বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭৪

🟢

সোফায় মনমরা হয় বসে আছেন সালমা বেগম। বেশ অনেকদিন হলো গহনের কোন খোঁজ পান না তিনি। কল করেছেন তবে ফোন রিসিভ করেনি গহন। আর গত দুদিন ধরে ফোনটাই বন্ধ দেখাচ্ছে।

কলিং বেল এর আওয়াজ কানে যেতেই ধ্যান ভাঙলো ওনার। নিজেই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজা খুলতেই সামনে গহনের মুখটা দেখে তিনি চমকে উঠলেন। তিনি এখন নিজের বিস্ময় ভাব প্রকাশ করবেন, নাকি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবেন, নাকি অভিমান দেখাবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। চুপচাপ দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালেন।

সালমা বেগম দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াতেই নিধি আর গহন ভিতরে এলো। উদ্দেশ্য সরাসরি নিজেদের ঘরে যাওয়া। সালমা বেগম তখনও দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চেয়েও ডাকতে পারলেন না গহন কে। আশায় রইলেন যে গহন নিজ থেকে কিছু বলবে।

এদিকে গহন নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিল। তবে কয়েক কদমে গিয়ে নিজেই আবার থেমে গেল। গহনকে থামতে দেখে নিধি জিজ্ঞেস করল,

“কি হলো থামলেন কেন? চলুন। বিশ্রাম প্রয়োজন আপনার।”

গহন কোন উত্তর দিল না। পিছন ফিরে সালমা বেগমের দিকে এগিয়ে এসে বেশ নরম গলায় ওনাকে জিজ্ঞেস করলেন,

“ভালো আছো, মা?”

গহনের এই ছোট্ট একটা প্রশ্নে সালমা বেগমের মনে তৈরি হওয়া সমস্ত রাগ, অভিমান যেন কান্না হয়ে ঠেলে বেড়িয়ে আসতে চাইলো। তবে তিনি তেমনটা করলেন না। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে গম্ভীর গলায় বললেন,

“আমি ভালো থাকলেই কি, খারাপ থাকলেই কি। তোমার তো যায় আসে না। তাহলে অযথা এই প্রশ্নটা করার মানে কি?”

গহন কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ নির্জীব দৃষ্টিতে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুটা সময় পর বলে উঠলো,

“আমার মা মা রা গেছে। তাকে কবরে রেখে এলাম।”

আরেক দফা চমকে উঠলেন সালমা বেগম। কথাটা যেন ঠিকঠাক বোধগম্য হলো না তার। পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন,

“কে মা রা গেছে?”

“মা।”

“তোমার নিজের মা?”

“হ্যাঁ।”

সদলমা বেগম অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,

“সত্যি? কবে মা রা গিয়েছে? কি করে মা রা গেল?”

গহন এবারও কিছুটা সময় নিয়ে বলল,

“আমার থেকে ক্ষমা পাওয়ার আশাতেই বোধহয় বেঁচে ছিলেন। ক্ষমাও করে দিলাম, চলেও গেলেন।”

কোন উত্তর দিলেন না সালমা বেগম। নিধি এগিয়ে এসে গহনের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,

“চলুন এখান থেকে। পরে এসব কথা বলা যাবে।”

গহন বাধ্য ছেলের মত নিধির সাথে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে সালমা বেগম অভিমান জড়ানো গলায় বলে উঠলেন,

“নিজের মাকে তবে ক্ষমা করেই দিলে? মৃ ত্যু র আগে তাকে ঠিকই ক্ষমা করে দিলে, তবে কি ক্ষমা পাওয়ার জন্য আমাকেও ম র তে হবে? ম রা র আগে কি তোমার থেকে ক্ষমা পাবো না?”

