“গহন!”
গহন কোন উত্তর দিলো না নিধির ডাকের। সোফায় বসে আছে গম্ভীর ভঙ্গিতে। বসার ঘর থেকে নিধিকে টেনে এনে সোজা দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। আর একটা কথাও বলেনি। কেননা নিধির উপরে গহনের প্রচন্ড রাগ জমে আছে। বাইরে সবার সামনে আর কিছু বলেনি ঠিকই। তবে রেগে তো আছেই।
নিধি ভয়ে ভয়ে গহন এর দিকে এগিয়ে গিয়ে আবারো ডাকলো ওর নাম ধরে। এবারও গহন কোন উত্তর দিল না।
কোনো উপায় না পেয়ে নিধি এবার সরাসরি গিয়ে গহনের পায়ের কাছে বসে পড়লো দুই হাঁটু গেড়ে। গহনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“আমায় ক্ষমা করে দিন। আমি সত্যি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হয়ে যাবে। আমার খুব খারাপ লাগে কাউকে কষ্টে দেখলে। আমি তো একটা মেয়ে বলুন। আরেকটা মেয়ের অসহায়ত্ব আমি খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারি। সেজন্য খারাপ লেগেছিল। আমার উদ্দেশ্য তো খারাপ ছিল না। জানি, আপনার কথা না শুনে ঠিক করিনি। কিন্তু তারপরও ক্ষমা করে দিন। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন। এবারের মতন ক্ষমা করে দিন, গহন।”
গহন এবারে তাকালো নিধির দিকে। তবে কন্ঠ মোটেই স্বাভাবিক না। আর না আদুরে। বরং সেই কন্ঠের মাঝে নিধি যেন একটু রাগই খুঁজে পেল।
“তোমায় ভালোবাসি জন্যই রেগে আছি। তোমায় ভালোবাসি জন্যই সবাই মিলে এভাবে কথা শোনানোতে আমার খারাপ লেগেছে। আর তোমায় ভালোবাসি জন্যই সব কিছু থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।”
“এখন বুঝতে পেরেছি। তখন তো বুঝিনি। কি করব বলুন? ছোট মানুষ, বয়স কম, বুদ্ধিও কম, বুঝিও কম। আপনি তো বড় মানুষ। বুদ্ধি বেশি, বিবেচনা বোধ বেশি। ক্ষমা করে দিন। আর হবেনা।”
“আর হওয়া উচিতও হবে না। স্পষ্ট ভাবে তোমায় শেষবারের মতন বলে দিচ্ছি, আর যদি কখনো কারো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছো তাহলে সেদিন কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে নিধি। আজ অনেক কে অনেক ভাবে দোষারোপ করেছি। সেদিন তুমি ব্যতীত আর কাউকে দোষারোপ করব না।”
নিধি নিজেই নিজের দুই কান ধরে বলল,
“আর কখনো হবে না। ন্যাড়া একবারই বেলতলা যায়। আমি নিধি দ্বিতীয় বার যাব না। দেখুন আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি। শুধু আবেগে বিবেক হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন থেকে আর আবেগ কে কাজই করতে দেবো না। শুধু বিবেক দিয়ে চলব।”
গহন একটু নরম হলো। তবে তাও গম্ভীর গলায় বলল,
“হুম ঠিক আছে। তবে রেগে কিন্তু আমি এখনো আছি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। সে আপনাকে রাতে শান্ত করে দেব। কিন্তু এখন আমায় বাইরে যেতে দিন।”
“আবার বাইরে যাবে কার মুখ দেখতে?”
“আমার বাবা মা এসেছে। ওরা কি করছে এখন কে জানে!”
গহন গম্ভীর গলায় বলল,
“কোন প্রয়োজন নেই। ওনাদের তোমার প্রতি কতটা কি ভালোবাসা আছে আমি বুঝে নিয়েছি। যা ইচ্ছে করুক।”
“আরে না না। আপনি যেমন ভাবছেন তেমন না। মায়েরা এমনই হয়। ওরা শুধু চায় যে করেই হোক যেন মেয়ের সংসার বেঁচে যাক। তাও যদি আবার হয় আমার মতন নিম্নবিত্ত পরিবার। আমার বাবা কিন্তু কিছু বলেনি। আমি জানি আমার বাবার আমার ওপরে ভরসা আছে। সেজন্য চুপ ছিল। শুধু আমার বাবার ভীতটা মজবুত না তো, সেজন্য জোর গলায় কিছু বলতে পারেনি। শুনুন না, একটু চলুন না বাইরে আমার সাথে। আমার চাচা চাচির সাথে কথা বলতে হবে না। আমার বাবা আর মায়ের সাথে একটু ভালো করে কথা বলবেন? ওরা খুব অপমানিত হয়েছে। চলুন না গহন। ওনাদের কেউ সম্মান করে না। আপনি একটু করবেন?”
