বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৫৯

🟢

পিয়ালকে আজ একবার বাড়িতে ডেকেছে গহন। অনেক অনুরোধ করার পর পিয়াল আসতে রাজি হয়েছে। সেজন্য আর আজ অফিসে যায়নি গহন। বাড়িতে বসে কাজ করছে।

গহনের কাজের ব্যস্ততার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকিয়ে যে গহন দেখবে কে কল করেছে সেই সময়টাও হলো না। কোনমতে শুধু হাতরে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। তৎক্ষণাত অপর পাশ থেকে কোন উত্তর ভেসে এলোনা।

কারো কন্ঠ না পেয়ে গহন আবারো জিজ্ঞেস করলো,

“কে বলছেন?”

এবারও তৎক্ষণাত কোন উত্তর ভেসে এলো না। কিছুটা সময় নিয়ে অপর পাশ থেকে একটা মেয়েলী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“আমার আসল পরিচয়টা দিলে তো তোমার পছন্দ হবে না। তাও কি দেব, তুমি বলো?”

সঙ্গে সঙ্গে গহনের কাজের হাত থেমে গেল। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে একবার নাম্বারটা দেখলো। অপরিচিত নাম্বার। কন্ঠটাও হালকা একটু পরিচিত মনে হলো। এর আগেও শুনেছে। তার মানে কি গহন যাকে সন্দেহ করছে সেই কল করেছে?

পুনরায় ফোনটা কানে ধরে জিজ্ঞেস করলো,

“কে বলছেন?”

“তোমার মা।”

গহনের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো। আজকাল এই ‘মা’ শব্দটা শুনলেই কেমন যেন ভয় হয়। এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব হয়। তারপরও যে কেন ঘুরে ফিরে বারবার ওর কানে এই শব্দটাই ভেসে আসে বুঝে উঠতে পারে না। তার থেকেও বড় কথা এই মহিলা কেন আবার ওকে কল করেছে? কেন এত বছর পর যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন? যখন ছেড়ে চলেই গিয়েছেন আবার ফিরে আসার কি কোন মানে হয়?

গহনের এসব ভাবনার মাঝে ফোনের অপর পাশ থেকে কবরীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“দেখেছো, বলেছিলাম না আমার পরিচয় পেলে তোমার পছন্দ হবে না। চুপ করে গেলে কেমন। কিছু তো বলো?”

ধ্যান ভাঙলো গহনের। নির্জীব গলায় বলল,

“বলার মতন কি কিছু বাকি আছে আমাদের মাঝে?”

“তুমি চাইলেই তো বলার মতন কথা তৈরি হতে পারে।”

“তাহলে ধরে নিন আমি চাই না। আপনি সম্পর্কটা শেষ করতে চেয়েছিলেন, আমি তাতে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছি। সবশেষ আজ আর কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাহলে কিসের আশায় বারবার আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন? আমার কাছে আপনাকে দেওয়ার মতন কোন কালেই, কোন কিছুই ছিল না। আর না আপনার আমার থেকে কোন কিছু চাওয়ার ছিল। তাহলে অযথা আমাকে বিব্রত করার মানে কি?”

কবরী তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিতে পারলেন না। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে আগে নিজের কান্না নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে নিয়ে ফোনটা আবারো কানে ধরে গহনকে বললেন,

“আমার ভুলের কি কোন ক্ষমা হয় না? আমি কি করলে তুমি আমায় ক্ষমা করবে বলো? আমি কিভাবে বোঝালে তুমি আমায় বিশ্বাস করবে? আমার পরিস্থিতিটা একবার বোঝো, বাবা। আমি কোন পরিস্থিতির মাঝে ছিলাম, কেন তোমাদের ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম সেটা তো একবার বোঝার চেষ্টা করো। তুমি তো বড় হয়েছো। এখন তো অন্তত আমার পরিস্থিতিটা বুঝবে।”

গহন একবার ভাবলো কথা বলবে না। ফোনটা সরাসরি কেটে দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হলো যে একটু কিছু বলা দরকার। কবরী বোধহয় নিজের ভুলটা খুব হালকা ভাবে দেখছেন। সেজন্য এত সহজে ক্ষমা চাইছেন। একটা লম্বা শ্বাস টেনে গহন বলল,