গহন থেমে গেল। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঘরের দিকে পা বাড়াতে পারল না। নিজের বাহু থেকে নিধির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আবারো সালাম বেগমের সামনে এসে দাঁড়ালো। সালমা বেগমের এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওনার হাতের উল্টো পিঠে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“মায়েরা হয়তো অপরাধী হয় না। তুমি তো মা। এই একটা পরিচয় তোমার অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দিতে পারে। তুমি চেনো না আমাকে? আমি কতদিনই বা অভিমান করে থাকতে পারি? কতদিনই বা মনের মাঝে রাগ পুষে রাখতে পারি? তাও যেখানে বিপরীত পাশের মানুষটা আমার মা। তুমি বেঁচে থাকো। তোমার দীর্ঘায়ু হোক। আমার আয়ু তুমি নাও। তবুও তোমার কিছু না হোক। মায়ের মৃ ত্যু খুব যন্ত্রণাদায়ক।”

___________

হাত মুখ ধুঁয়ে গহন তখন ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। বলতে গেলে নিধি জোর করে শুইয়ে দিয়ে রেখে এসেছে। গহনকে ঘরে রেখে নিজে হাত মুখ ধুঁয়ে রান্না ঘরে এলো। অনেকক্ষণ থেকে কিছু খাওয়া হয়না গহনের। ভাবলো কিছু একটু রান্না করবে।

রান্নাঘরে আসতেই সেখানে সালমা বেগমকে পেল। উনিও রান্না করছেন। নিধি আগবাড়িয়ে কথা বলল না সালমা বেগমের সাথে। কেননা নিধি কথা বললেই সমস্যা হয়ে যায়। আর আজ অন্তত ঝামেলা করতে চায় না নিধি। ভেবেছে সালমা বেগমও যদি আজেবাজে কোন কথা শোনায় তবুও চুপচাপ সহ্য করে নেবে।

ফ্রিজে শাকসবজি, মাছ, মাংস কি কি আছে নিধি সেগুলো দেখার জন্য ফ্রিজ খুলল। শব্দ পেতেই সালমা বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কিছু লাগবে?”

“হ্যাঁ। রান্না করতাম। কি কি আছে সে সবই দেখছি।”

“করেছি আমি রান্না।”

“ও আচ্ছা। ভালো করেছেন। গহন তো আসলে ওসব খেতে পারে না। ওনার জন্য তো আমি আলাদা করে রান্না করি।”

“গহন যেন খেতে পারে সেভাবেই রান্না করেছি আমি কম তেল ঝাল দিয়ে। তুমি বাদেও আরো অনেকের ওর জন্য চিন্তা হয়। তুমি একাই ওকে ভালোবাসো সব সময় এটা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।”

কথাটা বলে সালমা বেগম চুপচাপ তরকারির বাটিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন রান্নাঘর থেকে। নিধি তখনও বিস্মিত দৃষ্টিতে ওনার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রয়েছে। উনি যে নিজের আরো কত রুপ দেখাবেন নিধি কে, কে জানে!

_________

সময় তখন রাত তখন সাড়ে নয়টার কাছাকাছি। খাওয়া-দাওয়া শেষে টুকটাক কাজ বাজ শেষ করে নিধি ঘরে এল। যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিল তখন দেখেছিল গহন ঘুমিয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে দেখল গহন বসে আছে। নিজেই নিজের বুকে হাত বোলাচ্ছে। চোখেমুখে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভাব ফুটে উঠেছে।

হঠাৎ করে কেন যেন ভয়ে নিধির গলা শুকিয়ে গেল। আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন?”

নিধি এমন ভাবে কথাটা বলে উঠেছে যে গহন নিজেই কেঁপে উঠল। চমকে উঠে দরজার দিকে তাকিয়ে নিধিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাড়াহুড়ো করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

“কি হয়েছে? কিছু হয়নি তো আমার।”

নিধি দৌড়ে গিয়ে বিছানার উপর গহনের পাশে বসে ফের আর্তনাদ করে বলল,

“না না। কিছুতো হয়েছে। আপনি এমন করছিলেন কেন? বুকে ব্যথা হচ্ছে? কোথাও কষ্ট হচ্ছে? সত্যি করে বলুন গহন, কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে? চলুন ডাক্তারের কাছে যাই।

“না না শরীর খারাপ লাগতে যাবে কেন? ঠিক আছি তো আমি। তুমি অযথা এত চিন্তা করো কেন আমায় নিয়ে?”

