বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৫৬

🟢

সকালে অফিস যাওয়ার আগে গহন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সাড়বে ভাবলো। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আজ আটটা বেজে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে ফোনটা নিয়ে সোফায় বসে আগে পিয়ালের নাম্বারে কল করলো। কয়েকবার রিং হতেই পিয়াল ফোনটা রিসিভ করল। প্রথমে স্বাভাবিক কিছু কথাবার্তা শেষে গহন বলল,

“শম্পা কে কবে নিতে আসছো?”

ফোনের অপর পাশে থাকা পিয়াল কপাল কুঁচকে বলল,

“হঠাৎ এই কথা বললে যে গহন? তুমি তো এভাবে বলার কথা না?”

“তাহলেই ভাবো শম্পার আচরণ কোন পর্যায়ে চলে গেছে যে আমি তোমায় এই কথাটা বলতে বাধ্য হচ্ছি। যাই হোক, এসব কথা তুলতে চাই না। আজই সময় করে এসে ওকে নিয়ে যেও।”

“না গহন। আমি আসবো না ওকে নিতে। আর না ও এলে আমি ওকে আমার বাড়িতে তুলবো।”

পিয়ালের বলা কথাটা যেন গহনের মাথার উপর দিয়ে গেল। অবুঝের মতন বলল,

“হ্যাঁ? কি বললে?”

“বললাম তোমাদের বাড়ির মেয়েকে তোমরা তোমাদের কাছে রেখে দাও। ওর সংসার করার কোন ইচ্ছে নেই। আমি ভেবেছিলাম আরেকটু সময় নিয়ে তোমায় এই কথাটা বলবো। কারণ মন মেজাজটা ভালো ছিল না আমার। তবে তুমি যেহেতু কল করলে তাই তোমাকে বলছি। ও যদি এসে এখন আমার পায়েও ধরে তাও ওকে আর আমি আমার ঘরে তুলবো না। আমি ভুলে গিয়েছি যে কোন কালে আমার বিয়ে হয়েছিল, আমার স্ত্রী ছিল, আমার সন্তানদের মা ছিল।”

“রিল্যাক্স পিয়াল। শান্ত হও। কি বলছো এসব বুঝতে পারছো? ঝগড়া হয়েছে শম্পার সাথে?”

“কোন দিন ঝগড়া হয় না বলতে পারো? কোন বিষয়ে ঝগড়া হয় না? ওর মতন মেয়ের সাথে সংসার করা যায় না গহন। শম্পার মত মেয়েরা শুধু সংসারে অশান্তি তৈরি করতে জানে, সম্পর্ক ভাঙতে জানে, মানুষকে অসম্মান করতে জানে। এর থেকে বেশি আর কিছু জানে না। আসলে তোমার শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে কিন্তু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, শম্পা এতটা প্রশ্রয় পেয়েছে শুধুমাত্র তোমার মায়ের জন্য। তোমার মা চায় না তার মেয়ে সংসার করুক। উনি সারা জীবন ওনার ছেলে মেয়েদেরকে নিজের কোলেই রাখতে চান। বেশ রাখুক। আমার আর দরকার নেই ওনার মেয়েকে।”

“কিন্তু হয়েছেটা কি সেটা তো বলবে।”

পিয়াল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তোমার শোনার রুচি হবে না, বাদ দাও। আর দয়া করে আমাকে এই অনুরোধটা করো না গহন যেন আমি আবার সবটা মিটমাট করে নেই। অনেক চেষ্টা করেছি। বিয়ের আট বছর হচ্ছে। আট বছর ধরে শুধু আমি চেষ্টাই করে গেছি। আমার জীবনটা একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। ভালো-মন্দ কোন কিছু আজকাল আর অনুভবই করতে পারিনা। কাউকে ভালোবাসলে কেমন অনুভূত হয় সেটাই বুঝতে পারিনা। আরে ও তো আমার বাচ্চাদের অবধি ছাড়েনি। ছেলেটা ছোট জন্য কিছু বলে না। মেয়েটা বড় হয়েছে। ও নিজের বাবাকে সহ্যই করতে পারে না। ওর দাদা-দাদি কে সহ্য করতে পারে না। যখন যেটা চায় সেটা দিতেই হবে। হোক সেটা আমার সামর্থের বাইরে। আমার এত সামর্থ্য নেই ভাই। কথায় কথায় আমি শম্পা কে নতুন নতুন গয়নাও দিতে পারব না, বাড়িও দিতে পারব না, গাড়িও দিতে পারব না। আর না আমি আমার বৃদ্ধ মা-বাবাকে ছাড়তে পারবো। ওকে ওর ব্যবস্থা করে নিতে বলো।”

