বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৬২

🟢

আজ আবার নিধিকে নিয়ে ওদের নতুন বাড়ির কাজ দেখতে গিয়েছিল গহন। ভার্সিটির উদ্দেশ্যে নিধি বেরিয়েছিল ঠিকই। তবে আর ভার্সিটিতে যাওয়া হয়নি। বাড়ির কাজ দেখতে এসেছিল। আর খুব বেশিদিন সময় লাগবে না কাজ শেষ হতে।

যেহেতু ভার্সিটি যায়নি তাই গহন ভাবলো নিধি কে আবার বাড়ি পৌঁছে দেবে। তবে নিধি যেতে চাইলো না। অনেকক্ষণ থেকে একটা কথা বলার জন্য উশখুশ করছে। গহন সেটা বুঝতে পেরে নিজেই জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে? কিছু বলতে চাইছো, তাই না? কিছু খাবে? ক্ষুধা লেগেছে?"

নিধি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। এক জায়গায় যাব। নিয়ে যাবেন?”

“কোথায়?"

নিধি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

“ভয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে রেগেই যান কিনা আপনি।”

“রেগে যাব কেন? পৃথিবীর বাইরে তো আর কোথাও যেতে চাইবে না। দেশের ভেতরে, বাইরে যে কোন জায়গায় তোমায় নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমার আছে।”

“আরে না না। এতদূর নিয়ে যেতে হবে না। আমার বাড়িতে নিয়ে যাবেন একবার? ভাইকে দেখে আসতাম।”

নিধির বাড়ির কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে গহনের চোখে মুখে অদ্ভুত বিরক্তি আর কাঠিন্যতা ফুটে উঠলো। সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বলল,

“বাড়িতে যাওয়ার কি প্রয়োজন? কালকে নিয়াজের স্কুলে নিয়ে যাব। ওই বাড়িতে গিয়ে কি করবে?”

“কি আর করব, দেখে আসতাম। আমার ভাই আছে, বাবা আছে, দাদী আছে, আকিব আছে।”

নিধি আকিবের নামটা উচ্চারণ করতেই গহন কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“আকিব কে?”

“আরে আমার চাচাতো ভাই। মনে নেই? প্রথম রাতে তো সন্দেহ করেছিলেন। তখন তো আপনি খারাপ স্বামী ছিলেন। ভুলে গেছেন?”

মস্তিষ্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই আকিবের কথা মনে পড়ল। একটু স্বাভাবিক হলো গহন। তবে তাও গম্ভীর গলাতে বলল,

“ওর সাথে দেখা করতে যাওয়ার আবার কি আছে?”

“অদ্ভুত তো! ও আমার ভাই। ওর সাথে আমার কত ভালো সম্পর্ক ছিল, আপনি জানেন? ও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমাকে অনেক ভালোবাসে। আপনার তো ভাই বোন একটাও জাতের না। কিন্তু আমার ভাই ভালো ছিল।"

গহন কেমন যেন নেতিয়ে গেল। আসলে গহন হয়ত ভাই-বোনের সম্পর্কের মর্ম বুঝতে পারছে না। সেজন্য এই কথাটা বলেছিল নিধি কে।

সে যাই হোক, এসব নিয়ে আর বেশি ভাবনা চিন্তা করল না। নিধি যেহেতু আবদার করেছে ভাবলো একবার নিয়ে যাওয়াই যায়।

মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে গহন গাড়ি থামালো। সিটবেল্টা খুলতে খুলতে নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মিষ্টির সাথে আর কি কি নেব?”