নিধি এবার রাগান্বিত গলায় বলল,

“একদম মিথ্যে বলবেন না। নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখা একটা বদ অভ্যাস হয়ে গেছে আপনার। বলুন না গহন, শরীর খারাপ লাগছে? আমায় বলতে কি অসুবিধা?”

“শরীর খারাপ লাগছে না। বোধহয় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে। খাবার তো তুমি রান্না করোনি তাই না? একটু ঝাল বেশি ছিল।”

নিধি কপাল কুঁচকে বলল,

“মোটেই ঝাল বেশি ছিল না। আমি নিজেও একই খাবার খেয়েছি। হ্যাঁ আমি রান্না করিনি এটা ঠিক। আপনার মা রান্না করেছিল। তবে আপনি যেন খেতে পারেন সেভাবেই রান্না করেছিল। তারপরও সমস্যা হলো কেন?”

গহন না বোঝার ভান করে বলল,

“কে জানে! তাহলে হয়তো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হওয়া একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমি ওষুধ খেয়ে নিয়েছি। চিন্তা করো না। ঠিক হয়ে যাব। এখন একটু ঘুমোই। তুমিও ঘুমোও।”

কথাটা বলে গহন সত্যি পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। নিধি ভাবল হয়তো সত্যিই গহনের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাই হয়েছে। সেজন্য লাইট বন্ধ করে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ল।

শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত নিধির। তাই খুব তাড়াতাড়ি চোখদুটো লেগে এলো। তবে ঘুমোতে পারল না গহন। ধীরে ধীরে যেন বুকের ব্যথাটা আরো তীব্র হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের ওপরে কেউ ভারী কোন পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। অদ্ভুত ধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। রুমে এসি চলছে। তারপরও গহন ঘামছে। প্রায় ২০ মিনিটের মতন অতিবাহিত হওয়ার পর যন্ত্রণাটা যেন একেবারে সহ্যের বাইরে চলে গেল গহনের।

তবুও নিধিকে ডাকল না। নিজে একা একাই উঠে বসলো। ফোনের ফ্লাশ লাইট অন করে গ্লাসে পানি ঢালল। তবে গ্লাসটা হাতে নিয়ে পানিতে চুমুক বসাতে পারল না। কম্পিত হাত থেকে পানির গ্লাসটা পড়ে গেল। কাচ ভাঙার বেশ জোরেশোরে একটা শব্দ হতেই নিধি লাফ দিয়ে উঠে বসলো।

হঠাৎ করে ঘুম ভাঙ্গায় যেন মাথাটা কাজ করছে না। ভনভন করে ঘুরছে। তবুও গহনকে বসে থাকতে দেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে? কিসের শব্দ হলো?”

গহন অপরাধী গলায় বলল,

“দুঃখিত। আমি আসলে তোমার ঘুম ভাঙাতে চাইনি। হাত থেকে পানির গ্লাসটা পড়ে গেছে।”

নিধি তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে আগে ঘরের লাইট জ্বালালো। গহনের দিকে তাকাতেই দেখল ছেলেটার ঘেমে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। গহনের এই অবস্থা দেখে নিধি আঁৎকে উঠলো। এসির কারণে তো নিধির ঠান্ডা লাগছে। আর সেখানে গহন এভাবে ঘেমে গেল কি করে?

এদিকে গহন নিজেও আর তখন যেন বুকের ব্যথা লুকোনোর মতো অবস্থাতে নেই। কাতরাতে কাতরাতে শুয়ে পড়ল।

নিধি ছুটে এসে পাশে বসে পড়ল। গহন কে এভাবে বুকে হাত রেখে কাতরাতে দেখে মেয়েটা ভয়ে আতঙ্কে কেঁদে ফেলল। নিজেই গহনের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? আমাকে কিছু বলছেনও না ঠিক করে। বুকে ব্যথা হচ্ছে? গহন, কথা বলুন না। আমার ভয় হচ্ছে তো।”

গহন এখন আর কোন কিছু বলার মতন অবস্থাতে নেই, ব্যথা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। নিধি কোন কিছু বুঝতে না পেরে সালমা বেগমকে ডাকলো।