“আর একবার ভেবে দেখো পিয়াল।”

পিয়াল সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিলাে না। চোখ বন্ধ করতেই শম্পার কিছু কার্যকলাপ ভেসে উঠল চোখের সামনে। মুহূর্তের মাঝে রাগে ঘৃণায় খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে ফেলল।

“আর সম্ভব না গহন। আমার পক্ষ থেকে আর কিচ্ছু সম্ভব না। রাখছি।”

কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিলো পিয়াল। গহন ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ থ মেরে সেখানে বসে রইলো। গহন খুব ভালো করেই জানে পুরো দোষটাই শম্পার। পিয়ালের মতন মানুষরা কখনো কোন দোষ করতেই জানে না। গহন পিয়ালের মাঝে খানিকটা নিজেকে দেখতে পায়। যে বেশিরভাগ সময়টাই সহ্য করে যায়। তবে পিয়ালের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে গহনের মতন। সেজন্যই তো চূড়ান্ত পদক্ষেপটা নিয়ে নিলো।

__________

“আরে এটা কি রান্না করেছো? লবণ ঝাল কই? আর এটা কিসের তরকারি?”

সিনথিয়া নাক মুখ কুঁচকে কথাটা বলতেই নিধি গম্ভীর গলায় বলল,

“কাঁচা কলার ঝোল। ওটা তো তোমার খাবার না। ওটা গহনের খাবার।”

সিনথিয়া একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তাই বলো। তাইতো বলি এই রোগীর খাবার কোত্থেকে এলো। যাইহোক আমার খাবার দাও।”

“নিয়ে এসো রান্না ঘর থেকে।”

নিধি কথাটা বলতেই সিনথিয়া কপাল কুঁচকে বলল,

“হ্যাঁ? কি করবো?”

“কথা কানে যায় না? রান্নাঘর থেকে গিয়ে নিজের খাবার নিয়ে এসো। অবশ্য আগে দেখো গিয়ে রান্না হয়েছে কিনা।”

“মানেটা কি? তুমি রান্না করনি?”

নিধি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি যা রান্না করেছি সেটা তো খেতে পারবে না। আর আমার এত ঠ্যাকা পড়েনি যে তোমাদের মতন কুটনিদের তিনবেলা কষ্ট করে রান্না করে খাওয়াবো। অনেক খাইয়েছি। তাও মন ভরাতে পারলাম না। আজ থেকে আর কারো জন্য রান্না করতে পারবো না আলাদা করে। কাজের লোক আছে। রান্না করছে। ওর রান্না যদি গিলতে পারো ভালো কথা। না হলে নিজেই নিজের ব্যবস্থা করে নাও। আমার কিছু করার নেই।”

সিনথিয়ার পাশের চেয়ারে তখন সাবিত বসেছিল। সকালে নাস্তা করার জন্য এসেছিলো। আজকে সকাল সকাল উঠে পড়েছে। তৈরি হয়ে এসে একেবারে বসেছে। বাইরে যাবে। সময় মত খাবার না পাওয়ায় মাথাটা গরম হয়ে গেল। টেবিলের পায়ায় সজোরে আঘাত করে উঠে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার কি মনে হয়, তোমার নাটক দেখার জন্য এখানে এসে আমি বসেছি? রান্না করবে না তো

বা ল কামে তোমাকে আনা হয়েছে? এই আজাইরা দেমাগ আমার সামনে দেখাবে না।”

নিধি হা করে আগে কিছুক্ষণ সাবিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। বোধগম্য হলোনা সাবিতের এই ব্যবহারটা। একবার সন্দেহ হলো এটা ভেবে যে সাবিত কি আদৌও এই কথাগুলো ওকে বলল কিনা। এভাবে তো সাবিত ওর সাথে কথা বলে না।

“আপনি কি আমায় বললেন এই কথাগুলো?”

