বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭২

🟢

উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্রন্দনরত গহনের দিকে, যে এখনও মেঝের উপরে বসে কেঁদেই যাচ্ছে। সালমা বেগম যেন কখনো আন্দাজই করতে পারেননি যে উনি গহনকে ঠিক কতটা কষ্ট দিয়েছেন। যা করেছেন ওনার সবসময় মনে হয়েছে যে উনি ঠিকই করেছেন। কখনো কোন অন্যায় করেছেন বলে মনে হয়নি। আজও যে অন্যায় করেছেন বলে মনে হচ্ছে তেমনটা না।

তবে গহনের ওপর যে এই বিষয়গুলোর এত গভীর প্রভাব পড়েছিল সেটা উনি কখনো ভাবেননি। যখন এই ঘটনাগুলো গহনের সাথে ঘটেছিল তখনও তো গহন এভাবে কাঁদেনি। এভাবে কেন, কাঁদেইনি গহন। সবসময় চুপচাপ সবকিছু মেনে নিয়েছে। সারারাত যখন দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল তখনও ছেলেটা কাঁদেনি। আড়ালে কেঁদেছিল কিনা জানেন না। তবে সালমা বেগমের সামনে তো মোটেই কাঁদেনি

না খাবারের ঝাল দেওয়া নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করছে, না কখনো ওনার কোন অবহেলা নিয়ে অভিযোগ করেছে, না খাবার বেড়ে দেওয়া নিয়ে কখনো অভিযোগ করেছে। কোন কিছু নিয়েই যে ছেলে কখনো অভিযোগ করেনি সেই ছেলের আজ কি হয়ে গেল যে নিজের মা কে পেয়ে একেবারে অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসলো?

তার মানে কি এত কাল যাবত গহন অভিযোগ করার মতন কাউকে পায়নি খুঁজে? সেজন্য অভিযোগও করেনি। গহনের মতন শক্ত, কঠিন হৃদয়ের ছেলের তো এভাবে কাঁদার কথা না। দেখে মনে হচ্ছে চোখের সামনে বসে থেকে যেন পাঁচ-ছয় বছরের কোন একটা বাচ্চা ছেলে নিজের মায়ের কাছে অভিযোগ করে কাঁদছে।

গহনের সম্মুখে বসে কবরীও অসহায়ের মতন কাঁদছেন। গহন যেন ওনার অপরাধবোধ আরো কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে দিল। ওনার এখন নিজের গালে নিজেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে। নিজেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে নিজের জীবনটা নিজে শেষ করে দিতে। আজ কবরী আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারলেন উনি ঠিক কতটা স্বার্থপর ছিলেন।

একদম ঠিক বলেছে গহন। কবরী গহনের জীবনটা একেবারে শেষ করে দিয়েছে। ছেলেটার শৈশব, কৈশোর, জীবনের প্রত্যেকটা পর্যায় এমন ভয়াবহ কেটেছে যা কবরী কখনো কল্পনাও করেননি।

বেশ দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে কাঁদার পর গহন একটু হালকা হলো। এতক্ষণ যেন নিজের মাঝে ছিল না। বুঝতেই পারেনি যে এভাবে অসহায়ের মতন কাঁদছিল। যখন ধ্যান ভাঙল সঙ্গে সঙ্গে নিজের কান্না থামালো।

ছেলেটার নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা অসীম। চটজলদি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে চোখের জল মুছলো আগে।

সম্মুখে তাকাতেই দেখল কবরী কাঁদছেন। পাশে তাকাতেই দেখল নিধি কেঁদেকেটে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। শুধু ওরা দুইজন না, সবাই কাঁদছেন। বাকি শুধু জামিল হোসেন আর সালমা বেগম।

জামিল হোসেন হয়তো পুরুষ মানুষ বলে কাঁদছেন না। কাঁদা ওনার স্বভাব না। কিন্তু সালমা বেগম কেন কাঁদছেন না সেটা অজানা।

গহনের এসব ভাবনার মাঝে নিধির ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে,

“আর কাঁদবেন না। এবারে থামুন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপনাকে কাঁদতে দেখে। চলুন, চলে যাই আমরা।”

