্চা পেলেই হলো।”
সালমা বেগম নিধিকে উদ্দেশ্য করে নিজেও শান্ত গলাতেই বললেন,
“তুমি নিজে যেহেতু কাজ করতে পারবে না তাই সংসারের কাজে নাক গলাতে এসো না। আর আমি আবারো বলছি আমি গহনের বউয়ের উপর কোন আদেশ চালাইনি। আমি আমার ছেলের বউ এর উপরে আদেশ চালিয়েছি। আর ঋতু আমার আদেশ পালন করবে। তুমি চাইলেও আটকাতে পারবেনা ওকে।”
কথাটা বলে সালমা চলে গেলেন সেখান থেকে। নিধি আবারও ঋতুতে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে ধরলে ঋতু দুই হাত জোড় করে অনুরোধের স্বরে নিধি কে বলল,
“দয়া করো। দয়া করে চলে যাও তুমি। আমাকে আমার মতন সংসারটা করতে দাও নিধি। তোমায় বলছি কিছু হবে না। ওরা ম'রতে দেবে না আমায়। চলে যাও তুমি। আমি করে নেব কাজ। যা হয় হয়ে যাবে। চুপচাপ বসে থেকে ওনার কথা শোনার থেকে দুটো কাজ করা ভালো।”
রাগে বিরক্তিতে নিধির চান্দি গরম হয়ে গেল। কাঁধে থাকা ব্যাগটা সোফার উপরে ছুঁড়ে ফেলে বলল,
“কাজই আগে করবো। আজ আমি কাজই করব। কাজ বাদে কোন বা'লই করবো না। কাজ করতে করতে পুরো বাড়ির আজ ভিত নাড়িয়ে ফেলবো। দরকার পড়লে প্রত্যেকটা ইট খুলে আবার নতুন করে গাঁথবো। আর এটাই দেখবো কাজের কি হয়েছে। কতটা কাজ করলে ওনার চান্দি ঠান্ডা হয় সেটাও দেখব।”
কথাটা বলে নিধি কাপড়ের বালতি নিয়ে গটগট করে হেঁটে দরজা খুলে ছাদে চলে গেল। ঋতু অসহায় দৃষ্টিতে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। বুঝলো না মেয়েটা যে কতটা বাজে ভাবে ফেঁসে গেল। মেয়েটা মোটেও চালাক না। প্রচন্ড বোকা। ঋতুর থেকেও বেশি বোকা।
_____________
“তুমি এলে না কেন? আজ তোমার ভার্সিটিতে প্রথম দিন ছিল মনে নেই?”
গহনের গম্ভীর কন্ঠটা শুনে নিধি একটু ভয় পেল। তবে কন্ঠটা কাঁপতে দিতে চাইলো না। নয়তো ধরা পড়ে যাবে। আবার এখন সত্যিটাও বলতে চাইলো না। ভাবলো গহন বাড়ি ফিরলে তারপর বলবে। এখন কাজের চাপে আছে। এর মাঝে পারিবারিক ঝামেলা গুলো না জানাই ভালো।
নিধি চটপট একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,
“আসলে শরীরটা হঠাৎ করে খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে সেজন্য যাইনি। কাল থেকে যাব।”
“শরীর খারাপ? কি হয়েছে? সকালে আসার সময় তো দেখে এলাম সুস্থ। এতোটুকু সময়ের মাঝে কি হয়ে গেল?”
নিধি জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আসলে সত্যিই আমি অসুস্থ। মানে শরীরটা কেমন যেন লাগছে। খুবই খারাপ লাগছে। নড়াচড়াও করতে পারছি না।”
“কি সমস্যা হয়েছে পরিষ্কার করে বলো? বাড়ি তে কিছু হয়েছে? তোমার শরীর খারাপের জন্য ভার্সিটিতে আসতে অসুবিধা হলে আগে তুমি আমাকে কল করে জানাতে। গাড়ি পাঠানোর পর সেই গাড়িটা আবার ফেরত পাঠাতে না। তারপরও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি।”
একটু ঘাবড়ে গেল নিধি। কিন্তু তারপরেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“না, সত্যি শরীরটা খারাপ। কাল থেকে যাব কথা দিচ্ছি। শরীর খারাপ হলেও আর বাড়ি থাকবো না।”
গহন তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। একটু ভাবনা চিন্তা করে গম্ভীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে রাখছি। কাজ আছে অফিসে।”
কথাটা বলে গহন ফোনটা কেটে দিল। নিধি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আপাতত গহন কে চিন্তার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া গেল। তবে রাতে গহন কে জানাতে হবে ব্যাপারটা। নয়ত রোজ রোজ ক্লাস মিস দেওয়া যাবে না। এর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।