গহন পড়লো মহা ঝামেলায়। এই মেয়েটার একটা আবদারও ফেলতে পারে না। মেয়েটা একটা ছোট্ট কিছু চাইলে ইচ্ছে করে পুরো দুনিয়া ওর পায়ের কাছে এনে রাখতে। গহন যেন চারিদিকে শুধু একটা সুযোগ হাতড়ে বেড়াতে থাকে যে, কি করলে মেয়েটাকে হাসানো যাবে, খুশি রাখা যাবে। সেই সুযোগটা যখন পেয়ে যায় তখন তো আর হাতছাড়া করতে চায় না। তাও যখন মেয়েটা নিজ মুখে কিছু চাইছে। কি করেই বা ফিরিয়ে দেবে?
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে চলো।”
_________
“এই মেয়ে, মুখটা একটু কম চালাস। তোর শরীরে ভয় ডর নেই তাই না? শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে যাবি কোথায়? আবার আমাদের ঘাড়ে চাপবি? আমাদের র’ক্ত চুষে খেয়ে তোর বদ অভ্যাস হয়েছে তাই না? শান্তি পেতে দিলি না।”
নিধির বিন্দুমাত্র আর কারো সাথে তর্কে জড়ানোর ইচ্ছে নেই। আর না তর্ক করার মতন শক্তি আছে। ফলস্বরূপ শান্ত গলায় আনিসা কে বলল,
“চিন্তা করো না। কখনো যদি আমায় এই সংসার ছেড়ে যেতেও হয় তোমাদের বাড়ি যাব না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার থেকে মৃ'ত্যু আনন্দায়ক হয়। আমার ক্ষেত্রেও আবার ওই বাড়িতে গিয়ে ওঠার থেকে মৃ'ত্যু অধিক সম্মানজনক এবং আনন্দদায়ক।”
কথাটা বলে নিধি চলে গেল সেখান থেকে। একটু দূরে গহন আযীয আহমেদ আর নীলার সাথে কথা বলছেন। ওদিকেই গেল।
গহন মাথা নিচু করে অপরাধী গলায় আযীয আহমেদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল,
“আসলে ভুলটা আমারই। আমারই আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। ক্ষমা করবেন। আমার ভুলের জন্য আপনাদের আজ এতটা অপমানিত হতে হলো।”
জামাইকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে দেখে নীলা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তড়িঘড়ি করে বললেন,
“আরে না না বাবা। কি করছো? তুমি কেন হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছো? এমনটা করো না বাবা। তোমার কোন ভুল নেই। আমি জানি দোষ আমার মেয়েরই।”
গহন নীলার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“কেন মা? আমার কেন দোষ থাকতে পারে না? আমিও মানুষ। আপনি মা হয়ে যদি নিধিকে দোষী সাব্যস্ত করতে উঠে পড়ে লেগে যান, যদি আপনি ওর পাশে না দাঁড়ান তাহলে আমি আমার মায়ের থেকে আর কি আশা করবো? মেয়েকে একটু বুঝুন। মেয়ের পাশে একটু দাঁড়ান। ওকে তো চমৎকার শিক্ষা দিয়েছেন আপনারা। এমন চমৎকার শিক্ষা ক’জন বাবা-মা দিতে পারে তার মেয়েকে। তাহলে এভাবে যখন শিক্ষা দিয়েছেন ওর পাশেও দাঁড়ান। সেই শিক্ষার মর্যাদা রাখতে দিন ওকে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও থেমে গেলেন নীলা। ওনাকে চুপ করে যেতে দেখে গহন আবারো আযীয আহমেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাবা, আপনি একদম এসব ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করবেন না। আপনি কখনো ভাববেন না, যে মেয়েকে আপনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভরসা করে সেই মেয়েকে আবার আমি আপনার কাছে ফেরত পাঠাবো। এইসব অশান্তি হতেই থাকবে সংসারে। তবে আপনি চিন্তা করে নিজের শরীর খারাপ করবেন না। আমি নিধির পাশে সারা জীবন থাকবো।”