নিধি কাচুমাচু করে বলল,

“আমি কি বলবো? আমি তো পারলে পুরো দুনিয়াটাই নিয়ে যাই আমার ভাইয়ের জন্য। আপনি দেখুন, আপনার বিবেক কি বলে।”

“আরে আমি কি করে বুঝব যে তোমার বাড়ির লোক কি খেতে পছন্দ করে।”

“বুঝতে হবে না। যা পাবেন নিয়ে আসুন। মানে যা আপনার ইচ্ছে হয় আর কি।”

গহন বুঝলো এই মেয়ে কিছু বলবে না। তাই ভাবলো নিজেই যা ভালো মনে করবে নিয়ে আসবে। ওই মিষ্টি, ফলমূল এসবই তো নিতে হবে।

গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে মিষ্টি আর ফলমূল কিনে নিয়ে এলো গহন। সেই সাথে নিধির ভাইয়ের জন্য কিছু চকলেটও কিনলো।

“দেখে নাও তো, আর কিছু লাগবে কিনা। এখনো সময় আছে বলে দাও। তোমাদের পাড়ায় তো ভালো দোকান নেই। কিছু কিন্তু আর পাব না।”

গহন ব্যাক সিটে সব প্যাকেট গুলো রেখেছে। নিধি একবার সেগুলো তে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,

“না, আর কিছু লাগবে না। প্রয়োজনের থেকে বেশিই নিয়েছেন। অর্ধেকই তো গিলবে আমার চাচা-চাচি। আচ্ছা, আমায় এক-দুশো টাকা দেবেন? আসলে আমার ভাইটা স্কুলে যায় তো। ওকে একটু টিফিনের টাকা......।”

নিধি কে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে গহন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“আমি কি কারণ জানতে চেয়েছি?”

কথাটা বলে গহন মানিব্যাগ বের করে দু'টো এক হাজার টাকার নোট নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“বেশি ক্যাশ নেই আমার কাছে। আপাতত দুই হাজার রাখো। আর যদি লাগে তাহলে বলো।”

নিধি খুশি মনে টাকাটা হাতে নিল। যা চেয়েছিলো তার থেকে বেশিই পেয়ে গেল। বাহ্ ভালোই হলো। ভাবলো বাকি টাকা ওর বাবার হাতে দিয়ে আসবে।

__________

শ্বশুরবাড়িতে এসে নিজের শ্বশুর শাশুড়ির সাথে টুকটাক কিছু কথা বলতে না বলতেই গহনের চাচা শ্বশুররা ওকে টেনে নিয়ে গেল বসার ঘরে। একেই তো তাদের জামাই বড়লোক। তার ওপর আবার আসার সময় এত জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। সেই সাথে কয়েকদিন আগে যখন ও বাড়িতে গিয়েছিল তখন বুঝেছে যে জামাই বেশ ভালো। মেয়ের কদর আছে জামাইয়ের কাছে। তার মানে নিশ্চয়ই মেয়ের বাপের বাড়ির লোকজনেরও কদর আছে।

আর এমন জামাই কে সম্মান না করলে চলে নাকি? বলা যায় না, বিপদে আপদে যেকোনো সময় কাজে লেগে যেতে পারে। এত বড় ব্যবসা আছে জামাইয়ের। তাদের ছেলে মেয়েকে তো সেই ব্যবসায় লাগিয়ে দিতেই পারেন। মূলত সেই জন্যই এত খাতির যত্ন গহনের।

নিধি খেয়াল করলো বিষয়গুলো। তবে আপাতত কিছু বলল না।

আজ ঠিক কতগুলো দিন পর যে নিধি আবার নিজের ভাইকে দেখলো তার হিসেব নেই। মোটকথা বিয়ের পর এই প্রথম দেখলো। মাঝে প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে।

ভাইয়ের সাথে বেশ অনেকটা সময় কাটালো নিধি। আকিবের সাথেও গল্প গুজব করলো। দাদির সাথেও কথাবার্তা বলল। বাবার সাথেও কথাবার্তা বলল। কিন্তু নিজের মায়ের সাথে কথা বলল না।