সাবিত খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“আশেপাশে আর কাউকে দেখতে পাচ্ছো? নাটক

মা রা নো র জায়গা পাওনা? পুরো বাড়িতে তান্ডব চালিয়ে রেখে এখন আবার নতুন ঢং হচ্ছে। যাও গিয়ে খাবার নিয়ে এসো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাবার চাই আমার।”

নিধি গহনের জন্য প্লেটে খাবার বেড়ে ঘরে যাচ্ছিলো। হাতে থাকা সেই প্লেটটা শব্দ করে টেবিলের উপরে রেখে হিংস্র দৃষ্টিতে সাবিতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনার চাকর মনে হয় আমাকে? নাকি আপনার অবলা, বোবা বউ পেয়েছেন। একদম গলা উঁচিয়ে কথা বলবেন না। নয়ত গলা টিপে ধরবো। যে জিভ দিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে নোংরা বাক্য বলছেন না, সে জিভ একেবারে টেনে ছিঁ ড়ে ফেলবো। আর ভুলেও আমার সামনে এসব বা ল ছা ল বলতে আসবেন না।”

“হাজার বার বলবো। কি করবে? কি ক্ষমতা আছে তোমার?”

নিধি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“আপনাকে পঙ্গু বানিয়ে রাখার ক্ষমতা আছে। দেমাগ একেবারে বের করে ছাড়বো। গহনকে একবার বললে না টাকা পয়সা দেওয়া যখন সব বন্ধ করে দেবে, বাড়ি থেকে যখন লা থি দিয়ে বের করে দেবে তখন দেমাগ এমনি বেরিয়ে যাবে। তখন বুঝবেন নিধির কি ক্ষমতা। চোখ নামিয়ে কথা বলুন। চুপচাপ বসুন। রান্না হলে দিয়ে যাবে, গিলবেন।”

সাবিত এবারে আঙুল উঁচিয়ে নিধি কে শাসিয়ে বলল,

“বড্ড বার বেরেছে কিন্তু তোমার। এই বাড়ি থেকে তুমি কেন গহনের বাপ এলেও আমাকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ডাকো তোমার গহনকে। দেখি ওই শা লা কি করে বের করে আমায়। শা লা বা ই ন চো দে র বাচ্চা গুলো সব এই বাড়িতে এসে উঠেছে।”

“কাকে বললে তুমি এ কথাগুলো?”

নিধি নিজেই অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সাবিতের দিকে। সাবিতের মুখের ভাষা শুনে ওর চোখ কপালে উঠে গেছে। ভদ্রতার খোলস থেকে একে একে সবাই বেরিয়ে আসছে। এর মাঝে গহনের কন্ঠে ধ্যান ভাঙলো। গহন এগিয়ে এসে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সাবিতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কাকে উদ্দেশ্য করে তুমি ওই কথাগুলো বললে? আগে তো কখনো তোমার মুখে এই ধরনের ভাষা শুনিনি আমি।”

সাবিত হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বলল,

“আগে শোনোনি তার কারণ প্রয়োজন হয়নি। শা লা তোমার মতন বে ঈ মা ন এই দুনিয়ায় দুটো দেখিনি। আমার মা খাইয়ে, পরিয়ে মানুষ করলো। আমার মা আদর যত্ন দিল। আর কাল রাত থেকে আমার মা অসুস্থ তাকে একটা বার দেখতে গেলে না তুমি। আরে তোমার মতন ছেলেকে তো বি ষ খাইয়ে মে’রে ফেলা উচিত।”

“সেই চেষ্টাও বোধহয় করা হয়েছিল। আমি ভুল না হলে সেই চেষ্টাও বাকি রাখা হয়নি।”

নিধিসহ উপস্থিত প্রত্যেকে চমকে উঠে তাকালো গহনের দিকে। ব্যাপারটা কারোরই ঠিক বোধগম্য হলো না। নিধি গহন কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,

“কি বললেন? কি চেষ্টা করেছে?”

নিধির বেলায় গহনের কন্ঠটা শান্ত হলো।

“কিছু না। পরে বলব।”

“এক্ষুনি বলুন। মা রা র চেষ্টা করেছিল নাকি?

