সময় তখন বিকেল চারটে। সেই যে সকালে গহন চলে গিয়েছিল। সারাদিন আর নিধির সাথে কথা হয়নি। নিধি কল করেছিল কয়েকবার। তবে গহন ফোনটা রিসিভ করেনি। শেষে গিয়ে ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিল। সারাদিনে নিধির খাওয়া-দাওয়া কিচ্ছু হয়নি। সেই থেকে ঘরে বসে থেকে কাঁদছে তো কাঁদছেই।
এমন সময় ঘরে সিনথিয়া এলো। নিধি খেয়াল করেনি তখনো সিনথিয়াকে। সিনথিয়া সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“এই ঢং ছেড়ে বাইরে এসো। মা ডাকছে।”
নিধি সিনথিয়ার দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমার মায়ের আদেশ পালন করতে বাধ্য নই আমি। ওনাকে গিয়ে বল আমাকে কিছু বলার থাকলে যেন ঘরে এসে বলে যায়।”
“এই, তোমার তেজ কেন কমেনা?”
“কোনদিন কমবেও না। গহন একটু আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে মানে ভেবো না ও কিছু বোঝেনি। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে ঠিকই বুঝেছে। তবে আমার অপরাধের কারণে আমার উপরে রেগে আছে। আর একটা কথা স্পষ্ট শুনে রাখো, তোমার মা সহ চৌদ্দগুষ্টিকে গিয়ে বলে রাখো যতদিন না তোমরা ভালো হবে ততদিন নিধির তেজ কমবে না।”
সিনথিয়া এবার ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আমার মা তোমার তেজ কমাতে না পারলেও তোমার মা নিশ্চয়ই কমাতে পারবে। বাইরে একবার এসে দেখো। তোমার পুরো গুষ্টি এসেছে তোমার তেজ কমানোর জন্য। এত তেজ নিয়ে না কোথাও ভাত পাবে না। তাড়াতাড়ি এসো। আমাদের কারো কাছে এত সময় নেই যে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।”
কথাটা বলে সিনথিয়া বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। নিধির মাথার উপর দিয়ে গেল ওর কথা গুলো। নিধির পুরো গুষ্টি কেন আসতে যাবে তাও ওকে না জানিয়ে? মেয়েটা কি মিথ্যে বলে গেল নিধিকে ঘর থেকে বের করার জন্য?
নিধি আর বসে থাকতে পারলো না। ভাবলো একবার গিয়ে অন্তত দেখে আসা উচিত।
বসার ঘরে আসতেই দেখল নিধির বাড়ির লোকজন সেখানে বসে। নিধির মা-বাবা, দুই চাচা আর বড় চাচি এসেছেন। কিন্তু এই অসময়ে নিধিকে কোন কিছু না জানিয়ে ওনারা কেন এসেছে ঠিক বুঝে উঠতে পারল। তার মধ্যে বাড়ির যা পরিবেশ। এর মাঝে ওনাদের আসাও ঠিক হয়নি।
নিধি ওনাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তোমরা কেন এসেছো? আর আমাকে কিছু জানাওনি কেন?”
মিনিট দশেক হলো তারা এসেছেন। এর মাঝেই অনেক কথা হজম করতে হয়েছে তাদের। ফলস্বরূপ মেয়ের কন্ঠটা কানে যেতেই নীলা হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে। নিধি কে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উনি নিজের বসার জায়গা থেকে উঠে এসো ঠাস করে নিধির গালে একটা চড় মা’র’লে’ন। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,
“অসভ্য বেয়াদব মেয়ে। শ্বশুরবাড়িতে তোকে পাঠিয়েছি ঝগড়া করার জন্য? শাশুড়ির মুখে মুখে তর্ক করার জন্য পাঠিয়েছি, না ননদ দেবরকে অপমান করার জন্য পাঠিয়েছি? একটুও শান্তিতে থাকতে দিবি না তুই আমাদের তাই না? ও বাড়িতে থাকতে চাচা-চাচির মুখে মুখে মুখে তর্ক করতে করতে জীবনটা অতিষ্ঠ করে ফেলেছিলি। এ বাড়িতে এসে আবার এদের মুখে মুখে তর্ক করিস। কোথায় জায়গা হবে তোর? কে পালবে তোকে? কি ভবিষ্যৎ তোর? নিজের জীবন নিয়ে কোন চিন্তা নেই তোর তাই না?”
