আলমারির ভেতর থেকে একটা নতুন শাড়ি বের করে পরে নিল নিধি। টুকটাক সাজগোজও করল। সাজগোজ শেষে আয়নায় নিজেই নিজেকে একবার ভালোভাবে দেখে নিল। এমনিতেই গরমের মাঝে সারাদিন ক্লাস করে চেহারার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। পড়াশোনার চাপ বেশি যাচ্ছে। সেজন্য সাজগোজ করেও মুখের খুব একটা উন্নতি করা যায়নি।
বিছানার উপর গহন মন ম রা হয়ে বসে আছে। গহন অনেকক্ষণ আগেই তৈরি হয়েছে। গহনের তো আর তৈরি হতে বেশি সময় লাগে না। একটা শার্ট আর প্যান্ট পরেছে। অন্যান্য দিন একটু চুলটা আঁচড়ায়, পারফিউম লাগায়, ঘড়ি পরে। আজকে সেসব কিচ্ছু করেনি।
এদিকে নিধি যখন নিজে নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট হতে পারল না তখন ভাবল গহনের থেকে একটু প্রশংসা শুনবে। গহন তো অবশ্যই প্রশংসা করবে। খারাপ লাগলেও প্রশংসা করবে, ভালো লাগলেও প্রশংসা করবে।
গুটি গুটি পায়ে গিয়ে গহনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“কেমন লাগছে আমায় দেখতে, বলুন তো? সিলিন্ডারের মতন লাগছে কি?”
নিধির কণ্ঠ কানে যেতেই গহনের ধান ভাঙল ঠিকই। তবে নিধি কি বলেছে সেই প্রশ্নটা আর গহনের কানে আসেনি। ফলস্বরূপ কন্ঠে কিঞ্চিত অনুরোধ প্রকাশ করে বলল,
“আরেকবার কি জিজ্ঞেস করা যাবে? আমি আসলে শুনতে পারিনি।”
“আরে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমাকে কেমন লাগছে? বিয়ের পরের দিন সকালের মতো সিলিন্ডার সিলিন্ডার লাগছে না তো?”
গহন চটজলদি দু-দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না তো। সুন্দর লাগছে।”
নিধি রুষ্ট গলায় বলল,
“সুন্দর লাগছে ছাড়া কি আর কিছু বলতে পারেন না আপনি? একটু তো ফুল লতা পাতার সাথে তুলনা করতে পারেন। না হয় সবুজ ঘাসের সাথেই তুলনা করলেন। চাঁদ, সূর্য, তারা, নদী, পাহাড়, সমুদ্র কত কিছু আছে এই পৃথিবীতে। তা না পারলে না হয় বলবেন রসগোল্লার মত লাগছে। তাও তো একটু শান্তি পাই। তা না করে ঘুরেফিরে একই কথা সুন্দর লাগছে। কচু লাগছে।”
গহন অসহায় মুখ করে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,
“খুব চিন্তায় আছি নিধি। ভেতর থেকে এখন এসব আসবে না।”
“কোনদিনও আসে না আপনার।”
“আরে অন্যান্য দিন তো কত প্রশংসা করি। কিন্তু আজকে হচ্ছে না। আমার কেমন যেন লাগছে। খুব অস্থির অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে আমি যেকোনো সময় অসুস্থ হয়ে যাব। আমি পারছিনা নিধি।”
ব্যাপারটা নিধির কাছে এবারে একটু গুরুতর মনে হলো। গহনের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কেন? কি হয়েছে?”
গহন সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না। কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“কতদিন পর ওনাকে দেখব। এতগুলো বছর ওনার সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ করে ওনার সামনে দাঁড়াবো কি করে? কি বলবো আমি? তুমি জানো আমি আগবাড়িয়ে গিয়ে কথা বলতে পারি না। কেউ আমায় কিছু জিজ্ঞেস করলে সেই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়াও আমার জন্য অনেক সময় বাড়াবাড়ি হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে আমি গিয়ে কি করব? উনি হয়তো আমার থেকে অনেক কিছু আশা করছেন। কিন্তু আমি তো সেসব কিছুই করতে পারবো না। বরং ওনাকে সামনাসামনি দেখলে অতীত মনে হয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। যদি নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খারাপ আচরণ করে ফেলি ওনার সাথে?”