বি ষ খাইয়া ছিল ওই সালমা? একবার শুধু আপনি বলুন বি ষ খাইয়েছিলো। সবকটাকে আজকেই বি ষ খাইয়া কাত করে ফেলব আমি।”

বিজ্ঞাপন

“আরে না তেমন কিছু না। তুমি চুপ করো। কথা বলতে দাও সাবিতের সাথে। পরে আমরা এই নিয়ে কথা বলব।”

নিধিকে কথাটা বলে গহন আবারো সাবিতের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,

“তোমায় কিছু কথা বলি। বয়সে তুমি আমার থেকে অনেকটা ছোট। অতীতের অনেক কিছুই তুমি জানো না। আমি বলব কোন কিছুই জানো না। কার যে কার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত সে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই।”

“আমার এত জ্ঞানের প্রয়োজনও নেই। তবে এতোটুকু তো যেকেউ বলবে যে তুমি বেইমান। বেইমানি করে তো ম রা র আগে বাবার থেকে সব সম্পত্তিও হাতিয়ে নিয়েছো। আর কত বেইমানি করবে? আমাদেরকে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছো।”

গহন মোটেও রাগলো না। বরং সামান্য একটু হেসে বলল,

“তাই নাকি? বেশ ঠিক আছে। এবারে তোমাকে বোঝাবো হাতের পুতুল বানানো কাকে বলে। শোনো, প্রত্যেক মাসে মাসে তোমার একাউন্টে যে মোটা অংকের টাকা পাঠাই আজ থেকে সেটা বন্ধ হলো। তোমার যাবতীয় খরচ নিজে জোগাড় করে নেবে। আমার নামে থাকা ফার্মহাউস, ফ্ল্যাট যে তোমার নামে করার প্রক্রিয়া চলছিল সেটা আজই বন্ধ করার ব্যবস্থা আমি করবো। যেদিন নিজেকে মানুষ বানাতে পারবে, আমায় সম্মান দিতে শিখবে সেদিনই আবার হাত খরচের টাকা পাবে। তাও বিনা পরিশ্রমে পাবে না। অফিসে যাবে, কাজ করবে। তারপর একজন কর্মচারীর যে বেতন হয় সেটাই পাবে।”

সাবিত কটমটে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ গহনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। দাঁত চিবিয়ে বলল,

“তোমার কর্মচারী হবো আমি সেই আশা ত্যাগ করো। আমার বাপেরই যথেষ্ঠ সম্পত্তি আছে। সারা জীবন এভাবে রাজা সেজে বসে থাকতে পারবেনা তুমি। আমিও এই বংশের ছেলে। আমাকে আমার অংশ দিয়ে দাও। তারপরে যা ইচ্ছে কর।”

“এ ব্যাপারে বরং তুমি মায়ের সাথে গিয়ে কথা বলো। মা খুব ভালো করে জানে কার কোথায় কি অংশ আছে, কাকে কখন তার অংশ দিতে হবে।”

“মা কে? আমার অংশ আমি নেব মাকে কেন জিজ্ঞেস করতে হবে? তোমাকে বলছি ভালো মানুষের মতন দিয়ে দেবে। শা লা এই বাড়িতে থাকার উপায় নেই।”

সাবিত কথাটা বলে বেরিয়ে গেল। সিনথিয়া তো একেবারে চুপসে গেছে। মাথা নামিয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসেছিল এতক্ষণ। সাবিত সেখান থেকে চলে যেতেই ও নিজেও চলে গেল।

গহন এবারে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এইজন্য, শুধুমাত্র এই কারণগুলোর জন্য আমি কথা বলি না নিধি। একেকজনের ব্যবহার দেখেছো? কেউ সম্মান দিতে জানে না। জোর করে এদের থেকে সম্মান কিভাবে নেব? ওদের শিক্ষা নেই, বিবেক নেই, মনুষ্যত্ব, ভদ্রতা কিচ্ছু নেই। আমার তো আছে। আমি সব সময় নিজের সম্মান রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছি। এবার কি বুঝেছো কেন আমি চুপ থাকি?”

নিধি গম্ভীর গলায় বলল,

“তার আগে বলুন কি করেছিলো আপনার সৎ মা? বি ষ খাইয়েছিল?”

“আরে তেমন কোনো ব্যাপার না। আমি এমনিতেই কথাটা বললাম।”

নিধি কপাল কুঁচকে বলল,

“এটা এমনি বলার মতন কোনো কথা?”