নিধির যতটা না খারাপ লাগলো তার থেকেও অনেক বেশি অপমানিত বোধ করলো। নীলা বুঝতেও পারলেন না উনি নিধিকে ঠিক কতটা ছোট করলেন ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সামনে। এমনিতেই তো ওরা নিধিকে কথা শোনাতে, খোঁটা দিতে ছাড়ে না। তার উপরে আজ থেকে তো আরোকটা নতুন কথা পেয়ে গেল, যে নিধির বাপের বাড়ির লোকের কাছেও ওর দাম নেই।
নিধির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তবে তাও কন্ঠ কাঁপলো না। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে নীলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অর্ধেক কথা শুনে বিচার করতে যেও না মা। দোষটা আমার না, দোষটা ওদের।”
নীলা ফের রাগ চিৎকার করে উঠে বললেন,
“দোষ যারই হোক তুই মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারিস না কেন? কথায় কথায় তর্ক করতে হবে কেন তোর? যে যা বলে চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করে নিতে পারিস না? তোর মাকে দেখিসনি সংসারে কিভাবে সবার কথা চুপচাপ সহ্য করে নেয়?”
“দেখেছি তো। সেই সাথে মায়ের করুণ পরিণতিও দেখেছি। তাই আমি নিজেকে তোমার জায়গায় কল্পনা করতে পারি না মা।”
“বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু তুই নিধি। মুখে মুখে তর্ক করা ছাড়। একবার ভেবে দেখেছিস আজই যদি তোকে ওরা বাড়ি থেকে বের করে দেয় তখন কোথায় গিয়ে উঠবি? জামাই যদি তোকে ছেড়ে দেয় তাহলে কি হবে তোর? তুই কোন জমিদারের মেয়ে না। না তোর নিজের কোন যোগ্যতা আছে। তুই একবারে তোর বাবার কথা ভাবলি না? মানুষটা অসুস্থ। সেই অসুস্থ শরীর নিয়ে আজ শুধুমাত্র তোর জন্য এখানে আসতে হলো। প্রথমবার মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলেন তাও মেয়ের বিচার করার জন্য। যদি জামাই তোকে ছেড়ে দেয় আমাদের মান সম্মান থাকবে? মুখ দেখাবো কি করে? মানুষকে কারণ কি বলবো যে মেয়ে মুখে মুখে তর্ক করে জন্য ছেড়ে দিয়েছে? এই মুখ দেখাতে পারবি কাউকে। তখন মরণ ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।”
এমনিতেই নিধির চাচিদের কাছে নিধি ভীষণই অপ্রিয়। সেটাও উচিত কথা বলার জন্যই। আজ তো আরো সুযোগ পেয়ে গেলেন আনিসা নিধিকে অপমান করার। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আর বলবেন না আপা, জন্ম থেকেই দেখছি মেয়েটা চূড়ান্ত বেয়াদব। বড় ছোট কিচ্ছু মানে না। একটা কথা মাটিতে পড়তে দেয় না। আমরা তো জানি এই মেয়ে কেমন। আমরা মা চাচি হয়ে সহ্য করতে পারি না। আর আপনারা তো শ্বশুরবাড়ির মানুষজন। আর কি কি করেছে এই মেয়ে?”
