বারো মাসই বর্ষা

পর্ব - ৮১

🟢

ভীষণ মনোযোগ সহকারে গহন ফোনে কিছু একটা দেখছে। সেই তখন থেকে কি এত মনোযোগ দিয়ে গহন দেখছে সেটা নিধি বুঝতে পারছে না। বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর শেষে নিধি ভাবলো জিজ্ঞেস করবে।

“সেই তখন থেকে কি এত মনোযোগ দিয়ে দেখছেন, গহন?”

কোন উত্তর এলো না গহনের দিক থেকে। কিছুটা সময় গহনের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে নিধি আবার জিজ্ঞেস করল,

“কি দেখছেন এতো মনোযোগ দিয়ে?”

খানিকটা গলা উচিঁয়ে জিজ্ঞেস করেছিল এবার নিধি। ফলস্বরূপ গহনের ধ্যান ভাঙাতে সক্ষম হলো। তবে গহনের কানে নিধির প্রশ্নটা যায়নি। হঠাৎ করে নিধির কন্ঠ পেয়ে কেমন যেন একটু উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেল গহন কে।

“কি হয়েছে? কিছু লাগবে তোমার?”

নিধি এক হাতে কপাল চাপড়ে বলল,

“না রে বাবা কিছু লাগবে না আমার। জিজ্ঞেস করছিলাম সেই তখন থেকে ফোনে কি দেখছেন? মনে হচ্ছে ঢুকে যাবেন এখন ফোনের ভিতরে। এত মনোযোগ দিয়ে কি দেখছেন? কোন মেয়ের ছবি দেখছেন নাকি? দেখিতো কি দেখছেন?”

কথাটা বলে নিধি নিজেই উঠে এসে সোফায় গহনের পাশে বসে গহনের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল দেখার জন্য যে গহন আসলে কি দেখছে। নিধি দেখল গহন কি দেখছে। তারপরে আরেক দফা কপাল চাপড়ে বলল,

“হায়রে পাগল! এসব আবার ফোনে দেখতে হয়? আর আপনি কি পাগলামি শুরু করেছেন, বলুন তো? ডাক্তারের কাছে তো গিয়েছিলাম। উনি তো বলেছেন কি করতে হবে। এখন আমি কি খাব না খাব, কিভাবে চলাফেরা করব সেগুলো আপনি ফোন থেকে দেখবেন? এত সাবধানতার কোন প্রয়োজন নেই। পৃথিবীতে আমিই প্রথম মেয়ে না যে মা হবে। আর তাছাড়া আপনি এমন বাচ্চাদের মতন আচরণ করছেন কেন?”

গহন একটু নড়েচড়ে বসে কিঞ্চিত গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

“এমনিতেই তোমার বয়স কম। তার ওপরে তুমি যে চঞ্চল, অস্থির স্বভাবের মেয়ে তোমাকে নিয়ে সাবধান থাকতেই হবে। এখনো তোমার ছোটাছুটি কমেনি। তোমার চিন্তায় না আমার রাতে ঘুম হচ্ছে, না দিনে কাজে মনোযোগ দিতে পারছি। একা তো তোমাকে বাড়িতে রেখে যেতেও পারছিনা অফিসে।”

নিধি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তাহলে আর কি? আমাকে ব্যাগের ভেতরে তুলে নিয়ে চলুন অফিসে। এমনিতেও আপনার বউ ছোটখাটো মানুষ। ব্যাগের ভেতরে খুব সহজে ঢুকে যেতে পারব। চলুন যাই।”

নিধির কথাটা শুনে গহন কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। যেন খানিকটা অবাক হয়েছে আবার একটু বিরক্তও হয়েছে।গহনের এমন অভিব্যক্তি দেখে নিধি হেসে ফেলল। তবে গহন মোটেই হাসতে পারল না। বরং পাশ থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে কাজে মনোযোগ দিল। গহন কে এখন আবার কাজে মনোযোগ দিতে দেখে নিধি বিরক্ত হলো। ভাবলো একটু বিরক্ত করবে। গহন কে কাজ করতে দেবে না এখন। তবে সেই সময়টুকুও আর পেল না নিধি। তার আগেই কলিংবেল বেজে উঠলো।

যদিও গহন উঠে যেতে চাইল দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। তবে নিধি যেতে দিল না। নিজেই গিয়ে দরজা খুলল।