একেই তো আগেরই অনেক অভিমান মনের মাঝে জমা ছিল। তার ওপর এতদিন পর নিধি বাড়িতে এসেছে। অথচ তিনি মেয়েকে রেখে জামাইকে নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মেয়ের দিকে নজরই নেই ওনার। মেয়ের কি পছন্দ, মেয়ের সুবিধা অসুবিধার দিকে তার খেয়াল নেই।

নিধির অবশ্য একবার মনে হলো এই নিয়ে অভিমান করা হয়তো ঠিক না। হয়তো ওর মা ভাবছে জামাইয়ের যত যত্ন করতে পারবে মেয়ের সম্মান তত বাড়বে। মেয়ে তত ভালো থাকবে।

এদিকে নিধি অনেকক্ষণ থেকে খেয়াল করছেন নীলা একবার ঘরে আসছেন তো আবার বেরিয়ে যাচ্ছেন। চোখে মুখে তার দুশ্চিন্তার ছাপ। মাঝে মাঝে নিধির বাবার কানের কাছে ফিসফিস করে কি সব যেন বলে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে গিয়ে নিধি এসব ফিসফিসানি সহ্য করতে পারল না।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে মা? দৌড়াচ্ছো কেন? জামাই আসার খুশিতে হাঁটুর ব্যথা উধাও হয়ে গেল তোমার?”

নীলা শুকনো মুখে নিধির দিকে তাকালেন। আসলে উনি ব্যাপারটা নিধিকে বলবেন কি বলবেন না বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কেননা এই মেয়ের তো রাগ বেশি। কথার ধাঁচ ভালো না। একদিনের জন্য এসে যদি আবার অশান্তি করে যায় ব্যাপারটা তো খারাপ দেখায়। তার ওপরে আবার সঙ্গে জামাই আছে। তবে এবারে মনে হলো নিধিকে বলা দরকার কথাটা।

গুটিগুটি পায়ে নিধির দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন,

“শোন না রে মা, বিয়ের পর জামাই প্রথম এলো। কি দিয়ে কি করব, কি খেতে দেবো কিছুই তো বুঝতে পারছি না। জানিসই তো তোর চাচিরা কেমন। ফ্রিজে মাছ মাংস আছে কিনা আমি জানিনা। আমি তো কিছু বেরও করতে পারব না। একটু যে রান্না বসাবো তারও কোন উপায় নেই। ওরা রান্না ঘরে কি করছে কে জানে? জামাইকে এখন কি দিয়ে খেতে দেই বলতো?”

এতক্ষণে নিধি বুঝলো নীলার চিন্তার কারণ। আসলে ব্যাপারটা চিন্তারই। গহন ভালো জন্য খেতে না দিলেও কিছু বলবে না। কিন্তু যদি গহনের জায়গায় অন্য কেউ থাকতো, তাহলে এই ব্যাপারটা বিরাট বড় হয়ে উঠতো। তবে নিধি এত কিছু বুঝতে দিতে চাইলো না। বরং বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আরে খেতে দিতে হবে না, মা। আমরা খেয়ে এসেছি। এমনিতেও উনি খেতে পছন্দ করেন না।”

“সে পছন্দ করুক বা না করুক কিন্তু দিতে তো হবে। একটা মাত্র জামাই বলে কথা। তাও প্রথমবার এলো। এত বড় মাপের মানুষ। খালি মুখে ফেরত পাঠাতে পারি নাকি? তোর মান থাকল শ্বশুর বাড়িতে?”

নিধি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“এমনিতেও নেই। তুমি যা করে এসেছো তার পরে আর আমার মান থাকতে পারে না। শ্বশুর বাড়ির লোকের সামনে মেয়েকে অপমান করে এসে এখন জামাইকে পেট ভরিয়ে খাওয়ালে মেয়ের মান বেঁচে যাবে? এসব অদ্ভুত নিয়ম শেখায় কে তোমায়?”

