অনেকদিন পর আজ সকালে নাস্তার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। আজও ভার্সিটি যাবে নিধি। নিধিকে তাই সকাল সকাল উঠতে হয়েছে। সকালের খাবারের ব্যবস্থা নিধিকেই করতে হয়। নাহলে না খেয়েই ওকে আর গহন কে বেরিয়ে যেতে হবে।
নাস্তা বানানো শেষে নিধি গিয়ে সবাইকে নিজেদের ঘর থেকে ডেকে এনেছে। গতকাল রাতেই শম্পা এসেছিল। যদিও নিধি কিংবা গহন জানতো না। কেন এসেছে সেটা আর জিজ্ঞেস করাও হয়নি।
খাবার টেবিলে বসে তখন সবাই নাস্তা করছে। নিধি আজ বসেনি সবার সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে। গহন বলেছিল খেতে তবে নিধি বসেনি। আজ সাবিতও খাবার টেবিলে উপস্থিত। এর মাঝে একটা অদ্ভুত ব্যাপার নিধি খেয়াল করেছে। আজ হঠাৎ করে সাবিত নিজের বউয়ের খুব খেয়াল রাখছে। কি খাচ্ছে না খাচ্ছে সেসব দেখছে। নিজের প্লেট থেকে ডিম সিদ্ধ তুলে বউকে দিচ্ছে।
নিধির গা পিত্তি জ্বলে গেল। তবে ঋতুকে একেবারে নিস্তেজ দেখাচ্ছে। নিধি বুঝলো মেয়েটা চিন্তায় চিন্তায় একেবারে আধমরা হয়ে গেছে। ঋতুকে এতটা অসহায় অবস্থায় দেখে নিধি আর কোনমতেই চুপ থাকতে পারবে না।
নিধি জানে না গহনের এতবার নিষেধ করা সত্ত্বেও ওর এই কাজটা করা ঠিক হবে কিনা। তবে নিধি চুপ থাকতে পারবে না। ও ঋতুর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভেবেছে সবটা। ঋতুর অসহায়ত্ব গুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে। আর একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের এমন অসহায়ত্ব দেখেও স্বার্থপরের মতন কোনমতেই চুপ থাকতে পারবে না।
নিধি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে সালমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা, কিছু কথা ছিল আপনার সাথে।”
উপস্থিত প্রত্যেকের দৃষ্টি একযোগে পড়ল নিধির উপরে। সব থেকে বেশি কৌতুহল দেখা গেল গহনের দৃষ্টিতে। আজ সকাল থেকে তো কিছু হয়নি। কেউ কোন ঝামেলাও করেনি। তাহলে হঠাৎ করে নিধির সালমা বেগমের সাথে কি দরকার পড়ে গেল?
তবে সালমা বেগমকে একটুও চমকাতে হতে দেখা গেল না। না তার চোখমুখে কোন কৌতুহল আছে। বরং তিনি মুখে থাকা খাবার গিলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“বলো।”
নিধি মনে মনে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আপনার ছোট ছেলে অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে এই কথাটা জানার পর কি আপনার কোন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল বলে মনে হয় না আপনার? এমন নোংরা বিষয়ে কিভাবে আপনি আপনার ছেলেকে প্রশ্রয় দিতে পারেন? যদি আজ আপনার ছোট ছেলের বউয়ের জায়গায় আপনার মেয়েরা থাকতো তবে কি আপনি এমন নীরবই থাকতেন মা?”
নিধি কথাটা বলার সাথে সাথে গহন চেয়ার থেকে উঠে থেকে দাঁড়িয়ে ওর হাত টেনে ধরে গম্ভীর গলায় দাঁত পিষে বলল,
“শাট আপ নিধি। আমি তোমায় নিষেধ করেছি এই নিয়ে কথা বলতে।”
নিধি অনুনয়ের স্বরে বলল,
“প্লিজ গহন একটু তো বলতে দিন আমায়। একবার ভাবির দিকে তাকিয়ে দেখুন। অর্ধমৃ'ত অবস্থা ওনার। আপনি তো বাকিদের মতন নির্দয় নন। আপনার কি একটুও খারাপ লাগছে না ভাবিকে দেখে? ভাবি যে জায়গায় আছে আপনার বোনেরা যদি সেই জায়গায় থাকতো তাহলেও কি এমনই করতেন?”