দরজা খুলতেই প্রথমে যেই মানুষটার ওপর নিধির দৃষ্টি গেল তিনি হলেন সালমা বেগম। নিধির চোখ দুটো যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। চার মাসের অধিক সময় হয়ে গেছে নিধিরা এই বাড়িতে এসে উঠেছে। এর মধ্যে সালমা বেগম ভুলক্রমেও কোনোদিন এই বাড়িতে পা রাখেননি।

ওনার সাথে সিনথিয়াও এসেছে। সিনথিয়া এর আগেও অনেকবারই এসেছে এই বাড়িতে। প্রায়ই আসে মেয়েটা। তখন সিনথিয়ার থেকেই মাঝে মাঝে শুনেছে সালমা বেগম নাকি প্রতিজ্ঞা করেছেন কোনদিন নিধির বাড়িতে পা রাখবেন না। যে বাড়িতে পা রাখার আগেই নিধির নাম দেখতে হয় সেই বাড়িতে উনি কেন, ওনার লা শও কখনো নাকি আসবে না। তাই নিধি সত্যিই বুঝতে পারছে না আজ সালমা বেগম এসেছে নাকি ওনার রূপধারী কোন জ্বীন-ভুত এলো।

“আরে মা, আপনি সত্যি এসেছেন? আপনার পায়ের ধুলো তবে পড়লো আমার ঘরে? আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আপনি এসেছেন আমার বাড়িতে।”

খানিকটা নড়ে চড়ে উঠলেন সালমা বেগম। একটু যেন অপ্রস্তুত হয়েও পড়লেন। তবে তিনি তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর আচরণ থেকে মোটেই বেরিয়ে আসতে পারলেন না।

“ইচ্ছে ছিল না তোমার বাড়িতে আসার। বলে রেখেছিলাম আমার ছেলে মেয়েকে যেন আমার লা শও কখনো এই বাড়িতে না আসে। আজও তোমার জন্য আসিনি। এসেছি আমার ছেলের সাথে দেখা করতে। সে তো মায়ের কথা ভুলেই গেছে। নিজের মাকে যেদিন কবরে রেখে এসেছে সেদিন তার সাথে সাথে যেন আমাকেও রেখে এসেছে, এমনভাবে ভুলে বসেছে আমার কথা।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নিধি। দরজার সামনে থেকে সরে দাড়িয়ে বলল,

“হয়েছে থামুন। ভিতরে আসুন।”

কথাটা বলে নিধি দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াতেই সালমা বেগম ভিতরে এলেন। ওনার পিছন পিছন সিনথিয়াও এলো। নিধিকে আগে জড়িয়ে ধরে শুভকামনা জানালো।

নিধিও পাল্টা জড়িয়ে ধরল সিনথিয়াকে। মেয়েটার মাঝে অগাধ পরিবর্তন এসেছে। এখনকার সিনথিয়ার মাঝে সেই পুরানো সিনথিয়ার কোন ছাপই দেখতে পাওয়া যায় না। নিজেকে মানুষ বানাতে পেরেছে মেয়েটা। সেই জন্য নিধিও আর পুরনো কথাগুলো তুলে খোঁচায় না। নিধি বুঝতে পারে সিনথিয়া ওর সাথে একটু বন্ধুত্ব করতে চায়, সম্পর্ক রাখতে চেয়ে ওদের সাথে, একটু ওদের বাড়িতে যাতায়াত করতে চায়। নিধিও সেজন্য ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করে সিনথিয়ার সাথে।

গহন তখন ফোনে কারো সাথে একটা কথা বলছে। সেজন্য এতক্ষণেও জিজ্ঞেস করতে পারেনি নিধিকে যে কে এসেছে।

সালমা বেগম ভেতরে আসতেই দেখলেন বসার ঘরে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে হাঁটুর উপরে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে গহন। কানে তার ফোন ধরা। কারো সাথে কথা বলছে।

নিজের অজান্তেই সালমা বেগমের চোখ দুটো কেমন যেন ছলছল করে উঠলো। বুকটা কেমন যেন হালকা হালকা লাগল। মনে হলো অনেকদিন পর তিনি এমন কিছু দেখলেন যা দেখে তার ভীষণ শান্তি লাগলো। ভেতরে জমে থাকা সব কষ্টগুলো যেন দূর হয়ে গেল। চোখের শান্তি অনুভব করলেন তিনি, মনের শান্তি অনুভব করলেন।

তাড়াহুড়ো করে আবার শাড়ির আঁচলে নিজের চোখের জল মুছেও নিলেন। নিধিকে দেখতে দেওয়া যাবে না যে উনি কাঁদছেন। নিধির সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দেওয়া যাবে না।

চোখের জল মুছে নিয়ে তিনি একবার গহনকে ডাকলেন,

“গহন!”