“আপাতত আমি আপনার পরিস্থিতিটা বুঝতে চাইছি না। শুধু এতোটুকু বলুন, যদি আমার দায়িত্ব পালন নাই করতে পারবেন তাহলে আমাকে জন্মটা দিয়েছিলেন কেন? একটা বাচ্চার বড় হওয়ার পেছনে তার মায়ের ভূমিকা থাকে সর্বাধিক। আপনি একজন শিক্ষিত মহিলা হয়ে তো এই কথাটা আপনার জানা উচিত ছিল। আমি যখন আপনার কাছে এতটাই অপ্রিয় ছিলাম, বোঝা ছিলাম তাহলে আমাকে জন্ম দেওয়ার মানেটা কি বলুন? আমাকে জন্ম দিয়েই তো একটা ভুল করেছিলেন। তার উপরে আবার আমাকে এমন একটা পরিবেশের মাঝে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন যে, জীবনটা আমার জাহান্নাম হয়ে উঠেছিল। এত কিছু ভুলে কি করে আবার সবটা নতুন করে শুরু করবো বলতে পারবেন?”

কবরী এবারে কোনমতেই আর নিজের কান্না আটকাতে পারলেন না। শব্দ করে কেঁদে উঠে বললেন,

“সুখের আশায় জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়ে গিয়েছিল। চারিদিকে শুধু একটু সুখ হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। তোমার ওপরে আমার কোন অধিকারই ছিল না। তোমাকে শুধু আমি জন্মই দিয়েছিলাম। কিন্তু মা হিসেবে কখনো কোন অধিকার খাটাতে পারিনি। সেজন্য তোমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে আসার কথাও ভাবতে পারিনি। তোমার বাবা কোনমতেই তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে দিতেন না।”

“সেজন্যই ভিড়ের মাঝে শপিংমলে একা ফেলে রেখে গিয়েছিলেন? নাকি সেটাও আমার বাবা বলেছিল। চলে যেতেন ভালো কথা। তবে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে রেখে গিয়েছিলেন কেন? বলেছিলেন কেন যে ফিরে আসবেন? আসলে, আমি আপনার জীবনের একটা অভিশাপের মতন ছিলাম। আপনার দুঃখ কষ্টে জর্জরিত জীবনটা আরো দুর্বিষহ করে তুলেছিলাম আমি তাই না? খুব বেশি বোধ হয় অসহ্যকর হয়ে উঠেছিলাম আপনার জন্য। নইলে কি আর কোন মা তার সন্তানকে ছেড়ে এভাবে চলে যেতে পারে! এখানেও বোধহয় দোষটা আমারই। আপনি মা হিসেবে ব্যর্থ নন। কিন্তু আমি ছেলে হিসেবে ব্যর্থ।”

কথাটা বলে গহন এবারে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কলটা কেটে দিল। নাম্বারটা ব্লক করতে চাইলো গহন, তবে কেন যেন পারলো না। সেজন্য আপাতত ফোনটাই বন্ধ করে রাখলো।

গহন চায় না কবরী আবার ওকে কল করুক। তবে তাও কেন যেন একটা আশা রেখেই দিল নাম্বারটা ব্লক না করে। মনে হলো আবার কখনো কবরী কল দেক। গহন নিজের অজান্তেই কলটা রিসিভ করবে। তারপরে কবরীর পরিচয় জানার পর আবারো অভিযোগ করবে, কিংবা রাগ প্রকাশ করবে। ঝগড়া হোক কিংবা অভিযোগের আদান-প্রদানে, কিন্তু তবুও কথা হোক। ভুল করে হলেও একবার সেই মানুষটার কন্ঠ গহনের কানে আসুক।

__________

সোফায় গহনের পাশে বসে আছে পিয়াল। অন্য পাশের সোফায় বসে আছে শম্পা আর সালমা বেগম। দূরে দাঁড়িয়ে আছে নিধি। এই ব্যাপারটা থেকে নিধি নিজেকে দূরেই রাখতে চাইছে। কেননা জানে বেশি কাছাকাছি চলে এলে মুখটা বন্ধ রাখতে পারবেনা। শম্পাকে উল্টোপাল্টা কথা শুনিয়ে দেবে।