নীলার মুখটা চুপসে গেল। যেই না মেয়েকে কিছু বলতে গেলেন অমনি ঘরে আনিসা এলো। আনিসার মুখটা দেখতেই নিধির সর্বাঙ্গে আ গুন ধরে গেল যেন। আসার পর থেকে একবারও এই মানুষটার মুখোমুখি হয়নি। বাড়িতে ঢুকে সরাসরি এই ঘরে চলে এসেছে ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। ইচ্ছে ছিল যাওয়ার আগে অব্দি এই মানুষটার মুখ দেখবে না। তবে মুখটা দেখাতে চলেই এলো।

বেশ হাস্যোজ্জ্বল মুখে আনিসা ঘরে প্রবেশ করলেন। অন্যান্য দিন তো মুখের দিকে তাকানো যায় না। কে জানে আজ আবার কি হলো।

নিধি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এমন ভাব দেখালো যে নিজের ভাইয়ের সাথে ভীষণ ব্যস্ত।

আনিসা নিজ থেকে এগিয়ে এসে নীলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কি রে নীলা, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? রান্নাবান্না তো হয়ে গেছে। যা, জামাই কে খেতে দে।”

কথাটা নিধির কানে যেতেই বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে আনিসার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি করবে? কাকে খেতে দেবে?”

“ও মা জামাইকে খেতে দেবে। তুইও গিয়ে খেয়ে নে। অনেক বেলা হয়েছে। আর কতক্ষণ না খেয়ে থাকবি?”

নিধি নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আনিসার দিকে। বিশ্বাসই হতে চাইলো না যে ওর চাচি এসব বললেন। কে জানে কি মতলব।

নীলার অবশ্য এত কিছু ভাবার সময় নেই। বড় জা কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বাপরে বাপ জামাইকে খেতে দিতে হবে। খাবার টেবিলটা তো ভালোভাবে সাজাতে হবে। ওদের বাড়িতে তো তেমন ভালো কোন চেয়ারও নেই। কে জানে জামাই কাঠের শক্ত চেয়ারে বসতে পারবে কিনা।

বেশ ভালোই খাওয়া দাওয়া হলো গহন আর নিধির। নিধি তো খেতেই চায়নি। ওর চাচা চাচি মিলে জোর করে এনে ধরিয়ে চেয়ারে বসিয়েছে। গহনকেও একই রকম ভাবে জোর করে বসিয়েছে।

নিধি সবই বুঝলো যে কেন আজ ওদের এত খাতির যত্ন করা হচ্ছে। ওই যে গহনের টাকা আছে। জানে গহনের সাথে দেমাগ দেখিয়ে কুল পাবে না। আর নিধির সম্মান আছে তার কারণ ওর সাথে গহন আছে।

এইসব কারণে নিধি একবার ভেবেছিল খাবে না। কিন্তু পরে যখন নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকলো তখন আর না করতে পারল না। আজ যদি ওরা না খেয়ে চলে যেত তাহলে নিধির মা বাবা ভীষণ কষ্ট পেত। তেমন তো কোন সুখ দিতে পারেনি নিধি নিজের মা-বাবাকে। তাই ভাবলো এটুকু নাহয় মানিয়ে নিয়ে ওনাদের কে একটু খুশি করা যাক।

খাওয়া-দাওয়া শেষে এবারে ওরা চলে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলো। নিধির বাবা তখন ঘরেই ছিলেন। উনি খুব একটা বের হন না ঘর থেকে। আসলে একা চলাচল করতে খুব অসুবিধা হয়। আর উনি কাউকে বিরক্তও করতে চান না।

বিজ্ঞাপন

বিছানায় শুয়ে আছেন আযীয আহমেদ। নিধি ওনার পাশে গিয়ে বসে একবার ডাকলো।

“বাবা।”

ডাকটা কানে যেতেই আযীয আহমেদ চোখ মেলে তাকালেন। একা উঠে বসতে পারেন না তিনি। নিধি সাহায্য করে উঠে বসালো।

“খাওয়া-দাওয়া করেছিস মা? জামাই খেয়েছে?”