“এখন যেমন চুপ আছি, তখনও তেমন চুপই থাকতাম। তোমাকেও আমি চুপ থাকতে বলেছি। ঘরে চলো।”
কথাটা বলে গহন নিধির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“দাঁড়াও গহন। তোমার স্ত্রীকে আগেই নিয়ে যাচ্ছ কেন? ও যে কথা তুলেছে সে কথা ওকে সম্পূর্ণ করতে দাও।”
গহন থেমে পিছন ফিরে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“ধরে নাও ও কিছু বলেনি মা। এই আলোচনার সমাপ্তি এখানেই।”
সালমা বেগম মোটেও মানলেন না গহনের কথাটা। বরং চেয়ার থেকে উঠে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন,
“অসম্ভব। তোমার বেপরোয়া, বেয়াদব, অসভ্য বউকে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে দাও। ও সাধারণ কোন কথা বলেনি যে আমি ভুলে যাব।”
গহন আবারো কিছু বলে উঠতে চাইলে নিধি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“দাঁড়ান গহন। উনি আমাকে বেয়াদব বলছেন তো ঠিক আছে। আমি মেনে নিলাম আমি বেয়াদব। আমি অসভ্য, আমি বেপরোয়া। কিন্তু ওনার ছেলে মেয়েরা যে ঠিক কতটা ভদ্র সেটা ওনাকে দেখাতে বলুন।”
গহন এবারে চোখ গরম করে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মুখ দিয়ে যেন আর একটা শব্দও না বের হয়। এটা আমার শেষ কথা নিধি।”
নিধি যেই না একটু থেমে যেতে চাইছে অমনি সালমা বেগম যেন নিধিকে উস্কে দিচ্ছেন। তিনি যেন খুব করে চাইছেন এই আলোচনা কোন মতেই না থামুক। তিনি চাইছেন খুব ভয়ানক ভাবে আলোচনাটা হোক। সেজন্য এবারে যখন নিধি থেমে যেতে ধরলো তিনি আবার বলে উঠলেন,
“না নিধি থেমো না। বল তুমি কি করেছে আমার ছেলে? আমার সহজ সরল ছেলের নামে তুমি আর কি কি অপবাদ দেবে দাও।”
নিধি ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“কি বললেন সহজ সরল ছেলে? লজ্জা করল না নিজের ছেলেকে সহজ সরল বলতে? আর সবকিছু জেনেও না জানার ভান কেন করছেন? আমি নিজে কালকে আপনার ঘর থেকে ভাবিকে কাঁদতে কাঁদতে বের হতে দেখেছি। আপনি জানেন না আপনার ছেলে পরকীয়া করে? আপনি জানেন না অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আপনার ছেলে নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে? কত অভিযোগ অস্বীকার করবেন? হাজারটা অভিযোগ ওনার নামে।”
“তাই নাকি? তা কে করল তোমার কাছে এই অভিযোগগুলো?”
