আজ অনেকদিন পর আবার বাড়িতে জারা এলো। গতকাল রাতে নিধির সাথে কথা হয়েছিল। তখনই জানতে পেরেছিল যে গহন নাকি খুব বেশি অসুস্থ। সেজন্যই মূলত ওকে দেখতে এসেছে। যদিও এই কারণটা জারা বলবেনা। বলবে এদিক দিয়েই যাচ্ছিল, অনেকদিন থেকে ওদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তাই এসেছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো ঠিক একই সময় আবিদও এসেছে। আবিদও গহন কে দেখতেই এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে দরজার কাছে আসতে না আসতেই যখন জারা আবিদের মুখটা দেখলো সঙ্গে সঙ্গে গা পিত্তি জ্বলে গেল। জারা আসলে বুঝতেই পারে না কি করে যখন ও এই বাড়িতে আসে ঠিক সেই সময় এই ছেলেটাও চলে আসে। মাঝে মাঝে ভাবে সারাক্ষণ বোধহয় জারার পিছন পিছন ঘোরে। কিন্তু এটা তো সম্ভব না। ছেলেটার নাকি বড় ব্যবসা আছে। সেটা একাই সামলায়। তাহলে এত বড় ব্যবসা রেখে ওর পেছনে ঘুরবে কি করে?
আসলে জারার কপালটাই খারাপ। যাকে চায় তাকে পায় না। আর যাকে চায় না সে সারাক্ষণ হুটহাট সামনে চলে আসে।
সবেমাত্র জারা ভেতরে এলো। নিধি দরজা খুলে দিয়েছে। আবিদও আছে অবশ্য ওদের সাথে। নিধির সাথে কথা বলতে বলতে ওদের ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে ধরে হঠাৎ করে কোত্থেকে যেন সামনে এসে সাবিত দাঁড়ালো। কেমন যেন ঢুলছে মনে হচ্ছে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে কতকাল ঘুমোয়না। সাবিত কে দেখার সাথে সাথেই জারার মন মেজাজটা আরো বিগড়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“কোন কাজ নেই তোমার যে, যখন তখন মেয়েদের সামনে এসে দাঁড়াও? সরো সামনে থেকে।”
জারার ঝাড়ির প্রেক্ষিতে সাবিত খুব অদ্ভুত ভাবে হাসলো। অদ্ভুত বলতে নোংরা ভাবে হাসলো। জারা কে রেখে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“অন্যের সংসারের দিকে এত নজর রাখো আবার নিজের সংসার ভাঙার জন্য একেবারে দাওয়াত করে নিয়ে আসছো ওকে? অন্যের স্বামীর চরিত্রের উপর আঙুল তুলতে পারো। আর নিজেই নিজের স্বামীর মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছো? বাহ!”
সাবিতের মুখ দিয়ে খুব বাজে গন্ধ বেরোলো। জারা আর আবিদ দুজনেরই মাথার উপর গেল সাবিতের বলা কথাগুলো। কিন্তু নিধির বেশ ভালোই বোধগম্য হলো ব্যাপারটা। চোখ রাঙিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে সাবিত কে শাসিয়ে বলল,
“আমি কিন্তু আমার মুখটা বন্ধ করেছি। সেটা আবার খুলতে বাধ্য করবেন না। ভুলেও যদি আর একটা বাজে কথা বলেছেন আজ কিন্তু জুতো দিয়ে পে টা বো আপনাকে। আপনার মা, বউ, বোন পুরো গুষ্টি এলেও বাঁচাতে পারবে না। গহন অসুস্থ বলে ওর কানে এখন এই কথাটা দিলাম না। আপাতত বেঁচে গেলেন সেজন্য।”
কথাটা বলে নিধি সাবিত কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে সাবিত আবারো ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“নিজের স্বামীর চরিত্রের ব্যাপারে কথা বললে খুব খারাপ লাগে তাই না? অথচ অন্যদের চরিত্রের দিকে সারাক্ষণ আঙুল তুলতেই থাকো। আসলে তোমার মতন বউই তো ঘরে ঘরে থাকা দরকার। যারা এমন সুন্দর সুন্দর মেয়েদের অসুস্থ স্বামীদের মনোরঞ্জনের জন্য ঘরে নিয়ে আসে।”
সাবিত শেষের কথাটা জারার দিকে তাকিয়ে বলল। জারা জানে না আগে কি ঘটেছে। তবে সাবিত যে নোংরা ইঙ্গিতটা ওকে উদ্দেশ্য করেই করলো সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। মুহূর্তের মাঝে মাথাটা গরম হয়ে গেল। খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“এই, কাকে কি বলছিস তুই? ম দ গিলে গিলে কি মাথাটার বারোটা বাজিয়েছিস? তোর মতন চরিত্রহীন গহন না, বুঝতে পেরেছিস? আর না তোর বউয়ের মতন আত্মসম্মানহীন মেয়ে নিধি। আর একটা আজেবাজে কথা বললে নিধি যে বলল না এক্ষুনি যে, জুতো খুলে পে টা বে? সেই কাজটা কিন্তু আমি করে দেব।”
জারার কথাগুলো শুনে সাবিত তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“তোমার মতন মেয়ে মানুষের আবার এত দেমাগ কিসের? আচ্ছা তোমাদের তো বেশ ভালোই টাকা পয়সা আছে। তাহলে কিসের এত অভাব পড়ে গেল যে রক্ষিতা হয়ে ওর ঘরে আসতে হয়?”