নিধি মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ খেয়েছে। তুমি এই সময় শুয়ে আছো যে? শরীর খারাপ নাকি?”

“না তো।”

“তাহলে মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? কি হয়েছে?”

মেয়ের কথা শুনে আযীয আহমেদ মলিন হেসে বললেন,

“মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর বাবাদের কত দায়িত্ব থাকে। বিয়ের পর আজ প্রথমবার বাড়িতে মেয়ে জামাই এলো। অথচ আমায় দেখ, আমি বিছানায় অক্ষমের মতন শুয়ে আছি। আমার মেয়ে জামাই কি খেতে পছন্দ করে সেগুলো যে শুনে একটু গিয়ে বাজার করে আনব সেই ক্ষমতাও নেই। তোদের কি দিয়ে খেতে দিল না দিল সেই নিয়ে কোন কিছু বলতেও পারবো না। একটু যে তোর ওপর জোর খাটিয়ে বলবো আজ জামাইকে নিয়ে থেকে যা, সেটাও বলতে পারব না। কারণ কখন, কে, কিভাবে জামাইকে অপমান করে দেবে সেটা তো বলতে পারি না। এত অসহায়ত্ব নিয়ে মুখ তো শুকনো থাকবেই রে মা। এই মুখে হাসি পাবি কি করে?”

নিধির খুব কষ্ট হল আযীয আহমেদের কথাগুলো শুনে। ওনাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতেও ইচ্ছে করলো। তবে তেমনটা করল না নিধি। যদি আযীয আহমেদ বুঝতে পারে যে নিধিরও এই ব্যাপার গুলো খারাপ লেগেছে তাহলে উনি আরো বেশি কষ্ট পাবেন।

“বাদ দাও তো এইসব কথা। এই বাড়িতে কে থাকবে ওই জংলীগুলোর সাথে? আমি তো থাকবো না। জানো, আমার ঘরে এসি আছে। রাতে এসি ছাড়া এখন আর আমি ঘুমোতে পারি না। এই বাড়িতে মশার কা ম ড় খাওয়ার জন্য থাকবো নাকি?”

মেয়ের সুখের কথা শুনে আযীয আহমেদের বুক প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। দুহাত বাড়িয়ে মেয়েকে আদর করে বললেন,

“তুই ভালো থাক, মা। তুই ভালো থাকলেই হবে। আমার আর কি? জীবনটা তো শেষই। তুই শুধু ভালো থাক।”

“আচ্ছা হয়েছে হয়েছে। এখন এটা রাখো তো। নিয়াজের স্কুলের বেতন দিয়ে দিও।”

গহনের থেকে দু হাজার টাকা নিয়েছিল নিধি। সেই পুরো টাকাটা আযীয আহমেদের হাতের মুঠোয় দিল। টাকার দিকে তাকিয়ে আযীয আহমেদ সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকাটা আবার নিধির হাতে ফেরত দিয়ে বললেন,

“না না। কি করছিস এসব? কোন টাকার প্রয়োজন নেই। তুই এটা তোর কাছে রাখ।”

নিধি চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,

“আমি নিতে বলেছি তো তোমায়। এর আগেও কিন্তু টাকা পাঠিয়েছিলাম, তুমি নাওনি। আমি কিন্তু খুব কষ্ট পেয়েছি। আজ না নিলে আরো কষ্ট পাবো। তোমাকে তো দিচ্ছি না। নিয়াজের স্কুলের বেতন দিয়ে দিও।”

আযীয আহমেদ ফের আপত্তি জানিয়ে বললেন,

“কোন প্রয়োজন নেই। আমি কোন না কোনভাবে ঠিক ব্যবস্থা করেই নেব। তুই চিন্তা করিস না। আর জামাই কি ভাববে?”