নিধি বুঝলো গহনের অসহায়ত্ব। তবে এখন গহন কে সাহস দিতে হবে। গহনের হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল,
“কিচ্ছু হবে না। আপনি এমন কিছু করবেন না সেটা আমি খুব ভালোভাবে জানি। আমি আপনাকে বলছি কি বলবেন। ওনাকে একবার জিজ্ঞেস করবেন কেমন আছে, শরীর কেমন, অসুস্থতা কোন পর্যায়ে, ঠিকঠাক ওষুধ খাচ্ছে কিনা, খাওয়া দাওয়া করে কিনা, নিজের শরীরের যত্ন নেয় কিনা এসব জিজ্ঞেস করবেন।”
গহন বিস্মিত গলায় বলল,
“এত কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে? সবগুলো কি কোন একটা প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করা সম্ভব না?”
“না, সম্ভব না। যখন যাচ্ছেনই দেখা করতে তাহলে দু চারটে কথা বললে ওনার আত্মাটাও শান্তি পাবে। আর এত ভাবার দরকার নেই। অস্বস্তি ওনারও হবে। ফলস্বরূপ উনিও বেশি কথা বলতে পারবেন না। আর আমি আছি তো। আপনার চোখমুখ দেখলেই আমি বুঝতে পারি আপনার মনের মাঝে কি চলছে। আপনি যেটা বলতে পারবেন না সেটা আমি বলে দেবো। আর দরকার পড়লে ওনাকে গিয়ে আগেই বলে দেব যে, আমার স্বামী বেশি কথা বলতে পছন্দ করে না। তাই কেউ যেন বিরক্ত না করে আপনাকে।”
কথাটা বলে আলতো হেসে উঠে দাঁড়ালো নিধি। চুলটা বাঁধার জন্য আবার ড্রেসিং টেবিলের দিকে যেতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরলো। দুহাতে নিধির কোমর জড়িয়ে ধরে অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,
“আমি পারবো না নিধি। আমায় নিয়ে যেও না। তুমি যাও। ওনার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবো না আমি। দেখো, আমার এখনই পুরনো কথাগুলো মনে পড়ে কেমন যেন অস্থির লাগছে। আমি ওনার অপরাধবোধ বাড়াতে চাই না। আমি ওনাকে বোঝাতে চাই আমি ভালো আছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি সবটা এলোমেলো করে ফেলব, নিধি। যদি ওনার সামনে আবার ভুল করে কেঁদে ফেলি?”
নিধি আলতো করে গহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“যদি একান্তই কান্না চলে আসে, তবে কাঁদবেন। উনি তো আপনার মা। দেখবেন ঠিক আদর করবে। চোখের জল মুছিয়ে দেবে। কাছে টেনে নেবে। কান্না এলে মোটেই আটকানোর দরকার নেই। উনি তো আপনার মা, গহন। আপনার অসহায়ত্ব উনি বুঝলেও কোন সমস্যা নেই। উনি আপনার সৎ মা নন যে, সেই অসহায়ত্ত্বের সুযোগ নেবেন।”
গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“বুঝেছি। তুমি আমাকে না নিয়ে যাবে না। আমাকে একটা কঠিন পরিস্থিতির মাঝে ফেলেই ছাড়বে।”
__________
জুবাইদার বাড়ির দরজার সামনে এসে নিধি কলিং বেল বাজালো। গহনের দিকে তাকাতেই দেখল কেমন যেন করছে। নিধি গহনের হাতটা শক্ত করে ধরতে গিয়ে দেখল ছেলেটার হাত কাঁপছে। নিধি তাড়াহুড়ো করে গহনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“আরে ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি আছি তো। খুব বেশি অসুবিধা হলে চলে আসবো আমরা। এখানে বেশিক্ষণ থাকবো না। একবার শুধু ওনাকে দেখেই চলে আসব।”