সাবিত কথাটা বলার সাথে সাথে জারা এবার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সাবিতের গালে কষিয়ে চ ড় বসিয়ে দিয়ে রাগে হিশহিশিয়ে বলল,
“আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে তোর জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব আমি। আমি গহন না বুঝতে পেরেছিস, যে তোর এসব নোংরামি সহ্য করব। মে রে তোর ঠ্যাং
ভে ঙে রেখে দেব। সবার জিভ তোর মতন হয় না যে, মেয়ে দেখলেই লকলক করবে। তুই হলি একটা কুকুরের বাচ্চা। তোর মা একটা কুকুর জন্ম দিয়েছে।”
জারার হাতে চ ড় খেয়ে সাবিত হিংস্র হয়ে উঠল। চ ড় খাওয়া গালে হাত দিয়ে জারার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে হিংস্র গলায় বলল,
“তোমার এত বড় সাহস তুমি আমার গায়ে হাত তুললে! আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে তুমি আমার গায়ে হাত তুললে!”
সাবিত নিজেও জানেনা ও জারার সাথে আসলে কি করতো। আগে পিছে কোন কিছু না ভেবেই ওর দিকে তেড়ে আসতে ধরলো। তবে জারা অব্দি পৌঁছাতে পারলো না। তার আগেই আবিদ জারার হাত ধরে টেনে ওকে নিজের পেছনে দাঁড় করালো। হঠাৎ করে সামনে আবিদ চলে আসায় সাবিত থেমে গেল। কথা তার পরিষ্কার না। ঠিক ভাবে দাঁড়াতেও পারছেনা। তবুও তেজী গলায় বলল,
“সামনে থেকে সরে যাও।”
আবিদ একহাতে সাবিতের কলার চেপে ধরে বলল,
“তুই পিছনে যা। পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখিসনি? একবার গলাটা টিপে ধরলে তখন দেখবো তোর তেজ কোথায় যায়। তোকে আছাড় মা র তে দু সেকেন্ডও লাগবে না। জিম করা বডি আমার। তুই তো চুনো পুটি আমার সামনে।”
এত চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে ঘর থেকে সালমা বেগম, শম্পা, ঋতু তিনজনই বেরিয়ে এলো। বসার ঘরে এমন উত্তপ্ত পরিবেশ দেখে তিনজনে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথোপকথন শোনার পর যখন ব্যাপারটা বোধগম্য হলো তখন এগিয়ে এসে আবিদের থেকে সাবিত কে ছাড়ালেন।
“মা ছাড়ো। ওই জারা আমার গায়ে হাত তুলেছে। কি ভেবেছে ওকে আমি ছেড়ে দেবো?”
ব্যাপারটা চমকানোর মতন সালমা বেগমের কাছে। কিন্তু তবুও তিনি নিজের সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে গম্ভীর গলায় সাবিত কে ঘরে নিয়ে যেতে বললেন। ঋতু আর শম্পা মিলে অনেক কষ্টে সাবিত কে নিয়ে ঘরে গেলো।
ওরা সেখান থেকে চলে যেতেই সালমা বেগম শুধু একবার ওদের তিনজনের দিকে তাকালেন। তারপর চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে জারা বলে উঠলো,
“কোন জন্তুকে জন্ম দিয়েছেন বুঝতে পারছেন? আর এই জন্তু গুলোর জন্য আপনি গহনের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন? অর্ধেক জীবন তো আপনার শেষ। বাকি যতটুকু সময় আছে আপনার কাছে, ভালো হয়ে যান। আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি ভবিষ্যতে আপনার তিন সন্তানের একজনের কাছেও আপনার জায়গা হবে না৷ গহনের পায়ের কাছেই থাকতে হবে কিন্তু।”
সালমা বেগম কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলেন। অদ্ভুত বিষয় হলো তিনি কিচ্ছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
জারা প্রচন্ড অবাক হলো। বিস্মিত গলায় নিধি কে বলল,
“উনি আবার এত শান্ত হয়ে গেলেন কেনো, নিধি?”
