বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৬৬

🟢

জারা এসে নিধি কে নিয়ে গেছে। নিধি সত্যি একা একা আজ রাতে বাড়িতে কোনমতেই থাকতে পারতো না। আর শুধু তো আজ রাতের ব্যাপার না। গহন আগামী কালকেও ফিরতে পারবে না। একেই তো মনের মাঝে একটা আতঙ্ক কাজ করছে। তার ওপর আবার দম বন্ধ হয়ে আসছে কারো সাথে কথা বলতে না পেরে। ওই তো বিকেলের দিকে একটু সালমা বেগমের সাথে ঝগড়া হয়েছিল। তখন ভালো লেগেছিল। তারপর থেকে তো আবার চুপ করে থাকতে হয়েছে।

পুরো বাড়িতে তখন থমথমে পরিবেশ বিরাজমান। প্রত্যেকটা ঘরে মানুষ আছে। তবে কারোর কোন সাড়া শব্দ নেই। থেকে থেকে শুধু ঋতুর ছেলের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে সালমা বেগমের জ্বর বেড়েই চলেছে। ওষুধও নেই বাড়িতে। সিনথিয়া তো নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে। একবার শম্পাকে বলতে গিয়েছিলেন ওষুধ আনার কথা। তবে শম্পা নিজের বাচ্চাদের নিয়ে যে বিরক্ত হয়ে ছিল সেজন্য আর তিনি মেয়েকে কিছু বলার সাহস পাননি। বাকি রইল সাবিত। ওকে তো আর কোন কিছু বলার রুচিই নেই।

বালিশের কাছ থেকে হাতরে ফোনটা নিয়ে গহনের নাম্বার বের করলেন তিনি। এমনিতেই হঠাৎ করে ইচ্ছে হলো গহনের সাথে একটু কথা বলার। রাত তখন অনেকই হয়েছে। কিন্তু তবুও তিনি সময়ের তোয়াক্কা করলেন না। একবার কল করলেন গহন এর নাম্বারে। ফোনটা রিং হয়ে গেল কিন্তু রিসিভ করল না গহন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সালমা বেগম। তাচ্ছিল্য হেসে ফোনটা রেখে দিলেন পাশে। ভাবলেন নিশ্চয়ই নিধি কল করলে একবারেই রিসিভ করতো। কিংবা এমনও হতে পারে হয়তো নিধি নিষেধ করে দিয়েছে যেন সালমা বেগমের কল রিসিভ না করে গহন।

সালমা বেগমের এসব ভাবনার মাঝেই ওনার ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। তড়িঘড়ি করে হাতে নিতেই দেখলেন গহনের নাম্বার থেকে কল এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে ওনার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে গহন ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“ফোন করেছিলে তুমি। কোন দরকার ছিল কি? আমি আসলে কাজ করছিলাম তো খেয়াল করিনি।”

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সালমা বেগম।

যাক ছেলে তবে তাকে অবহেলা করেনি। শুধু খেয়াল করেনি যে উনি কল করেছিলেন, কাজের ব্যস্ততার জন্য।

“ঠিক আছে সমস্যা নেই। কবে ফিরবে তুমি?”

“কেন? কিছু লাগবে তোমার?”

“কিছু লাগলেই বুঝি আমি শুধু তোমায় বাড়ি ফিরতে বলি? এছাড়া বলি না?”

গহন কিঞ্চিত অপ্রস্ত হয়ে পড়ল। অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“আসলে কোন সমস্যা হলে তখনই তুমি এভাবে বলো আমায়। সেজন্য জিজ্ঞেস করলাম। আর এবার তো বাদলও আমার সাথে এসেছে। কাউকে বাড়িতে পাঠাতেও পারছি না। সেজন্য আর কি বললাম।”

“না তেমন কোন ব্যাপার না। এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম। কবে ফিরবে? ভালো লাগছে না।”

কথাটা বলে সালমা বেগম একটা হাঁচি ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে ফোনের অপর পাশ থেকে গহন উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে তোমার? অসুস্থ তুমি? শ্বাসকষ্ট হচ্ছে নাকি আবার? ওষুধ খাওনি? ইনহেলার নিয়েছিলে? নিশ্চয়ই কোন অনিয়ম করেছ, তাই না?”

