আজকাল আর নাস্তার টেবিলে সবাইকে একসাথে দেখা যায় না। টেবিলে খাবার রাখাই থাকে। যখন যার ইচ্ছে হয় খেয়ে নেয়। নিধি তখন গহনের জন্য প্লেটে নাস্তা বাড়ছে। গহন আর এখন টেবিলে বসে খায় না। নিধি ঘরেই নিয়ে যায়।
সিনথিয়া খাচ্ছে তখন। নিধি বেশ কয়েকবার আড়চোখে সিনথিয়ার দিকে তাকালো। শুকনো রুটি খাচ্ছে মেয়েটা। সামনে তরকারি রাখা, ডিম রাখা সেগুলো নিচ্ছে না। কে জানে কি হয়েছে। চোখ মুখের অবস্থাও ভালো না। মনে হচ্ছে ঘুম হয়নি। কিংবা হয়তো অনেক কেঁদেছে। চুলগুলো এলোমেলো করে রেখেছে। আর সব থেকে অবাক করার বিষয় হলো পরনের জামাটাও উল্টো করে পরেছে।
সিনসিয়া তো এত অগোছালো হয়ে থাকার মেয়ে না। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকে। নিজেকে গুছিয়ে রাখে। কে জানে কি হলো।
এরইমধ্যে সালমা বেগম এলেন সেখানে। নিধি ততক্ষণে প্লেটে গহনের জন্য রুটি আর মাংস বেড়ে নিয়েছে। অন্য বাটিতে পায়েস বাড়ছে। সালমা বেগম এসে মেয়েকে এমন শুকনো রুটি চিবোতে দেখে অসন্তুষ্ট হলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,
“শুকনো রুটি খাচ্ছো কেন মা? সবজি আছে তো। নাও।”
সিনথিয়া ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“আমি খাইনা এসব জানো না তুমি?”
সালমা বেগম তড়িৎ গতিতে তাকালেন নিধির দিকে। চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন,
“দেখছো মেয়েটা শুকনো রুটি খাচ্ছে। তাও একটু পায়েস কিংবা মাংস দিতে পারোনি? এগুলো কি বাপের বাড়ি থেকে কিনে এনেছো যে আমার মেয়েকে দিচ্ছো না?”
সালমা বেগমের কথাটা কানে যেতে সিনথিয়াই বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,
“আহ মা! চুপ কর। যা জানো না তা নিয়ে কথা বলতে আসো কেন?”
“তুই চুপ কর। তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? এটা তোর বাড়ি। তোর ভাইয়ের টাকায় খাস তুই। আর এই যে নিধি তোমায় বলছি, সংসার যখন করতে এসেছো একটু তো মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করো। এত হিংসে কেন তোমার মনে?”
নিধির সত্যিই তর্কাতর্কিতে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই। ফলস্বরুপ বেশ শান্ত গলাতেই সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি বলেছিলাম ওকে নিতে। কিন্তু ও নেয়নি। কারণ এগুলো কম ঝাল মসলা দিয়ে রান্না করা।”
“তেমন ভাবে রান্না করো কেন যেভাবে আমার ছেলে মেয়েরা খেতে পারে না? ইচ্ছে করে গহনের স্বভাব বদলাচ্ছো তাই না? এতদিন তো আমি যেভাবে রান্না করতাম সেভাবেই খেতো। সব সময় সবকিছু এত নিজের মন মর্জি মত চাও কেন? মাঝে মাঝে অন্যদের ইচ্ছেকেও প্রাধান্য দিতে আর কবে শিখবে? শুধু সংসার করতে এসেছো কিন্তু কিছু জানো না। বাবা-মা কিচ্ছু শেখায়নি।”
নিধির মন মেজাজটা একেবারে তেঁতো হয়ে গেল। ভাবলো আর বোধহয় সত্যি শান্ত থাকা যাবে না। এই মহিলাকে গরম ভাষায় উত্তর না দিলে ইনি আসলে ঠিক বোঝেন না কথা।
তবে অবাক করার বিষয় হলো নিধিকে কিছু বলতেই হলো না। ও কিছু বলার আগেই সিনথিয়া নিজের জায়গা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠে সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চুপ করবে তুমি? আমি তোমাকে একবারও বলেছি যে আমার অসুবিধা হচ্ছে, আমি মাংস খেতে চাই? আলগা দরদ দেখাতে কেন আসো? যেখানে দরদ দেখানোর দরকার হয় সেখানে তো দেখাতে পারেনা। এক মাংস খাইয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছো, তুমি মা হিসেবে খুব ভালো? তোমার ছেলে মেয়ের খুব খেয়াল রাখো? সংসার তো তুমি করতে জানো না। ছেলে মেয়ের খেয়াল রাখতে তো তুমি জানো না, অন্যকে দোষ দিচ্ছে কেন?”
