বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৮২

🟢

এক মাস হতে চলল জারা-আবিদের সংসারের। জুবাইদা তার ছোট মেয়েকে নিয়ে আবার বিদেশ চলে গেছেন। ওখানেই তাদের স্থায়ী বাস। শুধু জারা থেকে গেছে। তার যাওয়ার কোনো ইচ্ছেও নেই। আর না যেতে পারার আফসোস রয়েছে।

নিজের ব্যবসার সূত্রে আবিদ আগে এই শহরে একাই থাকতো। পরিবার থাকত অন্য জায়গায়। বিয়ের পরে জারা একটা বেশ ফাঁকা সংসারই পেয়েছে। দুজন মাত্র মানুষ। ও আর আবিদ। তবে আজ এক সপ্তাহ হলো জারার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছে। ওর শ্বশুর, শাশুড়ি, ফুফু শাশুড়ি, খালা শাশুড়ি, দুই ননদ, তাদের ছেলেমেয়ে সবাই এসেছে। আবিদ ভাই-বোনের মাঝে ছোট। ওর দুই বোন বড়। দুজনের বিয়ে হয়ে বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে। আজ রাতে নাকি আবার তাদের জামাইরাও আসবে।

এত বেশি মানুষজনের আনাগোনায় জারার এলার্জি। যত বেশি মানুষ হবে তত বেশি মত পার্থক্য হবে। ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা হবে তাদের। যাদের অধিকাংশের সাথে জারার মানসিকতা কিংবা মতামত কোনটাই মেলে না। এখানেও তার বিপরীত কিছু হলো না।

জারার বয়স বেশি। বত্রিশ পেরিয়ে গেছে। বলা যায় জারা আর আবিদ সমবয়সী। এই নিয়ে আবিদের পরিবারের ছিল ঘোর আপত্তি। মেয়ে শিক্ষিত হোক, সুন্দরী হোক কিংবা যতই বড়লোক পরিবারের হোক না কেন। তবুও এত বয়সী মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে মেনে নেওয়া যায় না। তবে আবিদের জেদের কাছে শেষমেষ তাদেরকে হার মানতে হয়েছিল। কেননা নিজেদের ছেলের স্বভাব সম্পর্কে তারা বেশ ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। না মানলে পরিবারের অমতে গিয়েই বিয়ে করত।

আবিদের চাপে পড়ে বিয়েটা মেনে নিলেও এখনো তাদের মনে কিছুটা তিক্ততা যেন রয়েই গেছে জারার প্রতি। জারা এখন বুঝতে পারে কেন নিধি মাঝে মাঝে মানিয়ে নিতো। কেন চুপচাপ সব সহ্য করত। অশান্তির ভয়ে। নিজের মানসিক শান্তির জন্য। জারাও এসব ভেবে চুপ থাকে।

তবে যখন কেউ ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রবেশ করে, অপমানজনক কথা বলে তখনই জারার মাথাটা গরম হয়ে যায়।

আজ সকাল থেকে রান্নার কাজে লেগেছে। ওকে সাহায্য করার জন্য লোক আছে। তবে রান্নার পুরো দায়িত্বটা জারাকেই পালন করতে হবে। কেননা ওর শাশুড়ির আদেশ বিয়ের পর প্রথম দুই জামাই এই বাড়িতে আসবে। ওদের সমস্ত আপ্যায়নের ব্যবস্থা তাই জারাকেই করতে হবে।

জারার রান্না করতে অসুবিধা নেই। রান্নাবান্না সে বেশ ভালো পারে। তবে সমস্যা হলো ডাল, মাছ, মাংস, তরকারি এই খাবারগুলো রান্না করতে অভ্যস্ত নয়। মোট কথা সে বাংলাদেশি খাবার রান্না করার অভ্যাস নেই। বিদেশি খাবার-দাবার রান্না করতে অভ্যস্ত সে। তবে তাও চেষ্টা করছে।

এই অত্যাচার গুলো তবুও ঠিক ছিল। এগুলোকে আসলে অত্যাচার বলাও চলে না হয়তো। সভ্য সমাজের কেউ এই বিষয়গুলোকে অত্যাচার হিসেবে গণ্য করবে না। তবে সমস্যাটা তখন হয় যখন কথায় কথায় এরা এসে জারা কে নিজের বয়স মনে করিয়ে দিয়ে বলে তাড়াতাড়ি যেন বাচ্চা নেয়।

এই ব্যাপারটা যে জারার ঠিক কতটা নোংরা লাগে সেটা বলে বোঝাতে পারবে না। বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ ওর আর আবিদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত, তাই না? ওরা যখন মনে করবে যে ওরা এখন বাবা মা হওয়ার জন্য উপযুক্ত তখন এই সিদ্ধান্তে আসবে। তবে বাদ বাকি মানুষ এসব বিষয়ে কেন কথা বলবে?