গহন একটা ঢোক গিলে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে নিধিকে বোঝালো যে ওরা চলে যাবে। নিধি উঠে দাঁড়িয়ে গহনের হাত ধরে ওকে তোলার চেষ্টা করল। ছেলেটা যেন উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু তবুও নিধির হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়ালো।

জামিল হোসেন এসে কবরীকে তুললেন। উনি এখনো কাঁদছেন। জামিল হোসেন ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে উনি শান্ত হতে পারলেন না। গহনরা চলে যেতে ধরলে কবরী তাড়াহুড়ো করে অপরাধী গলায় বললেন,

“বিশ্বাস করো গহন, আমি এসবের কিচ্ছু জানতাম না। আমি কখনো ভাবিনি যে তোমার ওপর দিয়ে এত ঝড় বয়ে গেছে। এত কঠিন পরিস্থিতিতে তুমি থেকেছো আমি সেটা বুঝিনি।”

“জানলেও কি করতেন? সম্পূর্ণ অজানা থাকার তো কথা নয় এই বিষয়টা আপনার? আপনি চলে যাওয়ার পর বাবা যে দ্বিতীয় বিয়ে করবে এটা অনেকটাই স্বাভাবিক। আর সৎ মায়ের ব্যবহার কেমন হতে পারে এটাও জানা কথা।”

“তাই বলে এতটা ভয়ংকর হবে আমি ভাবিনি। আমি কি করবো বলো? কি করলে তোমার মনের দুঃখ একটু হালকা হবে? আমি কি করলে আমার পাপের বোঝাটা একটু কমবে? আমাকে একটু আদর করতে দেবে, বাবা? একটাবার, শুধু একটাবার তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে দেবে? দেখো, তোমার কষ্ট কমে যাবে। এটুকু করতে দাও।”

গহনের ভেতরে যে কি তুমুল ঝড় বয়ে চলেছে সেটা বুঝতে দিতে চাইল না কবরী কে। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,

“আমি চাইছি না আপনার আদরটুকু নিতে। একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আপনি আবার চলে যাবেন। আর আমি আবার আপনার আদর পাওয়ার জন্য ছটফট করবো। যা আমি আর চাই না। আপনি চলে যান। আমাকে আমার মতন থাকতে দিন। আমি ভালো আছি আমার স্ত্রীর সাথে। আর আমি ওর সাথে ভালো থাকতে চাই। আর তার জন্য আপনি আর আমার সৎ মা দুজনের থেকেই আমি মুক্তি চাই।”

কবরী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আর কিছু বলার মতন মুখ নেই ওনার। গহন বুঝলো ওরও আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোন লাভ নেই। সামনে পা বাড়াতেই দেখল সালমা বেগম নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গহন নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। ওনাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে সালমা বেগম ওর হাত টেনে ধরল। বোধহয় এক সেকেন্ডও সালমা বেগম গহনের হাতটা ধরে থাকতে পারলেন না। গহন সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় ওনার থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“গতকাল রাতেই সব সম্পর্ক শেষ করে এসেছি। শেষ করেছি মানে একেবারেই শেষ করেছি। কিচ্ছু আর বাকি নেই।”

সালমা বেগম নির্জীব গলায় বললেন,

“কার জন্য সম্পর্ক শেষ করলে? বউয়ের জন্য, না মায়ের জন্য?”

“নিজের মানসিক শান্তির জন্য। আমার বউয়ের নিরাপত্তার জন্য। তোমার সাথে কোন সুস্থ মানুষ থাকতে পারে না। তুমি সুস্থ না। আগে নিজের চিকিৎসা করে সুস্থ হও। তারপরে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসো।”

“তবে এই মেয়ে সব শেষ করেই দিল? আমার সংসার ভেঙেই দিল, তাই না?”