একনাগারে কতগুলো প্রশ্ন করলো গহন, তাও সবগুলো উদ্বিগ্নতার সহিত জিজ্ঞেস করল। গহনের চিন্তা হচ্ছে সালমা বেগমকে নিয়ে। সামান্য একটু হাঁচি ফেলেছেন তাতেই এত চিন্তা করছে। তাও এত দূরে বসে থেকে। আর ওনার নিজের সন্তান, যারা ওনার র ক্ত, যাদেরকে উনি এত কষ্ট করে জন্ম দিয়েছেন তারা ওনার কাছে থাকা সত্ত্বেও একবার এসে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। এইগুলোই ভাবলেন সালমা বেগম।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওনার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সাবিত সকালে ওনার সাথে ঠিক কি ব্যবহার করেছে সেটা গহনকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করল। মোটকথা গহনের কাছে অভিযোগ করতে ইচ্ছে হলো। গহনকে একবার বলতে ইচ্ছে করল যে গহন ব্যতীত ওনাকে কেউ সম্মান দেয় না। কেউ ওনাকে ভালোবাসে না। কেউ ওনার খেয়াল রাখে না। এই জীবনে সালমা বেগম এমন কাউকে পাননি গহন ব্যতীত যে একটু ওনার খেয়াল রাখবে। এমনকি নিজের বাবা মা-ও না। গহন খেয়াল রাখে। নিজের থেকেও বেশি খেয়াল রাখে।

এদিকে সালমা বেগমের থেকে কোন জবাব না পেয়ে গহন ফের বলে উঠলো,

“কি হলো মা বল? শরীর খারাপ তোমার?”

ধ্যান ভাঙল সালমা বেগমের। একটু নড়েচেড়ে উঠে বললেন,

“ওই আর কি একটু জ্বর এসেছে। শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। ইনহেলার নিয়েছি। ঠিক আছি এখন।”

“ঠিক আছি বললেই হলো? তোমার কন্ঠ শুনে তো আমি এখন বুঝতে পারছি যে তোমার সমস্যা হচ্ছে। ওষুধ খেয়েছিলে?”

“ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছে। আনতে হবে।”

“তো সেটা কখন আনবে? মাঝরাতে যদি অসুখ বেড়ে যায় তখন কি করবে? এখনই আনিয়ে রাখো সাবিত কে দিয়ে।”

“সাবিত তো বাড়িতে নেই। আর ও জানেনা আমার কি কি ওষুধ লাগে। আমিও ওসব প্রেসক্রিপশন দেখে বলতে পারব না ঠিকভাবে। বাদ দাও। ওষুধ লাগবে না।”

“বাদ দাও বললেই তো হলো না। শোনো, কাল সকালে ডাক্তারের কাছে যাবে। একা যেন যেও না। ঋতু আর শম্পা তো পারবেনা যেতে। হয় সিনথিয়া নয়ত সাবিতকে নিয়ে যেও।"

সালমা বেগম তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,

“কোন কালে ওরা আবার আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, যে কাল নিয়ে যাবে? ওদের সময় হয় না জানো না? তুমি ছাড়া তো আর কেউ নিয়ে যায় না।”

“কিন্তু আমার যে ফিরতে আরো দুদিন সময় লাগবে, মা। আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছি। চাইলেও যেতে পারছিনা। তুমি এক কাজ করো কাল ওদের কারো সাথে যাও ডাক্তারের কাছে। আমি ফিরে এসে আবার নিয়ে যাব। চিন্তা করোনা আমি সাবিতকে বলে দেব। আর টাকা নিয়ে ভেবো না। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি সাবিতের নাম্বারে। আর নয়তো নিধিকে বলি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে?”

নিধির নামটা শুনতেই সালমা বেগমের চোখে মুখে কাঠিন্যটা ফুটে উঠল। গম্ভীর গলায় বললেন,

“প্রয়োজন নেই। ও দেখে গেছে আমি অসুস্থ। তারপরও তো চলে গেছে আমায় রেখে। আর দরকার নেই ওকে। ওর যখন ইচ্ছে তখনই আসুক। দরকার হলে ডাক্তারের কাছে আমি যাবই না। তবুও ওর সাথে যাব না।”

গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“অথচ নিধি তোমার বাকি তিন ছেলে মেয়ের থেকে বেশি যত্ন করতো। তুমি কেন নিজের ভালো বোঝো না মা বলতো? তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করলে না যে, তুমি নিধিকে একটু ভালোবাসা দিলে বিনিময়ে ও তোমাকে কতটা ভালোবাসা দিতো। ও তো একটা বাচ্চা মেয়ে। এত জটিলতা তো ওর মাথার মধ্যে ধরেই না। কেউ একটু ভালো ব্যবহার করলে তাকে ভালো ভেবে নেয়, নিজের ভেবে নেয়। আফসোস থেকে গেল আমার মা যে, তুমি নিধিকে বুঝলে না।”

কথাটা বলে গহন ফোনটা কেটে দিল। মুহূর্তের মাঝে সালমা বেগমের মেজাজটা আবারও বিগড়ে গেল।

ঘুরেফিরে আবারও সেই নিধির জন্য ওনার আর গহনের সম্পর্কের মাঝে একটা বাজে পরিস্থিতি তৈরি হলো। গহন তো বেশ ভালোভাবেই কথা বলছিল। সালমা বেগমের মনে হচ্ছিল যেন ওনার পুরোনো গহনের সাথে কথা বলছেন। কিন্তু আবার মাঝ থেকে ওই মেয়ে এসে সবটা নষ্ট করে দিল। আবার গহনের মনে সালমা বেগমের জন্য ঘৃণা তৈরি করল। ক্ষমা করবেন না সালমা বেগম নিধি কে। কোনদিনও ক্ষমা করবেন না। ওর কঠিন শাস্তি কামনা করবেন।

___________

ঘড়িতে সময় তখন রাত দশটা। গহন সবেমাত্র হোটেলে ফিরে একটু হাতমুখ ধুঁয়ে এলো। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে। শরীরটা আর চলছে না। তাই ভাবলো এখন আগে একটু ঘুমোবে। এর মাঝেই ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো।

ফোনটা হাতে নিতেই দেখল নিধির নাম্বার থেকে কল এসেছে। গহন কেটে দিয়ে কল ব্যাক করল। অপর পাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই গহন বলে উঠলো,

“এখনো ঘুমোওনি কেন? এত রাত অব্দি জেগে থাকার কোনো মানে হয়?”

গহনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নিধির গানের আওয়াজ। সুরেলা কন্ঠে গাইলো,

❝ফুলের-গন্ধ-ভরা বাতাস এসে,

আমাকে পাগল করে বইবে,

মুখ বুজে মন কত সইবে?

এমন লগ্ন পেয়ে কী করে বলো,

নিজেকে সরিয়ে আমি রাখব?

আর কত রাত একা থাকব?

আর কত রাত একা থাকব?❞

নিধির গানটা শেষ হতেই গহনের কাশি উঠে গেল। তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে বেড সাইডের উপর থেকে মগটা নিয়ে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে নিলো। হালকা তোঁতলানো গলায় বলল,

“তোমার আবার কি হলো?”

অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নিধির অসহায় গলা,

“আর কত রাত একা থাকবো গহন? আর কত রাত? পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই এত দূরে চলে গেলেন? এখন এই একা রাত আমি কাটাবো কি করে? উত্তর দিন আমার প্রশ্নের? আর কত রাত আমি একা কাটাবো?”

এসির নিচে বসে থাকা সত্ত্বেও গহন ঘামছে। আসলে নিধির এমন আচরণে গহনের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। যদি দূরত্বটা খুব বেশি না হতো তাহলে এক্ষুনি ছুটে চলে যেত।

গহনের খুব আফসোস হচ্ছে এখন এটা ভেবে যে কেন নিধিকে নিজের সাথে নিয়ে এলো না। নিয়ে এলে তো এখন নিধি ওর পাশে থাকতো। তাহলেই তো আর এই অদ্ভুত অস্বস্তি হতো না। চাইলেই নিধির কাছে ছুটে যেতে পারত।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই নিধি আবারো বলে উঠল,

“চুপ করে আছেন কেন? উত্তর দিলেন না তো?”

