“খু ন কেন করতে গেলে? ডিভোর্স দিতে পারতে। তোমার ছেলেকে নিয়ে আলাদা কোথাও থাকতে পারতে।”
নিধির কথাগুলো শুনে ঋতুর মাঝে কোন উদ্বেগ দেখা গেল না। কোলে থাকা ওর ছেলে ক্ষুধায় কাঁদছে। ছেলেটাকে থামানোর চেষ্টা করছে ঋতু। এখানে খাবারের ব্যবস্থাও করা সম্ভব না। তবে অবুঝ ছেলেটা সেসব বুঝছেনা। সেজন্য কেঁদেই যাচ্ছে।
ঋতুর থেকে কোন উত্তর না পেয়ে নিধি এবারে ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো আমি। তোমার ছেলের কি হবে এখন সেটা ভেবেছো?”
ঋতু এবারে তাকাল নিধির দিকে। অভিব্যক্তি তার বেশ স্বাভাবিক। তবে কন্ঠ একটু গম্ভীর শোনাল।
“আমার ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ওকে খু ন করেছি। এখন ও ছোট। দুদিন পর যখন বড় হবে ধীরে ধীরে ওর বাপের ছোঁয়া লাগত। ও তো দেখত নিজের চোখে ওর বাপ কি করে বেড়াচ্ছে। দুদিন পরে ও সেই একই পথে হাঁটত। সেজন্য ওর বাপকেই মে রে দিয়েছি।”
“এটা কোন সমাধান হলো? তুমি দূরে চলে যেতে পারতে।”
“পারতাম না। বাপের বাড়িতে তুলত না। মা বাবা আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছিল যে সংসার ছেড়ে বেরোল ওরা কখনো আমায় নিজেদের ঘরে তুলবে না। ছেলেকে নিয়ে কোথায় যেতাম? আমার ঘরে এক সাবিত। আর এই সমাজে আরো হাজারটা সাবিত রয়েছে। বাঁচতে দিতো আমায়?”
নিধি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এবার। গহন তো সেই যে আসার পর চুপচাপ বসেছে না বসেছে একটা শব্দ বেরোয়নি ওর মুখ দিয়ে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সালমা বেগম গেছেন ওনার বোনের বাড়ি। দুই মেয়ে ওনার সঙ্গে গেছে। এখনো উনি এই খবরটা জানেনই না। সাবিত ওনার ভীষণ আদরের। এই খবরটা উনি জানলে যে কেমন আচরণ করবে, ওনাকে যে কি করে সামলাবে সে ব্যাপারে গহনের কিচ্ছু জানা নেই। এদিকে ঋতুকেও গালাগালি করতে পারছে না। সে স্বভাবই নেই গহনের। এতগুলো বছর যাবত কোন পরিস্থিতির মাঝে ঋতু সংসার করেছে সেসব তো জানে। কিন্তু তাই বলে খু ন করাটা সমাধান না। কিন্তু ঋতুর যা মানসিক অবস্থা বর্তমানে তাতে ওকে এসব বোঝানো মুশকিল।
নিধি আর কথা বলার সুযোগ পেল না ঋতুর সাথে। একজন লেডি কনস্টেবল এলো ঋতুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নিধি জানে না কেন ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। অবশ্যই সাবিত ম রা র শোকে না। কষ্ট লাগছে ঋতু আর ওর বাচ্চাটাকে দেখে। ঋতু ভীষণই নরম স্বভাবের। সহজ সরল বলা যায়। একটু বোকাও। ভীষণ ধৈর্য ছিল সাবিত আর সংসারের ব্যাপারে। নিধি শুধু এটা ভেবেই অবাক হচ্ছে যে এই কয় দিনে সাবিত না জানি আরো কত অন্যায় করেছে যার জন্য ঋতুর মতন মেয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।
কনস্টেবল এর সাথে যাওয়ার আগে ঋতু নিজের ছেলেকে একবার প্রাণ ভরে দেখে নিল। ছেলেটা এখনো কাঁদছে। সালারের ক্রন্দনরত গালে মুখে অজস্র চুমু খেল। চুমু খেতে খেতে নিজেও এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলল। ঋতুর হাত দুটোয় এখনো র ক্তে র ছিঁটে ফোঁটা দেখা যাচ্ছে। সেই হাত দিয়েই নিধির হাতটা খামচে ধরে বলল,