“উহু। যা নষ্ট করার তুমি করেছো। তুমি তোমার দোষে সব নষ্ট করেছ। আমার মা তো কোন অজুহাতই না। যার সাথে আমার নিজের সম্পর্কই শেষ তার অজুহাতে আর তোমার সাথে কি সম্পর্ক শেষ করতাম। তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা শেষ হলো শুধুমাত্র নিধির সাথে তোমার করা ব্যবহারের কারণে। হাতজোড় করে অনুরোধ করছি তোমার কাছে, এবারে আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও। মানুষের হায়াত খুবই কম। আর কদিনই বা বাঁচবো। আর যেকদিন বাঁচি নিধির সাথে একটু ভালোমতো বাঁচতে দাও। একটু হাসতে দাও আমায়।”

কথাটা বলে নিধির হাতটা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে গেল গহন সেখান থেকে। পিছনে ফেলে রেখে গেল দুজন অসহায় মা কে। যারা দুজনেই নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই আজ অসহায়। নিজেদের কর্মের কারণেই আজ গহন কে হারিয়েছেন তারা।

_________

জুবাইদার বাড়ি থেকে ফিরে গহনরা আবার আবিদের বাড়িতেই এসেছে। অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরে গিয়েছিল গহনের। সেজন্য নিধিকে রেখে বেরিয়ে গেছে। গহনের ফিরতে ফিরতে বেশ অনেকটা রাত হলো। আবিদও তখন বাড়িতে নেই।

আবির এখানে একাই থাকে। ও নিজেও অফিসে গিয়েছে, এখনও ফেরেনি। আগে বাড়ি গহনই ফিরল। কলিং বেল বাজাতেই নিধি এসে দরজা খুলে দিল।

গহন ঠিক করেছে ওর মনে যাই চলুক না কেন সেটা নিধিকে বুঝতে দেবে না। নিধির ওপরে এর কোনো প্রভাব পড়তে দেবে না। আজ সকালে যা কিছু হয়ে গেছে, গহন সেই সবকিছু ভুলে যেতে চায়৷

দরজা খুলতেই নিধির মুখটা দেখতেই গহনের সমস্ত মন খারাপ দূর হয়ে গেল। আলতো হাসল।

গহন বুঝতে দিতে চাইছিল না যে ওর মনের মাঝে ঠিক কী ভয়ানক ঝড় বইছে। কিন্তু বুঝতে দিতে না চাইলে কি হবে, নিধি তো সব বুঝেছে। এই মানুষটার চোখ দেখেই নিধি বুঝে যায় যে সে ঠিক কতটা কষ্টে আছে, তার বুকের মাঝে কি ভয়ংকর হাহাকার বয়ে চলেছে।

তবে যেহেতু গহন আপাতত নিধিকে আর কিছু বুঝতে দিতে চাইছে না, তাই নিধির মনে হলো ওরও চুপ থাকাটাই বোধহয় ভালো হবে। পুরোনো কথা তুললে গহনের মন খারাপ আরও বাড়বে। ফলস্বরূপ, আলতো হেসে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো।

গহন সোজা গেল ওদের জন্য বরাদ্দ ঘরে ফ্রেশ হতে। এই ফাঁকে নিধি গেল খাবার গরম করতে। কিছুক্ষণের মাঝে আবিদও চলে এলো।

খাবার টেবিলে বসে টুকটাক যা কথাবার্তা হওয়ার নিধি আর আবিদের মাঝেই হলো। মাঝে মাঝে ওরা দুজনেই গহনকে নিজেদের কথার মাঝে সামিল করতে চাইল। গহন শুধু ছোট করে হু হ্যাঁ ইত্যাদি উত্তরই দিলো। তবে খুব বড় সংলাপ গহনের মুখ দিয়ে বেরোল না। শেষে নিধি আর আবিদও আশা ছেড়ে দিলো। অবশ্য গহনের থেকে এখন আশা করাটাই হয়তো ভুল। যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গহন যাচ্ছে, তাতে স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে গহনের।

খাওয়াদাওয়া করে যে যার ঘরে চলে গেল। নিধি ঘরে গিয়ে দেখল, গহন ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। বোধহয় অফিসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কল। নিধি আর বিছানায় বসল না। সরাসরি গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়।

বাইরে আজ বোধহয় অমাবস্যা। চাঁদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। চারিপাশটা একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পরিবেশটা ভয়ংকর লাগল নিধির কাছে। এমনিতেই নিধির ভূতে বেশ ভয়। অন্যান্য দিন হলে এমন সময় বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। তবে কে জানে আজ কোথা থেকে এত সাহস সঞ্চারিত হলো নিধির মনের মাঝে!