ডাকটা কানে যেতেই গহন মাথা তুলে তাকালো। এতক্ষণ সত্যিই সালমা বেগমকে খেয়াল করেনি। এবারে খেয়াল করল। কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল সালমা বেগমের দিকে। অনেকদিন পর সালমা বেগমের সঙ্গে দেখা হলো গহনের। মাঝে ফোনে কয়েকবার কথা হয়েছে। কিন্তু সামনাসামনি আর দেখা হয়নি।

ফোনে যার সাথে বলছিল আপাতত আর তার সাথে কথা বাড়ালো না। কলটা কেটে দিল।

অল্প একটু হেসে উঠে এগিয়ে গেল সালমা বেগমের দিকে। সালাম দিল। সালামের জবাব দিলেন সালমা বেগম। বরাবরের মতোই গহন আলতো হেসে জিজ্ঞেস করল,

“ভালো আছো, মা?”

গহনের সামান্য একটা প্রশ্নেই সালমা বেগমের ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ অভিমান বেরিয়ে আসতে চাইল। তবে তিনি সেসব হতে দিলেন না। সেই সবকিছু এক ঢোকে গিলে নিয়ে বললেন,

“ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?”

“হ্যাঁ মা। খুব ভালো আছি।”

“ও আচ্ছা। ভালো তো থাকবেই। ভালো থাকার জন্যই তো এসেছো। ভালো। ভালো থাকো।”

গহন আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। ফলস্বরূপ আর সালমা বেগমের সাথে কোন কথা বাড়াতে পারল না।

সিনথিয়ার সাথে গল্প করতে করতে নিধি ভিতরে এসে দেখল সালমা বেগম এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ইশারায় ওনাকে সোফা দেখিয়ে বলল,

“বসুন মা। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

সালমা বেগম বসলেন না। হাতে থাকা ব্যাগটা নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ধর। তোমার জন্য।”

নিধি আরেক দফা অবাক হলো। বিস্মিত গলায় বলল,

“আমার জন্য? সত্যি? এই নাকি আমার বাড়িতে আমার জন্য আসবেনই না। আবার এলেন তো এলেন, আমার জন্য উপহার নিয়ে এলেন!”

সালমা বেগম রেগে গেলেন না। বড় আলতো হেসে বললেন,

“কখনো তোমার বাড়িতে পা রাখার ইচ্ছে ছিল না আমার। তবু আজ আসতে হলো। আমার ছেলের খুশির দিনে ছেলে না চাইলেও আমি একটু সামিল হতে চাইলাম। ব্যাগের ভেতর একটা বক্স আছে। একটু পায়েস রান্না করে এনেছি। তুমি খেও। ভালো লাগবে আমার। আর ইচ্ছে না হলে ফেলে দিও।”

নিধি বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

বিজ্ঞাপন

“সব তো ঠিকই ছিল। আবার ফেলে দেওয়ার কথা কোত্থেকে এলো? আমি কি একবারও বলেছি ফেলে দেবো? আসলে আমার সাথে ঝগড়া না করলে যে আপনার ভালো লাগে না সেটা আমি বুঝে গেছি। যাইহোক, বসুন এখানে। আমি নাস্তা আনছি। ছেলের বাড়িতে এসে যদি আবার না খাইয়ে পাঠাই তাহলে তো ছেলের বউয়ের বদনাম হবে। আমি আবার এতসব বদনাম ঘাড়ে নিতে পারব না।”

কথাটা বলে নিধি পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। গহনের ততক্ষণে ফোনে কথা বলা শেষ। চুপচাপ বসে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছে।

সেই যে শুরুতে একটু কথা বলেছে সালমা বেগমের সাথে। আর বলেনি কিছু। হয়তো বলার মতন কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না।

সালমা বেগম নিজ থেকেই এগিয়ে এসে বসলেন গহন এর পাশে। যেই না কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রান্নাঘর থেকে গলা উচিঁয়ে নিধি ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“পায়েসটা সুন্দর হয়েছে, মা। তবে একটু তেঁতো, আপনার মতন।”