“তোমাদের জীবনে আমার ছেলেটাকে একটা বোঝা হিসেবে দিয়ে গেলাম। তোমাদের দায়িত্ব একটু বেড়ে গেল, নিধি। তোমার মেয়েটার সাথে আমার ছেলেটাকে একটু বড় করো। ওকে কখনো নিজের বাবা-মার পরিচয় জানতে দেবে না। বলবে তুমি আর ভাইয়া ওর মা-বাবা। একদম ভাইয়ার মতন করে ওকে মানুষ করবে। ওর শরীরে যতই ওই জানোয়ারের র ক্ত থাকুক না কেন। তবুও ওর শিক্ষায় যেন শুধুমাত্র ভাইয়ার বৈশিষ্ট্য থাকে। যদি কখনো এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পেরেছ ওর শরীরে থাকা নোংরা র ক্তে র বৈশিষ্ট্য ওর মাঝে দেখা যাচ্ছে কোন কিছু না ভেবে সেই মুহূর্তে ওকে গলা টিপে মে রে ফেলবে। আমি ওর মা হয়ে তোমাকে এই অধিকার দিয়ে গেলাম। তবুও যেন ও কোন মেয়ের জীবন নষ্টের কারণ না হতে পারে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিধি এবারে কেঁদে ফেলল। ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“কেন করতে গেলে এমনটা! আমাদের কাছে চলে এলেও তো পারতে। গহন কি ফিরিয়ে দিত তোমাদের? আমি কি রাখতাম না? কোন না কোন একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হয়ে যেত।”
ঋতু আলতো হেসে বলল,
“কষ্ট পাচ্ছো কেন? পৃথিবী থেকে একটা আবর্জনা দূর করেছি আমি। না জানি কত মেয়ের জীবন নষ্ট করত। ওর থাকার থেকে না থাকাই ভালো। বাড়িতে ওর মা ছিল না। নয়ত ওনার সাথেও একই কাজটা করার ইচ্ছে ছিল আমার। এই একটা আফসোসই থেকে গেল আমার। যদি ওনাকেও একটা ভয়ানক মৃ ত্যু উপহার দিতে পারতাম আমি শান্তি পেতাম। সাবিত তো আর নিজে নিজে এমন তৈরি হয়নি। ওকে তৈরি করা হয়েছে। সাবিত কে যেভাবে ছু রি দিয়ে কো পা তে কো পা তে
মে রে ছি ওনাকেও সেভাবে মা র লে আমি শান্তি পেতাম।”
নিধি ভয় পেয়ে খানিকটা দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“এভাবে কথা বলছো কেন? তুমি তো এমন ছিলে না। আবার মা র লে তো মা র লে, পালাতে পারলে না? থানায় কেন এলে? এখন তো তোমার শাস্তি হবে।”
“আমি চাই আমার শাস্তি হোক। আমি নিজেও প্রশ্রয় দিয়েছি ওকে। সবকিছু জেনে তারপরও জোর করে বিয়ে করেছি। এত বছর সবকিছু জানা সত্ত্বেও সংসার করেছি ওর সাথে। তাই শাস্তি আমারও প্রাপ্য। আমারও অনেক দোষ আছে। আমার যদি এখন ফাঁসিও হয়ে যায় তবুও আমার আফসোস থাকবে না। মনে হবে একটা জানোয়ারকে পৃথিবী থেকে বিদায় করতে পেরেছি। এই পৃথিবীর মেয়েগুলো অন্তত একটা সাবিতের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।”
____________
আট বছর পর……
ঘড়িতে সকাল ছয়টার অ্যালার্ম দেওয়া। ঘড়িটা রাখা গহনের পাশে। অ্যালার্মের শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গহনের ঘুমটা ভেঙে গেল। তাড়াহুড়ো করে অ্যালার্মটা আগে বন্ধ করল। একবার উঁকি দিয়ে দেখল যে নিধির ঘুম ভেঙেছে কিনা। ভাঙেনি ঘুম। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে তাকাল ওদের দুজনের মাঝখানে ঘুমোনো চার বছরের জমজ ছেলে মেয়ে সামির আর সিমির দিকে। যাক কারোরই ঘুম ভাঙেনি। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে গহন ধীরে ধীরে নেমে গেল বিছানা থেকে। ফ্রেশ হয়ে ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই দেখল নিধি বসে আছে বিছানার উপর।
“নিষেধ করেছিনা তোমায় এত সকালে উঠতে। যাও ঘুমোও।”