বেশ কিছুটা সময় এভাবে একাকী অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকার পর খেয়াল করল পেছন থেকে কেউ দুহাত ওর কোমরে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখেছে। স্পর্শটা চিনতে নিধির সময় লাগল না। এই স্পর্শটা এখন নিধির কাছে চিরপরিচিত। ভীষণই চেনা, ভীষণই ভালো লাগার একটা স্পর্শ। স্পর্শটা গহনের।

“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

নিধি ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“এমনিতেই।”

“কিছু ভাবছিলে বোধহয়, তাই না?”

নিধি অস্বীকার করে বলল,

“না তো। কিছুই ভাবছিলাম না। এমনিতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

বিজ্ঞাপন

গহন সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না। কিছুটা সময় নিয়ে নিধির কাঁধ থেকে থুতনিটা তুলে নিধির দুই বাহু ধরে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,

“আমার কথা ভাবছিলে?”

নিধি চটজলদি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। আপনার কথা কী ভাবব?”

“আমার থেকে লুকোতে চাইছ? যার চোখের ভাষা আমি পড়তে শিখেছি, সে কী করে আমার থেকে নিজের মনের কথা লুকোতে পারে?”

নিধি খুব তাড়াতাড়ি হার মেনে নিল। যে নিজ মুখে বলছে যে নিধির চোখের ভাষা পড়তে শিখেছে, তার কাছে মিথ্যে বলে লাভই বা কী হবে? ধরা পড়ে যাবে তো। তার থেকে বরং ভাবল সত্যিটাই বলে যাওয়া যাক।

দুহাতে গহনকে জড়িয়ে ধরে গহনের বুক নিজের মাথা ঠেকিয়ে বলল,

“আপনি খুব কষ্ট পেয়েছেন, তাই না? আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের উপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আমি জানি আপনার ভেতরে এখনও তুমুল অস্থিরতা কাজ করছে। কিন্তু আপনি সেটা আমাকে বুঝতে দিতে চাইছেন না। কেন এমন করেন, বলুন তো? মনের মাঝে এত কষ্ট জমা ছিল। আমাকে তো জানাতে পারতেন? তাহলে তো একটু হালকা লাগত।”

গহন পাল্টা নিধিকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“সারাক্ষণ যদি এইসব স্মৃতিই আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াই, তাহলে আমাদের নিজেদের জীবনটুকু উপভোগ করব কী করে, নিধি? সারাক্ষণ যদি আমার বেদনাদায়ক অতীতের স্মৃতিচারণই আমরা করতে থাকি, তবে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সুখের স্মৃতি কী করে জমা করব?”

নিধি গহনের বুক থেকে মাথা তুলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাই বলে এত কষ্ট নিজের মাঝে জমা করে রাখবেন? আমি তো আপনার জীবনসঙ্গী। আপনার সবকিছুর উপরে আমার ভাগ আছে। শুধু আমি আপনার সুখের ভাগ কেন নেব? আপনার দুঃখের ভাগও আমার।”

“কিন্তু আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে সবসময় ভালো রাখতে চাই, সুখে রাখতে চাই। আমি জানি তোমার অতীতটাও খুব একটা ভালো ছিল না। তোমার জীবনটা খুব একটা সুখে মোড়ানো ছিল না। সেই দুঃখের স্মৃতিগুলোর উপরে আমি আবার আমার দুঃখের স্মৃতিগুলোর ভার চাপিয়ে দেব? তুমি তো অনেক ছোট, বয়স কম। এত কম বয়সে এত চাপ তুমি নিতে পারবে না, নিধি। আমি যা সহ্য করেছি, আমি চাই না তা তুমি সহ্য করো। আমি তো বুঝি এত অল্প বয়সে অধিক চাপ নিতে কেমন লাগে। তাই আমি চাই না আমি থাকতে তুমি সেই চাপগুলো নাও। আর আমার অবর্তমানেও যেন তোমাকে কোনো চাপ নিতে না হয় সেই ব্যবস্থা আমি নিশ্চিত করে যাব।”

