বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৭৮

🟢

নিধি তখন স্যুটকেস গোছাচ্ছে। আলমারি থেকে বেছে বেছে নিজের পছন্দের জামাকাপড়গুলো তুলছে। আর গহন বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।

ছেলেটার স্বভাব বদলায়নি। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, কাজ ছাড়া যেন ছেলেটা থাকতেই পারে না। গত দুমাস যাবৎ চেষ্টা করেও নিধি ছেলেটার কাজ করার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর নিধি অনেক চেষ্টা করেছে যেন বেশি কাজের চাপ না নেয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

প্রথম এক মাস তাও একটু শুনেছিল। তবে পরের মাস থেকেই আবার পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছি। নিধি আর কি রাগারাগি করবে। গহন নিজেই আকুতি-মিনতি করে, আদর করে, চুমু টুমু দিয়ে অফিসের জন্য বেড়িয়ে গেছে।

গহন কাজ করতে করতেই আড়চোখে একবার নিধির দিকে তাকালো। দেখল স্যুটকেস পুরো ভরে গেছে। তবুও মেয়েটার জামাকাপড় তোলা শেষ হচ্ছে না। শেষে বাধ্য হয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে পাশে রেখে নিধির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,

“মাত্র তিন দিনের ট্রিপে যাচ্ছি আমরা, নিধি। আর কত জামাকাপড় নেবে?”

গহনের কথাটা শুনে নিধি আমতা আমতা করে বলল,

“তিন দিন তো কী হয়েছে? তিন দিনে কতগুলো জামা পরা যায় আপনার কোনো হিসেব আছে? প্রয়োজন হলে আমি প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় নতুন নতুন জামা পরবো। আপনার সমস্যা?”

“না, আমার সমস্যা না। কিন্তু কথা হলো তুমি নাহয় ঘন্টায় ঘন্টায় জামা বদলাবে ঠিক আছে। কিন্তু আমার জন্য এত জামা কাপড় কেন নিচ্ছো? আমার এত প্রয়োজন নেই। পাঁচ থেকে ছয়টা নিলেই যথেষ্ট।”

গহনের কথায় নিধি তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“উহু। ওসব চলবে না। আমি আমার প্রত্যেকটা জামাকাপড়ের সাথে আপনার জামাকাপড় ম্যাচিং করে তুলছি। আমি যখন যে রঙের জামা পরবো, আপনাকেও তখন সে রঙের জামাই পরতে হবে। এখন আমি যদি প্রত্যেক ঘন্টায় জামা বদলাই তাহলে আপনাকেও আমার সাথে ম্যাচিং করার জন্য প্রত্যেক ঘন্টায় জামা বদলাতে হবে। বুঝতে পেরেছেন?”

“ওমা! এ আবার কেমন কথা? এতবার কেউ জামা বদলায় নাকি?”

নিধি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“কে বদলায় জানি না। তবে আমি আর আপনি বদলাবো।”

“তাই বলে প্রতি ঘন্টায়?”

“প্রয়োজন হলে প্রতি মিনিটে বদলাবো। ছবি তুলবো, ঘুরবো, খাবো, কতকিছু করব, একটু নতুন নতুন জামা কাপড় লাগবে না? সকালে একটা পরবো, বিকালে একটা পরবো, সন্ধ্যায় একটা পরবো, রাতে একটা পরবো। এর মাঝেও আরো অনেকগুলো পরবো। একই জামা পরে কত ছবি তুলবো, বলুন? নতুন নতুন জামা পরে বারবার ছবি তুলবো। কোনোদিন শহর থেকে না বেড়োনো মেয়েটাকে আপনি কক্সবাজার নিয়ে যাচ্ছেন। এতটুকু পাগলামি তো করবোই বলুন।”

গহন এবার হালকা একটু হেসে উঠল।

“আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম তোমার কথা। কিন্তু তাই বলে আমাকেও এর মাঝে জড়ানো কি খুব জরুরি? মানুষ তো হাসবে আমায় দেখে, তাই না? ধরো তুমি একটা লাল রঙের জামা পরলে, আমি কি লাল রঙের পরতে পারি? তুমি গোলাপি রঙের পরলে, আমি কি গোলাপি রঙের পরতে পারি? হাসবে তো সবাই আমায় দেখে। মান সম্মান থাকবে না নিধি।”