নিধি আর সালমা বেগম দুজনেই একযোগে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন সিনথিয়ার দিকে। নিধি কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। বুঝতেও পারছে না যে সিনথিয়ার হঠাৎ করে কি হয়ে গেল।
সালমা বেগম কিছুক্ষণ হা করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বিস্মিত গলায় বললেন,
“এভাবে কেন কথা বলছো তুমি আমার সাথে? আমি তো তোমার কথা ভেবেই…….।”
সালমা বেগমকে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই সিনথিয়া আবার চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ভাবতে হবে না আমার কথা। কি করতে পেরেছো আমাদের কথা ভেবে? আদৌও কি তুমি কখনো আমাদের কথা ভেবেছো এতদিন, যে আজ ভাবতে এসেছো? অন্যের মেয়ের পেছনে লাগা বন্ধ করো এবার মা। একবার নিজের ছেলে মেয়ের জীবনের দিকে তো তাকিয়ে দেখো তাদের জীবনের কি অবস্থা। অন্যের জীবন নষ্ট করার পরিকল্পনা করতে করতে তোমার নিজের ছেলে মেয়েদের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে তুমি বড় ভাইয়ার সংসার নষ্ট করতে চেয়েছিলে, তো ওদিকে গিয়ে দেখো নিজের বড় মেয়ের সংসার ভেঙে বসে আছে। একটু তো ভালো শিক্ষা দিতে পারতে আমাদের। একটু ভালো কিছু শেখাতে পারতে। অন্তত জীবনে কাজে লাগতো আমাদের। কি করলে এতগুলো বছর সংসার করে বলতো? না নিজে কিছু করতে পেরেছো, না আমাদের কিছু শেখাতে পেরেছো।”
সালমা বেগম পুনরায় বিস্মিত গলায় বললেন,
“কি হয়েছে তোমার? কি বলতে চাইছো তুমি, আমি তোমাদের কথা ভাবিনা? তোমাদের ভালোবাসি না?”
হঠাৎ করে সিনথিয়া এবারে একটু কেঁদে উঠলো। আরেক দফা ভরকালো নিধি। কন্ঠটা এবারে সিনথিয়ার পূর্বের তুলনায় অনেকটা নরম হলো। বরং অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। একহাতে চোখের জল মুছে সালমা বেগম কে বলল,
“ভাবো না। তুমি আমাদের কারোর কথাই ভাবো না, মা। তুমি স্বার্থপর। তুমি ভীষণই স্বার্থপর। তোমার কুকর্মের জন্য তোমার ছেলে-মেয়েদের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। তুমি যে যে অন্যায় বড় ভাইয়ার সাথে করেছো, করতে চাইছো সেগুলো সব ঘুরেফিরে তোমার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ঘটছে। তুমি কখনো ভালো মা হতে পারোনি। তুমি কখনো আমাদের ভালো শিক্ষা দিতে পারোনি। ঠিক-ভুল শেখাওনি আমাদের। জীবনটা যে ঠিক কতটা কঠিন সেসব কিচ্ছু জানাওনি আমাদের। তুমি এতটাই খারাপ মা যে, কখনো তোমার কাছে গিয়ে মনখুলে দুটো কথা বলতে পারিনা। ছেলে-মেয়ের অসহায়ত্ব বোঝোনা তুমি। মোটকথা তুমি স্বার্থপর। তোমার সাথে কোন কালে কি কি অন্যায় ঘটেছে এখনো তুমি সেগুলোর প্রতিশোধ নেওয়ার পেছনে পড়ে আছো।”
কথাগুলো বলে সিনথিয়া দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। সালমা বেগম এখনও সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ করে কি হয়ে গেল? এসব কি আজেবাজে কথা বলে গেল সিনথিয়া ওনাকে, তাও আবার নিধির সামনে? সিনথিয়া তো এমন ছিল না। ওর তো পারিবারিক বিষয় নিয়ে এতটা আগ্রহই কখনো ছিল না। তাহলে আজ হঠাৎ করে এতগুলো কথা শুনিয়ে রেখে কেন গেল?