দুপুরে রান্না বান্নার মাঝেও সেই একই কাজটা হলো। শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা সমস্ত মহিলা এসে জারা কে একই পরামর্শ দিল। একপর্যায়ে জারার যখন ধৈর্যে কুলালো না তখন ভাবল কিছু একটা বলা দরকার। রেগেমেগে কিছু বলল না। শান্ত ভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করল সবাইকে।

“এটাতো আমার আর আবিদের ব্যক্তিগত ব্যাপার হওয়া উচিত, তাই না? আপনারা কেন বারবার এই নিয়ে কথা বলছেন? আপনাদের অস্বস্তি না হলেও এই সেনসিটিভ টপিকে আলোচনা করতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আর তাছাড়া আমার বয়স যে বেশি সেটা জেনেই আবিদ বিয়ে করেছেন আমায়।”

বরাবর জারা চুপ থেকে এসেছে। তাই হঠাৎ করে ওর মুখ থেকে এতগুলো কথা ঠিক সহ্য হলো না কারোরই। কথা শোনানোর সুযোগ ছাড়লেন না। বেয়াদব বলেও আখ্যায়িত করলেন এভাবে মুখে মুখে তর্ক করার জন্য। সেই সাথে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যক্তিগত বিষয় বলার জন্যও কথা শুনতে হলো। জারা সহ্য করল সবটা চুপচাপ। ওরা যখন জারা কে কথা শুনিয়ে সেখান থেকে চলে গেল তখন জারা গেল সোজা নিজের ঘরে।

আবিদ আজ অফিসে যায়নি। গত এক সপ্তাহ ধরে যতটা সম্ভব বাড়িতে থাকারই চেষ্টা করছে। কেননা আবিদ বুঝতে পারছে যে যখন যে দিক থেকে পারছে জারা কে খোঁচাচ্ছে।

এমন সময় জারা এলো ঘরে। ঘরে ঢুকেই ঠাস করে আগে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বিছানার উপরে বসা আবিদের দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,

“আমাকে বিয়ে করার আগে কি আপনি আপনার বাড়ির লোকজনদেরকে বলেননি যে আমার বয়স কত?”

ল্যাপটপের উপর থেকে চোখ তুলে জারার দিকে তাকিয়ে আবিদ একটু মনে করার ভঙ্গিতে বলল,

“হ্যাঁ বলেছিলাম তো। কিন্তু কি হয়েছে? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন উঠলো?”

“প্রশ্ন উঠছে তার কারণ আপনার বাড়ির লোকজন কথায় কথায় এই প্রসঙ্গটাই টেনে তোলে। দেখুন আবিদ, বত্রিশ বছরে এসে বিয়ে করার পেছনে কোন বিশেষ কারণ ছিল না। এমন নয় যে আমার কোন শারীরিক ত্রুটি ছিল কিংবা মানসিকভাবে আমি বিকারগ্রস্ত ছিলাম জন্য বিয়ে হচ্ছিল না। মোটকথা আমার কোন খুঁতের জন্য আমি দেরিতে বিয়ে করিনি। আমার জীবনে মোটিভ কখনই শুধুমাত্র বিয়ে করে সংসার করা ছিল না, আবিদ। মাস্টার্স কমপ্লিট করে পিএইচডি করেছি আমি, তাও স্কলারশিপে। পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল আমার। তারপরও জীবনে এগোতে পারছিলাম না কেন সেই কারণটা আপনি জানেন। আমার জীবনের এমন কোন কথা নেই যেগুলো আপনি জানেন না। তাহলে কেন আপনার বাড়ির লোকজন বারবার প্রত্যেকটা পদক্ষেপে আমায় মনে করিয়ে দেয় যে আমার বয়স বেশি, এই বয়সে আপনি বিয়ে করে যেন আমায় দয়া করেছেন?”