নিধি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঘরে চলো বলছি। দুদিন হলো ভালো মানুষির রোগ ধরেছে। গহনের কাছে ঝাড়ি খেয়েছে যে। এখন আবার ভালো মানুষ সাজতে হবে না! তাই একেবারে চুপ করে গেছে। পুরোই ধান্দাবাজ মহিলা।”
_________
শহর থেকে খুব একটা দূরে না জায়গাটা। বেশ শান্ত শিষ্ট কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। আশেপাশে শুধু বিশাল বিশাল ফ্ল্যাট দেখা যাচ্ছে। গহনের গাড়ি এসে সেখানে থামলো। ভার্সিটিতে ক্লাস শেষে নিধি কে নিয়ে সোজা এখানে এসেছে।
গাড়িটা থামতেই জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে নিধি একবার আশেপাশটা দেখে নিল। বেশ ফাঁকা একটা জায়গা। তাও আবার নিরিবিলি। মেইন রোড থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে। মাথাটা আবার ভিতরে ঢুকিয়ে সিটে বসে গহনকে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কোথায় নিয়ে এলেন? এত নিরিবিলি কেন? কোন মানুষজন নেই নাকি?”
গহন সিট বেল্টটা খুলতে খুলতে বলল,
“নামো আগে। পরে বলছি।”
নিধি কথা বাড়ালো না। বাধ্য মেয়ের মতন সিটবেল্টটা খুলে গাড়ি থেকে নামলো। এখন নিধি সিটবেল্ট খুলতেও শিখে গেছে, বাঁধতেও শিখে গেছে। অভ্যাস হয়ে গেছে। কিছুদিন পর হয়তো গহনের মতনই অবস্থা হবে। গাড়ি ছাড়া আর কোথাও যেতেই পারবে না।
গাড়ি থেকে নেমে নিধি আরো একবার আশপাশটা ভালোভাবে দেখে নিলো। এখন মানুষজনের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে। যে যার গাড়িতে করে যাতায়াত করছে। গাড়ির জানালার কাচ তুলে রাখার জন্য ভেতরে মানুষজন দেখা যাচ্ছে না। তবে এতক্ষণে নিধি একটু শান্তি পেল। যাক, মানুষজন আছে তাহলে এখানে। কিন্তু গহন এখানে কেন নিয়ে এলো সেটাই ভাবনার বিষয়।
নিধির এসব ভাবনার মাঝেই গহন এসে ওর হাত ধরলো। নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই গহন আলতো হেসে বলল,
“আমার সাথে এসো।”
কথাটা বলে গহন আগে আগে হাঁটা দিলো। এতক্ষণ একটা নির্মাণাধীন ভবন দূর থেকে নিধির চোখে পড়ছিল। এবার সেটার অনেকটাই কাছাকাছি চলে এলো। বাড়ির চারিপাশ প্রাচীরে ঘেরা। যদিও বাড়ির কাজ এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু তবুও সদর দরজার কাজ একেবারে শেষ।
বিশাল বড় একটা রাজকীয় দরজা। কাছাকাছি যেতেই আরো ভালোভাবে দরজার নকশা নিধির কাছে প্রতিয়মান হলো। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে নিধির মুখ হা হয়ে গেল। দরজা দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসেছে গহন ওকে। বিস্মিত গলায় বলল,
“এটা কোথায় নিয়ে এলেন আমায়?”
নিধির প্রশ্নটা শুনে মুচকি হাসলো গহন। আঙ্গুলের ইশারায় নিধিকে দেয়ালে লাগানো নেমপ্লেটটার দিকে তাকাতে বলল। নিধি নেমপ্লেটটার দিকে তাকালো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ❝নিভৃতির নীড়❞। নামটা চমৎকার লাগলো নিধির। সেই সাথে অন্যরকম।
“বাহ! বাড়ির নামটা তো চমৎকার। যিনি নামটা দিয়েছেন তার প্রশংসা করতে হয়।”
নিধির কথাটা শুনে গহন একটু শব্দ করে হেসে উঠল। বুঝল বোকা মেয়েটা নিজের নামও চিনতে পারেনি।
“এই পাগলি, নিজের নাম ভুলে গেলে?”