“আসলে আমার একবার খাবার থেকে

বি ষ ক্রি য়া হয়েছিল। সেই ব্যাপারটা নিয়ে বাবা, মা কে সন্দেহ করেছিল। যদিও আমি জানি ওটা ভুল ছিল। আমি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়েছিলাম। ওটা শুধু সাবিত কে ভয় দেখানোর জন্য বলেছি।”

নিধি বুঝলো এই ছেলের মুখ দিয়ে আসল কথা বের হবে না। ওকেই আসল কথা শোনার ব্যবস্থা করতে হবে।

_________

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটা ফুলের দোকানের সামনে গাড়ি থামালো গহন। নিধির জন্য সবসময় খাবার জিনিসই নিয়ে যায়। কখনো ফুল নিয়ে যাওয়া হয়নি। তাই ভাবল আজ একটু ফুল নিয়ে যাবে।

দোকান থেকে কয়েকটা তাজা গোলাপ কিনলো। একটা বেলি ফুলের গাজরাও কিনলো। টাকাটা দিয়ে গহন যেই না চলে যেতে ধরলো ওমনি কোত্থেকে যেন একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো ওর সামনে। গহন চেনে না মেয়েটাকে। অথচ মেয়েটা হাস্যজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে আছে গহনের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে গহন কে যেন চেনে। কিন্তু কে এই মেয়েটা?

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই মেয়েটা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলে উঠলো,

“আপনার তাকিয়ে থাকা দেখেই বুঝতে পেরেছি ভাইয়া যে আপনি আমায় চিনতে পারেননি। তবে আমি কিন্তু আপনাকে চিনি। আমি স্মৃতি।”

গহন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“ও আচ্ছা। আমি গহন। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না।”

“আমি জানি তো ভাইয়া আপনার নাম গহন। আর আমাকে আপনি করে ডাকছেন কেন? আমি আপনার ছোট। তুমি করে ডাকুন।”

গহন অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“আসলে অপরিচিত কাউকে তুমি বলে ডাকতে আমার অস্বস্তি হয়।”

“তাই নাকি? তাহলে এখন ডাকতে হবে না। যখন আপনার বাড়িতে গিয়ে উঠবো সারা জীবনের জন্য তখন কিন্তু তুমি বলে ডাকতেই হবে। সিনথিয়াকেও তো নিশ্চয়ই তুমি বলেই ডাকেন। আমিও তো আপনার ছোট বোনের মতনই।”

গহনের মাথার উপর দিয়ে গেল পুরো ব্যাপারটা। কে এই মেয়েটা? কেন গহনের বাড়িতে গিয়ে উঠবে? সিনথিয়া কে কিভাবে চিনলো? তাহলে কি সিনথিয়ার বান্ধবী?

গহন যেই না জিজ্ঞেস করতে যাবে অমনি কোত্থেকে যেন দৌড়াতে দৌড়াতে মেয়েটার পেছনে এসে সাবিত দাঁড়ালো। হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। গহনকে দেখেই মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো সাবিতের। এদিকে এই মেয়েটার সাথে সাবিতের কি সম্পর্ক সেটা বুঝে উঠতে পারছে না গহন। সাবিত সেখানে এসে দাঁড়াতেই স্মৃতি আবারও গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানেন ভাইয়া, সাবিত এখনও আপনাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে চায় না। কতবার করে ওকে বলেছি একবার যেন আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যায়, একটু আপনাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু ও নিয়ে যায়নি৷ তবে আমি কিন্তু আপনাদের সবার ছবি দেখেছি। সেজন্যই তো হঠাৎ করে আপনাকে দেখে চিনতে পেরে ভাবলাম পরিচয় করবোই করবো আজ আপনার সাথে।”

গহন প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কে আপনি? সাবিতের সাথে কি সম্পর্ক?”