গহন একটা শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“আমি ঠিক আছি।”
ওদের কথোপকথনের মাঝেই জারা এসে দরজা খুলে দিল। ওদেরকে আগেই ভেতরে যেতে না দিয়ে নিজে বাইরে বেরিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় গহনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“গহন, তুমি ঠিক আছো? তুমি সিওর তো যে ওনার সাথে দেখা করতে চাও? দেখো, মা বলেছে বলেই যে দেখা করতে হবে তেমন কোন কথা নেই। যদি তোমার অসুবিধা হয় চলে যাও। আমি মা কে বোঝাবো।”
গহন জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আমি ঠিক আছি জারা। এটা এতটাও কঠিন কাজ না। আর নিধি আছে তো।”
“নিধি তোমার সাথে আছে জন্যই তোমাকে যেতে দিচ্ছি। নয়তো সত্যি তোমাকে দেখা করতে দিতাম না। তখন তোমায় সামলানোর মতন কেউ থাকত না। এখন নিধি আছে। যাইহোক, নিধি নিয়ে যাও ওকে ভেতরে। ওর হাত ছাড়বে না একদম।”
নিধি আলতো হেসে গহন কে নিয়ে ভিতরে গেল। জারাও দরজা বন্ধ করে ওদের পিছন পিছন গেল।
বসার ঘরে তখন সবাই উপস্থিত। নিজেদের মাঝে গল্পগুজব করছেন ওনারা। এরই মাঝে সেখানে গহন আর নিধি এলো। দূর থেকে ওদেরকে দেখতে পেয়ে জান্নাত আগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ওই তো ভাইয়া আর ভাবি এসে গেছে।”
উপস্থিত প্রত্যেকের দৃষ্টি একযোগে ওদের দুজনের ওপরে পড়ল। হঠাৎ করেই পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল। একপাশের সোফায় বসে আছেন কবরী। ছিমছাম পোশাক তার গায়ে। মাথাটা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। কোনরকম কোন সাজগোজ করেননি তিনি। চোখ মুখে একটা অসুস্থতার ভাব ফুটে উঠেছে। ওনার এক পাশে বসে আছেন জামিল হোসেন। অন্য পাশে বসে আছে এক কিশোরী। বয়স কতই বা হবে? খুব বেশি হলে পনেরো কি ষোলো। গায়ের রং ধবধবে সাদা। চুলের রং বাদামি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিদেশি।
যদিও উপস্থিত প্রত্যেকেই থমকে গেছে। এমনকি জুবাইদাও। যদিও ওনার থমকানোর কোন কথা ছিল না। ওনার তো স্বাভাবিক থাকার কথা ছিল। তবে উনিও যেন স্বাভাবিক থাকতে পারলেন না।
গহনকে দেখে সবাই শান্ত হয়ে গেলেও শান্ত থাকতে পারলো না সেই কিশোরী মেয়েটা, যার নাম কিয়ারা। সম্পর্কে সে গহনের সৎ বোন।
মূহুর্তের মাঝে তার ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। সে যেমন চঞ্চল, ঠিক তেমনি মিশুক। তার মাঝে আন্তরিকতারও কোন অভাব নেই। সবার এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকার মাঝেই সে নিজের জায়গা থেকে উঠে ছুটে গহনের দিকে এগিয়ে এলো। এবং গহন সহ উপস্থিত প্রত্যেককে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরলো গহন কে।
আকস্মিক জড়িয়ে ধরায় গহন খানিকটা পিছিয়ে গেল। চোখে মুখে তার ফুটে উঠেছে আকাশসম বিস্ময়। পাল্টা জড়িয়ে ধরতে পারল না কিয়ারা কে। আসলে পরিস্থিতিটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না গহন। ওর কি করা উচিত, কি বলা উচিত সেটাও বুঝতে পারছে না। গহনের এসব ভাবনার মাঝেই কিয়ারা নিজ থেকেই উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলো,