নিধি চোখ ছোট ছোট করে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমাকে কি আপনার বলদ মনে হয় যে, আমি আপনার জন্য লাল, গোলাপি রঙের জামা নেব? আরে বাবা, বৌয়ের উপর একটু ভরসা রাখুন তো। একটু ভরসা রাখুন বৌয়ের উপরে গহন। আপনার বৌয়ের বয়স কম হতে পারে, মাথার বুদ্ধি হাঁটুতে থাকতে পারে, তাই বলে এতটা অবিবেচক না যে আপনার জন্য লাল, গোলাপি রঙের জামা নেব আমি।”

গহন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো মেয়েটাকে কোনো কিছু বলেই লাভ নেই। তার কারণ এর কানে কোনো কথাই যাবে না। বরং নিধিকে নিজের মতন কাজ করতে দিয়ে নিজেও আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল।

স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে নিধির একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ে গেল। অনেকক্ষণ ভেবেছিল যে কথাটা বলবে। কিন্তু শেষে আর বলা হয়নি। শেষে স্যুটকেসটা বন্ধ করে পাশে সরিয়ে রেখে বিছানার উপর উঠে গিয়ে গহনের পাশে বসে মিনমিনে গলায় বলল,

“একটা কথা বলার ছিল।”

“হুম বলো।”

নিধি আমতা আমতা করে বলল,

“ইয়ে মানে বলছিলাম যে গত এক মাস ধরে যে আমি আপনাকে কাজে সাহায্য করছি, কত ফাইল দেখছি, কাউকে মেইল পাঠানোর হলে সেগুলো পাঠাচ্ছি, আরও কত কাজ করছি, বলুন তো? মানে আমি আপনার কোম্পানিতে ইন্টার্ন করছি। তো আমার বেতন নেই? বেতন দেবেন না? না মানে আমি নিতাম না, কিন্তু এটা তো আমার অধিকার, তাই না? যেহেতু আমি ইন্টার্ন করছি, আবার পরিশ্রম করেছি। আমি তো জানি এখন যদি আমি বেতনটা না নেই আপনার খারাপ লাগবে। আপনার মনে হবে বিনা পারিশ্রমিকে একজনকে দিয়ে পরিশ্রম করিয়ে নিলেন। সেইজন্যই আমি বেতনটা নিতে চাইছি।”

“বেশ ঠিক কাছে। নেবে বেতন।”

নিধির চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। গহনের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“কত টাকা দেবেন আমায় বেতন?”

গহন পাল্টা প্রশ্ন করল,

“তুমি কত টাকা চাও?”

নিধি একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“দিন লাখ দশেক টাকা।”

গহন চোখ বড় বড় করে নিধির দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত টাকা কোনো ইন্টার্নের মাসিক বেতন হয়? আমিও তো এত টাকা নিই না।”

নিধি সোজা হয়ে বসে হালকা একটু কাঁশার ভঙ্গিতে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,

“তো আপনার সাথে আমার তুলনা করলে চলবে নাকি? আপনি হলেন মালিক। আর আমি হলাম মালিকের বউ। তাহলে কার সম্মানটা বেশি? সবই তো আমারই। বরং আমি কমই চেয়েছি। শুকরিয়া করুন যে সবকিছু চেয়ে বসিনি আপনার থেকে।”

মুখ ফসকে গহন হেসে উঠে বলল,

“তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। আচ্ছা বেশ, যা চাও তাই দেব। আসলেই তো কোথায় মালিক আর কোথায় মালিকের বউ! অবশ্যই মালিকের বউয়ের মর্যাদাটাই বেশি।”

কথাটা বলে দুজনে হো হো করে হেসে উঠল। নিধির তো হাসি থামতেই চাইছে না। হাসতে হাসতে গহনের গায়ের উপরেই ঢলে পড়ল। মেয়েটার হাসতে হাসতে পাশে যে থাকে তার গায়ে ঢলে পড়ার একটা বাজে স্বভাব রয়েছে। আবার হাসির মাঝে তাকে কয়েকটা কিল ঘুষি লাগানোরও স্বভাব আছে। অবশ্য নিধির এইসব অত্যাচারে গহন মোটেও বিরক্ত হয় না। বরং চুপচাপ সহ্য করে নেয়। কিছু অত্যাচার বড্ড মিষ্টি লাগে যে!