“ভাবি বলেছে। জানেন, কাল উনি আমায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে। একটা মেয়েকে কতটা অসহায় বানিয়ে রেখেছেন আপনারা। আর বাকি রইল আপনার এই ছেলে, ওনাকে গালি দেওয়ার মতন যোগ্য কোন শব্দ আমার জানাই নেই। মাতাল, লম্পট, চরিত্রহীন, অপদার্থ একটা। গর্ভের কলঙ্ক বোঝেন? উনি হলেন আপনার গর্ভের কলঙ্ক। না ছেলে হিসেবে ভালো, না স্বামী হিসেবে ভালো। বাপ হিসেবে যে কেমন হবে খুব ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারছি। পুরো অমানুষ, জানোয়ার একটা। ওনার মতন স্বামী থাকার থেকে ম’রে যাওয়া অনেক ভালো।”
নিধি শেষের বাক্যটা উচ্চারণ করতেই নিধিকে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে ঋতু চেঁচিয়ে উঠলো ওর নাম ধরে। প্রথমে নিধি চমকালো। হা করে কিছুক্ষণ ঋতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রাগে ঋতুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
নিধির তাকিয়ে থাকার মাঝেই ঋতুর রাগান্বিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“তোমার সাহস কি করে হলো আমার স্বামীর সম্বন্ধে এই কথাগুলো বলার? আমার স্বামীর মৃ'ত্যু কামনা করো তুমি কোন সাহসে? কে অধিকার দিয়েছে তোমাকে আমাদের মাঝে কথা বলার? দুদিন ভালোভাবে কথা বলেছি বলে আমার জীবনে নাক গলানোর অধিকার দিয়ে দেয়নি। মৃ'ত্যু কামনা করার ইচ্ছে থাকলে নিজের স্বামীর মৃ'ত্যু কামনা করো। অন্যের স্বামীর দিকে নজর দাও কেন?”
গহন দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দুচোখ খিঁচে বন্ধ করে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। আন্দাজ করতে পেরেছিলো গহন এমন কিছুই হবে। বারবার নিধিকে এই কথাগুলোই বোঝাতে চাইছিল। কিন্তু মেয়েটা শুনলো না। গহম যতই মেয়েটাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে চায় মেয়েটা যেন যেচে অপমানিত হতে চায়।
এদিকে নিধি তখনও হা করে তাকিয়ে আছে ঋতুর মুখের দিকে। বোধগম্য হলো না নিধির ঋতুর কথাগুলোর মানে। বিস্ময়ভরা গলায় বলল,
“এভাবে কেন কথা বলছো তুমি আমার সাথে? আমি তো তোমার ভালোর জন্যই…..।”
নিধিকে নিজের কথা সম্পন্ন করতে না দিয়ে ঋতু ফের রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“আমি তোমাকে বলেছি আমার ভালো ভাবতে? ন্যাকামো করছো? এমন ভাব দেখাও যেন কিচ্ছু বোঝো না। অথচ অন্যের সংসারে অশান্তি লাগানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছো। তোমার উদ্দেশ্য কি বলতো? নিজের সংসারে অশান্তি বাঁধিয়ে এখন আমার সংসারে শান্তি সহ্য হচ্ছে না?”
নিধি বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“আমার সংসারে কিসের অশান্তি?”
“আবার নাটক করছো? এমন ভাব দেখাচ্ছো যেন কিছুই বোঝো না। তুমি আমাকে বলোনি তোমার সংসারের অশান্তির কথা? ভাইয়ার সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন চলে সেসব তুমি আমায় বলোনি? বিয়ের দীর্ঘদিন পরেও তোমাদের দুজনের মাঝে স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়নি সে বিষয়ে তুমি আমায় জানাওনি? আমাকে আমার স্বামীর সাথে সুখে শান্তিতে সংসার করতে দেখে হিংসে হচ্ছে?”
ঋতু কথাগুলো বলা শেষ করতেই সালমা বেগম বলে উঠলেন,
“একদম ঠিক বলেছো ঋতু। এই মেয়ের সমস্যাই এটা। ওর নিজের সংসারের দিকে কোন খেয়াল নেই। শুধু অন্যের সংসারের দিকে চোখ দেওয়া। এই মেয়ে, তোমাকে এই বাড়িতে এনেছিলাম আমার বড় ছেলের বউ হিসেবে যেন ওর জীবনটা গুছিয়ে দিতে পারো তুমি। এই বাড়ির সবার দায়িত্ব নিতে পারো। কিন্তু আসার পর থেকে আমার ছেলের প্রতি তোমার অবহেলা দেখছি। তুমি তো আমাকেও বলেছিলে আমি নাকি আমার ছেলেকে মানুষ করতে পারিনি। সুযোগ পেলে তুমি চলে যাবে সংসার ছেড়ে। যাবে যখন যাও না। কেউ তোমাকে আটকায়নি। কিন্তু বাড়িতে অশান্তি তৈরি করছো কেন? তোমার নাহয় সংসারের প্রতি, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা নেই। তাই বলে সবাইকে তোমার মতন অলক্ষুণে মেয়ে পেয়েছো?”