বিরক্তিতে নাক মুখ কোঁচকালো আবিদ। সেই সাথে রাগও হলো। আসলেও যেন মেয়ে মানুষ মানে ঝামেলা। এরা অন্যের সংসারে অশান্তি তৈরি করে পরে আবার নিজের সংসারে অশান্তির জন্য অন্যদের দায়ী করে। মানে প্রত্যেকটা জায়গায় সংসারের অশান্তি গুলো যেন শুধু মেয়ে মানুষরাই তৈরি করে।

ল্যাপটপটা সামনে থেকে সরিয়ে জারা কে নিজের পাশে বসালো। জারা অবিবেচক না। অল্পতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলার মত মেয়েও নয়।

জারা সবেমাত্র তখন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। শরীরে এখনো ঘাম রয়ে গেছে। আবিদের কাছে কোন রুমাল নেই। তাই জারার ওড়না দিয়েই ওর কপাল, গলার ঘাম মুছে দেল। এতেই যেন জারার রাগ অনেকটা কমলো। জারা খেয়াল করেছে আজকাল আবিদের সামান্য একটু যত্নেই জারা শীতল হয়ে যায়। হয়তো এটাই ভালোবাসা!

“আমি গতকাল রাতেও এই নিয়ে ওদের সাথে কথা বলেছি। আসলে আমি বুঝি না মানুষের কানে কথা কেন ঢোকে না।”

জারা ঘুরে বসল আবিদের দিকে। শীতল চাহনি নিক্ষেপ করে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“আপনি জানেন আমার মতন মেয়ের পক্ষে এই ধরনের কথাগুলো সহ্য করা ঠিক কতটা কঠিন। আমি প্রচন্ড আত্মসম্মানী মেয়ে। আমি চাইলে ওনাদেরকে অনেক কিছুই বলতে পারতাম। কিন্তু বলিনি। তার কারণ ওনারা আপনার বাড়ির লোক। আমি চাইনা ওনাদের অসম্মান করতে। আমি চাই না আপনাকে কষ্ট দিতে। তার মানে কি এটা যে ওরা আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলে যাবে? ওরা আমার আত্মসম্মানে প্রচন্ড আঘাত করছে, আবিদ।”

আবিদ আলতো করে জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“আসলে আপনাকে বিয়ে করার পর থেকে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি তো সেজন্য কেউ আর আবিদ কে দেখে ভয় করছে না। পুরনো আবিদকে ফিরিয়ে আনতে হবে। পুরনো আবিদ ছাড়া ওদেরকে কেউ সোজা করতে পারবে না।”

“যা ইচ্ছে করুন। কিন্তু ওদের এই খোঁচাখুঁচি বন্ধ করুন। আমার ভালো লাগেনা। আমি শান্তির জন্য আপনার সংসারে এসেছি। এখানে এসেও যদি সেই অশান্তির মাঝেই থাকি, তাহলে আমি আর কোথায় যাবো! আমি তো শেষ শান্তির ঠিকানা হিসেবে আপনাকে বেছে নিয়েছি। আমার শান্তির ব্যবস্থা করুন আপনি।”

__________

নিধির প্রেগন্যান্সির পাঁচ মাস চলছে। আজ গিয়েছিল ডাক্তার দেখাতে। ফেরার পথে হঠাৎ করে নিধির চোখে পড়ল একটা ফুচকার স্টল। তাড়াহুড়ো গলায় নিধি গাড়ি থামাতে বলল। গহন সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি আবার? হসপিটালে যাব?”

“আরে ধুর। সবসময় কানের কাছে হসপিটাল হসপিটাল নামটা যপবেন না। দেখুন ফুচকা। চলুন খাই।”

গহন নিধির কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“একদম না। এইসব খুবই অস্বাস্থ্যকর খাবার। এমনিতেই তোমার শরীর খারাপ। এখন এসব খাওয়া যাবে না। অন্য কিছু খাও।”

নিধি গহনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে জেদ দেখিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

“না। আমি অন্য কিছু খাব না, ফুচকাই খাব। খাওয়ালে ফুচকাই খাওয়াবেন। নয়ত আর কিচ্ছু খাওয়ানোর কথা মুখে আনবেনও না। বাড়ি নিয়ে যাবেন তো না খাইয়ে? বেশ চলুন। বাড়িতে গিয়ে আমি কিছু মুখে তুলবো না। ওষুধও খাব না। যা হয়ে যায় হোক। তবুও কিছু খাব না যদি আপনি ফুচকা না খাওয়াচ্ছেন।”

