“মেয়েটার নাম স্মৃতি। ও জানেও না যে সাবিতের বউ আছে, কিছুদিন পর বাচ্চাও হবে। সম্পর্কটা এক দুদিনের না। দেড় বছর ধরে চলছে এসব। মেয়েটাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে তোমার ছেলে। এবারে কি বলবে তুমি? নিজের চোখে দেখে এসেছি, মেয়েটার সাথে কথা বলে এসেছি আমি।”
বিছানার উপরে বসে চুপচাপ গহনের বলা কথাগুলো শুনলেন সালমা বেগম। গহন নিজের কথা শেষ করতেই মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমার কি মনে হয় কি করা উচিত আমার?”
গহন আলতো হেসে বলল,
“আমি বললে কি সে কথা শোনা হয় মা? আর তাছাড়া যে অন্যায়টা সাবিত করেছে তার যোগ্য কোন শাস্তি আমার জানা নেই। ভাবতে পারছো, ঋতুর কানে এই কথাটা গেলে কি হবে? অবশ্য ও তাে আগে থেকেই জানে। নতুন করে আর অবাক হবে না। নেশা করাও নাকি আবার শুরু করেছে।”
“রিহ্যাবে পাঠিয়ে দাও ওকে।”
গহন সালমা বেগমের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,
“বেশ। তুমি তাহলে ওর সাথে এ বিষয়ে কথা বলো।”
“আমার বলার কি প্রয়োজন? তুমি বলো।”
গহন আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না মা। আমি ওর সাথে কোন কথা বলবো না। সারা জীবন আমি নিজের মান সন্মানের ভয়ে চুপ থেকেছি। এখনো চুপই থাকতে চাই। যা বলার তুমি ওকে বলো। আর দয়া করে ওকে নোংরামিটা ছাড়তে বলো।”
কথাটা বলে গহন চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“শুধু অভিযোগ নিয়েই এসেছিলে? একবারও আমার খোঁজ নিলে না? গতকাল সবার সামনে অতোগুলো কথা শোনালে, অপমান করলে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললে তারপরও মনে হলো না যা একবার একটু গিয়ে মায়ের সাথে কথা বলে আসা দরকার? আমি অসুস্থ জেনেও দেখতে এলে না। তুমি বোধহয় আমায় আর নিজের মা ভাবো না তাই না? নিজের মা ভাবলে কি এমনটা করতে পারতে? এতক্ষণে দৌড়ে এসে ঠিকই ক্ষমা চেয়ে নিতে।”
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও গহন আর যেতে পারলো না। পা উঠলো না। চোখে মুখে এক তীব্র ব্যথা ফুটিয়ে তুলে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোমায় নিজের মা ভাবি না, নাকি তুমি আমায় নিজের ছেলে ভাবো না মা? কোনটা সত্যি? কোন অপরাধ না করেও বারবার ছুটে এসে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছি। আদৌ কি তুমি কখনো মন থেকে ক্ষমা করতে পেরেছো আমায়? আমার প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ গুলোর প্রতিশোধ এখন নিধির উপরে তুলছো। পার্থক্য আমি করি না। পার্থক্য করো তুমি।”
“হ্যাঁ আমি করি পার্থক্য। সাবিত, শম্পা, সিনথিয়া ওদের সাথে একটা নাড়ির টান আছে আমার। যেটা তোমার সাথে নেই। এই একটা কারণে হয়তো পার্থক্য হয়ে যায়। আমি তো মানুষ। করে ফেলি পার্থক্য। ভুল হয়ে যায়। কিন্তু ভালো তো বাসি তোমায়। তুমি অস্বীকার করতে পারবে এই কথাটা?”
গহন আলতো হাসলো সালমা বেগমের কথাটা শুনে। হাতে থাকা ব্যাগটা পাশে থাকা একটা চেয়ারের উপর রেখে এগিয়ে এসে সালমা বেগমের পাশে বসে বলল,
“আমি এটাই বিশ্বাস করতে চাই মা যে, তুমি আমায় ভালোবাসো। আমি সব সময় নিজের উপরে জোর চালাই এই কথাটা নিজেকে বিশ্বাস করানোর জন্য। কিন্তু তুমি একবার মন থেকে ভেবে বলোতো সত্যি কি তুমি আমায় ভালোবাসো? আমি সবসময় তোমায় যেভাবে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি, তুমি কি সেভাবে আমাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছো বা পেরেছো? আমি কখনো মুখ ফুটে বলিনি মা। কিন্তু তোমার করা প্রত্যেকটা অবহেলা আমার মনে আছে।”
সালমা বেগম অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,
“কই আগে তো কখনো তোমার এগুলো মনে পড়তো না। আগে তো কখনো মুখ ফুটে বলার প্রয়োজন হতো না। নিধি আসার পর থেকেই কেন এসব হয়?”