“ইউ আর মাই ব্রো, রাইট? আই মিন তুমি আমার বাই। আই এম রিয়েলি সরি ফর মাই রং প্রোনাউনসিয়েশন। একচুয়ালি আমি বাংলা খুব বালো বাবে বলতে ফারিনা। কিন্থু আমি জানি তুমি আমার বাই।”
গহন কোন উত্তরই দিতে পারল না। মূর্তির মতন সটান দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে যে ওকে ছাড়তে বলবে সেটাও বলতে পারছে না।
কিয়ারা নিজ থেকেই গহন কে ছেড়ে দিল। তারপরে তাকালো পাশে দাঁড়ানো নিধির দিকে। পূর্বের মতনই উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“তুমি আমার বাবি, রাইট? আমি তোমার কিছু ফটোস দেখেছিলাম। ইউ আর সো কিউট। টুডে ইউ আর লুকিং ইভেন মোর গর্জিয়াস, লাইক অ্যা কিউট লিটল ডল।”
নিধি জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
নিধি কিয়ারাকে ধন্যবাদটা দিয়ে তারপরে তাকালো পাশে দাঁড়ানো গহনের দিকে। গহনের যে অবস্থা খারাপ সেটা বুঝতে পেরেছে। আপাতত একটা ঘোরের মাঝে আছে গহন। নিধি হালকা করে গহনের কাঁধে ধাক্কা দিল। ধ্যান ভাঙলো গহনের।
কিয়ারা একটু বিরতি নিয়ে আবারও গহন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি মমের কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি। আমার ফ্রেন্ডদের যখন ওদের সিবিলিংসদের সাথে দেখতাম আমার খুব খষ্ট হতো। দেন মম টোল্ড মি এবাউট ইউ। যখন আমি জানতে পারলাম যে আমার একটা বড় বাই আছে আই ফেল্ট সো হ্যাপি। বাই দা ওয়ে, আই এম কিয়ারা। ইওর স্টেপ সিস্টার।”
গহন কেন যেন চেয়েও জোর করেও হাসতে পারল না। একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না মুখ দিয়ে। এদিকে এই ইংরেজের বাচ্চার কি ব্যবস্থা করবে নিধি নিজেও সেটা বুঝতে পারছে না। এই মেয়ে তো আর বুঝবে না যে ওর কাছে সৎ ভাই-বোন বিষয়টা যতটা স্বাভাবিক গহনের কাছে ততটা সহজ না। তার উপরে আবার আজ প্রথমবার দেখল। কিছু তো বলতেও পারবে না। একে কিভাবে বোঝালে যে বুঝবে সেটাও তো জানে না। কারণ এর যে জ্ঞান বুদ্ধি খুব একটা নেই সেটা নিধি বেশ বুঝতে পারছে।
আশেপাশে তাকিয়ে জারা কে খুঁজলো, পেয়েও গেল। নিধি অসহায় দৃষ্টিতে জারার দিকে তাকাতেই জারা যেন বুঝে গেল নিধির কথা। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে কিয়ারার হাত টেনে ধরে ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“লিসেন কিয়ারা, হি নিড সাম টাইম। তুমি গিয়ে বসো। লিভ হিম।”
নিধি মেয়েটাকে যতটা অবুঝ কিংবা পাগল ভেবেছিল ততটা না। জারা একবার বোঝালো তাতেই বুঝে গেল। কিয়ারা বাধ্য মেয়ের মতন চুপচাপ গিয়ে আবার নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
এতক্ষণে জুবাইদা এগিয়ে এলেন গহন এর দিকে। কবরী আর ওনার স্বামী তখনো নিজেদের জায়গায় বসে আছে। কবরী তো সেই প্রথমই একবার গহনের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন। তারপর আর তাকাতে পারেননি। জুবাইদা উঠে এসে গহনের হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের পাশে বসালেন। কবরী আর গহন আপাতত মুখোমুখি বসে আছে। তবে কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। দুজনেই মাথা নামিয়ে বসে আছে।