____________

গহন গেছে গোসলে। এর মাঝে বাদল এলো। কালকে অফিস থেকে সবাই ঘুরতে যাবে, অথচ ছেলেটার আজকেও কাজের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ কমেনি। যেমন গহন ঠিক তেমনই যেন তার সেক্রেটারি। কাজ বলতে পাগল।

ছেলেটা আপাতত সোফায় বসে গহনের জন্য অপেক্ষা করছে। এর মাঝে নিধি বসার ঘরে এসে বাদল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া, একটু সাহায্য করুন না আমায়!”

বাদল তড়িৎ গতিতে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“ইয়েস ম্যাম। বলুন না কি করতে হবে?”

নিধি বিরক্তিকর গলায় বলল,

বিজ্ঞাপন

“ধুর! আবার ম্যাম। বলেছি না আমার এসব ম্যাম ম্যাম ভালো লাগে না? ভাবি বলবেন। বিয়ে তো করলামই ভাবি ডাকটা শোনার জন্য। সেই ভাবি বলে কেউ ডাকেই না। যেখানেই যাই শুধু সবাই ম্যাম ম্যাম ম্যাম।”

বাদল তড়িঘড়ি করে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলল,

“আমি রিয়েলি সরি ম্যাম। আর হবে না। আমি এবার থেকে ভাবি ডাকার চেষ্টা করব। বলুন না কি সাহায্য করতে হবে?”

নিধি নিজের ফোনটা বাদলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আমি আসলে টাকা ট্রান্সফার করতে পারছি না। কীভাবে করতে হয় আসলে জানি না। গহন বেরোলে সাহায্য করতে পারত। কিন্তু আমার আর তর সইছে না। সেজন্য আপনার কাছে এলাম। একটু এই অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে দিন না ভাইয়া।”

কথাটা বলে নিধি বাদলের দিকে নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিল। বাদলের একটুও অসুবিধা হলো না কাজটা করতে। এসব কাজ ওর জানা। অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে ফোনটা আবার নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“হয়ে গেছে ভাবি।”

নিধি উচ্ছ্বসিত গলায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলল,

“অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাইয়া। আপনি ভীষণই ভালো। আপনি একটু বসুন। আমি এক্ষুণি আসছি। আর দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে যাবেন কিন্তু।”

কথাটা বলে নিধি ফোনটা নিয়ে আবার ঘরে গিয়ে নিজের বাবার নাম্বারে কল লাগাল। দুবার রিং হতেই আযীয আহমেদ ফোনটা রিসিভ করলেন।

“ভালো আছিস মা? হঠাৎ এই সময়ে কল করলি যে? সব ঠিক আছে তো?”

মেয়ে কল করলে আযীয আহমেদ কেমন যেন চিন্তায় পড়ে যান। একদিন শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের যে অবস্থা দেখে এসেছেন তারপর থেকেই তার মাঝে ভয় কাজ করে। তিনি জানেন জামাই তার যথেষ্ট ভালো মানুষ। এই যুগে এমন মানুষ পাওয়া বিরল। কিন্তু তবুও মনের মাঝে একটা ভয় থেকেই যায়। মানুষ যে পরিবর্তনশীল। কখন কার মন কোথায় কীভাবে পরিবর্তন হয়ে যায় তা তো বলা যায় না। তার উপর আবার তাদের ভাগ্য।

আযীয আহমেদের চিন্তিত গলার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিধি হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“আমি ঠিক আছি বাবা। তোমরা সবাই ভালো আছো? নিয়াজ ভালো আছে তো? ওর পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?”

“আমরা সবাই ভালো আছি মা। এত চিন্তা করিস কেন আমাদের নিয়ে? আচ্ছা জামাই কেমন আছে? সব ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ রে বাবা সব ঠিক আছে। আচ্ছা শোনো, তোমার অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়েছে আমি। আমি আকিবকেও বলে দিয়েছি, ও টাকাগুলো তুলে এনে তোমাকে দেবে। নিয়াজের স্কুলের বেতন দিয়ে দিও। ওর অংক আর ইংরেজির জন্য একটা টিউশনিও দিও। তুমি ওষুধও কিনে নিও। আর তোমাদের তিনজনের জন্য নতুন জামাও কিনো। যা খেতে ইচ্ছে করে সব খেও কেমন? আর কেউ টাকা চাইলে ভুলেও দেবে না। যদি বলে টাকার অভাবে ওরা ম রে যাচ্ছে তাও দেবে না, বুঝতে পেরেছো? অবশ্য কথাটা তোমরা কাউকে না জানালে কেউ জানবেও না। আকিবও জানাবে না কাউকে।”

নিধি একনাগারে কথাগুলো বলে থামল। হঠাৎ করে মেয়ের মুখ থেকে এমন টাকার হিসেব শুনে আযীয আহমেদ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। মেয়ে যে লম্বা হিসেব দিলো তার জন্য তো অনেক টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এত টাকা পাবেন কোথায়? কে ওনার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠালো?