“তার কারণ নিধি আমাকে লোভী বানিয়ে দিয়েছে। আমাকে ভালোবাসা দিয়ে দিয়ে এতটাই লোভী বানিয়ে দিয়েছে যে সবার করা অবহেলা গুলোয় এখন আমার খুব কষ্ট হয়। কোন অবহেলা ঠিক সহ্য হয় না আমার আর আজকাল।”
“আমারও সহ্য হয় না। আমারও তোমার থেকে বিন্দুমাত্র অবহেলা সহ্য হয় না। আমি হয়তো ওদের তিনজনকে একটু বেশি ভালোবাসি। কিন্তু আমি তোমার থেকে বেশি ভালোবাসা আশা করি। আমিও বুঝি কে কেমন। আমিও বুঝি কার কাছে আমার কতটা মূল্য আছে। আমি বুঝি ভবিষ্যতে কে আমার খেয়াল রাখবে। কিন্তু তারপরও ওদেরকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলি। ওই যে পুরনো ক্ষতগুলো এখনো ঠিক সেরে ওঠেনি তাই। কিন্তু আমি সব সময় তোমার থেকে সব কিছু বেশি আশা করি। বিশ্বাস করো বাবা, আমার নিজের ছেলে মেয়ে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে আমার এতটা কষ্ট হয় না যতটা তুমি করলে কষ্ট হয়। আমি জানিনা কেন তবে তোমার থেকে অনেক বেশি কিছু আশা করি আমি। আমি আশা করি তুমি আমায় ভালোবাসবে, আমায় সম্মান করবে।”
“সেই সাথে তোমার কথা মত চলবো তাই তো? ঠিক ভুলের বিচার শক্তি হারিয়ে ফেলে তুমি যখন যা করতে বলবে তাই করবো এটাই তো চাও? তুমি চাও যেন আমি তোমার হাতের পুতুল হয়ে থাকি তাই তো?”
এবারে আর নিজের রাগটা ধরে রাখতে পারলেন না সালমা বেগম। সেই সাথে আবার কেঁদেও ফেললেন। রাগে চিৎকার করে উঠে বললেন,
“সবটা কেন ওই মেয়ের জন্য পরিবর্তন হলো? ওই মেয়ে আসার পর কেন বদলে গেলে তুমি? যদি আমাকে সারা জীবন এভাবে সম্মান নাই করতে পারবে তাহলে শুরুতে কেন লোভ ধরিয়েছিলে আমার? তোমার থেকে ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তোমার থেকে সম্মান পেয়ে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আমার তীব্র আত্মবিশ্বাস আমার গহনকে আমি যা বলবো ও সেটাই শুনবে। আমার তীব্র আত্মবিশ্বাস আমার গহন আমায় সব থেকে বেশি ভালোবাসে। ওর জীবনে আমার গুরুত্ব সবথেকে বেশি। তাহলে সেই সব কেন ওই মেয়ে আসায় নষ্ট হয়ে গেল? তুমি কেন সবদিক সামলাতে পারলে না? আমি ওকে সহ্য করতে পারি না। ও আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে। আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল ওই মেয়েকে এই বাড়িতে তোমার বউ করে নিয়ে আসে। আমি নিজের হাতে সবটা শেষ করে দিয়েছি। বেছে বেছে এমন একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছি যে আমার জীবনটা তছনছ করে দিলো। আমার থেকে আমার সব থেকে বড় শক্তি কেড়ে নিয়েছে। ও তোমাকে কেড়ে নিয়েছে।”
কথাগুলো বলা শেষে সালমা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। গহন চুপচাপ শুধু শুনে গেলো সালমা বেগমের অভিযোগগুলো। গহন জানতো এই কথাগুলো যে সালমা বেগমের নিধির প্রতি আকাশসম ক্ষোভ জমে আছে।
কিছুক্ষণ সালমা বেগম কাঁদার পর গহনের মনে হলো এবার ওনাকে থামানো দরকার। নয়তো অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।
“থামো মা। নিধি তোমার কাছ থেকে আমায় কেড়ে নেয়নি। আমাদের মাঝে দূরত্ব গুলো তৈরি হয়েছে তোমার আচরণের জন্য। তুমি যদি আমায় বোঝার চেষ্টা করতে তাহলে এমনটা হতো না। আমি সবসময় সবদিক সামলানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি সেটা হতে দাওনি। তোমার প্রতি আমার যে ভরসা ছিল সেটা তুমি নষ্ট করে দিয়েছো।”