নিধি হা করে ওদের সবার বলা কথাগুলো শুনে যাচ্ছে। একটু পর পাশে দাঁড়ানো গহন এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“গহন, আপনি কিছু বলবেন না? ওরা আমায় অপমান করছে আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবেন?”
গহন অগ্নিদৃষ্টিতে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার বলার মতন কোন মুখ রাখোনি তুমি। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি নিধি যে, এটাই তোমার প্রাপ্য।”
মুহূর্তের মাঝে নিধির চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। ওদের বলা কথাগুলো শুনে যতটা না খারাপ লেগেছিল তার থেকেও হাজার গুণ বেশি খারাপ লাগলো গহনের মুখ থেকে এই কথাটা শুনেছে। নিধিকে এভাবে বলতে পারলো গহন সবার সামনে!
নিধির এসব ভাবনার মাঝে ওর কানে এবারে ভেসে এলো শম্পার কর্কশ কণ্ঠস্বর। এতক্ষণ শুধু একটা সুযোগ খুঁজছিল। এবারে যেন সেই সুযোগটাই পেয়ে গেল।
“এই মেয়ে, তোমার সমস্যা কি বলতো? ঋতুর নাম নিয়ে এত বড় একটা মিথ্যে বললে কোন সাহসে? তুমি হয়তো জানো না কিন্তু আমরা সবাই জানি ঋতু আমাদের সাবিত কে কতটা ভালোবাসে। ও সংসারী, নম্র, ভদ্র মেয়ে। আর ওরা দুজনে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। আজ অব্দি কখনো ওদের দুজনের ঘর থেকে ঝগড়ার আওয়াজ আসেনি। আর না ঋতু তোমার মতন বেয়াদব যে সবার সামনে স্বামীকে, শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে কথা শুনিয়ে দেবে।”
নিধির গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সবার কথা উপেক্ষা করে এগিয়ে গেল ঋতুর দিকে। ঋতুর দুই বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,
“আমার দিকে তাকাও। ভয় দেখিয়েছে ওরা তোমাকে? ভয় দেখিয়েছে তোমায় তাই না? কি বলেছে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে, ডিভোর্স দিয়ে দেবে? এমন স্বামীর সংসার করার থেকে তুমি আলাদা থাকবে সেটাই ভালো। আমি তোমার ভালোর জন্যই কথাগুলো তুলেছিলাম। তোমার ভালো ভাবতে গিয়ে আমি আমার স্বামীর চোখে খারাপ হয়ে গেলাম। তুমি চুপ করে থাকবে? কাল যখন তুমি আমায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছিল তখন আমার খারাপ লেগেছিল তোমার জন্য। আমি তোমার ভালো চাই। এখনো সুযোগ আছে সত্যিটা বল। আমি সবার চোখে এমনিতেই খারাপ তাতে আমার যায় আসে না। কিন্তু আমি চাই তুমি ভালো থাকো। সত্যিটা স্বীকার করো। আমি জানি ওরা তোমায় ভয় দেখিয়েছে।”
ঋতু এক ঝটকায় নিধির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বলে উঠলো,