আসার পর থেকে আযীয আহমেদ একটা কথাও বলেননি। তিনি যেন বাকহারা হয়ে গিয়েছিলেন। কথা বলার মতন পরিস্থিতিতেই ছিলেন না। এবারে তিনি উপস্থিত গহন আর নীলা কে অবাক করে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ওনাকে কাঁদতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল গহন। দূর থেকে নিধি ওর বাবাকে কাঁদতে দেখে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে দুই হাটু গেঁড়ে ওনার সামনে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“বাবা, কি হলো? কাঁদছো কেন তুমি? আরে আমার সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করে না তো। আজকে আমি একটু বাড়াবাড়ি করেছিলাম জন্য সবাই রেগে গেছে। আরে কাঁদছো কেন? সবাই ভালো। আমায় ভালোবাসে তো ওরা।”
মিথ্যে কথাগুলো বলতে বলতে নিধি নিজেও কেঁদে ফেলল। আযীয আহমেদ তার কম্পিত হাত দুটো মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একটু আদর করলেন। ক্রন্দনরত গলাতে বললেন,
“মা রে, আমার মতন অসহায় বাবাদের যেন কখনো কোন মেয়ে সন্তান না হয়। আমার মতন নিষ্কর্মা, অসহায় বাবার মেয়ে হয়ে আসার থেকে তোরা কখনো জন্মই নিস না। আজ বাবা হয়ে মেয়েকে এই পরিবেশে রেখে যাচ্ছি। আমি এতটাই অক্ষম যে একবার জোর গলায় এই কথাটা বলার সাহস অব্দি পেলাম না যে ফিরিয়ে দিন আমার মেয়েকে। আমি নিয়ে যাব আমার মেয়েকে আমার সাথে। আমার মেয়ে আমার ঘরের রাজকন্যা। সারাজীবন ওকে বসিয়ে পালার ক্ষমতা আমার আছে। পারলাম না রে মা বলতে। নিজে তিন বেলা ভাইয়েদের টাকায় খাই। উঠতে বসতে খোঁটা শুনতে হয়। সেই খাবারটুকু হজম হতে চায় না। তোকে আবার কোন মুখে নিয়ে যাই রে মা। আমি কি করি মা বলতো? আমায় একটা সমাধান দে? আর সমাধান দিতে না পারলে তোর এই অক্ষম বাবাকে গলা টিপে মে'রে ফেল। না আমায় বেঁচে থাকাকালীন দুচোখে তোর এই কষ্ট দেখতে হবে, না তোর নিজেকে তোর বাবা বেঁচে থাকা সত্ত্বেও অসহায় মনে হবে। এই জীবনটাই যেন এখন একটা অ ভি শা প হয়ে ঠেকেছে।”
নিধি নিজেও কাঁদছে। আযীয আহমেদের বলা শেষের কয়েকটা বাক্য শুনে ওর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। হাত বাড়িয়ে আযীয আহমেদের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“এসব কি যা তা বলছো বাবা? তুমি যেমনই হও না কেন তাও আমার বাবা। কত কিছু দিয়েছো তুমি আমাকে। আমায় জন্ম দিয়েছো, এত ভালো শিক্ষা দিয়েছো। আজ যেখানে আছি তোমার জন্যই তো আছি। আজ না হয় কিছু দিতে পারছো না। যখন সামর্থ্য ছিল তখন তো দিয়েছো। সাধ্যের বাইরে গিয়ে দিয়েছো। সেসব কি আমি ভুলে গেছি নাকি? এখন কিছু দিতে পারো বা না পারো তাও তো তুমি আছো। বাবা বলে ডাকতে তো পারছি। চোখের সামনে তোমায় দেখতে তো পারছি। আমার আর কিচ্ছু লাগবে না।”
“তুই কিভাবে থাকবি এই বাড়িতে সারাটা জীবন মা? আমার কয়েক ঘণ্টায় দম বন্ধ হয়ে এসেছে। একটা মানুষের কথা বলার ধরন ঠিক নেই। ছোট বড় যে যা পারে তোকে বলে। বিন্দুমাত্র তোর কোন সম্মান নেই মা। আমি জানি সেটাও আমার কারণে। কারণ আমি কিছু দিতে পারিনি তোকে। আজ যদি তোর বাবার ক্ষমতা থাকতো, তোর বাবার টাকা থাকতো সবাই তোর সাথে বুঝেশুনে কথা বলতো। কিন্তু আমার যে কিচ্ছু নেই।”
কথাটা বলে আযীয আহমেদ আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। নিধি এবারে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। চুপচাপ বসে কেঁদে গেল।
পাশে দাঁড়িয়ে নীলাও কাঁদছে। গহন বুঝলাে পরিস্থিতিটা ওকে সামাল দিতে হবে। নয়ত এরা সবাই কেঁদেই যাবে।
গহন নিজেও দুই হাঁটু গেড়ে নিধির পাশে বসলো। আযীয আহমেদের হাতটা শক্ত করে ধরে ওনাকে একটু ভরসা দিতে চাইলো।
“বাবা, কেন নিজেকে এতটা অসহায় ভাবছেন? কেন দোষারোপ করছেন নিজেকে? আপনি কোন ভুল করেননি। ওই যে আমি বললাম চমৎকার শিক্ষা দিয়েছেন আপনারা আপনার মেয়েকে। এর থেকে দামি আর কিই বা হতে পারে!”