সালমা বেগমের এসব ভাবনার মাঝেই ওনার কানে নিধির কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
“দেখলেন তো মা, কাদের জন্য এত কষ্ট করছেন? আসলে দোষটা ওদের না, দোষটা আসলে আপনার শিক্ষার। সিনথিয়া তো বড় হচ্ছে। সেজন্য বোধহয় ভালো-মন্দটা বুঝতে শিখছে। একবার নিজেই ভেবে দেখুন ছেলে মেয়েকে ঠিক কি শিক্ষা দিয়েছেন যে ওরাই আপনার দিকে আঙ্গুল তুলছে।”
সালমা বেগম নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে আলতো হেসে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“সুযোগের সদ্ব্যবহার করছো তাই তো?”
“উঁহু। সুযোগ তো সব সময় আমার কাছে থাকে আপনাকে অপমান করার। কিন্তু আমি সেটা করি না। আপনি বরং এত কিছু না ভেবে নিজের দিকে নজর দিন। গহনের জীবনটা কিভাবে বিষিয়ে তুলবেন সেই চিন্তা করতে করতে নিজের ছেলে মেয়েদের জীবনের দিকে কখনো নজর দেননি। একজনের জীবন নষ্ট করতে গিয়ে বাকি তিনজনের জীবন নিজের হাতে ধ্বংস করে ফেলছেন। এবারে শুধরে যান।”
কথাটা বলে নিধিও খাবারের থালাটা নিয়ে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে। সালমা বেগম ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে। কি হচ্ছে ওনার সাথে একের পর এক? কেন হচ্ছে এমন? কেন সব পরিস্থিতি ওনার বিপক্ষে চলে যাচ্ছে? কেন সবাই ওনার দিকে আঙ্গুল তুলছে? ওনাকেই কেন দোষারোপ করছে?
__________
হাসপাতাল থেকে ঋতু কে আরো দুদিন আগেই বাড়িতে আনা হয়েছে। এই দুদিন সাবিতের দেখা পাওয়া যায়নি। রাতেও বাড়ি ফেরেনি। একমাত্র সাবিতই জানে রাতে কোথায় থেকেছে। নিধির সাথেও আর কথা হয়নি ঋতুর। নিধিও আর আগবাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেনি যে সেদিন ঋতু কেন গহন কে ডেকেছিল।
সালমা বেগমা আপাতত সাবিতের ব্যাপারটা নিয়ে বেশি একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না। তিনি বর্তমানে বেশি চিন্তিত শম্পার সংসারটা নিয়ে। সংসার যে আর জোড়া লাগানো যাবে না সেটা তো তিনি বুঝে গেছেন। মেয়েকে অবশ্য তিনি জোড়াজুড়িও করেছিলেন যেন পিয়ালের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেয়। সালমা বেগম নিজেও জানেন পিয়াল, ওর পরিবারের লোকজন ভালো। যদি শম্পা হাত পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নেয় তাহলে ওনারা ক্ষমা করলেও করতে পারেন।
তবে হাজার চেষ্টা করেও মেয়েকে রাজি করাতে পারেননি। মেয়ে তো নিজের দোষ স্বীকার করতেই নারাজ। সালমা বেগম রেগে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ভালোবেসে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তবুও মেয়েকে রাজি করাতে পারেননি। এক পর্যায়ে গিয়ে তিনিও হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তাই আপাতত তার সম্পূর্ণ মনোযোগ সিনথিয়ার উপর।
আপাতত সিনথিয়ার বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে তিনি যেন নিশ্চিন্ত হন। কাবিনের দিন ঠিক হয়েছে। অথচ মেয়ের জন্য এখনো কোনো কিছু কেনাকাটা করা হয়নি। টাকা পয়সা কোন কিছুই তার হাতে নেই। যখন যা প্রয়োজন হয় গহনের থেকে চেয়ে নেন। ফলস্বরুপ মেয়ের বিয়ের আয়োজন এর জন্য গহনের কাছ থেকেই চাইতে হবে। এতে অবশ্য তার খুব একটা আপত্তিও নেই। জানে যা চাইবে গহন তার থেকে বেশিই দেবে।