“আর একবার যদি আমায় সংসার ছাড়ার কথা বলেছো তুমি নিধি আমি কিন্তু নিজের ভদ্রতা ভুলে যাব। কষিয়ে তোমার গালে একটা চ'ড় লাগাতেও দু’বার ভাববো না। তোমার দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। কখন আমাদের মাঝে কথা হয়েছ, গতকাল কখন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি? আরে আমি কাঁদতে যাবোই বা কেন? কয়েকদিন পর আমার সন্তান আসবে পৃথিবীতে। আমি কত খুশি। আমার স্বামী আমার এত যত্ন করে, আমার খেয়াল রাখে, আমার চোখে জল আসতে দেয় না, আমার ঠোঁট থেকে হাসি সরতে দেয় না।”
“আমাকে এভাবে অপরাধী বানিও না গহনের চোখে। আমি মিথ্যে বলি না। আমাকে মিথ্যুক প্রমাণ করো না তুমি।”
ঋতু ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“তুমি মিথ্যুক না? তোমার থেকে বড় মিথ্যেবাদী এই পৃথিবীতে আমি দেখিনি। এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ আমায় ভালোবাসে। আমি প্রত্যেকটা মানুষকে ভালোবাসি। আমরা সব সময় চাই যেন এই বাড়িতে শান্তি বজায় থাকে। কিন্তু তুমি আসার পর থেকে একটা দিন এই বাড়িতে শান্তিতে কাটেনি। অত্যন্ত নোংরা একটা মেয়ে তুমি। না নিজে শান্তিতে সংসার করবে, না কাউকে শান্তিতে সংসার করতে দেবে। আমি আমার স্বামীকে কি তালাক দেবো। ভাইয়ার তোমার মতন মেয়েকে তালাক দিয়ে দেওয়া উচিত, যার সংসার করার যোগ্যতা নেই। আর আমার স্বামী ভদ্র বলে তোমার এত বড় অপবাদ দেওয়া সত্ত্বেও এখনো চুপচাপ বসে আছে। একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি মুখ দিয়ে। নয়তো ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে তোমাকে নিজের আসল জায়গাটা দেখিয়ে দিত।”
নিধি ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। কি হয়ে গেল এটা ওর সাথে। গহনের দিকে তাকাতেই দেখল গহন সটান দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে তীব্র ক্রোধ ফুটে উঠেছে। নিধি খুব ভালো করে বুঝতে পারছে যে গহন ওর উপরে রেগে আছে। নিধি তো এখন গহনের কাছে গিয়ে সাহায্যও চাইতে পারছে না।
নিধির সব ভাবনার মাঝে আবারো ওর কানে ঋতুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো নিধি। আমার আর আমার স্বামীর মাঝখানে কখনো নাক গলাতে আসবেনা। আজ যে ভুলটা করেছো ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু এর পরের বার থেকে কিন্তু আর ক্ষমা করবো না। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষটাকে আমি আমার স্বামী হিসেবে পেয়েছি। তাকে নিয়ে একটা বাজে কথা আমি তোমার মুখ থেকে সহ্য করব না। নিজের সংসারে সুখ নেই বলে আমার সংসারে আগুন লাগাতে এসো না। তুমি আমায় বলেছিলে না যে ভাইয়ার নাকি জারা আপুর সাথে সম্পর্ক আছে। সেই বিষয়ে আমি জানিনা। থাকতেই পারে সম্পর্ক। এখন তোমার স্বামী পরকীয়া করে বলে আমার স্বামীর ঘাড়েও পরকীয়ার দোষ চাপাবে এমনটা কিন্তু হতে পারে না। তোমার স্বামীর চরিত্র কেমন সেটা আমি জানিনা, জানতেও চাই না। তুমি সবাইকে বলে বেড়াও সেসব। কিন্তু আমার স্বামীর বিরুদ্ধে একটা কথাও আমি সহ্য করবো না। ভুলেও ওর চরিত্রের ওপর আঙ্গুল তুলতে আসবে না। নিজের স্বামীর খেয়াল রাখো।”