গহনের প্রশ্নটা শুনে নিধি বোকা বোকা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ? আমার নাম?”
“হ্যাঁ তোমার নাম। তুমিই তো নিভৃতি নিধি। আরেকবার নামটা পড়ো। নিভৃতির নীড়। এটা আমার নিভৃতির বাড়ি। এটা তোমার বাড়ি। তোমার সব সময় কত অভিযোগ থাকে না যে, তোমার বাবার বাড়ি থেকেও জোর করে তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আবার এই বাড়ির মানুষগুলোও তোমাকে জোর করে তাড়ানোর চেষ্টা করে। সেজন্য তোমাকে একটা নিজের বাড়ি বানিয়ে দিলাম। এখান থেকে কেউ কোনদিন তোমায় বের করতে পারবে না। কারোর সেই সাহসই হবে না। তুমি আমি এই নীড়ে সারা জীবন থেকে যাব কেমন?”
নিধি বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো গহনের দিকে। মাথাটা ভনভন করে ঘুরে উঠলো। গহনের বলা কথাটা বিশ্বাসই হলো না। ভাবলো ভুল শুনছে। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“মজা করছেন? এত বড় বাড়ি আমার কি করে হবে? ধুর! এটা হতে পারে না। কার বাড়ির সামনে নিয়ে এসে আমাকে আমার বাড়ি বলছেন? পাগল হয়ে গেলেন নাকি? দেখিতো, জ্বর গেছে নাকি আছে?”
কথাটা বলে নিধি গহনের কপালে হাত রাখতে ধরলে গহন ওর হাতটা ধরে ফেলল। নিধিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে ইশারায় বাড়িটা দেখিয়ে বলল,
“তোমার বাড়ি এটা। ভেবেছিলাম বাড়ির কাজ শেষ হলে তোমায় নিয়ে আসব। কিন্তু মনে হলো যেখানে তোমায় এনে তুলব, যে বাড়িটা তোমার, সেই বাড়িটা তুমি তোমার মনমত গোছাবে। কোথায় কি রাখবে, কিভাবে কি করবে সেই সবকিছু তোমার মন মত হওয়া উচিত। আমি চাই এই বাড়ীর প্রতিটা আনাচে-কানাচে যেন তোমার হাতের ছোঁয়া থাকে। সব কিছুর মাঝে যেন আমি তোমায় খুঁজে পাই। বাড়ির যে কোনায় যাই না কেন, যাই থাকুক না কেন সেই সবের দিকে তাকালে যেন আমার তোমার কথা মনে পড়ে। আমি এই বাড়ির প্রতিটা জায়গায় তোমার শরীরের সুঘ্রাণ অনুভব করতে চাই।”
নিধি কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকলো বাড়িটার দিকে। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে গহনের দিকে তাকিয়ে আবারও অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি এটা আমার বাড়ি? আপনি বানিয়ে দিলেন? মজা করছেন না তো? নিজের একটা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন তো আমার বহু পুরনো। এটাতো অনেক বড় একটা স্বপ্ন। আপনি এত সহজে পূরণ করে দিলেন, তাও আমি না চাইতেই? এত ভালোবাসেন আমায়? আচ্ছা আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? আমি কিন্তু মাঝে মাঝে এমন আজেবাজে অনেক স্বপ্ন দেখি। আচ্ছা গহন, এই স্বপ্নটা ভেঙে যাবে না তো?”