সালমা বেগম বসা অবস্থাতেই গহনের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে গহনের গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,
“আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি জানিনা। তবে আমি ভালোবাসি তোমায়। তুমি বলো যদি তোমায় ভালো না বাসতাম তোমায় আমার বড় ছেলে বলতাম? দিনের পর দিন তোমার জন্য তোমার বাবার হাতে মা র খেয়েছি, তোমার দাদির কথা শুনেছি, না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। যদি তোমায় না ভালোবাসতাম তাহলে এত কিছুর পরেও কি তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করতাম? করতাম না। যদি তোমায় না ভালোবাসতাম তাহলে অনেক আগেই চলে যেতাম সবকিছু ছেড়ে। কিন্তু যায়নি। তোমার নিজের মা পালিয়েছিল তোমায় ছেড়ে। কিন্তু আমি পালাইনি। তার কারণ আমি তোমায় ভালোবেসেছি বাবা।”
গহন কেমন যেন না চাইতেও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে দুর্বল হলে চলবে না। গহন সব জানে, সব বোঝে। এতদিন বুঝেও না বোঝার ভান করে থেকেছে। তবে এবারে গহন বুঝতে চায় সবটা। সালমা বেগমকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“চুপ কর মা। এখন আবার এই কথাগুলো তোলার দরকার নেই।”
সালমা বেগম থামলেন না। ছাড়লেন না গহনকে। উল্টো গহনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন,
“তুমি আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বললে আমার খুব কষ্ট হয়, বাবা। আমার…আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তোমার মনে নেই টানা দশ দিন তোমায় দেখতে না পেয়ে আমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম? ওটা আমার ভালোবাসা ছিল। তোমার মনে নেই তুমি অসুস্থ হলে রাত জেগে তোমার পাশে বসে থাকতাম? সেটাও আমার ভালোবাসা ছিল। আমি জানি আমি অন্যায় করেছি নিধির সাথে। আমি যথেষ্ট অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি বাধ্য হয়েছি করতে। ও আমার থেকে তোমাকে কেড়ে নিয়েছে। আমার সব সময় মনে হয় নিধি আসায় তুমি আমার পর হয়ে গেছো। আমি ওকে খুব ঘৃণা করি, খুব।”
“চুপ কর মা। দয়া করে নিধিকে নিয়ে এসব কথা বলা বন্ধ করো। শুধুমাত্র এই একটা কারণেই আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেছে।”
সালমা বেগম গহন কে ছেড়ে দিয়ে দুই হাতের আঁজলায় ওর মুখটা নিয়ে আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“এভাবে বলো না। নষ্ট কেন হবে আমাদের সম্পর্ক? মা ছেলের সম্পর্ক কখনো নষ্ট হয় না। তুমি…তুমি বলো না আমার কিছু হলে তুমি কষ্ট পাবে না? আমি তোমার থেকে দূরে চলে গেলে তুমি কষ্ট পাবে না? তুমি বলো না তুমি আমাকে মা ভাবো না?”
গহন কোন উত্তর দিলো না। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সালমা বেগমের দিকে। গহনের থেকে আশানুরূপ কোন উত্তর না পেয়ে সালমা বেগম সন্দেহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি ভাবোনা আমায় আর তোমার মা?”
গহন নিজের গাল থেকে সালমা বেগমের হাতটা নামিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“ভাবতে চাই মা। তবে আজকাল আর ভাবতে পারি না। খুব কষ্ট হয় জানো তো যখন চোখের সামনে দেখি যে তুমি বাকি তিনজনকে মায়ের স্নেহ দাও। কিন্তু আমার উপর সবসময় কর্তৃত্ব ফালানোর চেষ্টা করো।”
“তোমায় সব থেকে বেশি ভরসা করি আমি। সেই জন্য তোমার উপরে অধিকার ফলাই। এটা কি আমার ভুল?”