নিধি ঘুম ঘুম চোখে গহনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার অফিস আছে, সালার আর নম্রতার স্কুল আছে। এই দুটো কিছুক্ষণ পর উঠে ভ্যাঁ ভ্যাঁ শুরু করে দেবে। তার আগে আমায় রান্নাবান্না শেষ করতে হবে। আমার কি আর ঘুমোনোর উপায় আছে!”
“রান্নার জন্য তো লোক আছে।”
“ওনার রান্না সালার আর আপনি খেতে পারেননা। আপনাদের জন্য আমায় আলাদা করে রান্না করতে হয়। আপনি তবুও খেতে পারেন। কিন্তু ছেলেটা আমার খেতে পারে না। কোন অভিযোগও করে না। ওর জন্য রান্না করতেই হয় আমায়। যাইহোক তাড়াতাড়ি গিয়ে নাস্তা বানাই। নয়ত এই দুটো যেকোনো সময় উঠে যাবে।”
নিধি নিজের কথাটা শেষ করল কি করল না তার আগেই ওর কানে ভেসে এলো মেয়ের কান্নার কণ্ঠস্বর। গহন তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে মেয়েকে কোলে নিল। চেষ্টা একটাই যেন মেয়ের কান্নার শব্দে ছেলে না জেগে যায়। তবে শেষ রক্ষা হলো না। দুজনেই উঠে গেল। এবং ঘুম ভাঙার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল দুজনের আড়াআড়ি। কে আগে আব্বুর কোলে উঠবে সেই নিয়ে যুদ্ধ। গহন শেষে বাধ্য হয়ে দুই ছেলে মেয়েকে একসঙ্গে কোলে নিল। নিধি এসবের মাঝে নেই। গহনের দায়িত্বে ছেলেমেয়েকে রেখে ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নাস্তা বানানো শেষে নিধি গেল নম্রতার ঘরে। নম্রতাকে ঘুম থেকে তুলে এবারে এলো সালারের ঘরে।
নিধির সালার কে ঘুম থেকে টেনে তোলার সুযোগ হয় না। ছেলেটা প্রতিদিন আগে আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। নিধি যখন ওর ঘরে আসে তখন দেখে ছেলেটা স্কুল ব্যাগ গোছাচ্ছে। আজও ঠিক তাই হলো। নিধি কে দেখে ছেলেটা একগাল হাসল। নিধিও পাল্টা হেসে ভিতরে এলো।
“তুমি প্রতিদিন ঠিক সময় কি করে ঘুম থেকে জেগে যাও বলোতো, বাবা? আম্মুকে একদিনও ডেকে তোলার সুযোগই দাও না।”
“আমি তো অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমোই, আম্মু।”
“নম্রতাও তো অ্যালার্ম দিয়েই ঘুমোয়। কিন্তু তাও দেখো ওকে ডেকে তুলতে আমার কত কষ্ট করতে হয়। কিন্তু আমার বাবাটা আমাকে দিয়ে একটুও কষ্ট করায় না।”
কথাটা বলে সালারের কপালে একটা চুমু খেয়ে ওকে নাস্তার জন্য আসতে বলে নিধি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে সালার ওর হাত টেনে ধরল। নিধি থামতেই সালার ইশারায় ওকে একটু নিচু হতে বলল৷ নিধি নিচু হতেই সালার ওর কপালে হাত রাখল। গত দুদিন নিধির বেশ জ্বর ছিল। গতকাল রাত থেকে একটু কমেছে। এখন আর একদমই নেই।
“আম্মু, জ্বর তো আর নেই। তুমি সুস্থ হয়ে গেছো।”
ছেলের কথা শুনে নিধি আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ বাবা, সুস্থ হয়ে গেছি। তুমি খেতে এসো।”
___________
নিধির চার ছেলে-মেয়েই মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে খুবই পছন্দ করে। তাদের জন্য গতকাল রাতে একটু পায়েস রান্না করেছিল। সালার বাদে সবাই খেয়েছিল। নিধি সালারের অংশের পায়েস টুকু ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। সকালে নাস্তার সময় সালার কে সেটা দিল। সালারের পাশের চেয়ারে বসা নম্রতা সেই পায়েসটা দেখে আবদার করল,
“আম্মু, আমাকে দাও না। শুধু ভাইয়াকে দিলে যে?”