গহন নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কেননা এই মেয়েকে যত সুযোগ দেবে এই মেয়ে লাগামহীন কথা তত বেশি বলবে।

বিজ্ঞাপন

“আমাকে ছাড়া তো একটা রাতও এখনও একা কাটাওনি।”

“কিন্তু দিন তো কেটেছে। আর ভালো লাগছে না। কাউকে একটু জড়িয়েও ধরতে পারছি না। কারো গায়ের উপর যে একটু পা তুলে ঘুমোবো তাও পারছি না। আপনি এভাবে আমাকে অসহায় করে রেখে গিয়ে কাজটা ভালো করেননি গহন। ছোট্ট একটা বউ আপনার। কতটুকুই বা উচ্চতা? স্যুটকেসের মাঝে তুলে নিয়ে গেলেও তো পারতেন। ঘরের এক কোনায় নাহয় রেখে দিতেন। আপনি বলুন এখন কি আপনার আফসোস হচ্ছে না? বিছানায় শুয়ে পাশ ফিরে যখন দেখবেন বউ নেই, তখন কি কষ্ট হবে না? মাঝ রাত্তিরে যখন অনুভব করবেন যে আপনার বুকের উপর আমার মাথা নেই, তখন কি আপনার বুকটা খা খা করবে না? আজ সারাদিন আমার এই নরম তুলতুলে গালে একটাও চুমু খাননি। এই আফসোসে কি আপনার বুক ফেটে কান্না আসছে না? জবাব দিন গহন, জবাব দিন। আমার প্রত্যেকটা প্রশ্নের জবাব চাই।”

গহন আগে এসির পাওয়ার বাড়ালো। তারপরে মৃদু গম্ভীর গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চুপ করবে তুমি। বেশি পেকে গেছো তুমি। ছোট মানুষ এত কেন আজেবাজে কথা বলবে? যা মুখে আসছে তাই বলে দিচ্ছো। ভয় করো না কেন আমায় দেখে?”

গহনের এত ঝাড়িকে পাত্তা না দিয়ে নিধি আবারো অসহায় গলায় বলে উঠলো,

“সত্যি করে বলুন না গহন, একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে না আমাকে? এসব কাজ-টাজ করে কি হবে? চলে আসুন। কাজ তো পরেও করতে পারবেন। কিন্তু এই মুহূর্তগুলো তো আর ফিরে আসবে না। নিজের অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দিন, ব্যাকুলতাকে প্রশ্রয় দিন। সবকিছু ছেঁড়ে ছুঁড়ে বউয়ের কাছে চলে আসুন। এত কাজের চাপ, ক্লান্তি সবকিছুকে পিছনে ফেলে রেখে ছুটে আসুন আমার কাছে। সব ক্লান্তি দূর করে দেব। এখন দেখুন আপনি যা ভালো বোঝেন তাই করুন।”

কথাটা বলে নিধি ফোনটা কেটে দিল। ফোনটা কেটে দিয়ে নিধি একা একাই হাসল। আসলে করার মতন কোন কাজ পাচ্ছিল না। তাই ভেবেছিল একটু ফোন করে নাহয় গহনকে বিরক্ত করা যাক। আর তো কেউ নিধির এসব পাগলামি সহ্য করবে না। সেজন্য গহনকেই একটু বিরক্ত করল।

আর নিধি খুব ভালো করেই জানে গহন এখন আসতে পারবে না। গেছে তো গুরুত্বপূর্ণ কাজে। তাও আবার এই রাত বিরেতে আসা অসম্ভব। সেজন্যই তো আরেকটু অস্থির করে দিল গহনের মনটা। নিধি যেহেতু শান্তিতে নেই গহন কেও শান্তিতে থাকতে দেবে না। নিধির যেহেতু গহনের কথা মনে করে ঘুম ধরছে না, তাই গহনকেও ঘুমোতে দেবে না।

_________

রাত তখন ঠিক ক’টা বাজে সেই হিসেব নিধির জানা নেই। পুরো পরিবেশটা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। নিধি তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে। এই ঘরে একাই ঘুমিয়েছে। ফলস্বরুপ বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমােতে পারছে।

হঠাৎ করে নিধির ঘুমটা একটু হালকা হয়ে গেল। মনে হচ্ছে ঘাড়ের কাছে কেউ জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। নিধি ঘুমের মাঝেই ভাবল বোধহয় ভুল ভাবছে। কেননা ওর সাথে তো আর কেউ ঘুমোইনি।

যেই না আবার একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবে অমনি কেউ একজন ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে নিধি চোখ মেলে তাকাল। দুচোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল। একটা শুষ্ক ঢোক গিলল।

ওর যতদূর মনে পড়ছে ঘরে তো আর কেউ ছিল না। তাহলে কে নিঃশ্বাস ফেলছে এর ঘাড়ের কাছে? কেই বা জড়িয়ে ধরল?