সালমা বেগম তখনও ঘুমোননি। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই কানে নিধির এমন চেঁচানোর শব্দ আসতেই তিনি নিজেও খানিকটা থতমত খেলেন। দৌড়ে এলেন গহনদের ঘরের সামনে। নিধির চেঁচামেচি শুনে ঘর থেকে সিনথিয়া আর ঋতুও বেরিয়ে এসেছে। বের হয়নি শুধু সাবিত আর শম্পা।

বিজ্ঞাপন

ঘরের দরজায় বন্ধ। সালমা বেগম জোরে জোরে দরজার করাঘাত করলেন। নিধি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। নিধির চোখ মুখের অবস্থা দেখে সালমা বেগম নিজেই আতঙ্কিত গলায় বললেন,

“কি হয়েছে? কাঁদছ কেন?”

নিধি হাউমাউ করে কেঁদে বিছানায় শুয়ে থাকা গহন কে ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“গহন কেমন যেন করছে। ওনার বুকে ব্যথা করছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।”

নিধির মুখ থেকে কথাটা শুনতেই সালমা বেগম চোখ বড় বড় করে গহনের দিকে তাকালেন।

দৌড়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে গহনের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“ কি হয়েছে বাবা? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমায় বল?”

ব্যথায় গহনের চোখ মুখ নীল বর্ণ ধারণ করেছে। তবুও খুব কষ্টে বলল,

“বুকে ব্যথা করছে আমার।”

এর বেশি আর কিছু উচ্চারণ করতে পারল না। এদিকে নিধি তখনও হাউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছে। কি করবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। সালমা বেগম ঋতু কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ঋতু, সাবিত কে গিয়ে ডেকে তোলো। গাড়ি বের করতে বলো ওকে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে গহন কে।”

ঋতু এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গেল নিজের ঘরে। মিনিট দুয়েক পর ঘরে ঋতু একাই ছুটে এসে বলল,

“মা, ওই শ য় তা ন টা উঠছে না। আমি ওকে বললাম ভাইয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে তাও উঠছে না। আমাকে গালাগালি করছে।”

সালমা বেগম বিস্মিতা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওনার যেন বিশ্বাসই হতে চাইল না ঋতুর বলা কথাটা। ঋতুর মুখ থেকে কথাটা শুনে নিধি আরো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বাড়িতে আর কেউ নেই যে গাড়ি চালাতে পারে। এত রাতে এখানে গাড়ি পাবে কিনা তাও সন্দেহ। তার উপরে আবার মাথাটা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

পাশ থেকে সিনথিয়া রাগান্বিত গলায় বলল,

“দরকার নাই ওকে ডাকার।”

তারপরে নিধিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“ভাবি, তুমি কেঁদোনা। আমি নিচে গিয়ে দেখছি গাড়ি পাওয়া যায় কিনা। তোমরা সবাই মিলে ভাইয়াকে ধরে নিচে নামাও।”

কথাটা বলে সিনথিয়া নিচে গেল। সালমা বেগম কোন কথা না বলে উঠে গেলেন সাবিতের ঘরে। গিয়ে দেখলেন তার ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কেন যেন মেজাজটা ভীষণভাবে চটে গেল।

বেড সাইডের ওপর জগে পানি দেখতে পেলেন। জগটা হাতে নিয়ে সম্পূর্ণ পানি সাবিতের মুখের ওপর ঢেলে দিলেন।

ধরফরিয়ে উঠে বসল সাবিত। প্রথম দফায় পরিস্থিতি বুঝতে পারল না। পরমুহূর্তেই কানে ভেসে এলো সালমা বেগমের রাগান্বিত কন্ঠস্বর।

“আর কত ঘুমোবি? ঘুম কেন শেষ হয় না তোর? ওদিকে ছেলেটা অসুস্থ, তাও তোর মরার ঘুম কেন শেষ হয় না?”

এবারে ব্যাপারটা বুঝতে পারল সাবিত। পাল্ট রাগী গলায় বলল,

“পাগল হয়ে গেছো? আবার বিরক্ত করতে চলে এসেছো কেন? আরে ও মরতে বসেছে তো হাসপাতালে নিয়ে যাও না। আমি কি করবো এখানে?”