“তোমারটা তো তুমি রাতে খেয়ে নিয়েছিলে, মা। অল্প করে রান্না করেছিলাম। আবার অন্য কোনদিন রান্না করে দেব। ভাইয়া খাক।”
নম্রতা কিছু বলল না। শুধু মুখটা গোমড়া করে বসে রইল। তা দেখে সালার পায়েসের বাটিটা নম্রতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি খাও, নম্রতা। আমি খাব না।”
নম্রতা সঙ্গে সঙ্গে একগাল হাসল। একবারের জন্যও আপত্তি জানাল না। তবে ব্যাপারটা নিধির মোটেই পছন্দ হলো না। সে পায়েসের বাটিটা নিয়ে আবারো সালারের সামনে রেখে বলল,
“সালার, এটা তুমি খাও। নম্রতা দেখো, ভাইয়া তো ঝাল তরকারি গুলো খেতে পারবে না। তাই ভাইয়া পায়েসটা খাক। তুমি অন্য কিছু খাও।”
নিধি বলল ঠিকই তবে সালার রাজি হলো না একা একা খেতে। যেহেতু বোন বলেছে, তখন কি করে আর একা একা খায়! শেষে অর্ধেক অর্ধেক করে খেল দুজনে। নিধি চুপচাপ সেখানে চিন্তিত মুখ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
“ওরা নিজেরা যদি ভাগ করে খেতে চায় তুমি কেন এত চিন্তা করছো, নিধি?”
হঠাৎ করে গহনের কন্ঠটা পেতে খানিকটা চমকে উঠল নিধি। মুহূর্তের মাঝে আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে খুব গভীর কোন ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে বলল,
“আমার খুব ভয় করে, গহন। অন্যের ছেলের দায়িত্ব নেওয়া খুব কঠিন। ভয় করে আমি না ওর সাথে কোন অন্যায় করে বসি। ওর ভাগের প্রত্যেকটা জিনিস আমি ওকে গুছিয়ে দিতে চাই সব সময়। আমি চাই না আমার ছেলে মেয়ে ওর থেকে কোন কিছু কেড়ে নিক।”
“কেউ কিছু কেড়ে নেয় না। তোমার এত ভয় পাওয়ারও প্রয়োজন নেই। তুমি খুব ভালো একজন মা। আর এটা সবাই জানে যে তুমি বাকিদের থেকে সালার কে বেশি ভালোবাসো। তাই চিন্তা করো না। তুমি আমার মায়ের মতন না। তুমি আলাদা।”
“সত্যি বলছেন তো! আমি আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি তো? আমার মাঝে আবার আপনার সৎ মাকে দেখা যায় না তো? আমি ওনার মতন হতে চাই না, গহন। আমি সালার কে সত্যি খুব ভালোবাসি। বিশ্বাস করুন আমি ওকে মন থেকে ভালোবাসি। আমার তো এই কথাটা মনেও থাকে না যে ও আমার নিজের ছেলে না।”
গহন আবারও নিধিকে আশ্বস্ত করে বলল,
“তুমি নিজের দায়িত্ব একেবারে ঠিকঠাক ভাবে পালন করো। তুমি যেমন একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী, একজন দায়িত্বশীল মেয়ে, ঠিক তেমনি একজন দায়িত্বশীল মা। একটা পিচ্চি মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলাম। দেখতে দেখতে তার সাথে আজ প্রায় দশটা বছর কাটিয়ে ফেললাম। আমি চোখের সামনে সেই পিচ্চি মেয়েটাকে বড় হতে দেখেছি। একসময় যার দায়িত্ব আমায় নিতে হয়েছিল এখন সে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে একা হাতে আমাদের চার বাচ্চা আর তোমায় মানুষ করতে হবে। তবে যা বুঝলাম আমার স্ত্রী এতটাই দায়িত্বশীল যে আমাকে সংসারের দিকে নজরই দিতে হয় না।”