“আরে বাবা, উনি কিছুই ভাববেন না। উনি ভালো মানুষ। আর এটা তোমার জামাইয়ের টাকা না। আমার টাকা। উনি আমার হাত খরচ দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিচ্ছি তোমায়।”

“তোর হাত খরচের টাকা আমায় দিয়ে দিলে তুই চলবি কি করে? বারবার কি জামাই দেবে টাকা? আর আমিতো জানি একবার যদি কিছু বলে তাহলে তুই আর কখনো চাইবি না। অযথা তোর সংসারে অশান্তি তৈরি করিস না। তোর কাছে রেখে দে। এত বছরও তো বেঁচে ছিলাম। বাকিটা জীবনও কাটিয়ে নেব। তোকেও পড়াশোনা করিয়েছি, তোর ভাইকেও ঠিক করাবো।”

নিধি এবার অসহায় গলায় বলল,

“কেন এমন করো বাবা? নিয়ে নাও না। আমি কি তোমার কেউ না? আর আমি তো বলছি গহন খারাপ না। আর উনি জানবেনও না এই বিষয়ে। আমি বলবো না ওনাকে। বিয়ে দিয়েছো বলে পর হয়ে গেছি আমি? আমার কোন দায়িত্ব নেই তোমাদের প্রতি?”

আযীয আহমেদ নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,

“কয়েক মাস হলো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এর মাঝেই যদি জামাইয়ের টাকায় চলা শুরু করি তাহলে যে মান সম্মান থাকে না রে, মা। তখন তো জামাইও ভাববে যে জামাইয়ের টাকা দেখেই আমি তোর বিয়ে দিয়েছি। ও তো আর তখন বিশ্বাস করবে না যে আমি ওই মানুষটাকে দেখে বিয়ে দিয়েছি। জামাইয়ের টাকার উপরে আমার অধিকার আছে বলে আমি মনে করি না। যদি আমার মেয়ে কখনো উপার্জন করে সেই টাকার উপরে আমার অধিকার থাকবে। আমার মেয়ে যেদিন উপার্জন করবে সেদিন আমার মেয়ের টাকা নেব। কিন্তু জামাইয়ের টাকা আমাকে দিস না। আমার পরিবারের লোকজনের কাছে তো আমার কোন সম্মান নেই। অন্তত জামাইয়ের কাছে যেটুকু সম্মান আছে নষ্ট করিস না।”

নিধি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর বাবার দিকে। আরো অনেকভাবে জোর করলো টাকাটা দেওয়ার জন্য। তবে আযীয আহমেদ কোনমতেই রাজি হলেন না। পরবর্তীতে নীলাও ওনার সাথে যোগ দিল। কোনমতেই তারা জামাইয়ের টাকা নিলেন না। তাদের একটাই কথা, তাদের মেয়ে ভালো আছে এই যথেষ্ট। ওনাদের আর কি? যে করেই হোক ঠিকই দিন পার করে দেবে। সে হোক তিন বেলা খেয়ে কিংবা না খেয়ে।

____________

বাড়ি ফিরে নিধির প্রচন্ড মাথা ব্যথা ধরেছে। বিছানার ওপর নিজেই দু হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে। গহন গিয়েছে কফি বানাতে। একটু পর গহন ঘরে এলো। তবে কফি না। নিধির জন্য আদা দিয়ে লাল চা বানিয়ে এনেছে। সেই চায়ের কাপটা নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“নাও।”

নিধি চুল ছেড়ে দিয়ে কাপটা হাতে নিয়ে যখন দেখল ভেতরে লাল চা। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুখ বিকৃত করে বলল,

“এসব কি এনেছেন? আমি তো ঘন করে দুধ দিয়ে কফি বানিয়ে আনতে বলেছিলাম। এটা কে খাবে?”