সাবিত কথাটা বলার সাথে সাথে সালমা বেগম কষিয়ে ছেলের গালে একটা চড় বসালেন। প্রথম দফায় সাবিত থমকে গেল। পরমুহূর্তে হিংস্র হয়ে যখন কিছু বলতে গেল আরেকটা কষিয়ে চড় বসাল সালমা বেগম। রাগে হিশহিশিয়ে বললেন,

“চল বলছি। গহনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তুই ছাড়া আর কেউ গাড়ি চালানো জানেনা। এক্ষুনি চল।”

সাবিত পাল্টা দাঁত পিষে বলল,

“যাব না। ও মরুক, বাঁচুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তোমাদের যদি এত পিরিত উতলে ওঠে তাহলে নিজেরা নিয়ে যাও। আমাকে খবরদার এসবের মাঝে টানবে না। আর দ্বিতীয়বার যদি আমার গায়ে হাত তুলেছো তুমি, তবে কিন্তু আমি ভুলে যেতে বাধ্য হব যে তুমি আমার মা।”

সাবিত নিজের কথাগুলো শেষ করতেই সালমা বেগম তৃতীয়বারের মতন ওর গালে কষিয়ে একটা চড় বসিয়ে রাগে চিৎকার করে উঠে বললেন,

“সে তো তুই কবেই ভুলে গেছিস জা নো য়া রে র বাচ্চা। চল বলছি। আমার ছেলের যদি কিছু হয়েছে, তোকে কিন্তু শেষ করে ফেলব। চল সাবিত। গাড়ি বের কর গিয়ে।”

সালমা বেগম কথাটা সম্পূর্ণ করতে না করতেই ঘরে দৌড়ে ঋতু এলো। হাপানো গলায় বলল,

“মা, প্রয়োজন নেই ওর। ভাইয়ার সেক্রেটারি বাদল এসেছে। নিয়ে যাচ্ছে ভাইয়াকে। চলুন আপনি। ওকে ঘুমােতে দিন।”

ঋতুর মুখ থেকে কথাটা শুনতেই সালমা বেগম সাবিত কে আর পাত্তা না দিয়ে দৌড়ে গেলেন। ততক্ষণে বাদল নিধি মিলে গহনকে ধরে ধরে নিচে নামিয়েছে।

বেশ কয়েকদিন হল গহনের কোন খোঁজ খবর পায়না বাদল। অফিসেও যায় না। কোন ধরনের কোন কাজেও গহনের পাত্তা পাওয়া যায় না। আগামী কাল সকালে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। সেই মিটিংয়ে গহনকে যেতেই হবে।

বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে গহনে সাইনও লাগবে। গহন তো সেই কবে একবার বাদলকে কল করে বলেছিল সবটা যেন সামলে নেয়। কিন্তু বাদলের একার পক্ষে তো সবটা সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। গহনকে ছাড়া কি চলে নাকি একটা গোটা অফিস।

সেই জন্য কিছু ফাইলে সাইন নেওয়ার জন্য আর আগামীকালের মিটিং এর কথাটা স্মরণ করে দেওয়ার জন্যই বাদল এসেছিল। নিচে সিনথিয়ার সাথে দেখা হয়ে যায়। সিনথিয়ার থেকে গহনের শারীরিক অবস্থার কথা শুনে দৌড়ে ওপরে আসে। ভাগ্যিস এসেছিল বাদল। নয়তো এত রাতে গহন কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়তো।

____________

গহনের সাথে নিধি, সালমা বেগম আর সিনথিয়া গিয়েছে। শম্পা একবার ঘর থেকে বের হওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি। ঋতুর কেন যেন মনটা মানতে চাইছে না। আবার বাচ্চাকে একা রেখে যেতেও পারছেনা। একবার শম্পার ঘরে গিয়েছিল ওকে বলার জন্য যেন বাচ্চাটাকে একটু দেখে। তবে শম্পা মুখের ওপরে মানা করে দিয়েছে।