সুযোগটা একেবারেই হাত ছাড়া করলেন না সালমা বেগম। একে একে নালিশ করেই গেলেন। বেশিরভাগই মিথ্যে বললেন। আর কিছু কিছু সত্যি বললেন। তার মাঝেও আবার কিন্তু থেকেই গেল। এই যেমন নিধি ওনার ছোট ছেলের সংসারে অশান্তি তৈরি করতে চাইছে, ওনার মেয়ের বাড়িতে আসা পছন্দ করেনা, ওনার ছোট মেয়েকে দু চোখে সহ্য করতে পারেনা, জামাই এলে ঠিকঠাক সম্মান করে না, কথায় কথায় চটাং চটাং উত্তর দেয়, শাশুড়িকে সম্মান করে না, সবার কাছে গিয়ে স্বামীর বদনাম করে, আবার স্বামীর কানে গিয়ে শাশুড়ির নামে বদনাম করে। আরো যে কত অভিযোগ করলো তার কোন হিসাব নেই।
নিধি শুধু চুপচাপ মাথা নত করে শুনে গেল সব অভিযোগগুলো। নিধির সত্যি কিছু বলার নেই। কাকে অভিযোগ করবে? না গহন আছে, না ওর মা বাবা ওকে বুঝলো। আর কাকেই অভিযোগ করবে? চাচা চাচি তো এমনিতেই সহ্য করতে পারেনা। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের কথা তো মুখে তোলাই যায় না।
সব অভিযোগ করা শেষে সালমা বেগম থামলেন। নীলা বুঝলেন মেয়ের অনেক অপরাধ। মেয়ের অপরাধের হিসেব করে শেষ করা যাবে না। যে করেই হোক উনি তো মা, ওনাকে তো সামাল দিতেই হবে ব্যাপারটা। তিনি আবারো নিজের পূর্বের জায়গায় গিয়ে বসে দুহাত জোর করে সালমা বেগমের উদ্দেশ্য ক্ষমা চেয়ে বললেন,
“আপা, আমার মেয়ের হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি। মেয়েটা আমার ছোট। বয়স কম, অবুঝ। আপনি তো দয়ালু মানুষ। ক্ষমা করে দিন ওকে। দয়া করে আমার মেয়েটাকে রেখে দিন আপনাদের কাছে।”
নীলাকে একটু নরম পেয়ে সালমা বেগম যেন আরো সুযোগ পেয়ে গেলেন। গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,
“সত্যি বলতে এমন মেয়েকে নিয়ে সংসার করা যায় না। আমরা আপনাদের থেকে কি চেয়েছিলাম বলুন তো? আপনাদের অবস্থা দেখে তো আমরা কিচ্ছু চাইনি। মেয়ের বাবা চলাফেরাই করতে পারেনা তার থেকে আর কিই বা আশা করা যায়। সামান্য বিয়ের শাড়িটাও আমাদের বাড়ি থেকেই পাঠানো হয়েছিল। চার পাঁচ জন লোক গিয়েছিলাম। আপনারা তাদেরকেও ঠিকঠাক ভাবে সম্মান করতে পারেননি। আসলে বুঝতেই পারিনি যে ছোটলোক বাড়ি থেকে নিয়ে আসছি মেয়েকে। তবে বুঝলাম সেটা মেয়ের ব্যবহার দেখে। ভেবেছিলাম গরিব অসহায় বাড়ির মেয়ে সাহায্য করি। বাড়িতে ছেলের বউ করে নিয়ে এলে অন্তত মেয়েটার জীবন বেঁচে যাবে। তিন বেলা ভালো খাবার পাবে, ঘুমোনোর জায়গা পাবে। কিন্তু এই মেয়ে তো এসে এখন আমাদের মাথার উপরে নাচা শুরু করে দিয়েছে। আপনারা নিয়ে যান আপনাদের মেয়েকে নিজেদের সাথে। যদি মানুষ করতে পারেন আবার পাঠিয়ে দেবেন।”
আযীয আহমেদ একেবারে নিশ্চুপ। তিনি হুইল চেয়ারে চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে আছেন। একটা টু শব্দ বের হয়নি তার মুখ দিয়ে। তবে চুপ থাকতে পারলেন না নীলা। মেয়েটার তো সংসার ভেঙে যেতে বসেছে। তিনি কি করে চুপ থাকেন মা হয়।
অনুনয়ের স্বরে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“এমন করবেন না আপা। আপনিও তো মেয়ের মা। দয়া করে আমার মেয়েটার সংসার ভাঙবেন না। আপনি একটু জামাইকে বোঝান না। আপনি তো মা। আপনি বোঝালে ঠিক বুঝবে। আমার মেয়েটার সর্বনাশ হয়ে যাবে আপা।”
অনেকক্ষণ থেকে নিধি চুপচাপ সহ্য করছিল। তবে এবার আর সহ্য করতে পারলো না। অশ্রুসিক্ত নয়নে নীলার দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলল,
“আর কত ছোট করবে আমায় মা? আমাকে যেতে হবে না এই বাড়ি থেকে। গহন যেতে দেবে না আমায়।”
নিধি কথাটা বলতেই নীলা অগ্নিদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠে বললেন,
“তুই চুপ কর নিধি। যা গোলমাল করার করেছিস। আমাকে সামলাতে দে সবটা। তোকে নিয়ে যেতে পারবো না সঙ্গে করে।”
“আমার স্ত্রীকে তো আপনার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কোন প্রয়োজন আমি দেখছি না মা। আমি বেঁচে থাকতে আমার স্ত্রীকে আমার অনুমতি ব্যতীত কে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে?”