নিধি কথাগুলো বলতে বলতেই কেঁদে ফেলল। গহন তৎক্ষণাত নিধিকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“ভাঙবে না। তোমার কোন স্বপ্ন আমি ভাঙতে দেব না। এ তো সবে শুরু। মাত্র তোমার ছোট্ট একটা স্বপ্ন পূরণ করলাম। অনেকদিন থেকে বাড়ির কাজ শুরু করেছি। আমি জানি তোমার ওই বাড়িতে থাকতে অসুবিধা হয়। কিন্তু জানো, আমার ওই বাড়ির প্রতি একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করে। আমি যে ঘরটাতে থাকি সেই ঘরের প্রতি একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করে। ছোটবেলা থেকে আজ অবধি প্রতিটা দিন ওই ঘরে কাটিয়েছি। হাসলেও ওই ঘরে থেকেছি, কাঁদলেও ওই ঘরেই থেকেছি। তবে ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারছি তোমার ওই বাড়িতে থাকা খুব মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য ভেবেছি বেরিয়ে আসবো। এখন তোমাকে নিয়ে তো আর যে সে জায়গায় উঠতে পারিনা। আমার ঘরের রানী তুমি। রানীকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে না উঠলে হয় নাকি! রানীর অসম্মান করা হয় তো তাহলে।”
নিধি পাল্টা দুহাতে গহনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আমাকে এত সম্মান কেউ কখনো দেয়নি। আমার মা-ই তো আমাকে এত সম্মান দেয় না। আপনি রানী বানিয়ে ফেললেন? আপনি এতটা ভেবেছেন আমার কথা? আমি সারা জীবন ভেসে ভেসে বেরিয়েছি। কখনো কোন বাড়িকে নিজের বাড়ি বলতে পারিনি। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে এই বুঝি আমাকে বের করে দেয় বাড়ি থেকে। কিন্তু এটা আমার বাড়ি। আমি আজ থেকে এটাকে নিজের বাড়ি বলতে পারব। কেউ আমায় বের করে দিতে পারবে না।”
গহন আবার নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,
“হ্যাঁ। কেউ বের করে দিতে পারবে না। এটা তোমার বাড়ি। তোমার সংসার। অসহায় আমরা দুজন একে অপরের ভরসা হয়ে এই নীড়ে, নিশ্চিন্তে সারাজীবন থেকে যাবো।”
__________
জানালার ধারে বসে আছে নিধি। চোখের সামনে এখনো ভাসছে সেই বাড়ি। এখনো সবটা একটা স্বপ্নের মতন লাগছে নিধির কাছে। বিশ্বাসই হতে চাইছেনা যে গহন একটা বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে ওকে।
নিধি এসব ভাবনার মাঝেই ডুবে ছিল। হঠাৎ করে সামনে ধপ করে এসে গহন বসে পড়ায় ধ্যান ভাঙ্গলো। গহন হেলান দিয়ে বসে বলল,
“কি ভাবছো?”
নিধি আগে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো গহনের দিকে। তারপর এগিয়ে গিয়ে গহন কে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
“আমাদের নতুন বাড়িতে আমাদের ঘরে আমাদের দুজনের বিয়ের একটা ছবি বড় করে ফ্রেমবন্দি করে টানিয়ে রাখবো। আপনার ফোনের ওয়ালপেপারে আমাদের দুজনের একটা ছবি আছে না? সেই ছবিটাই রাখবো, ঠিক আছে?”
গহন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“আর শুনুন না, বসার ঘরে তো একটা টিভি থাকবেই। কিন্তু আমাদের ঘরেও আমরা একটা বিশাল বড় টিভি লাগাবো, ঠিক আছে? আমি আর আপনি রাত জেগে পপকর্ন খেতে খেতে মুভি দেখব। আর আমরা কেনাকাটা করতে কবে যাব? আমি রান্নাঘরটা খুব সুন্দর করে গোছাবো। অনেক কিছু তো কিনতে হবে। আমি মনে করে করে সব লিখে রাখবো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। একদিন সময় করে নিয়ে যাব। এখনো তো বাড়ির কাজ শেষে হয়নি। আগে শেষ হতে দাও।”
নিধি শোয়া থেকে উঠে বসলো। উৎফুল্ল গলায় বলল,
“মনে আছে গহন, আপনাকে বলেছিলাম আবার আমরা যেদিন বৃষ্টিতে ভিজবো তখন ছবি তুলব? আমাদের নতুন বাড়িতে গিয়ে আমরা দুজনে বৃষ্টিতে ভিজবো। অনেকক্ষণ ভিজবো। আমাদের ঘরের সাথে যে বড় বারান্দাটা আছে বৃষ্টির দিনে সেখানে আমরা দুজনে দাঁড়িয়ে থাকবো। যখন ফুরফুরে হাওয়া বইবে তখন আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকবো। আর হাতে থাকবে কফি। আমি বকবক করব আর আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।”
গহন একটু হেসে উঠে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তাই হবে।”
নিধি আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই গহনের একটা কল এলো। গহন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে উঠে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় বসলো। নিধি বুঝলো গহনের সাথে আবারো এসব আজেবাজে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
হঠাৎই নিধির কানে শম্পার চিৎকার ভেসে এলো। চিৎকার করে ওর মা কে ডাকছে। নিধি আর গহন দুজনেই আৎকে উঠলো। গহন উঠতে ধরলে নিধি ইশারায় গহন কে বোঝালো যে, ও যাচ্ছে। গহন যেন নিজের কাজ করে।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নিধি। গিয়ে দেখল শম্পা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কিসের যেন একটা কাগজ। ওর চিৎকার শুনে সালমা বেগম, ঋতু দুজনেই বেরিয়ে এসেছে। সালমা বেগম দৌড়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“কি হয়েছে?”