বাধ্য হয়ে ঋতু আবার নিজের ঘরে চলে এলো। মনে হলো ওখানে একজন কারো থাকার দরকার। নিজের কারো থাকার দরকার। বাদল তো যথাসম্ভব সাহায্য করবে। কিন্তু সাবিত তো নিজের ভাই। ওর যাওয়াটা দরকার। অন্তত বাকিরা তো একটু ভরসা পেত।

খুব সাহস করে এসে ঋতু আরেকবার সাবিতকে ডাকলো। বেশ কয়েকবার ডাকার পরে সাবিতের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে শেষে বাধ্য হয়ে ঋতু ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকালো। আসলে সাবিত ঘুমোয়নি। শুধু সাড়া দিচ্ছিল না। তবে এবারে সাড়া দিল। খুব ভয়ানক ভাবেই সাড়া দিল।

সালমা বেগমের রাগটা গিয়ে ঋতুর উপরে পড়লো। এমন ভাবে ঋতুর গালে একটা চড় বসাল যে তাল সামলাতে না পেরে খাটের সাথে গিয়ে ঋতুর মাথাটা বারি খেল। ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলো ঋতু। সাবিত ঋতুকে বেশ কিছু গালাগালি করে অন্য পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঋতু খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। বুঝলো এই অমানুষের থেকে সামান্য মনুষ্যত্ব আশা করাটাই ভুল হয়েছে। কেন যেন আর ঘরেও থাকতে ইচ্ছে করছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবার থেমে গেল।

চোখ পড়ল ঘরের এক কোনায় সাজানো একটা ফুলদানির উপরে। ফুলদানিটা বেশ ভারী। কি ভেবে যেন ঋতু ফুলদানিতে হাতে নিল। সেটা নিয়ে এগিয়ে গেল সাবিতের দিকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো পাশে। ধীরে ধীরে ফুলদানির উপর ঋতুর হাতের বাঁধন আরো শক্ত হলো। চোখ মুখে এক অদ্ভুত হিংস্রতা ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে ।

হঠাৎ করে ঋতুর ছেলে সালার কেঁদে উঠলো। ধ্যান ভাঙলো ঋতুর। হাতে থাকা ফুলদানিটার দিকে নিজেই বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো। কেন নিয়েছিল ফুলদানিটা?

নিজের প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে ফুলদানিটা আবার নিজের পূর্বের জায়গায় রেখে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ঋতু।

____________

“কি হয়েছে গহনের? মানে উনি কেমন আছেন? সুস্থ হয়ে যাবেন তো?”

নিধি উদ্বিগ্ন গলায় ডাক্তার কে প্রশ্নগুলো করল। সিনথিয়া এক হাতে ওকে আগলে নিয়ে শান্ত হতে বলল। তবে নিধি শান্ত হতে পারছে না। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ডাক্তারের উত্তরের জন্য।

“হার্ট অ্যাটাক করেছেন। এখনই সম্পূর্ণভাবে ওনাকে ঝুঁকিমুক্ত বলতে পারছিনা। খুব বেশি দেরি না করলেও একটু দেরি হয়েছে আপনাদের ওনাকে হাসপাতালে আনতে। কিছু টেস্ট করা হয়েছে। সেগুলোর রিপোর্টে এলে তারপরে বিস্তারিত বলতে পারব। প্রে ফর হিম।”

কথাটা বলে ডাক্তার চলে গেল সেখান থেকে। নিধি কেন যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। সিনথিয়ার একার পক্ষে ওকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব হলো না। ফলস্বরূপ ধপ করে ফ্লোর এর উপরে বসে পড়লো। নিধি কাঁদছে না। নির্জীব দৃষ্টিতে সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

“উনি এভাবে কেন বলে গেলেন? দেরি করেছি মানে কি? তাড়াতাড়ি তো নিয়ে এলাম। উনি কি সুস্থ হয়ে যাবেন না? আমি ওনাকে আমার সাথে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবো না?”