“ভুল না। তবে যদি ভরসা করার সাথে সাথে একটু ভালোবাসতে খুব ভালো লাগতো আমার মা। জানো তো মা, আজ হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় একবার খাবার থেকে বি ষ ক্রি য়া হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল আমাকে। আজ অব্দি কেউ কখনো জানতে পারেনি খাবার থেকে বি ষ ক্রি য়া টা আমার হলো কি করে। যেখানে সেই একই খাবার তুমি আর দাদিও খেয়েছিলে। আমি আজও এর উত্তর খুঁজি মা। মাঝে মাঝে উত্তর পেয়েও যাই। তবে আমি সেটা বিশ্বাস করতে চাই না। আমি এটা বিশ্বাস করতে চাই যে আমার মা আমাকে ভালো না বাসলেও অন্তত আমার মৃ ত্যু চায় না।”
হঠাৎ করে সালমা বেগম কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ হা করে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরে আবার হঠাৎ করেই কেঁদে উঠলেন।
“আমার জীবনটা মোটেও সুখকর ছিল না। তোমার মৃ ত্যু চাইনি আমি। আমি চাইনি তোমার কিছু হোক। যদি চাইতাম তবে সেদিন এক লোকমা খাওয়ার পরেই তোমায় নিয়ে হাসপাতাল ছুটতাম না।”
“তারমানে আমি যা সন্দেহ করেছিলাম সেটাই ঠিক?”
গহন প্রশ্নটা করেও আবার মনে মনে ভাবলো কেন করতে গেলে এই প্রশ্নটা। না করলে বোধহয় ভালো হতো। আবার যেহেতু প্রশ্নটা করেই ফেলেছে চাইলো যেন সালমা বেগমের উত্তরটা না হয়। সালমা বেগম যেন বলে গহন যেটা সন্দেহ করছে সেটা ভুল। তবে তেমনটা হলো না।
সালমা বেগম গহনের হাতের উল্টো পিঠে একটা চুমু খেয়ে বললেন,
“সেদিন আমি কি চেয়েছিলাম জানিনা। হুঁশে ছিলাম না। যখন হুঁশ ফিরেছিল বুঝেছিলাম ভুল করেছি। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল আমি তোমার মৃ ত্যু চাই না। সেদিনও আমি তোমার মৃ ত্যু চাইনি। শুধু আমার সন্তানের মৃ ত্যু র প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। তবে তোমার মৃ ত্যু চাইনি।”
সালমা বেগম নিজের কথাটা শেষ করতেই গহন ওনার হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সেখানে আর বসে থাকার ইচ্ছে হলো না। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। খানিকটা দাঁড়াতেই আবার ধপ করে বিছানার উপরে বসে পড়লো। দাঁড়ানোর জন্য ঠিক শক্তি পাচ্ছে না। তবে এখানে যে সালমা বেগমের পাশে আর বসার ইচ্ছেও হচ্ছে না।
গহন কষ্ট করে আবার উঠে দাঁড়ালো। পা দুটো উঠতে চাইছে না। তারপরও জোর করে হেঁটে হেঁটে দরজার কাছ অব্দি যেতেই পিছন থেকে সালমা বেগম মৃদু ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলেন,
“তোমার মৃ ত্যু চাইনি আমি।”
গহন দেয়াল ধরে থেমে গেল। ভাগ্যিস দেয়ালটা ধরেছিল। নয়তো আবারো হয়তো পড়ে যেত। পিছনে ঘুরে আর সালমা বেগমের দিকে তাকালো না। মৃদু কম্পিত গলায় বলল,
“আমার মৃ ত্যু হয়তো চাওনি, তবে সে পথেই ঠেলে দিয়েছিলে। এখন আমার কি মনে হচ্ছে জানো মা? যাকে মা হিসেবে ডেকেছি, যাকে মা হিসেবে ভালোবেসেছি, সম্মান করেছি সে আমাকে খু ন করতে চেয়েছিল এই কথাটা জানার থেকে বোধহয় সেদিন আমি পুরো ভাতটা খেয়ে ম রে গেলেই ভালো হতো। আজ তোমার মুখ থেকে এই কথাটা শুনে যত যন্ত্রণা হচ্ছে এর থেকে বোধহয় মৃ ত্যু যন্ত্রণাটা কম হতো আমার জন্য।”
“বললাম তো আমি তোমার মৃ ত্যু চাইনি।”
গহন সালমা বেগমের সে কথা এড়িয়ে গিয়ে মলিন হেসে আবারও বলল,
“কত সৌভাগ্যবান সেই মানুষগুলো তাই না মা, যারা নিজেদের মায়ের ভালোবাসা পায়! এই পৃথিবীতে সবথেকে দামি বোধহয় মায়ের ভালোবাসা, যেটা সহজে পাওয়া যায় না। আমি তো পেলামই না। খুব সাধ ছিল এটা বোঝার যে মায়ের ভালোবাসা কেমন হয়। বুঝতেই পারলাম না কখনো। এত বড় একটা আফসোস নিয়েই ম র তে হবে আমায়। এক জীবনে এই বুকের মাঝে যে ঠিক কতটা হাহাকার নিয়ে আমি চলে যাব সেটা তোমায় দেখাতে পারবো না মা। সব পাওয়া হলো আমার। শুধু মায়ের ভালোবাসা টাই পাওয়া হলো না।”