আলতো হাসল নিধি। এতক্ষণে যেন নিশ্চিত হলো যে ও নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে। মনে যত দ্বিধাদ্বন্দই সৃষ্টি হোক না কেন একবার যদি গহন একটুা বোঝায় তবে সবটা বুঝে যায়। কেন যেন এই মানুষটাকে ছাড়া নিধির সবকিছুই জটিল লাগে। পুরো জীবনটাই অমীমাংসিত মনে হয়। যদি মানুষটা একবার শুধু হেসে একটু কথা বলে নিধির মনে হয় পুরো দুনিয়া জয় করতে পারবে। কোন কাজই আর তখন নিধির জন্য কঠিন থাকে না। কি অদ্ভুত তাই না!
গহন খেতে বসল। গহনের দুপাশের চেয়ারে ওর দুই মেয়ে বসে। ওরা দুজন ব্যতীত আর কারো ক্ষমতা নেই সেখানে বসার।
নিধি গেছে রান্না ঘরে চা বানাতে। গহন নিজের প্লেটে খাবার বেড়ে নিতে ধরলে নম্রতা ওকে বাঁধা দিয়ে বলল,
“আব্বু, আমি তোমার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছি। তুমি বসে থাকো।”
নম্রতার মুখ থেকে কথাটা শুনে পাশ থেকে সিমি বলে উঠল,
“আব্বু, আমিও তোমার প্লেটে খাবার তুলে দেব।”
সিমির কথায় নম্রতা আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না। তুমি পারবে না। তুমি ছোট।”
নম্রতা ভীষণ শান্ত-শিষ্ঠ, নরম স্বভাবের। ভীষণ বুঝদারও মেয়েটা। সিমি আবার ঠিক উল্টো। মেয়েটার যেমন রাগ, তেমনই জেদ। বলা যায় মায়ের মতন মাথার দু তিনটে বোধহয় তার কাটা রয়েছে। সেজন্যই তো নম্রতার কথা মোটেই মানতে পারল না। নিজেই তার আব্বুর প্লেটে খাবার তুলে দেবে বলে কান্নাকাটি শুরু করতে লাগল। শেষে বাধ্য হয়ে গহন দুজনকে দুটো প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে বলল।
নম্রতার দ্বারা যতটুকু গুছিয়ে সম্ভব ততটুকু গুছিয়েই খাবার বেড়ে দিল। কিন্তু সিমি সেভাবে গুছিয়ে দিতে পারল না। কিছু খাবার প্লেটের উপরে পড়ল তো কিছু টেবিলে। তবুও গহন কিছু বলল না। শুধু মন ভরে দুই মেয়েকে দেখতে লাগল।
একটা সময় ছিল যখন গহনের প্লেটে খাবার তুলে দেওয়ার মতন কোন মানুষ ছিল না। গুছিয়ে তো দূর অগোছালো ভাবেও কেও খাবার বেড়ে দিত না। অথচ এখন ওর প্লেটে খাবার বেড়ে দেওয়ার জন্য কত তোড়জোড়। দু দিক থেকে দুজন দুটো প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। তাদের চেষ্টা আব্বুর প্লেটটা সুন্দরভাবে গুছিয়ে দেওয়ার।
এই সবটাই নিধির জন্য সম্ভব হয়েছে। মেয়েটা সব সময় বাচ্চাদেরকে শেখায় যেন আব্বুর বেশি খেয়াল রাখে, আব্বুর বেশি যত্ন করে, আব্বুকে বেশি ভালোবাসা। ছেলেমেয়েরাও তাই শিখেছে।