স্মৃতি মুখে হালকা একটু লজ্জা ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আমি আর সাবিত রিলেশনে আছি ভাইয়া। আপনারা মত দিয়ে দিলে খুব তাড়াতাড়ি বিয়েও করে নেব।”

গহন পূর্বের মতোই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তবে যে ঠিক কতটা অবাক হয়েছে সেই অনুভূতি প্রকাশ করে বোঝাতে পারবে না। এদিকে স্মৃতি কথাটা বলার সাথে সাথে সাবিত ওর বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো,

“কি করছো কি এসব বেবি? আমি তোমায় বলেছিলাম না আমার বাড়ির লোকদেরকে এখন এই কথাটা বলা যাবে না।”

স্মৃতি সাবিতের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“ধুর। তোমার আশায় থাকলে আমাদের বিয়ে এই জন্মে আর হবে না।”

সাবিত কে কথাটা বলা শেষে স্মৃতি আবারও গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া দেখুন না, আজ দেড় বছর হলো আমরা সম্পর্কে আছি। কিন্তু এই ছেলেটা বিয়ের কথা শুনতেই পারে না। এদিকে আমার বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। আপনারা একটু আমার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান না ভাইয়া? এই ছেলেটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ও শুধু পারেই ভালোবাসতে। এ ছাড়া আর কিচ্ছু পারে না। ভাইয়া প্লিজ হেল্প করুন না! আমি তো আপনার ছোট বোনের মতন।”

গহন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ওর এখন কি বলা উচিত। স্মৃতির কথাগুলো শুনে তো বেশ ভালোমতোই বুঝতে পারল যে সাবিতের যে বউ আছে, বাচ্চা হবে সেই ব্যাপারে কিছু জানে না। এদিকে গহনের এসব ভাবনার মাঝে সাবিত বলে উঠলো,

“ভাইয়া, তুমি বাড়ি চলে যাও। তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি সামলে নেব। আর কিছু বলার দরকার নেই। চলে যাও তুমি।”

এবারে গহনের অভিব্যক্তিতে বদল ঘটলো। কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সাবিতের দিকে। সাবিত কেন যেন নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিতে বাধ্য হল। এদিকে গহনকে হঠাৎ করে রাগী দৃষ্টিতে সাবিতের দিকে তাকাতে দেখে স্মৃতি একটু ভয় পেল। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“আপনি কি রেগে গেলেন ভাইয়া? কিন্তু সাবিত যে আমাকে বলেছিল আপনি নাকি খুব ঠান্ডা মানুষ। আপনার অফিসে আমার বাবা শুরুর দিকে চাকরি করতো। আমাকে বলেছে আপনি নাকি খুবই ভালো। রাগারাগি করেন না। অনেক প্রশংসা করেছে। এমনকি, সাবিত আপনার ভাই জেনেই আমার বাবা রাজি হয়েছে ওর সাথে বিয়ে দিতে। কিন্তু আপনি এটা শুনে রেগে গেলেন কেন ভাইয়া?”

সাবিতের দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে গহন এবারে স্মৃতির দিকে তাকালো। খারাপ লাগলো মেয়েটার জন্য। মায়া হল। সেই সাথে একটা অপরাধবোধও কাজ করল গহনের মাঝে। যতই হোক সাবিত তো ওরই ভাই। এভাবে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করছে খারাপ তো লাগবেই। গহনের মনে হলো ওর এখান থেকে চুপচাপ চলে যাওয়াটা উচিত হবে না। আবার সরাসরি এখন কিছু বলাও উচিত হবে না।

“তোমার কন্টাক্ট নাম্বারটা পাওয়া যাবে?”

স্মৃতি খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল,

“নিশ্চয়ই ভাইয়া। কেন পাওয়া যাবে না? আপনি নোট করুন। আমি বলছি।”

“তোমার বাবার নাম্বারটাও দাও।”

সাবিত অনেক আটকানোর চেষ্টা করলো স্মৃতিকে। তবে স্মৃতি কোনমতেই শুনলো না। ও যেন ঠিক করেই নিয়েছে যে বিয়ের কথা একেবারে পাকা করেই ছাড়বে। স্মৃতির থেকে নাম্বারটা নেওয়া শেষে গহন ওকে বলল,

“এই নাম্বারে যোগাযোগ করলে পাবো তো তোমায়?”

“নিশ্চয়ই।”

“ঠিক আছে। নাম্বারটা খোলা রেখো। খুব শীঘ্রই কথা বলবো তোমার সাথে।”

আর কোন কথা না বলে গহন চুপচাপ চলে গেল গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে। এতদিন নিধি কে নিষেধ করেছে এই ব্যাপারে কথা না বলতে। তবে এবারে গহনের মনে হচ্ছে ওকেই দেখতে হবে পুরো বিষয়টা। অন্তত স্মৃতির জন্য হলেও দেখতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প