হঠাৎ করে নতুন কারো একটা কন্ঠ পেতেই সবার দৃষ্টি দরজার দিকে গেল। দেখলো সেখানে গহন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে আকাশসম বিস্ময়। গহন এই পরিবেশটার মানে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কথাবার্তার মানেও বুঝে উঠতে পারছে না। নিধির দিকে তাকাতেই দেখল নিধি ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। গহন কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে নিধি এবারে আর কোনমতেই নিজের কান্না নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। ওখানে দাঁড়িয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
গহন জুতাে খুলে ভিতরে এলো। নিধির কাছে আগেই গেল না। সোফায় বসা দুই পরিবারের লোকজনদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“কি হচ্ছে এখানে?”
উত্তরটা সালমা বেগম আগে দিলেন।
“ওই মেয়ে যে অপরাধ করেছে তার বিচার তো করতেই হবে তাই না? আর আমরা শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিচার করলে তাে আবার দোষ হয়ে যাবে। সেজন্য ওর বাপের বাড়ির লোকজনকে ডেকেছি। ওনারাই বিচার করুক।”
“মানে? কিসের বিচার?”
শম্পা সালমা বেগমের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সালমা বেগম উত্তর দিতে ধরলে ওনার কাঁধের উপর হাত দিয়ে ইশারায় ওনাকে থামতে বলে নিজে গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আরে সকালে এই মেয়ে যে গন্ডগোলটা পাকালো তার বিচার করতে হবে না? দেখো নিজের বাড়ির লোকদেরকে দেখে মুখ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেছে যে এই বাড়িতে ভাত না হলে টিকতে পারবে না। বাপের বাড়িতে গেলে তো তুলবেও না ওকে। এমন মেয়েকে তিন বেলা খাবার দিয়ে কেউ পালবে না। আসলে হাভাতে বাড়ির মেয়ে তো, হঠাৎ করে অনেক বড় কিছু পেয়ে গেছে। ছোটলোক ঘর থেকে এত বড় বাড়িতে এসেছে সেজন্য একটু বেশি উড়ছিল। ওই যে বলে না কুকুরের পেটে ঘি সহ্য হয় না।”
শম্পা নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার সাথে সাথে একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে গেল। এমন একটা ঘটনা ঘটলো যা কেউ কখনো কল্পনাও করেনি। গহন সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শম্পার গালে কষিয়ে একটা চ'ড় লাগালো। শম্পা ছিটকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। সালমা বেগম তড়িৎ গতিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন ওদের দুজনের দিকে।
শম্পা চ'ড় খাওয়া গালে হাত দিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“তুমি আমাকে মা’র’লে! তুমি আমার গায়ে হাত তুললে!”
গহন অগ্নিদৃষ্টিতে শম্পার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এর আগেও হাজার দিন নিষেধ করেছি তোমায় আমার স্ত্রীকে অপমান করবে না তুমি। বাংলা কথা কি তোমার মাথায় যায় না? ও আমার স্ত্রী। গহন কিফায়াতের স্ত্রী। এই বাড়ির কাজের লোক না যে তুমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে কথা বলতে পারো ওর সাথে। কিছু বলি না জন্য মাথায় উঠে গেছো। আমি চুপ থাকি জন্য ভেবেছো আমি কথা বলতে জানি না। প্রশ্রয় দিতে দিতে এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছো যে নিজের সীমা ভুলে যাচ্ছো তুমি।”
শম্পা একটা উত্তরও দিতে পারলো না। সিনথিয়া তো অনেকক্ষণ আগেই এক কোণায় গিয়ে লুকিয়ে পড়েছে। শম্পাকে চ'ড় খেতে দেখে ভয় পেয়েছে। ওর আর সাহসই নেই কিছু বলার। তবে চুপ থাকতে পারলেন না সালমা বেগম। উনি রাগান্বিত গলায় গহনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“গহন, বাইরের মানুষদের সামনে এসব কি ব্যবহার করছো তুমি শম্পার সাথে? ওর গায়ে হাত তুললে কেন?”