গহন কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ নিধির দিকে। আজকাল মেয়েটার জেদ বড্ড বেড়েছে। একটা বিষয় যদি মুখ দিয়ে বের করে তবে সেই ইচ্ছে পূরণ করতেই হয়। এখন সেটা যদি মেয়েটার শরীর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ হয় তাও গহনকে পূরণ করতেই হয় বাধ্য হয়ে। নয়তো মন খারাপ করে বসে থাকে। গহন তো নিধির মন খারাপ সহ্য করতে পারে না। সেজন্য বাধ্য হয়ে ফুচকা খাওয়ালো। এখন মেয়েটার মন মেজাজ বেশ ফুরফুরে হয়েছে।

বাড়ির সামনে আসতেই গহন দেখল পিয়াল গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকদিন পর পিয়াল কে দেখল গহন। মাঝে তো ফোনে কথাবার্তাও হয়নি অনেক মাস।

গাড়ি থেকে নেমে পিয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে সর্বপ্রথম আগে গহন কৌতূহল বসত জিজ্ঞেস করল,

“পিয়াল, তুমি হঠাৎ এখানে? কোন দরকার ছিল ?”

পিয়াল আগেই গহনের প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। আগে শুভকামনা জানালো। নিধির সাথেও টুকটাক কথা হলো।

“ভিতরে নিয়ে যাবে না নাকি? দরজা থেকে বিদায় করে দেবে? আমি তো ভেবেছিলাম তোমার বোনের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও আমার তোমার সাথে সম্পর্ক থাকবে। নাকি তুমি সম্পর্কটা শেষ করতে চাইছো?”

গহন একটু হেসে উঠে বলল,

“আরে না। তেমন ব্যাপার না। তোমার সাথে তো আমার সম্পর্ক অনেক আগের। আর যেখানে আমি জানি সম্পর্কটা নষ্টের পেছনে দোষটা আমার বোনেরই সেখানে তোমার আমার সম্পর্ক নষ্ট করার কোন মানে আসে না। ভিতরে চলো।”

____________

“আমি আবার বিয়ে করছি গহন!”

গহন চমকে উঠল পিয়ালের কথাটা শুনে। নিধি তখন রান্নাঘরে পিয়ালের জন্য নাস্তা সাজাচ্ছে। কথাটা ওর কানেও গেল। থমকালো নিধি। মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো শম্পার মুখটা। নিধির খারাপ লাগলো কিনা জানেনা। তবে কষ্ট পেল হয়ত। একটু অস্বস্তিও হলো।

কথাটা পিয়ালের বলতেও হয়ত অস্বস্তি হয়েছে। তবুও বলেছে। গহনের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সেই অস্বস্তিটা যেন আরো বাড়লো।

“তুমি খুশি হওনি সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। খুশি না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবুও কেন যে তোমাকে জানাতে এসেছি জানিনা।”

ধ্যান ভাঙল গহনের। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“তেমন কোন ব্যাপার না। আসলে হঠাৎ করে শুনে একটু মানে বুঝতেই পারছ শম্পা তো আমার বোন। খারাপ লাগবে এটাই স্বাভাবিক।”

“ঠিক বলেছো। এত বছরের সংসার ছিল। ভেঙেছে কয়েক মাস হলো। আবার আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। হয়তো আমাকে খারাপ ভাবছো, তাই না?”

“না। খারাপ কেন ভাবতে যাব? একটা ভালো সংসার, একজন ভালো জীবনসঙ্গী তোমারও প্রাপ্য। আমি বুঝি পিয়াল একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর একজন মানুষের ভালো থাকার জন্য কেবল একজন ভালো জীবনসঙ্গী প্রয়োজন। আচ্ছা যাই হোক, কবে বিয়ে করছো?”

“করব। এখনো দিন তারিখ ঠিক করা হয়নি। কোন অনুষ্ঠান হবে না। পারিবারিকভাবে বিয়ে হবে। আমার খালার মেয়ে। জানো ওকে বিয়ে করার কারণ কি? ওর একটা ছেলে আছে। ওর এক্স হাজব্যান্ড ভালো ছিল না। মা র ধর করত। যৌতুকের জন্য সব সময় চাপ দিত। কিন্তু মেয়েটা ভালো। চার বছর সহ্য করার পর আর পারেনি। চলে এসেছে। অনেকটা আমার মতন, তাই না? ও স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সংসার ভেঙেছে। আমি বউয়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সংসার ভেঙেছি। আমার তাই মনে হলো আমরা দুজনেই বোধহয় একজন ভালো জীবনসঙ্গীর কতটা প্রয়োজন সেটা বুঝব। আমরা আর একে অপরের জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াব না। তাই ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

“তোমার ছেলে মেয়ে যদি কখনো তোমার কাছে যেতে চায়?”