আযীয আহমেদ অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বিশ্বাস করো বাবা, আমার পরিবারের কে কি দেখে আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল আমি জানিনা। তবে আমি শুধুমাত্র রাজি হয়েছিলাম তোমায় দেখে। তোমার ব্যবহার দেখে, তোমার ভদ্রতা, শিষ্টাচার দেখে। তোমায় প্রথম দেখাতেই আমার মনে হয়েছিল যে তুমি খুব ভদ্র একটা ছেলে। আমার মনে হয়েছিল তুমি দায়িত্ববান, যত্নশীল একজন মানুষ হবে। আমার মেয়ে ভালো থাকবে তোমার কাছে। আমি তোমার টাকা পয়সার লোভে বিয়ে দেইনি, বাবা। আমি কি তাহলে তোমায় ভুল চিনেছিলাম? আমি কি ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম?”
আযীয আহমেদ কথাটা বলতেই নিধি তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“না না বাবা। তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নাওনি। উনি খুবই ভালো। ওনার বাড়ির লোকজনের সমস্যা। কিন্তু উনি ভালো। তুমি তো আমায় চেনো বলো। আমি কি কারো মিথ্যে প্রশংসা করি? উনি সত্যি মাটির মানুষ। আর সমস্যা এখানেই। সবাই খুঁচিয়ে চলে যায় ওনাকে। কিন্তু উনি খুবই ভালো। আমার যত্ন নেন বাবা। ওনাকে দোষারোপ করো না।”
“তাহলে কাকে দোষারোপ করবো মা?”
নিধির দৃষ্টি এবারে সোজা গেল নীলার দিকে। তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“সবার আগে ভাগ্যকে দোষারোপ করি আমি, বাবা। তারপরে দোষারোপ করি আমার মা কে। আমার মা হয়তো আমায় ভালোই বাসে। শুধু তার ভালোবাসার ধরণটা খারাপ। আর আমার এমন ধরন খারাপ ভালোবাসার প্রয়োজনই নেই। যে নিজের মেয়ের দিকটা বোঝেনা, নিজের মেয়ের সম্মান বোঝেনা, নিজের মেয়ের ভালো মন্দ বোঝেনা সে আবার কেমন মা? এমন মা কোন সন্তানই বা চায়?”
নিধি কথাগুলো বলতেই নীলা অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,
“কি বললি? আমি তোর ভালো মন্দ বুঝি না?”