সালমা বেগম পাত্তা দিলেন না নিধির কথায়। যদিও নিধি কথাটা মজা করেই বলেছিল। তবে কেন যেন হঠাৎ করে গহন অস্থির হয়ে উঠলো। কি ভাবলো কে জানে। ল্যাপটপটা ফেলে রেখে ছুটে গেল রান্নাঘরে। হঠাৎ করে গহন কে এভাবে দৌড়াতে দেখে সালমা বেগম আর সিনথিয়াও ভ্যাবাচ্যাকা খেল। ওরা দুজনেও গেল গহনের পিছু পিছু।

নিধির হাতে তখনো পায়েসের বাটিটা। গহন দৌড়ে এসে আগে নিধির হাত থেকে পায়েসের বাটিটা নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তব্দা খেয়ে গেল নিধি। গহন উদ্বিগ্ন কন্ঠে বিরতিহীন ভাবে বলতে লাগলো,

“কতটুকু খেয়েছো? শরীর খারাপ লাগছে? মুখে যেটুকু আছে বের করে দাও। তেঁতো ছিল পায়েসটা? অন্যরকম লেগেছে? তুমি খেতে গেলে কেন? আমি কেন তোমাকে আটকালাম না? ডাক্তারের কাছে যাব, চল। নিধি, কথা বলছো না কেন? ঠিক আছো তুমি? এই নিধি!”

হঠাৎ করে গহনের এত উদ্বিগ্নতায় নিধি আসলেই তাজ্জব বনে গেছে। হা করে গহনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। গহন দুহাতে ওর কাঁধ ধরে ঝাকাচ্ছে। নিধির ধ্যান ভাঙলো। শুধু উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ। আমি ঠিক আছি।”

গহন ফের উদ্বিগ্নতার সহিত বলল,

“তুমি ঠিক নেই। ওই খাবারে কিছু একটা ছিল আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু সেটা তুমি বুঝতে পারোনি। চলো এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। নয়তো তোমার কিছু একটা হয়ে যাবে। আমাদের বাচ্চার কিছু একটা হয়ে যাবে। চলো।”

“গহন, কি হয়েছে আপনার? শান্ত হোন। কিছু ছিল না পায়েসে। আমি তো মজা করেছি। পায়েস তেঁতো কেন হতে যাবে?”

গহন মানলো না নিধির কথা। সে আবারো নিজের পূর্বের কথাই আওড়ালো,

“তুমি চলো ডাক্তারের কাছে। এক্ষুনি চলো।যদি কিছু একটা হয়ে যায়!”

গহনের এসব জোড়াজুড়ির মাঝেই পিছন থেকে ভেসে এলো সালমা বেগমের কণ্ঠস্বর।

“বি ষ মেশাইনি আমি তোমার স্ত্রীকে দেয়া পায়েসে। ভুল মানুষ এক দুবার করেই থাকে। তাই বলে তাকে সারা জীবনের জন্য খু নি ভেবে বসে থাকবে? এতগুলো মাস তো আমার বাড়িতে থেকে এলো। মা রা র ইচ্ছে থাকলে তখনই মা র তা ম। এতদিন পর এতদূর কষ্ট করে এসে খু ন করার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।”

শান্ত হয়ে গেল গহন। তবে এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না। আরেকবার উদ্বিগ্ন গলায় নিধিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“সত্যি করে বলো আমায় ঠিক আছো তো তুমি? শরীর খারাপ লাগছে না তো?”

নিধি আবারও গহনকে আশ্বস্ত করে বলল,

“ঠিক আছি আমি। শরীর খারাপ লাগছে না আমার। এই যে দেখুন আমার দিকে তাকিয়ে আমি একদম ঠিক আছি, গহন। অযথা চিন্তা করছেন আপনি।”

এতক্ষণে গহন যেন আশ্বস্ত হলো। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে তৎক্ষণাত নিধিকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।

“ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম বোধহয় তোমাদের খেয়াল রাখতে পারলাম না। কোথাও বোধহয় কোন ভুল করে ফেললাম।”

নিধি দেখতে পাচ্ছে এখনও সালমা বেগম আর সিনথিয়া দুজনেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। খানিকটা অস্বস্তির মাঝে পড়ল নিধি। গহনকে জোর করে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বলল,

“বুঝেছি আমি। কিন্তু আমি ঠিক আছি। এখন যান আপনি। পাগলই হয়ে গেছেন আপনি।”

গহন শুধু আলতো হাসলো। যেই না আবারও বসার ঘরের দিকে পা বাড়ালো অমনি খেয়াল করল নিধি যেন পড়ে যেতে ধরেছে। সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলল গহন নিধিকে। মাথাটা ঘুরে উঠেছিল নিধির। কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখলো।