অফিস থেকে ফিরে হাত মুখ ধুঁয়ে এসে গহন সবেমাত্র খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিতে যাবে। এর মাঝেই সালমা বেগম এলেন ঘরে। বরাবরের মতন কোন প্রকারের অনুমতি না নিয়েই তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন।
নিধি সবেমাত্র একটু কাজ শেষ করে বিছানায় যাচ্ছিলো গহনের সাথে গল্প করার জন্য। এর মাঝেই সালমা বেগম প্রবেশ করলেন। মন মেজাজটাই বিগড়ে দিল। একেই তো অসময়ে এসেছে। তার উপর আবার অভদ্রের মতন বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছে। একটুও শিক্ষা নেই।
আজকাল সালমা বেগমকে দেখলে গহনের মাঝে বিশেষ কোনো অনুভূতি কাজ করে না। ব্যস্ত হয়ে পড়ে না। খুবই স্বাভাবিক থাকে। ঠিক ভাবে তাকায়ও না। এই যেমন এখন সালমা বেগম এসেছে। গহন তো জানে ওর সাথেই নিশ্চয়ই কথা বলতে এসেছে। কিন্তু তবুও আগবাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল না। একবার শুধু মাথা তুলে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো।
সালমা বেগম সবটাই বুঝলেন। তবে এখন মনে নিলেন না এসব। এগিয়ে গিয়ে গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“সিনথিয়ার কাবিনের দিন ঠিক হয়েছে। সামনের মাসের বিশ তারিখ।”
গহন ছোট্ট করে উত্তর বলল,
“ওহ্।”
“ওর জন্য তো কেনাকাটা করতে হবে। জামাইকেও কিছু দিতে হবে।”
“আপাতত কত টাকা লাগবে?”
“দশ লাখ দাও।”
সালমা বেগমের মুখ থেকে টাকার পরিমাণটা শুনতেই নিধির চোখ কপালে উঠে গেল। শরীরটা কেমন যেন দুর্বল লাগলো। মনে হলো মাথা ঘুরে এক্ষুনি পড়ে যাবে। এত টাকা দিয়ে কি করবে এই মহিলা?
পরক্ষণেই নিধির মনে হলো ওরা তো বড়লোক। ওদের কাছে এসব টাকা কোন ব্যাপারই না। নিধির মতন অকেজো মেয়েকেই তো সাত লাখ টাকা দিয়ে এনেছে। আরো কত গয়না দিয়েছে। তাহলে নিজের মেয়েকে যে আরো বেশি দেবে এটাই তো স্বাভাবিক।
গহন তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“এখনো তো এক মাসের মতন সময় আছে। আমায় একটু সময় দাও। কাল তিন লাখ দেব। পরে বাকি টাকা দিয়ে দেব। এত তাড়াতাড়ি একসাথে এতগুলো টাকা জোগাড় করা একটু কষ্টকর হয়ে যাবে নাহলে।”
গহনের কথাটা শুনে কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো সালমা বেগমের। উনি জানেন গহনের কাছে টাকার অংকটা খুবই সামান্য। তাই হওয়া উচিত। ব্যবসা তো ধীরে ধীরে অনেক বড় হয়েছে। রোজগার যে খুব ভালোই হয় সেটা সালমা বেগম বেশ ভালোই জানেন। যদিও উনি কখনো গহনের থেকে এসবের হিসাব নেননি। কিন্তু তবুও জানেন। যেকোনো ছোট বড় সাফল্য গহন তো এসে আগে ওনাকেই বলত। সেই থেকেই উনি আন্দাজ করতে পারতেন যে ছেলের ব্যবসা ভালোই চলছে।
আর তাছাড়া গহন তো কখনো এভাবে বলে না। সঙ্গে সঙ্গে তো দিয়ে দেয়। মানে এটাও কি বউয়ের প্রভাব? নিধি কি টাকা দিতে নিষেধ করে দিয়েছে? হতেই পারে।
মুহূর্তের মাঝে সালমা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন গহনের টাকায় উনি মেয়ের বিয়েই দেবেন না।
গম্ভীর গলায় গহন কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমি তো তোমার টাকা চাইনি। তোমার যেহেতু দিতে সমস্যা, তোমাকে দিতে হবে না। তোমাদের বাবা যা রেখে গেছে সেখান থেকে দিয়ে দাও। চেক সাইন করে দাও। তাহলেই তো হয়ে গেল।”