গহন একইভাবে অগ্নিদৃষ্টিতে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তার আগে তুমি আমায় বল মা আমার অনুমতি ছাড়া, আমাকে কোন কিছু না জানিয়ে, আমার বাড়িতে আমার বউয়ের বিচারসভা বসিয়েছো তুমি কোন সাহসে? কার থেকে অনুমতি নিয়ে তুমি আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে এখানে ডেকেছো? আমি তোমাকে বলেছিলাম এগুলো করতে?”
“ভদ্রভাবে কথা বলো গহন। ভুলে যেও না আমি তোমার মা। নিজের বোনকে না হয় অপমান করেছো। কিন্তু মা কে আর সবার সামনে অপমান করো না। আমি যা করেছি একদম ঠিক করেছি।”
“চূড়ান্ত রকম ভুল করেছো। এটা শুধু ভুল না অন্যায়।”
সালমা বেগমকে কথাটা বলে গহন আবারো শম্পার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,
“আর এই যে তুমি, তোমার শ্বশুর বাড়ি নেই? তোমার স্বামী সংসার নেই? নিজের সংসার ছেড়ে অন্যের সংসার নাক গলাতে আসো কেন? আমি যেন তোমাকে আর এক ঘন্টাও এই বাড়িতে না দেখি। ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নিজের শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে। এটা আমার স্ত্রীর সংসার। ওর সংসার ওকে করতে দাও। তুমি গিয়ে নিজের সংসার বুঝে নাও।”
সালমা বেগম আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে গহন হাত উঠিয়ে ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করো মা। এক ঘন্টা সময় দিচ্ছি আমি। ওর ছায়াও যেন আমি এই বাড়িতে না দেখি।”
সালমা বেগমকে কথাগুলো বলা শেষে গহন এবারে নিধির বাড়ির লোকজনদের দিকে তাকিয়ে, বিশেষত নীলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর আপনাদেরকে বলছি, আপনাদেরকে যে এখানে ডাকা হয়েছে একবার আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন আপনারা? নিধির দায়িত্ব তো আমি নিয়েছি। নিধিকে বিয়ে করেছি আমি। তাহলে আমার সাথে কথা না বলে আপনারা কিভাবে এখানে চলে এলেন ওর বিচার করতে? বিশেষ করে মা আপনাকে বলছি। আপনার মেয়ে হয়তো আপনার কাছে বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু আমার স্ত্রী আমার কাছে বেশি হয়নি। আমি জীবিত থাকা অবস্থায় ওকে এই বাড়ির বাইরে পা রাখতে দেব না। আপনাদের বাড়িতে তো কোনদিনও যেতে দেব না। আর আমি না থাকা অবস্থাতেও যেন আপনাদের খোঁচা খাওয়ার জন্য ওকে ওই বাড়িতে যেতে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি করে রেখে যাব। আমার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনাদের কাউকে ভাবতে হবে না। ওর স্বামী এখনো বেঁচে আছে।”
গহনের আর কারো সাথে আপাতত কোনো কিছু বলার ইচ্ছে হলো না। সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে এবারে শম্পা কথা বলল। হিংস্র গলায় বলে উঠলো,
“কাজটা কিন্তু তুমি ঠিক করলে না। তুমি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারো না। এটা আমার বাপের বাড়ি। আর তুমি আজ যে কাজটা করলে তার ফল কিন্তু তোমায় ভোগ করতে হবে।”
সাবিতও শুরু থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু পুরোটা সময় চুপ থেকেছে। ও চুপচাপ মজা দেখতে পছন্দ করে। অনেকটা সিনথিয়ার মত। তবে এবারে মনে হল একটু শম্পাকে সাহায্য করা দরকার। নিজের বোন তো। একটু খারাপ লেগেছে গহনের এমন ব্যবহারে। তার ওপরে আবার গহন গায়ে হাতে তুলেছে। শম্পার দিকে এগিয়ে এসে এক হাতে শম্পা কে আগলে নিয়ে সাবিত গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি আমার বোনের সাথে এমন ব্যবহার করতে পারো না ভাইয়া। দোষ তোমার স্ত্রীর। ও অপমান করেছে আমাকে, আমাদের সবাইকে। তোমাকেও তো অপমান করেছে। ও এই বাড়িতে থাকলে কিন্তু আমি থাকবো না। আমরা কেউ থাকবো না এই বাড়িতে।”