“কি হলো তোমার? তুমি না বলেছিলে ঠিক আছো? নিধি, কি হলো? কথা বল।”

নিধি দুর্বল গলায় বলল,

“ঠিক আছি আমি। শুধু মাথাটা ঘুরছে।”

নিধির মাথা ঘোরার কথা শুনে গহনের মাথাটাও যেন ঘুরে উঠলো। ভয়টা আবারো জেগে উঠলো মনের মাঝে। তার মানে গহনই ঠিক ছিল। কিছু একটা তো মেশানো ছিল পায়েসে। তারমানে গহন ঠিকই আন্দাজ করেছিল।

সালমা বেগম নিজের সন্তান মা রা যাওয়ার জন্য গহনকে দায়ী করেন। হয়তো সেই জন্য গহনের সন্তানকেও মে রে ফেলতে চাইছেন। হয়তো চাইছেন যেন গহনও সেই একই কষ্টটা অনুভব করতে পারে। হয়তো তিনি এত বছর যাবত এই প্রতিশোধটা নেওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন।

গহনকে আর কেউ আটকাতে পারল না। কারো থেকে আর কোন কিছু শুনলোও না। নিধির থেকেও আর কোন অনুমতি না নিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে দৌড় লাগালো।

নিধির তখনও মাথাটা ঘুরছে। গহনকে কিছু বলতেও পারছে না। প্রথমে তো ভেবেছিল বোধহয় ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। পরে বুঝল নিচে এনে গাড়িতে বসিয়েছে।

“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”

গহন তাড়াহুড়ো করে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে বলল,

“ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই কিছু ছিল ওই খাবারে। নয়তো তোমার শরীর কেন খারাপ হয়ে গেল? তুমি জানো না মায়ের আমার প্রতি কতটা রাগ। প্রতিশোধ উনি নেবেনই। কোন না কোনভাবে ঠিক প্রতিশোধ নেবেন। ওনার প্রতিশোধের নেশায় তোমাদের হারাতে পারবো না আমি।”

__________

সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার দেখিয়ে গহন আর নিধি বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ করে নিধির মাথা ঘুরে ওঠাটা নিতান্তই স্বাভাবিক ছিল। কোন সমস্যা হয়নি। খাবারেও কোন কিছুই ছিল না। নিধি যদিও ব্যাপারটা আগেই আন্দাজ করেছিল। তবে গহনের উদ্বিগ্নতা কমানোর জন্য আর কিছু বলেনি।

গহনের চোখ মুখের দিকে এখনো তাকানো যাচ্ছে না। কয়েক ঘন্টার চিন্তাতেই ছেলেটার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। গহনকে দেখতেই এখন অসুস্থ মনে হচ্ছে।

“সামান্য বিষয়গুলো নিয়ে এত চিন্তা করলে চলে, গহন? সামনে আমার অসুস্থতা আরো বাড়বে। তখন কি করবেন আপনি?”

গহন বিড়বিড় করে বলল,

“পাগলই হয়ে যাব আমি।”

“কি বললেন?”

গহন তাড়াহুড়ো করে নিজের কথা পাল্টে নিয়ে বলল,

“ভয় হয় আমার তোমাদের নিয়ে তুমি বোঝো না? আমার ভয় হওয়াটা অস্বাভাবিক না। তোমার কষ্ট দেখতে পারিনা আমি। আমার সহ্য হয় না।”

নিধি মৃদু রাগী গলায় বলল,

“ডেলিভারির সময় তো এর থেকে আরও হাজারগুন বেশি কষ্ট হবে। তখন কি করবেন? নাকি পেট কেটে বাচ্চাটা আপনার পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেবো এখন?”

গহন মিনমিনে গলায় বলল,

“সম্ভব হলে তাই করতাম। তবুও তোমায় কষ্ট পেতে দিতাম না। তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয় না। বুকটা ছিঁড়ে যায়। কি করবো আমি?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিধি। কি আর বলবে? মানুষটা কখনো কাউকে ভালোবেসে শান্তি পায়নি। কেউ তার ভালোবাসার কদরও করেনি। সেজন্য সবটুকু ভালোবাসা এসে এখন পড়েছে নিধির ওপর। এমন পাগলামো তো করবেই।

বিজ্ঞাপন
বারো মাসই বর্ষা গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও পারিবারিক গল্প