________
সে রাতেই হঠাৎ করে গহনের গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। গহনের হঠাৎ করে এত জ্বর কেন এলো নিধি সত্যিই বুঝে উঠতে পারল না। জ্বর আসার আগে অন্তত কিছু তো লক্ষণ দেখানো উচিত ছিল। একটু তো বলে আসতে পারতো। কিন্তু তা না করে হঠাৎ করে চলে এলো। তাও আবার সরাসরি একশো দুই জ্বর উঠে গেল।
নিধি ওষুধ খাওয়ালো, জল পট্টি দিয়ে দিল। যত রকম সেবা করা যায় সব করলো। কিন্তু জ্বর কমতে চাইছে না। দুটো কম্বল গায়ে জড়িয়ে দিয়েছে গহনের। তাও কাঁপুনি থামছে না।
একটু আগে সালমা বেগম এসে দেখে গিয়েছিলেন যে গহনের জ্বর এসেছে। ঘরে ঢোকেননি। সেজন্য গহন কিংবা নিধি কেউ বুঝতেই পারেনি যে উনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সবটা দেখে গেছেন।
একটু পর গ্লাসে করে গহনের জন্য দুধ গরম করে আনলেন। গহনের ঘরে ঢোকার জন্য তিনি কখনো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এখনো করলেন না। দরজাটা এমনি চাপানো ছিল। ভেতরে এলেন তিনি।
দরজা খোলার শব্দটা হতেই নিধি দরজার দিকে তাকালো। সালমা বেগমের মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিধির চোখে মুখে এক অদ্ভুত বিরক্তিভাব ফুটে উঠলো। কিংবা ঘৃণাও বলা যায়। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। গহন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। অর্ধঅচেতন অবস্থা যেন। ফলস্বরুপ সালমা বেগম যে এসেছেন সেদিকে খেয়াল করেনি।
নিধিকে কিছু বলার প্রয়োজনও মনে করলেন না সালম বেগম। সরাসরি এগিয়ে এসে গহনকে একবার নাম ধরে ডাকলেন ধীর গলায়। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিধি চুপ করে থাকতে পারলো না। গম্ভীর গলায় বলল,
“ঘুমিয়েছেন বোধহয়।”
সালমা বেগম পাল্টা গম্ভীর গলায় বললেন,
“জ্বর না কমা অব্দি ও ঘুমোতে পারেনা। আমার থেকে বেশি চেনো না তুমি ওকে।”
“মানুষের স্বভাব বদলায় সেটা কি জানেন না?”
সালমা বেগম আর কোন উত্তর দিলেন না। ফের গহন কে একবার নাম ধরে ডাকলেন। নিধি এবার বিরক্তিকর গলায় বলল,
“দেখছেন তো চোখ খুলছে না। তার মানে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছে। অযথা ওনাকে বিরক্ত করার কোন মানে আছে? এই দুধ নিয়ে এসে কি প্রমাণ করতে চাইছেন, দরদ উতলে পড়ছে ওনার জন্য? তার থেকে যান গিয়ে আপনার ছোট ছেলেকে দিয়ে আসুন। মদ গিলতে গিলতে তো কোমর বেঁকিয়ে ফেলেছে। ওনার একটু পুষ্টি দরকার।”
নিধি এতগুলো কড়া কথা বলে গেল কিন্তু তবুও সালমা বেগম ওর দিকে ফিরেও তাকালেন না। একটা কথার উত্তরও দিলেন না। তিনি এবার গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে হালকা করে গহনের কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারো গহনের নাম ধরে ডাকলেন।
গহন সত্যি ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। হালকা একটু ঝাঁকুনি অনুভব করতেই চোখ মেলে তাকালো। চোখ দুটো লাল টকটক করছে। দেখে মনে হচ্ছে সেই চোখ দুটোতে কত ক্লান্তি! এবারে একটু বিশ্রাম দরকার।
গহনকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে সালমা বেগমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। গহনের গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,
“শরীর কি এখন একটু ভালো লাগছে, বাবা?”