সিনথিয়া চেয়েও নিজের কান্না নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। এক হাতে নিধিকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“নিশ্চয় পারবে ভাবি। কেন পারবে না? ভাইয়ার কিচ্ছু হবে না। তুমি কেঁদোনা।”

“ডাক্তার এভাবে কেন বললেন? ডাক্তার কেন বললেন না যে উনি ঠিক হয়ে যাবেন? আমাকে তো একটু ভরসাও দিল না? উনি বাঁচবেন তো? এই সিনথিয়া বলো না, উনি ঠিক হয়ে যাবেন তো? কত মানুষের বদদোয়া আছে। কত মানুষ চায় যেন উনি ম রে যায়। উনি চলে যাবেন আমায় ছেড়ে? ওনার দেওয়া কথাগুলো রাখবেন না, তাই না?”

সিনথিয়া নিধিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওর চোখের জল মুছে দিয়ে আবার ভরসা দিয়ে বলল,

“এমন কিছু হবে না। ভাইয়া কখনো কথার খেলাপ করে না। তোমাকে যে যে কথা দিয়েছে সেগুলো নিশ্চয়ই রাখবে। তুমি দেখো খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে ভাইয়া। বাড়ি নিয়ে যাব আমরা ভাইয়াকে।”

নিধি কিছুক্ষণ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো সিনথিয়ার দিকে। তারপর হঠাৎ করে আবারও হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,

“আমার ভয় করছে কেন তাহলে? আমার মনে খুব খারাপ খারাপ ভাবনা আসছে। দেখো না আমি কাঁদছি, তারপরও উনি এসে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন না। উনি আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন। উনি কখনো নিজের অসুস্থতার কথা বলে না। ভাবো তো কতটা অসুস্থ হলে এভাবে কাতরান? ডাক্তারও ভালোমতো কিছু বলে গেল না। কিসের ডাক্তার যে রোগীকে ঠিক করতে পারে না? কোন হাসপাতালে নিয়ে এলাম? কোন ডাক্তার এটা? এরা কেউ ভালো না।”

নিধি কিছুক্ষণ কাঁদলো। হঠাৎ করে নিধির কেন যেন মনে হলো যে অনেকে বোধহয় গহন এর মৃ ত্যু কামনা করছে। তার কারণটা হয়তো নিধি। তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া দরকার। তাদেরকে অনুরোধ করা দরকার যেন তারা গহন কে ক্ষমা করে দেয়। যেন গহনের জন্য একটু দোয়া করে। অন্তত বদদোয়া যাতে না করে। সর্বপ্রথম দৃষ্টি গেল সালমা বেগমের দিকে।

সালমা বেগম তখন চুপচাপ বসে আছেন। নিধি উঠে সালমা বেগমের পায়ের কাছে এসে বসে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“মা, দয়া করে বদদোয়া দেবেন না। গহন আপনাকে কতটা ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে সেসব তো আপনি জানেন। আমি খারাপ, আমি আপনার সাথে অনেক বেয়াদবি করেছি। আপনি বরং আমার ক্ষতি চান। তবুও দয়া করে গহনের ক্ষতি চাইবেন না, মা। একটু দোয়া করুন মা যেন উনি সুস্থ হয়ে যায়। আমার স্বামী কে যেন আমি আবার ফিরে পাই। উনি….ওনাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, মা।”

ধ্যান ভাঙলো সালমা বেগমের। ক্রন্দনরত নিধির দিকে তাকালেন তিনি। কখনো এই মেয়েটার জন্য তার মায়া হয়নি, করুণা হয়নি। তবে আজ কেন যেন খারাপ লাগলো । আজ প্রথমবার সালমা বেগম নিধিকে আগলে নিয়ে ভরসা দিয়ে বললেন,

“চিন্তা করোনা। গহন সুস্থ হয়ে যাবে। ও কোনোদিন এমন কোন কাজ করেনি যার কারণে এত বড় শাস্তি পাবে। ওর সাথে ওর মায়ের দোয়া আছে। সৎ মায়ের দোয়ায় হয়ত তোমার ভরসা হবে না। ওর আসল মায়ের দোয়া ওর সাথে আছে। গহনের মতন সন্তান কখনো শাস্তি পেতে পারে না।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প