নিধি এবারে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“সবসময় এমন অবর্তমানের কথা বলবেন না তো। আপনাকে ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্ব নেই, বুঝতে পেরেছেন? যেই পৃথিবীতে আপনি থাকবেন না, সেখানে আমি এক মুহূর্তের জন্যও নিঃশ্বাস নিতে চাই না।”

নিধির কথা শুনে গহন আলতো হাসল। মেয়েটা আসলে নিতান্তই বাচ্চা। নয়তো কি এমন বাচ্চাদের মতন কথা বলে? কাউকে ছাড়া তো কারো জীবন থেমে থাকে না। সবাইকে নিজেদের জীবনে এগোতে হয়। জীবনটা জীবনের মতনই গতিশীল। তাকে চাইলেও থামিয়ে রাখা যায় না। বাঁচার তাগিদে হলেও জীবন চলবেই। কারো জীবনই কারো জন্য থেমে থাকবে না। মেয়েটার বয়স কম তো, সে জন্য এখন এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বুঝবে না। আবেগে ভেসে যাবে।

গহন দুহাতের আজলায় নিধির মুখটা নিয়ে ওর কপালে একটা গাঢ় চুম্বন বসিয়ে স্নেহপূর্ণ গলায় বলল,

“আমি তোমাকে শেখাবো। আমি তোমাকে একা বাঁচতে শেখাবো। আমি তোমাকে যেমন আমার আশ্রয়ে বাঁচতে শেখাবো, ঠিক তেমনি আমাকে ছাড়াও বাঁচতে শেখাবো। তোমাকে কঠিন দুনিয়া চেনাবো আমি, নিধি। আমি তোমাকে বোঝাবো, একা একা কিভাবে সংগ্রাম করে শুধুমাত্র নিজের জন্য টিকে থাকতে হয়। আমি তোমাকে সবটাই শেখাবো। তোমাকে বাঁচতে হবে। কখনো আমার জন্য, কখনো বা নিজের জন্য, বুঝতে পেরেছ? আমি থাকলেও বাঁচতে হবে, আমিহীনও বাঁচতে হবে।”

নিধি গহনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“পারব না, বুঝতে পেরেছেন? আপনি ছাড়া কে আছে আমার? আমি কী করব একা একা বেঁচে? তার থেকে বরং দুজনে টানা কয়েক বছর প্রেম করে, বাচ্চা কাচ্চা পয়দা করে, তারপরে নাতিপুতি হলে একসঙ্গে বিদায় নেব, কেমন? কেউ কাউকে একলা রেখে যাব না।”

গহন কেমন যেন আঁৎকে উঠল। তড়িঘড়ি করে নিধির মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“না না, এমন কখনো বলো না। তোমার মৃ ত্যু আমি কী করে সহ্য করব? নিজের প্রিয়জনের মৃ ত দে হ বহন করা খুব কঠিন নিধি। প্রিয়জনের লাশের খাটিয়া এই কাঁধে বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি পারবো না। তুমি বেঁচে থাকো। আমার আয়ু তোমার হোক, আমার জীবনের সুখ শান্তি তোমার হোক। তোমার কিছু না হোক। আমি যেন তোমাকে এমন হাসিখুশি, সুখী দেখেই বিদায় নিতে পারি। তাহলে আমি ম রেও শান্তি পাবো।”

নিধি বুঝতে পারল এই আলোচনা এবারে গুরুতর দিকে চলে যাচ্ছে। এই আলোচনার সমাপ্তি এখানে করাই ভালো। এইসব

ম রা-টরা নিয়ে কথা বলতে নিধির আবার ভালো লাগে না। নিধিও তো বাঁচতে চায়। জীবনে এত প্রতিকূল পরিবেশ এসেছে, তবুও কখনো মৃ ত্যু কে চায়নি। সবসময় চেয়েছে বাঁচতে।

আবারও মাথা তুলে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“হয়েছে হয়েছে। এখন এইসব ম রা র কথা বাদ দিন তো। সবসময় এত নিরামিষ জীবন ভালো লাগে না। অনেকদিন হলো একটু ভালোবাসেন না আমায়, আদর করেন না আমায়। ভুলে গেলেন কি যে আপনার ছোট বউটা একটু আদর চায় আপনার থেকে? দেখি তাড়াতাড়ি একটু আদর করে দিন তো আমায়।”