“আমি কি একবারও বলেছি মা যে আমি দেব না? আমি শুধু বলেছি একটু সময় দাও। কাল তো কিছু দিতে চাইলাম। এটাতো একশো কিংবা এক হাজার টাকা না। দশ লাখ টাকা চাইছো। আমার একাউন্টে এত টাকা নেই এখন।”
“নেই তো বেশ ভালো কথা। কি করেছো, কেন নেই সেসব তো আমি জানতে চাইনি। তুমি চেকটা সাইন করে দাও।”
গহন আর একটা কথাও বাড়ালো না। উঠে গিয়ে আলমারির ভেতর থেকে একটা চেকবুক করে আনলো। গহন টাকার পরিমান লিখলো না। টাকার ঘরটা ফাঁকা রেখেই সাইন করে চেকটা দিয়ে দিল সালমা বেগমকে।
অনেকক্ষণ থেকে চুপ করে আছে নিধি। তবে এবারে আর চুপ থাকতে পারছে না। একটা ব্যাপার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তাও এক্ষুনি। সালমা বেগমের সামনে। জিজ্ঞাসু গলায় সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা মা, আপনি বললেন ওনার টাকা নেবেন না। আবার ওনার সাইন করা চেকই নিলেন। মানে আসলে টাকাটা কার?”
নিধি প্রশ্নটা করার সাথে সাথে সালমা বেগম চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বললেন,
“সিনথিয়ার বাবার টাকা। তোমার স্বামীর টাকা নেইনি আমি।”
“প্রশ্নটা তো আমার সেখানেই। সিনথিয়ার বাবার টাকা। গহনের টাকা তো না। তাহলে সাইন গহনের কেন লাগলো? মানে ব্যাপারটা কোনমতেই না আমি বুঝতে পারছি না। গহনের টাকা নিলেন না, আবার গহনের টাকাই নিলেন।”
“বোঝার প্রয়োজন নেই তোমার। অন্যের বোধ বুদ্ধি গিলে খেতে খেতে নিজের বোধ বুদ্ধিও বোধহয় হারিয়ে ফেলছো দিন দিন। কৌশল তুমি বেশ ভালোই জানো। ভুলটা তো করেছিলাম আমি। সহজ, সরল, বোকা, কম বয়সী মেয়ে ভেবে বাড়িতে তুলেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি কত বড় ভুল করেছিলাম।”
কথাটা বলে গহনের হাত থেকে চেকটা নিয়ে সালমা বেগম বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। সালমা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই গহন গিয়ে আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলো। বলা যায় না আবার কখন কে অশান্তি করতে চলে আসে। গহনের আপাতত আর কোন অশান্তি করার ইচ্ছে নেই।
দরজা বন্ধ করে গহন বিছানায় এসে বসতেই নিধি ওর সামনাসামনি এসে বসে পড়লো।
“গহন, বুঝিয়ে বলুন না আমায়। আপনার সাইন করা চেক নিয়ে উনি এত গরম দেখালেন কেন? বাপরে বাপ কি তেজ। এমন ভাব করলেন যেন আপনার টাকা নেয় না। আজ যেই টাকাগুলো দিলেন, ওই টাকাগুলো কার?”
গহন বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসে বলল,
“বাবার টাকা। আমার একাউন্টে দিয়ে রেখে গেছে।”
“বাকিদেরকে কিছু দেয়নি?”
“না।”
নিধি রুষ্ট গলায় বলল,
“এ আবার কেমন কথা? তিনটে ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়েছে আর টাকা-পয়সা কিচ্ছু দিল না? নাকি ওদেরটা শেষ করে এখন আবার আপনার ভাগের উপরে নজর পড়েছে?”
“না, তেমন না। বাবার স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি আমার নামে করে দিয়ে গেছেন। এমনকি বাবার একাউন্টে যত টাকা ছিল সেসবও আমার একাউন্টে দিয়ে গেছেন। আর আমায় বলে গেছেন যেন আমি বাকিদের খেয়াল রাখি।”
“কত টাকা আছে আনুমানিক আপনার সেই একাউন্টে?”