“না মা বোঝো না। তুমি শুধু একটা কথাই বোঝো কি করে আমাকে তোমাদের বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে। কি করে আমাকে তোমাদের ঘাড় থেকে নামাতে হবে। আজ আমার জায়গায় যদি তোমার ছেলে থাকতো তুমি এই কাজটা করতে পারতে না মা। তোমার ভালোবাসার শুরু থেকে শেষ অব্দি শুধু ভুল আর ভুল। আর এমন ভালোবাসার আমার দরকার নেই। তুমি তোমার ভালোবাসা তোমার সঙ্গে করে নিয়ে যাও। আর কখনো এমন ভালোবাসা আমাকে দেখাতে আসবে না। আজ তুমি আমার সম্মান সব শেষ করে দিয়েছো। আমাকে একেবারে ভেঙ্গে চুরে দিয়েছো ভেতর থেকে। আর আমি চাইনা এমন কেউ আমার জীবনে থাকুক যে আমাকে ভাঙতে পারে। আমি নিজেকে বরাবরই শক্ত রাখতে চাই। তোমার সাথে আবার সেদিনই আমি কথা বলতে চাই মা, যেদিন তুমি আমাকে ভাঙতে না, গড়তে আসবে।”
নীলার দু চোখ ছলছল করে উঠলো। গহন নিধি কে আর এগোতে দিল না। ওকে থামিয়ে দিয়ে আযীয আহমেদ কে বলল,
“বাবা, অক্ষমতাটা আসলে আমার যে আমি আপনার ভরসা জিততে পারিনি। আমি কথা দিচ্ছি, এবারে আপনার ভরসা অর্জন করবো আমি। তখন আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে আপনার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল না ভুল।”
__________
গহনের সাথে কথা বলার মতন সাহস আপাতত বাড়িতে সিনথিয়া ব্যতীত আর কারোরই নেই। কেননা একমাত্র সিনথিয়াই ঝাড়ি খায়নি গহনের হাতে। তবুও সিনথিয়া এখনো আসতে চায়নি গহনের কাছে। কিন্তু ওকে জোর করে পাঠানো হয়েছে।
শম্পা সাহস করে গহনের ঘরের দরজা পর্যন্ত ওকে নিয়ে এসেছে। তারপর ঠেলে সিনথিয়া কে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। নিধি এখন ঘরে নেই। সেই সকাল থেকে গহন কিছু খায়নি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সেজন্য ওর জন্য রান্না করতে গেছে। আর শম্পা ভাবলো এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে। বউ সামনে থাকলে আবার গহনের মাথা আজকাল একটু বেশিই গরম হয়। সেজন্য বউয়ের অনুপস্থিতিতে যা করার করতে হবে।
সিনথিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল গহন বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সিনথিয়া ভয়ে ভয়ে কম্পিত গলায় একবার ডাকলো গহনকে।
“ভাইয়া!”
ডাকটা কানে যেতেই গহন চোখ মেলে দরজার দিকে তাকালো। সিনথিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“কিছু বলবে?”
সিনথিয়া আবারও কম্পিত গলাতেই বলল,
“ভিতরে এসে বলি?”
“এসো।”
সিনথিয়া গুটিগুটি পায়ে ভিতরে এলো। একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“আসলে ভাইয়া মায়ের শরীরটা খুব খারাপ করেছে। শ্বাসকষ্ট বেড়েছে আবার।”
“হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে?”
“না না। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে না। মানে আসলে মা ইনহেলার নিতে চাইছে না।”
“জোর করো।”
“জোর করেছি কিন্তু মা শুনছেনা। মা তো তোমার কথা ছাড়া আমাদের কারো কথা শোনে না ।”
“সাবিতকে ডেকে নিয়ে যাও ঠিক শুনবে।”
“না ভাইয়া হবে না। তুমি একবার চলো না।”
গহন এবারেও পূর্বের মতন গম্ভীর গলাতেই বলল,
“ইনহেলার নিতে না চাইলে প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়াও। আমি ডাক্তার না যে আমি গেলে কাজ হবে। আর এমনিতেও আমার গুরুত্ব এই বাড়িতে কারো জীবনেই তেমন একটা নেই। সাবিত মায়ের ছেলে। ওকে নিয়ে যাও। কাজ হয়ে যাবে।”
কেন যেন সিনথিয়া আর একটা টু শব্দও করতে পারল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দরজার কাছেই শম্পা দাঁড়িয়েছিল। ওদের কথাবার্তা খুব একটা ওর কানে যায়নি। সিনথিয়াকে বের হতে দেখেই তড়িঘড়ি করে বলল,
“কি হলো? কি বলল?”
“ছোট ভাইয়াকে নিয়ে যেতে বলল।”
“ও নিজে এলো না?”