নিধি দূরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলো শম্পা কাঁদছে৷ হাত দুটো কাঁপছে। শম্পা হাতে থাকা কাগজটা সালমা বেগমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“পিয়াল…পিয়াল ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে, মা।”
শম্পা কথাটা বলতেই সালমা বেগম বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো ওর দিকে। মেয়ের হাত থেকে কাগজটা কেড়ে নিলেন তিনি। মেয়ে তো ভুল বলেনি। সত্যিই তো ডিভোর্স লেটার। কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। হঠাৎ করে কি হয়ে গেল যে, ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল।
প্রশ্নাত্মক গলায় মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোনো কারণ ছাড়া তো নিশ্চয়ই ডিভোর্স লেটার পাঠাবে না। কি করেছিস?”
শম্পা কিছু বলতে পারলো না সালমা বেগমকে। শুধু ওনার হাত থেকে ডিভোর্স লেটারটা নিয়ে ভাইয়া বলে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে গহনের ঘরের দিকে গেল। শম্পার পেছন পেছন বাকিরাও গেল।
ফোনে কথা বলা শেষে গহন ঘর থেকে বেরোতেই ধরেছিল। এর মাঝে কাঁদতে কাঁদতে শম্পা কে ঘরে ঢুকতে দেখে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?”
শম্পা কান্নার তোপে কিছু বলতেও পারছে না। শুধু হাতে থাকা কাগজটা গহনের দিকে বাড়িয়ে দিল। কাগজটা পড়তেই গহনের চোখ কপালে উঠে গেল। এতক্ষণে গহন বুঝতে পারল শম্পার কান্নার মানে। কিন্তু গহনের কি বলা উচিত ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এই ব্যাপারটার আন্দাজ তো পিয়াল ওকে সেদিনই দিয়েছিল। কিন্তু গহন ভেবেছিল পিয়াল হয়তো আরেকটু ভাববে। বাচ্চাদের কথা ভেবে হলেও আরেকটু ভাববে। তবে এভাবে হঠাৎ করে যে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবে সেটা গহন সত্যি আন্দাজ করেনি।
গহনের এসব ভাবনার মাঝেই শম্পা দুহাতে ওর বাহু খামচে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“ভাইয়া, কিছু একটা করো। পিয়াল এটা কিভাবে করতে পারে আমার সাথে। আমাকে কিচ্ছু বলেনি। ও একবার আমার কথা ভাবলো না, বাচ্চাদের কথা ভাবলো না। তুমি ওকে বোঝাও। তুমি বোঝালে ও ঠিক শুনবে।”
গহন কিঞ্চিৎ গম্ভীর গলায় বলল,
“এখন আমাকে বলে কি হবে? সময় থাকতে আমার কথা শুনেছিলে? ও বাড়ি থেকে কি করে এখানে এসেছো সেসব কি ভুলে গেছো?”
“আচ্ছা সেসব নাহয় ভুল করেছি। তাই বলে ডিভোর্স দিয়ে দেবে? একবার আলোচনাও করবে না আমার সাথে এই নিয়ে? তুমি কথা বলো না ওর সাথে। ঠিক করে দাও না সবটা। একবারও ও আমার কথা ভাবলো না, ভাইয়া। আমি কি করবো বাচ্চাদের নিয়ে একা একা? তুমি কিছু একটা কর।”
কথাটা বলে শম্পা কান্নায় ভেঙে পড়লো। গহন কি আর করবে? এক হাতে জড়িয়ে ধরল ওকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। তবে গহন তো জানে ও এই ব্যাপারটা সামলাতে পারবে না। পিয়াল মনস্থির করেই নিয়েছে সবটা। গহনের তো পিয়াল কে জোর করারও মুখ নেই। পিয়াল কে নিজে পছন্দ করেছিল শম্পার জন্য। পিয়াল ভালো ছেলে বলেই তো শম্পার সাথে বিয়ে দিয়েছিল। অথচ সেই ছেলেটার জীবনই শেষ হয়ে গেছে।