“এটা খাও। মাথা ব্যথা সেরে যাবে।”

নিধি যেই না আবার আপত্তি করতে যাবে অমনি গহন চোখ গরম করে ওর দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে নিধি থেমে গেল। বুঝলো আপত্তি জানিয়েও কোন লাভ হবে না।

গহন নিজের জন্যও চা-ই বানিয়েছে। নিজের চায়ের কাপটা বেড সাইডের উপর রেখে গিয়ে নিধির পিছনে বসলো। নিধির চুল টেনে দিচ্ছে। যেন মাথা ব্যাথাটা একটু কমে যায়। নিধির খুব আরাম লাগল গহন চুল টেনে দেওয়ায়।

বেশ অনেকটা সময় ধরে গহন মাথাটা টিপে দেয়ার পর অবশেষে একটু শান্তি পেল নিধি। পিছনে বসা গহনের গায়ের উপর হেলে পড়লো। সামলাতে না পেরে গহন নিজেও পেছন দিকে হেলে গেল।

“উফ! কি আরাম পেলাম। জানেন এই মাথা ব্যথার সমস্যা আমার বহু পুরনো। কিন্তু কেউ একটু মাথাটা টিপে দিতো না। সবাই অলস। আগে যদি জানতাম আপনি এত সুন্দর মাথা টিপে দিতে পারেন, তাহলে কবেই বিয়ে করে নিতাম!”

গহন উঠে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে সে বুঝলাম। কিন্তু ঠিক হয়ে বসো। পড়ে যাচ্ছি তো আমি।”

নিধি ঠিক হয়ে বসার বদলে আরো ভালোভাবে গহনের উপরে নিজের শরীরের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিল। ফলস্বরূপ গহন এবারে একেবারে বিছানায় শুয়ে পড়লো। এদিকে চিত হয়ে শুয়ে ঠিক জুৎ করতে পারছে না নিধি। ফলস্বরূপ গহনের গায়ের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। ছোট্ট একটা শরীর নিধির। খুব একটা ভারীও না। তাই গহনেরও খুব বেশি অসুবিধা হলো না।

মেয়েটাকে তাই আর বাঁধাও দিলো না। এমন ব্যাঙের মতন লাফিয়েই যদি শান্তি পায়, তাহলে তাই করুক।

কিছুটা সময় সেভাবে শুয়ে থাকার পর হঠাৎ করে গহনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়লো। নিধি কে জিজ্ঞেস করলো,

“আকিবের সাথে তোমার অনেক ভালো সম্পর্ক?”

প্রশ্নটা নিধির কানে যেতেই সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলল। মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনার হিংসে হচ্ছিল নাকি? সত্যি করে বলুন, আপনার সমস্যা হচ্ছিল তাই না আমাকে আর আকিবকে গল্প করতে দেখে?”

একটু থতমত খেল গহন। নিধির দেয়া অপবাদ নাকচ করে বলল,

“মোটেই না। হিংসে কেন হতে যাবে? ও তো তোমার ভাই। ভালো সম্পর্ক থাকতেই পারে, তাই না?”

নিধি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“সত্যি আপনার একটুও সমস্যা হচ্ছিল না? মানে ওই যে বলে না, জেলাসি? আকিবের সাথে আমাকে কথা বলতে দেখে একটুও জেলাস ফিল করেননি আপনি?”

কথাটা বলে নিধি সূচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল গহনের দিকে ওর অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণের জন্য। গহন কেন যেন থতমত খেল। একবার ভেবেছিল মিথ্যে বলবে। তবে পারলো না মিথ্যে বলতে। আমতা আমতা করে বলল,

“না মানে ওই আর কি। আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় শুধু আমার সাথেই মন খুলে কথা বলো। আমার সাথেই বকবক করতে ভালোবাসো।”

গহনের কথাটা শুনে নিধি হেসে ফেলল। একহাতে গহনের গাল টেনে দিয়ে বলল,

“আরে, সে তো বকবক করতে আমি এমনিই ভালোবাসি। সবার সাথেই বকবক করি। আমার কাজই বকবক করা।”