নিজের নামে এতক্ষন অনেক কথা সহ্য করেছে নিধি। তবে গহনের নামে মিথ্যে দোষারোপগুলো সহ্য করতে পারলো না। নিধি কখনো তো আগবাড়িয়ে ঋতুকে এই কথাগুলো বলেনি। বরং ঋতু উল্টো ওকে বলেছে এই কথাগুলো।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঋতু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি যা তা বলছো? আমি কখনো গহনের নামে তোমার কাছে কিছু বলিনি। বরং তুমি এগিয়ে এসে আমাকে বলেছো ওদের কথা। আমি সবসময় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি সব সময় তোমাকে বলেছি যে ওদের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই।”
“ও আচ্ছা। সেজন্যই বুঝি রাত হলে ভাইয়ার সাথে অশান্তি করতে? আচ্ছা তোমার কথা অনুযায়ী নাহয় মানলাম আমি তোমাকে উস্কেছি। তা তোমার যদি এতই তোমার স্বামীর প্রতি বিশ্বাস থেকে থাকতো তাহলে আমাকে থামাওনি কেন। সারাদিন মন মরা হয়ে কেন বসে থাকতে। ঘুরে ফিরে এসে কেন আমাকে জিজ্ঞেস করতে যে আমি ঠিক বলছি না ভুল বলছি? স্বামীর প্রতি বিশ্বাস ছিল না জন্যই তো বলতে তাই না? আমি শুধু তোমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অবিশ্বাস তুমি করেছো তোমার স্বামীকে।”
নিধির মনে হলো এবারে ব্যাপারটা পুরোপুরি হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে। এই কথাগুলো এখানে ওঠা একদমই ঠিক হলো না। ঋতুকে রেখে সরাসরি গহনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“গহন, বিশ্বাস করুন আমি কখনো ভাবির সাথে এই কথাগুলো আলোচনা করিনি। উনি বারবার আমাকে উস্কানোর চেষ্টা করেছেন। আমি বিশ্বাস করি আপনাকে। আপনি আমাকে বোঝানোর পর থেকে তা আমি আর কিছু বলিনি। আর বিশ্বাস করুন ওরা সবাই মিথ্যে বলছে। ভাবি কাল নিজে আমাকে বলেছে যে সাবিত পরকীয়া করে। নিজে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। আপনি জানেন দুদিন আগে আপনার ভাই নেশা করে বাড়ি ফিরেছিল। ভাবি সেদিন আমার পায়ে পড়েছিল যেন আমি আপনাকে কিছু না জানাই। সেজন্য আমি জানাইনি। বিশ্বাস করুন গহন…....”
অনেকক্ষণ চুপচাপ সহ্য করার পর গহনের এবারে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। নিধির দু'বাহু শক্ত করে চেপে ধরে হিংস্র গলায় বলল,
“জাস্ট শাট আপ নিধি। তোমার স্টুপিডিটি থামাও এবার। এখানে কেউ তোমার মতন গাধা না। তোমার মতন দয়ালু মন কারোর না। ঋতুও তোমার মতন বোকা না যে ওদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে কি হচ্ছে সেগুলো পুরো পাড়া শুদ্ধ লোককে বলে বেড়াবে। ঋতু তোমার মতন এতটা বোকা না যে স্বামীর সাথে অশান্তি হলে সেটা বাড়ির সবাইকে বলে বেড়াবে। বুঝতে পেরেছো?”