কেননা এখন সবথেকে বেশি চিন্তা নিধিরই হচ্ছে। যদি শম্পার ডিভোর্স সত্যি হয়ে যায় তার মানে ও এখানেই থাকবে। তার মানে নিধির মাথার উপর উঠে নাচবে। মানে নিধির জীবন শেষ। যতটুকু বাঁচার সম্ভাবনা ছিল ততটুকু আর থাকবে না।

নিধির এসব ভাবনার মাঝেই ওর কানে শম্পার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। পিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার সাথে কোন প্রকারে আলোচনা না করে এই সিদ্ধান্তটা তুমি কোন সাহসে একা একা নিয়ে নিলে?”

শম্পা প্রশ্নটা করার সাথে সাথে গহন রাগান্বিত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি কথা বলার জন্য ডেকেছি তো পিয়ালকে। আমাকে তো বলেছো বিষয়টা দেখার জন্য। দয়া করে নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।”

মুখ বন্ধ রাখার মেয়ে তো শম্পা না। হ্যাঁ, গতকাল রাতে একটু কান্নাকাটি করেছিল হঠাৎ করে বিষয়টা ঘটার জন্য। কিন্তু তাই বলে এখনো পিয়ালের সামনে কাঁদবে এতটা বোকা শম্পা না। পিয়াল কে বোঝাবে নাকি নিজের দুর্বলতা।

শম্পা আবারও যেই না কিছু বলে উঠতে ধরলো তখনই সালমা বেগম ওর হাত খামচে ধরলেন। ইশারায় মেয়েকে চুপ থাকতে বললেন। শম্পা ওনার কথাও মানতে চাইলো না। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“আমি কেন চুপ করবো মা? ও অন্যায় করেছে। ও বাচ্চাদের কথা একবারও ভাবেনি। এতবড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল হঠাৎ করে।”

শম্পা কথাগুলো বলতেই সালমা বেগম অগ্নিদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে এই ব্যাপারে কোন ফয়সালা না করেই কিন্তু তোমাকে এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের করে দেবো আমি। তারপরে যেখানে ইচ্ছে সেখানে গিয়ে দুজনে মিলে ফয়সালা করো। গহন কথা বলছে তো, চুপচাপ বসে থাকো।”

চুপসে গেল শম্পার মুখটা। এতক্ষণে গহন একটু কথা বলার সুযোগ পেল। পিয়ালের দিকে ঘুরে বসে ওকে জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে পিয়াল? হঠাৎ করে এত কঠিন একটা সিদ্ধান্ত কেন নিলে?”

পিয়াল আসার পর থেকে চুপচাপ বসেছিল। কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে ছেলেটা। গহনের প্রশ্নে এতক্ষণে ধ্যান ভাঙল। গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই মেয়ে মানুষ না গহন। বিশ্বাস করো ও মানুষ হতেই পারে না। ওর শরীরে যে পশুর র ক্ত বইছে আমি সেটাও বলতে পারি না। তার কারণ পশুর মাঝেও আমার মনে হয় বিবেক থাকে। ওদের শরীরেও দয়া মায়া থাকে। কিন্তু আমি সত্যি ভেবে পাইনা যে এটা কি জন্ম নিয়েছে। আমার বাঁচার ইচ্ছেটাই নষ্ট করে দিয়েছে এই মেয়ে। তবে আমি এত তাড়াতাড়ি ম র তে চাই না। একটাই তো জীবন। আমি একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। সেজন্য আমার জীবনের সবথেকে বড় অশান্তিকে দূর করে দিয়েছি। এটাই ডিভোর্সের কারণ।”

পাশ থেকে সালমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,

“কিন্তু কি করেছে শম্পা সেটা তো বলো?”