“না মানে তারপরও মনে হচ্ছিল আকিবের সাথে বকবক করতে আরো বেশি ভালোবাসো।”

নিধি আরেক দফা হেসে উঠলো। দুহাতে গহনের গলা জড়িয়ে ধরে, গহনের গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,

“এত কিছু বুঝি না। ভালো আমি আপনাকেই বাসি, বুঝেছেন? সে যার সাথে যতই বকবক করি না কেন। দিনশেষে আপনার সাথে বকবক করে যে শান্তিটা পাই সেই শান্তি আর কারো সাথে বকবক করে পাই না। আপনার মতন এত ভালো, নম্র, ভদ্র, হ্যান্ডসাম জামাই থাকতে অন্য কাউকে ভালোবাসা যায় না গহন।”

নিধি কথাটা বলতেই গহন কেমন চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“আচ্ছা নিধি, তুমি কি ভাবলে যে আমি তোমায় সন্দেহ করছি? আমি কিন্তু সন্দেহ করছি না। আমি জানি আকিব কে তুমি তোমার ভাইয়ের নজরেই দেখো।”

নিধি গহনের গলার ভাঁজ থেকে মাথাটা তুলে গহনের মুখের দিকে তাকাতেই দেখলো ছেলেটার চোখ মুখ চুপসে আছে। বোধহয় ভয় পেয়ে গেছে এটা ভেবে যে নিধি আবার ভুল বুঝলো কিনা।

নিধি তো ভুল বোঝেনি। এই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ভুল বুঝলে চলে নাকি?

গহনের প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না নিধি। বরং গহনের গালের সাথে নিজের গাল লাগিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলো। তারপরে হঠাৎ করেই আবার নিজ থেকেই গহনের গালে চুমু খেল। একটা দুটো চুমু খেয়ে থেমে থাকল না। পরপর যে ঠিক কতগুলো একই গালে, একই জায়গায় চুমু খেল তার কোন হিসেব নেই। চুমু খাওয়া শেষে আবারো গহনের গালের সাথে নিজের গাল লাগিয়ে বলল,

“এত কিছু ভাবতে হবে না আপনাকে। শুধু এতোটুকুই জেনে রাখুন, আমি আপনাকে ভালোবাসি।”

কথাটা বলে নিধি আবারও গহনের সেই একই গালে বেশ কয়েকটা চুমু খেল।

অনেকক্ষণ নিজেকে সামলেছে গহন। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকেছে। কিন্তু এবার আর পারল না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।

নিধিকে নিজের উপর থেকে নামিয়ে নিজে নিধির উপর আঁধশোয়া হয়ে বলল,

“আমি যথেষ্ট ভদ্র ভাবে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি আমাকে ভদ্র ভাবে থাকতে দিলে না। আমার কিন্তু কোন দোষ নেই। তুমি আমাকে উস্কে দিয়েছো। আমার শান্ত হৃদয়কে অস্থির তুমি বানিয়েছো। এখন আবারও সেই অস্থির হৃদয় কে শান্ত তোমাকেই বানাতে হবে।”

নিধি বুঝতে পারলো ছেলেটার মতিগতি ভালো না। নিধিও আটকাতে চায় না গহন কে। মাঝে মাঝে তো গহনের এমন ভালোবাসাময় স্পর্শ পেতে নিধিরও ভালো লাগে। নিধিও তো ব্যাকুল হয়ে থাকে গহনের স্পর্শের জন্য।

তবে গহন কে তো সেসব বুঝতে দিলে চলবে না। একটু ভাব দেখিয়ে যেই না আপত্তি জানাতে যাবে অমনি গহন অতর্কিত হামলা চালালো নিধির ঠোঁটের উপরে। নিধির কোমল অধর জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল।

নিধি আর কি করবে? চুপচাপ গহনের ভালোবাসায় মোড়ানো অত্যাচার সহ্য করে নিল। মাঝে মাঝে এমন অত্যাচারও ভালো লাগে।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প