এই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার জন্য পিয়ালকে এক মুহূর্ত ভাবতে হলো না।

“বিনা বাক্য ব্যয়ে নিয়ে আসব ওদেরকে আমার কাছে। আরেকটু বড় হলে আমি আইনি ভাবেই ওদের কে আমার কাছে রাখার চেষ্টা করব। আমিও তো ওর ছেলেকে মেনে নিচ্ছি। ওকে আমি আগেই বলেছি আমার ছেলে মেয়েকেও ওকে মেনে নিতে হবে।”

“আর যদি না মানে?”

পিয়াল এবার খানিকটা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আগেই ভয় দেখিও না। বিয়েটা তো করতে তো দাও আগে। সবাই তোমার বোনের মতন নাও হতে পারে কিন্তু গহন।”

গহন এবারে কেন যেন হাসতে পারল না। বোধহয় একটু স্বার্থপর হয়ে উঠল মনটা।

“এভাবে বলে না পিয়াল। আমার বোন তো। কষ্ট লাগে। যাই হোক তোমার নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল। আমার বোনের জন্যও দোয়া করে যেন ও জীবনে ভালো থাকতে পারে।”

আরো টুকটাক কথাবার্তার পর নাস্তা করে বেরিয়ে গেল পিয়াল। গহন তখনো সোফায় বসে। নিধি এসে পাশে বসল। গহনের কাঁধের উপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,

“ধরুন কখনো আমার কিছু হয়ে গেল। আমি থাকলাম না। কয়েক মাসের ব্যবধানে আমাদের সংসারের স্মৃতি, আমার স্মৃতি ভুলে গিয়ে আপনিও কি নতুন করে জীবনটা শুরু করবেন আবার, গহন?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল গহন। বুঝতে পারছে নিধি কেন এই প্রশ্নটা করল। নিধিকে আগলে নিল এক হাতে। আদুরে গলায় বলল,

“শম্পা পিয়ালের জীবনে এমন কোন মুহূর্ত তৈরি করতে পারেনি যা সারা জীবন কোন সুখময় স্মৃতি হয়ে পিয়ালের মস্তিষ্কে রয়ে যাবে। ওদের সংসারটা একটা যুদ্ধ ক্ষেত্র ছিল। যে যুদ্ধক্ষেত্রে পিয়াল একাই জয়ের চেষ্টা করেছে। অথচ সঙ্গী শম্পার কোন অবদান ছিল না সেখানে। এত তাড়াতাড়ি পিয়াল আবার নতুন জীবনে পা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তোমার হয়তো একটু অদ্ভুত লাগছে। আমারও লেগেছিল শুরুতে। তবে আমি এখন ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছি।”

নিধি মাথা তুলে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“সত্যি কি এটা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার মতন ব্যাপার? আমি জানি আপনার বোনের সাথে সংসার করা কঠিন। আমি ওনার নতুন করে সংসার শুরু করার ব্যাপারে আপত্তিও করছি না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আবার নতুন জীবনে পা কিভাবে রাখছেন? আমার কেমন যেন লাগছে, গহন। মনে হচ্ছে পুরুষ মানুষের জন্য এসব খুব সহজ।”

“হয়তো সহজ। তবে যেসব পুরুষের জীবনে তোমার মত জীবন সঙ্গী আছে তাদের জন্য মোটেও সহজ না, নিধি। এক কথায় অসম্ভব। যে তোমায় হাসতে শিখিয়েছে, যে তোমায় বাঁচতে শিখিয়েছে, যে তোমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছে তাকে ভোলা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। হয়তো কিছু মানুষ ব্যতিক্রম হয়। বাস্তবতার চাপে পড়ে কিংবা জীবনে প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে। তবে সবাই এমন হয় না। তুমি তো আমার জীবনের সেই অংশ যে অংশের বিলীন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে। তোমাকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়। অসম্ভব আমার পক্ষে।”

আর কোন কথা বলল না নিধি। চুপচাপ গহনের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে রাখলো। গহনও চুপচাপ হাত বুলিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প