গহন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“দরজা খোলা আছে। যার যেদিকে ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে, জা'হা'ন্না'মে যাবে না কোথায় যাবে যেতে পারো। এই বাড়ি গহন কিফায়াতের, এই বাড়ি গহন কিফায়াতের স্ত্রীর। যদি কারো আমার স্ত্রীকে নিয়ে কোন অসুবিধা থাকে, আমার স্ত্রীর সাথে একই ছাদের নিচে থাকতে অসুবিধা থাকে তাহলে সে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমার স্ত্রী এই বাড়ির বাইরে পা রাখবে না। যার যার অসুবিধা সে যেন চলে যায়। আমি কারোর পরোয়া করি না। কারো ওপর নির্ভরশীলও না।”
গহনের কথাটা শুনে শম্পা আর সাবিত দুজনেরই যেন মাথাটা ঘুরে উঠল। সাবিত তড়িৎ গতিতে শম্পার কাঁধ থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। পাশ থেকে সালমা বেগম অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠলেন,
“তুমি কি আমাকেও চলে যেতে বললে? তোমার স্ত্রীর সাথে আমিও এক ছাদের নিচে থাকবো না।”
গহন সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে কাট কাট গলায় বলল,
“স্পষ্টভাবে বলেছি যার যার অসুবিধা সে চলে যেতে পারে। এখন তোমার অসুবিধা হলে তুমিও যেতে পারো। আমার স্ত্রী কোথাও যাবে না। সকালে সামান্য একটু রাগারাগি হয়েছে আর তোমরা তো ব্যাপারটা কে একেবারে তালাকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছো। আমি কেন ওর ওপর রেগে গিয়েছিলাম জানো? ওর বোকামির জন্য। আমি খুব ভালো করে জানতাম কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে। আমি সেটা বলেও গেছি। কিন্তু তোমরা কেউ বোঝোনি আমার কথা। নিজের বোকামির জন্য আজ নিধিকে এত অপমান সহ্য করতে হয়েছে। ও যদি একটু আমার কথা শুনে চলতো তাহলে আজ এই পরিস্থিতি তৈরিই হতো না সেইজন্য আমি রেগে গিয়েছিলাম। তোমরা তো একেবারে তিলকে তাল বানিয়ে ছেড়েছো। আমাকে বলা নেই, কওয়া নেই আমার স্ত্রীর বিচার সভা বসিয়ে ফেলেছো। কত বড় সাহস তোমাদের সবার। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমাদের দেখে। আমার স্ত্রী আমার সম্মান। তাকে তোমরা এতো মানুষের সামনে অসম্মানিত করতে উঠে পড়ে লেগেছো। তোমাদের দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমি কখনো কিছু বলি না জন্য তোমরা যেন ভেবে নিয়েছো আমি বোবা। বিবেকহীন ভেবেছো? তোমার দুরব্যবহার সহ্য করি, তোমার অবহেলা সহ্য করি, তোমার নোংরা ষড়যন্ত্র গুলো বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকি তোমায় সম্মান করি বলে। তোমার উপর আমার ঋণ জমা হয়ে আছে বলে। তাই বলে আমার স্ত্রীর সাথে যা ইচ্ছে তাই করবে আর আমি ছেড়ে দেবো? আমি নিজের বেলায় অসহায় হতে পারি, নিজের প্রতি নিজে অবিচার করতে পারে। কিন্তু নিধির প্রতি এক চিলতে অবিচারও করব না।”
কথাগুলো বলা শেষে গহন থামল। জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপরে আবার নিজের পরিবারের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি আবারো স্পষ্ট গলায় বলছি দরজা খোলা আছে। যার যার আমার স্ত্রীর সাথে থাকতে অসুবিধে সে যেন চলে যায়। যে আমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখতে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করেনা তার আমার সাথেও সম্পর্ক রাখার কোন প্রয়োজন নেই। যাদের আমার স্ত্রীকে পছন্দ না তারা যেন ভুলে যায় গহন কিফায়াতের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল।