এরই মাঝে নিধি এলো সেখানে চা নিয়ে। একবার দেখে নিল আড়চোখে দুই মেয়েকে। এই অল্প সময়ের মাঝে খাবার দাবার ফেলে টেবিলের অবস্থা একেবারে খারাপ করে ফেলেছে। বিশেষ করে সিমি। অন্যান্য সময় হলে নিধি এই আকামের জন্য বেশ গালি দিত মেয়েদের। ভালো মতো বকাবকি করত। তবে যখনই ওদের দুষ্টুমি গুলো গহনকে শান্তি দেয় তখনই নিধি আর কিছু বলে না। এইতো এখনো নিধি গহনের চোখ দুটো দেখেই বুঝতে পারছে মেয়েদের দুষ্টুমি, পাগলামি দেখে গহন ঠিক কতটা শান্তি পাচ্ছে। সেজন্যই তো কিছুই বলল না।
ওদের খাওয়া দাওয়ার মাঝে কলিং বেল বেজে উঠল। নিধি দরজা খুলতেই দেখল সিনথিয়া আর বাদল এসেছে। সিনথিয়ার কোলে ওর ছয় মাসের ছেলে। চার বছর হলো বাদলের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের দায়িত্বে ছিল গহন। গহন নিজেই বাদল কে সিনথিয়ার জন্য পছন্দ করেছে। নিজেই বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিল। সিনথিয়ার অতীত সম্পর্কে সবই জানিয়েছিল। বাদলের কোন আপত্তি ছিল না। পরে পারিবারিকভাবে দুজনের বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং সিনথিয়া জোর গলায় বলতে পারে ও সুখী। ভীষণ সুখী। গহন যেমন নিজে একজন চমৎকার মানুষ ঠিক তেমনি ওর জন্য একজন চমৎকার জীবনসঙ্গীকেই বেছে দিয়েছে।
প্রায়ই সিনথিয়া আসে বাড়িতে। ওর শ্বশুরবাড়িতে কেউ নেই। ওরা দুজন মাত্র মানুষ। বাদল তো অফিসে চলে যায়। একা একা তাই বাড়িতে ভালো লাগেনা। এখানে নিধিও বাড়িতে একা। ওর সাথে এসে একটু গল্প গুজব করলে ভালো লাগে। আজকে অবশ্য আরও একটা উদ্দেশ্য আছে আসার। সালমা বেগম ভীষণ অসুস্থ। ওনাকে দেখতে যাবে বিকেলে । গহনরাও যাবে। সেজন্যই এই বাড়িতে চলে এসেছে। ভেবেছে ওদের সাথেই যাবে।
____________
নিধি তখন দুপুরে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত। দুপুরে বাদলও আসবে। জামাই মানুষ তাকে তো একটু খাতির যত্ন করতে হবে। এমন সময় নিধির ফোন বেজে উঠল। সামির ওকে ফোনটা দিয়ে গেল। নিধির ভাই কল করেছে। এখন আর নিয়াজ ছোট নেই। কলেজে পড়ে। নিধি ফোনটা রিসিভ করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ বল নিয়াজ।”
“আপু দেখো না অনেকগুলো বাজার এসেছে আমাদের বাড়িতে। আম্মু বলছে তুমি নাকি কয়েকদিন আগেই টাকা পাঠিয়েছিলে। এখন আবার এতগুলো বাজার কে পাঠাল এই নিয়ে চিন্তায় আছে। একবার বলছে ভুল ঠিকানায় চলে এসেছে। আবার ভয়ও পাচ্ছে কোন কারণ ছাড়া। তুমি একটু কথা বলো তো।”
নিয়াজের থেকে নীলা ফোনটা কেড়ে নিয়ে কেমন যেন আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“তুই আবার কেন বাজার করে পাঠিয়েছিস? এখানে তো কম টাকার বাজার নেই। মাছ, মাংস, শাকসবজি সব কিনে পাঠিয়েছিস। কিছুদিন আগেই তো টাকা পাঠালি। এত টাকা পেলি কোথায়? চাকরিও তো করিস না। ইশ জামাই কে আর কত জ্বালাবি!”