জুবাইদা বুঝলেন এরা কেউই আগে আগে কিছু বলতে পারবে না। ওনাকেই শুরুটা করতে হবে। তিনি নিজেই আগবাড়িয়ে কবরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“দেখোতো, গহনের ছোটবেলার চেহারার সাথে মিল খুঁজে পাও কিনা? আমার গহন কিন্তু এখন আরো বেশি সুন্দর হয়েছে দেখতে। চেহারায় দাঁড়ি গোঁফ গজিয়ে গেছে।”
অস্বস্তিতে গহন আরো জড়োসড়ো হয়ে বসলো। কবরী ভয়ে ভয়ে সাহস করে একবার মাথা তুলে তাকালেন গহনের দিকে। সত্যি গহনের চেহারাটা বদলে গেছে। অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে হ্যাঁ, ছোটবেলার চেহারার সাথে মিল তো রয়েই গেছে কিছু কিছু।
হঠাৎ করে কবরী কেমন যেন আবেগী হয়ে উঠলেন। চোখ দুটো ওনার ছলছল করে উঠলো। ঠোঁটে কিঞ্চিত হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,
“হ্যাঁ। বড় হয়ে গেছে গহন। অবশ্য বড় হওয়ারই কথা। পঁচিশটা বছর কেটে গেছে মাঝে। তবে স্বভাব মনে হচ্ছে এখনো বদলায়নি। যেমন শান্ত- শিষ্ট, ভদ্র ছিল, এখনো তেমনি আছে। কি তাইনা গহন?”
কবরী খুব সাহস করে গহনের নামটা নিলেন। গহন কেঁপে উঠলো। হাজার চেষ্টা করেও গহন কিছুই বলতে পারল না। আপাতত গহনের পুরো শরীর কাঁপছে। আদৌও কিছু বলতে পারবে কিনা কে জানে।
নিধি বুঝল গহনকে দিয়ে কিছু হবে না। বরং এভাবে চলতে থাকলে গহন অসুস্থ হয়ে পড়বে। নিজ থেকেই এগিয়ে এসে গহনের পাশে বসলো। এত মানুষজনের তোয়াক্কা করলো না নিধি। নিজেই আগবাড়িয়ে গহনের হাত ধরে বসে বলল,
“ঠিক বলেছেন। উনি আসলে এখনো ভীষণ শান্তশিষ্ট আর ভদ্র। বরং অতিরিক্ত ভদ্র। এত ভদ্র ছেলে আমি আমার জীবনে দেখিনি। এতটাই ভদ্র যে জোর করে করে আমার ওনাকে দিয়ে কথা বলাতে হয়। আজেবাজে কথা তো উনি বলতেই পারেন না। প্রয়োজনীয় কথাও ওনার মুখ দিয়ে বেরোয় না। মানুষজনের সামনে গেলে তা আরো চুপচাপ হয়ে যায়। এই যেমন দেখুন এখনো চুপচাপ বসে আছে। এই কম কথা বলার স্বভাব ওনার গেলোই না।”
নিধি যে আসলে ব্যাপারটা সামলানোর চেষ্টা করল সেটা উপস্থিত প্রত্যেকেই বুঝতে পারল। বুঝতে বাকি রইল না গহনেরও। কেন যেন ধীরে ধীরে গহনের অস্বস্তি আরো বাড়ছে। একটু বিরতি নিয়ে কবরী নিজেই আবার সাহস করে গহনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কেমন আছো, গহন?”
গহন আরেক দফা কেঁপে উঠলো। যতবার কবরীর মুখ থেকে নিজের নামটা শুনছে ততবার কেঁপে উঠছে। কে জানে হঠাৎ করে কি হলো। সেখানে আর বসেই থাকতে পারলো না। ওয়াশরুমে যাওয়ার অজুহাত করে ভেতরে চলে গেল।
গহন যে একটা মিথ্যে অজুহাত দিল সেটাও কারো বুঝতে বাকি রইলো না। তাড়াহুড়ো করে নিধিও ওর পেছন পেছন গেল। জুবাইদা কবরীর দিকে তাকাতেই দেখলেন উনি চোখের জল মুছছেন।
জুবাইদা ওনাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলল,
“চিন্তা করো না। কথা বলবে গহন। শুধু একটু সময় লাগবে ওর।”
কবরী মলিন হেসে বললেন,
“সেই সময়ই তো নেই আমার কাছে।”