সালমা বেগমের কন্ঠ ভীষণ নরম। পিয়াল ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“আপনি জানেন না? আপনার সাথে পরামর্শ ব্যতীত আপনার মেয়ে কিছু করে নাকি? আপনি যা শিখিয়ে পাঠান ও তো তাই করে।”

এবারে সালমা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,

“ভদ্রভাবে কথা বলো।”

পিয়াল একটু চেঁতে উঠে বলল,

“এত ভদ্রতা দেখানোর ঠ্যাকা আর আমার নেই। সম্পর্কের খাতিরে সম্মান দিতাম। সে সম্পর্কেই যখন থাকছে না আমি সম্মান কেন দেব? আপনি আপনার বাড়িতে কর্তৃত্ব ফলাবেন, আপনার ছেলে মেয়েদের জীবনের উপর দখলদারি করবেন। অথচ আমার বাড়িতে আমার মা আমার সাথে থাকার অধিকারও রাখে না? এইতো আপনার শিক্ষা? এইতো শিখিয়েছেন মেয়েকে?”

সালমা বেগমকে কথাটা বলা শেষে পিয়াল এবার গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি তো আমার মা-বাবাকে চেনো গহন। ওনারা ঠিক কতটা নরম মনের মানুষ সেও জানো। তুমি জানো, তোমার বোন আমার মা-বাবাকে গিয়ে শাসিয়ে রেখে আসে যেন তাদের ওষুধপত্র শেষ হলে আমাকে না বলে। আমি উপার্জন করি, আমি টাকা খরচ করি। ওই মেয়ে ফ্রিজ লক করে রাখে যেন আমার মা-বাবা কোন কিছু খেতে না পারে। আমার বোন তো এই বাড়িতে আসে ছেড়েই দিয়েছে ওর অত্যাচারে। কয়েকদিন আগে ডাক্তার দেখাতে এসেছিল শুধু৷ একবেলা রান্না করে খাওয়ালে কি খুব অসুবিধা হতো? আচ্ছা ঠিক আছে ও না হয় রান্না করে নাই খাওয়ালো। ঐ অসভ্য বেয়াদব মেয়ে কাজের লোকদের অব্দি রান্না করতে দেয়নি। অত দূর থেকে এসে আমার অসুস্থ বোন না খেয়ে চলে যেতে ধরেছিল। আমি হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে তারপর ওদেরকে পাঠিয়েছি। এরপরও তুমি আমায় বলবে আমি যেন ওই মেয়ে কে নিয়ে সংসার করি?”

পিয়ালের কথাগুলো শুনে গহন অগ্নিদৃষ্টিতে শুধু তাকালো শম্পার দিকে। শম্পা এখন একটু নেতিয়ে গেছে। তার কারণ বুঝতে পারছে সালমা বেগমও ওর দিকে কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গহনের কাছে সত্যি বলার মতন কিছু নেই। একটু বিরতি নিয়ে পিয়াল আবারো বলে উঠলো,

“আর সব থেকে লজ্জাজনক ব্যাপার আমার জন্য কি জানো? ও একটা চো র। আমি আমার বাবা মাকে তাদের হাত খরচের জন্য যে টাকাটা দেই ও তাদের মানিব্যাগ থেকে গিয়ে সেই টাকাগুলো

চু রি করে আনে। ছিহ! আমার বলতেও লজ্জা করছে। আরে আমি ঘরে ব্যবসার টাকা এনে রাখি। আমার কাজের টাকা ওগুলো। এই মেয়ে সেখান থেকে অব্দি টাকা চু রি করে। আমার ব্যবসা ধ্বংস করে ছাড়বে। ঘরের বউকে যদি বিশ্বাস না করতে পারি, তাহলে কাকে বিশ্বাস করব? ঘরে যদি টাকা পয়সা না রাখতে পারি আর কোথায় রাখবো? কিসের অভাব রেখেছি ওর আমি? ওর শুধু চাই, চাই আর চাই। মেয়েটারও একই অবস্থা করেছে। সবসময় শুধু এদের চাই, চাই আর চাই। আমার জীবনটা একেবারে শেষ করে দিল। আমার দ্বারা আর হবেই না গহন। তোমার বোন তাই ভেবেছিলাম তোমার মতনই হবে। কিন্তু এ তো তোমার নখেরও যোগ্য না। এমন চূড়ান্ত বেয়াদব, জংলি ধাঁচের মেয়ের সাথে আর সংসার করবো না। এর থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ম রা ভালো।”