গহন কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সালমা বেগমের মুখের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই নিধির নাম ধরে ডেকে উঠলো। সালমা বেগমের প্রশ্নের কোন উত্তরই দিলো না গহন। নিধি তাড়াহুড়ো করে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন,
“হ্যাঁ বলুন। কিছু লাগবে?”
গহন দুর্বল কণ্ঠে বলল,
“একটু পানি দাও।”
নিধি পানি দিতে ধরলে সালমা বেগম বাঁধা দিয়ে গহন কে বলল,
“বাবা, পানি খেতে হবে না। গরম দুধ এনেছি। এটা একটু খাও। ভালো লাগবে।”
গহন একবার তাকালো সালমা বেগমের হাতে থাকা দুধের গ্লাসের দিকে। আবারো পূর্বের মতোই কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপরে ফের নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নিধি, পানি দাও।”
সালমা বেগমের মুখটা এবারে কালো হয়ে গেল। নিধি হাতে করে পানির গ্লাসটা নিয়ে এসে বলল,
“একটু সরে দাঁড়ালে সুবিধা হয়। শুনলেন তো দুধ খাবেন না। এতো ভালোবাসা ওনার সয় না। এলার্জি হয়ে যায়।”
কি ভেবে যেন সালমা বেগম সত্যি সরে গেলেন। নিধি একাই গহন কে উঠে বসতে সাহায্য করলো। তারপরে নিজেই গ্লাসটা ধরে একটু পানি খাইয়ে দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিয়ে আবার শুইয়ে দিল।
নিধি গহনের মাথার কাছে বসে গহনের চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“এখন একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করুন। আমি পাশে আছি। কোন কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকবেন।”
সালমা বেগম তখনও দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। গহন আড়চোখে একবার ওনাকে দেখে চোখটা বন্ধ করে নিধি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“লাইটটা বন্ধ করে দাও। আমার সমস্যা হচ্ছে।”
সালমা বেগম বেশ বুঝতে পারলেন যে গহন ইঙ্গিতে ওনাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলছে। নিধিও যেন হালকা হালকা একটু আন্দাজ করতে পারলো। নিধিকে অবশ্য সালমা বেগমকে আলাদা করে বলতে হলো না ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। উনি নিজেই পিল পিল পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। ঘর থেকে বের হয়ে কয়েক কদম হাঁটতেই ওনার কানে নিধির কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও থামলেন সালমা বেগম। ঘাড় ঘুরিয়ে নিধির দিকে তাকাতেই নিধি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“একটা বিষয় হালকা হালকা একটু আন্দাজ পেলাম। ওনাকে মা রা র চেষ্টা করেছিলেন কখনো? বি ষ খাইয়েছিলেন নাকি?”
সালমা বেগম খানিকটা চমকে উঠলেন। ওনার জানামতে গহন এই কথাটা কাউকে বলবে না। গহন কখনোই কারো কাছে ওনাকে খারাপ করবে না। কখনোই ওনার দোষ ত্রুটি গুলো কারো কাছে বলবে না। তাহলে নিধি জানলো কি করে?
তিনি ঘাবড়ালেন না। বরং চোখে মুখে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বললেন,
“তোমাকে কে বলেছে এসব?”
“অর্ধেক শুনেছি। বাকি অর্ধেক আন্দাজ করেছি। আপনি বলুন ঠিক না ভুল?”
“ঠিক হলে কি করবে, ভুল হলে কি করবে?”
“ভুল হলে তো বেঁচে গেলেন। ঠিক হলে আপনাদেরকেও খাওয়াবো। গহন কে ঠিক যেভাবে খাইয়েছেন, সেভাবেই খাওয়াবো। কথাটা মাথায় রাখবেন। এখন বলুন ঠিক না ভুল?”
সালমা বেগম বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বললেন,
“অর্ধেক যখন জেনেছো বাকি অর্ধেকও নিজেই জেনে নিও। তুমি তো মাতব্বর। আমায় আবার নতুন করে জানাতে হবে কেন।”
কথাটা বলে সালমা বেগম সেখান থেকে চলে গেলেন। নিধি শুধু কটমটে দৃষ্টিতে ওনার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো। ইচ্ছে করলো পিছন থেকে গিয়ে দু হাতে বুড়ির মাথার চুল খামচে ধরতে। তাহলে যদি নিধি একটু শান্তি পেত।