“জানিনা। কখনো খোঁজই নেওয়া হয়নি। আমি ওইখান থেকে টাকা খরচ করি না নিজের জন্য। বাকিদের কেও দেই না। তবে যখন ওরা ওদের বাবার রেখে যাওয়া টাকার উপর অধিকার ফলাতে আসে তখন শুধু দেই। নয়তো আমি উপার্জন শুরু করার পর থেকে নিজেই সবার খরচ চালাই।”
নিধি আর কিছু বলল না। চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ নিজেই কি সব ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“আপনি বোধহয় অনেক টাকার মালিক তাই না? অনেক বড়লোক? জানেন তো গহন একটা হিসাব করে দেখলাম। আপনার এত টাকা খরচ করার জন্য এক দুটো বাচ্চা দিয়ে হবে না। কমপক্ষে দশটা বাচ্চা লাগবে। না মানে ধরুন, দুটো বাচ্চা হলো। ওদের যদি এত সম্পত্তি দেই তাহলে আপনার ভাইয়ের মতন বিগড়ে যাবে। কিন্তু যদি দশটা বাচ্চা হয় তাহলে সবাই অল্প অল্প করে সম্পত্তি পাবে। তাহলে সেই অল্প সম্পদের কদর করতে জানবে, বুঝলেন?”
নিধির কথাটা শুনে গহন ফিক করে হেসে উঠে বলল,
“তারমানে বলতে চাইছো আমাদের এক দুটো বাচ্চাতে থেমে থাকলে চলবে না, তাইতো? তা তোমার ক’টা বাচ্চা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে?”
নিধি ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
“এখনই নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। একদিন আগে আপনার টাকা-পয়সা আর সম্পত্তির হিসেব করতে হবে। যত বেশি সম্পত্তি থাকবে, তত বেশি বাচ্চা আসবে।”
গহন এবার একটু নড়েচড়ে উঠলো। বালিশ থেকে মাথা তুলে নিধির দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তা শুধু পরিকল্পনা করলে হবে? বাস্তবায়নও তো করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কত পরিশ্রম করতে হবে সে কথা কি হুঁশে আছে?”
পরিকল্পনার কথা ঠিক ছিল। বাস্তবায়নও ঠিক ছিল। কিন্তু পরিশ্রমের কথাটা উঠতেই নিধি কেমন যেন লজ্জায় মিইয়ে গেল। বুঝতে পারলো গহনের মতিগতি ভালো না। ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসতেই আছে। নিধি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“এখন শুধু পরিকল্পনা অব্দিই থাক। বাস্তবায়ন পরে হবে। আমি পড়তে বসি আগে। আরে আমার কত পড়া বাকি আছে জানেন? আমি কত ভালো স্টুডেন্ট আপনার কোন আন্দাজ আছে? আপনি ঘুমোন তো। আমি পড়তে বসবো এখন।”
কথাটা বলে নিধি সত্যি এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে টেবিলে বসে পড়লো। বই খুললে নিধি সত্যি দিন দুনিয়া ভুলে বসে। সম্পূর্ণ মনোযোগ গিয়ে পড়ে বইয়ের উপরে। সে পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, পরিবেশ যেমনই হোক না কেন, আশেপাশে যেই থাকুক না কেন। একবার যদি নিধি মনস্থির করে যে পড়বে, তার মানে পড়বেই।
ঠিক যেমন এখন মনস্থির করেছিল পড়বে। এখন পড়ছেই। খুব তাড়াতাড়ি পড়ার মাঝে এতটাই ডুবে গেলে যে ভুলে গেলে ঘরে ওর স্বামী আছে। ভুলে গেল যে গহন অসহায় দৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
গহন ডাকলো কয়েকবার নিধির নাম ধরে। কিন্তু কোন কাজ হলো না। মেয়েটা তাকালোই না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গহন আবারো ডাকলো। এখন ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অনুরোধও করলো। কিন্তু মেয়েটার কোন সাড়া শব্দই নেই। গহনের তো এখন আফসোস হচ্ছে এটা ভেবে যে কেন এই মেয়েকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। এই মেয়েটা পড়াশোনায় যে এতটা পাগল সেটা তো গহন বুঝতে পারেনি। গহন যদি আগে বুঝতো যে পড়াশোনার মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে গিয়ে রাতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটাই বউ ওকে দেবে না। তাহলে কখনোই নিধিকে পড়াশোনা নামক আপদের মাঝে ঢুকতেই দিত না। খামোখা নিজের হাতে নিজের জীবনটা তেজপাতা বানালো।