কথাটা বলে পিয়াল সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। উঠে চলে গেল। গহন একবারও থামতে বলল না পিয়ালকে। কেননা গহনেরই এখন মনে হচ্ছে পিয়াল একেবারে ঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছে। গহনের নিজেরই মনে হচ্ছে শম্পার মতন এত চূড়ান্ত বেয়াদব সে জীবনে কখনো দেখেনি।

এদিকে কোন সমস্যার সমাধান না হওয়াতেই পিয়াল চলে যাওয়াতে শম্পা এবারে গহনের উপরে রেগে গেল। ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“ও চলে গেল আর তুমি চুপচাপ বসে আছো? সমাধান করার জন্য তো তোমায় বলেছিলাম। আর ও আমার নামে নিন্দা করে গেল তুমি চুপচাপ শুনে গেলে? যদি ওর কাছ ওর থেকে আমার বদনাম শোনারই ছিল তাহলে আগেই বলতে পারতে। তোমায় বলতামই না আমি সমাধান করার জন্য।”

বিজ্ঞাপন

গহন হিংস্র দৃষ্টিতে শম্পার দিকে তাকিয়ে ওকে শাসিয়ে বলল,

“একদম চুপ করে থাকবে তুমি। কোন কিছু বলার মতন মুখই রাখোনি তুমি আমার। একটা ছেলের জীবন নিজের হাতে নষ্ট করেছি আমি। দোষটা আমার ছিল। পিয়াল ভালো ছেলে বলে তোমার সাথে বিয়ে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে তোমার স্বভাব কেমন। যে নিজের মা, ভাই, বোনের সাথে মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারে না সে পরের ঘরে কি কি করতে পারে সেটা আমার আগে বোঝা উচিত ছিল। তোমার স্বভাব অত্যন্ত খারাপ। পিয়াল বলে তোমার সাথে আটটা বছর সংসার করেছে। তুমি তো আমার বোন। তোমাকে সহ্য করা যে ঠিক কতটা কঠিন সেটা আমি খুব ভালো মতোই জানি।”

শম্পাকে কথাগুলো বলে এবারে গহন সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আর মা তোমাকে বলছি, আজ যখন সবকিছু হাতের বাইরে চলে গেছে তখন মেয়েকে শাসন করছো। অথচ এই শাসন অনেকদিন আগে করা দরকার ছিল। এখন আর করার মতন কিছুই নেই। বসে বসে এখন নাটক দেখো।”

শম্পা কিংবা সালমা বেগম কেউ একটা কথাও বললেন না। চুপচাপ গহনের কথাগুলো সহ্য করে নিলেন। কেননা ওরা এখন বিপদে পড়েছে।

ওদেরকে কথা শোনানো শেষে গহন উঠে চলে যেতে ধরলো। কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। আবারো পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে শম্পাকে উদ্দেশ্য করে সাবধানী গলায় বলল,

“আরেকটা কথা শম্পা, এই বাড়িতে থাকবে ভালো কথা। তবে নিধির সাথে যেন কখনো তর্কে জড়াতে না দেখি। আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। এমনিতেও ওকে তোমাদের সবার থেকে দূরে নিয়ে যাবো। তবে যে ক’দিন থাকবো এখানে, ওর সাথে যেন কোন ধরনের কোন অশান্তি করতে আমি না দেখি। ওর থেকে দূরে থাকবে। তোমার এসব অসভ্যতামো কিন্তু আর সহ্য করবো না আমি।”

কথাটা বলে গহন এবারে চলে গেল। যাওয়ার সময় দূরে দাঁড়ানো নিধির হাত ধরে টেনে ওকেও নিয়ে গেল।

________

গহন মেঝের উপর বসে আছে। আর নিধি ওর পেছনে সোফায় বসে মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে গহনের। সারাদিন এত চিৎকার চেঁচামেচি আর ভালো লাগেনা। সারাদিন রাত এত অশান্তি আর সহ্য করা যায় না।

“চুলগুলো জোরে জোরে টানো তো।”

গহনের কথাটা শুনে নিধি কিঞ্চিত বিরক্তিভরা গলায় বলল,

“আর কত জোরে টানবো? এবারে তো মাথার খুলি খুলে আসবে।”

গহন আর কোন উত্তর দিল না। নিধি এখনো চুলগুলো টেনে দিচ্ছে। একটু বিরতি নিয়ে গহন জিজ্ঞেস করলো নিধি কে,

“আচ্ছা নিধি, তোমার বাড়িতেও কি এমন ঝামেলা হতো? মানে সারাদিন চিৎকার চেঁচামেচি চলতেই থাকতো?”