নিধির পুরো শরীর অবশ হয়ে এলো। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। মুহূর্তের মাঝে ঘেমে ভিজে গেল। ঠিক কতটা সময় যে এমন আতঙ্ক নিয়েই চুপচাপ শুয়ে থাকল তার হিসেব নিধি জানে না।

বেশ অনেকটা সময় পর অবশেষে নিধি মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল যে ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখবে কে আছে ওর পাশে। নিধি তো এই বিষয়ে নিশ্চিত যে, কোন জ্বীনই আছে ওর পাশে।

নিধি ভয়ে ভয়ে ঘাড় কাত করে তাকালো। গহনের ঘুমন্ত চেহারাটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ করে এমন চিৎকারের শব্দ পেয়ে গহন নিজেও আঁৎকে উঠে বসলো।

নিধি ততক্ষণে বিছানা থেকে নেমে গিয়েছে এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো মেয়েটা জ্বীন জ্বীন বলে চেঁচাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে গহন নিজেকে ধাতস্থ করল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে একহাতে নিধির মুখ চেপে ধরে বলল,

“আরে চুপ কর, চুপ কর। পাগলের মতন চেঁচাচ্ছো কেন? মান সম্মান কিছু রাখবে না নাকি আমার?”

নিধি এখনও ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে। মুখ ফুটে কিছু বলার চেষ্টা করছে। তবে গহন ওর মুখ চেপে ধরে থাকায় কিছু বলতে পারছে না। নিধিকে এখনও কাঁপতে দেখে গহন আবারো বলল,

“আরে আমি জ্বীন না। আমি গহন। আরে পাগল নাকি তুমি? এভাবে চেঁচালে মানুষ ভাববে কি না কি করছি আমি তোমার সাথে।”

নিধি একটু স্বাভাবিক হলো। অন্ততপক্ষে চেঁচানো থামিয়েছে। এখন একটু একটু বিশ্বাস হচ্ছে যে ওর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে সত্যিই গহন। কোন জ্বীন না। মেয়েটাকে শান্ত হতে দেখে গহন ওর মুখের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এখন তো এটা ভেবে ভয় হচ্ছে যে কে না কখন ছুটে আসে নিধির চেঁচানোর কারণ জানার জন্য।

গহনের এসব ভাবনার মাঝেই নিধি সন্দেহী গলায় বলল,

“আপনি সত্যি গহন তো? মানে আপনি আমার স্বামী? সত্যি বলছেন তো?”

গহন এবারে বিরক্তিকর স্বরে বলল,

“একদিনের মাঝে কি আমার চেহারা ভুলে গেলে? দেখে বুঝতে পারছ না যে এটা আমি নাকি অন্য কেউ? কন্ঠটাও চিনতে পারছো না? কার মাঝে পড়লাম রে বাবা। কার সাথে সংসার করি যে এক দিনের ব্যবধানে চেহারাই ভুলে যায়!”

কথাটা বলে গহন গিয়ে বিছানার উপরে বসে পড়লো। নিধি কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে তাড়াহুড়ো করে গিয়ে গহনের পাশে বসে আবারও সন্দিহান গলায় বলল,

“সত্যি করে বলুন, আপনি গহন তো?”

“হ্যাঁ রে বাবা আমি গহন।”

নিধি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু আপনি যদি গহন হন, আপনি এখানে কি করছেন? ঘরে এলেন কি করে? আপনি তো শহরের বাইরে ছিলেন। কাজের জন্য গিয়েছিলেন।”

গহন এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“কাজের জন্য তো গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আর কাজ করতে দিলে কোথায়? তোমার সাথে কথা বলার পরই রওনা হয়েছিলাম। রাতে ফাঁকা রাস্তা বলে তাড়াতাড়ি আসতে পেরেছি।”

নিধি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“আমার কথায় প্রভাবিত হয়ে আপনি কাজ ফেলে এত রাতে এসেছেন?”

“তো কি করতাম? আমার মন অস্থির করে তুলে তুমি তো দেখলাম নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলে। ওদিকে আমার অবস্থা যে খারাপ হয়ে যাচ্ছিল সেটা আর কি করে বোঝাতাম।”

“আরে গাধা, আমি তো ইচ্ছে করে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ওসব বলেছিলাম। তাই বলে আপনি এতটা গাধা যে, সত্যি সত্যিই চলে এলেন?”