নিধি তৎক্ষণাত কোন উত্তর দিল না। সত্যি বলতে নিধি কোন বাজার করে পাঠায়নি। আর যেহেতু নিধি পাঠায়নি তার মানে নিশ্চয়ই গহনই পাঠিয়েছে। মাঝেমধ্যেই এমন করে ছেলেটা। আজ তো ওদের বাড়িতেও সাপ্তাহিক বাজার করে পাঠিয়েছে গহন। তাহলে তো আর কোন সন্দেহই রইল না।
তবে নীলা কে সেসব বলতে চাইল না। ওনারা ব্যাপারটাকে বড্ড অস্বস্তির চোখে দেখেন। ভাবেন জামাইয়ের ঘাড়ে বোঝা হয়ে আছেন। তাই নিধি ওনাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“আমি পাঠিয়েছি মা। আর কে পাঠাবে!”
“কি দরকার ছিল? এখনো তো বাজার রয়েছেই বাড়িতে।”
“তো কি হয়েছে? আমি এখানে ভালো মন্দ খাব আর আমার বাবা মা খাবে না। আর কে বলেছে আমি চাকরি করি না, হুম? পড়াশোনা শেষ করেছি আমি। গহনের অফিসেই চাকরি করি।”
নীলা রুষ্ট গলায় বললেন,
“এত চাপ দিস না জামাইকে। কি ভাববে বলতো? ওদিকে জামাইকে কতজনের দায়িত্ব সামলাতে হয়। তোর নিজের সংসার আছে, চারটে ছেলে মেয়ে আছে। আবার এদিকে আমাদের সংসার। কি দরকার ছিল আমাদেরকে ভাড়া বাড়িতে এনে তোলার? তোর বাবার চিকিৎসা, নিয়াজের পড়াশোনা এত দায়িত্ব ছেলেটা একা কি করে পালন করে?”
“উনি সব পারেন মা। আর বললাম তো এগুলো আমি পাঠিয়েছি। আমি চাকরি করি ওনার অফিসে। সত্যি বলছি। কত কাজ করে দেই ওনাকে!”
“চাকরি করিস তাহলে অফিসে যাস না কেন?”
“আমি বাড়ি থেকে কাজ করি। যাকে বলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম। শোন, আমি এখন রান্নায় ব্যস্ত আছি। তুমি নিয়াজকে জিজ্ঞেস করো। ও তোমাকে বুঝিয়ে দেবে এসব। এখন রাখছি।”
কথাটা বলে নিধি ফোনটা কেটে দিল। রান্না করতে করতেই গহনের ভাবনায় ডুব দিল। কি অদ্ভুত একটা মানুষ! কি চমৎকার তার ব্যক্তিত্ব, কি সুন্দর তার ভাবনা গুলো, কি মার্জিত তার আচরণ! স্ত্রীকে খুশি করার জন্য কত চেষ্টা তার। শুধুমাত্র স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য মানুষটা কত কিছুই না করে। কি অসম্ভব রকম ভালোবাসতে জানে মানুষটা। নিধি আজও ভেবে অবাক হয় যে এমন একটা চমৎকার মানুষকে এত সহজে কি করে পেয়ে গেল !