“কী সব যা তা বলছিস মা? অ্যাকাউন্টে টাকা আসবে কী করে?”

“আমি পাঠিয়েছি।”

নিধি কথাটা বলতেই আযীয আহমেদ ব্যতিব্যস্ত গলায় বললেন,

“তুই পাঠিয়েছিস মানে? কেন পাঠিয়েছিস? আমি তোকে বলেছিলাম টাকা পাঠানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তুই ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকব। তুই কেন এসব করিস? সেই জামাইয়ের চোখে আমায় ছোট করলি তো ছাড়লি।”

“আরে আরে বাবা, শান্ত হও, শান্ত হও! আমাকে বলার সুযোগ তো দাও।”

আযীয আহামেদ রুষ্ট গলায় বললেন,

“কী বলবি তুই? তোকে আমি বারবার করে বলেছিলাম জামাইয়ের কাছে অন্তত আমার সম্মান রাখ। অন্তত জামাইয়ের কাছে আমার সম্মান নষ্ট করিস না। কিন্তু তুই আমার সেই কথাটাও রাখলি না। দিনকাল তো আমাদের ভালোই চলে যাচ্ছে। বেঁচে তো আছি আমরা।”

নিধি মলিন হেসে বলল,

“বেঁচে আছো, কিন্তু ভালো নেই, তাই তো? বেঁচে আছো ঠিকই, তবে সেটা অনুভব করতে পারো না, তাই তো? এমনভাবে বেঁচে আছো যে দিনরাত মৃ ত্যু কে ডাকো, তাই তো?”

হঠাৎ করে আযীয আহমেদ কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন। প্রত্যুত্তরে একটা টু শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিধি আবার বলে উঠল,

“তোমাদেরকে আমি আর কিভাবে বোঝাবো বাবা বলো তো যে, গহন এমন মানুষই না? এতদিনেও বুঝলে না উনি ঠিক কতটা পরিষ্কার মনের একজন মানুষ? আমি যদি আমার সংসারের সর্বস্ব নিয়ে গিয়েও তোমাদের দিয়ে দিই, তবুও উনি কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না যে আমি কেন দিয়েছি? কখনো উনি আমার থেকে এর জন্য জবাবদিহি চাইবেন না।”

আযীয আহমিদ এবার অসহায় গলায় বলল,

“কিন্তু আমাদের যে ভালো লাগে না, মা। জামাইয়ের টাকায় সংসার চালানো ভীষণ অসম্মানের রে মা এটা তোকে কি করে বোঝাই আমি।”

“আরে আমি তো জামাইয়ের টাকা দেইনি। এটা আমার নিজের উপার্জনের টাকা। তুমি তো বলেছিলে যেদিন তোমার মেয়ে উপার্জন করবে, সেদিন তুমি তোমার মেয়ের টাকা নেবে। আজ তোমার মেয়ে নিজের উপার্জনের টাকা তোমায় পাঠিয়েছে, বাবা।”

নিধির কথাটা ঠিক বিশ্বাস হলো না আযীয আহমেদের। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তোর উপার্জনের টাকা মানে? তুই কি করে উপার্জন করবি? তোর তো এখনো পড়াশোনাই শেষ হয়নি।”

নিধি বেশ গর্বের সাথে বলল,

“পড়াশোনা শেষ হয়নি তো কী হয়েছে? তোমার জামাইয়ের অফিস আছে না? আমি ওখানে চাকরি করি, বুঝেছ? এক মাস হলো আমি ওখানে চাকরি করছি। উনি আমাকে বেতনও দিয়েছে। আর আমি আমার সেই বেতনের টাকাই তোমাদেরকে পাঠিয়েছি। তাহলে কী দাঁড়াল? এইটা তোমার জামাইয়ের টাকা না। এটা তোমার মেয়ের উপার্জনের টাকা। আর মেয়ের টাকা নিতে কোনো লজ্জা নেই, বুঝেছো বাবা?”