গহন কপাল কুঁচকে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কেন? তুমি খুশি হওনি?”

“আরে খুশি হওয়া না হওয়া সেসব পরের ব্যাপার। আমি শুধু এটা ভাবছি আপনি কত বড় পাগল।

এত তাড়াহুড়ো করে এত রাতে কেউ রওনা দেয়? যদি একটা বিপদ হয়ে যেত? আপনি আপনার বউকে চেনেন না? আপনি জানেন না আমার শিরায় শিরায়

শ য় তা নি? আরে বাবা, আপনার তো বোঝা উচিত ছিল যে আমি মজা করেছি আপনার সাথে।”

গহন আর পাত্তা দিল না এসব কথায়। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিধি ওকে কেন ওসব বলেছিল সেসব গহন জানতে চায় না। তবে অস্থিরতায় আর টিকতে পারছিল না বলে চলে এসেছে।

গহন বিছানায় শুয়ে পড়ে নিধির হাত ধরে ওকে নিজের কাছে টেনে আনলো। নিধি হুমড়ি খেয়ে গহনের বুকের উপরে পড়ল। গহন আলতো করে নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ডাকছিলে কেন আমায়?”

“আরে সে তো মজা করছিলাম।”

“মজা করেই কেন ডাকছিলে?”

নিধি এবার মুখ কাচুমাচু করে বলল,

“ইয়ে মানে ওসব আমি এমনি বলেছিলাম। সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার নেই।”

কথাটা বলে নিধি উঠতে ধরল। তবে গহন ওকে উঠতে দিল না। বরং টেনে নিধিকে নিজের পাশে শুইয়ে গহন ওর উপরে আধশোয়া হয়ে বলল,

“একবার যখন ডেকে এনেছ তাহলে পালাচ্ছো কোথায়? পালানোর তো কোন উপায় নেই তোমার কাছে। শুধুমাত্র তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। তোমাকে তো আর পালাতে দেবো না।”

“এতটা পথ আপনি এসব করার জন্য এসেছেন? আপনি আসলেই অশ্লীল।”

কথাটা বলে নিধি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। নিধির অন্যদিকে ঘোরানো মুখটা গহন নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,

“সব যখন বুঝেই গেছো যে কেন আমি কষ্ট করে এত রাতে এলাম, তাহলে নতুন করে তো আর কোন কিছু বোঝানোর দরকার নেই, তাই না?”

নিধি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। আমতা আমতা করে বলল,

“ইয়ে মানে বললাম না ওসব মজা করে বলেছিলাম। আর আপনি সবসময় এসব করার মেজাজেই কেন থাকেন? নিজের উপর একটুও নিয়ন্ত্রণ নেই আপনার, তাই না? আপনি দিনদিন খুবই…..।”

নিধি নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই গহন ওকে থামিয়ে দিল। একটা আঙ্গুল নিধির ঠোঁটের ওপরে রেখে বলল,

“হুঁশশ। আর একটাও আজেবাজে কথা না। এখন রাত তিনটে বাজে। মানে অর্ধেক রাত চলেই গেছে। আমায় আবার অনেক সকাল সকাল উঠতে হবে। হাতে তিন ঘন্টা মতন সময় আছে। এই সময়ের মাঝে ঘুমোতেও হবে। আবার তোমায় ভালোওবাসতে হবে। বুঝতে পারছো কতটা চাপ?”

গহনের এমন বেহায়া কথাবার্তায় নিধি লজ্জায় মিইয়ে গেল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো। মুখ দিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। একটু যে গহন কে তেজ দেখাবে সেটাও পারলো না। একটু যে মেকি রাগ দেখাবে সেটাও সম্ভব হলো না।

গহন মুখ ডোবালো নিধির গলার ভাঁজে। প্রথম দফায় নিধির সর্বাঙ্গ শিউরে উঠলো। তারপরে ধীরে ধীরে সবটা স্বাভাবিক হয়ে গেল। এক দারুন অনুভূতি তৈরি হলো নিধির শরীরে। যা গহনের মাঝে হারিয়ে যেতে বাধ্য করল ওকে। ভুলে গেল সব লজ্জা-শরম। কেটে গেল সব জড়তা-সংকোচ। আরো একবার ভালোবাসার স্পর্শে দুটো মানব মানবী এক হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প