নিধি ছলছল দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু উনি বলেছিলেন আমায়।”
“ভুল শুনেছিলে তুমি। বুঝতে পেরেছো? ভুল শুনেছিলে। তোমাকে আমি নিষেধ করিনি এই ব্যাপারে কথা বলতে। গতকাল রাতে বুঝিয়েছি, তার আগে বুঝিয়েছি, তারও আগে বুঝিয়েছি। কিন্তু তুমি আমার একটা কথা শোনোনি। এর মানে কি দাঁড়ায় জানো? আমার কথার কোন মূল্যই নেই তোমার কাছে। তুমি আজ সবাইকে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছো আমার আর তোমার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার। তুমি আমাদের দুজনের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তিদের ঢুকতে সাহায্য করেছো। তোমার জন্য আজ এত মানুষের সামনে আমার চরিত্র নিয়ে কথা উঠলো? শুধুমাত্র তোমার জন্য এতগুলো মানুষের সামনে আমাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কত দূরে গিয়েছে, সেটা স্বাভাবিক হয়েছে কি হয়নি সেই নিয়ে কথা উঠলো। শুধুমাত্র তোমার স্টুপিডিটির জন্য আমি কারো দিকে চোখ তুলে তাকানোর অবস্থাতে নেই। তুমি প্রচন্ড অবাধ্য মেয়ে নিধি। আসলে তোমার সংসার করার বয়সই হয়নি। তোমার সংসার করার যোগ্যতাও নেই। তুমি কিচ্ছু বোঝো না সংসারের। তোমার সামান্য এই জ্ঞানটুকু নেই যে স্বামী কিছু নিষেধ করলে সেটা শুনতে হয়। এতদিন হলো আমার সাথে থেকে তুমি এতটুকু বোঝোনি যে আমি তোমাকে কিছু বললে তোমার ভালোর জন্য বলি। ওকে ফাইন, আজ থেকে আমি আর তোমাকে কিছু বলবো না। তোমার যা ইচ্ছে তাই করো, যেমন ভাবে চলার ইচ্ছে তেমনভাবেই চলো। আমাদের সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্কটাকে তুমি তোমার বোকামির দ্বারা নষ্ট করেছো। এন্ড ইউ হ্যাভ টু পে ফর দিস।”
কথাটা বলে গহন ছেড়ে দিলো নিধিকে। গহন সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে নিধি ওর হাত টেনে ধরে বলল,
“এভাবে বলবেন না। আপনি সবার সামনে এভাবে বলতে পারলেন আমাকে? ওরা তো সুযোগ নেবে এগুলোর।”
গহন এক ঝটকায় নিধির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“সুযোগ নেওয়ার মতন পরিস্থিতি তুমি তৈরি করে দিয়েছো। প্রথম রাতেই তোমাকে বলেছিলাম আমার মায়ের মুখে মুখে তর্ক করবে না। কেন বলেছিলাম জানো? কারণ আমি জানি সেই তর্কের প্রেক্ষিতে তোমাকে অনেক বড় দাম দিতে হবে। আমি তোমাকে বলেছিলাম বিয়ের পরও আমার বোন বাপের বাড়িতে কেন থাকে এই নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলবে না। তার কারণ আমি জানি এই নিয়ে প্রশ্ন তুললে তোমার এই বাড়িতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। আমার জীবনটা আরো কঠিন হয়ে যাবে। আমি তোমাকে সব সময় চুপ থাকতে বলি তার কারণ আমি তোমাকে সব কিছু থেকে বাঁচাতে চাই নিধি। আমি সবদিক সামলে চলতে চাই। তাকিয়ে দেখো এখানে তোমার মতন বোকা কেউ নেই। সবাই নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে চলে। অন্তত আমার সামনে সবাই ভালো হয়ে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু একমাত্র তুমিই সেই স্টুপিড যে নিজের ভালো বোঝেনা। তুমি আমাকে বলো না যে আমাকে নাকি তুমি অশান্তির হাত থেকে বাঁচাতে চাও, মানসিক শান্তি দিতে চাও? কিন্তু সেই তুমিই আমার মানসিক অশান্তির জন্য দায়ী হয়ে যাচ্ছো।”