কেউ আর কোন উত্তর দিলো না। সবাই চুপ করে গেছে। গহন বুঝলো সবাই ঠান্ডা হয়ে গেছে। ওর আর কিছু বলারও প্রয়োজন নেই। গহন এবারে এগিয়ে গেল নিধির দিকে, যে এখনো কাঁদছে।
নিধির চোখের জল মুছে দিল গহন। তবে মুহূর্তের মাঝে আবারও গাল দুটো ভিজে উঠলো। গহন এবারে শক্ত করে নিধির একটা হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
“বোকামি করতে নিষেধ করেছিলাম আমি। কিন্তু ঠিক জায়গায় উত্তর দিতে নিষেধ করিনি। সবাইকে এক বাক্যে বলে দিতে পারোনি যে তোমার স্বামী কখনো তোমার হাত ছাড়বে না? এত কথা শুনছিলে কেন বোকার মতন? ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে। নতুন ফোন তো কিনে দিয়েছি, ফোন চালাতে। বোকামি ঠিকই করতে পারো অথচ কাজের কাজ হয় না তোমায় দিয়ে।”
নিধি এবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আপনিই তো সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। আপনি সকালে ওভাবে রেগে বেরিয়ে না গেলে আপনার মা বোনের সাহস হতো না এসব করার।"
“বাধ্য করেছিলে তুমি আমায়। প্রচন্ড মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। সে জন্য চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি তোমার হাত ছেড়ে দেবো। তুমি আমার জন্য এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানো? আমার জীবনে কতটা অংশ জুড়ে তুমি আছো জানো?”
নিধি ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলল,
“আমায় না বলে বাকিদের কে বলুন।”
গহন হালকা একটু হেসে উঠে বলল,
“প্রয়োজন নেই। আমার কাছে কারো মূল্য নেই। শুধু তোমার মূল্য আছে। তুমি আমার কাছে এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ নিধি যে আমার জীবনে আর কেউ থাকুক বা না থাকুক আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তবে তোমার থাকতেই হবে। সবার নাটক, মেকি ভালোবাসা দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। সবার হাতের পুতুল হয়ে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত। যাদের সামান্য স্বার্থে আঘাত লাগলে আমার প্রতি থাকা সমস্ত ভালোবাসা উবে যায় তাদের সেই মিথ্যে ভালোবাসা দেখে দেখে আমি ক্লান্ত। আর আমি এখন অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি তোমার ভালোবাসায়, তোমার যত্নে। যা হয়েছে সব ভুলে যাও। আর একটা কথা বুঝে নাও, আর কারো সাহসও হবে না তোমাকে কিছু বলার। এতদিন আমি চুপ করে ছিলাম জন্য সবাই অনেক কিছু বলার সুযোগ পেয়েছে। তবে আর সাহস হবে না কারো। এখন ঘরে চলো।”
কথাটা বলে গহন নিধির হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে ঘরের দিকে চলে গেল। সালমা বেগম ধপ করে বসে পড়লেন। কি হয়ে গেল এটা? উনিতো ভেবেছিলেন নিধি আর গহনের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটা ওনাকে কাজে লাগাতে হবে। সত্যি উনি সকালে গহনের ব্যবহার দেখে ভেবেছিলেন গহন হয়ত আর নিধিকে গ্রহণ করবেনা। যে রেগে গেছিলো অন্তত কিছুদিন শাস্তি দেওয়ার জন্য হলেও হয়তো নিধিকে বাপের বাড়ি পাঠাতে পারবেন। কিন্তু কিছুই তো হলো না। ওদের সম্পর্ক তো ঠিকই আছে। বরং মধ্যে থেকে ওনার আর গহনের সম্পর্ক একেবারে শেষ হয়ে গেল। সম্মান, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা কিচ্ছু রইলো না আর। এই সবটা তিনি নিজের হাতে শেষ করলেন। নিজের বোকামি আর তাড়াহুড়ো দিয়ে শেষ করলেন। এত বড় ভুল কি করে করে ফেললেন সালমা বেগম?