“এটা আবার বলতে হয়? এখানে তো আপনার মা, দুই বোন, ভাই সবাই চেঁচায়। আমার বাড়িতে আমার বড় চাচি একাই যথেষ্ট। একদম আপনার মায়ের ফটোকপি। পুরাই ধান্দাবাজ মহিলা।”

“তুমি কিভাবে সহ্য করতে?”

“সহ্য করতাম না তো। আমার সাথে কিছু করতে এলে উল্টো কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিতাম। সাহসই হতো না আমার সাথে লাগার। কিন্তু যখন আমি বাড়িতে থাকতাম না আমার মায়ের সাথে ঝগড়া করতো। কিন্তু আপনার এখানে তো আবার অন্য ঝামেলা। এখানে আপনার মা-ই ঝগড়া করে।”

মা শব্দটা কানে যেতেই গহনের আবারও মনে পড়ে গেল কবরীর কথা। নিধিকে এখনো বলাই হয়নি এই কথাটা। ভাবলো এখন বলবে।

“মা কল করেছিল।”

নিধি অবুঝের মতন বলল,

“কার মা? আমার মা কল করলে বলবেন আমি কথা বলবো না।”

“আরে না। আমার মা।”

“এক বাড়িতে থেকে উনি আবার কল করেছিলেন কেন? এ আবার কি নতুন নাটক?”

গহন এবারে কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলায় বলল,

“ধুর। আমার মা কল করেছিল। নিজের মা।”

‘নিজের মা’ কথাটা কানে যেতেই নিধি বিস্ফোরিত নয়নে গহনের দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল,

“সত্যিই? কিন্তু কেন কল করেছিল? কি কথা হলো?”

গহন একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল নিধিকে কি কথা হয়েছে। সবকিছু শোনার পর নিধি সোজা হয়ে বসে একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,

“জানেন, আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে। অন্যায় তো আপনার সৎ মাও কম করেনি আপনার সাথে। তাহলে ওনাকে ক্ষমা করতে পারেন, ওনার অপরাধগুলো ভুলে যেতে পারেন। তাহলে আপনার নিজের মায়ের অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন না কেন? অপরাধী তো আপনার দুই মা-ই। দুজনেই স্বার্থের জন্য আপনাকে কষ্ট দিয়েছে। দুজনেরই শাস্তি পাওয়া উচিত। একজনকে তো ঠিকই মা বলে ডাকেন। তাহলে নিজের মায়ের বেলায় গিয়ে এমন করেন কেন?”

নিধির প্রশ্ন শুনে গহন আনমনে বলে উঠল,

“নিজের মা জন্যই। সেজন্য অভিযোগও বেশি, অভিমানও বেশি। সে নিজের মা হয়ে যখন আমায় ভালোবাসতে পারেনি, সৎ মায়ের কাছে আর কি অভিযোগ করব।”

ধীরে ধীরে গহনের গলাটা যেন ধরে এলো। নিধি বেশ ভালোই বুঝতে পারলো সেটা। তাড়াহুড়ো করে সোফা থেকে নেমে গহনের সামনে গিয়ে বসে বলল,

“এই থামুন থামুন। এখন দুই মায়ের শোকে আবার কাঁদার দরকার নেই। ওরা যা ইচ্ছে করুক গে। আপনি কাঁদবেন না। আমি আছি তো আপনার জন্য। আপনি কাঁদলে আমার কষ্ট হয়।”

কথাটা বলে নিধি গহনের গলা জড়িয়ে ধরলো। নিজ থেকেই আগবাড়িয়ে আবার গহনের দুগালে দুটো চুমুও খেল। গহনের মন মেজাজটা মুহূর্তের মাঝে ভালো হয়ে গেল। পাল্টা নিধি কে জড়িয়ে ধরে ওর চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,