নিধি অসহায় কন্ঠে বলল,
“এভাবে বলবে না গহন। আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“হোক কষ্ট। তুমি নিজে এর জন্য দায়ী। আজ আমি তোমায় একটা কথা স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিচ্ছি, তোমাকে আমার হয়েও প্রতিবাদ করতে হবে না। আমার হয়ে কাউকে কথাও শোনাতে হবেনা। তুমি শুধু দয়া করে নিজের মুখ বন্ধ রাখবে। আমি এত বছর যথেষ্ট কথা শুনেছি, যথেষ্ট অশান্তি সহ্য করেছি। আরও সহ্য করে নিতে পারব। তবে অন্যায় ভাবে আমার চোখের সামনে তোমায় কেউ অপমান করবে আর আমি সেটার প্রতিবাদ করার মতন অবস্থাতে থাকবো না, আমার বলার মতন মুখ থাকবে না এই বিষয়টা আমি মেনে নিতে পারব না। তুমি আজ আমাকে এতটাই নিরুপায় বানিয়ে দিয়েছো যে দেখো আমি চোখের সামনে মিথ্যে দেখা সত্ত্বেও কিছু বলতে পারছিনা। তার কারণ আমার নিজের স্ত্রী আমার কথা শোনে না। অন্যদের আমি কি বলবো? আজ তুমি অনেকটা দূরত্ব তৈরি করলে আমাদের মাঝে নিধি, অনেকটা। আজ তুমি আমাকে ঠিক কতটা কষ্ট দিয়েছো ভাবতেও পারবেনা।”
কথাটা বলে গহন চলে গেল সেখান থেকে। নিধি আটকাতে পারলো না গহন কে। কিছু বলতেও পারলো না। হা করে শুধু যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো।
হঠাৎ করেই নিধির কানে ভেসে এলো সালমা বেগমের কণ্ঠস্বর। ব্যঙ্গাত্নক গলায় নিধি কে বললেন,
“মনে নেই একটা কথা বলেছিলাম তোমায়। পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমার সংসারে, আমার ছেলের উপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চাও? আমাকে আমার ছেলের চোখে ভুল প্রমাণ করতে চাও? দেখলে তো আমার ছেলেকে আমার থেকে দূরে করতে চেয়েছিলে কিন্তু দূরত্বটা তৈরি হয়ে গেল তোমাদের মাঝে। ঋতু আমার ছেলের বউ বুঝলে তো। তুমি নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে।”
নিধি চমকে উঠে সালমা বেগমের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে থেকে সঙ্গে সঙ্গে আবার তাকালো ঋতুর দিকে। ঋতু ততক্ষণে চেয়ারে বসে পড়েছে। চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে থেকে কাঁদছে।
সবথেকে অবাক করার বিষয় হলো ঋতুর পাশের চেয়ারে বসে থেকে সাবিত এখনো নাস্তা করছে। খুবই নিশ্চিন্ত মনে খেয়ে যাচ্ছে। নিধি তাজ্জব বনে গেল এসব কিছু দেখে। তার মানে সবাই সবকিছু আগে থেকেই জানতো। এইসব কিছুই ওদের পরিকল্পনা।
নিধি আবারও সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তবে তার আগেই দেখল গহন তৈরি হয় বেরিয়ে যাচ্ছে। নিধির মনে হলো সালমা বেগমকে পরেও কিছু বলা যাবে। আগে গহনের সাথে একটু কথা বলা দরকার। গহনকে ডাকলো পিছন থেকে। তবে গহন শুনলাে না। নিধি বেশ কয়েকবার ডাকলো গহনের নাম ধরে। তবে গহন গটগট করে হেঁটে চলে গেল।
নিধি দরজার কাছাকাছি যাওয়ার আগেই গহন বাইরে বেরিয়ে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। নিধি থমকে গেল সেখানেই। আর বাইরে পা বাড়ানোর ক্ষমতা হলো না। গহন ওকে একা ফেলে রেখে চলে গেল! এই একটা দম বন্ধকর পরিবেশে নিধিকে একা ফেলে রেখে চলে গেল। একবার পিছন ফিরে তাকালোও না। একটু সান্ত্বনা দিলো না। বোঝার চেষ্টাও করলো না যে নিধির কতটা কষ্ট হচ্ছে।