“না।”
শম্পা রাগান্বিত গলায় দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“না বলল আর চলে এলি? জোর করতে পারলি না? একটা কাজ হয় না তোকে দিয়ে।”
সিনথিয়া খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তো তুমি যাও। আমাকে দিয়ে যখন কাজ হয় না নিজে আড়ালে দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে যাও। তোমরা সবগুলো স্বার্থপর। শুধু বোঝো নিজেরটা। কি দরকার ছিল এই ঝামেলা গুলো করার? আরে ভাইয়া ওর বউ কে নিয়ে থাকতে চাইছে থাকুক না। আমাদের কোনো অসুবিধা তো হচ্ছিল না। যা চাইছিলাম দিয়ে দিচ্ছিলো। কিন্তু তোমাদের র’ক্ত চুষে না খেলে পেটের ভাত হজম হয় না। দেখি সরো। থাকবোই না এখানে। যত সব আজাইরা ঝামেলা।”
সিনথিয়া কথাটা বলে শম্পাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে নিধির সাথে ধাক্কা খেলো। নিধিকে দেখতেই সিনথিয়া কেঁপে উঠলো। বেশি ভয় পেল নিধির চোখ দুটো দেখে। যদিও শান্ত দেখাচ্ছে নিধি কে কিন্তু তবুও ওর চোখদুটো সিনথিয়ার কাছে হিংস্র মনে হলো। সিনথিয়ার যেন বুকটা কেঁপে উঠলো। ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলো,
“আমি তো কিছু বলিনি তোমায়।”
নিধির কোনো কথাই বলার ইচ্ছে হলো না ওদের সাথে। চুপচাপ ওদের কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে শম্পা বলে উঠলো,
“তোমার স্বামী কে বলে দিও মা খুব অসুস্থ। একবার যেন এসে দেখে যায়।”
নিধি বাধ্য হলো থামতে। ঘাড় ঘুরিয়ে শম্পার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“যা বলার নিজে বলে যান। আমি আপনার চাকর না যে এভাবে হুকুম করবেন।”
“আজকাল তো তুমি আবার জাদু করেছো। আমাদের কথা তো শোনেনা তোমার স্বামী। যাও গিয়ে বলো। অসুস্থ তো তোমার স্বামীর জন্যই হয়েছে মা।”
নিধি এবারে ঘুরে দাঁড়ালো শম্পার দিকে। কন্ঠে হালকা বিস্মিত ভাব প্রকাশ করে বলল,
“আপনাকে আমি যত দেখি তত অবাক হয়ে যাই। আরো কবে ভালো হবেন আপনি? এখনো যদি ভালো না হন তাহলে তো ঠেঙিয়ে ভালো করতে হবে। আর সব থেকে বড় কথা আপনি এখনও এ বাড়িতে কি করছেন? গহন তো আপনাকে চলে যেতে বলেছিল।”
নিধি শেষের বাক্যটা বলতেই শম্পা ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আঙ্গুল উঁচিয়ে যেই না শাসিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিধি কন্ঠ খাদে নামিয়ে শাসিয়ে বলল,
“আঙ্গুল নামিয়ে কথা বলুন। নয়ত ওটা ভাঙতে আমার দু সেকেন্ডও লাগবে না। এতদিন যথেষ্ট ভদ্রভাবে থেকেছি। অনেক অপমান সহ্য করেছি। কিন্তু এবার থেকে কথা বলতে এলে দশবার না দশ লক্ষ বার ভাববেন। বড় ছোট কিচ্ছু মানবো না। আমার ভালোমানুষি দেখেছেন। এবার থেকে সবাই কে একেবারে ধুঁয়ে দেব।”
শম্পা নিজের আঙুলটা গুটিয়ে এনে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“বাড়াবাড়ি করো না নিধি। ভুলে যেও না এই বাড়িটা আমারও। আমার বাবা বানিয়ে রেখে গেছে।”
“কার বাবা বানিয়েছে জানিনা। কিন্তু এই বাড়িটা আমার স্বামীর। আর এটা একটা বাড়ি। কোন চিড়িয়াখানা না যে কুকুর বিড়ালকে পালবো। দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পোষার দিন শেষ। এবার এক একটাকে ধরবো আর বের করবো। তাড়াতাড়ি নিজের স্বামীকে কল করে বলুন এসে নিয়ে যেতে।”
কথাটা বলে নিধি নিজের ঘরের ভেতরে চলে গেল। শম্পা এখনো হা করে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। নিধি যে চলে গেছে সেই বিষয়টাও যেন বোধগম্য হয়নি। কি যা তা বলে গেল মেয়েটা। একেবারে খাপছাড়া কথাবার্তা বলে গেল।
শম্পা কে আজ এত অপমান করার সুযোগ পেল শুধুমাত্র গহনের জন্য। গহনের থেকে একটু আস্কারা পেয়ে মেয়েটা একেবারে মাথায় উঠে বসেছে। আচ্ছা ঠিক আছে। আজ নাহয় শম্পা নিজের অপমান সহ্য করে নিল। তার কারণ সালমা বেগম ঝিমিয়ে গেছেন। তবে কি ভেবেছে এই মেয়ে সারা জীবন এরকম ঝিমিয়েই থাকবেন সালমা বেগম? মোটেও না। সময় আসুক। আবার ঠিকই ফোঁস করবে।