এমন গুরুতর মুহূর্তেও নিধির বাচ্চামোতে না হেসে পারল না গহন। ফিক করে হেসে উঠে বলল,

“আমি তো সবসময় আমার বউটাকে আদর করতেই চাই। কিন্তু আমার বউ তো শুধু পালাতে চায় সবসময়। যেই না আমি একটু ভালোবাসতে চাই, অমনি লজ্জায় গুটিয়ে যায়। অথচ যখন আমি দূরে দূরে থাকব, সে রাতবিরেতে ফোনে উষ্কানিমূলক গান শুনিয়ে কাজ ফেলে রেখে আমাকে নিজের কাছে টেনে আনে।”

মুহূর্তের মাঝে নিধি লজ্জায় মিইয়ে গেল। সত্যি বলতে সেদিনকার ঘটনা মনে হলে আজও নিধির বেশ লজ্জা লাগে। নিধিকে লজ্জা পেতে দেখে গহনের ইচ্ছে হল ওকে আরেকটু লজ্জা দিতে। নিধির দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,

“বিয়ের এতদিন হয়ে গেল, তবুও এত লজ্জা কেন? এদিকে সম্পর্ক তো অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। এতদিনে তো লজ্জা শরম কিছু থাকার কথা না। আর এখনও যদি লজ্জা থাকে তবে বাচ্চা কাচ্চা কবে হবে বলো? আমার যত সম্পদ এগুলো সবার মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য তো অনেক বাচ্চাকাচ্চা লাগবে। তো প্রস্তুতি নিতে হবে না?”

নিধির চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। হালকা করে গহনের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“আপনি আসলেই একটা নির্লজ্জ লোক। সবসময় শুধু ইয়ে নিয়ে কথা বলেন। এত ইয়ে নিয়ে কথা বলবেন না। আমার এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না কিন্তু।”

গহন শব্দ করে হেসে উঠল। নিধি সেখান থেকে পালাতে ধরলে গহন ওর হাত টেনে ধরলো। যেই না কিছু বলতে যাবে, অমনি বেজে উঠল গহনের ফোনটা।

নিধি বিরক্ত হলো না। বরং ও তো একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবে বিরক্ত হলো গহন। চোখে মুখে বিরক্তিভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“মানুষজন আর কল করার সময় পায় না? এত রাত হয়েছে তাও এদের কিসের এত কাজ? এরা কি বোঝে না যে আমার বাড়িতে বউ আছে, বউয়ের সাথে আমার কাজ থাকে?”

আরো বিড়বিড় করে কিসব বলতে বলতে যেন গহন পকেট থেকে ফোনটা বের করল। অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে কল এসেছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করল। তারপরে আর গহনের মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোলো না। বরং ধীরে ধীরে ওর চোখ মুখের অবস্থা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে উঠল। মুখটা শুকিয়ে গেল।

নিধি বুঝতে পারছে গহনের চোখে মুখে যেন চিন্তার ভাব ফুটে উঠেছে। কিন্তু কেন ফুটে উঠেছে কিছু বুঝতে পারছে না। কেই বা কল করেছে, কি বা বলছে সেসবও তো বুঝতে পারছে না।

কিছুক্ষণ কথাবার্তা শেষে গহন নিজের কান থেকে ফোনটা নামাল। নিধি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে গহন? কে কল করেছিল? আপনার মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেন?”

গহন সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারল না। নিধি আরও বেশ কয়েকবার একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। বেশ অনেকটা সময় পর গহন কেমন মূর্তির মতন আনমনেই বলে উঠল,

“উনি অসুস্থ। ওনাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।”

“কাকে?”

গহন এবারেও তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না। নিধি অপেক্ষা করে গেল জানার জন্য। কিছুটা সময় নিয়ে গহন অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

“মা....আমার মা খুব অসুস্থ। আমার মা কে আইসিইউ তে রাখা হয়েছে।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প