“তুমি আমার সেই সুখ, যা আমার সব অসুখের মহৌষধ। তুমি আমার সেই শান্তি, যা সব অশান্তি দূরীকরণের মাধ্যম। এই প্রথম আমি নিজের ভালো থাকার জন্য কিছু চাইছি। তোমাকে চাইছি। এই সুখ, শান্তি সারাজীবন থেকে যাক আমার হয়ে।”

___________

ক্লাস শেষ করে বাইরে বেরোতেই নিধি দেখল গহন ওকে নিতে এসেছে। প্রতিদিনই আসে গহন। যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন তবুও আসে। নিধি নিষেধ করেছে যেন কাজ ফেলে না আসে। কিন্তু ছেলেটা একটা কথাও শোনে না। নিধি বেশি ভালোবাসা দিয়ে দিয়ে একেবারে মাথায় তুলেছে। এখন আর নিধির কথাও শোনে না।

নিধি গাড়িতে এসে বসলো। গহন ওকে দেখে স্মিত একটু হাসলো। ক্লাস কেমন হলো সেসব জিজ্ঞেস করে যেই না গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে অমনি ফোন বেজে উঠলো।

পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখলো সিনথিয়া কল করেছে। খানিকটা চমকালো গহন। তবে খুব বেশি না ভেবে রিসিভ করলো।

“হ্যাঁ সিনথিয়া, বলো। কিছু হয়েছে?”

সিনথিয়া নামটা শুনে নিধিও চমকে তাকালো সেদিকে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো গহনের মুখের দিকে। ধীরে ধীরে গহনের অভিব্যক্তি বদলালো। একপর্যায়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“আচ্ছা চিন্তা করোনা। আমি আসছি।”

কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ঋতুকে নিয়ে ওরা হসপিটালে যাচ্ছে। লেবার পেইন হচ্ছে। সাবিতকেও ফোনে পাচ্ছে না। আমাদের যেতে হবে নিধি।”

প্রথম দফায় খানিকটা দুশ্চিন্তা নিধির চোখেমুখেও দেখা গেল। পরক্ষণেই আবার গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনি যান৷ আমি যাব না। আমাকে ওনার এমনিতেও পছন্দ হবে না। দোয়া করি ভালোমতো সুস্থভাবে বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসুক। তবে যাব না আমি। আমি বলেছিলাম না আপনাকে আমি ভালোবাসলে যেমন বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসি, ঘৃণা করলেও বাড়াবাড়ি রকমের ঘৃণাই করি? ওনার প্রতি এখন আমার বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ঘৃণা চলে এসেছে। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি রিক্সা নিয়ে।”

কথাটা বলে নিধি গাড়ির দরজাটা খুলতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরল। গহন ভেবেছিলো এই কথাটা নিধিকে জানাবে না। কারণ মেয়েটা ভালো খারাপের পার্থক্য করতে জানে না। কিন্তু এখন মনে হলো জানানো উচিত। ঋতু অবশ্যই অপরাধী। তবে কিছু যে উপকারও করেছিল।

“একটা কথা শুনে যাও।”

নিধি থেমে গিয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি?”

“সেদিন কিভাবে আমি ঠিক সময়ে বাড়িতে পৌঁছেছিলাম জানতে চেয়েছিলে না?”

গহন কথাটা বলতেই নিধির কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আপনি তো বলেছিলেন এমনি এসেছিলেন। মিথ্যে ছিল ওটা?”

গহন উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ। এমনি আসিনি। ঋতু কল করেছিল।”

বিস্ময়ে নিধির চোখ কপালে উঠে গেল। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“ঋতু?”

“হুম। কেন কল করেছিলে জানিনা। শুধু বলেছিল তোমার বাড়ির লোকজনকে নাকি ডেকেছে। তোমায় অপমান করতে পারে, আমি যেন তাড়াতাড়ি আসি। যাইহোক এখন আর এত কথা বাড়ানোর সময় নেই। চলো যাই।”

নিধি আর একটা কথাও বাড়ালো না। গহন গাড়ি ছাড়লো। সারা রাস্তা নিধির মাথায় একটা কথাই চলল যে, ঋতু কেন কল করেছিল? আসলে এই মেয়েটার সমস্যাটা যে কি সেটাই নিধি বুঝে উঠতে পারে না। এই মেয়ে তো সালমা বেগমের থেকেও বেশি জটিল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প