আযীয আহমিদ অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,

“তুই সত্যি বলছিস যে তুই চাকরি পেয়েছিস জামাইয়ের অফিসে? তোকে চাকরি দিল? আবার বেতনও দিল?”

নিধি আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ বাবা দিয়েছে। চাকরিও দিয়েছে, বেতনও দিয়েছে। সেই টাকাই তোমায় পাঠিয়েছে। চিন্তা করো না। এখন থেকে প্রতি মাসে পাঠাবো। আর খুব তাড়াতাড়ি তোমাদেরকে ওই বাড়ি থেকে বের করার ব্যবস্থা করব। তুমি তোমার সামর্থের বাইরে গিয়ে আমাকে যতটা দিয়েছ, আমি হয়তো তোমাকে তার থেকে বেশি দিতে পারব না, বাবা। কেননা বাবারা তাদের মেয়েকে যা দেয়, কেউ কখনো সেগুলো ফেরত দিতে পারে না। তবে আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে তার থেকে কমও দেব না।”

একটু থামল নিধি। আসলে কণ্ঠটা ধরে আসছে। চোখ দুটো ছলছল করে উঠছে। একটু বিরতি নিয়ে ফের বলা শুরু করল,

“মনে আছে বাবা আমাদের ভালো রাখার জন্য, আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তুমি কত কষ্ট করতে? কখনো কোনো কিছুর অভাব হতে দাওনি। আমি এতদিন নিরুপায় ছিলাম। আমার কাছে করার মতো কিচ্ছু ছিল না। সেইজন্য মুখ বুঝে তোমাদেরকে অনেক অপমানিত হতে দিয়েছি। তবে দেখো এবার আমি তোমাদেরকে ভালো রাখব। আমার মা কখনো নিজের সংসার পায়নি। আমি আমার মাকে একটা সংসার গুছিয়ে দেব। আমি তোমাদেরকে তোমাদের একটা নিজের বাড়ি গুছিয়ে দেব। যেখানে তোমাদের অপমানিত হতে হবে না। যেখানে তোমরা নিজেদের মতো ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। ভালোভাবে খেতে পারবে, ঘুমোতে পারবে, কোনো অপমান, অবজ্ঞা, অবহেলা থাকবে না সেখানে। দেখো বাবা, খুব তাড়াতাড়ি আমি তোমাদের মাঝে বাঁচার ইচ্ছে আবার জাগিয়ে তুলব।”

ফোনের অপর পাশে থাকা আযীয আহমেদ ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করলেন। তবে তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। কিন্তু তিনি মেয়েকে বুঝতে দিতে চাইলেন না যে তিনি কাঁদছেন। মেয়েটা তো তার ছোট। আবার বাবাকে ভীষণ ভালোওবাসে। যদি বুঝতে পারে যে বাবা কাঁদছে তাহলে কষ্ট পাবে।

তিনি যথাসম্ভব হাসার চেষ্টা করে বললেন,

“তুই আজ যা বললি মা, এতেই আমার প্রাণটা জুড়িয়ে গেছে। আমার মেয়ে সবসময় আমার শক্তি ছিল। আমি জানতাম, আমার মেয়ে আমাদের স্বপ্ন ঠিক পূরণ করবে। তবে তোর থেকে আমি এত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার আশা রাখি না মা। আমি স্বার্থপর হতে চাই না। আমি তোকে যা আদর ভালোবাসা দিয়েছি তার বিনিময়ে আমি তোর থেকে কোনো কিছুর দাবি রাখতে চাই না। আমি শুধু চাই তুই যেন ভালো থাকতে পারিস।”

নিধি তড়িঘড়ি করে নিজের চোখের জল মুছে বলল,

“আর আমি একা ভালো থাকতে পারব না বাবা। আমার জীবনের লক্ষ্যই ছিল তোমাদেরকে ভালো রাখা। এখন সেই সাথে নতুন একটা লক্ষ্য যুক্ত হয়েছে। গহনকে ভালো রাখা। তোমরা সবাই যদি ভালো না থাকো আমি ভালো থাকতে পারব না। আমি আর গহন খুব সুখে আছি বাবা, খুব সুখে আছি। আমাদের সংসারে কোনো অশান্তি নেই। কিন্তু এবার যে আমাকে তোমাদেরকেও ভালো রাখতে হবে। নইলে সারা জীবনই একটা অশান্তি নিয়ে আমায় বেঁচে থাকতে হবে।”

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প